পরিবারের জন্য সাহায্য | সন্তান লালনপালন
বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ সন্তানদের উপর কেমন প্রভাব ফেলে?
যে-দম্পতিরা একে অপরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না, তারা মনে করে বিবাহবিচ্ছেদ করলে সন্তানেরা আরও ভালো এক পরিবেশে বড়ো হয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু, সত্যটা কী?
বিবাহবিচ্ছেদ সন্তানদের উপর কোন প্রভাব ফেলে?
গবেষণা দেখায় যে, বিবাহবিচ্ছেদ সন্তানদের উপর এক মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যে-সন্তানদের বাবা-মা বিবাহবিচ্ছেদ করে, সেই সন্তানেরা:
রাগ, উদ্বিগ্নতা ও হতাশায় ভোগে
এমন আচরণ করে যার ফলে অন্যদের এবং তাদের নিজেদের ক্ষতি হয়
ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারে না অথবা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়
সহজেই অসুস্থ হয়ে যায়
এ ছাড়া, অনেক সন্তান তাদের বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের জন্য নিজেদের দোষ দেয়। তারা মনে করে, তাদের কারণেই এমনটা হয়েছে অথবা তারা এটা আটকাতে পারত।
যে-সন্তানদের বাবা-মা বিবাহবিচ্ছেদ করে, সেই সন্তানেরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও বিভিন্ন সমস্যায় ভোগে। যেমন, তারা নিজেদের মূল্যহীন বলে মনে করে এবং কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। এ ছাড়া, পরবর্তী সময়ে তাদের বিবাহিত জীবনে যখন সমস্যা দেখা দেয়, তখন তারাও বিবাহবিচ্ছেদ করতে চায়।
মূল কথা: যারা বিবাহবিচ্ছেদ করার কথা ভাবছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করে, এটা তাদের সন্তানদের জন্যই ভালো হবে। কিন্তু, গবেষকেরা এই বিষয়টাকে সমর্থন করে না। চাইল্ডকেয়ার এক্সপার্ট পেনেলোপ লিচ লিখেছেন, “বিবাহবিচ্ছেদ সন্তানদের জীবনকে একেবারে এলোমেলো করে দেয়।”a
বাইবেলের নীতি: “কেবল নিজেদের বিষয়ে চিন্তা কোরো না, কিন্তু অন্যের প্রতিও চিন্তা দেখাও।”—ফিলিপীয় ২:৪.
বিবাহবিচ্ছেদ করলে আমার সন্তান কি ভালো থাকবে?
এর উত্তরে কিছু লোক হয়তো হ্যাঁ বলবে। কিন্তু মনে রাখবেন, বাবা-মায়ের চাহিদা এবং সন্তানের চাহিদা সাধারণত এক হয় না। যিনি বিবাহবিচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তিনি একটা নতুন জীবন শুরু করতে চান। অন্যদিকে, একজন সন্তান সাধারণত তার বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকতে চায়।
হাজার হাজার বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে গবেষণা করার পর দ্যা আনএক্সপেক্টেড লিগেসি অভ্ ডিভোর্স বইয়ের লেখিকারা লিখেছেন: “একটা বিষয় স্পষ্ট যে, সন্তানেরা কখনো বলে না, তারা ভালো আছে। এর পরিবর্তে তারা বলে, ‘যে-দিন আমার বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়, সেই দিন থেকে আমার জীবনটা একেবারে তছনছ হয়ে যায়।’” এই বইয়ে আরও লেখা আছে, সেই সন্তানদের কাছে “এই জগৎ এমন এক জায়গা হয়ে ওঠে, যেখানে তারা নিরাপদ বোধ করে না, কারণ তাদের জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর উপর তারা ভরসা করতে পারে না।”
মূল কথা: বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানেরা কখনোই ভালো থাকে না।
বাইবেলের নীতি: “চূর্ণবিচূর্ণ হওয়া মন শক্তি শুষে নেয়।”—হিতোপদেশ ১৭:২২.
যৌথভাবে সন্তানের লালনপালন করার বিষয়ে আমার কী জানা উচিত?
কিছু বাবা-মা বিবাহবিচ্ছেদের পর তাদের সন্তানকে যৌথভাবে মানুষ করে তোলার চেষ্টা করে এবং এটা চিন্তা করে, তারা বাবা-মা হিসেবে সমানভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবে। তবে, যৌথভাবে সন্তান মানুষ করে তোলা সহজ নয়। গবেষণা দেখায় যে, বাবা-মায়েরা তাদের বিবাহবিচ্ছেদের পর:
সন্তানদের সঙ্গে কম সময় কাটায়।
দু-জন দু-রকম শিক্ষা দেয়।
নিজেদের দোষী মনে করে বা অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে সন্তানদের নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করতে দেয়।
যে-সন্তানদের বাবা-মা বিবাহবিচ্ছেদ করে, সেই সন্তানেরা তাদের বাবা-মায়ের কথা শোনার কোনো প্রয়োজন মনে করে না। তারা মনে করে, বাবা-মায়েরা একসঙ্গে থাকার যে-প্রতিজ্ঞা করেছিল, সেটা তারা নিজেরাই রাখতে পারেনি। তাই তারা বলে, ‘কেন আমি তাদের কথা শুনব?’
মূল কথা: বিবাহবিচ্ছেদের পর যৌথভাবে সন্তানদের মানুষ করে তোলা বাবা-মায়েদের পক্ষে কঠিন। কিন্তু, সন্তানদের জন্য এইরকম পরিস্থিতি আরও বেশি কঠিন।
বাইবেলের নীতি: “তোমরা নিজ নিজ সন্তানদের বিরক্ত করে তুলো না, নতুবা তারা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বে।”—কলসীয় ৩:২১, পাদটীকা।
বিবাহিত জীবনে আসা সমস্যাগুলোর সঙ্গে কি আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করা যায়?
বিবাহবিচ্ছেদের পর একটা নতুন জীবন শুরু করার জন্য অনেক প্রচেষ্টা করতে হয়। কিন্তু, দম্পতিরা যদি তাদের বিয়েকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই প্রচেষ্টা করে, তা হলে সেটা কতই-না ভালো হবে! দ্যা কেস ফর ম্যারেজ নামক বইটি বলে: “দম্পতিদের মধ্যে যদি সমস্যা লেগেই থাকে, তা হলে এর মানে এই নয় যে, তাদের সম্পর্ক কখনোই ঠিক হবে না। বিবাহিত জীবনে সমস্যা দেখা দিয়েছিল এমন দম্পতিদের সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবারও ঠিক হয়েছে, কারণ তারা বিবাহবিচ্ছেদ না করে তাদের বিয়েকে টিকিয়ে রেখেছে।” তাই এটা স্পষ্ট যে, বাবা-মায়েরা যখন একসঙ্গে থাকে, তখন সন্তানদের জীবন সবচেয়ে বেশি আনন্দের হয়।
কিন্তু, এর মানে এই নয় যে, স্বামী-স্ত্রীরা কখনোই বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারবে না। আসলে বাইবেল শুধুমাত্র সেইসময় বিবাহবিচ্ছেদ করার অনুমতি দেয়, যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেউ যৌন অনৈতিকতা করে। (মথি ১৯:৯) তবে, বাইবেল এও বলে, “সতর্ক ব্যক্তি প্রতিটা পদক্ষেপের আগে চিন্তা করে।” (হিতোপদেশ ১৪:১৫) বিবাহবিচ্ছেদ করার আগে স্বামী-স্ত্রীদের সমস্ত দিক নিয়ে চিন্তা করা উচিত। এর অন্তর্ভুক্ত হল তাদের বিবাহবিচ্ছেদ সন্তানদের উপর কেমন প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও চিন্তা করা।
তবে, বিবাহিত দম্পতিদের শুধু একসঙ্গে থাকাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে আরও কিছু জড়িত রয়েছে। বাইবেল স্বামী-স্ত্রীদের জন্য সবচেয়ে উত্তম পরামর্শ দিয়ে থাকে। এই পরামর্শ তাদের নিজেদের মধ্যে এমন গুণাবলি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে, যার ফলে তারা কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরতে এবং সুখী হতে পারবে। আর এটা কোনো অবাক করার মতো বিষয় নয়, কারণ যিহোবা বাইবেল লিখিয়েছেন, যিনি হলেন বিয়ের উদ্যোক্তা।—মথি ১৯:৪-৬.
বাইবেলের নীতি: “আমি যিহোবা, তোমার ঈশ্বর, আমি তোমার উপকারের জন্য তোমাকে শিক্ষা দিই।”—যিশাইয় ৪৮:১৭.
a Your Growing Child—From Babyhood Through Adolescence শিরোনামের বই থেকে নেওয়া হয়েছে।