ক্যারাইটরা—এবং সত্যের জন্য তাদের অন্বেষণ
“পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে [শাস্ত্রকে] অনুসন্ধান কর এবং আমার মতামতের উপর নির্ভর কর না।” সা.শ. অষ্টম শতাব্দীতে একজন ক্যারাইট নেতা এই কথাগুলি বলেছিলেন। এই ক্যারাইটরা কারা ছিল? তাদের উদাহরণ থেকে আমরা মূল্যবান কি কিছু শিখতে পারি? এই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমাদের অবশ্যই ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ফিরে যেতে হবে, যেখানে দীর্ঘদিনের এক বিতর্ক ছিল, যা ক্যারাইট আন্দোলন পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
এই বিতর্ক কিভাবে শুরু হয়েছিল?
সাধারণ শতাব্দীর পূর্বের শেষের শতাব্দীগুলিতে যিহূদী ধর্মের এক নতুন দর্শনবাদ দেখা দিয়েছিল। এটা ছিল যে ঈশ্বর সীনয় পর্বতে দুটি নিয়ম দিয়েছিলেন, একটি লিখিত এবং অন্যটি মৌখিক।a প্রথম শতাব্দী শেষ হবার আগেই, যারা এই নতুন শিক্ষাগুলিকে সমর্থন করেছিল এবং যারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদের মধ্যে প্রবল দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। সেখানে ফরীশীরা ছিল এর উদ্যোক্তা অথচ সদ্দূকীরা এবং এসেনীরা ছিল বিরোধী।
এই বিতর্ক চলাকালীন মধ্যবর্তী সময়ে প্রতিজ্ঞাত মশীহ হিসাবে নাসরতীয় যীশুর আবির্ভাব ঘটে। (দানিয়েল ৯:২৪, ২৫; মথি ২:১-৬, ২২, ২৩) যীশু এইসব যিহূদীদের সেই সব বিবাদমূলক দলগুলির মোকাবিলা করেন। তাদের সাথে যুক্তি করার সময়ে, তিনি তাদের নিন্দা করেছিলেন যে তারা তাদের পরম্পরাগত বিধির জন্য ঈশ্বরের বাক্যকে লঙ্ঘন করেছে। (মথি ১৫:৩-৯) যীশু আধ্যাত্মিক সত্যগুলিকেও এমনভাবে শিখিয়েছিলেন যা একমাত্র মশীহের পক্ষেই শেখান সম্ভব ছিল। (যোহন ৭:৪৫, ৪৬) এছাড়াও, শুধুমাত্র যীশুর সত্য অনুগামীরা এই ঐশিক সমর্থনের প্রমাণ দেখিয়েছিলেন। তারা খ্রীষ্টান বলে পরিচিত হয়েছিলেন।—প্রেরিত ১১:২৬
যিরূশালেম মন্দির যখন সা.শ ৭০ সালে ধ্বংস হয়, তখন ফরীশীরাই ছিল একমাত্র ধর্মীয় দল, যারা রক্ষা পেয়েছিল। এখন পৌরোহিত্য, বলিদান এবং মন্দির না থাকার দরুন ফরীশীবাদী যিহূদী ধর্ম এর পরিবর্তে বিকল্প সৃষ্টি করতে পারত, যাতে করে লিখিত আইনকে উপেক্ষা করে পরম্পরাগত বিধি ও ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করা যেত। এটা সুযোগ করে দেয় একটি নতুন “পবিত্র পুস্তকগুলির” লেখার। প্রথম আসে মিশ্না, যার মধ্যে মৌখিক আইনগুলিও সংযোজন ও ব্যাখ্যা যোগ করা ছিল। পরবর্তীকালে অন্যান্য লিখিত অংশও এর সাথে যোগ করা হয় এবং তাকে বলা হয় তালমুড। একই সঙ্গে ধর্মভ্রষ্ট খ্রীষ্টানেরা যীশুর শিক্ষাকে উলঙ্ঘন করতে শুরু করে। দুটি পক্ষই শক্তিশালী ধর্মীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল—রব্বিদের কর্তৃপক্ষ একদিকে এবং গির্জার কর্তৃপক্ষ আর এক দিকে।
পৌত্তলিক রোমের সাথে যিহূদীদের এবং পরবর্তীকালে “খ্রীষ্টান” রোমের সাথে দ্বন্দ্ব থাকার দরুন, কালক্রমে যিহূদী ধর্মের কেন্দ্র বাবিলনে স্থানান্তরিত হয়। এখানেই তালমুডের লেখাগুলি পূর্ণ আকারে সংস্করণ করা হয়। যদিও রব্বিরা দাবি করেছিল যে তালমুড ঈশ্বরের ইচ্ছাকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করেছিল, তবুও বহু যিহূদীরা মনে করত যে রব্বিদের কর্তৃত্বের প্রভাব রয়েছে, মোশি এবং অন্যান্য ভাববাদীদের কাছে ঈশ্বর যে বাক্য দিয়েছিলেন, তার জন্য প্রত্যাশা করত।
সা.শ. অষ্টম শতাব্দীর শেষ দিকে বাবিলনের যিহূদীরা যারা রব্বিদের কর্তৃত্ব ও তাদের মৌখিক নিয়মের প্রতি বিশ্বাসকে বিরোধিতা করত, তারা একজন শিক্ষিত নেতা অ্যানন বেন ডেভিডের কথায় সাড়া দিয়েছিল। তিনি ঘোষণা করেছিলেন সত্য ধর্মকে পাওয়ার একমাত্র উপায় হল ইব্রীয় শাস্ত্রের অবারিত অধ্যয়ন যা প্রতিটি যিহূদীর অধিকার, রব্বিদের ব্যাখ্যা বা তালমুডের প্রতি কোন সম্মান প্রদর্শন না করেই করা যেতে পারে। অ্যানন শিখিয়েছিলেন: “তোরাহকে [ঈশ্বরের লিখিত আইন] পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসন্ধান কর এবং আমার মতামতের উপর নির্ভর কর না।” শাস্ত্রের উপর এমন জোর দেওয়ার ফলে আননের অনুগামীরা কারাইম নামে পরিচিত হয়, একটি ইব্রীয় নাম যার অর্থ দাঁড়ায় “পাঠকেরা।”
কারাইটদের এবং রব্বিদের দ্বন্দ্ব
এই কারাইটের শিক্ষার কিছু কিছু দৃষ্টান্ত কী যা রব্বিদের দলের মধ্যে বিস্ময় জাগিয়েছিল? রব্বিরা দুধ এবং মাংস একসঙ্গে খেতে নিষেধ করেছিল। তারা যাত্রাপুস্তক ২৩:১৯ পদের ব্যাখ্যাকে মৌখিক নিয়ম হিসাবে এটিকে তুলে ধরেছিল, যা বলে: “ছাগবৎসকে তাহার মাতার দুগ্ধে পাক করিও না।” অপরদিকে কারাইটরা শিক্ষা দিয়েছিল এই শাস্ত্রপদটি যা বলে, তার অর্থ ঠিক তাই—কমও নয় বা বেশিও নয়। তারা তর্ক করে যে রব্বিদের বাধানিষেধগুলি ছিল মানুষের সৃষ্টি।
দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৮, ৯ পদের ব্যাখ্যা অনুসারে রব্বিরা মনে করত যে যিহূদী পুরুষদের হাতে টেফিলিন অথবা মাদুলি জাতীয় ছোট চামড়ার বাক্স নিয়ে প্রার্থনা করতে হবে এবং প্রতিটি দরজায় একটি মেজুজা লাগান থাকবে।b কারাইটরা মনে করত যে এই শাস্ত্রপদগুলিতে শুধুমাত্র একটা রূপক এবং প্রতীক অর্থ রয়েছে, আর সেইজন্য তারা রব্বিদের এইধরনের নিয়মকানুনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
অন্যান্য বিষয়ে কারাইটরা রব্বিদের থেকে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যাত্রাপুস্তক ৩৫:৩ পদের বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করুন, যেটি পড়া হয়: “তোমরা বিশ্রামদিনে আপনাদের কোন বাসস্থানে অগ্নি জ্বালিও না।” কারাইটরা কোন প্রদীপ অথবা আগুন জ্বালতে নিষেধ করেছিল, এমনকি বিশ্রামদিনের আগেও জ্বালতে দিত না।
বিশেষ করে অ্যাননের মৃত্যুর পর কারাইট নেতারা প্রায়ই বিশেষ বিশেষ নিষেধাজ্ঞার প্রকৃতি এবং পরিমাপের উপর ভিন্নমত প্রকাশ করে এবং তাদের বার্তাও সবসময়ে স্পষ্ট ছিল না। কারাইটদের মধ্যে একতা ছিল না, কারণ তারা একক কোন নেতাকে স্বীকার করত না, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে শাস্ত্র পড়ার উপর এবং নিজেদের মত অর্থ করে নেওয়ার উপর জোর দিত, যা ছিল রব্বিদের প্রথাগত কর্তৃত্বের বিরোধী। যাইহোক, তৎসত্ত্বেও কারাইট আন্দোলন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এবং তার প্রভাব বাবিলনীয় যিহূদী সম্প্রদায়কে ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। একটি বড় ধরনের কারাইট কেন্দ্র যিরূশালেমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সা.শ. নবম ও দশম শতাব্দীতে কারাইট পণ্ডিতেরা ইব্রীয় ভাষাকে আরও গভীরভাবে পড়ার উপর মনোযোগ দেয় এবং এক স্বর্ণ যুগের অভিজ্ঞতা লাভ করে। তারা মনে করেছিল যে মৌখিক রীতিনীতি, নয় লিখিত ইব্রীয় শাস্ত্র হল পবিত্র। কিছু কারাইটরা ইব্রীয় শাস্ত্রের সূক্ষ্ম নকলনবিশ হয়ে উঠেছিল। বস্তুতপক্ষে, কারাইটদের আগ্রাহান্বিত কাজ যিহূদীদের মধ্যে ম্যাসোরেটিক পুঁথি বিশ্লেষণ করার স্পৃহা জাগিয়েছিল যার দরুন বর্তমান দিনের জন্য আরও নিখুঁত বাইবেল পুস্তক রক্ষা করার বন্দোবস্ত করেছে।
দ্রুত উন্নতির এই সময়কালে, যিহূদী ধর্মমত কারাইটরা খোলাখুলিভাবে অন্যান্য যিহূদীদের কাছে মিশনারীর কাজ চালিয়ে গিয়েছিল। এটা রব্বিদের যিহূদী ধর্মমতের উপর অবশ্যই একটা আঘাত এনেছিল।
রব্বিরা কিভাবে সাড়া দিয়েছিল?
প্রত্যুত্তরে রব্বিদের আক্রমণ ছিল মৌখিক, অত্যন্ত চতুরতার সাথে এবং নিজ উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য শিক্ষাকে পরিবর্তন করে। অ্যাননের আক্রমণের পরের শতাব্দীতে রব্বিদের যিহূদী ধর্মমত কারাইটের প্রণালী থেকে গ্রহণ করেছিল। কারাইটদের ধরন ও প্রণালী তাদের বাগ্মিতা অবলম্বন করে রব্বিরা শাস্ত্রপদকে উদ্ধৃত করতে আরও দক্ষ হয়ে উঠেছিল।
কারাইটদের সঙ্গে মৌখিক লড়াইয়ের এই উপলক্ষে অনুমোদিত নেতা ছিলেন সাদিয়া বেন যোসেফ, যিনি সা.শ. দশম শতাব্দীর প্রথমভাগে বাবিলনে যিহূদী সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে দাঁড়ান। সাদিয়ার বেশির ভাগ কাজ, বিশ্বাসের ও মতবাদের বই (ইংরাজি), ইংরাজিতে শমূয়েল রোসেনব্লাটের দ্বারা অনুবাদিত হয়, যিনি ভূমিকাতে বলেছিলেন: “এমনকি যদিও . . . তার দিনে তিনি ছিলেন তালমুডের উপরে কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি, তথাপি [সাদিয়া] অতি অল্পই যিহূদী রীতিনীতির উল্লেখ করেছিলেন, হয়ত এই কারণে যে তার ইচ্ছা ছিল যে কারাইটরা যেন তাদের নিজেদের অস্ত্র দ্বারা পরাজিত হয়, যারা লিখিত আইনকে শুধুমাত্র কার্যকারী বলে গ্রহণ করেছিল।”
সাদিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রব্বিদের যিহূদী প্রথা শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট আধিপত্য বিস্তার করে। এটা সম্পন্ন করে লিখিত আইনকে ততটা গ্রহণ করে, যতটা কারাইটদের যুক্তির শক্তিকে হরণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। শেষ আঘাতটি আসে মোশি মাইমোনাইডসের এর দ্বারা, যিনি ছিলেন ১২শ শতাব্দীর একজন উল্লেখযোগ্য তালমুড পণ্ডিত। কারাইটদের প্রতি তার ধৈর্যের মনোভাব দেখিয়ে, যাদের সাথে মিশরে বাস করতেন, আর সেইসঙ্গে তার দৃঢ় পাণ্ডিত্যের পদ্ধতির জন্য তিনি তাদের সম্মান অর্জন করেছিলেন এবং তাদের নিজেদের নেতাদের স্থানকে দুর্বল করে দিয়েছিলেন।
কারাইট আন্দোলন প্রেরণা হারিয়ে ফেলে
এখন একতা না থাকায় এবং সামঞ্জস্যের অভাবে কারাইটদের গতিবিধি তাদের প্রেরণা এবং অনুগামী উভয়কেই হারিয়ে ফেলে। সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে কারাইটরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং নীতিগুলি উভয়ই পরিবর্তন করেছিল। লিয়ন নিময়, কারাইট আন্দেলনের একজন লেখক, লেখেন: “যদিও তালমুড আক্ষরিকভাবে বাতিল হয়ে যায়, তবুও প্রচুর তালমুডের তথ্য ধীরে ধীরে কারাইটদের নিয়ম পালনে এবং প্রথায় ব্যবহার হতে শুরু হয়।” সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায় কারাইটরা তাদের আদি উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছিল এবং রব্বিদের ধর্মমত থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করেছিল।
এখনও ইস্রায়েলে প্রায় ২৫,০০০ কারাইট রয়েছে। আরও কয়েক হাজার অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে, বিশেষ করে রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। যাইহোক, তাদের নিজস্ব মৌখিক রীতিনীতি থাকায়, তারা প্রথম কারাইটদের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির।
কারাইটদের ইতিহাস থেকে আমরা কী শিখতে পারি? ‘পরম্পরাগত বিধির জন্য ঈশ্বরের বাক্যকে নিষ্ফল করা’ হল একটি গুরুতর অন্যায়। (মথি ১৫:৬) মানুষের তৈরি বোঝাস্বরূপ রীতিনীতির থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজন শাস্ত্রের বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান। (যোহন ৮:৩১, ৩২; ২ তীমথিয় ৩:১৬, ১৭) হ্যাঁ, যারা ঈশ্বরের অন্বেষণ করে এবং তাঁর ইচ্ছা পালন করতে চায়, তারা মানুষের রীতিনীতিতে নির্ভর করে না। পরিবর্তে তারা সূক্ষ্মভাবে বাইবেল পড়ে অনুসন্ধান করে এবং ঈশ্বরের অনুপ্রাণিত বাক্যের উপকারজনক উপদেশ জীবনে প্রয়োগ করে থাকে।
[পাদটীকাগুলো]
a তথাকথিত মৌখিক আইনের ব্যাখ্যা হিসাবে যুদ্ধবিহীন জগৎ কী আসবে?, নামক ব্রোশারটির ৮-১১ পৃষ্ঠা দেখুন, যা ওয়াচ টাওয়ার বাইবেল অ্যান্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটি অফ নিউ ইয়র্ক, ইনক. দ্বারা প্রকাশিত।
b টেফিলিন হল দুটি ছোট চারকোণা চামড়ার বাক্স, যার মধ্যে থাকত ছোট কাগজে লেখা শাস্ত্রপদগুলি। এই বাক্সগুলি ঐতিহ্যগতভাবে বাঁ হাতে এবং মাথায় পরা হত সাপ্তাহিক প্রার্থনার দিনগুলির সময়ে। মেজুজা হল একটি পার্চমেন্ট কাগজের লিপি যাতে দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৪-৯ এবং ১১:১৩-২১ পদ লেখা থাকত যেটি ছোট কৌটাতে করে দরজার খুঁটি লাগিয়ে রাখা হত।
[৩০ পৃষ্ঠার চিত্র]
ক্যারাইটদের একটি দল
[সজন্যে]
From the book The Jewish Encyclopedia, 1910