৫০ বছরেরও অধিক সময় ধরে ‘পার হওয়া’
ইম্মানূয়েল প্যাটারিকিস দ্বারা কথিত
উনিশ শতাব্দী পূর্বে প্রেরিত পৌল এক অসামান্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন: “পার হইয়া মাকিদনিয়াতে আসিয়া আমাদের উপকার করুন।” পৌল স্বেচ্ছায় “সুসমাচার প্রচার” করার এই নতুন সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন। (প্রেরিত ১৬:৯, ১০) যদিও আমি যে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম, তা ততখানি দূরবর্তী না হলেও, ৫০ বছরের অধিক পূর্বে, আমি নতুন এলাকাগুলিতে “পার হয়ে” যেতে সম্মত হয়েছিলাম যিশাইয় ৬:৮ পদের এই উদ্দীপনায়: “এই আমি, আমাকে পাঠাও।” আমার অসংখ্য ভ্রমণ আমাকে অবিরাম ভ্রমণকারী উপনাম অর্জন করিয়েছে, কিন্তু আমার কাজগুলি এবং ভ্রমণের সাথে সামান্যই মিল ছিল। একাধিক বার, আমার হোটেলের কক্ষে পৌঁছে, আমি হাঁটু পেতেছি এবং আমাকে রক্ষা করার জন্য যিহোবাকে ধন্যবাদ দিয়েছি।
আমি ১৬ই জানুয়ারি ১৯১৬ সালে, ক্রীতের ইরাপাটরায়, এক অতিশয় ধর্মনিষ্ঠ অর্থোডক্স পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলাম। ছোটবেলা থেকেই মা আমাকে এবং আমার তিন বোনকে রবিবারে গির্জায় নিয়ে যেতেন। আমার বাবা ঘরে থাকতে এবং বাইবেল পড়তে বেশি পছন্দ করতেন। আমি আমার বাবাকে শ্রদ্ধা করতাম—কারণ তিনি ছিলেন সৎ, ধার্মিক ও ক্ষমাশীল ব্যক্তি—এবং আমার যখন নয় বৎসর, তার মৃত্যু, আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
যখন আমি পাঁচ বছরের ছিলাম, আমার মনে আছে, স্কুলে বসে একটি উদ্ধৃত অংশ আমি পড়েছি যা বলেছিল: “আমাদের চতুর্দিকে সমস্ত কিছু ঈশ্বরের অস্তিত্বকে ঘোষণা করে।” আমি বড় হওয়ার সাথে সাথে, এতে সম্পূর্ণভাবে দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে পড়ি। তাই ১১ বছর বয়সে, আমি একটি রচনা লিখতে স্থির করি গীতসংহিতা ১০৪:২৪ পদের উপর ভিত্তি করে যার বিষয়বস্তু: “হে সদাপ্রভু, তোমার নির্ম্মিত বস্তু কেমন বহুবিধ! তুমি প্রজ্ঞা দ্বারা সে সমস্ত নির্ম্মাণ করিয়াছ; পৃথিবী তোমার সম্পত্তিতে পরিপূর্ণ।” এই বিস্ময়কর প্রকৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছিল, এমনকি বীজের মত সাধারণ জিনিস যেটি ক্ষুদ্র পক্ষ দ্বারা সুসজ্জীভূত যাতে করে মূল গাছের ছায়া থেকে দূরে বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এক সপ্তাহ পর আমি রচনাটি পেশ করি এবং আমার শিক্ষক, শ্রেণীর সকলের সামনে এবং এরপর বিদ্যালয়ের সকলের সামনে এটি পড়ে শোনান। ঐ সময়ে, শিক্ষকেরা সাম্যবাদী ধারণাগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রতি আমার সমর্থনের কথা শুনে তারা আনন্দিত হয়েছিলেন। আমার ক্ষেত্রে, সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমার বিশ্বাসকে প্রকাশ করে আমি আনন্দিত হয়েছিলাম।
আমার প্রশ্নের উত্তরগুলি
যিহোবার সাক্ষীদের সাথে ১৯৩০ এর দশকের প্রথমদিকে আমার প্রথম সাক্ষাতের কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে। ইম্মানূয়েল লিওনুডাকিস ক্রীতের সমস্ত শহর এবং গ্রামগুলিতে প্রচার করছিলেন। আমি তার কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের পুস্তিকা নিয়েছিলাম, কিন্তু মৃতেরা কোথায়? (ইংরাজি) নামক একটি পুস্তিকা সত্যিই আমার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিল। মৃত্যু সম্পর্কে আমার এমন একটি আতঙ্কজনক ভয় ছিল যে, বাবা যে কক্ষে মারা গিয়েছিলেন এমনকি আমি সেখানে প্রবেশ করতাম না। আমি যখন বারংবার এই পুস্তিকা পড়ি এবং মৃতদের অবস্থা সম্পর্কে বাইবেল যা শিক্ষা দেয়, তা শিখি তখন আমি উপলব্ধি করি যে আমার কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভয় আর নেই।
বছরে একবার, গ্রীষ্মের সময়ে, সাক্ষীরা আমাদের শহরে আসেন এবং আমার পড়ার জন্য আরও সাহিত্যাদি আনেন। ধীরে ধীরে শাস্ত্র সম্বন্ধে আমার বোধগম্যতা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু তবুও আমি অর্থোডক্স গির্জায় যোগ দেওয়া চালিয়ে যাই। যাইহোক, ডেলিভারেন্স্ (ইংরাজি) বইটি, এক সন্ধিক্ষণকে চিহ্নিত করে। এটি স্পষ্টভাবে যিহোবার সংগঠন এবং শয়তানের সংগঠনের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছিল। সেই মুহূর্ত থেকে, আমি বাইবেল এবং ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির যে কোন সাহিত্যাদি যা আমি হাতে পেতাম তা আরও নিয়মিতভাবে অধ্যয়ন করতে শুরু করি। যেহেতু গ্রীসে যিহোবার সাক্ষীদের কাজ নিষিদ্ধ ছিল, তাই আমি গোপনে রাতের বেলা অধ্যয়ন করতাম। তবুও, আমি যা কিছু শিখছিলাম সেই সম্পর্কে এতখানি প্রবল উৎসাহী ছিলাম যে এই বিষয়ে প্রত্যেকের সাথে কথা বলা থেকে আমি নিজেকে দমন করতে পারতাম না। শীঘ্রই পুলিশ আমার প্রতি আগ্রহী হতে শুরু করে, দিনে ও রাতে যে কোন সময় সাহিত্যাদি খোঁজার উদ্দেশ্যে প্রায়ই আমার কাছে আসতে থাকে।
১৯৩৬ সালে, ১২০ কিলোমিটার দূরে ইরাক্লিয়নে প্রথম বারের মত, আমি একটি সভায় যোগদান করি। আমি সাক্ষীদের সাথে মিলিত হতে পেরে খুবই খুশি হয়েছিলাম। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই সাদাসিধা লোক ছিল, অধিকাংশ কৃষক, কিন্তু তারা আমাকে নিশ্চিতভাবে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে, এটিই হল সত্য। তখনই আমি যিহোবার কাছে উৎসর্গীকৃত হই।
আমার বাপ্তিস্ম এমনই একটি ঘটনা যা আমি কখনও ভুলতে পারব না। ১৯৩৮ সালের এক রাতে, আমাকে এবং আমার দুই জন বাইবেল ছাত্রকে ভাই লিওনুডাকিস এক সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন সমুদ্রতীরে নিয়ে যান। সেখানে প্রার্থনা করার পর, তিনি আমাদের জলে নিমজ্জিত করেন।
গ্রেপ্তারাধীনে
আমি একেবারে প্রথমবার যখন প্রচার করতে গিয়েছিলাম তা কম করে বললেও খুবই ঘটনাবহুল ছিল। আমি বিদ্যালয়ের এক পুরাতন বন্ধুর দেখা পাই যে একজন পাদ্রি হয়েছিল এবং আমাদের একসঙ্গে খুবই সুন্দর আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু পরে সে বলে যে বিশপের আদেশ অনুযায়ী, তার উচিত হবে আমাকে গ্রেফতার করা। যখন আমরা মেয়রের কার্যালয়ে প্রতিবেশী গ্রাম থেকে পুলিশের আসার অপেক্ষায় ছিলাম, তখন বাইরে জনতা ভিড় করেছিল। সুতরাং আমি গ্রীক নিউ টেস্টামেন্টটি নিই যা অফিসে ছিল এবং মথি ২৪ অধ্যায়ের উপর ভিত্তি করে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতে শুরু করে দিই। প্রথমে লোকেরা শুনতে চায়নি, কিন্তু সেই পাদ্রিটি বাধা দেয়। সে বলে, “ওকে বলতে দাও। এটি আমাদের বাইবেল।” আমি দেড় ঘন্টা কথা বলতে পেরেছিলাম। এইভাবে, পরিচর্যায় প্রথম দিন আমার প্রথম জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগও হয়েছিল। যেহেতু আমার বক্তৃতা শেষ হওয়া পর্যন্ত পুলিশ এসে পৌঁছায়নি, তাই মেয়র এবং পাদ্রি সিদ্ধান্ত নেয় যে একদল লোক দিয়ে আমাকে শহর ছাড়া করবে। রাস্তার প্রথম মোড়ে, আমি তাদের পাথর ছোড়া এড়াতে যত তাড়াতাড়ি দৌঁড়াতে পারতাম তত তাড়াতাড়ি দৌঁড়াতে শুরু করি।
পরের দিন দুই জন পুলিশ, বিশপের সাথে যুক্ত হয়ে কর্মক্ষেত্রে আমাকে গ্রেফতার করে। থানায় বসে বাইবেল থেকে আমি তাদেরকে সাক্ষ্য দিতে পেরেছিলাম, কিন্তু যেহেতু আমার বাইবেল সাহিত্যাদিতে আইন অনুযায়ী বিশপের অনুমোদন চিহ্ন ছিল না, তাই আমাকে ধর্মান্তরিতকরণ এবং অননুমোদিত সাহিত্যাদি বন্টন করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
একমাস পরে আমার বিচার শুরু হয়। আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করে উল্লেখ করি যে আমি প্রচার করার জন্য খ্রীষ্টের আজ্ঞার বাধ্যতার চেয়ে অধিক কিছু করছি না। (মথি ২৮:১৯, ২০) বিচারক ঠাট্টা করে বলেছিলেন: “বৎস, যিনি এই আজ্ঞাটি দিয়েছিলেন, তিনি তো ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন। দুঃখের বিষয় যে, তোমার প্রতি একই রকম শাস্তি আরোপ করার অধিকার আমার নেই।” যাইহোক, একজন যুবক আইনজীবী, যার সাথে আমার পরিচয় ছিল না, তিনি আমার পক্ষ সমর্থন করে বলেন, বহু সাম্যবাদ এবং নিরীশ্বরবাদের মধ্যে, আদালতের গর্বিত হওয়া উচিত যে ঈশ্বরের বাক্যকে সমর্থন করতে যুবকেরা প্রস্তুত রয়েছে। তারপরে তিনি কাছে আসেন এবং আমার লিখিত প্রতিপাদনের উপর আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান, যা আমার নথি পত্রে ছিল। আমি খুব অল্পবয়স্ক হওয়াতে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং বিনা খরচে আমার পক্ষ সমর্থন করার জন্য প্রস্তাব দেন। কমপক্ষে তিন মাসের পরিবর্তে, আমাকে মাত্র দশ দিনের জন্য জেলে বন্দী থাকার দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ৩০০ ড্রাক্মা জরিমানা করা হয়েছিল। এইধরনের বিরোধিতা যিহোবাকে সেবা করতে এবং সত্যের পক্ষ সমর্থন করতে আমার সংকল্পকে কেবল শক্তিশালীই করেছিল।
অন্য একটি সময় যখন আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম, তখন বিচারক আমার সেই সহজসাধ্যতা লক্ষ্য করেছিলেন যেভাবে আমি বাইবেল থেকে উল্লেখ করেছিলাম। “আপনি আপনার কাজ করেছেন, আমি এর প্রতি লক্ষ্য রাখব” এই বলে তিনি বিশপকে তার কার্যালয় থেকে যেতে বলেন। তারপর তিনি তার বাইবেল বের করেন এবং সমস্ত বিকেল আমরা ঈশ্বরের রাজ্যের সম্পর্কে কথা বলেছিলাম। এইধরনের ঘটনাগুলি কঠিন অবস্থা থাকা সত্ত্বেও এগিয়ে যেতে আমাকে উৎসাহিত করেছিল।
মৃত্যুর দণ্ডাদেশ
১৯৪০ সালে, আমাকে বাধ্যতামূলক সামরিক কাজ করতে বলা হয় এবং একটি চিঠি লিখে আমি ব্যাখ্যা করি কেন আমি সামরিক বাহিনীতে ভর্তি হতে রাজি নই। দুই দিন পর আমি গ্রেফতার হই এবং পুলিশ আমাকে নিদারুণভাবে প্রহার করে। তারপর আমাকে আলবেনিয়ায় রণক্ষেত্রে পাঠানো হয়, যেখানে সামরিক আদালতে আমার বিচার হয়, কারণ আমি যুদ্ধ করতে অস্বীকার করেছিলাম। সামরিক বাহিনীর কর্তৃপক্ষ আমাকে বলে যে আমি সঠিক অথবা ভুল ছিলাম তা জানার জন্য তারা খুবই কম আগ্রহী ছিলেন, এই বিষয়টির তুলনায় যে সৈন্যদের উপর আমার উদাহরণের কী প্রভাব থাকতে পারে। আমাকে মৃত্যুর দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়, কিন্তু আইন সংক্রান্ত একটি ত্রুটিতে আমি এই দণ্ডাদেশ থেকে মুক্তি পাই এবং বিনিময়ে আমাকে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আমার জীবনের পরবর্তী কয়েকটি মাস গ্রীসে সামরিক কারাগারে আমি খুবই কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যে কাটাই, যার জন্য আমি এখনও শারীরিক অসুস্থতায় ভুগি।
কারাগার কিন্তু আমাকে প্রচার করা থেকে বিরত করতে পারেনি। একেবারেই নয়! অনেকে বিস্মিত হত যে কেন অসামরিক লোক সামরিক জেলখানায় রয়েছে, তাই সহজেই আলোচনা শুরু করা যেত। একজন অকৃত্রিম যুবকের সাথে এই রকম একটি আলোচনা কারাগারের প্রাঙ্গণে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করতে পরিচালিত করে। আটত্রিশ বছর পর একটি অধিবেশনে আবার এই ব্যক্তির সাথে আমার দেখা হয়। তিনি সত্য গ্রহণ করেছিলেন এবং লীফ্কাস দ্বীপে মণ্ডলীর অধ্যক্ষ হিসাবে সেবা করছিলেন।
হিটলারের সৈন্যবাহিনী ১৯৪১ সালে যখন যুগোশ্লাভিয়া আক্রমণ করে, তখন আমরা আরও দক্ষিণে প্রীভিজায় একটি কারাগারে স্থানান্তরিত হই। ভ্রমণকালে, আমাদের বাহিনী জাহাজকে জার্মান বোমারু বিমান আক্রমণ করে এবং আমাদের অর্থাৎ বন্দীদের কোন খাবার দেওয়া হয়নি। যখন আমার সামান্য রুটিটি শেষ হয়, আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি: “যদি আমার প্রতি তোমার ইচ্ছা হয় যে আমাকে মৃত্যুর দণ্ডাদেশ থেকে বাঁচানোর পর ক্ষুধায় মরতে দেবে, তাহলে তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হোক।”
পরের দিন হাজিরা ডাকার সময়ে, এক আধিকারিক আমাকে একপাশে ডাকেন এবং আমি কোথা থেকে এসেছি, কে আমার বাবামা ও কেন আমি বন্দী হই তা জানার পর, তাকে অনুসরণ করতে বলেন। তিনি আমাকে শহরে কর্মকর্তাদের ভোজনশালায় নিয়ে যান এবং রুটি, পনির ও ভেড়ার মাংসের রোস্ট সমেত একটি টেবিল দেখিয়ে আমাকে খেতে বলেন। কিন্তু আমি বলেছিলাম যে, আমার বিবেক খেতে বারণ করছে, যেহেতু অন্য ৬০ জন বন্দী কিছুই খায়নি। আধিকারিকটি উত্তর দেন: “আমি সকলকে খাওয়াতে পারি না! আপনার বাবা আমার প্রতি খুবই সদয় ছিলেন। ফলে আপনার প্রতি আমার নৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে, কিন্তু অন্যদের প্রতি নয়।” “এক্ষেত্রে তাহলে আমি ফিরে যাব,” আমি উত্তর দিই। তিনি এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করলেন এবং তারপর একটি বড় থলি দিলেন যাতে করে আমি যতটা পারি ততাটা খাবার এতে ভর্তি করি।
বন্দীদের কাছে ফিরে গিয়ে, আমি থলিটি নিচে রাখি এবং বলি: “মহাশয়েরা, এগুলি আপনাদের জন্য।” ঘটনাক্রমে, গত সন্ধ্যাতেই অন্যান্য বন্দীদের দুরবস্থার জন্য আমাকে অভিযুক্ত করা হয়, কারণ আমি কুমারী মরিয়মের কাছে তাদের প্রার্থনায় যোগ দিতাম না। যাইহোক, একজন সাম্যবাদী আমার পক্ষে আসেন। এখন খাবার দেখে, তিনি অন্যদের বলেন: “তোমাদের ‘কুমারী মরিয়ম’ কোথায়? তোমরা বলছিলে যে আমরা এই লোকের কারণে মারা যাব, অথচ এই ব্যক্তিই আমাদের জন্য খাবার এনেছে।” তারপর তিনি আমার দিকে ফিরে বলেন: “ইম্মানুয়েল! এসো এবং প্রার্থনায় ধন্যবাদ কর।”
এর কিছু পরেই, জার্মান সেনাদের আগমণের কারণে কারারক্ষীরা পালিয়ে যায়, বন্দীত্বের দ্বার খুলে দেওয়া হয়। আমি ১৯৪১ সালের মে মাসের শেষে এথেন্সে যাওয়ার পূর্বে প্যাট্রাসে অন্যান্য সাক্ষীদের খুঁজতে যাই। সেখানে আমি কিছু কাপড় এবং জুতা পেয়েছিলাম আর এক বছরেরও বেশি সময় পরে আমি স্নান করতে পেরেছিলাম। দখল শেষ না হওয়া পর্যন্ত, জার্মানরা সবসময়ই আমার প্রচার কাজ বন্ধ করে দিত, কিন্তু তারা কখনও আমাকে গ্রেফতার করেনি। এদের মধ্যে একজন বলেছিলেন: “জার্মানীতে আমরা যিহোবার সাক্ষীদের গুলি করেছিলাম। কিন্তু এখানে আমরা চাই যে, আমাদের সমস্ত শত্রুরাই যদি সাক্ষী হত!”
যুদ্ধের পরবর্তী কার্যাবলী
যদিও গ্রীসে প্রচুর যুদ্ধ হয়েছিল, ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে এটি আরও বিভক্ত হয়ে যায়, যে কারণে হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হয়। ভাইয়েদের দৃঢ় থাকতে প্রচুর উৎসাহের প্রয়োজন ছিল যখন শুধু সভায় যোগদান করলেই গ্রেফতার করা হত। অনেক ভাইয়েদের তাদের নিরপেক্ষতার জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও, অনেক লোক রাজ্যের বার্তায় সাড়া দেয় আর প্রত্যেক সপ্তাহে এক অথবা দুই জনকে বাপ্তিস্ম দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে, আমি এথেন্সে সমিতির কার্যালয়ে দিনের বেলা কাজ শুরু করি এবং রাতে ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসাবে মণ্ডলীগুলি পরিদর্শন করি।
এরপর ১৯৪৮ সালে, আমি যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াচটাওয়ার বাইবেল স্কুল অফ গিলিয়াডে যোগদান করার আমন্ত্রণ পেয়ে আনন্দিত হই। কিন্তু একটি সমস্যা ছিল। আমার পূর্ববর্তী দোষী সাব্যস্তকরণের জন্য আমি পাসপোর্ট পাইনি। যাইহোক, আমার একজন বাইবেল ছাত্রের সঙ্গে একজন প্রধান সেনা অধিকারিকের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এই ছাত্রের সাহায্যে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি আমার পাসপোর্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি চিন্তিত ছিলাম যখন, চলে যাবার অল্পদিন পূর্বেই আমি প্রহরীদুর্গ বিতরণের জন্য গ্রেফতার হই। একজন পুলিশ আমাকে এথেন্সের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পুলিশের প্রধানের কাছে নিয়ে যায়। আমি খুবই আশ্চর্য হই যে তিনি আমার একজন প্রতিবেশী ছিলেন! আমাকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে পুলিশটি তা বলে এবং তাকে পত্রিকার মোড়কটি দেয়। আমার প্রতিবেশী তার ডেস্ক থেকে এক গোছা প্রহরীদুর্গ পত্রিকা বের করেন এবং আমাকে বলেন: “আমার সর্বশেষ সংখ্যাটি নেই। আমি কি একটি কপি নিতে পারি?” এই বিষয়ে যিহোবার সাহায্য দেখে কি দুশ্চিন্তা মুক্তই না আমি হয়েছিলাম!
১৯৫০ সালে, গিলিয়াডের ষোড়শতম ক্লাস ছিল এক উপভোগ্য অভিজ্ঞতা। তা শেষ হওয়ার পর, আমি সাইপ্রাসে পরিচর্যার দায়িত্ব পাই, যেখানে শীঘ্রই আমি লক্ষ্য করি যে গ্রীসের মত সেখানেও পাদ্রিদের বিরোধিতা ছিল। আমরা প্রায়ই অর্থোডক্স যাজকদের দ্বারা প্ররোচিত গোঁড়া জনতার সম্মুখীন হই। ১৯৫৩ সালে সাইপ্রাসের জন্য আমার ভিসা নবীকরণ করা হয়নি আর আমাকে তুরস্কের ইস্তানবুলে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখানেও আবার আমার অল্পকাল থাকা হয়। তুরস্ক এবং গ্রীসের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার অর্থ হল যে, প্রচার কাজের ফল ভাল হওয়া সত্ত্বেও, আমাকে অন্য একটি দায়িত্বের জন্য চলে যেতে হয়—মিশরে।
যখন আমি কারগারে ছিলাম, গীতসংহিতা ৫৫:৬, ৭ পদ আমার মনে পড়ত। দায়ূদ সেখানে প্রান্তরে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আমি কখনও ভাবতে পারিনি যে যেখানে আমি যেতে চেয়েছিলাম, একদিন ঠিক সেখানেই যাব। ১৯৫৪ সালে, কয়েকদিন ট্রেনে এবং নীলনদে নৌকায় করে এক ক্লান্তিকর ভ্রমণের পর, আমি শেষপর্যন্ত আমার গন্তব্যস্থলে পৌঁছাই—সুদানের খার্তুমে। আমি যা করতে চেয়েছিলাম তা হল স্নান করা এবং বিছানায় যাওয়া। কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে তখন দুপুর ছিল। ছাদের উপর জলাধারে সঞ্চিত জল এত গরম ছিল যে তা আমার মাথার চামড়া পুড়িয়ে ফেলে, ফলে কয়েক মাস যতদিন না আমার মাথার চামড়া ভাল হয়, আমি একটি টুপি পরতে বাধ্য হই।
নিকটতম মণ্ডলীর কাছ থেকে ছয়শত কিলোমিটার দুরে, সাহারার মধ্যস্থলে একা একা, আমি প্রায়ই নিঃসঙ্গ অনুভব করতাম, কিন্তু টিকে থাকতে যিহোবা আমাকে সামর্থ এবং শক্তি দেন। মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে উৎসাহ আসত। একদিন, খার্তুমের যাদুঘরের পরিচালকের সাথে আমি সাক্ষাৎ করি। তিনি সংস্কার মুক্ত ছিলেন এবং আমাদের সুন্দর আলোচনা হয়েছিল। আমি একজন গ্রীক বংশের লোক ছিলাম তা জেনে, তিনি আমাকে যাদুঘরে গিয়ে, ছয় শতাব্দীতে গির্জায় পাওয়া হস্তশিল্পের উপর খোদাই করা কিছু লেখা অনুবাদ করে দিয়ে তার উপকার করতে বললেন। পাঁচ ঘন্টা ধরে শ্বাসরুদ্ধকর ভূ-গর্ভস্থ ঘরে, যিহোবার নাম টেট্রাগ্রামাটোন লিখিত একটি পিরিচ খুঁজে পেলাম। আমার আনন্দের কথা চিন্তা করুন! ইউরোপের গির্জাগুলিতে ঈশ্বরের নাম দেখা বিরল নয়, কিন্তু সাহারার মধ্য অঞ্চলে এটি বিরল!
১৯৫৮ সালে আন্তর্জাতিক অধিবেশনের পর, আমি আঞ্চলিক অধ্যক্ষ হিসাবে মধ্যপ্রাচ্য ও নিকটপ্রাচ্যে এবং ভূমধ্যসাগরের চতুষ্পার্শ্বস্থ ২৬টি দেশ এবং অঞ্চলগুলিতে পরিদর্শন করার কার্যভারে নিযুক্ত হই। প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে কিভাবে মুক্ত হতে হয় তা আমি জানতাম না, কিন্তু যিহোবা সর্বদাই একটি উপায় করে দিতেন।
যে সমস্ত সাক্ষীরা বিভিন্ন দেশে বিছিন্ন রয়েছে তাদের প্রতি যিহোবার সংগঠনের যত্ন দেখে আমি প্রভাবিত হই। একবার আমি তেলক্ষেত্রে কার্যরত একজন পূর্ব ভারতীয় ভাইয়ের সাক্ষাৎ পাই। সম্ভবত এই দেশে তিনিই একমাত্র সাক্ষী ছিলেন। তার ছোট আলমারিতে ১৮টি বিভিন্ন ভাষার প্রকাশনাদি ছিল, যা তিনি তার সহকর্মীদের দিয়েছিলেন। যদিও এখানে অন্যান্য সমস্ত ধর্ম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, ছিল কিন্তু আমাদের ভাইটি সুসমাচার প্রচার করার তার যে দায়িত্ব তা ভুলে যাননি। তার সহকর্মীরা দেখে প্রভাবিত হয়েছিল যে তার ধর্মের একজন প্রতিনিধিকে তাকে পরিদর্শন করার জন্য পাঠান হয়েছে।
আমি ১৯৫৯ সালে স্পেন এবং পর্তুগাল পরিদর্শন করি। উভয় দেশই তখন যিহোবার সাক্ষীদের কাজকর্মের নিষেধাজ্ঞা সহ সামরিক একনায়কত্বের অধীনে ছিল। অসুবিধাগুলি থাকা সত্ত্বেও ভাইয়েদের হাল ছেড়ে না দিতে উৎসাহিত করে, আমি এক মাসের মধ্যে একশটিরও বেশি সভা পরিচালনা করতে সক্ষম হই।
আর একা নই
২০ বছরেরও বেশি, আমি একা পূর্ণ-সময়ে যিহোবার সেবা করে আসছি, কিন্তু কোন স্থায়ী বাসস্থান ছাড়া ক্রমাগত ভ্রমণের ফলে হঠাৎ আমি ক্লান্তি অনুভব করি। আমি সেই সময়ে তিউনিশিয়ার এক বিশেষ অগ্রগামী, অ্যানী বীয়ানুচির দেখা পাই। আমরা ১৯৬৩ সালে বিবাহ করি। যিহোবা এবং সত্যের প্রতি তার প্রেম, শিক্ষা দেওয়ার কৌশল সহ পরিচর্যার প্রতি তার ভক্তি এবং ভাষা সম্বন্ধে তার জ্ঞান উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা এবং ইতালীতে আমাদের মিশনারী ও সীমার কাজে এক প্রকৃতই আশীর্বাদ প্রমাণিত হয়েছিল।
আমি এবং আমার স্ত্রী ১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে, সেনেগালের ডাকারে, কার্যভার পাই, যেখানে আমার স্থানীয় শাখা কার্যালয় সংগঠিত করার সুযোগ হয়েছিল। সেনেগাল দেশটি ধর্মীয় সহনশীলতার দিক দিয়ে উল্লেখ্যযোগ্য ছিল, নিঃসন্দেহে এর কারণ ছিল, রাষ্ট্রপতি লেওপোল সেংহর যিনি অল্প কয়েকজন আফ্রিকার রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে একজন ছিলেন, যিনি ১৯৭০ এর দশকে মালাউতে ভয়াবহ তাড়নার সময় যিহোবার সাক্ষীদের সমর্থনে মালাউয়ের রাষ্ট্রপতি বান্দার কাছে একটি চিঠি লেখেন।
যিহোবার প্রচুর আশীর্বাদ
আমি যখন ১৯৫০ সালে, সাইপ্রাসের উদ্দেশ্যে গিলিয়াড ত্যাগ করি, সাতটি সুট্কেইস নিয়ে আমি যাত্রা করেছিলাম। তুরস্কে যাবার সময়ে, আমার কাছে পাঁচটি ছিল। কিন্তু অত্যধিক ভ্রমণের জন্য, আমি ২০ কিলোগ্রামের মধ্যে সীমিত মালপত্র ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম, যার মধ্যে আমার ফাইলগুলি এবং আমার “ছোট্ট” টাইরাইটার যন্ত্রটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। একদিন আমি ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির তৎকালীন সভাপতি, ভাই নর্কে বলেছিলাম: “আপনি আমাকে বস্তুবাদী হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। আপনি আমাকে ২০ কিলোগ্রাম মালপত্র নিয়ে জীবনযাপন করতে শিখিয়েছেন এবং এতে আমি সন্তুষ্ট।” অনেক বিষয়াদি না থাকার কারণে আমি কখনও বঞ্চিত অনুভব করিনি।
দেশ থেকে বের হওয়া এবং প্রবেশ করা ছিল আমার ভ্রমণের প্রধান সমস্যা। একদিন, একটি দেশে যেখানে কাজ নিষিদ্ধ ছিল, একজন শুল্ক কর্মকর্তা আমার ফাইলগুলি অনুসন্ধান করতে শুরু করে। এইভাবে অনুসন্ধান এই দেশে সাক্ষীদের জন্য একটি ঝুঁকি, সুতরাং আমি আমার জ্যাকেট থেকে আমার স্ত্রীর একটি চিঠি বের করি এবং শুল্ক কর্মকর্তাকে বলি: “আমার মনে হয় যে আপনি চিঠিপত্র পড়তে আগ্রহী। আপনি কি আমার স্ত্রীর এই চিঠিটিও পড়তে চান, যেটি ফাইলের মধ্যে নেই?” লজ্জিত হয়ে তিনি নিজেই ক্ষমা চান এবং আমাকে যেতে দেন।
আমি এবং আমার স্ত্রী ১৯৮২ সাল থেকে ফ্রান্সের দক্ষিণে, নাইসে মিশনারী হিসাবে সেবা করছি। ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে, আমি আর আগের মত কাজ করতে পারি না। কিন্তু এটির মানে এই নয় যে আমাদের আনন্দ হ্রাস পেয়েছে। আমরা দেখেছি যে ‘আমাদের পরিশ্রম নিষ্ফল নয়।’ (১ করিন্থীয় ১৫:৫৮) অসংখ্য ব্যক্তিদের যাদের সাথে আমার বছরের পর বছর অধ্যয়ন করার সুযোগ হয়েছিল তাদের, অধিকন্তু আমার পরিবারে ৪০ জনেরও বেশি সদস্যকে বিশ্বস্তভাবে সেবা করতে দেখার আনন্দ আমার রয়েছে।
আমার জীবনে ‘পার হওয়া’ যে ত্যাগস্বীকারকে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করেছে, তার জন্য কখনই আমি দুঃখ করি না। কারণ, যিহোবা এবং তাঁর পুত্র, খ্রীষ্ট যীশু আমাদের জন্য যা করেছেন তার সাথে কোন ত্যাগস্বীকারকেই আমরা তুলনা করতে পারি না। আমার সত্য জানার সময় থেকে ৬০ বছরের কথা যখন আমি চিন্তা করি, আমি বলতে পারি যে যিহোবা আমাকে প্রচুর আশীর্বাদ করেছেন। যেমন হিতোপদেশ ১০:২২ পদে বলে, “সদাপ্রভুর আশীর্ব্বাদই ধনবান করে।”
নিঃসন্দেহে, যিহোবার “দয়া জীবন হইতেও উত্তম।” (গীতসংহিতা ৬৩:৩) বৃদ্ধ বয়সের বহুবিধ অসুবিধাগুলি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে, আমি আমার প্রার্থনায় প্রায়ই গীতরচকের অনুপ্রাণিত বাক্যগুলি উল্লেখ করি “সদাপ্রভু, আমি তোমার শরণ লইয়াছি; আমাকে কখনও লজ্জিত হইতে দিও না। কেননা, হে প্রভু সদাপ্রভু, তুমি আমার আশা; তুমি বাল্যকাল হইতে আমার বিশ্বাস-ভূমি। হে ঈশ্বর, তুমি বাল্যকালাবধি আমাকে শিক্ষা দিয়া আসিতেছ; আর এ পর্য্যন্ত আমি তোমার আশ্চর্য্য ক্রিয়া সকল প্রচার করিতেছি। হে ঈশ্বর, বৃদ্ধ বয়স ও পক্বকেশের কাল পর্য্যন্তও আমাকে পরিত্যাগ করিও না।”—গীতসংহিতা ৭১:১, ৫, ১৭, ১৮.
[২৫ পৃষ্ঠার চিত্র]
বর্তমানে, আমার স্ত্রী অ্যানীর সাথে