“এমন কার্য্যকারী” হওয়ার জন্য চেষ্টা করা “যাহার লজ্জা করিবার প্রয়োজন নাই”
আন্দ্রে সোপা দ্বারা কথিত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরম পর্যায়ে যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড হয় ও এর ফলে মানুষের মধ্যে যে হতাশা আসে তা বর্ণনা করা যায় না। জার্মানির নৌবাহিনী, নরওয়ের নার্ভিকের কাছে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করেছিল আর সেখানে সিগ্ন্যালম্যানের কাজ করার সময় আমি নিজের চোখে মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুর ব্যবহার দেখতে পেয়েছিলাম। রাতে সমুদ্রতটে থাকার সময় আকাশের অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে আমি আমার জীবন সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করি। আমি এই বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম যে ঈশ্বর যিনি এত অপূর্ব জিনিস সৃষ্টি করেছেন তিনি কখনই এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের জন্য দায়ী হতে পারেন না।
আমি ১৯২৩ সালে চেকোস্লাভাকিয়ার সীমান্তের কাছে লাসোতের (বর্তমানে পোল্যান্ডে) একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলাম আর গরিব কৃষক পরিবারে আমি বড় হয়ে উঠি। আমার বাবামা ক্যাথলিক ছিলেন আর ধর্ম আমাদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু, ছোটবেলা থেকেই ধর্ম সম্বন্ধে আমার মনে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিত। আমাদের গ্রামে, তিনটি প্রটেস্টান্ট পরিবার ছিল আর ক্যাথলিকেরা তাদেরকে একঘরে করে দেয়। আমি বুঝতাম না যে তাদের সঙ্গে কেন এমন করা হয়েছিল। স্কুলে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আমাদেরকে ধর্মীয় মতবাদগুলো শিক্ষা দেওয়া হতো। একদিন আমি যাজককে ত্রিত্ব বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে বললে যে উত্তরটি আমি তার কাছ থেকে পেয়েছিলাম, তা ছিল দশটি বেতের বাড়ি। তাসত্ত্বেও, আমার যখন ১৭ বছর বয়স তখন এমন কিছু ঘটে যার জন্য আমি গির্জার সঙ্গে সবরকমের সম্পর্ক ছিন্ন করি। আমার দাদুদিদিমা এক মাস অন্তর মারা যান আর আমার মায়ের কাছে দুটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য গির্জায় দেওয়ার মতো যথেষ্ট টাকা ছিল না। তাই তিনি যাজককে বলেন যে তিনি পরে টাকা দিয়ে দেবেন। কিন্তু যাজক বলেন, “আপনার বাবামার কিছু জিনিসপত্র তো আছে, তাই না? যান সেগুলোকে বিক্রি করে অন্ত্যষ্টিক্রিয়ার জন্য ব্যবস্থা করুন।”
এই ঘটনার কয়েক বছর আগে ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় আসার পর, আমাদের পোলিস ভাষায় কথা বলতে নিষেধ করা হয়; আমাদেরকে জার্মান ভাষায় কথা বলতে হতো। যারা সেটি অমান্য করেছিলেন কিংবা যারা জার্মান ভাষা শিখতে পারেননি, ধীরে ধীরে তাদের আর দেখা যায়নি—পরে আমরা জেনেছিলাম যে তাদেরকে কনসেনট্রেশন শিবিরে পাঠানো হয়েছিল। এমনকি আমাদের গ্রামের নাম পাল্টিয়ে জার্মান নাম গ্রুনফ্লিস দেওয়া হয়েছিল। আমি ১৪ বছর বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে দিই আর আমি হিটলারের যুবদলের না হওয়ায় চাকরি পাওয়া আমার জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু একসময়, আমি কামারের কাজ পাই। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হিটলার ও জার্মান সৈন্যবাহিনীর জন্য গির্জায় প্রার্থনা শুরু হয়ে যায়। আমি ভাবতাম যে অন্য পক্ষও নিশ্চয় জয়লাভের জন্য একইরকম প্রার্থনা করছে।
জার্মান নৌবাহিনীতে কাজ
১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে, আমি জার্মান নৌবাহিনীতে যোগ দিই আর ১৯৪২ সালের প্রথমদিকে আমাকে নরওয়ের সমুদ্র উপকূলে পাঠানো হয় ও সেখানে আমি যুদ্ধজাহাজে কাজ করি। আমাদেরকে ট্রোন্ডেইম ও ওসলো এর মধ্যে রক্ষি জাহাজে করে সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য জিনিস আনানেওয়ার কাজ দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে জাহাজে আমি দুজন নাবিককে জগতের শেষ সম্বন্ধে আলোচনা করতে শুনেছিলাম যে বিষয়ে বাইবেলে ভাববাণী করা আছে। যদিও প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পেতেন, তবুও তারা আমাকে বলেছিলেন যে তাদের বাবামা যিহোবার সাক্ষীদের সঙ্গে মেলামেশা করছেন কিন্তু তারা তাদের মতো তা করেননি। সেই সময়ই আমি প্রথম যিহোবার সাক্ষীদের সম্বন্ধে জানতে পেরেছিলাম।
যুদ্ধ শেষে, ব্রিটিশরা আমাদেরকে বন্দি করে নিয়ে যায়, পরে জার্মানিতে ফেরত পাঠানোর জন্য আমাদেরকে আমেরিকার লোকেদের হাতে তুলে দেয়। আমাদের মধ্যে যাদের বাড়ি তখন সোভিয়েত অঞ্চলে ছিল, তাদেরকে কয়লা খনিতে কাজ করার জন্য উত্তর ফ্রান্সের লেভিনের একটি জেল শিবিরে পাঠানো হয়। এটি ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের ঘটনা। আমার মনে আছে যে আমি একজন ফরাসি রক্ষীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তার ধর্ম কী। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “ক্যাথলিক।” যেহেতু আমিও একজন ক্যাথলিক ছিলাম, তাই আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেন আমরা একে অপরের শত্রু হয়েছি? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “বোঝার চেষ্টা করেছি কিন্তু এর কোন উত্তর পাইনি।” কিন্তু আমার কাছে এটি খুবই অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছিল যে কী করে একই ধর্মের লোকেরা যুদ্ধ করে ও একে অপরকে হত্যা করে।
কয়লা খনিতে আলোকচ্ছটা
স্থানীয় খনিকর্মীদের সঙ্গে খনিতে কাজ করার প্রথমদিনে ইভান্জ ইমিয়ট নামে এক ব্যক্তি তার থেকে কিছুটা স্যান্ডউইচ আমাকে খেতে দেন। তিনি আমেরিকার ওহিও থেকে এসেছেন ও বেশ কয়েক বছর ধরে ফ্রান্সেই থাকছেন। তিনি আমাকে এমন এক জগৎ সম্বন্ধে জানান যেখানে আর যুদ্ধ থাকবে না। তার সদয় ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যদিও আমি একজন জার্মান ছিলাম আর তিনি ছিলেন আমেরিকার কিন্তু তারপরও তিনি আমাকে তার শত্রু ভাবেননি। তিনি আমাকে “শান্তিরাজ” (ইংরাজি) নামক একটি পুস্তিকা দেন এবং সেই থেকে ১৯৪৮ সালের আগে পর্যন্ত তার সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। শেষ পর্যন্ত এখানে আমি একমাত্র মঙ্গলময় ঈশ্বর সম্বন্ধে জানতে পারি যিনি যুদ্ধকে ঘৃণা করেন—তিনি সেই ঈশ্বর যাঁর সম্বন্ধে আমি রাতের আকাশের সৌন্দর্য দেখার সময় কল্পনা করতাম। যে ধর্ম এইরকম শিক্ষা দেয় তা খুঁজে বের করার জন্য আমি সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। কিন্তু ইভান্জ যেহেতু খনির অপর প্রান্তে কাজ করতেন, তাই আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। আমি বন্দি শিবিরে সমস্ত ধর্মীয় দলের কাছে গিয়েছিলাম আর তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে তারা এই পুস্তিকা সম্বন্ধে কিছু জানেন কি না কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
অবশেষে, ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে বন্দি শিবির থেকে ছাড়া পেয়ে আমি একজন স্বাধীন কর্মী হই। এর ঠিক পরের রবিবার, রাস্তায় একটি ছোট ঘন্টার আওয়াজ শুনে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। রাস্তায় ইভান্জকে দেখে আমার কী যে ভাল লেগেছিল! তিনি যিহোবার সাক্ষীদের একটি দলের সঙ্গে ছিলেন যারা বুকে ও পিঠে ব্যানার লাগিয়ে জনসাধারণের বক্তৃতার বিষয়বস্তু ঘোষণা করছিলেন। যে সাক্ষী ঘন্টা বাজাচ্ছিলেন তার নাম মারসো লারওয়া, যিনি এখন ফ্রান্সের শাখা কমিটির একজন সদস্য। জার্মান-ভাষী যোষেফ কুলচাক নামে পোল্যান্ডের এক ব্যক্তির সঙ্গে আমাকে আলাপ করিয়ে দেওয়া হয়। তিনি তার বিশ্বাসের জন্য কনসেনট্রেশন শিবিরে কষ্টভোগ করেছিলেন। তিনি আমাকে সেই সন্ধ্যায় তার সঙ্গে সভায় আসতে বলেন। সভায় যা বলা হয়েছিল আমি তার বেশিরভাগই বুঝতে পারিনি কিন্তু সভায় যোগদানকারীরা যখন তাদের হাত উঠিয়েছিলেন, আমি আমার পাশের জনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে কেন তারা হাত উঠিয়েছেন। তিনি জানিয়েছিলেন “এরা পরের সপ্তাহে প্রচার করার জন্য ডনকর্কে যেতে চান।” আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “আমি কি আসতে পারি?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “অবশ্যই!” তাই পরের রবিবার আমি ঘরে ঘরে প্রচার শুরু করি। যদিও যাদের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল সকলে আমাদের কথা শোনেননি, তবুও প্রচার করে আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম আর শীঘ্রই নিয়মিতভাবে প্রচারে অংশ নিতে শুরু করেছিলাম।
আমি আমার মেজাজকে সংযত করতে শিখি
এর অল্প কিছুদিন পর, সাক্ষীরা সেই ব্যারাকগুলোতে প্রচার করতে শুরু করেছিলেন যেখানে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া জার্মান কয়েদিরা থাকতেন। কিন্তু তাদের কাছে প্রচার করা আমার জন্য সহজ ছিল না, কারণ তারা আমার বদমেজাজ সম্বন্ধে ভালভাবেই জানতেন। কেউ যখন আমার কথায় গুরুত্ব দিতেন না, আমি তাকে এই বলে ভয় দেখাতাম: “যদি সাবধান না হন, তাহলে কিন্তু বিপদে পড়বেন।” খনিতে কাজ করার সময়, আমি একবার একজনকে ঘুষি মেরেছিলাম কারণ তিনি যিহোবাকে উপহাস করেছিলেন।
যাইহোক, যিহোবার সাহায্যে আমি আমার ব্যক্তিত্বকে পাল্টাতে পেরেছিলাম। একদিন আমরা যখন এই ব্যারাকগুলোতে প্রচার করছিলাম, তখন একদল মাতাল সাক্ষীদের কাজে ঝামেলা সৃষ্টি করে। আমি যে ভাইদের সঙ্গে কাজ করছিলাম তারা জানতেন যে আমি একটুতেই রেগে যাই, তাই তারা আমাকে এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে বারণ করেন। কিন্তু ওই দলের একজন ভয় দেখিয়ে আমার দিকে তেড়ে এসে তার গায়ের জ্যাকেটটি খুলতে শুরু করে। আমি আমার সাইকেল থেকে নেমে সেই লোকটাকে ধরতে বলি এবং তারপর আমার হাত দুখানা পকেটের মধ্যে রাখি। এতে তিনি এত অবাক হয়ে যান যে আমি যা বলেছিলাম তিনি তা শুনেছিলেন। আমি তাকে বাড়ি গিয়ে একটু ঘুমিয়ে জনসাধারণের বক্তৃতা শোনার জন্য আসতে বলেছিলাম। আর সেইমত ঠিক ৩:০০টের সময় তিনি সেখানে হাজির হয়েছিলেন। পরিশেষে, আগে যারা কয়েদি ছিলেন তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন আমাদের সংবাদ শুনে তা গ্রহণ করেছিলেন। আর আমি ১৯৪৮ সালে সেপ্টেম্বর মাসে বাপ্তিস্ম নিই।
ব্যস্ত অথচ পুরস্কারদায়ক কর্মসূচি
যে এলাকাগুলোতে আমরা প্রচার করতাম সেগুলো দেখাশোনা করার ও কোন্ এলাকাগুলোতে জনসাধারণের বক্তৃতা দেওয়া যেতে পারে তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছিল। তা করার জন্য খনিতে রাতের শিফ্টে কাজ করার আগে আমাকে কখনও কখনও আমার ছোট মটর সাইকেলে চড়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করতে হতো। তারপর প্রতি শনিবার-রবিবারে, আমরা বাসে করে আমাদের প্রচারের এলাকায় যেতাম আর বক্তার সঙ্গে দুই অথবা চারজন প্রকাশক নেমে যেতেন। বড় শহরগুলোতে, উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করে, আমরা সেখানে আমাদের সুটকেসগুলোকে একসঙ্গে জড় করে বক্তৃতা দেওয়ার মঞ্চ তৈরি করতাম। প্রায়ই, আমরা বুকে ও পিঠে ব্যানার লাগিয়ে জনসাধারণের বক্তৃতার বিষয়বস্তু ঘোষণা করতাম ও লোকেদের আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাতাম।
১৯৫১ সালে জেনেট শৌফোর নামে একজন সাক্ষীর সঙ্গে আমার দেখা হয় যিনি রিমস থেকে এসেছিলেন। প্রথম দেখাতেই আমাদের মধ্যে প্রেম হয়ে যায় আর এর এক বছর পর, ১৯৫২ সালের মে মাসে আমরা বিয়ে করি। আমরা ডুয়ার কাছে পিকাকুঁর নামে একটি শহরে চলে যাই যেখানে খনি ছিল। কিন্তু শীঘ্রই, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ডাক্তার বলেছিলেন যে আমার ফুসফুসের রোগ হয়েছে যা খনিতে কাজ করার জন্য হয়েছিল আর এর ফলে আমি শ্বাসকষ্টে ভুগতাম। কিন্তু অন্য কোথাও কাজ খুঁজে পাওয়া আমার জন্য কঠিন ছিল। তাই ১৯৫৫ সালে, জার্মানির নুরেমবার্গে আন্তর্জাতিক অধিবেশনের সময় আমাদের যখন রাইনের একটি শিল্প এলাকা, কেলের একটি ছোট মণ্ডলীকে সাহায্য করার কথা বলা হয়েছিল, সেখানে কাজ করতে আমাদের কোন বাধাই ছিল না। তখন সেই মণ্ডলীতে মাত্র ৪৫ জন প্রকাশক ছিলেন। এরপর সাত বছর আমরা সেই মণ্ডলীতে কাজ করেছি আর মণ্ডলীতে প্রকাশকের সংখ্যা বেড়ে ৯৫ জন হয়েছিল।
পরিচর্যার অন্যান্য সুযোগ
মণ্ডলী দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেখে আমরা সোসাইটির কাছে আবেদন জানাই যেন আমাদের ফ্রান্সে বিশেষ অগ্রগামী করে পাঠানো হয়। আমাদের প্যারিসে কার্যভার দেওয়া হয়েছে জেনে আমরা অবাক হয়ে যাই। যে আট মাস আমরা সেখানে কাটিয়েছিলাম তা আনন্দে ভরপুর ছিল। আমি ও জেনেট দুজনে মিলে ৪২টি বাইবেল অধ্যয়ন করতে পেরেছিলাম। আমরা সেখানে থাকাকালে পাঁচজন ছাত্র বাপ্তিস্ম নিয়েছিলেন আর অন্য ১১ জন পরে সত্যে এসেছিলেন।
যেহেতু আমরা ল্যাটিন কোয়ার্টারে থাকতাম, সরবন থেকে আসা অধ্যাপকদের সঙ্গে প্রায়ই আমাদের দেখা হতো। দর্শনবিদ্যার অবসরপ্রাপ্ত এক অধ্যাপক যিনি অলৌকিকভাবে রোগ ভাল করতেন তিনি বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করেন এবং পরে যিহোবার সাক্ষী হন। একদিন আমি এক সরকারি ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বাইবেল আলোচনা শুরু করেছিলাম যিনি জেসুইট শিক্ষকদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি বিকাল তিনটের সময় আমাদের ঘরে আসেন আর রাত দশটার সময় ফিরে যান। আমাকে অবাক করে দিয়ে দেড় ঘন্টা পর তিনি আবার আমাদের ঘরে ফিরে এসেছিলেন। তিনি একজন জেসুইটের সঙ্গে কথা বলেছিলেন যিনি বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী সম্বন্ধে তার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারেননি। রাত একটার সময় তিনি ঘরে ফিরে যান কিন্তু সকাল সাতটার সময় আবার ফিরে আসেন। পরে তিনিও একজন যিহোরার সাক্ষী হন। সত্যের জন্য এইরকম তৃষ্ণা সত্যিই আমার ও আমার স্ত্রীর কাছে বড়ই উৎসাহের বিষয় ছিল।
প্যারিসে কাজ করার পর, আমাকে ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলে ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ফ্রান্স ও জার্মান-ভাষী মণ্ডলীগুলোকে পরিদর্শন করে ভাইদের শক্তিশালী করা সত্যিই আমাদের কাছে আনন্দের বিষয় ছিল। লোরেনের রমবাস্ মণ্ডলী পরিদর্শন করার সময় স্টেনিলাস অ্যামব্রোসজাকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি পোল্যান্ডের লোক ছিলেন আর তিনি যুদ্ধের সময় এলিয়েড ডুবোজাহাজে কাজ করেছিলেন ও নরওয়ের সমুদ্রে যুদ্ধ করেছিলেন। সমুদ্রে থাকার সময় আমরা বিরোধী পক্ষ ছিলাম। এখন আমরা ভাই ভাই, একসঙ্গে আমাদের ঈশ্বর যিহোবার সেবা করছি। আরেকবার প্যারিসে একটি অধিবেশনে আমি আমার চেনা একজনকে দেখেছিলাম। তিনি ছিলেন উত্তর ফ্রান্স শিবিরের সেনাপতি, যেখানে আমি একজন কয়েদি ছিলাম। অধিবেশনে একসঙ্গে কাজ করতে পেরে আমরা কতই না আনন্দিত হয়েছিলাম! এটিই হল ঈশ্বরের বাক্যের ক্ষমতা, যে ক্ষমতা পূর্বের শত্রুদের ভাই ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত করে!
কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, ১৪ বছর ধরে ভ্রমণের কাজ করার পর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার কারণে আমাকে তা ছেড়ে দিতে হয়। তবুও, আমি ও আমার স্ত্রী আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ মনপ্রাণ দিয়ে যিহোবার সেবা করার জন্য সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। তাই মালহাউসে, যেটি ফ্রান্সের পূর্ব দিকে সেখানে আমরা থাকার জন্য ঘর ও কাজ খুঁজে নিই ও অগ্রগামী (পূর্ণ-সময়ের প্রচারক) হিসাবে কাজ করতে থাকি।
আর এই বছরগুলোতে আমার আনন্দের আরেকটি কারণ ছিল কিংডম হল নির্মাণ কাজে অংশ নেওয়া। ১৯৮৫ সালে আমাকে বলা হয়েছিল যে আমি যেন পূর্ব ফ্রান্সের নির্মাণ প্রকল্পের জন্য একটি দলকে সংগঠিত করি। দক্ষ কারিগরদের ব্যবহার করে এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমরা এমন একটি দল গড়ে তুলতে পেরেছিলাম যারা নির্মাণ প্রকল্পে অথবা ৮০টির বেশি হল পুনর্নির্মাণের কাজে অংশ নিয়ে সেগুলোকে যিহোবার উপাসনার জন্য উপযোগী করে তুলেছেন। আর ১৯৯৩ সালে দক্ষিণ আমেরিকার ফ্রেঞ্চ গায়েনা একটি অধিবেশন হল এবং পাঁচটি কিংডম হল নির্মাণের কাজ করতে পেরে আমি কতই না আনন্দিত হয়েছিলাম!
বিভিন্ন পরীক্ষা সত্ত্বেও এগিয়ে যাওয়া
বিগত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের ঐশিক কাজ সম্বন্ধে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে আমার জীবন প্রচুর আনন্দ ও পরিচর্যার সুযোগগুলোর দ্বারা ভরে গেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমার প্রিয়তমা স্ত্রী যার সঙ্গে আমি ৪৩ বছর একসঙ্গে কাটিয়েছিলাম সে ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মারা যায়। এই নিদারুণ দুঃখের সময় আর আজও আমি যখন শোক করি, যিহোবা আমাকে শক্তি দেন আর আমার আধ্যাত্মিক ভাইবোনেরাও আমাকে ভালবাসেন ও সাহায্য করেন যা সময় কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার দুঃখকে কমিয়ে দিয়েছে।
১৯৬৩ সালে জার্মানির মুনিচে একটি অধিবেশনে একজন অভিষিক্ত ভাইয়ের সেই কথাগুলো আজও আমার স্পষ্টভাবে মনে পড়ে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “আন্ড্রে, আশেপাশে তাকিও না। আমাদের ভাইয়েরা কনসেনট্রেশন শিবিরে পরীক্ষা সহ্য করেছেন। প্রচার কাজ চালিয়ে যাওয়া এখন আমাদেরই দায়িত্ব। আমরা যেন নিজেদের সম্বন্ধে কখনও দুঃখবোধ না করি। তাই এগিয়ে যাও!” আমি এই কথাগুলো সবসময়ে মনে রেখেছি। ভগ্ন স্বাস্থ্য ও বয়স বাড়ার জন্য যদিও আমি এখন খুব বেশি করতে পারি না কিন্তু ইব্রীয় ৬:১০ পদের কথাগুলো আমাকে সবসময়ে সান্ত্বনা যুগিয়েছে। এটি জানায়: “ঈশ্বর অন্যায়কারী নহেন; তোমাদের কার্য্য, এবং . . . তাঁহার নামের প্রতি প্রদর্শিত তোমাদের প্রেম, . . . তিনি ভুলিয়া যাইবেন না।” হ্যাঁ, যে কোন কাজের থেকে যিহোবার পরিচর্যা করা সবচেয়ে মহান সুযোগ। বিগত ৫০ বছর ধরে আমার লক্ষ্য ছিল ‘এমন কার্য্যকারী হওয়া, যাহার লজ্জা করিবার প্রয়োজন নাই’ এবং আজও সেই একই লক্ষ্য রয়েছে।—২ তীমথিয় ২:১৫.
[২২ পৃষ্ঠার চিত্র]
নরওয়ের সমুদ্রতটের কাছে এই রকমের এক নৌকায় চড়ে আমি কাজ করতাম
[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]
উত্তর ফ্রান্সে সাইকেলে প্রচাররত
[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]
সুটকেসগুলোকে একসঙ্গে জড়ো করে জনসাধারণের বক্তৃতার জন্য মঞ্চ তৈরি করা হত
[২৪ পৃষ্ঠার চিত্র]
১৯৫২ সালে আমাদের বিয়েতে আমার স্ত্রী জেনেটের সঙ্গে