জীবনকাহিনি
লাজুক হওয়া সত্ত্বেও আমি মিশনারি সেবা করতে পেরেছি
ছোটোবেলায় আমি লাজুক ছিলাম আর লোকদের সঙ্গে মেলামেশা করতে খুব ভয় পেতাম। কিন্তু, এমন একটা সময় আসে যখন মিশনারি হিসেবে যিহোবা আমাকে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে সাহায্য করেন। কিন্তু কীভাবে? প্রথম দিকে, আমার বাবা আমাকে খুব সাহায্য করেছিল। এরপর, একজন অল্পবয়সি বোনের উত্তম উদাহরণ আমাকে সত্যিই অনুপ্রাণিত করে। আর শেষে, আমার স্বামীর ধৈর্য এবং আমার সঙ্গে সদয়ভাবে কথা বলা, আমাকে সাহায্য করেছে। আসুন, আমার এই কাহিনি আমি আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই।
আমার জন্ম হয়, ১৯৫১ সালে অস্ট্রিয়ার শহর ভিয়েনাতে, একটা ক্যাথলিক পরিবারে। আমি খুব লাজুক ছিলাম, কিন্তু আমি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতাম এবং প্রায়ই তাঁর কাছে প্রার্থনা করতাম। আমার বয়স যখন নয় বছর, তখন আমার বাবা যিহোবার সাক্ষিদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করতে শুরু করে। তার কিছু দিন পরে, আমার মা-ও তার সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়নে যোগ দেয়।
আমার বোন এলিজাবেথের সঙ্গে (বাঁ-দিকে)
এর কিছু দিন পরে, আমরা ভিয়েনার ডুবলিন মণ্ডলীর অংশ হই। পরিবারগতভাবে আমরা অনেক কিছু একসঙ্গে করতাম। আমরা একসঙ্গে বাইবেল পড়তাম এবং অধ্যয়ন করতাম, একসঙ্গে সভায় যোগ দিতাম এবং সম্মেলনগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতাম। খুব ছোটোবেলা থেকে আমার বাবা আমার হৃদয়ে যিহোবার প্রতি গভীর ভালোবাসা গেঁথে দিয়েছিলেন। আমার বাবা প্রার্থনা করতেন যেন আমি এবং আমার বোন অগ্রগামী হতে পারি। কিন্তু, সেই সময় সেটা আমার লক্ষ্য ছিল না।
পূর্ণসময়ের সেবা শুরু করা
আমি ১৯৬৫ সালে, ১৪ বছর বয়সে বাপ্তিস্ম নিই। কিন্তু, ক্ষেত্রের পরিচর্যায় অপরিচিত লোকদের সঙ্গে কথা বলা, আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। এ ছাড়া, আমার একটা সমস্যা ছিল, আমি প্রায়ই ভাবতাম, আমার বয়সি ছেলে-মেয়েরা আমার চেয়ে অনেক ভালো আর আমি ভীষণভাবে চাইতাম, তারা যেন আমাকে তাদের বন্ধু হিসেবে দেখে। তাই, বাপ্তিস্ম নেওয়ার কিছু সময় পরে, আমি সেই সমস্ত লোকদের সঙ্গে সময় কাটাতে শুরু করি, যারা যিহোবার সেবা করত না। যদিও তাদের সঙ্গে মেলামেশা করতে ভালো লাগত, কিন্তু আমার এটা ভেবে খারাপ লাগত, কারণ আমি জানতাম যারা যিহোবাকে ভালোবাসে না, তাদের সঙ্গে আমার অতিরিক্ত সময় কাটানো উচিত নয়। কিন্তু, আমি কোনোভাবেই তাদের সঙ্গে মেলামেশা করা বন্ধ করতে পারিনি। তবে, কোন বিষয়টা আমাকে সাহায্য করেছিল?
আমি ডরোথির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি (বাঁ-দিকে)
সেই সময়, ডরোথি নামে একটি ১৬ বছরের মেয়ে, আমাদের মণ্ডলীতে যোগ দেয়। ঘরে ঘরে প্রচার কাজ করতে মেয়েটি এত ভালোবাসত যে, সেটা দেখে আমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বয়সে আমি তার থেকে একটু বড়ো ছিলাম, কিন্তু আমি নিয়মিতভাবে তার মতো প্রচার করতাম না। আমি মনে মনে ভাবতাম: ‘আমার বাবা-মা যিহোবার সাক্ষি, কিন্তু ডরোথির পরিবারে কেউই সত্যে ছিল না। তার মা খুবই অসুস্থ ছিল, কিন্তু তবুও ডরোথি নিয়মিতভাবে প্রচার কাজ করত।’ ডরোথির এই উদাহরণ, যিহোবার জন্য আমাকে আরও বেশি কিছু করতে অনুপ্রাণিত করে। এর কিছুদিন পরই, ডরোথি আর আমি একসঙ্গে অগ্রগামীর কাজ শুরু করি। প্রথমে আমরা সহায়ক অগ্রগামী হিসেবে, এরপর নিয়মিত অগ্রগামী হিসেবে সেবা করি। প্রচার কাজের প্রতি ডরোথির উদ্যোগ দেখে, আমারও প্রচার কাজের প্রতি উদ্যোগ বেড়ে যায়। ডরোথিই আমাকে একজনের সঙ্গে প্রথম বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করতে সাহায্য করে। এরপর থেকে ঘরে ঘরে, রাস্তায় এবং অন্যান্য পরিস্থিতিতে লোকদের সঙ্গে কথা বলা, আমার জন্য অনেকটা সহজ হয়ে ওঠে।
নিয়মিত অগ্রগামী হিসেবে সেবা করার প্রথম বছরে, হাইন্স নামে অস্ট্রিয়ার একজন ভাই, আমাদের মণ্ডলীতে যোগ দেয়। সে কানাডায় তার ভাইয়ের কাছ থেকে সত্য সম্বন্ধে জানতে পারে, যিনি একজন যিহোবার সাক্ষি ছিলেন। হাইন্সকে ভিয়েনায়, আমাদের মণ্ডলীতে একজন বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। প্রথম থেকেই আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম। কিন্তু, হাইন্স একজন মিশনারি হতে চেয়েছিল, কিন্তু আমার মিশনারি হিসেবে সেবা করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আমি যে তাকে পছন্দ করি, সেটা আমি প্রথমে তাকে জানাইনি। পরে আমরা ডেটিং করতে শুরু করি এবং বিয়ে করে নিই। এরপর আমরা একসঙ্গে অস্ট্রিয়াতে অগ্রগামী হিসেবে সেবা করি।
মিশনারি হওয়ার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া
হাইন্স প্রায়ই আমাকে বলত যে, সে একজন মিশনারি হতে চায়। যদিও সে আমাকে কখনো এই বিষয়ে জোরাজুরি করেনি, কিন্তু সে আমাকে আমার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলার জন্য প্রায়ই জিজ্ঞেস করত, “আমাদের তো কোনো সন্তান নেই, তাই আমরা কি যিহোবার সেবায় আরও বেশি কিছু করতে পারি না?” আমি খুব লাজুক স্বভাবের ছিলাম, তাই মিশনারি হতে আমার খুব ভয় করত। যদিও আমি একজন অগ্রগামী হিসেবে সেবা করেছি, কিন্তু মিশনারি হিসেবে সেবা করা আমার পক্ষে খুবই কঠিন বলে মনে হত। কিন্তু, হাইন্স এই বিষয়ে হাল ছেড়ে দেয়নি। সে সবসময় আমাকে উৎসাহ দিত, যেন আমি নিজের বিষয়ে অতিরিক্ত না ভেবে লোকদের জন্য চিন্তা করি। তার এই পরামর্শ সত্যিই আমাকে সাহায্য করেছিল।
১৯৭৪ সালে অস্ট্রিয়ার সল্জ্বার্গ শহরে একটা ছোটো যুগোস্লাভিয়ান মণ্ডলীতে হাইন্স প্রহরীদুর্গ অধ্যয়ন পরিচালনা করছে
ধীরে-ধীরে আমার মধ্যে মিশনারি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়তে থাকে এবং আমরা দু-জনে গিলিয়েড স্কুলের জন্য আবেদন করি। কিন্তু, একজন শাখা দাস আমাকে ইংরেজি ভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রে উন্নতি করতে বলে। তিন বছর ধরে পরিশ্রম করার পর, আমাদের যখন অস্ট্রিয়ার সল্জ্বার্গ শহরে একটা যুগোস্লাভিয়ান মণ্ডলীতে সেবা করার কার্যভার দেওয়া হয়, তখন আমরা খুব অবাক হয়ে যাই। সেখানে আমরা সাত বছর কাজ করি এবং এক বছরের জন্য আমার স্বামী সেখানে সীমা অধ্যক্ষ হিসেবে সেবা করে। সার্বিয়ান-ক্রোয়েশীয় ভাষা শেখা খুব কঠিন ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা সেই ভাষায় অনেক বাইবেল অধ্যয়ন পরিচালনা করতাম।
এরপর, ১৯৭৯ সালে শাখা অফিস আমাদের “ছুটি” কাটানোর নাম করে বুলগেরিয়ায় যেতে বলে কারণ সেখানে প্রচার কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তাই, আমরা ওই ‘ছুটির’ দিনগুলোতে কোনো প্রচার কাজ করিনি। কিন্তু, আমরা গোপনে পাঁচজন বোনের জন্য খুব ছোটো আকারের কিছু প্রকাশনা নিয়ে গিয়েছিলাম, যারা বুলগেরিয়ার রাজধানী সফিয়া শহরে থাকত। যদিও এটা খুব বিপদজনক ছিল, কিন্তু এই চমৎকার কার্যভার পালন করতে যিহোবা আমাদের সাহায্য করেছিলেন। আমি লক্ষ করেছিলাম যে, সেই পাঁচজন বোন এইরকম বিপদজনক পরিস্থিতিতেও তাদের সাহস ও আনন্দ বজায় রেখেছিল, যদিও পুলিশ তাদের যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করতে পারত। আর এটা আমাকে সাহস জুগিয়েছিল যেন আমি যিহোবার সংগঠন যা বলে, সেটা করার বিষয়ে আমার সর্বোত্তমটা দিই।
এর মধ্যে, আমরা আবার গিলিয়েডের জন্য আবেদন করি আর এই বার আমাদের আবেদন গ্রহণ করা হয়। আমরা ভেবেছিলাম যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজি ভাষার গিলিয়েড স্কুলে যোগ দেব। কিন্তু, ১৯৮১ সালে নভেম্বর মাস থেকে জার্মানির শাখা অফিস ভিসবাডেনে গিলিয়েড এক্সটেনশন স্কুল শুরু হয়। তাই, আমরা জার্মান ভাষার স্কুলে যোগ দিই, আর এটা আমার পক্ষে খুব সহজ হয়েছিল। কিন্তু, প্রশ্ন হল আমাদের কোথায় পাঠানো হবে?
যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে সেবা করা
আমাদের প্রথমে কেনিয়াতে পাঠানো হয়! কিন্তু, কেনিয়ার শাখা অফিস আমাদের জিজ্ঞেস করে যে, আমরা প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় সেবা করতে ইচ্ছুক কি না। এদিকে প্রায় দশ বছর আগে উগান্ডা সরকার জেনারেল ইডি আমীনের অধীনে আসে। তারপর থেকে ইডি আমীনের নেতৃত্বের ফলে হাজার হাজার মানুষ মারা যায় ও লক্ষ লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর, ১৯৭৯ সালে উগান্ডা সরকারের আবার পতন হয়। আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমি কেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু, যিহোবার উপর আস্থা রাখতে গিলিয়েড স্কুল আমাদের প্রস্তুত করেছিল। তাই, আমরা সেখানে যেতে রাজি হয়েছিলাম।
উগান্ডা শহরের পরিস্থিতি ও পরিবেশ অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিপদজনক ছিল। ২০১০ সালের বর্ষপুস্তকে হাইন্স এভাবে পরিস্থিতির বর্ণনা দেয়: “বিভিন্ন রকমের পরিষেবা, যেমন জল সরবরাহ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাতে গোলাগুলি ও ডাকাতি একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল। সবাই আতঙ্কে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকত আর এই প্রার্থনা করত যে, কখন রাতটা শেষ হবে।” এই ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও স্থানীয় ভাইয়েরা নিজেদের বিশ্বাসকে দৃঢ় রেখেছিল এবং আনন্দের সঙ্গে যিহোবার সেবা করে চলেছিল!
ওয়াইসবা পরিবারের বাড়িতে রান্না করা
১৯৮২ সালে হাইন্স ও আমি উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা এসে পৌঁছাই। প্রথম পাঁচ মাস আমরা স্যাম ও ক্রিস্টিনা ওয়াইসবার বাড়িতে থাকি, তারা তাদের পাঁচজন সন্তান ও চারজন আত্মীয়ের সঙ্গে সেই একই বাড়িতে থাকত। ভাই ও বোন ওয়াইসবার পরিবার খুবই গরিব ছিল। তারা দিনে মাত্র এক বারই খেত, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নিত। ওয়াইসবা পরিবারের সঙ্গে থাকার সময় হাইন্স ও আমি অনেক কিছু শিখতে পারি, যেগুলো আমাদের মিশনারি জীবনে খুব সাহায্যে এসেছিল। যেমন, আমরা শিখেছিলাম, কীভাবে জলের অপচয় বন্ধ করতে হয়। স্নানের জন্য অল্প পরিমাণে জল ব্যবহার করে সেই জলটাই কীভাবে টয়লেটের কাজে ব্যবহার করা যায়। ১৯৮৩ সালে হাইন্স ও আমি কাম্পালার মোটামুটি একটা নিরাপদ এলাকায় নিজেদের জন্য একটা বাড়ি খুঁজে পাই।
আমরা কাম্পালায় প্রচার কাজ খুব উপভোগ করেছিলাম। আমার মনে আছে যে, একটা মাসে আমরা প্রায় ৪,০০০-এরও বেশি পত্রিকা বিতরণ করেছি! কিন্তু, লোকেরা যেভাবে সত্যের প্রতি সাড়া দিত, সেটা দেখে আমরা খুব আনন্দ পেতাম। তারা ঈশ্বরকে সম্মান করত এবং বাইবেলের বিষয়ে তাদের অনেক আগ্রহ ছিল। হাইন্স ও আমি সাধারণত ১০ থেকে ১৫টা করে বাইবেল অধ্যয়ন পরিচালনা করতাম। আর আমরা আমাদের বাইবেল ছাত্রদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। যেমন, তাদের উদ্যোগী মনোভাব দেখে আমরা অনেক উৎসাহিত হয়েছি। তারা প্রতি সপ্তাহে পায়ে হেঁটে সভায় যেত, কিন্তু কখনো আমরা তাদের এই বিষয় নিয়ে অভিযোগ করতে শুনিনি আর আমরা লক্ষ করেছিলাম যে, সবসময় তাদের মুখে হাসি লেগেই থাকত।
১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে উগান্ডায় আরও দুটো যুদ্ধ হয়। আমরা প্রায়ই দেখতাম, খুব অল্পবয়সি ছেলেরা বড়ো বড়ো বন্দুক হাতে নিয়ে চেকপয়েন্টগুলো পাহারা দিচ্ছে। সেইসময় আমরা বিচক্ষণতা ও শান্ত হৃদয়ের জন্য যিহোবার কাছে প্রার্থনা করতাম, যাতে আমরা প্রচারে সেইসমস্ত ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে পারি, যারা বাইবেল সম্বন্ধে জানতে চায়। আর যিহোবা আমাদের প্রার্থনার উত্তর দিয়েছিলেন। যখনই কেউ আমাদের বার্তায় সাড়া দিত, তখনই আমরা আমাদের সমস্ত ভয় ভুলে গিয়ে তাদের সাহায্য করার জন্য এগিয়ে যেতাম।
হাইন্স ও আমি টাটইয়ানার সঙ্গে (মাঝখানে)
এ ছাড়া, আমরা বিদেশিদের কাছে সাক্ষ্য দিয়েও আনন্দ পেয়েছিলাম। যেমন, আমাদের তাতারস্টানে (মধ্য রাশিয়া) মুরাট ও দিলবার ইবাটুলিন নামে এক দম্পতির সঙ্গে দেখা হয় এবং তাদের সঙ্গে আমরা বাইবেল অধ্যয়নও শুরু করি। মুরাট একজন ডাক্তার ছিলেন। সেই দম্পতি সত্যে আসে এবং এখনও পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে যিহোবার সেবা করে চলেছে। এরপর আমাদের ইউক্রেনের একজন মহিলা টাটইয়ানা ভিলেসকার সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি সেইসময় আত্মহত্যা করার পরিকল্পনা করছিলেন। পরে টাটইয়ানা বাপ্তিস্ম নেন এবং ইউক্রেনে ফিরে যান আর এরপর তিনি আমাদের প্রকাশনার একজন অনুবাদক হিসেবে সেবা করেন।a
নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা
১৯৯১ সালে হাইন্স ও আমি যখন অস্ট্রিয়ায় ছুটি কাটাচ্ছিলাম, তখন স্থানীয় শাখা অফিস আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং জানায় আমাদের এবার বুলগেরিয়া যেতে হবে। পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট সরকারের পতনের পর বুলগেরিয়ায় যিহোবার সাক্ষিদের কাজ আইনত বৈধ হয়। আমি যেমন আগে বলেছিলাম, বুলগেরিয়ায় আমাদের কাজের উপর যখন নিষেধাজ্ঞা ছিল, তখন হাইন্স ও আমি সেখানে গোপনে কিছু প্রকাশনা নিয়ে গিয়েছিলাম আর এখন আমাদের সেই একই জায়গায় প্রচার করার জন্য পাঠানো হয়।
আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়, আমরা যেন উগান্ডায় ফিরে না যাই। তাই, আমাদের জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য মিশনারি হোমে ফিরে না গিয়ে আর আমাদের বন্ধুবান্ধবদের বিদায় না জানিয়েই, আমরা জার্মানির বেথেলের দিকে রওনা দিই। আর সেখান থেকে একটা গাড়ি নিয়ে সোজা বুলগেরিয়া চলে যাই। আমাদের সফিয়া শহরে একটা দলে নিযুক্ত করা হয়, যেখানে প্রায় ২০ জন প্রকাশক ছিল।
আমরা বুলগেরিয়ায় নতুন নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হই। প্রথমত, আমরা সেখানকার ভাষা জানতাম না। এর পাশাপাশি, বুলগেরিয়ান ভাষায় শুধুমাত্র দুটো প্রকাশনা ছিল: যে সত্য অনন্ত জীবনে লইয়া যায় এবং আমার বাইবেলের গল্পের বই। তৃতীয়ত, আমরা কোনোভাবেই বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করতে পারছিলাম না। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলো থাকা সত্ত্বেও আমাদের এই উদ্যোগী ছোটো দল উন্নতি করছিল। অর্থোডক্স চার্চ আমাদের গতিবিধির উপর লক্ষ রেখেছিল আর তখনই আসল সমস্যাটা শুরু হয়।
১৯৯৪ সালে যিহোবার সাক্ষিদের কাজের উপর আবার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সরকার আমাদের একটা বিপদজনক দল বলে মনে করে। এর ফলে, কিছু ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রচার মাধ্যম আমাদের সম্বন্ধে গুরুতর মিথ্যা কথা ছড়ায়, তারা দাবি করে যে, যিহোবার সাক্ষিরা যে শুধুমাত্র শিশুদের হত্যা করে, তা নয়, তারা অন্য সাক্ষিদেরও আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করে। হাইন্স ও আমার জন্য প্রচার করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা প্রায়ই এমন লোকদের মুখোমুখি হতাম, যারা আমাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করত, পুলিশ ডেকে আনত আর হাতে যা পেত, তা-ই আমাদের দিকে ছুড়ে মারত। সেইসময় প্রকাশনাগুলো দেশের মধ্যে নিয়ে আসা অসম্ভব ছিল, আর সভার জন্য হল ভাড়া করাও খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। এমনকী পুলিশ আমাদের একটা সম্মেলনে জোর করে ঢুকে আমাদের অনুষ্ঠান থামিয়ে দিয়েছিল। হাইন্স ও আমি এই ধরনের হিংসাত্মক কাজ দেখে অভ্যস্ত নই। এর বিপরীতে, আমরা উগান্ডায় কতই-না এক বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে প্রচার করতাম! কোন বিষয়টা আমাদের এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল?
স্থানীয় ভাই-বোনদের সঙ্গে মেলামেশা করে, আমরা খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। তারা সত্য খুঁজে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল আর আমরা তাদের পাশে ছিলাম বলে, তারা খুবই কৃতজ্ঞ ছিল। আমরা সকলে একে অপরের পাশাপাশি থাকতাম এবং সাহায্য করতাম। এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে একটা বিষয় শিখেছিলাম আর সেটা হল, যদি আমরা মানুষকে ভালোবাসি, তা হলে আমরা আনন্দের সঙ্গে যেকোনো কার্যভার পালন করতে পারব।
২০০৭ সালে বুলগেরিয়ার শাখা অফিসে
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। ১৯৯৮ সালে আমাদের সংগঠন আবারও বৈধভাবে স্বীকৃতি পায় এবং খুব তাড়াতাড়ি বুলগেরিয়ান ভাষায় আরও প্রকাশনা আসতে শুরু করে। এরপর ২০০৪ সালে, নতুন শাখা বিল্ডিং নির্মাণ ও উৎসর্গীকৃত হয়। বর্তমানে বুলগেরিয়ায় ৫৭ টা মণ্ডলী রয়েছে আর সেখানে ২,৯৫৩ জন প্রকাশক সেবা করছে। গত পরিচর্যা বছরে মোট ৬,৪৭৫ জন স্মরণার্থ সভায় যোগ দিয়েছিল। একসময় যেখানে সফিয়া শহরে শুধুমাত্র পাঁচ জন বোন ছিল, আজ সেখানে নয়টা মণ্ডলী রয়েছে! আমরা সত্যিই যিশাইয় ৬০:২২ পদে বলা ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূর্ণতা দেখতে পেয়েছি, যেখানে বলা রয়েছে “যে ছোটো, সে এক হাজার হয়ে উঠবে।”
ব্যক্তিগত সমস্যার সঙ্গে লড়াই করা
আমার নিজস্ব কিছু শারীরিক সমস্যা ছিল। আমার শরীরে অনেক বার টিউমার ধরা পড়ে, একটা টিউমার আমার মাথাতেও ছিল। আমাকে চিকিৎসার জন্য, ভারতে আসতে হয়। সেখানে, আমি রেডিয়েশান নিই আর বারো ঘণ্টা অপারেশনের পর, অধিকাংশ টিউমার আমার শরীর থেকে বের করে দেওয়া হয়। ভারতের শাখা অফিসে থাকাকালীন সুস্থ হয়ে ওঠার পর, আমরা আবার বুলগেরিয়ায় ফিরে যাই।
এরই মধ্যে, হাইন্স আবার হানটিংটন রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগটা ছিল খুবই বিরল, আর এটা সাধারণত একটা বংশগত রোগ। এরজন্য, তার পক্ষে হাঁটাচলা করা, কথা বলা এবং নড়াচড়া করা খুবই কষ্টকর ছিল। এই রোগটা যতই বাড়তে থাকে, ততই সে আমার উপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পরে। এর জন্য আমি মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়তাম আর চিন্তা করতাম যে আদৌ আমি ভালোভাবে তার যত্ন নিতে পারব কি না। যা-ই হোক না কেন, ববি নামে একজন যুবক ভাই নিয়মিতভাবে হাইন্সকে তার সঙ্গে প্রচারে নিয়ে যেত। হাইন্স স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারত না এবং তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে ছিল না বলে, ববি কখনোই তাকে নিয়ে বিব্রতবোধ করত না। আমি যখন হাইন্সকে সামলাতে পারতাম না, তখন ববি সবসময় সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসত। যদিও, হাইন্স ও আমি এই জগতে সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তবে আমরা অনুভব করেছি, যিহোবা ববিকে আমাদের ছেলে হিসেবে উপহার দিয়েছেন!—মার্ক ১০:২৯, ৩০.
এ ছাড়া, হাইন্স ক্যান্সারের সঙ্গেও লড়াই করছিল। দুঃখের বিষয় হল, ২০১৫ সালে আমার প্রিয় স্বামী মারা যায়। হাইন্স মারা যাওয়ার পর, আমার নিজেকে খুবই একা বলে মনে হত, আমি একেবারেই মেনে নিতে পারছিলাম না যে, সে আর নেই। কিন্তু, আমার স্মৃতিতে সে এখনও বেঁচে আছে! (লূক ২০:৩৮) সারাদিন ধরে, আমি প্রায়ই সবসময় তার প্রেমের সঙ্গে বলা কথা এবং পরামর্শ নিয়ে চিন্তা করতাম। আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ যে, আমরা একসঙ্গে অনেক বছর ধরে বিশ্বস্তভাবে যিহোবার সেবা করেছি।
যিহোবার সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞ
যিহোবা সত্যিই আমাকে আমার পরীক্ষাগুলো সহ্য করতে সাহায্য করেছেন। আর সেইসঙ্গে তিনি আমাকে আমার লাজুক স্বভাব কাটিয়ে উঠতেও সাহায্য করেছেন এবং একজন মিশনারি হিসেবে লোকদের ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। (২ তীম. ১:৭) যিহোবাকে ধন্যবাদ দিই যে, বর্তমানে আমার ছোটো বোন এবং আমি পূর্ণসময়ের সেবা করছি। আমার ছোটো বোন এবং তার স্বামী ইউরোপের সার্বিয়ান ভাষার মণ্ডলীগুলোতে পরিদর্শন করছে। অনেক বছর আগে আমার বাবা যে-প্রার্থনা করেছিল, সেটার উত্তর যিহোবা দিয়েছেন!
বাইবেল অধ্যয়ন করে আমি মনের শান্তি লাভ করি। কঠিন সময়ে আমি “আরও আন্তরিকভাবে” যিহোবার কাছে প্রার্থনা করতে শিখেছি, যেমনটা যিশু করেছিলেন। (লূক ২২:৪৪) একটা উপায়ে আমি আমার প্রার্থনার উত্তর পেয়েছিলাম আর সেটা হল সফিয়া শহরের, নাডেসডা মণ্ডলীর ভাই-বোনদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও আন্তরিকতা। তারা প্রায়ই আমাকে তাদের সঙ্গে মেলামেশা করার জন্য আমন্ত্রণ জানায় এবং আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করে আর এটা আমাকে অত্যন্ত আনন্দ দেয়।
আমি প্রায়ই পুনরুত্থানের বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি। আমি কল্পনায় দেখি, আমার বাবা-মা যেন আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আর বিয়ের সময় তারা যেমন সুন্দর ছিল, তাদের ঠিক ততটাই সুন্দর দেখাচ্ছে। আমি দেখতে পাই, আমার বোন খাবার তৈরি করছে। আমি কল্পনা করতে পারি যে, হাইন্স তার ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আর এই দৃশ্যগুলো আমাকে আনন্দ দেয়, ধৈর্য ধরার শক্তি দেয় এবং যিহোবার প্রতি আমার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে।
আমি আমার জীবন নিয়ে যখন চিন্তা করি এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, তখন আমি সম্পূর্ণ হৃদয় দিয়ে দায়ূদের মতো অনুভব করি, যা তিনি গীতসংহিতা ২৭:১৩, ১৪ পদে বলেছিলেন: “আমার যদি এই বিশ্বাস না থাকত যে, যিহোবা আমার জীবনকালে ভালো কাজ করবেন, তা হলে আমার যে কী হত! যিহোবার উপর আশা রাখো, সাহসী হও এবং মনকে দৃঢ় করো। হ্যাঁ, যিহোবার উপর আশা রাখো।”
a টাটইয়ানা ভিলেসকার জীবনকাহিনি পড়ার জন্য ২০০০ সালের ২২ ডিসেম্বর সজাগ হোন! (ইংরেজি) পত্রিকার ২০-২৪ পৃষ্ঠা দেখুন।