আমি যিহোবাতে নির্ভর করতে শিখেছিলাম
ইয়ান করপা-ওন্ডো দ্বারা কথিত
এটি ছিল ১৯৪২ সাল আর আমি তখন রাশিয়ার কুর্স্কের নিকটে হাঙ্গেরীয় সৈন্যদের পাহারাধীনে ছিলাম। আমরা অক্ষশক্তিগুলির কারাবন্দি ছিলাম যেগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রুশদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। আমার কবর খোঁড়া হয়ে গিয়েছিল এবং আমাকে একটি দলিলে সাক্ষর করব কি না সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দশ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল যেটিতে বলা ছিল আমি আর যিহোবার সাক্ষীদের একজন নই। পরে কী হয়েছিল তা বলার আগে, আসুন আমি আপনাদের বলি যে আমি কিভাবে সেখানে এসেছিলাম।
আমি ১৯০৪ সালে জাহোরের একটি ছোট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলাম যেটি এখন পূর্ব স্লোভাকিয়ায় অবস্থিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জাহোর নবগঠিত দেশ চেকোস্লোভাকিয়ার একটি অংশে পরিণত হয়েছিল। আমাদের গ্রামে ২০০টি বাড়ি এবং দুটি গির্জা ছিল যার একটি গ্রীক ক্যাথলিক এবং অন্যটি ক্যালভানিস্ট।
যদিও আমি ক্যালভানিস্ট গির্জায় যেতাম, তবুও আমি কোনরকম নৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই জীবনযাপন করতাম। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি একজন ব্যক্তি বাস করতেন যিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ছিলেন। একদিন তিনি আমার সঙ্গে কথোপকথন শুরু করেছিলেন এবং আমাকে একটি বাইবেল ধার দিয়েছিলেন। প্রথমবারের মত আমি ওই বইটি হাতে নিয়েছিলাম। এই সময় ১৯২৬ সালে আমি বারবোরাকে বিয়ে করি এবং শীঘ্রই আমরা আমাদের দুই সন্তান বারবোরা ও ইয়ানকে লাভ করি।
আমি বাইবেলটি পড়তে শুরু করেছিলাম কিন্তু সেখানে এমন অনেক বিষয় ছিল যা আমি বুঝতে পারিনি। তাই আমি আমার পাদ্রির কাছে গিয়েছিলাম এবং সাহায্য করার জন্য তার কাছে অনুরোধ করেছিলাম। “বাইবেল শুধু শিক্ষিত লোকেদের জন্য,” তিনি বলেছিলেন, “এটি বোঝার চেষ্টাও করো না।” তারপর তিনি আমাকে তাস খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এরপর আমি সেই ব্যক্তির কাছে গিয়েছিলাম যিনি আমাকে বাইবেলটি ধার দিয়েছিলেন। তিনি একজন বাইবেল ছাত্র ছিলেন, যিহোবার সাক্ষীদের তখন এই নামে ডাকা হত। আমাকে সাহায্য করতে তিনি আনন্দিত ছিলেন এবং কিছুদিন পর আমার চোখ খুলতে শুরু করেছিল। আমি অতিরিক্ত মদপান করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম এবং এক নৈতিক জীবনযাপন শুরু করেছিলাম; আমি এমনকি অন্যদের সঙ্গে যিহোবার সম্বন্ধে বলতেও শুরু করেছিলাম। ১৯২০-র দশকের গোঁড়ার দিকে বাইবেলের সত্য জাহোরে প্রবেশ করেছিল আর শীঘ্রই বাইবেল ছাত্রদের একটি সক্রিয় দল সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
কিন্তু, সেখানে তীব্র ধর্মীয় বিরোধিতা ছিল। স্থানীয় যাজক আমার পরিবারের অনেককেই আমার বিরুদ্ধে নিয়ে গিয়েছিলেন এই বলে যে আমি পাগল হয়ে গিয়েছি। কিন্তু আমার জীবনে একটি উদ্দেশ্য স্থাপিত হয়েছিল এবং আমি সংকল্পবদ্ধভাবে সত্য ঈশ্বর যিহোবাকে সেবা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। অতএব, ১৯৩০ সালে আমি যিহোবার প্রতি আমার উৎসর্গীকরণের চিহ্নস্বরূপ বাপ্তিস্ম নিয়েছিলাম।
কঠোর পরীক্ষাগুলির শুরু
১৯৩৮ সালে আমাদের প্রদেশ হাঙ্গেরির শাসনাধীনে আসে যেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানির পক্ষাবলম্বন করেছিল। সেই সময়ে আমাদের গ্রামের লোকসংখ্যা ছিল এক হাজার জনেরও কম আর আমরা প্রায় ৫০ জন সাক্ষী ছিলাম। আমরা প্রচার চালিয়ে গিয়েছিলাম যদিও তা করার অর্থ ছিল আমাদের জীবন ও স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা।
১৯৪০ সালে আমি হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনীর জন্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। আমার কী করার ছিল? যাইহোক, লোকেরা তাদের যুদ্ধাস্ত্র ভেঙ্গে শান্তির উপকরণ তৈরি করবে বাইবেলের সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলি আমি পড়েছিলাম এবং জানতে পেরেছিলাম যে, যথাসময়ে ঈশ্বর পৃথিবী থেকে সমস্ত যুদ্ধ দূর করবেন। (গীতসংহিতা ৪৬:৯; যিশাইয় ২:৪) তাই, আমি যুদ্ধকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম এবং পরিণতিগুলি অগ্রাহ্য করে সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
আমাকে ১৪ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং হাঙ্গেরির প্যাক্সে আমি কারাদণ্ড ভোগ করেছিলাম। অন্য পাঁচজন সাক্ষী সেই একই কারাগারে ছিলেন ফলে আমরা একজন আর একজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতে পারতাম ও তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ছিলাম। কিন্তু কিছু সময়ের জন্য পায়ে শিকল দিয়ে আমাকে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছিল। আমরা যখন যুদ্ধ সংক্রান্ত কোন কাজ করতে অস্বীকার করেছিলাম তখন আমাদের প্রহার করা হয়েছিল। এছাড়াও, আমাদের দুপুরে দুই ঘন্টা বাদে সারাদিন সোজা ও স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই কঠোর পরীক্ষা কয়েক মাস ধরে চলেছিল। তবুও আমরা সুখী ছিলাম কারণ ঈশ্বরের সামনে আমাদের এক শুদ্ধ বিবেক ছিল।
আপোশের প্রশ্ন
একদিন ক্যাথলিক যাজকদের ১৫ জনের একটি দল আমাদের এই বিষয়ে বোঝাবার চেষ্টায় এসেছিলেন যে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার দ্বারা যুদ্ধকে সমর্থন করাটা গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার সময় আমরা বলেছিলাম: “আপনারা যদি বাইবেল থেকে প্রমাণ করতে পারেন যে প্রাণ অমর আর আমরা যুদ্ধে মারা গেলে স্বর্গে যাব, তাহলে আমরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেব।” তারা অবশ্যই সেটি প্রমাণ করতে পারতেন না ফলে তারা আলোচনা চালিয়ে যেতেও চাননি।
১৯৪১ সালে আমার শাস্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল আর তখন আমি আমার পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হওয়ার জন্য সানন্দে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু তার পরিবর্তে, আমাকে বন্দি অবস্থায় হাঙ্গেরির শ্যারোসপাটাকের সৈন্যশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমরা যখন সেখানে পৌঁছাই, তখন মুক্ত হওয়ার জন্য আমাকে একটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমাকে বলা হয়েছিল, “তোমাকে কেবল এই অঙ্গীকারপত্রে সাক্ষর করতে হবে যে বাড়ি ফিরে গিয়ে তুমি ২০০ প্যানগু প্রদান করবে।”
“কিভাবে তা সম্ভব?” আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। “আপনারা কিসের জন্য অর্থ চাচ্ছেন?”
“অর্থের পরিবর্তে,” আমাকে বলা হয়েছিল, “তুমি এই সনদপত্র পাবে যে সেনাবাহিনীর জন্য চিকিৎসাসংক্রান্ত পরীক্ষায় তুমি উত্তীর্ণ হওনি।”
এটি আমাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্তের সম্মুখীন করেছিল। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে, আমি অমানবিক আচরণ ভোগ করেছি; আমি অবসন্ন হয়ে পড়ছিলাম। আর এখন কিছু অর্থ দিতে রাজি হলে আমি মুক্ত হতে পারব। “আমি এই বিষয়ে চিন্তা করব,” আমি বিড় বিড় করে বলেছিলাম।
আমি কী সিদ্ধান্ত নেব? আমার স্ত্রী ও সন্তানেরা ছিল যাদের জন্য চিন্তা করতে হয়েছিল। যাইহোক, সেই সময়ে একজন সহখ্রীষ্টানের কাছ থেকে আমি একটি চিঠি পেয়েছিলাম যেটিতে তিনি আমাকে উৎসাহ দিয়ে লিখেছিলেন। তিনি ইব্রীয় ১০:৩৮ পদটি উল্লেখ করেছিলেন যেখানে প্রেরিত পৌল যিহোবার বাক্যগুলি উদ্ধৃত করেছিলেন: “‘আমার ধার্ম্মিক ব্যক্তি বিশ্বাস হেতুই বাঁচিবে, আর যদি সরিয়া পড়ে, তবে আমার প্রাণ তাহাতে প্রীত হইবে না।’” এর অল্প কিছু দিন পরেই, সেনানিবাসের দুজন হাঙ্গেরীয় কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন যাদের একজন মন্তব্য করেছিলেন: “তুমি জান না যে বাইবেল নীতিগুলিকে এত দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার জন্য আমরা তোমাকে কতটা শ্রদ্ধা করি! হাল ছেড়ে দিও না।”
পরের দিন আমি, যারা আমাকে ২০০ প্যানগুর বিনিময়ে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন সেই ব্যক্তিদের কাছে গিয়েছিলাম আর তাদের বলেছিলাম: “যেহেতু যিহোবা ঈশ্বর আমাকে বন্দি হতে অনুমতি দিয়েছেন, তাই তিনি আমার মুক্তির বিষয়টিও দেখবেন। আমি আমার মুক্তি ক্রয় করব না।” তাই আমাকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাকে আপোশ করানোর জন্য সেটিই শেষ পদক্ষেপ ছিল না। আদালত আমাকে ক্ষমা করার প্রস্তাব দিয়েছিল যদি আমি কেবল দুই মাসের জন্য সেনাবাহিনীতে কাজ করতে রাজি হই আর আমাকে এমনকি একটি অস্ত্রও বহন করতে হবে না! আমি সেই প্রস্তাবটিও প্রত্যাখ্যান করেছিলাম ফলে আমার কারাদণ্ড কার্যকর হয়েছিল।
তাড়না বৃদ্ধি পায়
আমাকে আবারও প্যাক্সের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এইবার নির্যাতন আরও নির্মম ছিল। আমার হাত দুটি পিছনে বেঁধে আমাকে প্রায় দুই ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। ফলে, আমার উভয় কাঁধের হাড় স্থানচ্যুত হয়েছিল। এইধরনের নির্যাতন প্রায় ছয় মাস ধরে চলেছিল। আমি একমাত্র যিহোবাকে ধন্যবাদ দিতে পারি যে আমি হাল ছেড়ে দিইনি।
১৯৪২ সালে আমাদের একটি দলকে—যার মধ্যে রাজনৈতিক বন্দি, যিহূদী এবং আমরা ২৬ জন যিহোবার সাক্ষী ছিলাম—জার্মান সেনাবাহিনীর দ্বারা দখলকৃত কুর্স্ক শহরের একটি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমাদের জার্মানদের হাতে সমর্পণ করা হয়েছিল আর তারা কারাবন্দিদের যুদ্ধক্ষেত্রের সৈন্যদের জন্য খাদ্য, অস্ত্র ও পোশাক বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে নিযুক্ত করেছিল। আমরা সাক্ষীরা সেই কাজ করতে অস্বীকার করেছিলাম কারণ এটি আমাদের খ্রীষ্টীয় নিরপেক্ষতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছিল। ফলে, আমাদের হাঙ্গেরীয়দের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
পরিশেষে, আমাদের কুর্স্কের স্থানীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল। বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের দিনে তিনবার করে রবারের ব্যাট দিয়ে মারা হয়েছিল। একটি আঘাত আমার কপালের পাশে লেগেছিল ফলে আমি হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে গিয়েছিলাম। এই সময় আমি ভেবেছিলাম, ‘মারা যাওয়া অত্যন্ত কঠিন কিছু নয়।’ আমার সম্পূর্ণ দেহ অসাড় হয়ে যাওয়ায় আমি কিছুই অনুভব করতে পারতাম না। তিন দিন আমাদের একেবারেই কিছু খেতে দেওয়া হয়নি। তারপর আমাদের আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ও ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। শুধু আমরা ২০ জন বেঁচে গিয়েছিলাম।
১৯৪২ সালের অক্টোবর মাসে কুর্স্কের ওই দিনগুলিতে বিশ্বাসের যে পরীক্ষা আমি ভোগ করেছিলাম তা আমি যত পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলাম তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ছিল। আমাদের ভাবাবেগগুলি প্রাচীনকালের রাজা যিহোশাফটের দ্বারা উত্তমরূপে প্রকাশিত হয়েছিল যখন তার লোকেরা চরম প্রতিবন্ধকতাগুলির সম্মুখীন হয়েছিলেন: “আমাদের বিরুদ্ধে ঐ যে বৃহৎ দল আসিতেছে, উহাদের বিরুদ্ধে আমাদের ত নিজের কোন সামর্থ্য নাই; কি করিতে হইবে, তাহাও আমরা জানি না; আমরা কেবল তোমার দিকে চাহিয়া আছি।”—২ বংশাবলি ২০:১২.
আমাদের ২০ জনকে ১৮ জন হাঙ্গেরীয় সৈন্যদের পাহারাধীনে, নিজেদের গণ কবর খোঁড়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমরা যখন খোঁড়া শেষ করেছিলাম, তখন বলা হয়েছিল যে দলিলে সাক্ষর করার জন্য আমাদের দশ মিনিট সময় আছে যার একটি অংশে বর্ণিত ছিল: “যিহোবার সাক্ষীদের শিক্ষা ভুল। আমি আর এতে বিশ্বাস করব না কিংবা এটিকে সমর্থন করব না। আমি মাতৃভূমি হাঙ্গেরির জন্য লড়াই করব . . . আমি আমার সাক্ষর দ্বারা নিশ্চিত করছি যে আমি রোমান ক্যাথলিক গির্জায় যোগ দিচ্ছি।”
দশ মিনিট পর আদেশ এসেছিল: “ডান দিকে ঘোর! কবরের দিকে এগিয়ে যাও!” তারপরের আদেশ: “প্রথম ও তৃতীয় বন্দি গর্তে প্রবেশ কর!” এই দুজনকে দলিলে সাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আরও দশ মিনিট দেওয়া হয়েছিল। সৈন্যদের একজন বলেছিলেন: “তোমাদের বিশ্বাস ত্যাগ করে কবর থেকে বেরিয়ে এসো!” কেউ একটি কথাও বলেননি। তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাদের উভয়কে গুলি করেছিলেন।
“বাকিদের কী করা হবে?” একজন সৈন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
“তাদের বেঁধে ফেল,” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন। “আমরা তাদের আরও শাস্তি দেব এবং সকাল ছটায় গুলি করব।”
হঠাৎ আমি ভয় পেয়েছিলাম, মারা যাব বলে নয় কিন্তু আমি হয়ত নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আপোশ করে ফেলব সেইজন্য। তাই আমি সামনে এগিয়ে গিয়ে বলেছিলাম: “মহোদয়, আমরা আমাদের ভাইদের মত একই আইন লঙ্ঘন করেছি যাদের আপনারা এইমাত্র গুলি করেছেন। আপনারা আমাদেরও কেন গুলি করছেন না?”
কিন্তু তারা করেননি। আমাদের হাত পিছনে বাঁধা হয়েছিল। তারপর আমাদের বাঁধা হাতের উপর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা যখন চেতনা হারিয়ে ফেলতাম, তখন তারা আমাদের উপর জল ছুঁড়ে মারত। ব্যথা অত্যন্ত তীব্র ছিল কারণ দেহের সম্পূর্ণ ওজন আমাদের কাঁধের হাড়কে স্থানচ্যুত করেছিল। এই নির্যাতন প্রায় তিন ঘন্টা ধরে চলেছিল। তারপর, হঠাৎ যিহোবার সাক্ষীদের যেন আর গুলিবিদ্ধ করা না হয় এই আদেশ জারি করা হয়েছিল।
পূর্বাঞ্চলে স্থানান্তর—তারপর পলায়ন
তিন সপ্তাহ পর আমরা দলগতভাবে কয়েক দিন ধরে এগিয়ে গিয়েছিলাম যতক্ষণ পর্যন্ত না ডন নদীর কূলে পৌঁছেছিলাম। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আমাদের বলেছিলেন যে আমাদের আর জীবিত ফিরিয়ে নিয়ে আসা হবে না। দিনের বেলায়, আমাদের উদ্দেশ্যহীন কাজ দেওয়া হত, পরিখা খনন করে সেগুলি আবার ভরাট করা। বিকেলে, চারিদিক ঘুরে দেখার জন্য আমাদের কিছুটা স্বাধীনতা দেওয়া হত।
আমাদের অবস্থা অনুযায়ী, আমি সেখানে দুটি সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলাম। আমরা সেখানে মারা যেতে পারতাম কিংবা জার্মানদের কাছ থেকে পালিয়ে রুশদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারতাম। আমাদের মধ্যে কেবল তিন জন হিমায়িত ডন নদী পার হয়ে পালানোর চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ১৯৪২ সালের ১২ই ডিসেম্বর, আমরা যিহোবার কাছে প্রার্থনা করে স্থান ত্যাগ করেছিলাম। আমরা রুশ এলাকায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রায় ৩৫,০০০ জন বন্দির সঙ্গে বন্দিশিবিরে রাখা হয়েছিল। বসন্তকালের মধ্যে, প্রায় ২,৩০০ জন জীবিত ছিল। বাকিরা ক্ষুধায় মারা গিয়েছিল।
মুক্তি কিন্তু পরবর্তী দুঃখজনক ঘটনা
আমি যুদ্ধের বাকি সময় এবং যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর কয়েক মাস পর্যন্ত একজন রুশ বন্দি হিসাবে ছিলাম। পরিশেষে, ১৯৪৫ সালের নভেম্বর মাসে আমি আমার বাসস্থান জাহোরে পৌঁছাই। আমাদের খামার খুবই খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল, তাই আমাকে আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হয়েছিল। আমার স্ত্রী ও সন্তানেরা যুদ্ধ চলাকালে খামারে কাজ করেছিল কিন্তু ১৯৪৪ সালের অক্টোবর মাসে রুশরা যখন এগিয়ে এসেছিল, তখন তাদের পূর্বাঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমাদের যা কিছু ছিল সব লুট হয়ে গিয়েছিল।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়টি হল, আমি যখন বাড়ি ফিরে আসি, তখন আমার স্ত্রী অত্যন্ত অসুস্থ ছিল। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সে মারা যায়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩৮ বছর। পাঁচ বছরেরও দীর্ঘ কঠিন সময় পৃথক থাকার পর আমরা আমাদের পুনর্মিলনকে উপভোগ করার জন্য খুব অল্পই সময় পেয়েছিলাম।
সভাগুলিতে যোগ দিয়ে এবং ঘরে ঘরে পরিচর্যায় অংশ নিয়ে আমি আমার আধ্যাত্মিক ভাইদের মাঝে সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলাম। ১৯৪৭ সালে, একটি অধিবেশনে যোগ দিতে ব্রনোতে ভ্রমণ করার জন্য আমি কিছু অর্থ ধার করেছিলাম যা ছিল প্রায় ৪০০ কিলোমিটারের এক যাত্রা। সেখানে ওয়াচ টাওয়ার বাইবেল অ্যাণ্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটির তৎকালীন সভাপতি নেথেন এইচ. নর সহ আমার খ্রীষ্টান ভাইদের মাঝে, আমি অনেক সান্ত্বনা ও উৎসাহ পেয়েছিলাম।
আমরা আমাদের যুদ্ধোত্তর স্বাধীনতা বেশি দিনের জন্য উপভোগ করতে পারিনি। ১৯৪৮ সালে সাম্যবাদীরা আমাদের অত্যাচার করতে শুরু করেছিল। চেকোস্লোভাকিয়ায় যিহোবার সাক্ষীদের কাজের নেতৃত্ব গ্রহণকারী অনেক ভাইয়েরা ১৯৫২ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং আমাকে মণ্ডলীর দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে, আমাকেও গ্রেপ্তার করে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আমার ছেলে ইয়ান ও তার ছেলে ইয়োরিও তাদের খ্রীষ্টীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য গ্রেপ্তার হয়েছিল। আমি প্রাগের পানক্রাট রাজ্য কারাগারে দুই বছর ছিলাম। ১৯৫৬ সালে এক সাধারণ ক্ষমা ঘোষিত হয়েছিল ফলে আমি মুক্তি পেয়েছিলাম।
অবশেষে মুক্তি!
পরিশেষে, ১৯৮৯ সালে সাম্যবাদ চেকোস্লোভাকিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল ফলে যিহোবার সাক্ষীদের কাজ বৈধভাবে নিবন্ধিত হয়েছিল। তাই, আমরা একত্রিত হওয়ার এবং প্রকাশ্যে প্রচার করার জন্য স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। সেই সময়ে জাহোরে প্রায় একশ সাক্ষী ছিলেন, অর্থাৎ গ্রামের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন সাক্ষী ছিলেন। কয়েক বছর আগে, আমরা জাহোরে একটি সুন্দর, বড় কিংডম হল তৈরি করেছিলাম যেখানে প্রায় ২০০ লোকের বসার ব্যবস্থা ছিল।
আমার শরীর এখন আর বেশি ভাল নয়, তাই ভাইয়েরা আমাকে গাড়ি করে কিংডম হলে নিয়ে যান। সভাতে উপস্থিত হতে আমি আনন্দ পাই এবং প্রহরীদুর্গ অধ্যয়নে মন্তব্য করা উপভোগ করি। আমি আমার পরিবারের তিন পুরুষের প্রতিনিধিদের যিহোবাকে সেবা করতে দেখে বিশেষভাবে সুখী যার মধ্যে আমার অনেক নাতিনাতনীরা রয়েছে। এদের একজন চেকোস্লোভাকিয়ায় যিহোবার সাক্ষীদের একজন ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসাবে সেবা করেছিলেন যতদিন তার পারিবারিক দায়িত্বগুলি তাকে সেই কাজ করতে অনুমোদন দিয়েছিল।
আমার বিভিন্ন পরীক্ষার সময়ে আমাকে শক্তিশালী করার জন্য আমি যিহোবার কাছে কৃতজ্ঞ। আমার মনোযোগ কেবল তাঁর প্রতিই নিবদ্ধ করা—‘যিনি অদৃশ্য, তাঁহাকে যেন দেখাই’—আমাকে সংরক্ষিত করেছিল। (ইব্রীয় ১১:২৭) হ্যাঁ, আমি তাঁর উদ্ধার করার শক্তিশালী হস্ত অনুভব করেছিলাম। সেই কারণে, এমনকি এখনও আমি মণ্ডলীর সভাগুলিতে উপস্থিত থাকার এবং প্রকাশ্য পরিচর্যায় আমার সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর নাম ঘোষণায় অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করে থাকি।
[২৫ পৃষ্ঠার চিত্র]
জাহোরে কিংডম হল
[২৬ পৃষ্ঠার চিত্র]
আমি প্রহরীদুর্গ অধ্যয়নে মন্তব্য করার সুযোগকে উপলব্ধি করি