তালমুড কী?
“নিঃসন্দেহে তালমুড সর্বকালের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কর্মের অন্যতম।”—সার্বজনীন যিহূদী বিশ্বকোষ (ইংরাজি)।
“[তালমুড হল] মানবজাতির একটি অন্যতম বৃহৎ বুদ্ধিগত সম্পাদন, এতই গভীর, এতই সমৃদ্ধ, এতই সূক্ষ্ম এক দলিল যে তা দেড় সহস্রাব্দীরও বেশি সময় ধরে বুদ্ধিমান লোকেদের ব্যস্ত রেখেছে।”—যেকোব নইসনার, যিহূদী পণ্ডিত ও গ্রন্থকার।
“তালমুড [যিহূদীবাদের] কেন্দ্রীয় স্তম্ভ যেটি যিহূদী জীবনের সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক কাঠামোকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।”—এডিন স্টিনসল্টস্, তালমুডের পণ্ডিত ও রব্বি।
প্রশ্নাতীতভাবে শতাব্দীগুলি ধরে যিহূদী লোকেদের উপর তালমুডের এক প্রচণ্ড প্রভাব ছিল। কিন্তু, উপরে উদ্ধৃত এই প্রশংসাজনক মন্তব্যগুলির বিপরীতে তালমুডকে “এক অন্ধকারময় ও কর্দমাক্ত সমুদ্র” বলে কলঙ্কজনকভাবে আখ্যায়িত ও অভিহিত করা হয়েছে। এটিকে শয়তানের পক্ষ থেকে এক ঈশ্বরনিন্দামূলক কাজ বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পোপের নির্দেশ অনুযায়ী এটি বার বার পরীক্ষিত, বাজেয়াপ্ত এবং এমনকি ইউরোপের নগরমধ্যস্থ উন্মুক্ত স্থানগুলিতে প্রচুর সংখ্যায় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
প্রকৃতপক্ষে এই কাজটি কী যেটি এতখানি বিতর্ক উত্থাপন করেছে? কী তালমুডকে যিহূদী লেখাগুলির মধ্যে অদ্বিতীয় করে তুলেছে? কেন এটি লেখা হয়েছিল? যিহূদীবাদের উপর কিভাবে এটি এতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল? ন-যিহূদী জগতের জন্য এটি কি কোন অর্থ রাখে?
সাধারণ কাল ৭০ সালে যিরূশালেমের মন্দির ধ্বংস হওয়ার পরবর্তী ১৫০ বছরের মধ্যে সমগ্র ইস্রায়েলে রব্বি মহাজ্ঞানীদের শিক্ষায়তনগুলি যিহূদী অভ্যাসকে বজায় রাখার জন্য শীঘ্রই এক নতুন ভিত্তি খুঁজে নিয়েছিল। তারা তর্কবিতর্ক করেছিলেন এবং তারপর তাদের মৌখিক নিয়মগুলি থেকে বিভিন্ন পরম্পরাগত বিধিগুলিকে সম্মিলিত করেছিলেন। এই ভিত্তির উপর গড়ে তোলার সময় তারা যিহূদীবাদের জন্য নতুন সীমাবদ্ধতা ও চাহিদাগুলি স্থাপন করেছিলেন যা মন্দির ছাড়া কিভাবে প্রতিদিন পবিত্রতার সাথে জীবনযাপন করা যায় সে সম্বন্ধে নির্দেশনা দিয়েছিল। এই নতুন আধ্যাত্মিক কাঠামোর পরিলেখটি মিশ্নায় ছিল যেটি সা.কা. তৃতীয় শতাব্দীর শুরুতে যিহূদা হা-নাসির দ্বারা সংকলিত হয়েছিল।a
মিশ্না স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, বাইবেলের প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহের ভিত্তিতে এটি যথার্থতার অন্বেষণ করেনি। এর আলোচনার পদ্ধতি ও ইব্রীয় ভাষার শৈলী ছিল অদ্বিতীয় এবং বাইবেলের পাঠ্যাংশ থেকে স্বতন্ত্র। মিশ্নায় উদ্ধৃত রব্বিদের সিদ্ধান্ত সকল স্থানের যিহূদীদের প্রতিদিনের জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করত। বাস্তবিকই যেকোব নইস্নার মন্তব্য করেন: “মিশ্না ইস্রায়েলের সংবিধান সরবরাহ করেছিল। . . . এটি এর নিয়মাবলির প্রতি স্বীকৃতি ও সেগুলি মেনে চলা সম্বন্ধে দাবি করেছিল।”
কিন্তু সেই সম্বন্ধে কী বলা যায়, যদি কেউ প্রশ্ন করেন যে মিশ্নায় উদ্ধৃত মহাজ্ঞানী ব্যক্তিদের কর্তৃত্ব প্রকৃতই প্রকাশিত শাস্ত্রের সমান কি না? রব্বিদের দেখাতে হয়েছিল যে মিশ্নায় পাওয়া তানাইমদের (মৌখিক নিয়মের শিক্ষক) শিক্ষা ইব্রীয় শাস্ত্রাবলীর সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। অতিরিক্ত মন্তব্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল। তারা মিশ্নাকে ব্যাখ্যা করা ও এর যথার্থতা প্রতিপাদনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন এবং প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে সিনয় পর্বতে মোশিকে দেওয়া ব্যবস্থা ছিল এর উৎস। রব্বিরা এটি প্রমাণ করার জন্য বাধ্যতা অনুভব করেছিলেন যে মৌখিক ও লিখিত ব্যবস্থার প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য এক ছিল। যিহূদীবাদের অন্তিম উক্তি হওয়ার বিপরীতে মিশ্না ধর্মীয় আলোচনা ও তর্কবিতর্কের এক নতুন ভিত্তিতে পরিণত হয়েছিল।
তালমুডের রচনা
রব্বিরা যারা এই নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গ্রহণ করেছিলেন তারা অ্যামোরাইম নামে পরিচিত ছিলেন—মিশ্নার “অনুবাদক” অথবা “ব্যাখ্যাকারী।” প্রত্যেকটি শিক্ষায়তন একজন বিশিষ্ট রব্বিকে কেন্দ্র করে ছিল। সারা বছর ধরে পণ্ডিত ও ছাত্রদের একটি ছোট পরিধির মধ্যে আলোচনা হত। কিন্তু সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন বছরে দুবার আদার ও ইলুল মাসে অনুষ্ঠিত হত যখন কৃষিকাজ কমে আসত আর শতাধিক এমনকি সহস্রাধিক লোকেরা যোগ দিতে পারতেন।
এডিন স্টিনসল্টস্ ব্যাখ্যা করেন: “শিক্ষায়তনের প্রধান যিনি তত্ত্বাবধান করতেন একটি চেয়ারে বা বিশেষ মাদুরে বসতেন। তার বিপরীতে সামনের সারিতে গুরুত্বপূর্ণ পণ্ডিতেরা বসতেন যাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তার সহকর্মী ও উল্লেখযোগ্য ছাত্রেরা আর তাদের পিছনে বাকি অন্যান্য সমস্ত পণ্ডিতেরা। . . . বসার বিন্যাস নির্দিষ্টভাবে যাজকতন্ত্রের ক্রমোচ্চ শ্রেণী বিভাগের [গুরুত্ব অনুযায়ী] উপর ভিত্তিশীল ছিল।” মিশ্নার একটি অংশ আবৃত্তি করা হত। তারপর এটি তানাইমদের দ্বারা সংগৃহীত অনুরূপ বা সম্পূরক বিষয়বস্তুর সাথে তুলনা করা হত কিন্তু তা মিশ্নার সাথে সংযুক্ত করা হত না। বিশ্লেষণ করার পদ্ধতি শুরু হত। প্রশ্নগুলি উত্থাপিত হত আর শিক্ষার আভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়ার জন্য পরস্পর-বিরোধী বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করা হত। রব্বিদের শিক্ষাকে সমর্থন করার জন্য ইব্রীয় শাস্ত্র থেকে প্রমাণযোগ্য পাঠ্যাংশগুলিকে খোঁজা হত।
যদিও যত্নসহকারে বিন্যস্ত, এই আলোচনাগুলি ছিল তীব্র ও কখনও কখনও বিক্ষোভপূর্ণ। তালমুডে উদ্ধৃত একজন মহাজ্ঞানী বলেছিলেন যে তর্কবিতর্ক চলাকালীন রব্বিদের মুখ থেকে “আগুনের স্ফুলিঙ্গ” বের হত। (হুলিন ১৩৭খ, বাবিলনীয় তালমুড) এই সভাগুলি সম্বন্ধে স্টিনসল্টস্ বলেন: “শিক্ষায়তনের প্রধান অথবা বক্তৃতা দানকারী মহাজ্ঞানী সমস্যাগুলি সম্বন্ধে তার নিজস্ব ব্যাখ্যা দিতেন। শ্রোতাদের মধ্যে থেকে পণ্ডিতেরা প্রায়ই তাকে অন্যান্য উৎস, অন্যান্য মন্তব্যকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি অথবা তাদের নিজস্ব যৌক্তিক উপসংহারের ভিত্তিতে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে তাকে নাজেহাল করতেন। কখনও কখনও তর্কবিতর্ক খুবই সংক্ষিপ্ত হত আর আলোচিত প্রশ্নটির পরিষ্কার ও নিষ্পত্তিমূলক উত্তরে সীমিত থাকত। অন্যান্য ক্ষেত্রগুলিতে অন্য পণ্ডিতেরা বিকল্প সমাধানগুলি পেশ করতেন ফলে এক বৃহৎ মাত্রার তর্কবিতর্কের উদ্ভব হত।” এতে শ্রোতাদের সকলে স্বচ্ছন্দে অংশ নিতে পারতেন। আলোচনার পর্বে গৃহীত সিদ্ধান্তমূলক বিষয়বস্তু বিভিন্ন পণ্ডিতদের দ্বারা পুনর্বিবেচিত হওয়ার জন্য অন্যান্য শিক্ষায়তনগুলিতে পাঠানো হত।
তথাপি, এই পর্বগুলি কেবলমাত্র অন্তহীন আইনসংক্রান্ত তর্কবিতর্ক ছিল না। যিহূদী ধর্মীয় জীবনের নিয়ম ও নীতিগুলির সাথে সম্বন্ধিত আইনসংক্রান্ত বিষয়গুলি হালাকা নামে পরিচিত ছিল। এই পরিভাষাটি ইব্রীয় মূল শব্দ “যাওয়া” থেকে এসেছে যা ‘জীবনের সেই পথ যেখান দিয়ে একজনের যাওয়া উচিত’ এই বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে। অন্যান্য সমস্ত বিষয়গুলি—রব্বি ও বাইবেল চরিত্রগুলি সম্বন্ধে গল্প, প্রবাদ বাক্য, বিশ্বাস ও দর্শন সম্পর্কীয় ধারণা—হাগাদা নামে পরিচিত ছিল যেটি ইব্রীয় মূল শব্দ “বলা” থেকে এসেছিল। হালাকা এবং হাগাদা রব্বিদের তর্কবিতর্কের সময় একত্রে মিশে যেত।
তালমুডের বিশ্ব (ইংরাজি) নামক তার বইয়ে মরিশ অ্যাডলার মন্তব্য করেন: “একজন বিচক্ষণ শিক্ষক এক দীর্ঘ ও কঠিন আইনসংক্রান্ত তর্ককে বাধা দিয়ে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে একটি সহজ ও গঠনমূলক প্রসঙ্গে নিয়ে আসতেন। . . . সেই কারণে আমরা দেখতে পাই উপকথা ও ইতিহাস, সমকালীন বিজ্ঞান ও লোককাহিনী, বাইবেলের ব্যাখ্যা ও জীবনী, ধর্মোপদেশ ও ধর্মতত্ত্বসংক্রান্ত বিষয় এমন কিছুতে সংমিশ্রিত হয়েছিল যা শিক্ষায়তনের পদ্ধতির সাথে অপরিচিত একজনের কাছে এক অসংলগ্ন তথ্যের বিসদৃশ মিশ্রণ বলে মনে হত।” শিক্ষায়তনের পণ্ডিতদের কাছে এই সমস্ত অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলির একটি উদ্দেশ্য ছিল আর তা আলোচনার বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল। হালাকা ও হাগাদা ছিল একটি নতুন কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর যা রব্বিদের শিক্ষায়তনে নির্মাণ করা হচ্ছিল।
দুটি তালমুডের রচনা
কালক্রমে প্যালেষ্টাইনে অবস্থিত রব্বিদের প্রধান কেন্দ্র তিবরিয়াতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষায়তনগুলি সেফোরিস, কৈসরিয়া ও লিডায় অবস্থিত ছিল। কিন্তু নিম্নগামী অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অবিরত রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরিশেষে ধর্মভ্রষ্ট খ্রীষ্টতত্ত্বের পক্ষ থেকে চাপ ও তাড়না, পূর্বদিকে অপর একটি বৃহৎ যিহূদী বসবাসকারী কেন্দ্রে ব্যাপক অভিবাসনের সৃষ্টি করেছিল—বাবিলনীয়া।
শতাব্দীগুলি ধরে, শিক্ষায়তনের মহান রব্বিদের ছত্রছায়ায় অধ্যয়ন করার জন্য ছাত্রেরা বাবিলনীয়া থেকে প্যালেষ্টাইনে মিলিত হতেন। এইরকম একজন ছাত্র ছিলেন আব্বা বেন ইবো যিনি আব্বা আরিকা নামেও পরিচিত ছিলেন—দীর্ঘাকৃতি ব্যক্তি আব্বা—কিন্তু পরবর্তীকালে সাধারণভাবে রাব নামে পরিচিত হয়েছিলেন। যিহূদা হা-নাসির ছত্রছায়ায় অধ্যয়নের পর প্রায় সা.কা. ২১৯ সালে তিনি বাবিলনীয়ায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন আর এটি যিহূদী সমাজের আধ্যাত্মিক গুরুত্বের পক্ষে এক সন্ধিক্ষণকে চিহ্নিত করেছিল। সূরাতে রাব একটি শিক্ষায়তন স্থাপন করেছিলেন, এমন একটি এলাকা যেখানে অনেক যিহূদী বাস করতেন কিন্তু পণ্ডিত ব্যক্তিদের অভাব ছিল। তার সুনাম ১,২০০ জন নিয়মিত ছাত্রদের তার শিক্ষায়তনের প্রতি আকর্ষিত করেছিল আর যিহূদী আদর ও ইলুল মাসে আরও সহস্রাধিক ব্যক্তিরা যোগদান করতেন। রাবের সমকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তি স্যামুয়েল নেহারডিয়ায় একটি শিক্ষায়তন স্থাপন করেছিলেন। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষায়তনগুলি পামবেদিথা ও মেহোজাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
তখন প্যালেষ্টাইনে যাত্রা করার আর প্রয়োজন ছিল না কারণ একজন বাবিলনীয়াতেই মহান পণ্ডিতদের ছত্রছায়ায় অধ্যয়ন করতে পারতেন। এক পৃথক পাঠ্যাংশ হিসাবে মিশ্নার সংকলন বাবিলনীয় শিক্ষায়তনগুলির সম্পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য এক পথ প্রস্তুত করেছিল। যদিও এইসময় প্যালেষ্টাইন ও বাবিলনীয়ায় অধ্যয়নের ভিন্ন ভিন্ন শৈলী ও পদ্ধতি গড়ে উঠেছিল, তথাপি অবিরত যোগাযোগ ও শিক্ষক বিনিময় শিক্ষায়তনগুলির মধ্যে ঐক্য বজায় রেখেছিল।
সা.কা. চতুর্থ শতাব্দীর শেষ ও পঞ্চম শতাব্দীর শুরুতে প্যালেষ্টাইনের যিহূদীদের জন্য পরিস্থিতি প্রকৃতই কঠিন হয়ে উঠেছিল। ধর্মভ্রষ্ট খ্রীষ্টীয় জগতের উত্থানরত কর্তৃত্বের অধীনে বাধা ও তাড়নার ঢেউ চূড়ান্ত আঘাত এনেছিল যার দ্বারা প্রায় সা.কা. ৪২৫ সালের মধ্যে ধর্মধাম ও নাসির পদমর্যাদা (কুলপতি) উভয়ই লোপ পেয়েছিল। সুতরাং প্যালেষ্টাইনের অ্যামোরাইম শিক্ষায়তনের তর্কবিতর্কের সারাংশগুলির সংরক্ষণকে নিশ্চিত করার জন্য সেগুলিকে একটি সুসংগঠিত কাজে ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করেছিলেন। এই কাজ সা.কা. চতুর্থ শতাব্দীর শেষ ভাগে দ্রুত সংকলিত করা হয়েছিল যেটি প্যালেষ্টাইন তালমুডb নামে পরিচিত হয়েছিল।
প্যালেষ্টাইনের শিক্ষায়তনের পতনকালে আসে বাবিলনীয় অ্যামোরাইমরা তাদের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। এবেয়ে ও রাবা তর্কবিতর্ককে একটি জটিল ও সূক্ষ্ম তর্কের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন যেটি পরবর্তীকালে তালমুডের বিশ্লেষণের আদর্শে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অ্যাসে সূরা শিক্ষায়তনের প্রধান (সা.কা. ৩৭১-৪২৭ সাল) এই তর্কবিতর্কের সংক্ষিপ্তসারের সংকলন ও সম্পাদনা করতে শুরু করেছিলেন। স্টিনসল্টসের মতানুসারে তিনি এটি করেছিলেন কারণ “এটির অসংগঠিত অবস্থা দেখে তিনি ভয় করেছিলেন যে মৌখিক বিষয়বস্তুর এই বিশাল সম্ভার বিস্মৃতির অন্তরালে ডুবে যাওয়ার বিপদের মধ্যে ছিল।”
এই বিশাল বিষয়বস্তুর সম্ভারকে সংগঠিত করা একাধিক ব্যক্তি অথবা এমনকি একটি বংশের ক্ষমতার বাইরে ছিল। বাবিলনীয়ায় অ্যামোরাইমদের সময়কাল সা.কা. পঞ্চম শতাব্দীতে শেষ হয়েছিল কিন্তু বাবিলনীয় তালমুডের চূড়ান্ত সম্পাদনার কাজ সেবোরাইম, একটি অরামীয় পরিভাষা যার অর্থ “বর্ণনাকারী” অথবা “মতের ধারক” নামে একটি দলের দ্বারা সা.কা. ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত চলেছিল। এই চূড়ান্ত সম্পাদকেরা সহস্রাধিক অসম্পূর্ণ বিষয়গুলি ও শতাব্দীব্যাপী রব্বিদের তর্কবিতর্ককে একত্রে সম্মিলিত করে বাবিলনীয় তালমুডে এমন এক শৈলী ও কাঠামো প্রদান করেছিলেন যা এটিকে পূর্ববর্তী সমস্ত যিহূদী লেখাগুলি থেকে পৃথক এক রূপ দিয়েছিল।
তালমুড কী সম্পাদন করেছিল?
তালমুডের রব্বিরা এটি প্রমাণ করতে প্রচেষ্টা করেছিলেন যে মিশ্না ও ইব্রীয় শাস্ত্রাবলীর উৎস একই। কিন্তু কেন? যেকোব নইস্নার মন্তব্য করেন: “ঘোষিত বিষয়টি ছিল মিশ্নার মান। কিন্তু মূল বিষয়টি স্বয়ং মহাজ্ঞানীদের কর্তৃত্বের বিষয়ে পরিবর্তিত হয়েছিল।” এই কর্তৃত্বকে পুনরুজ্জীবিত করতে মিশ্নার প্রত্যেকটি পঙ্ক্তি, কখনও কখনও প্রত্যেকটি শব্দ বিশেষ পদ্ধতিতে পরীক্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান করা, ব্যাখ্যা এবং সামঞ্জস্য বিধান করা হয়েছিল। নইস্নার বলেছিলেন যে এভাবে রব্বিরা মিশ্নার পরিক্রমণ পথকে এক রাস্তা থেকে আর এক রাস্তায় স্থানান্তরিত করেছিলেন।” যদিও স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি কাজ হিসাবে এটি সৃষ্ট হয়েছিল, মিশ্না তখনও পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ছিল। এই পদ্ধতি চলাকালীন এটি পুনর্সৃষ্ট ও পুনরায় পরিমার্জিত হয়েছিল।
এই নতুন কাজ—তালমুড—রব্বিদের উদ্দেশ্য সম্পাদন করেছিল। তারা বিশ্লেষণের জন্য নিয়ম স্থাপন করেছিলেন আর তাই এটি লোকেদের রব্বিদের মত চিন্তা করতে শিখিয়েছিল। রব্বিরা বিশ্বাস করতেন যে অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করার জন্য তাদের পদ্ধতি ঈশ্বরের মনকে প্রতিফলিত করে। তালমুডের অধ্যয়ন স্বয়ং লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল, উপাসনার একটি রূপ—ঈশ্বরের অনুকরণে মনকে ব্যবহার করা। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তালমুড এই একই পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হত। এর ফল কী হয়েছিল? ইতিহাসবেত্তা সেসল রথ লেখেন: “তালমুড . . . [যিহূদীদের] এমন বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন দিয়েছিল যা তাদের অন্যদের থেকে পৃথক করেছিল আর সেই সাথে তাদের সংগঠিত লোক হিসাবে পরিবর্তিত হওয়ার উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা প্রদান করেছিল। এটির নীতিশাস্ত্র তাদের বোধশক্তিকে তীক্ষ্ণ করেছিল ও তাদের মানসিক সূক্ষ্মতা প্রদান করেছিল। . . . তালমুড মধ্যযুগের তাড়িত যিহূদীদের অন্য এক জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল যেখানে তারা মুক্তিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন . . . এটি তাদের এক পিতৃভূমি প্রদান করেছিল, যেটিকে তারা তার নিজের দেশ হারিয়ে ফেললেও সাথে নিয়ে যেতে পারত।”
অন্যদের রব্বিদের চিন্তাধারা সম্বন্ধে শেখানোর ক্ষেত্রে তালমুড অবশ্যই প্রভাবশালী ছিল। কিন্তু সকলের জন্য প্রশ্নটি হল—যিহূদী ও অনুরূপভাবে ন-যিহূদী—তালমুড কি প্রকৃতই ঈশ্বরের মনকে প্রতিফলিত করে?—১ করিন্থীয় ২:১১-১৬.
[পাদটীকাগুলো]
a মিশ্নার বিকাশ ও আভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তু সম্বন্ধে আরও তথ্যের জন্য ১৯৯৭ সালের ১৫ই নভেম্বর প্রহরীদুর্গ এর “মিশ্না ও মোশির প্রতি ঈশ্বরের ব্যবস্থা” নামক প্রবন্ধটি দেখুন।
b প্যালেষ্টাইন তালমুড জনসাধারণ্যে ব্যাপকভাবে যিরূশালেম তালমুড নামে পরিচিত। কিন্তু এই পরিভাষাটি ভুল নামকরণ, কারণ অধিকাংশ অ্যামোরাইক সময়কালে যিরূশালেমে যিহূদীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।
[৩১ পৃষ্ঠার বাক্স]
দুটি তালমুড—কিভাবে তাদের তুলনা করা যায়?
ইব্রীয় শব্দ “তালমুড” এর অর্থ “অধ্যয়ন” অথবা “শেখা।” প্যালেষ্টাইন ও বাবিলনীয়ার অ্যামোরাইম মিশ্না অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করেছিলেন। উভয় তালমুডই (প্যালেষ্টাইন এবং বাবিলনীয়) এটি করে কিন্তু কিভাবে তাদের তুলনা করা যায়? যেকোব নইস্নার লেখেন: “প্রথম তালমুডটি প্রমাণকে বিশ্লেষণ করে দ্বিতীয়টি উৎসস্থলের অনুসন্ধান করে, প্রথমটি এর আধারের সম্পূর্ণ সীমার মধ্যে থেকে যায় আর দ্বিতীয়টি সীমাকে অত্যন্তভাবে ছাপিয়ে যায়।”
আরও একাগ্র ও পুঙ্খানুপুঙ্খ সম্পাদনা বাবিলনীয় তালমুডকে কেবলমাত্র অত্যন্ত বিশালই করেনি কিন্তু এর চিন্তাধারা প্রণালী ও বিশ্লেষণকে গভীর ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন করে তুলেছিল। যখন “তালমুড” এই শব্দটি উল্লেখ করা হয়ে থাকে, তখন তা সাধারণত বাবিলনীয় তালমুডকেই বোঝায়। এটিই হচ্ছে সেই তালমুড যেটি সর্বাপেক্ষা বেশি অধ্যয়ন করা হয়েছে ও শতাব্দীব্যাপী যেটির উপর মন্তব্য করা হয়েছে। নইস্নারের মতানুযায়ী প্যালেষ্টাইন তালমুড “সক্ষমতার কাজ” আর বাবিলনীয় তালমুড “প্রতিভাসুলভ কাজ।”