সন্তানেরা হল “যিহোবার কাছ থেকে পাওয়া উপহার”
“উপহার” শব্দটা শুনলে আপনার মনে কোন ছবি ভেসে ওঠে? আপনার মনে হয়তো টাকাপয়সা, বিষয়সম্পত্তি অথবা কোনো মূল্যবান জিনিসের কথা ভেসে উঠবে, যেটা হয়তো আপনি আপনার পরিবারের কোনো সদস্যের কাছ থেকে পেয়েছেন। উপহার যেরকমই হোক না কেন, সেটা মূল্যবান এবং আপনি অবশ্যই সেটার যত্ন নেবেন।
বাইবেল বলে, সন্তানেরা হল “যিহোবার কাছ থেকে পাওয়া উপহার।” (গীত. ১২৭:৩, NW) যে-সমস্ত বাবা-মা যিহোবাকে ভালোবাসে, তারা তাদের সন্তানকে যিহোবার কাছ থেকে পাওয়া উপহার বলে মনে করে। তারা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে, যেন তাদের সন্তানেরা সুস্থ থাকে, আনন্দে থাকে এবং তারা যেন যিহোবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠতে পারে।
দুঃখের বিষয় হল বর্তমানে অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া একটা উপহার হিসেবে দেখে না। (যিশা. ৪৯:১৫; ২ তীম. ৩:১-৩) আবার অন্যেরা হয়তো আন্তরিকভাবে তাদের সন্তানদের যত্ন নিতে চায়, কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার কারণে তারা সেটা করে উঠতে পারে না। কোন সমস্যাগুলোর জন্য একজন বাবা-মায়ের পক্ষে তাদের সন্তানদের যত্ন নেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে? যিহোবা বাবা-মায়েদের কাছ থেকে কী আশা করেন? আর কীভাবে খ্রিস্টান বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের বড়ো করে তোলার ক্ষেত্রে সফল হতে পারে?
সমস্যাগুলো
সমাজ এবং পরিবারের চাপ। পৃথিবীতে এমন কিছু এলাকা রয়েছে, যেখানে বাবা-মায়েদের যদি একাধিক সন্তান থাকে, তা হলে সমাজ তাদের অনেক সম্মানের চোখে দেখে। তাই, ব্যক্তিগতভাবে দম্পতিরা বেশি সন্তানের জন্ম দিতে না চাইলেও, পরিবার এবং প্রতিবেশীরা তাদের এই বিষয়ে চাপ দিয়ে থাকে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা। পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে অপুষ্টি, রোগ এবং যথেষ্ট ডাক্তার বা হাসপাতাল না থাকার কারণে শিশুদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। তাই, অনেক দম্পতি সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাদের যেন একাধিক সন্তান থাকে যাতে তাদের মধ্যে কয়েকজন অন্তত বাঁচতে পারে। আবার অন্যদিকে কিছু দম্পতি একাধিক সন্তানের জন্ম দিতে চায়, যাতে বয়সকালে তাদের সন্তানেরা তাদের দেখাশোনা করতে পারে। এটা বিশেষভাবে সেই সব দেশে দেখা যায়, যেখানে বৃদ্ধদের আর্থিকভাবে সাহায্য করার জন্য কোনো সরকারি ব্যবস্থা নেই।
পরিবার পরিকল্পনা। এমন কিছু জায়গাও আছে, যেখানে সেই সমস্ত ওষুধপত্র খুবই কম পাওয়া যায়, যেগুলো দম্পতিরা গর্ভধারণ প্রতিরোধ করার জন্য ব্যবহার করতে পারে। অন্যেরা আবার নিম্নমানের ওষুধের (পিল্স) সাইড এফেক্টের কথা ভেবে এগুলো খেতে ভয় পায়। আবার অনেকে এইসব ওষুধপত্রের অতিরিক্ত দামের জন্য এগুলো কিনতে পারে না।a
যিহোবা বাবা-মায়েদের কাছ থেকে কী আশা করেন?
আপনার প্রত্যেক সন্তানের সঙ্গে আলাদা করে সময় কাটান
আপনার সন্তানের প্রয়োজনের বিষয়ে খেয়াল রাখুন। যিহোবা চান, বাবা-মায়েরা যেন তাদের নাবালক সন্তানদের বস্তুগত চাহিদাগুলো পূরণ করে। তিনি আশা করেন যে, বাবা-মায়েরা যেন কঠোর পরিশ্রম করে তাদের প্রতিটা সন্তানের জন্য খাবার, জামাকাপড় এবং থাকার ব্যবস্থা করে। যিহোবা এটাও চান বাবা-মায়েরা যেন, তাদের সন্তানদের পড়াশোনা শেখায়। তাই, খ্রিস্টান বাবা-মায়েরা শুধুমাত্র সন্তানদের বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়েই তাদের কর্তব্য পালন করে না। এর পরিবর্তে, তারা চায় যে, তাদের সন্তানেরা যেন বাড়িতেই বড়ো হয়ে ওঠে এবং এমন একটা প্রেমপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে থাকে, যেখানে তারা পড়াশোনা করতে পারবে, তাদের প্রতি যত্ন নেওয়া হবে এবং তারা নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারবে। এই ক্ষেত্রে, আমরা দেখি যে, যিহোবা খুবই যুক্তিবাদী। কেন আমরা তা বলতে পারি? কারণ, তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রের জন্য এমন একটা পরিবারকে বেছে নিয়েছিলেন, যেখানে তাঁর পুত্রের পার্থিব বাবা-মা খুবই পরিশ্রমী ছিলেন, কিন্তু তারা বস্তুগতভাবে ধনী ছিলেন না।—মথি ১৩:৫৫, ৫৬; লূক ২:২৪.
বাইবেলের নীতি: “কেউ যদি তার নিজ পরিবারের, বিশেষভাবে তার বাড়ির লোকদের ভরণ-পোষণ না জোগায়, তা হলে সে বিশ্বাস অস্বীকার করেছে এবং ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস নেই এমন লোকের চেয়েও মন্দ হয়ে গিয়েছে।”—১ তীম. ৫:৮.
যিহোবা বুঝতে পারেন যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়েদের কিছু সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়েদের যেন ঠিক মতো দেখাশোনা করা হয়, সেই ক্ষেত্রে আগে থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার দ্বারা সন্তানেরা বাবা-মায়েদের প্রতি তাদের সম্মান দেখাতে পারে। (যাত্রা. ২০:১২; ১ তীম. ৫:৪) কিন্তু, যিহোবা অনেক খুশি হন যখন তিনি দেখেন যে, বাবা-মায়েরা নিজেদের কথা বেশি না ভেবে এই বিষয়টার উপর মনোযোগ দিচ্ছে যে, তারা তাদের সন্তানদের কীভাবে দেখাশোনা করবে।—২ করি. ১২:১৪.
আপনার সন্তানদের যিহোবার বিষয়ে শিখতে সাহায্য করুন। খ্রিস্টান বাবা-মায়েদের এই দায়িত্ব রয়েছে, যেন তারা তাদের সন্তানদের যিহোবাকে ভালোবাসতে এবং তাঁর উপাসনা করতে সাহায্য করে। যিহোবার কাছে এটা হল, সন্তানদের বড়ো করে তোলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের দিতে পারে।—দ্বিতীয়. ৬:৬, ৭.
বাইবেলের নীতি: “যিহোবার শাসনে ও উপদেশে [তোমাদের সন্তানদের] মানুষ করে তোলো।”—ইফি. ৬:৪.
যিহোবা চান আপনারা যেন সফল হন
আগে থেকে আলোচনা করুন যে, আপনারা কত জন সন্তান নিতে চান
আগে থেকে পরিকল্পনা করুন। আপনি যদি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেন, তা হলে আগে থেকে আপনার পরিস্থিতির বিষয়ে ভালোভাবে চিন্তা করুন। উদাহরণ স্বরূপ, আপনার কি একাধিক সন্তানকে খাবার, জামাকাপড় এবং পড়াশোনা শেখানোর সামর্থ্য রয়েছে? যদি না থাকে, তা হলে আপনি আপনার সাথির সঙ্গে আলোচনা করুন যে, আপনারা আপনাদের পরিবারে কত জন সন্তানের ঠিক মতো দেখাশোনা করতে পারবেন, যাতে প্রতিটা সন্তানকে আপনারা যিহোবার শিক্ষায় বড়ো করে তুলতে পারেন। যিহোবা বোঝেন যে, জীবনে সবকিছু আগে থেকে পরিকল্পনা করা যায় না। (উপ. ৯:১১) কিন্তু, বাবা-মা হিসেবে সফল হওয়ার জন্য আপনারা যে-আন্তরিক প্রচেষ্টা করছেন, সেটার জন্য যিহোবা আপনাদের আশীর্বাদ করবেন।
বাইবেলের নীতি: “পরিশ্রমী ব্যক্তির পরিকল্পনা নিশ্চিতভাবেই সফল হবে, কিন্তু যে-সমস্ত ব্যক্তি তাড়াহুড়ো করে, তারা নিশ্চিতভাবেই গরিব হয়ে পড়বে।”—হিতো. ২১:৫, NW.
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি একটা দালান নির্মাণ করতে চায়, তা হলে সে কি প্রথমে বসে ব্যয় হিসাব করে দেখবে না যে, সেটা সম্পন্ন করার মতো যথেষ্ট টাকাপয়সা তার আছে কি না?”—লূক ১৪:২৮.
আপনার পরিবারে যিহোবাকে প্রথম স্থানে রাখুন। এটা লক্ষ রাখুন, আপনার পরিবারে যিহোবার উপাসনা যেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। আপনাদের যদি ইতিমধ্যেই সন্তান থাকে, তা হলে তাদের যিহোবাকে ভালোবাসতে সাহায্য করুন। মণ্ডলীর সভাগুলোতে মনোযোগ দিতে এবং সেখান থেকে শিখতে তাদের সাহায্য করুন। নিয়মিতভাবে প্রতি সপ্তাহে পারিবারিক উপাসনা করার একটা তালিকা বজায় রাখুন। আপনার সন্তানদের প্রচার করতে শেখান। বাবা-মা হিসেবে আপনাদের যে-দায়িত্ব রয়েছে, সেটা আপনাদের বড়ো ছেলে বা মেয়ের অথবা কোনো আত্মীয়ের উপর চাপিয়ে দেবেন না। আপনার সন্তানেরা যেন যিহোবাকে ভালোবাসে, সেটা শেখানোর জন্য সময় ও প্রচেষ্টার প্রয়োজন আর এটা করলে আপনারা প্রচুর আশীর্বাদ লাভ করবেন।
বাইবেলের নীতি: “আমার সন্তানেরা যে সত্যে চলছে, এই কথা শোনার চেয়ে বড়ো আনন্দ আমার আর নেই।”—৩ যোহন ৪.b
যিহোবার উপর নির্ভর করুন। আপনি হয়তো সন্তান নেওয়ার কথা ভাবছেন অথবা ইতিমধ্যেই আপনার সন্তান রয়েছে, যেটাই হোক না কেন, একটা বিষয়ে নিশ্চিত থাকবেন যে, স্থানীয় সংস্কৃতি বা রীতিনীতির চেয়ে যিহোবার মান মেনে চলা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানদের আধ্যাত্মিকভাবে সাহায্য করার জন্য সময় ও প্রচেষ্টার প্রয়োজন
আপনার যদি একাধিক সন্তান না-ও থাকে, তবুও আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, আপনার বৃদ্ধ বয়সে যা-কিছু প্রয়োজন, সেগুলো যিহোবা আপনাকে জোগাবেন। আপনার সন্তানদের একটা জমানো পুঁজি হিসেবে দেখবেন না, যেটা পরে গিয়ে তারা সুদসমেত আপনাকে ফেরত দেবে। এই ভয়টা পাবেন না যে, আপনার দেখাশোনা করার জন্য কেউ থাকবে না। যিহোবা আপনার যত্ন নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন এবং তিনি সবসময় তাঁর প্রতিজ্ঞা পূরণ করেন।—যিহো. ২৩:১৪.
বাইবেলের নীতি: “তুমি নিজের বুদ্ধির উপর নির্ভর কোরো না বরং সম্পূর্ণ হৃদয় দিয়ে যিহোবার উপর আস্থা রাখো। সমস্ত কাজ করার সময় তাঁর চিন্তাভাবনার বিষয়ে খেয়াল রেখো, তখন তিনি তোমাকে সঠিক পথ দেখাবেন।”—হিতো. ৩:৫, ৬, NW.
“একসময় আমি যুবক ছিলাম, এখন বৃদ্ধ হয়েছি, কিন্তু আমি কখনো দেখিনি, কোনো ধার্মিক ব্যক্তিকে পরিত্যাগ করা হয়েছে কিংবা তার সন্তানেরা রুটির জন্য ভিক্ষা করছে।”—গীত. ৩৭:২৫, NW.
“অতএব, তোমরা ঈশ্বরের রাজ্যকে এবং তাঁর দৃষ্টিতে যে-বিষয়গুলো সঠিক, সেগুলো করাকে সবসময় জীবনে প্রথম স্থান দাও, তা হলে এইসমস্ত বিষয়ও তোমাদের দেওয়া হবে।”—মথি ৬:৩৩.
সন্তানেরা হল যিহোবার কাছ থেকে পাওয়া একটা মূল্যবান উপহার, যাদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব তিনি বাবা-মায়েদের দিয়েছেন। খ্রিস্টান দম্পতিদের এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে দেখে যিহোবা কতই-না খুশি হন! তারা তাদের সন্তানদের জন্য শারীরিক, আবেগগত এবং আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণ করে; তারা পরিকল্পনা করে যে, তারা তাদের পরিবার কতটা ছোটো রাখবে, স্থানীয় সংস্কৃতি বা রীতিনীতির চেয়ে যিহোবার মানকে কীভাবে প্রথম স্থান দেবে। এগুলো করার মাধ্যমে খ্রিস্টান দম্পতিরা দেখায় যে, সন্তানেরা হল “যিহোবার কাছ থেকে পাওয়া উপহার।”
a কেবলমাত্র স্বামী ও স্ত্রী সিদ্ধান্ত নেবে যে, তারা কত জন সন্তান নেবে ও কখন নেবে এবং তারা কোনো ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করবে কি না। কারোরই তাদের এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে বিচার করা উচিত নয়। (রোমীয় ১৪:৪, ১০-১৩) এ ছাড়া, সমস্ত বিবাহিত খ্রিস্টানের ১ করিন্থীয় ৭:৩-৫ পদে দেওয়া পরামর্শ মনে রাখা উচিত।
b সত্য শেখানোর সময় যদিও যোহন এই পদে কিছু শিষ্যকে সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু যে-সমস্ত বাবা-মা যিহোবার উপাসনা করে, তারা অনায়াসে এই সন্তান শব্দটা নিজেদের সন্তানদের উপর প্রয়োগ করতে পারে।