এক অশান্ত দেশে—প্রকৃত শান্তি খুঁজে পাওয়া
“সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দানব খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে,” ১৯৬৯ সালের একটা রিপোর্ট বলে। আর ঠিক তখন থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের অশান্ত অবস্থা ও অস্থিরতা বাড়তে শুরু করেছিল আর আজও তা বেড়ে চলেছে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং হত্যা খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছিল যখন প্রটেস্টান্ট ও ক্যাথলিক খুনিরা, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় “দুপক্ষের হিংস্র লোকেরা” আয়ারল্যান্ডের ক্ষমতা দখল করার জন্য তীব্র লড়াই করেছিল। সেই থেকে “৩০ বছর ধরে চলতে থাকা হিংস্র লড়াইয়ে ৩,৬০০ জনেরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছে এবং হাজার হাজার লোক পঙ্গু হয়েছে,” দি আইরিশ টাইমস্ বলে।
অবশ্য এই লড়াই নতুন কিছু নয়। কয়েকশ বছর ধরেই আয়ারল্যান্ডে এমন সংকটময় অবস্থা বিরাজ করছে। কয়েক বছর ধরে উত্তর আয়ারল্যান্ডে এই লড়াইয়ের পরিণাম ভয়াবহ হলেও, আয়ারল্যান্ডের সমস্ত লোকেদের জীবনই লড়াইয়ের তিক্ত অনুভূতি ও বিরোধের কারণে তছনছ হয়ে গেছে।
ওই অবস্থার মধ্যেও একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যিহোবার সাক্ষিরা এই অশান্ত দেশের সমস্যাগুলোর প্রকৃত সমাধান সম্বন্ধে ঘোষণা করে আসছেন। সেই সমাধান হল ঈশ্বরের রাজ্য, যার ক্ষমতা যীশু খ্রীষ্টের হাতে রয়েছে। (মথি ৬:৯, ১০) ১৯৬৯ সালে অশান্ত অবস্থা শুরু হওয়ার সময় আয়ারল্যান্ডে মাত্র ৮৭৬ জন যিহোবার সাক্ষি ছিলেন। এখন সেখানে ১০০টারও বেশি মণ্ডলীতে ৪,৫০০ জনেরও বেশি সাক্ষি আছেন। নিচে এমন কিছু ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা আছে, যারা রাজনৈতিক ও আধা-সামরিক কাজকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
“বড় হয়ে আমি আইআরএ-তে যোগ দেব!”
মাইকেলa আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের এক ক্যাথলিক পরিবারে বড় হয়েছিলেন। আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস এবং ব্রিটেনের সঙ্গে এর শত শত বছরের পুরনো লড়াই সম্বন্ধে তিনি স্কুলে কিছুটা শিখেছিলেন। ছেলেবেলাতেই ইংরেজদের প্রতি তার প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মেছিল যাদেরকে তিনি “আইরিশ লোকেদের শোষক” বলে মনে করতেন। তার বয়স যখন দশ বছর তখন তিনি তার দিদিমাকে বলেছিলেন, “বড় হয়ে আমি আইআরএ-তে (দি আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি) যোগ দেব!” তিনি বলেন, “আমার এখনও মনে আছে সেদিন দিদিমা আমাকে একটা চড় মেরেছিলেন।” পরে তিনি জানতে পারেন যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার দাদু ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ছিলেন। আইআরএ-র সদস্যদের হাত থেকে তার দাদুকে বাঁচানোর জন্য একবার তার দিদিমাকে তার দাদুর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল।
তারপরও, মাইকেল যখন বড় হন তিনি উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিকদের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, “তখন আমার মনে হয়েছিল যে একমাত্র আইআরএ-র লোকেরাই উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিকদের সাহায্য করার জন্য কিছু করছেন।” তিনি যে বিষয়টাকে ঠিক মনে করেছিলেন সেটাই তাকে আইআরএ-র একজন সদস্য হতে প্রেরণা দিয়েছিল আর তিনি অস্ত্র চালানোর ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তার তিনজন বন্ধু উত্তর আয়ারল্যান্ডের আধা-সামরিক প্রটেস্টান্ট সেনাদের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন।
আধা-সামরিক বাহিনীর লড়াইয়ের ওপর থেকে মাইকেলের সমস্ত মোহ কেটে গিয়েছিল কারণ আধা-সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন দলগুলোর দীর্ঘদিনের কলহ দেখে তিনি বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। আইআরএ-র জন্য কাজ করার অপরাধে তার জেল হয় আর সেখানে বসে তিনি স্থায়ী শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন। কিছুদিন পর যিহোবার সাক্ষিরা তার ঘরে আসেন। কিন্তু, পুরনো ভুল ধারণাগুলো সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সাক্ষিরা ছিলেন ইংরেজ। ইংরেজদের প্রতি তার প্রচণ্ড ঘৃণা থাকায় তাদের কথা শোনা তার জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে ওঠে। “আমি সবসময়ই আমার হাবভাব দিয়ে তাদের বুঝিয়ে দিতাম যে তাদের দেখে আমি একটুও খুশি হইনি,” তিনি বলেন, “কিন্তু তারা বার বার আসতেন এবং আমার সঙ্গে কথা বলতেন আর একসময় আমি দেখতে পাই যে ঈশ্বরের রাজ্য সবধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবিচারকে নির্মূল করে দেবে, যার জন্য আমি লড়াই করছিলাম।”—গীতসংহিতা ৩৭:১০, ১১; ৭২:১২-১৪.
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছিল যখন মাইকেল একদিন সন্ধ্যায় আইআরএ-র একজন সেনা অধিনায়কের সঙ্গে দেখা করেন। সেনা অধিনায়ক তাকে বলেছিলেন, “আপনার জন্য আমাদের এখানে খুব ভাল একটা চাকরি আছে।” “আমার মনে হয়েছিল যে ওই মুহূর্তেই আমার সিদ্ধান্ত নিতে হবে আর” মাইকেল বলেন, “আমি লম্বা দম নিয়ে বলেছিলাম, ‘এখন আমি একজন যিহোবার সাক্ষি,’ যদিও তখনও আমি বাপ্তিস্ম নিইনি। তখন আমি শুধু এটুকুই জানতাম যে আমি যিহোবার একজন দাস হতে চাই।” ওই অফিসার উত্তরে বলেছিলেন, “আপনাকে গুলি করে মারা হবে।” এই হুমকি সত্ত্বেও, মাইকেল আইআরএ ছেড়ে এসেছিলেন। তিনি তার মনে ও হৃদয়ে যিহোবার বাক্যকে কাজ করতে দিয়েছিলেন বলেই তা করার মতো সাহস তিনি পেয়েছিলেন। “পরে আমার স্ত্রী ও কয়েকজন ছেলেমেয়ে যিহোবার কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। এখন আমাদের প্রকৃত শান্তি আছে। আর আমরা সবসময় যিহোবার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব কারণ তিনি আমাদেরকে সত্য জানার এবং এক অশান্ত দেশে শান্তির খবর প্রচার করার সুযোগ করে দিয়েছেন।”—গীতসংহিতা ৩৪:১৪; ১১৯:১৬৫.
নিরপেক্ষ থাকা এক প্রকৃত সুরক্ষা
প্যাট্রিক বলেন, ‘আমি উত্তর আয়ারল্যান্ডের এক গ্রামে কাউন্টি ডেরিতে বড় হয়েছি। ছেলেবেলাতে অস্থির উত্তেজনা ছাড়া আমি আর কিছুই দেখিনি। ওই অবস্থা আমার মন ও চিন্তাভাবনার ওপর অনেক বেশি ছাপ ফেলেছিল।’ বিদ্বেষপূর্ণ জাতীয়তাবাদের প্রভাবে প্যাট্রিক চরমপন্থী মনোভাব ও ব্রিটিশদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে বড় হয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন যে লড়াইরত দুপক্ষের ধর্মপ্রাণ লোকেরাই খ্রীষ্টীয় শিক্ষার মূল নীতিগুলো আর সেইসঙ্গে মানুষের সাধারণ সৌজন্য বোধের নীতিগুলোকে মেনে চলেন না। ফলে তিনি ধর্মকর্ম করাই ছেড়ে দেন এবং শেষ পর্যন্ত একজন নাস্তিক ও গোঁড়া মার্কস্বাদী হয়ে ওঠেন।—মথি ১৫:৭-৯; ২৩:২৭, ২৮.
“আমার ছেলেবেলার স্মৃতির মধ্যে উত্তরের প্রজাতন্ত্র সমর্থনকারী কয়েদিদের অনশন ধর্মঘটের কথা আমার মনে আছে,” প্যাট্রিক বলেন। “সেগুলো আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। আমার মনে আছে আমি সব জায়গায় আইরিশ পতাকা লাগিয়েছিলাম এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শ্লোগান লিখেছিলাম। মাত্র ১৫ বছর বয়সে আমি অনশন ধর্মঘটে মারা যাওয়া একজন কয়েদির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার তত্ত্বাবধায়ক হয়েছিলাম।” সেই বিক্ষোভ এবং বিশৃঙ্খলাপূর্ণ সময়ে আরও অনেকের মতো প্যাট্রিকও দাঙ্গা-হাঙ্গামায় অংশ নিয়েছিলেন এবং তার দৃষ্টিতে যা সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা বলে মনে হয়েছিল, তা পাওয়ার চেষ্টায় প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বেশ কিছু চরম জাতীয়তাবাদী লোকেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব করেছিলেন, যাদের অনেককে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জেলে ভরেছিল।
প্যাট্রিক বলেন, ‘তখন টাকাপয়সার সমস্যার কারণে আমি আর ইংল্যান্ডে থাকিনি। আমি যখন সেখানে ছিলাম তখন ব্রিটিশ পুলিশ আমার এক বন্ধুকে গ্রেপ্তার করেছিলেন, যে বোমা হামলায় অংশ নিয়েছিল।’ প্যাট্রিক যদিও তখন পর্যন্ত জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করতেন তবুও, তার মনোভাব পালটাতে শুরু করে। তিনি বুঝতে পারেন যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে তার যত ভুল ধারণা ছিল সেগুলোর আসলে কোন সঠিক ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, “এছাড়াও আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে কোন আধা-সামরিক সেনাবাহিনী কখনই সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান করতে পারবে না এবং যে অবিচার দেখে আমি কষ্ট পেয়েছিলাম তা দূর করতে পারবে না। যারা ওই সেনাবাহিনীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন তাদের মধ্যেও অনেক দুর্নীতি এবং অন্যায় ছিল।”—উপদেশক ৪:১; যিরমিয় ১০:২৩.
শেষ পর্যন্ত প্যাট্রিক উত্তর আয়ারল্যান্ডে ফিরে গিয়েছিলেন। “আমি যখন সেখানে চলে আসি তখন আমার এক বন্ধু আমাকে যিহোবার সাক্ষিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।” সাক্ষিদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়নের ফলে প্যাট্রিক মানুষে মানুষে লড়াই ও বিরোধের সত্যিকারের সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন। বাইবেলের নীতিগুলো তার মন ও হৃদয়ে কাজ করতে শুরু করে আর তিনি আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে দ্রুত উন্নতি করেন। (ইফিষীয় ৪:২০-২৪) তিনি বলেন, ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য সংগ্রাম না করে এখন আমি বাইবেল থেকে শান্তির খবর প্রচার করি, এমনকি সরকারি এলাকাগুলোতেও যাই, যেখানে আমি আগে কখনও যাওয়ার সাহস করিনি। সত্যি বলতে কী, বেলফাস্টে যখন অনেক লোক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিহত হয়েছিল তখন সরকারি ও জাতীয়তাবাদী এলাকাগুলোতে একমাত্র যিহোবার সাক্ষিরাই অস্ত্র-প্রতিরোধী গাড়ি ছাড়া অনায়াসে ঘোরাফেরা করতে পারতেন।’ উত্তর আয়ারল্যান্ডের অন্যান্য সাক্ষিদের মতো সেই সময় তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে প্রথম শতাব্দীর খ্রীষ্টানদের মতো নিরপেক্ষ থাকাই হল সত্যিকারের সুরক্ষা। (যোহন ১৭:১৬; ১৮:৩৬) তিনি এই কথা বলে শেষ করেন: “এটা দেখে খুবই স্বস্তি পাওয়া যায় যে যীশু খ্রীষ্টের মাধ্যমে যিহোবা সমস্ত মানবজাতিকে প্রকৃত ন্যায়বিচার দেবেন এবং দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত করবেন।”—যিশাইয় ৩২:১, ১৬-১৮.
“বন্দুকগুলোই ছিল আমার একমাত্র সুরক্ষা”
“আমি যেখানে বড় হয়েছি সেখানে রাজনীতি ও ধর্মের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না,” উইলিয়াম বলেন। “আমার মনের মধ্যে প্রটেস্টান্টদের ভুল ধারণাগুলো গেঁথে গিয়েছিল আর তাই আমি ক্যাথলিকদের প্রচণ্ড ঘৃণা করতাম। এমনকি সম্ভব হলে আমি ক্যাথলিকদের দোকানে পর্যন্ত যেতাম না আর আমি শুধু একবার আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রে গিয়েছিলাম। আমি প্রটেস্টান্টদের বিভিন্ন দল ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছিলাম, এর মধ্যে যেমন একটা ছিল অরেঞ্জ অর্ডার—যে সংগঠনটা প্রটেস্টান্ট ধর্ম এবং জীবনের পথকে রক্ষা করার জন্য নিয়োজিত।” উইলিয়ামের বয়স যখন ২২ বছর, তিনি আলস্টার ডিফেন্স রেজিমেন্টে যোগ দেন, যেটা ছিল সেখানকার ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটা শাখা। সেখানকার বেশির ভাগ সদস্যই ছিলেন প্রটেস্টান্ট। তিনি তার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য তাদেরকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। “আমি কয়েকটা বন্দুক কিনেছিলাম এবং দরকারে সেগুলোকে কাজে লাগাতে একটুও দ্বিধা করিনি। রাতে শোবার সময়ও আমি আমার বালিশের নিচে একটা বন্দুক রাখতাম।”
কিন্তু, তার জীবনে এমন কিছু ঘটে যা সবকিছু পালটে দেয়। “আমি যখন একজন যিহোবার সাক্ষির সঙ্গে বাড়ি মেরামতের কাজ করি তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তাদের মধ্যে বিশেষ কিছু আছে। আমার সহকর্মী আমার ওপর গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিলেন। একসঙ্গে বাড়ি তৈরি করার সময় আমি তাকে সমস্যা, ধর্ম এবং ঈশ্বর সম্বন্ধে বিভিন্ন প্রশ্ন করেছিলাম, যে প্রশ্নগুলো আমাকে খুব চিন্তায় ফেলেছিল। তার সহজ, স্পষ্ট উত্তর আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে যিহোবার সাক্ষিরা আসলে ঐক্যবদ্ধ, শান্তিপ্রিয় এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে নিরপেক্ষ, যাদের ঈশ্বর ও প্রতিবেশীদের জন্য প্রগাঢ় ভালবাসা আছে।”—যোহন ১৩:৩৪, ৩৫.
বাইবেল অধ্যয়নের চার মাসের মধ্যেই উইলিয়াম সমস্ত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে নিজের নাম কাটিয়ে নেন। “সেটা ছিল আমার জীবনের এক বিরাট পদক্ষেপ,” তিনি মনে করে বলেন, “কারণ আমাকে সেই রীতিনীতিগুলোকে বাদ দিতে হয়েছিল যা আমি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে আসছিলাম।” কিন্তু, তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তখনও আসেনি। “উত্তর আয়ারল্যান্ডের অবস্থার কথা ভেবে আমি মনে করেছিলাম যে আমার বন্দুকগুলোই ছিল আমার একমাত্র সুরক্ষা। আমি আইআরএ আধা-সামরিক বাহিনীর ‘লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত হয়েছিলাম। তাই এই অস্ত্রগুলোকে ফেলে দেওয়া আমার জন্য খুবই কঠিন ছিল।” কিন্তু, ধীরে ধীরে বাইবেলের পরামর্শ, যেমন যিশাইয় ২:২-৪ পদের কথাগুলো তাঁর মনোভাব পালটে দেয়। তিনি অবশেষে বুঝতে পারেন যে যিহোবাই হলেন তার প্রকৃত সুরক্ষা, ঠিক যেভাবে তিনি প্রথম শতাব্দীর খ্রীষ্টানদের রক্ষা করেছিলেন। আর উইলিয়াম তার বন্দুকগুলো ফেলে দেন।
উইলিয়াম বলেন, “যে কারণে এখন আমি সত্যিই অনেক খুশি তা হল আমার এখন সেই লোকেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও অটুট বন্ধুত্ব আছে, যাদের আমি একসময় প্রাণের শত্রু বলে মনে করতাম। এছাড়াও, বাইবেল থেকে আশার বার্তা নিয়ে সেইসব লোকেদের কাছে যাওয়াও আমাকে সত্যিকারের আনন্দ দেয়, যে এলাকাগুলো আগে আমার জন্য ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ ছিল। সত্য আমার ও আমার পরিবারের জন্য যা করেছে তা ভেবে আমি যিহোবা ও তাঁর সংগঠনের কাছে চির কৃতজ্ঞ।”
“আমার কাছে এগুলোর কোন অর্থই ছিল না”
রবার্ট ও টেরেসা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ থেকে এসেছিলেন। “আমি এক ধর্মপ্রাণ প্রটেস্টান্ট পরিবার থেকে এসেছি,” রবার্ট বলেন। “আমার কিছু আত্মীয় আধা-সামরিক বাহিনীতে কাজ করতেন। আমিও ১৯ বছর বয়সে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আলস্টার ডিফেন্স রেজিমেন্টে যোগ দিই। বেশির ভাগ সময়ই আমি টেরেসাদের এলাকা টহল দিতাম। এক রাতে আমাকে টহল দেওয়ার বদলে অন্য কাজ দেওয়া হয়। ওই রাতে আমি যে গাড়িতে করে যাচ্ছিলাম তা দুর্ঘটনায় পড়ে এবং এতে দুজন সৈনিক মারা যান ও দুজন আহত হন।”
রবার্ট তখন জীবনের অর্থ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। “আমার সবসময় ঈশ্বরে বিশ্বাস ছিল কিন্তু আমি যখন উত্তর আয়ারল্যান্ডের অবস্থা দেখতাম, তখন আমার কাছে এগুলোর কোন অর্থই ছিল না। আমি আসলে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করেছিলাম। আমি ঈশ্বরের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে ঈশ্বর সত্যিই আছেন কি না আর তিনি যদি সত্যিই থেকে থাকেন, তাহলে আমাকে যেন সঠিক পথ দেখান। আমার মনে আছে আমি ঈশ্বরকে বলেছিলাম যে কোথাও না কোথাও একটা সত্য ধর্ম নিশ্চয়ই আছে!” মাত্র কয়েকদিন পরই, একজন যিহোবার সাক্ষি রবার্টের ঘরে আসেন এবং তাকে কিছু বইপত্রিকা দিয়ে যান। গভীর রাতে টহলের কাজ শেষ করে রবার্ট যখন ঘরে ফেরেন তখন তিনি সেগুলো পড়তে শুরু করেন এবং ভোর পাঁচটা পর্যন্ত সেগুলো পড়ে শেষ করেন। “সঙ্গে সঙ্গে আমি সত্যের ধ্বনি শুনতে পাই,” তিনি বলেন, “আর আমি দেখেছিলাম যে সবকিছু সরাসরি বাইবেল থেকে বলা হয়েছিল।” (২ তীমথিয় ৩:১৬) তিনি বাইবেল অধ্যয়ন করতে শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ঈশ্বরের কাছে তার জীবন উৎসর্গ করেন।
“সাক্ষিরা সবসময় আমাদের বাইবেল থেকে দেখাতেন”
অন্যদিকে টেরেসা এসেছিলেন ক্যাথলিক পরিবার থেকে আর তার মধ্যে গভীর জাতীয়তাবাদী মনোভাব ছিল। “যুবতী হিসেবে আমি শিন ফ্যান-এb যোগ দিয়েছিলাম।” টেরেসা স্বীকার করেন: “এতে আমি আধা-সামরিক বাহিনীর সঙ্গেও কিছুটা জড়িত হয়ে পড়ি। আমি সৈনিকদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করার কাজে সাহায্য করেছিলাম। আমার এলাকায় কী হচ্ছিল না হচ্ছিল সেই বিষয়ে আমি সবসময় আইআরএ-কে খবরাখবর দিতাম। এছাড়াও, পুলিশ ও সৈনিকরা যখন টহল দিত তখন আমি হামলা করতাম ও তাদের পাথর ছুঁড়তাম।”
টেরেসার পরিবারের কয়েকজন যখন যিহোবার সাক্ষিদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করতে শুরু করেন তখন তার মধ্যেও কিছুটা কৌতূহল জেগে ওঠে। ঈশ্বরের বাক্যের ক্ষমতা তার মনে গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিল। “বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর সাক্ষিরা সবসময় আমাদের বাইবেল থেকে দেখাতেন,” তিনি বলেন। “দানিয়েল ২:৪৪ পদের প্রতিজ্ঞা সত্যি সত্যি তার চোখ খুলে দেয়। আমি দেখতে পেয়েছিলাম যে ঈশ্বরের রাজ্য ছিল সমস্ত অন্যায় সরিয়ে ফেলার প্রকৃত মাধ্যম, যেগুলোর বিরুদ্ধে আমি লড়াই করছিলাম।” সৈনিকদের কিছু নৃশংস কাজ দেখে তার মনে আচমকাই এক বিরাট পরিবর্তন আসে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টেরেসা বুঝতে পারেন না যে কেন সহানুভূতিপূর্ণ ও বিবেকবান লোকেরা কোন সন্ত্রাসী আক্রমণের কথা শুনে খুশি হয়, যেখানে সৈনিক কিংবা সাধারণ মানুষ মারা গেছে বা পঙ্গু হয়েছে এবং তাদের পরিবারগুলোর জন্য অনেক দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে এসেছে। তিনিও বাইবেলের সত্যের প্রতি আগ্রহ দেখান এবং ঈশ্বরের নীতিগুলোর মাধ্যমে তার চিন্তাভাবনাকে পরিবর্তন করেন। তিনি ঈশ্বরের কাছে তার জীবন উৎসর্গ করেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাপ্তিস্ম নেন।—হিতোপদেশ ২:১-৫, ১০-১৪.
উত্তর আয়ারল্যান্ডে যিহোবার সাক্ষিদের মণ্ডলীর এক সভায় টেরেসা এবং রবার্টের দেখা হয়। টেরেসা বলেন: “রবার্টের সঙ্গে আমার প্রথম যখন দেখা হয় তখন আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে আমি এমন একজনের সঙ্গে এত শান্ত ও ঠাণ্ডা মেজাজে কথা বলছিলাম, যাকে কিছুদিন আগেও আমি ব্রিটিশদের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থার অংশ বলে মনে করতাম। অনেক দিন ধরে যে ঘৃণা ও ভুল ধারণা আমি পোষণ করে আসছিলাম, ঈশ্বরের বাক্য নিশ্চয়ই আমাকে সেগুলো সরিয়ে ফেলতে সাহায্য করেছে।” তিনি এবং রবার্ট দেখেছিলেন যে আলাদা রীতিনীতি ও সংস্কৃতির কারণে তাদের মধ্যে যে ঘৃণা ও ভুল ধারণা জন্ম নিয়েছিল সেগুলোর দ্বারা বিভক্ত হওয়ার বদলে তারা এখন অনেক দিক দিয়েই একমত। এর মধ্যে সবচেয়ে জোরালো ছিল যিহোবার প্রতি তাদের ভালবাসা। তারা দুজনে বিয়ে করেন। এখন তারা দুজনে এই অশান্ত দেশের সব ধরনের লোকেদের কাছে ঈশ্বরের প্রকৃত শান্তির বার্তা ও বিশ্বাস প্রচার করেন।
আয়ারল্যান্ডের অন্যান্যদেরও এইরকম অভিজ্ঞতা আছে। ঈশ্বরের অনুপ্রাণিত বাক্যের শিক্ষা শুনে ও মেনে নিয়ে তারা মানুষের ‘দর্শনবিদ্যা ও অনর্থক প্রতারণা’ থেকে রক্ষা পেয়েছেন। (কলসীয় ২:৮) এখন তারা বাইবেলে লেখা ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞায় পুরোপুরি বিশ্বাস রাখেন। যিহোবার সাক্ষিরা খুবই খুশি যে তারা সকলের কাছে এক শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের কথা জানাচ্ছেন—যা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং অন্য ধরনের দৌরাত্ম্য থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকবে।—যিশাইয় ১১:৬-৯.
[পাদটীকাগুলো]
a নাম পালটে দেওয়া হয়েছে।
b একটা রাজনৈতিক দল যা অস্থায়ী আইআরএ-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত।
[১০ পৃষ্ঠার চিত্র]
উত্তর আয়ারল্যান্ডের সব জায়গায় দেয়ালে দেয়ালে আধা-সামরিক বাহিনীর লড়াইয়ের বিষয়ে প্রশংসা বাক্য লেখা হয়েছে