তারা যিহোবার ইচ্ছা পালন করেছিলেন
পৌল উচ্চপদস্থদের সামনে সাহসের সঙ্গে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন
এই দুজন ব্যক্তির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য ছিল। একজন ছিলেন মুকুট পরিহিত আর অন্যজন শৃঙ্খলাবদ্ধ। একজন রাজা; অন্যজন এক কারাবন্দি। কারাগারে দুবছর থাকার পর, প্রেরিত পৌল এখন যিহূদীদের শাসক, হেরোদ দ্বিতীয় আগ্রিপ্পের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজা ও তার সঙ্গিনী বর্ণীকী “মহা আড়ম্বরের সহিত আসিলেন, এবং সহস্রপতিগণের ও নগরের প্রধান লোকদের সহিত সভাস্থলে প্রবিষ্ট হইলেন।” (প্রেরিত ২৫:২৩) একটি তথ্যমূলক গ্রন্থ বলে: “সেখানে সম্ভবত কয়েক শত লোক উপস্থিত ছিলেন।”
নব নিযুক্ত রাজ্যপাল ফীষ্ট সভার আয়োজন করেছিলেন। তার পূর্ববর্তী রাজ্যপাল, ফীলিক্স চেয়েছিলেন যে পৌল কারাগারেই পড়ে থাকুক। কিন্তু ফীষ্ট পৌলের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলির ন্যায্যতা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করেছিলেন। তিনি যে নির্দোষ সেই সম্বন্ধে পৌল এত বেশি দৃঢ় ছিলেন যে তিনি তার মামলাটি কৈসরের নিকটে উপস্থিত করার দাবি জানিয়েছিলেন! পৌলের মামলা রাজা আগ্রিপ্পের কৌতুহল জাগিয়েছিল। “আমিও সেই ব্যক্তির নিকটে কথা শুনিতে চাহিয়াছিলাম,” তিনি বলেছিলেন। রাজা এই অসাধারণ কারাবন্দি সম্বন্ধে কী বিবেচনা করবেন হয়ত সেটি ভেবেই, ফীষ্ট তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করেছিলেন।—প্রেরিত ২৪:২৭–২৫:২২.
পরের দিন, পৌলকে উচ্চপদস্থদের এক বিশাল সমাবেশের সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল। “অদ্য আপনার সাক্ষাতে আত্মপক্ষ সমর্থন করিতে পাইতেছি, এজন্য আমি আমাকে ধন্য মনে করি,” তিনি আগ্রিপ্পকে বলেছিলেন, “বিশেষ কারণ এই, যিহূদীদের সমস্ত রীতিনীতি ও তর্ক সম্বন্ধে আপনি অভিজ্ঞ। অতএব নিবেদন করি, সহিষ্ণুতাপূর্ব্বক আমার কথা শ্রবণ করুন।”—প্রেরিত ২৬:২, ৩.
পৌলের সাহসী আত্মপক্ষসমর্থন
প্রথমে, পৌল আগ্রিপ্পকে খ্রীষ্টানদের তাড়নাকারী হিসাবে তার অতীত জীবন সম্বন্ধে বলেছিলেন। “আমি তাঁহাদিগকে . . . বলপূর্ব্বক ধর্ম্মনিন্দা করাইতে চেষ্টা করিতাম,” তিনি বলেছিলেন। “বিদেশীয় নগর পর্য্যন্তও তাঁহাদিগকে তাড়না করিতাম।” পৌল বর্ণনা করে চলেছিলেন যে কিভাবে তিনি এক অত্যন্ত উদ্দীপনামূলক দর্শন পেয়েছিলেন যেখানে পুনরুত্থিত যীশু তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “‘কেন আমাকে তাড়না করিতেছ? কন্টকের মুখে পদাঘাত করা তোমার দুষ্কর।’”a—প্রেরিত ২৬:৪-১৪.
তারপর যীশু শৌলকে “যে যে বিষয়ে . . . দেখিয়াছ, ও যে যে বিষয়ে আমি তোমাকে দর্শন দিব, সেই সকল বিষয়ে” সমস্ত জাতির লোকেদের কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পৌল বর্ণনা করেছিলেন যে তার কার্যভার পরিপূর্ণ করার জন্য তিনি পরিশ্রমের সঙ্গে প্রচেষ্টা করেছিলেন। অধিকন্তু, তিনি আগ্রিপ্পকে বলেছিলেন, “এই কারণ যিহূদীরা ধর্ম্মধামে আমাকে ধরিয়া বধ করিতে চেষ্টা করিতেছিল।” যিহূদীধর্মের প্রতি আগ্রিপ্পের আগ্রহ সৃষ্টি করে, পৌল জোর দিয়ে বলেছিলেন যে তার সাক্ষ্য প্রকৃতই মশীহের মৃত্যু ও পুনরুত্থান সম্বন্ধে “ভাববাদিগণ এবং মোশিও যাহা ঘটিবে বলিয়া গিয়াছেন, ইহা ছাড়া আর কিছুই” অন্তর্ভুক্ত করে না।—প্রেরিত ২৬:১৫-২৩.
ফীষ্ট মাঝ পথে বাধা দিয়েছিলেন। “বহু বিদ্যাভ্যাস তোমাকে পাগল করিয়া তুলিতেছে,” তিনি বলেছিলেন। পৌল উত্তর দিয়েছিলেন: “হে মহামহিম ফীষ্ট, আমি পাগল নহি, কিন্তু সত্যের ও সুবোধের উক্তি প্রচার করিতেছি।” পৌল তারপর আগ্রিপ্প সম্বন্ধে বলেছিলেন: “রাজা এ সকল বিষয় জানেন, আর তাঁহারই সাক্ষাতে আমি সাহসপূর্ব্বক কথা কহিতেছি; কারণ আমার ধারণা এই যে, ইহার কিছুই রাজার অগোচর নহে; যেহেতুক ইহা কোণের মধ্যে করা যায় নাই।”—প্রেরিত ২৬:২৪-২৬.
তারপর পৌল সরাসরি আগ্রিপ্পকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন। “হে রাজন্ আগ্রিপ্প, আপনি কি ভাববাদিগণকে বিশ্বাস করেন?” প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে আগ্রিপ্পকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। সর্বোপরি, তাকে তার নিজস্ব ভাবমূর্তি বজায় রাখতে হত আর পৌলের সঙ্গে একমত হওয়ার অর্থ হত ফীষ্ট যাকে “পাগল” বলেছিলেন তার পক্ষাবলম্বন করা। সম্ভবত আগ্রিপ্পের দ্বিধা সম্বন্ধে বুঝতে পেরে, পৌল তার নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়েছিলেন। “আমি জানি আপনি বিশ্বাস করেন,” তিনি বলেছিলেন। (বাঁকা অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।) আগ্রিপ্প তখন কথা বলেছিলেন কিন্তু কথার দ্বারা তিনি তার মনোভাব প্রকাশ পেতে দেননি। তিনি পৌলকে বলেছিলেন, “তুমি অল্পেই আমাকে খ্রীষ্টীয়ান করিতে চেষ্টা পাইতেছ।”—প্রেরিত ২৬:২৭, ২৮.
পৌল দক্ষতার সঙ্গে, আগ্রিপ্পের কৌশলী বক্তব্যটিকে একটি শক্তিশালী বিষয় তুলে ধরার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। “ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা করিতেছি,” তিনি বলেছিলেন, “অল্পে হউক কি অধিকে হউক, কেবল আপনি নন, কিন্তু অন্য যত লোক অদ্য আমার কথা শুনিতেছেন, সকলেই যেন এই বন্ধন ছাড়া আমি যেমন, তেমনি হন।”—প্রেরিত ২৬:২৯.
আগ্রিপ্প ও ফীষ্ট পৌলের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া কিংবা বন্দি করে রাখার যোগ্য কোন দোষই খুঁজে পাননি। তবুও, কৈসরের নিকটে তার মামলা উপস্থিত করার জন্য তার অনুরোধকে বাতিল করা যেতে পারে না। সেই কারণে আগ্রিপ্প ফীষ্টকে বলেছিলেন: “এই ব্যক্তি যদি কৈসরের নিকটে আপীল না করিত, তবে মুক্তি পাইতে পারিত।”—প্রেরিত ২৬:৩০-৩২.
আমাদের জন্য শিক্ষা
উচ্চপদস্থদের সামনে পৌলের সাক্ষ্য দেওয়ার ধরন আমাদের জন্য একটি লক্ষণীয় দৃষ্টান্ত প্রদান করে। রাজা আগ্রিপ্পের সঙ্গে কথা বলার সময়, পৌল বিচক্ষণতা ব্যবহার করেছিলেন। তিনি নিঃসন্দেহে আগ্রিপ্প ও বর্ণীকীকে ঘিরে যে কলঙ্কজনক ঘটনাগুলি ছিল সেই সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। তাদের মধ্যে অজাচারপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, কারণ প্রকৃতপক্ষে বর্ণীকী আগ্রিপ্পের বোন ছিলেন। কিন্তু ওই উপলক্ষে পৌল নৈতিকতার উপর বক্তৃতা দেওয়া বেছে নেননি। পরিবর্তে, তিনি সেই বিষয়গুলির উপর জোর দিয়েছিলেন যেগুলিতে তিনি ও আগ্রিপ্প একমত ছিলেন। অধিকন্তু, পৌল যদিও ফরীশী পণ্ডিত গমলীয়েলের দ্বারা শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তবুও তিনি স্বীকার করেছিলেন যে আগ্রিপ্প যিহূদী রীতিগুলি সম্বন্ধে অভিজ্ঞ ছিলেন। (প্রেরিত ২২:৩) আগ্রিপ্পের ব্যক্তিগত নীতিবোধ জানা সত্ত্বেও, পৌল তার সঙ্গে সম্মানপূর্বক কথা বলেছিলেন কারণ আগ্রিপ্প এক কর্তৃত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।—রোমীয় ১৩:৭.
যখন আমরা আমাদের বিশ্বাস সম্বন্ধে সাহসের সঙ্গে সাক্ষ্য দিই, তখন শ্রবণকারীদের অপরিচ্ছন্ন অভ্যাসগুলি প্রকাশ করে দেওয়া কিংবা নিন্দা করা আমাদের লক্ষ্য নয়। পরিবর্তে, সত্য গ্রহণ করাকে তাদের পক্ষে সহজ করে দেওয়ার জন্য, আমাদের সুসমাচারের ইতিবাচক দিকগুলির প্রতি জোর দেওয়া এবং আমাদের সকলের যে আশাগুলি আছে তা তুলে ধরা উচিত। যারা বয়স্ক ও যারা কর্তৃত্বে আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলার সময়, আমাদের তাদের পদমর্যাদাকে স্বীকার করা উচিত। (লেবীয় পুস্তক ১৯:৩২) এইভাবে, আমরা পৌলকে অনুকরণ করতে পারি যিনি বলেছিলেন: “সর্ব্বথা কতকগুলি লোককে পরিত্রাণ করিবার জন্য আমি সর্ব্বজনের কাছে সর্ব্ববিধ হইলাম।”—১ করিন্থীয় ৯:২২.
[পাদটীকাগুলো]
a “কন্টকের মুখে পদাঘাত” অভিব্যক্তিটি একটি ষাড়ের আচরণকে বর্ণনা করে যেটি পশুকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ও চালনা করার জন্য তৈরি তীক্ষ্ণ দণ্ডে পদাঘাত করার দ্বারা নিজেকে আঘাত করে। একইভাবে, খ্রীষ্টানদের তাড়না করার দ্বারা শৌল কেবল তার নিজের ক্ষতিই নিয়ে আসবেন যেহেতু তিনি এমন একটি দলের সঙ্গে লড়াই করছিলেন যাদের ঈশ্বরের সমর্থন ছিল।