অধ্যয়ন প্রবন্ধ ৩৫
গান ১২১ আত্মসংযম প্রয়োজন
কীভাবে আমরা মন্দ আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিরোধ করতে পারি?
“তোমরা নিজেদের মরণশীল দেহের উপর পাপকে আর রাজত্ব করতে দিয়ো না। যদি দাও, তা হলে তোমরা নিজেদের দৈহিক আকাঙ্ক্ষার বশীভূত হয়ে পড়বে।”—রোমীয় ৬:১২.
আমরা কী শিখব?
এই প্রবন্ধে আমরা জানতে পারব, আমাদের মনে যদি মন্দ আকাঙ্ক্ষা আসে, তা হলে কেন আমাদের নিরুৎসাহিত হওয়া উচিত নয় আর আমরা এই আকাঙ্ক্ষার দ্বারা প্রলোভিত হলে কীভাবে তা প্রতিরোধ করতে পারি।
১. সমস্ত মানুষকেই কীসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়?
আপনার কি কখনো এমন কিছু করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা হয়েছিল, যেটা যিহোবা পছন্দ করেন না? যদি হয়ে থাকে, তা হলে নিরুৎসাহিত হবেন না। বাইবেলে লেখা আছে, “মানুষ সাধারণত যে-সমস্ত প্রলোভনের মুখোমুখি হয়, সেগুলো ছাড়া অন্য কোনো প্রলোভন তোমাদের উপর আসেনি।” (১ করি. ১০:১৩) এর মানে হল, আপনি একাই যে আপনার মন্দ আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, এমনটা নয়, সমস্ত মানুষকেই এই আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। কিন্তু, আনন্দের বিষয় হল, যিহোবার সাহায্যে আপনি এই লড়াইয়ে জয়ী হতে পারেন।
২. কিছু খ্রিস্টান ও বাইবেল ছাত্র কোন মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে? (ছবিগুলোও দেখুন।)
২ বাইবেলে এটাও লেখা আছে, “প্রত্যেকে নিজের কামনার দ্বারা আকর্ষিত হয়ে এবং প্ররোচিত হয়ে পরীক্ষায় পড়ে।” (যাকোব ১:১৪) প্রত্যেক ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন আকাঙ্ক্ষার দ্বারা প্রলোভিত হতে পারে। যেমন, একজন খ্রিস্টান হয়তো কোনো বিপরীত লিঙ্গের ব্যক্তির সঙ্গে অনৈতিক যৌন সম্পর্ক করার জন্য প্রলোভিত হতে পারে। আবার অন্যদিকে, আরেকজন হয়তো সমলিঙ্গের কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করার প্রলোভনে পড়তে পারে। আবার যাদের একসময় পর্নোগ্রাফি দেখার অভ্যাস ছিল, তাদের মনে আবারও সেটা দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠতে পারে। অন্যদিকে, যাদের একসময় ড্রাগস্ নেওয়া অথবা অতিরিক্ত মদ খাওয়ার অভ্যাস ছিল, তাদের আবারও হয়তো সেই অভ্যাস ফিরে আসতে পারে। এখানে আমরা মাত্র কয়েকটা মন্দ আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে জানতে পারলাম, যেগুলোর বিরুদ্ধে হয়তো কিছু খ্রিস্টান এবং বাইবেল ছাত্রকে লড়াই করতে হয়। আসল বিষয়টা হল, আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন একটা সময় আসে, যখন আমরা হয়তো প্রেরিত পৌলের মতো এইরকম অনুভব করি: “আমি সঠিক কাজ করার ইচ্ছা করলেও মন্দ আমার মধ্যে উপস্থিত থাকে।”—রোমীয় ৭:২১.
আমরা যেকোনো জায়গায় এবং যেকোনো সময়ে প্রলোভিত হতে পারি (২ অনুচ্ছেদ দেখুন)c
৩. একজন ব্যক্তির মনে যদি বার বার মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলো আসতে থাকে, তা হলে তিনি হয়তো কী ভাবতে পারেন?
৩ আপনার মনে যদি বার বার মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলো আসতে থাকে, তা হলে আপনি হয়তো মনে করতে পারেন, আপনি এতটাই দুর্বল ও অসহায় যে এগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। এ ছাড়া, আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, শুধুমাত্র এই আকাঙ্ক্ষাগুলো আপনার মনে এসেছে বলেই যিহোবা আপনাকে দোষী বলে মনে করবেন এবং তিনি আপনাকে অনন্তজীবন দেবেন না। কিন্তু, এই দুটো চিন্তাধারাই ভুল। কেন? এটা জানার জন্য এই প্রবন্ধে দুটো প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা হবে, যেগুলো হল: (১) আপনার কেন মনে হতে পারে যে, আপনি দুর্বল ও অসহায় এবং যিহোবার চোখে দোষী? আর (২) আপনি কীভাবে মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারেন?
শয়তান আমাদের কী বিশ্বাস করাতে চায়?
৪. (ক) শয়তান কেন চায় আমরা নিজেদের দুর্বল ও অসহায় বলে মনে করি? (খ) কেন আমরা বলতে পারি, আমরা এতটা দুর্বল ও অসহায় নই যে নিজেদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না?
৪ আমরা যখন প্রলোভিত হই, তখন শয়তান চায়, আমরা যেন নিজেদের দুর্বল ও অসহায় বলে মনে করি। যিশু এটা জানতেন আর তাই তিনি তাঁর শিষ্যদের এভাবে প্রার্থনা করতে শিখিয়েছিলেন: “আমাদের প্রলোভনের কাছে নতিস্বীকার করতে দিয়ো না কিন্তু শয়তানের হাত থেকে উদ্ধার করো।” (মথি ৬:১৩) শয়তান এই দাবি করেছিল, একজন ব্যক্তি যদি প্রলোভনে পড়ে, তা হলে সে যিহোবার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে না। (ইয়োব ২:৪, ৫) কিন্তু সত্যিটা হল, শয়তান যখন নিজের মন্দ আকাঙ্ক্ষার দ্বারা প্রলোভিত হয়েছিল, তখন সেটার বিরুদ্ধে লড়াই না করে নিজেই সেই প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়েছিল এবং যিহোবার প্রতি অবিশ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। তাই, শয়তান মনে করে, মানুষও যদি প্রলোভনে পড়ে, তা হলে সেও যিহোবাকে ছেড়ে দেবে। এমনকী শয়তান এটাও মনে করেছিল, যিহোবার নিখুঁত পুত্রও প্রলোভনে পড়লে তাঁর আজ্ঞা অমান্য করবেন। (মথি ৪:৮, ৯) কিন্তু, চিন্তা করে দেখুন, আমরা কি সত্যি এতটাই দুর্বল ও অসহায় যে আমরা নিজেদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না? একেবারেই না! প্রেরিত পৌল লিখেছিলেন, “যিনি আমাকে শক্তি দেন, তাঁর মাধ্যমে আমি সব কিছুই করতে পারি।” (ফিলি. ৪:১৩) হ্যাঁ, একমাত্র যিহোবার সাহায্যেই আমরা নিজেদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব!
৫. কেন আমরা বলতে পারি, যিহোবা এই বিষয়ে নিশ্চিত যে, আমরা মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব?
৫ যিহোবার চিন্তাধারা শয়তানের থেকে একেবারেই আলাদা। যিহোবার সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে যে, আমরা মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব এবং তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারব। কেন আমরা এটা বলতে পারি? কারণ বাইবেলে তিনি আগে থেকেই লিখিয়েছিলেন যে, তাঁর বিশ্বস্ত লোকদের এক বিরাট জনতা মহাক্লেশ থেকে রক্ষা পাবে। আমরা জানি, যিহোবা মিথ্যা কথা বলেন না। তাই, যখন তিনি বলেছিলেন, এক বিরাট জনতা নতুন জগতে প্রবেশ করবে, তখন এর অর্থ হল, তিনি নিশ্চিত যে, অনেক লোক “মেষশাবকের রক্তে নিজেদের পোশাক ধুয়ে সেগুলোকে সাদা” করবে এবং ঈশ্বরের চোখে ধার্মিক বলে গণ্য হবে। (প্রকা. ৭:৯, ১৩, ১৪) এটা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, যিহোবা আমাদের দুর্বল ও অসহায় বলে মনে করেন না। তিনি নিশ্চিত যে, আমরা মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব।
৬-৭. শয়তান আমাদের আর কোন বিষয়টা বিশ্বাস করাতে চায়?
৬ এ ছাড়া, শয়তান চায় আমরা যেন এটা বিশ্বাস করি যে, আমাদের মনে মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলো আসলেই যিহোবা আমাদের দোষী বলে মনে করবেন এবং তিনি আমাদের অনন্তজীবন দেবেন না। কিন্তু সত্যিটা হল, শয়তান নিজেই যিহোবার চোখে দোষী এবং যিহোবা তাকে অনন্তজীবন দেবেন না। যিহোবা ইতিমধ্যেই শয়তানের বিরুদ্ধে শাস্তি ঘোষণা করেছেন। (আদি. ৩:১৫; প্রকা. ২০:১০) শয়তানের কাছে কোনো আশা নেই, তাই সে আমাদের হিংসা করে কারণ আমাদের কাছে চিরকাল বেঁচে থাকার আশা রয়েছে। তাই, সে চায় আমরাও যেন বিশ্বাস করি, পাপী মানুষ হিসেবে আমাদের কোনো আশা নেই। কিন্তু, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বাইবেলে বলা আছে, যিহোবা আমাদের দোষী বলে মনে করেন না বরং তিনি আমাদের সাহায্য করতে চান। এটিতে লেখা আছে: “তিনি চান না, কেউ ধ্বংস হয়ে যাক, বরং চান যেন সকলে অনুতপ্ত হয়।”—২ পিতর ৩:৯.
৭ তাই আমরা যদি বিশ্বাস করি যে, আমরা দুর্বল ও অসহায়, নিজেদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না অথবা এটা মনে করি, আমরা যিহোবার চোখে দোষী, তা হলে এতে শয়তানেরই জয় হবে। কেন? কারণ শয়তান চায় আমরা যেন এভাবেই চিন্তা করি। আর যেহেতু আমরা এই বিষয়টা বুঝে গিয়েছি, তাই আসুন, আমরা দৃঢ়ভাবে তার প্রতিরোধ করি।—১ পিতর ৫:৮, ৯.
পাপী হওয়ার কারণে আমরা কেমন অনুভব করতে পারি?
৮. পাপের অর্থ কী? (গীতসংহিতা ৫১:৫) (“এটার মানে কী?” দেখুন।)
৮ আমরা যেমনটা আগে দেখলাম, শয়তান চায় আমরা এটা বিশ্বাস করি যে, আমরা নিজেদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না এবং এই আকাঙ্ক্ষাগুলো আমাদের মনে আসে বলেই আমরা যিহোবার চোখে দোষী। এ ছাড়া, আরও একটা কারণে আমরা নিজেদের অসহায় ও দুর্বল বলে মনে করতে পারি। আর সেটা হল, আদম ও হবার কাছ থেকে আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পাপ পেয়েছি।a—ইয়োব ১৪:৪; পড়ুন, গীতসংহিতা ৫১:৫.
৯-১০. (ক) আদম ও হবা পাপ করার পর কেমন অনুভব করেছিলেন? (ছবিও দেখুন।) (খ) পাপী হওয়ার কারণে আমরা কেমন অনুভব করি?
৯ এটা চিন্তা করে দেখুন, আদম ও হবা পাপ করার পর কেমন অনুভব করেছিলেন। অবাধ্য হওয়ার পর তারা নিজেদের যিহোবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেন এবং তাদের শরীর ঢাকার চেষ্টা করেন। শাস্ত্রের প্রতি অন্তর্দৃষ্টি, বইয়ে লেখা আছে, “পাপের কারণে [১] তারা নিজেদের দোষী বলে মনে করেন, [২] তারা দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকেন, [৩] উদ্বিগ্নতা তাদের ঘিরে ধরে এবং [৪] তারা লজ্জাবোধ করেন।” এটা আমরা এইভাবে চিন্তা করতে পারি, আদম ও হবা এমন একটা বাড়িতে বন্দি হয়ে রয়েছেন, যেটাতে চারটে ঘর রয়েছে। তারা একটা ঘর থেকে আরেকটা ঘরে যেতে পারতেন ঠিকই, কিন্তু তারা কখনোই বাড়ির বাইরে যেতে পারতেন না। এর মানে হল, পাপী হওয়ার কারণে তারা কখনো কখনো নিজেদের দোষী বলে মনে করতেন, আবার কখনো দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতেন। আবার কখনো উদ্বিগ্নতা তাদের ঘিরে ধরত, আবার কখনো তারা লজ্জাবোধ করতেন। কিন্তু, তারা কোনোভাবেই এই পাপী অবস্থা থেকে রেহাই পেতে পারতেন না।
১০ আদম-হবা এবং মানুষের মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। আদম ও হবা মুক্তির মূল্য থেকে কোনো উপকার লাভ করতে পারবেন না। কিন্তু, মানুষ এটা থেকে উপকার লাভ করবে। আমরা আমাদের পাপের ক্ষমা পেতে পারি এবং এক শুদ্ধ বিবেক নিয়ে যিহোবার সেবা করতে পারি। (১ করি. ৬:১১) কিন্তু, এটা সত্য যে, আমরা আদম ও হবার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাপ পেয়েছি। তাই, ভুল করার পর আমরাও নিজেদের দোষী বলে মনে করি, দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকি, উদ্বিগ্নতা আমাদের ঘিরে ধরে আর আমরা লজ্জাবোধ করি। বাইবেলে লেখা আছে, আমরা ‘আদমের অবাধ্যতার মতো পাপ করিনি।’ তারপরও পাপ আমাদের উপর রাজত্ব করছে আর আমরা এর দাসত্বে রয়েছি। (রোমীয় ৫:১৪) কিন্তু, এর অর্থ এই নয়, আমরা আমাদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না অথবা আমরা ঈশ্বরের চোখে দোষী। তবে, কখনো কখনো আমাদের মধ্যে এইরকম চিন্তা আসতে পারে এবং আমরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তে পারি। এইরকম সময়ে আমাদের কী করা উচিত?
পাপের কারণে আদম ও হবা নিজেদের দোষী বলে মনে করেন, তারা দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকেন, উদ্বিগ্নতা তাদের ঘিরে ধরে এবং তারা লজ্জাবোধ করেন (৯ অনুচ্ছেদ দেখুন)
১১. আমাদের যদি মনে হয় যে, আমরা নিজেদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না, তা হলে আমাদের কী করা উচিত এবং কেন? (রোমীয় ৬:১২)
১১ পাপী হওয়ার কারণে আমাদের হয়তো মনে হতে পারে যে, আমরা নিজেদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না। কিন্তু, আমাদের এইরকম মনে করা উচিত নয়। কেন? কারণ বাইবেলে লেখা আছে, পাপকে আমাদের উপর ‘রাজত্ব করতে দেওয়া’ উচিত নয়। (পড়ুন, রোমীয় ৬:১২.) এর অর্থ হল, আমাদের মনে যখন মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলো আসে, তখন আমাদের সেই অনুযায়ী কাজ করা উচিত নয়। এটা আমাদের উপর নির্ভর করে যে, আমরা আমাদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর কাছে নতিস্বীকার করব, কি করব না। (গালা. ৫:১৬) যিহোবার এই আস্থা রয়েছে যে, আমরা প্রলোভনে পড়লেও মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোকে প্রতিরোধ করতে পারব। তাঁর যদি আমাদের উপর এই আস্থা না থাকত, তা হলে তিনি কখনোই আমাদের এটা করতে বলতেন না। (দ্বিতীয়. ৩০:১১-১৪; রোমীয় ৬:৬; ১ থিষল. ৪:৩) এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, আমরা এতটাও দুর্বল ও অসহায় নই যে আমরা আমাদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না।
১২. আমরা যদি ভাবি, মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলো মনের মধ্যে আসলেই যিহোবা আমাদের দোষী বলে মনে করবেন, তা হলে আমাদের কী করা উচিত এবং কেন?
১২ একইভাবে, আমরা যদি ভাবি, মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলো মনের মধ্যে আসলেই যিহোবা আমাদের দোষী বলে মনে করবেন, তা হলে আমাদের এইরকমটা ভাবা ঠিক নয়। কেন? কারণ বাইবেলে লেখা আছে, যিহোবা ভালোভাবে বোঝেন যে, আমরা পাপী। (গীত. ১০৩:১৩, ১৪) আর তিনি আমাদের বিষয়ে “সমস্ত কিছু জানেন।” (১ যোহন ৩:১৯, ২০) যিহোবা জানেন, পাপী মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে সবসময় ভুল করার একটা প্রবণতা থাকবে। কিন্তু, আমরা যদি আমাদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর কাছে নতিস্বীকার না করি এবং পাপ করা থেকে দূরে থাকি, তা হলে আমরা যিহোবার চোখে ধার্মিক বলে গণ্য হব। কেন আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারি?
১৩-১৪. কারো মনে যদি মন্দ আকাঙ্ক্ষা আসে, তা হলে এর মানে কি এই যে, যিহোবা তার প্রতি সন্তুষ্ট নন? বুঝিয়ে বলুন।
১৩ বাইবেল বলে, মন্দ কাজ করার আকাঙ্ক্ষা এবং মন্দ কাজ করার মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। না চাইলেও মন্দ আকাঙ্ক্ষা আমাদের মনে আসতে পারে, কিন্তু আমরা এই আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী মন্দ কাজ করা থেকে নিজেদের আটকাতে পারি। উদাহরণ স্বরূপ, প্রথম শতাব্দীর করিন্থীয় মণ্ডলীর কিছু লোকের কথা চিন্তা করুন, যারা খ্রিস্টান হওয়ার আগে সমকামী ছিল। তাদের বিষয়ে পৌল বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ সেই ধরনের লোক ছিলে।” কিন্তু, এর মানে কি এই যে, খ্রিস্টান হওয়ার পর তাদের মনে কখনো এই মন্দ কাজ করার আকাঙ্ক্ষা আসেনি? এমনটা ভাবা ঠিক হবে না কারণ মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলো আমাদের মনে গভীরভাবে বাসা বাঁধে এবং এর থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। এই আকাঙ্ক্ষাগুলো মনের মধ্যে বার বার আসতে পারে। কিন্তু, করিন্থের যে-সমস্ত খ্রিস্টান আত্মসংযম বজায় রেখেছিল এবং মন্দ আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাজ করেনি, তাদের প্রতি যিহোবা খুব সন্তুষ্ট ছিলেন। আর তারা যিহোবার চোখে “শুচি” ছিল। (১ করি. ৬:৯-১১) বর্তমানে, আমরাও যিহোবার চোখে শুচি থাকতে পারি।
১৪ আপনি যেকোনো মন্দ আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করুন না কেন, আপনি জয়ী হতে পারবেন। আপনি হয়তো সেই মন্দ আকাঙ্ক্ষাকে আপনার মন থেকে পুরোপুরি দূর করতে পারবেন না, তবে আপনি আত্মসংযম বজায় রাখতে পারবেন। আপনি সেই “মাংসিক ইচ্ছা এবং নিজেদের চিন্তাভাবনা অনুযায়ী” কাজ করা থেকে দূরে থাকতে পারবেন। (ইফি. ২:৩) কীভাবে? আসুন তা দেখি।
মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে আমরা কীভাবে লড়াই করব?
১৫. মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের কী করতে হবে এবং কেন?
১৫ মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রথমে আপনার দুর্বলতাগুলো স্বীকার করুন এবং “ভুল যুক্তি দিয়ে” নিজেকে ঠকাবেন না। (যাকোব ১:২২) যেমন, আপনি হয়তো অতিরিক্ত মদ খান, কিন্তু নিজেকে এটা বলে অজুহাত দিচ্ছেন যে, ‘আমি আর কত মদ খাই, অন্যেরা তো আমার চেয়ে আরও বেশি মদ খায়।’ আবার এটাও হতে পারে, আপনি একজন বিবাহিত ব্যক্তি এবং আপনার পর্নোগ্রাফি দেখার অভ্যাস আছে। তাহলে, আপনি হয়তো এইরকম অজুহাত দিতে পারেন, ‘আমার স্ত্রী যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসত, তা হলে আমার কি এই নোংরা ছবিগুলো দেখার কোনো প্রয়োজন পড়ত?’ আপনি যদি নিজেকে এই ধরনের অজুহাত দিতে থাকেন, তা হলে আপনি সহজেই খারাপ কাজ করে ফেলতে পারেন। তাই, খারাপ কাজগুলো করার জন্য অজুহাত খুঁজবেন না। নিজের ভুলগুলো স্বীকার করুন এবং নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করুন।—গালা. ৬:৭.
১৬. কীভাবে আপনি সঠিক কাজ করার জন্য আপনার সংকল্পকে দৃঢ় করতে পারেন?
১৬ নিজের দুর্বলতাগুলোকে স্বীকার করার পাশাপাশি এটাও গুরুত্বপূর্ণ যেন আপনি এই সংকল্পকে দৃঢ় করেন যে, আপনি কখনো মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর কাছে নতিস্বীকার করবেন না। (১ করি. ৯:২৬, ২৭; ১ থিষল. ৪:৪; ১ পিতর ১:১৫, ১৬) এর জন্য আপনি কী করতে পারেন? সবচেয়ে প্রথমে চিন্তা করুন, আপনার মধ্যে কোন দুর্বলতাগুলো রয়েছে আর আপনি কোন পরিস্থিতিতে এবং কখন সেটার জন্য প্রলোভিত হতে পারেন। যেমন, আপনি যখন খুব ক্লান্ত থাকেন, তখন কি আপনি মন্দ কাজ করার জন্য প্রলোভিত হতে পারেন? অথবা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকার সময়, আপনার কি মন্দ কাজ করার ইচ্ছা হয়? এরপর চিন্তা করুন, এইরকম পরিস্থিতিতে আপনি কী করবেন। এভাবে, আগে থেকে চিন্তা করার মাধ্যমে আপনি প্রলোভনে পড়বেন না।—হিতো. ২২:৩.
১৭. আমরা যোষেফের কাছ থেকে কী শিখতে পারি? (আদিপুস্তক ৩৯:৭-৯) (ছবিগুলোও দেখুন।)
১৭ চিন্তা করুন, পোটীফরের স্ত্রী যখন যোষেফকে প্রলোভিত করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন যোষেফ কী করেছিলেন। তিনি সঙ্গেসঙ্গে তাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সেখান থেকে পালিয়ে যান। (পড়ুন, আদিপুস্তক ৩৯:৭-৯.) এটা থেকে কী বোঝা যায়? এটাই যে, যোষেফ আগে থেকেই চিন্তা করে রেখেছিলেন, অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করবেন না। একইভাবে, আগে থেকেই আমাদের সংকল্পকে দৃঢ় করা উচিত যে, আমরা যদি কোনো প্রলোভনে পড়ি, তা হলে আমরা কী করব। এমনটা করার দ্বারা প্রলোভনে পড়লেও, আমরা সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারব কারণ আমরা আগে থেকেই সেই বিষয়ে চিন্তা করে রেখেছিলাম।
পাপ করার জন্য প্রলোভিত হলে যোষেফের মতো সঙ্গেসঙ্গে পদক্ষেপ নিন! (১৭ অনুচ্ছেদ দেখুন)
“সবসময় নিজেদের পরীক্ষা করে দেখো”
১৮. মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য আপনি কী করতে পারেন? (২ করিন্থীয় ১৩:৫)
১৮ মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য ‘নিজেদের পরীক্ষা করে দেখা’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মানে হল, নিজেদের দুর্বলতাগুলো নিয়ে নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা। (পড়ুন, ২ করিন্থীয় ১৩:৫.) কীভাবে আমরা তা করতে পারি? আপনার চিন্তাভাবনা এবং কাজগুলো নিয়ে বিবেচনা করুন আর যদি কিছু সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তা হলে সেটা করুন। ধরুন, আপনার মনে কোনো মন্দ আকাঙ্ক্ষা এসেছে আর আপনি সেটা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সেইসময়েও নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: ‘এটা প্রত্যাখ্যান করতে আমার কতটা সময় লেগেছে?’ যদি আপনার একটু সময় লেগে থাকে, তা হলে এরজন্য নিজেকে দোষ দেবেন না। এর পরিবর্তে, চিন্তা করুন, কী করলে পরের বার আপনি সঙ্গেসঙ্গে সেটা প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন। এর জন্য আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন: ‘আমি কি মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোকে আরও দ্রুত প্রত্যাখ্যান করতে পারি? আমি যে-ধরনের বিনোদন বাছাই করি, সেটার কারণে আমার পক্ষে কি এগুলো প্রত্যাখ্যান করা কঠিন হয়ে পড়ছে? কোনো নোংরা দৃশ্য আমার চোখের সামনে এলে আমি কি সঙ্গেসঙ্গে তা থেকে চোখ সরিয়ে নিই? যিহোবা চান, আমি যেন আত্মসংযম বজায় রাখি আর এটা করার জন্য অনেক প্রচেষ্টার প্রয়োজন, কিন্তু আমি কি বিশ্বাস করি, যিহোবার বাধ্য হওয়াই আমার জন্য ভালো?’—গীত. ১০১:৩.
১৯. ছোটো-ছোটো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে কীভাবে মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের জন্য কঠিন হতে পারে?
১৯ নিজেকে পরীক্ষা করার সময় খেয়াল রাখবেন, আপনি যেন আপনার ভুল কাজের জন্য মনে মনে কোনো যুক্তি না খোঁজেন। বাইবেলে লেখা রয়েছে, “অন্তঃকরণ সর্ব্বাপেক্ষা বঞ্চক, তাহার রোগ অপ্রতিকার্য্য” (যির. ১৭:৯) যিশুও বলেছিলেন, হৃদয় থেকে “মন্দ চিন্তা” আসে। (মথি ১৫:১৯) যেমন, একজন ব্যক্তি যিনি পর্নোগ্রাফি দেখা ছেড়ে দিয়েছেন, তিনি আবারও কিছুসময় পর কোনো অশ্লীল ছবি দেখে মনে মনে নিজেকে এই অজুহাত দিতে পারেন যে, ‘এটা তো খুব একটা খারাপ ছবি নয়, এখানে তো কাউকে নগ্ন দেখানো হয়নি।’ অথবা এটাও হতে পারে, একজন ব্যক্তি খারাপ কাজ করার বিষয়ে চিন্তা করছেন আর নিজেকে এই বলে অজুহাত দিচ্ছেন, ‘এতে কী এমন ভুল আছে? আমি তো শুধু চিন্তাই করছিলাম, কিছু তো আর করিনি।’ এটা এমন যেন তার বঞ্চক হৃদয় “মাংসিক আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করার জন্য আগে থেকে পরিকল্পনা” করছে। (রোমীয় ১৩:১৪) আপনি এই ধরনের অজুহাত দেওয়া থেকে কীভাবে নিজেকে দূরে রাখতে পারেন? মনে রাখুন, ছোটো-ছোটো ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের বড়ো-বড়ো ভুল করতে পরিচালিত করতে পারে। তাই, ভেবে-চিন্তে প্রতিটা সিদ্ধান্ত নিন।b মন্দ কাজ করার জন্য কোনো অজুহাত খুঁজবেন না, চেষ্টা করুন যেন আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ‘মন্দ চিন্তাকে’ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
২০. নতুন জগতের বিষয়ে আমরা কোন আশা রাখতে পারি এবং বর্তমানে কীভাবে আমরা মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি?
২০ আমরা যেমনটা শিখলাম, যিহোবা আমাদের মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোকে প্রতিরোধ করার শক্তি দেন। আমরা কতই-না কৃতজ্ঞ যে, যিহোবা আমাদের জন্য মুক্তির মূল্যের ব্যবস্থা করেছেন, যেটার ফলে আমরা নতুন জগতে চিরকাল বেঁচে থাকব। কল্পনা করুন, নতুন জগতে আমাদের আর মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে না! তখন যিহোবার সেবা করে, আমরা কতই-না আনন্দিত হব! কিন্তু, সেইসময় না আসা পর্যন্ত আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকতে পারি যে, আমরা মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব। আর এই ক্ষেত্রে আমরা একেবারেই দুর্বল ও অসহায় নই এবং এই মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলো মনের মধ্যে আসলেই যে, যিহোবা আমাদের দোষী বলে মনে করবেন, এমনটা নয়। মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করার প্রচেষ্টাকে, যিহোবা আশীর্বাদ করবেন। নিশ্চিত থাকুন, আমরা মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে অবশ্যই লড়াই করে জয়ী হব!
গান ১২২ দৃঢ় থাকো, সুস্থির থাকো
a এটার মানে কী? একজন ব্যক্তি যখন কোনো মন্দ কাজ করে, যেমন চুরি, ব্যভিচার অথবা হত্যা, তখন বাইবেলে সেটাকে “পাপ” বলা হয়েছে। (যাত্রা. ২০:১৩-১৫; ১ করি. ৬:১৮) বাইবেলের কিছু পদে আমাদের অসিদ্ধতাকেও “পাপ” বলা হয়েছে। আমরা জন্ম থেকেই পাপী আর এটা আমরা আদম ও হবার কাছ থেকে পেয়েছি। তাই, আমরা যদি কোনো মন্দ কাজ না-ও করি, তা হলেও আমরা পাপী।
b লক্ষ করুন, হিতোপদেশ ৭:৭-২৩ পদে বলা যুবক কীভাবে ছোটো-ছোটো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে যৌন অনৈতিকতার ফাঁদে পড়ে গিয়েছিল।
c ছবি সম্বন্ধে বর্ণনা: বাঁ-দিকে: একজন যুবক ভাই কফি শপে বসে আছেন এবং তিনি লক্ষ করছেন, দু-জন পুরুষ একে অন্যের প্রতি প্রেম প্রকাশ করছে। ডান দিকে: একজন বোন লক্ষ করছেন, দু-জন ব্যক্তি সিগারেট খাচ্ছে।