পারিবারিক জীবনে ঈশ্বরীয় শান্তি অনুধাবন করুন
“হে জাতিগণের গোষ্ঠী সকল, সদাপ্রভুর কীর্ত্তন কর, সদাপ্রভুর গৌরব ও শক্তি কীর্ত্তন কর।”—গীতসংহিতা ৯৬:৭.
১. যিহোবা পারিবারিক জীবনকে কিধরনের সূচনা দিয়েছিলেন?
যখন তিনি প্রথম পুরুষ ও প্রথম নারীকে বিবাহে একত্র করেছিলেন তখন যিহোবা পারিবারিক জীবনের এক শান্তিপূর্ণ ও সুখী সূচনা দিয়েছিলেন। বস্তুতপক্ষে, আদম এতই খুশি হয়েছিল যে সর্বপ্রথম নথিবদ্ধ কবিতায় সে তার আনন্দ এইভাবে প্রকাশ করেছিল: “এবার [হইয়াছে]; ইনি আমার অস্থির অস্থি ও মাংসের মাংস; ইহাঁর নাম নারী হইবে, কেননা ইনি নর হইতে গৃহীত হইয়াছেন।”—আদিপুস্তক ২:২৩.
২. তাঁর মনুষ্য সন্তানদের জন্য সুখ নিয়ে আসা ছাড়াও ঈশ্বরের মনে বিবাহ সম্বন্ধে আর কোন্ বিষয় ছিল?
২ যখন ঈশ্বর বিবাহ ও পারিবারিক ব্যবস্থা স্থাপন করেছিলেন তখন তাঁর মানব সন্তানদের জন্য কেবলমাত্র সুখ নিয়ে আসার চেয়েও তাঁর মনে আরও বেশি কিছু ছিল। তিনি চেয়েছিলেন যে তারা তাঁর ইচ্ছা পালন করবে। ঈশ্বর সেই প্রথম দম্পতিকে বলেছিলেন: “তোমরা প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হও, এবং পৃথিবী পরিপূর্ণ ও বশীভূত কর, আর সমুদ্রের মৎস্যগণের উপরে, আকাশের পক্ষিগণের উপরে, এবং ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় জীবজন্তুর উপরে কর্ত্তৃত্ব কর।” (আদিপুস্তক ১:২৮) সত্যই এক পুরস্কারজনক কার্যভার। আদম, হবা ও তাদের ভবিষ্যৎ সন্তানেরা কতই না সুখী হত যদি প্রথম বিবাহিত দম্পতিটি বাধ্যতার সাথে যিহোবার ইচ্ছা পালন করত!
৩. ঈশ্বরীয় ভক্তি অনুসারে জীবন যাপন করার জন্য পরিবারগুলির কিসের প্রয়োজন?
৩ এমনকি আজকেও, পরিবারগুলি সর্বাপেক্ষা সুখী হয় যখন তারা ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন করার জন্য একত্রে কাজ করে। আর কী উজ্জ্বল প্রত্যাশাগুলিই না এইপ্রকার পরিবারগুলির জন্য রয়েছে! প্রেরিত পৌল লিখেছিলেন: “শারীরিক দক্ষতার অভ্যাস অল্প বিষয়ে সুফলদায়ক হয়; কিন্তু ভক্তি সর্ব্ববিষয়ে সুফলদায়িকা, তাহা বর্ত্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতিজ্ঞাযুক্ত।” (১ তীমথিয় ৪:৮) যে পরিবারগুলি সত্য ঈশ্বরীয় ভক্তির সাথে জীবন যাপন করে তারা যিহোবার বাক্যের নীতিগুলি অনুসরণ করে ও তাঁর ইচ্ছা পালন করে। তারা ঈশ্বরীয় শান্তি অনুধাবন করে আর এইভাবে ‘বর্ত্তমান জীবনে’ সুখ খুঁজে পায়।
পারিবারিক জীবন বিপদগ্রস্ত
৪, ৫. কেন এটি বলা যেতে পারে যে এখন পৃথিবীব্যাপী পারিবারিক জীবন বিপদগ্রস্ত?
৪ স্বাভাবিকভাবেই, আমরা প্রত্যেক পরিবারে শান্তি ও সুখ খুঁজে পাই না। জনসংখ্যা পরিষদ নামক পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান কৃত এক গবেষণা সম্বন্ধে উল্লেখ করে দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়: “একইভাবে ধনী এবং দরিদ্র দেশগুলিতে পারিবারিক জীবনের কাঠামো গভীরভাবে পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা করে চলেছে।” এই গবেষণার এক লেখিকাকে এই বলে উদ্ধৃত করা হয়েছিল: “পরিবার একটি সুস্থির, সুসঙ্গতিপূর্ণ একক যেখানে বাবা অর্থ সরবরাহকারী হিসাবে ভূমিকা পালন করে থাকেন এবং মা আবেগগতভাবে দেখাশোনা করে থাকেন এই ধারণাটি মিথ্যা। বাস্তব বিষয়টি হচ্ছে এটি যে, পৃথিবীব্যাপী অবাঞ্ছিত মাতৃত্ব, বর্ধিত মাত্রায় বিবাহবিচ্ছেদ [এবং] ছোট পরিবারের প্রবণতা . . . দেখা যাচ্ছে।” এইধরনের প্রবণতার কারণে লক্ষ লক্ষ পরিবারগুলি সুস্থিরতা, শান্তি এবং সুখের অভাব ভোগ করছে এবং অনেক পরিবারগুলি ভেঙে যাচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর গত দশকের শুরু থেকে স্পেনে বিবাহবিচ্ছেদের মাত্রা ৮টি বিবাহের মধ্যে ১টিতে বৃদ্ধি পেয়েছে—শুধুমাত্র ২৫ বছর আগেও যেটি ছিল ১০০টি বিবাহের মধ্যে ১টি যা এক বৃহৎ পরিবর্তন। ইংল্যান্ড, ইউরোপের এক অন্যতম সর্বোচ্চ বিবাহবিচ্ছেদের হার সম্বন্ধে বিবৃতি দিয়েছিল—১০টি বিবাহের মধ্যে ৪টি ব্যর্থ। এছাড়া এই দেশ অসংখ্য একক-পিতামাতা পরিবারগুলির প্লাবনও প্রত্যক্ষ করেছে।
৫ এটি মনে হয় যে কিছু লোকেরা বিবাহবিচ্ছেদ পাওয়ার জন্য উন্মুখভাবে অপেক্ষা করে থাকে। জাপানে টোকিওর কাছে “বন্ধন বিচ্ছিন্ন মন্দির”-এ অনেক লোকেরা একত্র হয়ে থাকে। এই সিন্টো মন্দিরটি বিবাহবিচ্ছেদ এবং অন্যান্য অবাঞ্ছিত সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য আবেদন গ্রহণ করে। প্রত্যেক উপাসক তাদের প্রার্থনা একটি পাতলা কাঠের পাতে লেখে, সেটি সেই মন্দিরের চতুষ্পার্শ্বস্থ অঞ্চলে ঝোলায় ও উত্তরের জন্য প্রার্থনা করে থাকে। টোকিওর একটি সংবাদপত্র বলে প্রায় এক শতাব্দী আগে যখন মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছিল “স্থানীয় ধনী বণিকদের স্ত্রীরা এই বিষয়টি চেয়ে প্রার্থনা লিখেছিল যে, যেন তাদের স্বামীরা নিজেদের প্রেমিকাদের ছেড়ে তাদের কাছে ফিরে আসে।” কিন্তু, আজকে অধিকাংশ প্রার্থনা বিবাহবিচ্ছেদের জন্য, পুনরায় সম্মিলিত হওয়ার জন্য নয়। প্রশ্নাতীতভাবে পৃথিবীব্যাপী পারিবারিক জীবন বিপদগ্রস্ত। এটি কি খ্রীষ্টানদের আশ্চর্য করে? না, কারণ বাইবেল বর্তমান পারিবারিক সংকট সম্বন্ধে আমাদের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে থাকে।
পারিবারিক সংকট কেন?
৬. আজকে পারিবারিক সংকট ১ যোহন ৫:১৯ পদের সাথে কী সম্পর্ক রাখে?
৬ আজকের পারিবারিক সংকটের একটি কারণ হল: “সমস্ত জগৎ সেই পাপাত্মার মধ্যে শুইয়া রহিয়াছে।” (১ যোহন ৫:১৯) সেই দুষ্ট, শয়তান দিয়াবলের কাছ থেকে আমরা কী প্রত্যাশা করতে পারি? সে এক মন্দ, অনৈতিক মিথ্যাবাদী। (যোহন ৮:৪৪) এটি আশ্চর্যের বিষয় নয় যে তার জগৎ প্রতারণা ও অনৈতিকতার মধ্যে ডুবে থাকবে যা পারিবারিক জীবনের জন্য খুবই ধ্বংসাত্মক! ঈশ্বরের সংগঠনের বাইরে শয়তানের প্রভাব যিহোবার প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা বিবাহকে ধ্বংস করার জন্য ভীতি প্রদর্শন করে ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবনের শেষ নিয়ে আসে।
৭. এই শেষকালে অধিকাংশ লোকেরা যেমন প্রদর্শন করে থাকে সেই বৈশিষ্ট্যগুলি দ্বারা পরিবারগুলি কিভাবে প্রভাবিত হতে পারে?
৭ পারিবারিক সমস্যাগুলির আরেকটি কারণ যা এখন মানবজাতিকে আঘাত করে সেটি ২ তীমথিয় ৩:১-৫ পদে ইঙ্গিত করা হয়েছে। পৌলের ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বাক্যগুলি সেখানে লিপিবদ্ধ আছে যা দেখায় যে আমরা “শেষ কালে” বাস করছি। পরিবারগুলি শান্তিপূর্ণ ও সুখী হতে পারে না যদি তার সদস্যেরা “আত্মপ্রিয়, অর্থপ্রিয়, আত্মশ্লাঘী, অভিমানী, ধর্ম্মনিন্দক, পিতামাতার অবাধ্য, অকৃতজ্ঞ, অসাধু, স্নেহরহিত, ক্ষমাহীন, অপবাদক, অজিতেন্দ্রিয়, প্রচণ্ড, সদ্বিদ্বেষী, বিশ্বাসঘাতক, দুঃসাহসী, গর্ব্বান্ধ, ঈশ্বরপ্রিয় নয়, বরং বিলাসপ্রিয় . . . লোকে ভক্তির অবয়বধারী, কিন্তু তাহার শক্তি অস্বীকারকারী” হয়। একটি পরিবার সম্পূর্ণভাবে সুখী হতে পারে না এমনকি যদি এর সদস্যদের একজন স্নেহরহিত অথবা অসাধু হয়। পারিবারিক জীবন কতখানি শান্তিপূর্ণ হতে পারে যদি পরিবারের একজন প্রচণ্ড এবং কোন বিষয়ে একমত হওয়ার জন্য প্রস্তুত না হয়? এর চেয়ে আরও মন্দভাবে, কিভাবে শান্তি এবং সুখ থাকতে পারে যখন পরিবারের সদস্যেরা ঈশ্বরপ্রিয় না হয়ে বিলাসপ্রিয় হয়? এগুলিই হচ্ছে শয়তানের দ্বারা শাসিত এই জগতের লোকেদের বৈশিষ্ট্য। একেবারেই আশ্চর্যের বিষয় নয় যে পারিবারিক সুখ এই শেষকালে অনুপস্থিত!
৮, ৯. পারিবারিক সুখের উপর সন্তানদের ব্যবহারের কী প্রভাব থাকতে পারে?
৮ কেন অনেক পরিবারগুলিতে শান্তি ও সুখের অভাব আছে তার আরও একটি কারণ হচ্ছে সন্তানদের খারাপ আচরণ। যখন পৌল শেষকালের পরিস্থিতি সম্বন্ধে ভাববাণী করেছিলেন তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে অনেক সন্তানেরা পিতামাতার অবাধ্য হবে। যদি তুমি একজন যুবক ব্যক্তি হও তোমার ব্যবহার কি তোমার পরিবারকে শান্তিপূর্ণ ও সুখী করতে সাহায্য করে?
৯ কিছু সন্তানেরা তাদের ব্যবহারে উদাহরণযোগ্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি অল্পবয়স্ক ছেলে তার বাবাকে এই জঘন্য চিঠিটি লিখেছিল: “যদি তুমি আমাকে আলেকজান্দ্রিয়ায় নিয়ে না যাও, আমি তোমাকে চিঠি লিখব না, কথা বলব না অথবা বিদায় সম্ভাষণও জানাব না আর যদি তুমি আলেকজান্দ্রিয়ায় যাও আমি তোমার হাত ধরব না অথবা আর কখনও তোমাকে সম্ভাষিত করব না। এটাই ঘটবে যদি তুমি আমাকে না নিয়ে যাও . . . কিন্তু আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, আমার জন্য একটা [বীণা] পাঠিও। যদি না পাঠাও আমি খাব না আর জলও পান করব না। তুমি দেখো!” এটি কি অনেকখানি আধুনিক দিনের মত শোনায় না? একটি ছেলের তার বাবাকে দেওয়া এই চিঠিটি প্রায় ২০০০ বছর আগে প্রাচীন মিশরে লেখা হয়েছিল।
১০. কিভাবে অল্পবয়স্কেরা তাদের পরিবারগুলিকে ঈশ্বরীয় শান্তি অনুধাবন করতে সাহায্য করতে পারে?
১০ মিশরের অল্পবয়স্কদের মনোভাব পারিবারিক শান্তিকে উন্নীত করেনি। অবশ্যই, আরও বেশি গুরুতর বিষয়গুলি এই শেষকালের পরিবারগুলির মধ্যে ঘটে থাকে। তবুও, তোমরা, অল্পবয়স্কেরা তোমাদের পরিবারকে ঈশ্বরীয় শান্তি অনুধাবন করতে সাহায্য করতে পার। কিভাবে? বাইবেলের এই উপদেশটির বাধ্য হয়ে: “সন্তানেরা, তোমরা সর্ব্ববিষয়ে পিতামাতার আজ্ঞাবহ হও, কেননা তাহাই প্রভুতে তুষ্টিজনক।”—কলসীয় ৩:২০.
১১. যিহোবার বিশ্বস্ত সেবক হওয়ার জন্য বাবামায়েরা কিভাবে সন্তানদের সাহায্য করতে পারেন?
১১ বাবামা আপনাদের সম্বন্ধে কী? যিহোবার বিশ্বস্ত দাস হওয়ার জন্য প্রেমের সাথে আপনার সন্তানদের সাহায্য করুন। হিতোপদেশ ২২:৬ পদ বলে, “বালককে তাহার গন্তব্য পথানুরূপ শিক্ষা দেও, সে প্রাচীন হইলেও তাহা ছাড়িবে না।” বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় শিক্ষা ও বাবামার উত্তম উদাহরণের কারণে অনেক বালক ও বালিকারা, যখন তারা বয়স্ক হয় তখনও সেই সঠিক পথ থেকে সরে যায় না। কিন্তু অনেকখানি নির্ভর করে বাইবেল প্রশিক্ষণের গুণগতমান ও প্রসারতার উপর এবং সেই অল্পবয়স্কের হৃদয়ের উপর।
১২. কেন একটি খ্রীষ্টীয় গৃহ শান্তিপূর্ণ হওয়া উচিত?
১২ যদি আমাদের পরিবারের সমস্ত সদস্য যিহোবার ইচ্ছা পালন করার জন্য চেষ্টা করে, তাহলে আমাদের অবশ্যই ঈশ্বরীয় শান্তি উপভোগ করা উচিত। একটি খ্রীষ্টীয় গৃহ ‘শান্তির সন্তানদের’ দ্বারা পরিপূর্ণ হওয়া উচিত। লূক ১০:১-৬ পদ দেখায় যে যীশুর মনে এইধরনের লোকেদের বিষয়টি ছিল যখন তিনি ৭০ জন শিষ্যকে পরিচর্যার জন্য পাঠিয়েছিলেন এবং তাদের বলেছিলেন: “আর যে কোন বাটীতে প্রবেশ করিবে, প্রথমে বলিও, এই গৃহে শান্তি বর্ত্তুক। আর তথায় যদি শান্তির সন্তান থাকে, তবে তোমাদের শান্তি তাহার উপরে অবস্থিতি করিবে।” যিহোবার সেবকেরা শান্তিপূর্ণভাবে “সন্ধির সুসমাচার” গৃহ থেকে গৃহে নিয়ে যাওয়ার সময় শান্তির সন্তানদের অন্বেষণ করে। (প্রেরিত ১০:৩৪-৩৬; ইফিষীয় ২:১৩-১৮) নিশ্চিতভাবেই, যে খ্রীষ্টীয় পরিবার শান্তির সন্তানদের দ্বারা গঠিত সেটি শান্তিপূর্ণ হওয়া উচিত।
১৩, ১৪. (ক) রূৎ ও অর্পার জন্য নয়মী কী আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন? (খ) একটি খ্রীষ্টীয় গৃহের কিধরনের বিশ্রামস্থান হওয়া উচিত?
১৩ একটি গৃহ শান্তি ও বিশ্রামের স্থান হওয়া উচিত। বয়স্কা বিধবা নয়মী আশা করেছিলেন যে ঈশ্বর তার যুবতী বিধবা পুত্রবধূ, রূৎ ও অর্পাকে বিশ্রাম ও সান্ত্বনা দেবেন যা এক উত্তম স্বামী ও ঘর থাকার দ্বারা পাওয়া যায়। নয়মী বলেছিলেন: “তোমরা উভয়ে যেন স্বামীর বাটীতে বিশ্রাম পাও, সদাপ্রভু তোমাদিগকে এই বর দিউন।” (রূতের বিবরণ ১:৯) নয়মীর ইচ্ছা সম্বন্ধে একজন বিশেষজ্ঞ লিখেছিলেন এইধরনের গৃহে রূৎ ও অর্পা “অশান্ত অবস্থা ও উদ্বেগ থেকে মুক্তি খুঁজে পেত। তারা বিশ্রাম পেত। এটি একটি স্থান যেখানে তারা বাস করতে পারত আর যেখানে তাদের কোমলতম অনুভূতিগুলি এবং সর্বাপেক্ষা সম্মানজনক আকাঙ্ক্ষাগুলির পরিতৃপ্তি এবং স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পেত। স্বাতন্ত্র্যসূচক ইব্রীয় তাৎপর্য . . . উত্তমভাবে [যিশাইয় ৩২:১৭, ১৮ পদের] সম্বন্ধযুক্ত অভিব্যক্তিগুলির বিন্যাস দ্বারা দেখান হয়েছে।”
১৪ যিশাইয় ৩২:১৭, ১৮ পদের এই উক্তিটির প্রতি দয়া করে লক্ষ্য করুন। সেখানে আমরা পড়ি: “শান্তিই ধার্ম্মিকতার কার্য্য হইবে, এবং চিরকালের জন্য সুস্থিরতা ও নিঃশঙ্কতা ধার্ম্মিকতার ফল হইবে। আর আমার প্রজাগণ শান্তির আশ্রমে, নিঃশঙ্কতার আবাসে ও নিশ্চিন্ততার বিশ্রাম-স্থানে বাস করিবে।” একটি খ্রীষ্টীয় গৃহ ধার্মিকতা, সুস্থিরতা, নিঃশঙ্কতা ও ঈশ্বরীয় শান্তির এক বিশ্রাম-স্থান হওয়া উচিত। কিন্তু যদি পরীক্ষা, মতভেদ অথবা অন্যান্য সমস্যাগুলি উত্থাপিত হয়? তখন আমাদের বিশেষভাবে পারিবারিক সুখের রহস্য সম্বন্ধে জানা প্রয়োজন।
চারটি অত্যাবশ্যকীয় নীতি
১৫. পারিবারিক সুখের রহস্যকে আপনি কিভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
১৫ পৃথিবীর সমস্ত পরিবার, পরিবারের উদ্যোক্তা যিহোবা ঈশ্বরের কাছে থেকে তাদের নাম পেয়েছে। (ইফিষীয় ৩:১৪, ১৫) সুতরাং যারা পারিবারিক সুখের জন্য আকাঙ্ক্ষী, তাদের তাঁর পরিচালনার অন্বেষণ করা ও তাঁর প্রশংসা করা উচিত যেমন গীতরচক করেছিলেন: “হে জাতিগণের গোষ্ঠী সকল, সদাপ্রভুর কীর্ত্তন কর, সদাপ্রভুর গৌরব ও শক্তি কীর্ত্তন কর।” (গীতসংহিতা ৯৬:৭) পারিবারিক সুখের রহস্য ঈশ্বরের বাক্য, বাইবেলের পৃষ্ঠাগুলিতে এবং এর নীতিগুলি প্রয়োগ করার মধ্যে সুপ্ত আছে। যে পরিবার এই নীতিগুলি প্রয়োগ করে সেটি সুখী হবে এবং ঈশ্বরীয় শান্তি উপভোগ করবে। আসুন আমরা এর মধ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করি।
১৬. পারিবারিক জীবনে আত্মসংযমের কোন্ ভূমিকা পালন করা উচিত?
১৬ এই নীতিগুলির মধ্যে একটি এই বিষয়টিতে কেন্দ্রীভূত: পারিবারিক জীবনে ঈশ্বরীয় শান্তির জন্য আত্মসংযম অত্যাবশ্যকীয়। রাজা শলোমন বলেছিলেন: “যে আপন আত্মা দমন না করে, সে এমন নগরের তুল্য, যাহা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, যাহার প্রাচীর নাই।” (হিতোপদেশ ২৫:২৮) আমাদের মনোভাবকে নিয়ন্ত্রিত করা—আত্মসংযম অনুশীলন করা—অত্যাবশ্যক যদি আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ও সুখী পারিবারিক জীবনের জন্য আকাঙ্ক্ষী হই। যদিও আমরা অসিদ্ধ, আমাদের আত্মসংযম অনুশীলন করা প্রয়োজন যেটি হল ঈশ্বরের পবিত্র আত্মার একটি ফল। (রোমীয় ৭:২১, ২২; গালাতীয় ৫:২২, ২৩) আত্মা আমাদের মধ্যে আত্মসংযম উৎপন্ন করবে যদি আমরা এই গুণটির জন্য প্রার্থনা করি, এটির সম্বন্ধে বাইবেলের পরামর্শ প্রয়োগ করি এবং অন্যান্যেরা যারা এটি প্রদর্শন করে তাদের সাথে মেলামেশা করি। এই বিষয়টি আমাদের ‘ব্যভিচার হইতে পালায়ন করতে’ সাহায্য করবে। (১ করিন্থীয় ৬:১৮) এছাড়াও আত্মসংযম আমাদের দৌরাত্ম্য পরিত্যাগ করতে, মদের ব্যবহারকে এড়াতে বা অতিক্রম করতে এবং কঠিন পরিস্থিতিতে আরও শান্তভাবে আচরণ করতে সাহায্য করবে।
১৭, ১৮. (ক) খ্রীষ্টীয় পারিবারিক জীবনে ১ করিন্থীয় ১১:৩ পদ কিভাবে প্রয়োগ করা যায়? (খ) মস্তকপদের প্রতি স্বীকৃতি কিভাবে একটি পরিবারে ঈশ্বরীয় শান্তি উন্নীত করে?
১৭ অপর একটি অত্যাবশ্যকীয় নীতি এইভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে: আমাদের পরিবারগুলিতে মস্তকপদের স্বীকৃতি আমাদের ঈশ্বরীয় শান্তি অনুধাবন করতে সাহায্য করবে। পৌল লিখেছিলেন: “আমার ইচ্ছা এই, যেন তোমরা জান যে, প্রত্যেক পুরুষের মস্তকস্বরূপ খ্রীষ্ট, এবং স্ত্রীর মস্তকস্বরূপ পুরুষ, আর খ্রীষ্টের মস্তকস্বরূপ ঈশ্বর।” (১ করিন্থীয় ১১:৩) এর অর্থ যে একজন পুরুষ পরিবারে নেতৃত্ব নেবেন, তার স্ত্রী নিষ্ঠার সাথে সহায়ক হবেন এবং সন্তানেরা বাধ্য হবে। (ইফিষীয় ৫:২২-২৫; ২৮-৩৩; ৬:১-৪) এইধরনের আচরণ পারিবারিক জীবনে ঈশ্বরীয় শান্তি উন্নীত করবে।
১৮ এক খ্রীষ্টীয় স্বামীর স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে শাস্ত্রীয় মস্তকপদ একনায়কত্ব নয়। সে অবশ্যই তার মস্তক যীশুকে অনুকরণ করবে। যদিও তিনি “সকলের উপরে উচ্চ মস্তক” ছিলেন যীশু ‘পরিচর্য্যা পাইতে আইসেন নাই, কিন্ত পরিচর্য্যা করিতে আসিয়াছিলেন।’ (ইফিষীয় ১:২২; মথি ২০:২৮) একইভাবে, একজন খ্রীষ্টীয় ব্যক্তি প্রেমপূর্ণভাবে তার মস্তকপদ অনুশীলন করবেন যা তাকে তার পরিবারের আগ্রহগুলির প্রতি উত্তমভাবে যত্ন নিতে সক্ষম করবে। আর নিশ্চিতভাবেই এক খ্রীষ্টীয় স্ত্রী তার স্বামীর সাথে সহযোগিতা করতে চাইবে। তার “সহকারিণী” ও “পরিপূরক” হিসাবে সে সেই গুণাবলি যোগাবে যা তার স্বামীর অভাব আছে আর এইভাবে তাকে প্রয়োজনীয় সমর্থন প্রদান করবে। (আদিপুস্তক ২:২০, NW; হিতোপদেশ ৩১:১০-৩১) মস্তকপদের যথার্থ অনুশীলন স্বামী ও স্ত্রীদের সাহায্য করবে একে অপরের সাথে সম্মানজনকভাবে ব্যবহার করতে ও সন্তানদের বাধ্য হতে পরিচালিত করতে। হ্যাঁ, মস্তকপদের প্রতি স্বীকৃতি পারিবারিক জীবনে ঈশ্বরীয় শান্তি উন্নীত করে।
১৯. পারিবারিক শান্তি ও সুখের জন্য উত্তম ভাববিনিময় কেন অপরিহার্য?
১৯ তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি এই বাক্যগুলির দ্বারা প্রকাশ করা যেতে পারে: পারিবারিক শান্তি ও সুখের জন্য উত্তম ভাববিনিময় অপরিহার্য। যাকোব ১:১৯ আমাদের বলে “তোমাদের প্রত্যেক জন শ্রবণে সত্বর, কথনে ধীর, ক্রোধে ধীর হউক।” পরিবারের সদস্যদের একে অপরকে শোনা ও পরস্পর কথা বলা প্রয়োজন কারণ পারিবারিক ভাববিনিময় দুটি মুখ বিশিষ্ট একটি রাস্তা। এমনকি আমরা যখন কিছু বলি তা যদি সত্যও হয় কিন্তু সেটি সম্ভবত ভালর পরিবর্তে বরং আরও অনেক বেশি ক্ষতি করবে যদি আমরা তা নিষ্ঠুর, গর্বিত অথবা অসংবেদনশীলভাবে বলি। আমাদের কথাবার্তা মর্যাদাপূর্ণ, “লবণে আস্বাদযুক্ত” হওয়া উচিত। (কলসীয় ৪:৬) যে পরিবারগুলি শাস্ত্রীয় নীতিগুলি অনুসরণ করে এবং উত্তম ভাববিনিময় বজায় রাখে তারা ঈশ্বরীয় শান্তি অনুধাবন করছে।
২০. কেন আপনি বলবেন যে পারিবারিক শান্তির জন্য প্রেম অপরিহার্য?
২০ চতুর্থ নীতিটি হল এইরকম: পারিবারিক শান্তি ও সুখের জন্য প্রেম অপরিহার্য। অনুরাগপূর্ণ প্রেম বিবাহে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এবং গভীর স্নেহ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গড়ে তোলা যেতে পারে। কিন্তু, এমনকি আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল যে এই প্রেম কি গ্রীক শব্দ আগাপে দ্বারা চিহ্নিত। এইপ্রকার প্রেম আমরা যিহোবা, যীশু এবং আমাদের প্রতিবেশীদের জন্য উৎপন্ন করতে পারি। (মথি ২২:৩৭-৩৯) ঈশ্বর মানবজাতির প্রতি এই প্রেম “আপনার একজাত পুত্ত্রকে . . . যেন, যে কেহ তাঁহাতে বিশ্বাস করে, সে বিনষ্ট না হয়, কিন্তু অনন্ত জীবন পায়,” দান করার দ্বারা দেখিয়েছিলেন। (যোহন ৩:১৬) এটি কতই না অপূর্ব বিষয় যে আমরা এই একই প্রকার প্রেম আমাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি প্রদর্শন করতে পারি! এই উন্নত প্রেম “সিদ্ধির যোগবন্ধন।” (কলসীয় ৩:১৪) এটি এক বিবাহিত দম্পতিকে একত্রে সম্মিলিত করে এবং তাদের একে অপরের ও তাদের সন্তানদের জন্য যা সর্বোত্তম তা করতে অনুপ্রাণিত করে। যখন সমস্যাগুলি দেখা দেয়, প্রেম তাদের বিষয়গুলি একতায় পরিচালনা করতে সাহায্য করে। আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি কারণ “প্রেম . . . স্বার্থ চেষ্টা করে না, . . . সকলই বহন করে, সকলই বিশ্বাস করে, সকলই প্রত্যাশা করে, সকলই ধৈর্য্যপূর্ব্বক সহ্য করে। প্রেম কখনও শেষ হয় না।” (১ করিন্থীয় ১৩:৪-৮) সত্যই সেই সমস্ত পরিবারগুলি সুখী যাদের একে অপরের জন্য প্রেম যিহোবার প্রতি প্রেম দ্বারা দৃঢ়সংবদ্ধ!
ঈশ্বরীয় শান্তি অনুধাবন করে চলুন
২১. সম্ভবত কী আপনার পরিবারের শান্তি ও সুখকে বৃদ্ধি করতে পারে?
২১ পূর্ববর্তী নীতিগুলি এবং অন্যান্য বিষয়গুলি যা বাইবেল থেকে নেওয়া হয়েছে, প্রকাশনাগুলিতে তার পরিলেখ দেওয়া হয়েছে যা যিহোবা “বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাস” এর মাধ্যমে দয়ার সাথে সরবরাহ করেছেন। (মথি ২৪:৪৫) উদাহরণস্বরূপ, এইধরনের তথ্য পারিবারিক সুখের রহস্য (ইংরাজি) নামক ১৯২-পৃষ্ঠার বইটিতে পাওয়া যায় যেটি ১৯৯৬/৯৭ সালে জগদ্ব্যাপী অনুষ্ঠিত যিহোবার সাক্ষীদের “ঈশ্বরীয় শান্তির বার্তাবাহকগণ” জেলা সম্মেলনে প্রকাশিত হয়েছিল। এইধরনের প্রকাশনা সহযোগে শাস্ত্র থেকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অধ্যয়নের ফলস্বরূপ অনেক উপকার আসতে পারে। (যিশাইয় ৪৮:১৭, ১৮) হ্যাঁ, শাস্ত্রীয় পরামর্শ প্রয়োগ করা সম্ভবত আপনার পরিবারের শান্তি ও সুখ বৃদ্ধি করবে।
২২. আমাদের পারিবারিক জীবনকে আমাদের কোন্ বিষয়ের প্রতি কেন্দ্রীভূত করা উচিত?
২২ যে পরিবারগুলি তাঁর ইচ্ছা পালন করে তাদের জন্য যিহোবা অপূর্ব জিনিসগুলি সঞ্চিত করে রেখেছেন এবং তিনি আমাদের প্রশংসা ও সেবার যোগ্য। (প্রকাশিত বাক্য ২১:১-৪) তাই আপনার পরিবার সত্য ঈশ্বরের উপাসনায় তার জীবন কেন্দ্রীভূত করুক। আর আমাদের প্রেমময় স্বর্গীয় পিতা, যিহোবা সুখী হওয়ার জন্য আপনাকে আশীর্বাদ করুন যখন আপনি পারিবারিক জীবনে ঈশ্বরীয় শান্তি অনুধাবন করে চলেছেন!
আপনি কিভাবে উত্তর দেবেন?
◻ পরিবারগুলিকে যদি ঈশ্বরীয় ভক্তি অনুসারে জীবনযাপন করতে হয় তাহলে কী প্রয়োজনীয়?
◻ আজকে কেন পারিবারিক সংকট আছে?
◻ পারিবারিক সুখের রহস্য কী?
◻ সেই নীতিগুলি কী যা পারিবারিক জীবনে শান্তি ও সুখ উন্নীত করতে আমাদের সাহায্য করবে?
[২৪ পৃষ্ঠার চিত্র]
উত্তম ভাববিনিময় পারিবারিক জীবনে আমাদের ঈশ্বরীয় শান্তি অনুধাবন করতে সাহায্য করে