যুবক-যুবতীদের জিজ্ঞাস্য
যৌন নিপীড়ন সম্বন্ধে আমার কী জানা উচিত?—ভাগ ২: আঘাত থেকে সেরে ওঠা
নিজেকে দোষ দিয়ো না
যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে এমন অনেকেই নিজেকে মূল্যহীন বলে মনে করে আর এর জন্য তারা এমনকী নিজেকে দোষ দিয়ে থাকে। ১৯ বছর বয়সি ক্যারেনের কথাই চিন্তা করুন। ৬ থেকে ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। সে বলে, “আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল নিজের দোষী মনোভাবের সঙ্গে লড়াই করা। আমি ভাবি, ‘এত বছর ধরে কেন আমি এগুলো ঘটতে দিলাম?’”
তোমারও যদি এইরকমটা মনে হয়, তা হলে নীচে দেওয়া বিষয়গুলো নিয়ে একটু চিন্তা করো:
ছোটো বাচ্চারা শারীরিক অথবা মানসিকভাবে যৌন সম্পর্ক করার জন্য প্রস্তুত নয়। যৌন সম্পর্কের মানে কী, তারা তা জানে না। তাই এমনটা বলা ভুল হবে যে, এই যৌন সম্পর্কতে তার সম্মতি ছিল। এর মানে হল, ছোটো বাচ্চাদের সঙ্গে যে-যৌন নিপীড়ন হয়, সেগুলোর জন্য সেই বাচ্চারা কোনোভাবেই দায়ী নয়।
বাচ্চারা সবসময় বড়োদের বিশ্বাস করে আর তাই খারাপ লোকদের নোংরা কাজগুলো তারা ধরতে পারে না। এর ফলে খুব সহজেই বাচ্চারা তাদের কবলে পড়ে যায়। The Right to Innocence নামের বইটি বলে, “শিশুধর্ষকরা অত্যন্ত চালাক হয় আর ছোটো বাচ্চারা তাদের এই চালাকির সামনে কিছুই করতে পারে না।”
কোনো বাচ্চার সঙ্গে যখন জোরাজুরি করা হয়, তখন এক পর্যায়ে তার মধ্যেও যৌন উত্তেজনা জেগে উঠতে পারে। আসলে আমাদের শরীরের গঠনই এমন যে, যখন কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় স্পর্শ করা হয়, তখন স্বাভবিকভাবেই শরীরে যৌন উত্তেজনা তৈরি হয়। এর মানে এই নয় যে, এই খারাপ ঘটনার জন্য কিছুটা হলেও তুমি দায়ী। তাই, যদি তোমার সঙ্গেও এমনটা হয়ে থাকে, তা হলে মনে রেখো এতে তোমার কোনো দোষ নেই।
পরামর্শ: যে-বয়সে তোমাকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছিল, সেই বয়সের কোনো বাচ্চাকে যদি তুমি চেনো, তা হলে তার কথা চিন্তা করো। এরপর নিজেকে জিজ্ঞেস করো, ‘যদি এই ছোট্টো বাচ্চাটার সঙ্গে এমন ধরনের খারাপ ঘটনা ঘটে, তা হলে এর জন্য কি তাকে দোষ দেওয়া ঠিক হবে?’
ক্যারেনও ঠিক এটাই করেছিল। সেই সময়ে সে তিনটে বাচ্চার দেখাশোনা করত। তাদের মধ্যে একজনের বয়স প্রায় ছয় বছর ছিল, যে-বয়সে ক্যারেনের সঙ্গে যৌন নিপীড়ন শুরু হয়েছিল। ক্যারেন বলে, “আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, এই বয়সের একটা বাচ্চা কতটা অসহায় হয় আর আমিও সেই সময় কতটা অসহায় ছিলাম।”
সত্যটা হল: তোমার সঙ্গে হওয়া খারাপ ঘটনার জন্য যৌন নিপীড়নকারীই দায়ী। বাইবেল বলে, “যে মন্দ কাজ করে, সে নিজেই নিজের মন্দ কাজের ফল ভোগ করবে”—যিহিষ্কেল ১৮:২০.
মনের কথা কাউকে খুলে বলো
তোমার সঙ্গে যা-কিছু ঘটেছে, সেই বিষয়ে প্রাপ্তবয়স্ক কারো সঙ্গে কথা বলো, যার উপর তুমি আস্থা রাখতে পারো। এতে তোমার মন কিছুটা হালকা হবে। বাইবেল বলে, “প্রকৃত বন্ধু সবসময় ভালোবাসা দেখায় আর সে বিপদের সময়ে নিজের ভাই বলে প্রমাণিত হয়।”—হিতোপদেশ ১৭:১৭.
তোমার হয়তো মনে হতে পারে, যা-কিছু ঘটেছে সেই বিষয়ে কারো সঙ্গে কথা না বলাই ভালো। কাউকে কিছু না বলা, এটা এমন এক দেওয়ালের মতো, যেটা তুমি তোমার চারপাশে দাঁড় করিয়েছো, যাতে তোমার কোনো আঘাত না লাগে। কিন্তু ভেবে দেখো, তুমি যে-দেওয়াল তৈরি করেছ, সেটাই অন্যদের সাহায্য নিতে তোমাকে বাধা দেবে।
নিজের সুরক্ষার জন্য তুমি যে-দেওয়াল তৈরি করেছ, সেই দেওয়ালই অন্যদের সাহায্য নিতে তোমাকে বাধা দেবে
জেনেট নামের এক যুবতীর কথা চিন্তা করো। তার সঙ্গে হওয়া যৌন নিপীড়নের বিষয়ে সে যখন তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে, তখন তার মন অনেকটা হালকা হয়ে যায়। সে বলে, “খুব অল্প বয়সেই আমি যৌন নিপীড়নের শিকার হই। সেই ব্যক্তি আমার কাছের লোকই ছিল এবং অনেক বছর ধরে এই ঘটনার বিষয়ে আমি কাউকে কিছু বলিনি। একদিন আমি মাকে সবকিছু খুলে বলি। আমার মনে হয়েছিল যেন আমার কাঁধ থেকে কোনো এক ভারি বোঝা নেমে গিয়েছে।”
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেট বুঝতে পারে যে, কেনো কেউ কেউ এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে চায় না। সে বলে, “যৌন নিপীড়নের বিষয়ে কথা বলা খুবই অস্বস্তিকর। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি, আমার মনের মধ্যে এই বিষয়টা পুষে রাখা আমার জন্য অনেক ক্ষতি নিয়ে এসেছে। ভালো হত, যদি আমি আরও আগে এই বিষয় নিয়ে কারো সঙ্গে কথা বলতাম।”
‘সুস্থ হওয়ার সময়’
যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার ফলে, নিজের সম্বন্ধে তোমার হয়তো এক ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তুমি হয়তো ভাবতে পারো, তুমি আর কাউকে ভালোবাসার বা কারো কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নও। এখন তোমার কোনো মূল্যই নেই আর তুমি শুধু অন্যের যৌন চাহিদা মেটানোর জন্যই বেঁচে আছ। তবে, এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসো কারণ এখন তোমার ‘সুস্থ হওয়ার সময়।’ (উপদেশক ৩:৩) সুস্থ হওয়া বা আঘাত থেকে সেরে ওঠার জন্য তুমি কী কী করতে পারো?
বাইবেল অধ্যয়ন। বাইবেলে ঈশ্বরের নির্দেশনা রয়েছে, ‘এগুলো এমন শক্তিশালী অস্ত্র, যেগুলো … দূর্গের মতো দৃঢ় বিষয়গুলো ভেঙে ফেলতে পারে।’ (২ করিন্থীয় ১০:৪, ৫) তাই, তোমার নিজের সম্বন্ধে ভুল ধারণাগুলো দূর্গের মতো দৃঢ় হলেও, সেটা ভেঙে ফেলার ক্ষমতা বাইবেলের রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নীচে দেওয়া শাস্ত্রপদগুলো পড়ো এবং সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করো: যিশাইয় ৪১:১০; যিরমিয় ৩১:৩; মালাখি ৩:১৬, ১৭; লূক ১২:৬, ৭; ১ যোহন ৩:১৯, ২০.
প্রার্থনা। তোমার যখন নিজেকে খুব দোষী বলে মনে হবে বা এমনটা মনে হবে যে, তোমার কোনো মূল্যই নেই, তখন তুমি প্রার্থনায় ‘যিহোবার উপর তোমার বোঝা ফেলে দিয়ো।’ (গীতসংহিতা ৫৫:২২) কখনো নিজেকে একা বলে মনে কোরো না!
মণ্ডলীর প্রাচীনেরা। এই ভাইয়েরা হল, “বাতাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জায়গার মতো, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে লুকোনোর জায়গার মতো।” (যিশাইয় ৩২:২) প্রাচীনেরা তোমাকে নিজের বিষয়ে এক সঠিক মনোভাব রাখতে এবং অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তোমাকে সামনে এগিয়ে চলতে সাহায্য করবে।
উত্তম মেলামেশা। উদাহরণযোগ্য ভাই-বোনদের সঙ্গে মেলামেশা করো। একে অন্যের সঙ্গে তারা কীভাবে আচরণ করে, তা লক্ষ করো। একসময় তুমি বুঝতে পারবে, সবাই খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে মেলামেশা করে না আর যারা তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে, তারা কখনো তোমার সঙ্গে নোংরা আচরণ করবে না।
তানিয়া নামের এক কিশোরী ঠিক এটাই বুঝতে পেরেছিল। খুব ছোটোবেলা থেকেই সে বেশ কয়েক জন পুরুষের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। সে বলে, “আমার কাছের মানুষগুলোই আমার সঙ্গে নোংরা আচরণ করেছিল।” কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তানিয়া বুঝতে পেরেছিল এমন লোকেরাও আছে, যারা সত্যিকার অর্থেই ভালোবাসে। কীভাবে সে তা বুঝতে পারে?
তানিয়া যখন খ্রিস্টান হিসেবে উদাহরণযোগ্য এক দম্পতির সঙ্গে সময় কাটায়, তখন পুরুষদের সম্বন্ধে তার ধারণাটা বদলে যায়। সে বলে, “সেই ভাই তার স্ত্রীর সঙ্গে যেভাবে আচরণ করেন, তা দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, সব পুরুষই দুর্ব্যবহারকারী হয় না। তিনি তার স্ত্রীর যত্ন নিতেন আর তার নিরাপত্তার বিষয়েও খেয়াল রাখতেন, ঠিক যেভাবে যিহোবা স্বামীদের কাছ থেকে আশা করেন।”a—ইফিষীয় ৫:২৮, ২৯.
a তোমার মধ্যে যদি এই ধরনের লক্ষণগুলো দেখা যায়, যেমন: ডিপ্রেশন,.খাবারে অনীহা বা অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা (ইটিং ডিসঅর্ডার), নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা, মাদকের নেশা, ঘুমের সমস্যা (স্লিপ ডিসঅর্ডার) অথবা আত্মহত্যার প্রবণতা, তা হলে কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাও।