সত্যের চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই
জি. এন. ভ্যান ডার বেল দ্বারা কথিত
১৯৪১ সালের জুন মাসে, আমাকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা ও জার্মানির বার্লিনের নিকটবর্তী স্যাকসেনহাউসেন কনসেনট্রেশন শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে আমি ৩৮,১৯০ নম্বর বন্দী হিসাবে ১৯৪৫ সালের এপ্রিলের কুখ্যাত মৃত্যু যাত্রা পর্যন্ত ছিলাম। কিন্তু সেই ঘটনাগুলি বর্ণনা করার আগে, আমি কিভাবে একজন বন্দী হয়েছিলাম সেই সম্বন্ধে আমাকে বলতে দিন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অল্প কিছুকাল পরেই ১৯১৪ সালে, নেদারল্যান্ডের রটারড্যামে আমি জন্মগ্রহণ করি। আমার বাবা রেলপথ নির্মাণের কাজ করতেন আর আমাদের ছোট ঘরটি রেললাইনের কাছেই অবস্থিত ছিল। ১৯১৮ সালে, যুদ্ধের শেষের দিকে আমি অনেক ট্রেনকে গর্জন করে চলে যেতে দেখেছি যেগুলিকে সেই সময় সংকট ট্রেন বলা হত। নিঃসন্দেহে সেইগুলি আহত সৈন্যদের দ্বারা পূর্ণ ছিল যাদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে গৃহে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
আমি ১২ বছর বয়সে চাকুরি করার জন্য বিদ্যালয় ছেড়ে দিই। আট বছর পরে আমি একটি যাত্রীবাহী জাহাজের একজন তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে চুক্তিবদ্ধ হই আর পরবর্তী চার বছর নেদারল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্র জলপথে যাতায়াত করি।
যখন ১৯৩৯ সালের গ্রীষ্মকালে আমরা নিউ ইয়র্কের পোতাশ্রয়ে জাহাজ ভেড়াই, তখন অপর বিশ্বযুদ্ধটি আসন্ন ছিল। তাই একজন ব্যক্তি যখন আমাদের জাহাজে আসেন ও সরকার (ইংরাজি) নামক বইটি যেটি এক ধার্মিক সরকার সম্বন্ধে বলেছিল তা নেওয়ার জন্য আমাকে প্রস্তাব দেন, আমি আনন্দের সাথে সেটি নিয়েছিলাম। রটারড্যামে ফিরে এসে আমি স্থলে চাকুরি খুঁজতে শুরু করেছিলাম কারণ সমুদ্রে জীবন আর নিরাপদ বলে মনে হয়নি। ১লা সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করেছিল আর হঠাৎ জাতিগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল।
বাইবেলের সত্য শেখা
যখন ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে, এক রবিবার সকালে, আমি আমার বিবাহিত দাদার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম যিহোবার সাক্ষীদের একজন দরজায় ঘন্টা বাজিয়েছিলেন। আমি তাকে বলেছিলাম যে ইতিমধ্যেই সরকার বইটি আমার কাছে আছে এবং স্বর্গ কী ও কারা সেখানে যান সেই সম্বন্ধে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলাম। আমি এতটাই পরিষ্কার ও যুক্তিসংগত উত্তর পেয়েছিলাম যে আমি নিজেকে বলেছিলাম, ‘এটাই সত্য।’ আমি তাকে আমার ঠিকানা দিয়েছিলাম ও আমার ঘরে আসতে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম।
কেবলমাত্র তিনটি সাক্ষাৎ, যে সময়ে আমাদের গভীর বাইবেল আলোচনা হয়েছিল তার পরই আমি সাক্ষীদের সাথে ঘরে ঘরে প্রচার কাজে যেতে শুরু করেছিলাম। ক্ষেত্রে পৌঁছানোর পর তিনি আমাকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে কোথা থেকে শুরু করতে হবে আর আমি একা সেখানে প্রচার করেছিলাম। সেই সময়ে এইভাবেই অনেক নতুন ব্যক্তিদের প্রচার কাজের সাথে পরিচয় করান হয়েছিল। আমাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যে সাহিত্যাদি উপস্থাপন করার সময় আমার সর্বদা বাড়ির প্রবেশ দ্বারের ভিতরে থাকা উচিত, যেন রাস্তা থেকে তা দেখা না যায়। যুদ্ধের প্রথম দিকে সাবধানতা অবলম্বন করার প্রয়োজন ছিল।
তিন সপ্তাহ পরে, ১৯৪০ সালের ১০ই মে, জার্মান সৈন্যদল নেদারল্যান্ড আক্রমণ করেছিল আর ২৯শে মে, রিক কমিশনার সিস-ইনকোয়ার্ট যিহোবার সাক্ষীদের সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। আমরা কেবল ছোট ছোট দলে মিলিত হতাম আর আমাদের মিলিত হওয়ার স্থানগুলিকে গোপন রাখার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা হত। ভ্রমণ অধ্যক্ষদের পরিদর্শনগুলি আমাদের জন্য বিশেষভাবে শক্তিদায়ক ছিল।
আমি একজন ধূমপায়ী ছিলাম আর আমি যখন আমার সাথে যিনি অধ্যয়ন করেছিলেন সেই সাক্ষীকে একটি সিগারেট দিতে চেয়েছিলাম ও জানতে পেরেছিলাম যে তিনি ধূমপান করেন না, তখন আমি বলেছিলাম: “আমি কখনই ধূমপান ছাড়তে পারব না!” কিন্তু, এর কিছুক্ষণ পরেই আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, ‘আমি যদি একজন সাক্ষী হই তবে আমি একজন প্রকৃত সাক্ষীই হতে চাই।’ এরপর থেকে আমি আর কখনও ধূমপান করিনি।
সত্যের জন্য এক দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ
আমার দাদার বাড়ির দরজায় ১৯৪০ সালের জুন মাসে, সাক্ষীটির সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার তিন মাসেরও কম সময় পরে আমি যিহোবার কাছে আমার উৎসর্গের প্রতীকস্বরূপ বাপ্তিস্মিত হয়েছিলাম। এর অল্প কয়েক মাস পরে, ১৯৪০ সালের অক্টোবরে আমি একজন অগ্রগামী হিসাবে পূর্ণ সময়ের পরিচর্যায় প্রবেশ করেছিলাম। তখন, আমাকে অগ্রগামী জ্যাকেট নামক একটি জ্যাকেট দেওয়া হয়েছিল। বই ও পুস্তিকাগুলির জন্য এর অনেক পকেট ছিল আর এটি কোটের নিচে পরা যেত।
জার্মান দখলের প্রায় শুরু থেকেই, যিহোবার সাক্ষীদের সুসংগঠিতভাবে অনুসন্ধানপূর্বক ধরা ও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৯৪১ সালের ফ্রেব্রুয়ারির এক সকালে, আমি অন্য কয়েকজন সাক্ষীর সাথে ক্ষেত্রের পরিচর্যায় ছিলাম। যখন তারা সারিবদ্ধ গৃহগুলির একপাশে লোকেদের সাথে সাক্ষাৎ করছিলেন, আমি তাদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য সারির অপর পাশ থেকে কাজ করে আসছিলাম। কিছু সময় পরে, তাদের দেরি হচ্ছে কেন তা দেখতে গিয়ে আমি একজন ব্যক্তির দেখা পাই যিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আপনার কাছেও কি এই ছোট বইগুলি আছে?”
“হ্যাঁ,” আমি উত্তর দিয়েছিলাম। তৎক্ষণাৎ তিনি আমাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাকে প্রায় চার সপ্তাহ হাজতে রাখা হয়েছিল। অধিকাংশ কর্মকর্তারাই বন্ধুত্বপরায়ণ ছিলেন। একজন ব্যক্তি গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তরিত করার পূর্ব পর্যন্ত, তিনি একটি লিখিত ঘোষণাপত্রে কেবল স্বাক্ষর করার দ্বারা মুক্ত হতে পারতেন যাতে লেখা থাকত যে তিনি আর বাইবেল সাহিত্যাদি বিতরণ করবেন না। এইধরনের একটি ঘোষণাপত্রে যখন আমাকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়, তখন আমি উত্তর দিয়েছিলাম: “আপনারা আমাকে এক অথবা দুই কোটি টাকা দিলেও আমি স্বাক্ষর করব না।”
কিছু সময় পরে, আমাকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তারপর আমাকে জার্মানির স্যাকসেনহাউসেন কনসেনট্রেশন শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
স্যাকসেনহাউসেনের জীবন
যখন ১৯৪১ সালের জুন মাসে আমি স্যাকসেনহাউসেনে পৌঁছাই, তখন ইতিমধ্যেই সেখানে প্রায় ১৫০ জন সাক্ষী ছিলেন—যাদের অধিকাংশই জার্মান। আমাদের নতুন বন্দীদের শিবিরের অন্তরণ নামক একটি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে আমাদের খ্রীষ্টীয় ভাইরা আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করেছিলেন ও আমাদের প্রতি যা করা হবে তার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। এক সপ্তাহ পরে নেদারল্যান্ড থেকে জাহাজযোগে আরও সাক্ষীরা এসে পৌঁছেছিলেন। প্রথমে আমাদের সৈন্যনিবাসের সামনে সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কখনও কখনও বন্দীদের এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন তা করতে হত।
রূঢ় আচরণ সত্ত্বেও, ভাইরা সংগঠিত থাকার ও আধ্যাত্মিক খাদ্য গ্রহণ করার জরুরী প্রয়োজন উপলব্ধি করেছিলেন। প্রতিদিন একজনকে বাইবেলের একটি পদের উপর মতামত প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেওয়া হত। পরে, সমাবেশের স্থানে প্রত্যেক সাক্ষী তার নিকটে উপস্থিত হতেন ও তিনি যা প্রস্তুত করেছেন তা শুনতেন। কোন না কোন উপায়ে, সাহিত্যাদি নিয়মিত গোপনে শিবিরে আসত আর আমরা যথার্থরূপে প্রত্যেক রবিবারে সমবেত হতাম ও একত্রে এই বাইবেল সাহিত্য অধ্যয়ন করতাম।
কোন এক উপায়ে সন্তান (ইংরাজি) বইটির একটি কপি স্যাকসেনহাউসেনে গোপনে এসেছিল যা ১৯৪১ সালের গ্রীষ্মকালে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইস সম্মেলনে প্রকাশ করা হয়েছিল। বইটি আবিষ্কৃত ও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমাতে আমরা সেটি খণ্ড খণ্ড করেছিলাম ও খণ্ডিত অংশগুলি ভাইদের মধ্যে বিতরণ করেছিলাম যাতে প্রত্যেকে পালাক্রমে এটি পড়তে পারেন।
কিছুদিন পরে, আমরা যে সভাগুলি করতাম তা শিবিরের পরিচালকবর্গ দেখতে পেয়েছিলেন। ফলে সাক্ষীদের পৃথক করা হয়েছিল ও ভিন্ন ভিন্ন সৈন্যনিবাসে পাঠান হয়েছিল। তা আমাদের অন্যান্য বন্দীদের কাছে প্রচার করার উত্তম সুযোগ করে দিয়েছিল আর ফলস্বরূপ, অনেক পোলিস, ইউক্রেনীয় ও অন্যান্যেরা সত্য গ্রহণ করেছিলেন।
বাইবেলফোরশের, যিহোবার সাক্ষীদের যে নামে ডাকা হত, তাদের আনুগত্য ভেঙ্গে দেওয়া বা হত্যা করা সম্বন্ধে তাদের অভিপ্রায়কে নাৎসীরা গোপন করেননি। ফলস্বরূপ, আমাদের ওপরে তীব্র চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। আমাদের বলা হয়েছিল যে আমাদের বিশ্বাস অস্বীকার করে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করলে আমরা মুক্ত হতে পারি। কিছু ভাইরা যুক্তি দেখাতে শুরু করেছিলেন, “আমি যদি মুক্ত হই, তবে আমি যিহোবার সেবায় আরও বেশি কিছু করতে পারব।” যদিও অল্প কয়েকজন স্বাক্ষর করেছিলেন কিন্তু আমাদের ভাইদের অধিকাংশই বঞ্চনা, লাঞ্ছনা ও দুর্ব্যবহার সত্ত্বেও বিশ্বস্ত ছিলেন। যারা আপোশ করেছিলেন তাদের কিছুজনের কথা আর শোনা যায়নি। কিন্তু, আনন্দের বিষয় যে অন্যান্যেরা পরবর্তী সময়ে বিশ্বাসে ফিরে এসেছিলেন ও এখনও সক্রিয় সাক্ষী আছেন।
বন্দীদের যখন পাশবিক দৈহিক শাস্তি যেমন লাঠি দিয়ে ২৫ বার আঘাত করা হত, তখন নিয়মিত তা দেখতে আমাদের বাধ্য করা হত। একবার, চারজন লোকের ফাঁসি দেখতে আমাদের বাধ্য করা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাগুলি একজন ব্যক্তির উপর বাস্তব প্রভাব ফেলে। আমি যেখানে থাকতাম সেই একই সৈন্যনিবাসের একজন লম্বা, সুদর্শন ভাই আমাকে বলেছিলেন: “এখানে আসার আগে, আমি রক্ত দেখলেই সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে পড়তাম। কিন্তু এখন আমি শক্ত হয়ে গিয়েছি।” যদিও আমরা হয়ত শক্ত হয়ে উঠেছিলাম কিন্তু আমরা নির্মম হয়ে যায়নি। আমি অবশ্যই বলব যে, আমি আমাদের তাড়নাকারীদের প্রতি কখনও বিদ্বেষ পোষণ বা ঘৃণা বোধ করিনি।
এক কমান্ডো-র (কর্মী দলের) সাথে কিছু সময় কাজ করার পরে, আমাকে প্রচণ্ড জ্বরের কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। নরওয়ের একজন দয়ালু ডাক্তার ও একজন চেকোস্লোভাকীয় সেবক আমাকে সাহায্য করেছিলেন আর তাদের দয়াই সম্ভবত আমার জীবন রক্ষা করেছিল।
মৃত্যু যাত্রা
জার্মানি যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে এই বিষয়টি ১৯৪৫ সালের এপ্রিলের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। পাশ্চাত্যের মিত্রদলগুলি পশ্চিম থেকে ও সোভিয়েত পূর্ব থেকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। কনসেনট্রেশন শিবিরের হাজার হাজার ব্যক্তিদের হত্যা করা ও তাদের দেহগুলি অল্প কয়েকদিনের মধ্যে কোন প্রমাণ না রেখে নিশ্চিহ্ন করা নাৎসীদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাই তারা অসুস্থদের হত্যা করার ও অবশিষ্ট বন্দীদের নিকটবর্তী সমুদ্রবন্দরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেখানে তারা তাদের জাহাজে চড়িয়ে জাহাজগুলি ডুবিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
২০শে এপ্রিলের রাত্রে স্যাকসেনহাউসেন থেকে প্রায় ২৬,০০০ বন্দীদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শিবির ত্যাগ করার পূর্বে, আমাদের অসুস্থ ভাইরা চিকিৎসালয় থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। একটি টানাগাড়ি যোগাড় করা হয়েছিল যাতে করে তাদের বহন করা হয়েছিল। সেখানে আমরা ছয়টি ভিন্ন দেশ থেকে সর্বমোট ২৩০ জন ছিলাম। অসুস্থদের মধ্যে ভাই আর্থার উইঙ্কলার ছিলেন যিনি নেদারল্যান্ডে কাজ সম্প্রসারণে বিরাট অবদান রেখেছিলেন। আমরা সাক্ষীরা যাত্রার সবচেয়ে পিছনে ছিলাম আর আমরা ক্রমাগত এক অপরকে চলার জন্য উৎসাহিত করেছিলাম।
যাত্রা শুরু করে আমরা ৩৬ ঘন্টা কোন বিরতি ছাড়াই অগ্রসর হয়েছিলাম। হাঁটার সময়ে তীব্র যন্ত্রণা ও শারীরিক অবসাদের কারণে আমার ঘুম পেয়েছিল। কিন্তু পিছনে থাকা বা বিশ্রাম নেওয়া ছিল চিন্তাতীত কারণ তা করলে রক্ষীদের কাছ থেকে গুলি বিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি ছিল। রাত্রে আমরা খোলা মাঠে বা জঙ্গলে ঘুমাতাম। খুব অল্প, বা বলতে গেলে কোন খাবারই ছিল না। যখন ক্ষুধার যন্ত্রণা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল, আমি টুথপেস্ট খেয়ে ফেলেছিলাম যেটি সুইডিশ রেড ক্রশ আমাদের দিয়েছিল।
রুশ ও মার্কিন সৈন্যদল ঠিক কোথায়, সেই বিষয়ে জার্মান রক্ষীদের বিভ্রান্তির কারণে এক সময়ে আমরা জঙ্গলে চার দিনের জন্য শিবির স্থাপন করেছিলাম। এটি মঙ্গলজনক ছিল কারণ এর ফলে, সেই জাহাজগুলি যেগুলির আমাদেরকে সলিল সমাধিতে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল তাতে আরোহণ করার জন্য আমরা যথাসময়ে লুবেক উপসাগরে পৌঁছাতে পারিনি। অবশেষে, ১২ দিন পরে প্রায় ২০০ কিলোমিটার যাত্রা করে আমরা ক্রিভিট জঙ্গলে পৌঁছাই। এটি লুবেক থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরবর্তী শহর সায়োরিন থেকে দূরে ছিল না।
সোভিয়েতরা আমাদের ডান দিকে ও আমেরিকানরা আমাদের বাম দিকে ছিলেন। বড় কামানগুলি থেকে গোলা বর্ষণ ও রাইফেলের অবিশ্রাম গুলি থেকে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে আমরা যুদ্ধক্ষেত্রের কাছেই রয়েছি। জার্মান রক্ষীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন; কিছুজন পালিয়ে গিয়েছিলেন ও অন্যান্যেরা তাদের সামরিক পোশাক পরিত্যাগ করে মৃতদের দেহ থেকে খুলে নেওয়া বন্দীদের পোশাক পরেছিলেন এই আশা করে যে তাদের কেউ চিনবে না। এই বিভ্রান্তির মধ্যে, আমরা সাক্ষীরা পরিচালনার জন্য প্রার্থনা করতে একত্রিত হয়েছিলাম।
দায়িত্বপ্রাপ্ত ভাইরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে আমাদের পরের দিন ভোরবেলাতেই স্থান ত্যাগ করে আমেরিকান সৈন্যদের অবস্থানের দিকে যাওয়া উচিত। এমনকি যদিও যারা মৃত্যু যাত্রা শুরু করেছিলেন তাদের প্রায় অর্ধেক বন্দী পথিমধ্যে মারা গিয়েছিলেন বা হত হয়েছিলেন, কিন্তু সকল সাক্ষীরা রক্ষা পেয়েছিলেন।
আমি কিছু কানাডিয় সামরিক কর্মীদের সাথে গাড়িতে চড়ে নাইমেজান শহরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম যেখানে আমার একজন দিদি থাকতেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর আমি জানতে পারি যে তিনি চলে গিয়েছেন। তাই আমি রটারড্যামে যাওয়ার জন্য হাঁটতে শুরু করেছিলাম। আনন্দের বিষয় যে, পথিমধ্যে আমি একজনের ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম যা আমাকে আমার গন্তব্যস্থানে নিয়ে গিয়েছিল।
সত্য আমার জীবনে পরিণত হয়েছে
রটারড্যামে পৌঁছানোর দিন থেকেই আমি পুনরায় অগ্রগামীর কাজ করার জন্য আবেদন করেছিলাম। তিন সপ্তাহ পরে আমি জুটফেন শহরে আমার কার্যভারে গিয়েছিলাম যেখানে আমি পরবর্তী দেড় বছর পরিচর্যা করেছিলাম। সেই সময়ে, আমি কিছুটা শারীরিক শক্তি ফিরে পেয়েছিলাম। এরপর আমি একজন সীমা অধ্যক্ষ হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলাম যাদের ভ্রমণ পরিচারক বলা হত। অল্প কয়েক মাস পরে, আমি নিউ ইয়র্কের দক্ষিণ লেনসিং-এ ওয়াচ টাওয়ার বাইবেল স্কুল অফ গিলিয়েডে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পাই। ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেই স্কুলের ১২তম ক্লাশ থেকে স্নাতক উপাধি লাভ করার পর, আমাকে বেলজিয়ামে কার্যভার দেওয়া হয়েছিল।
বেলজিয়ামে আমি পরিচর্যার বিভিন্ন দিকগুলিতে সেবা করেছিলাম যার অন্তর্ভুক্ত ছিল শাখা অফিসে প্রায় আট বছরের সেবা এবং একজন সীমা অধ্যক্ষ ও জেলা অধ্যক্ষ হিসাবে কয়েক দশকের ভ্রমণ কাজ। ১৯৫৮ সালে, আমি জাস্টিনকে বিবাহ করি, যে আমার ভ্রমণ সঙ্গী হয়েছিল। বর্তমানে, বৃদ্ধাবস্থায় এখনও একজন বিকল্প ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসাবে সীমিত উপায়ে সেবা করতে সমর্থ হওয়ার আনন্দ আমার রয়েছে।
আমি যখন আমার পরিচর্যার দিকে ফিরে তাকাই, আমি সত্যই বলতে পারি: “সত্যের চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই।” অবশ্যই, এটি সর্বদা সহজ হয়নি। আমার ভুল ও দোষগুলি থেকে শেখার প্রয়োজনীয়তা আমি খুঁজে পেয়েছি। তাই যখন আমি যুবক-যুবতীদের সাথে কথা বলি, আমি প্রায়ই তাদের বলি: “তোমরাও ভুল করবে বা হয়ত গুরুতর অন্যায়ও করবে কিন্তু কখনও সেটি সম্বন্ধে মিথ্যা বলো না। বিষয়টি সম্বন্ধে তোমার পিতামাতা বা একজন প্রাচীনের সাথে আলোচনা করো এবং তারপর প্রয়োজনীয় সংশোধন করো।”
বেলজিয়ামে আমার প্রায় ৫০ বছরের পূর্ণ সময়ের পরিচর্যায়, আমি যাদের এক সময় শিশু হিসাবে চিনতাম তাদের প্রাচীন ও সীমা অধ্যক্ষ হিসাবে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। আর আমি সেই দেশের ১,৭০০ বা সমসংখ্যক রাজ্য ঘোষকদের বৃদ্ধি পেয়ে ২৭,০০০ এর বেশি সংখ্যায় পৌঁছতে দেখেছি।
আমি জিজ্ঞাসা করি, “জীবন উপভোগ করতে যিহোবাকে সেবা করার চেয়েও আরও আশীর্বাদপ্রাপ্ত কোন পথ কি আছে?” কখনও ছিল না, এখনও নেই আর কখনও থাকবেও না। আমি প্রার্থনা করি যে যিহোবা যেন আমার স্ত্রী ও আমাকে ক্রমাগত পরিচালনা ও আশীর্বাদ দান করেন যাতে আমরা চিরকাল তাঁকে সেবা করে যেতে পারি।
[২৬ পৃষ্ঠার চিত্র]
১৯৫৮ সালে আমাদের বিবাহের অল্প কিছুদিন পরে আমার স্ত্রীর সাথে