ভয়ঙ্কর পরীক্ষার মধ্যেও সুরক্ষিত
এভা যোসেফসন দ্বারা কথিত
আমাদের ছোট দলটি খ্রীষ্টীয় পরিচর্যায় বের হওয়ার আগে এক সংক্ষিপ্ত সভার জন্য হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের জেলা উইপেস্টে একত্রিত হয়েছিল। এটি ছিল ১৯৩৯ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অল্প সময় পূর্বে আর তখন হাঙ্গেরিতে যিহোবার সাক্ষীদের প্রচার কাজ নিষিদ্ধ ছিল। ওই সময়ে যারা জনসাধারণ্যে বাইবেল শিক্ষা দেওয়ায় অংশ নিতেন তারা প্রায়ই গ্রেপ্তার হতেন।
যেহেতু ওই কাজে সেটিই ছিল আমার প্রথম অংশগ্রহণ, তাই আমাকে অবশ্যই কিছুটা উদ্বিগ্ন এবং ফ্যাকাশে দেখিয়েছিল। একজন বয়স্ক খ্রীষ্টীয় ভাই আমার কাছে এসে বলেছিলেন: “এভা, একেবারেই ভয় করো না। যিহোবার সেবা করাই হল সর্বাধিক সম্মান যা একজন মানুষের থাকতে পারে।” ওই সহানুভূতিপূর্ণ এবং শক্তিশালী বাক্যগুলি আমাকে অনেক ভয়ঙ্কর পরীক্ষার মধ্যেও সুরক্ষিত থাকতে সাহায্য করেছিল।
এক যিহূদী পটভূমি
পাঁচ সন্তানের একটি যিহূদী পরিবারে আমি ছিলাম বড় সন্তান। মা যিহূদী ধর্ম নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না বলে তিনি অন্য ধর্মগুলি পরীক্ষা করতে শুরু করেছিলেন। এইভাবেই তিনি অপর একজন যিহূদী মহিলা এরজাবেথ স্লেজিংজারের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন, যিনিও বাইবেল সত্যের অন্বেষণ করছিলেন। এরজাবেথ মাকে যিহোবার সাক্ষীদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন আর ফলস্বরূপ আমিও বাইবেল শিক্ষাগুলির প্রতি গভীর আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। শীঘ্রই আমি যা কিছু শিখেছিলাম অন্যদের সাথে তা বন্টন করতে শুরু করেছিলাম।
১৯৪১ সালের গ্রীষ্মকালে আমার যখন ১৮ বছর বয়স হয়, তখন আমি ডেনিউব নদীতে বাপ্তিস্মের মাধ্যমে যিহোবা ঈশ্বরের প্রতি আমার উৎসর্গীকরণকে চিহ্নিত করেছিলাম। মাও একই সময়ে বাপ্তাইজিত হয়েছিলেন কিন্তু বাবা আমাদের নতুন পাওয়া খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসে অংশ নেননি। আমার বাপ্তিস্মের কিছুদিন পরেই, আমি অগ্রগামীর কাজ অর্থাৎ পূর্ণ সময়ের পরিচর্যায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। আমার একটি সাইকেলের প্রয়োজন ছিল আর তাই একটি বৃহৎ বয়ন কারখানার রসায়নাগারে আমি কাজ শুরু করেছিলাম।
পরীক্ষার শুরু
নাৎসীরা হাঙ্গেরি দখল করে নিয়েছিল এবং আমি যে কারখানায় কাজ করতাম সেটি জার্মান ব্যবস্থাপনাধীনে এসেছিল। নাৎসীদের প্রতি বশ্যতার একটি শপথ গ্রহণ করার জন্য একদিন সমস্ত কর্মীদের তত্ত্বাবধায়কদের সামনে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল। আমাদের বলা হয়েছিল যে এটি না করলে পরিণতি গুরুতর হবে। অনুষ্ঠান চলাকালে আমাদের হিটলারের জয়ধ্বনি করার জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছিল, আমি সম্মানপূর্বক দাঁড়িয়েছিলাম কিন্তু আদেশকৃত কাজটি করিনি। সেই দিনই অফিসে ডেকে নিয়ে আমার বেতন দিয়ে আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। যেহেতু কাজ দুষ্প্রাপ্য ছিল, তাই আমার অগ্রগামী কাজের পরিকল্পনা নিয়ে আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু, পরের দিন আমি আরও ভাল বেতনের একটি নতুন কাজ পেয়েছিলাম।
আর তখনই আমার অগ্রগামী কাজের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়েছিল। আমার কয়েকজন অগ্রগামী সঙ্গী ছিলেন এবং আমার শেষ সঙ্গী ছিলেন ইয়ুলিস্কা এসটালস। অর্পণ করার মত কোন সাহিত্য না থাকায় আমরা পরিচর্যায় কেবল আমাদের বাইবেল ব্যবহার করতাম। আগ্রহী লোকেদের খুঁজে পেলে আমরা পুনর্সাক্ষাৎ করতাম ও তাদেরকে সাহিত্য ধার দিতাম।
ইয়ুলিস্কা ও আমাকে বার বার আমাদের প্রচার কাজের এলাকা পরিবর্তন করতে হত। এর কারণ, একজন যাজক যখন জানতে পেরেছিলেন যে আমরা ‘তার মেষদের’ সাথে সাক্ষাৎ করছি তখন তিনি গির্জায় ঘোষণা করেছিলেন, যদি যিহোবার সাক্ষীরা তাদের কাছে আসেন তাহলে তাদের অবশ্যই তার কাছে অথবা পুলিশের কাছে সেটি জানাতে হবে। বন্ধুত্বপরায়ণ লোকেরা যখন আমাদের এইধরনের একটি ঘোষণা সম্বন্ধে জানিয়েছিলেন, তখন আমরা অন্য একটি এলাকায় গিয়েছিলাম।
একদিন ইয়ুলিস্কা ও আমি একটি অল্পবয়স্ক ছেলের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম যে আগ্রহ দেখিয়েছিল। তাকে কিছু সাহিত্যাদি পড়ার জন্য ধার দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা তার সাথে পুনর্সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু আমরা যখন ফিরে গিয়েছিলাম, তখন সেখানে পুলিশ ছিল এবং আমাদের গ্রেপ্তার করে ডুনাভেচের পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমাদের ধরার জন্য ছেলেটিকে ফাঁদ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আমরা পুলিশ স্টেশনে পৌঁছানোর পর সেখানে একজন যাজককে দেখতে পাই এবং বুঝতে পারি যে তিনিও জড়িত ছিলেন।
আমার সর্বাপেক্ষা কঠিন পরীক্ষা
পুলিশ স্টেশনে আমার মাথা কামিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রায় বারজন পুলিশের সামনে আমাকে উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। হাঙ্গেরিতে আমাদের নেতা কে ছিলেন তা জানতে চেয়ে তারা আমাকে জেরা করেছিলেন। আমি ব্যাখ্যা করেছিলাম যে যীশু খ্রীষ্ট ছাড়া আমাদের আর কোন নেতা নেই। তারা তাদের লাঠি দিয়ে আমাকে নির্মমভাবে মেরেছিলেন কিন্তু আমি আমার খ্রীষ্টীয় ভাইদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি।
পরে তারা আমার পা দুটো একসাথে বেঁধেছিলেন এবং আমার হাত মাথার উপরে তুলে সেগুলিও একসাথে বেঁধেছিলেন। তারপর, একজন পুলিশ ছাড়া অন্য সকলে একজনের পর একজন করে আমাকে ধর্ষণ করেছিলেন। আমাকে এত শক্ত করে বাঁধা হয়েছিল যে তিন বছর পরেও আমার কব্জিতে দাগ রয়ে গিয়েছিল। আমার সাথে এতটাই পাশবিক আচরণ করা হয়েছিল যে আমার সর্বাধিক তীব্র ক্ষতগুলি কিছুটা আরোগ্য না হওয়া পর্যন্ত আমাকে দুই সপ্তাহের জন্য ভুগর্ভস্থ ঘরে রাখা হয়েছিল।
স্বস্তির এক সময়
পরে আমাকে নাজকোনিজোর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেখানে অনেক যিহোবার সাক্ষী ছিলেন। বন্দীদশা সত্ত্বেও আমাদের তুলনামূলকভাবে দুটি সুখের বছর কেটেছিল। আমরা গোপনে আমাদের সমস্ত সভাগুলি করেছিলাম এবং আমরা মোটামুটি একটি মণ্ডলীর মত কাজ করেছিলাম। এছাড়াও রীতিবর্হিভূত সাক্ষ্যদানের অনেক সুযোগ আমাদের হয়েছিল। এই কারাগারেই আমি ওলগা স্লেজিংজারের সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম যিনি এরজাবেথ স্লেজিংজারের মাংসিক বোন ছিলেন, যে মহিলা আমার মা ও আমাকে বাইবেল সত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯৪৪ সালের মধ্যে হাঙ্গেরির নাৎসীরা হাঙ্গেরিয় যিহূদীদের সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যেমন তারা অন্য দখলকৃত এলাকাগুলিতে তাদের পরিকল্পনামাফিক হত্যা করেছিল। একদিন তারা ওলগা ও আমাকে নিতে এসেছিল। আমাদের গবাদি পশু বহনকারী রেলগাড়িতে উঠানো হয়েছিল এবং চেকোস্লাভাকিয়ার মধ্য দিয়ে এক অত্যন্ত কঠিন যাত্রার পর আমরা আমাদের গন্তব্যস্থল দক্ষিণ-পশ্চিম পোল্যান্ডে পৌঁছেছিলাম—মৃত্যু শিবির আউসউইটস।
আউসউইটসে রক্ষা পাওয়া
ওলগার সাথে থাকলে আমি নিরাপদ বোধ করতাম। এমনকি কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি কৌতুকপূর্ণ থাকতে পারতেন। আউসউইটসে পৌঁছে আমরা কুখ্যাত ডা: মেংগেলার সম্মুখীন হয়েছিলাম যার কাজ ছিল নতুন আগন্তুকদের মধ্যে যারা কাজ করার উপযুক্ত নয় তাদের, যারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তাদের থেকে পৃথক করা। প্রথম শ্রেণীকে গ্যাস কক্ষে পাঠিয়ে দেওয়া হত। আমাদের পালার সময় মেংগেলা ওলগাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আপনার বয়স কত?”
সাহসের সাথে ও চোখের তারায় কৌতুকের ঝিলিক দিয়ে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “কুড়ি।” বাস্তবে তার বয়স সেই বয়সের দ্বিগুণ ছিল। কিন্তু মেংগেলা হেসেছিলেন এবং তাকে ডান দিকে যেতে দিয়েছিলেন আর এইভাবে তিনি জীবিত থাকতে পেরেছিলেন।
আউসউইটসের সমস্ত বন্দী তাদের বন্দী পোশাকের উপর প্রতীকের দ্বারা চিহ্নিত ছিলেন—যিহূদীদের ছিল ডেভিডের তারকা ও যিহোবার সাক্ষীদের ছিল বেগুনি ত্রিভুজ। তারা যখন আমাদের পোশাকে ডেভিডের তারকা সেলাই করে দিতে চেয়েছিলেন তখন আমরা ব্যাখ্যা করেছিলাম যে আমরা যিহোবার সাক্ষী এবং আমরা বেগুনি ত্রিভুজ চাই। আমরা যে এটি চাই তার কারণ এই নয় যে আমরা আমাদের যিহূদী ঐতিহ্যের কারণে লজ্জিত কিন্তু আমরা এখন যিহোবার সাক্ষী। লাথি মারা এবং মারধর করার দ্বারা তারা আমাদেরকে যিহূদী প্রতীক গ্রহণ করার জন্য বাধ্য করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমরা অটল ছিলাম যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা আমাদের যিহোবার সাক্ষী হিসাবে স্বীকার করেছিলেন।
কিছুদিন পরে, আমি অপ্রত্যাশিতভাবে আমার বোন এলভিরার দেখা পাই যে আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট ছিল। আমাদের সাত সদস্যবিশিষ্ট সম্পূর্ণ পরিবারকে আউসউইটসে আনা হয়েছিল। একমাত্র এলভিরা ও আমি কাজ করার উপযুক্ত হিসাবে অনুমোদিত হয়েছিলাম। বাবা, মা ও আমাদের ছোট তিন ভাইবোন গ্যাস কক্ষে মারা গিয়েছিল। এলভিরা তখন সাক্ষী ছিল না ফলে আমি ও সে শিবিরের একই অংশে থাকতে পারিনি। সে মুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসিত হয়েছিল যেখানে পেনসিলভেনিয়ার পিটস্বার্গে সে একজন সাক্ষী হয়েছিল এবং পরে ১৯৭৩ সালে মারা গিয়েছিল।
অন্য শিবিরগুলিতে রক্ষা পাওয়া
১৯৪৪/৪৫ সালের শীতকালে জার্মানরা আউসউইটস সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কারণ রুশরা নিকটবর্তী হচ্ছিল। তাই আমাদের জার্মানির উত্তরাঞ্চলের বেরগেন-বেলসেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমাদের পৌঁছানোর অল্পকাল পরেই ওলগা ও আমাকে ব্রোনস্ভিকে পাঠানো হয়েছিল। আমাদের সেখানে মিত্র বাহিনীর তীব্র বোমা হামলার পর ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতে সাহায্য করার কথা ছিল। ওলগা ও আমি বিষয়টি আলোচনা করেছিলাম। এই কাজ আমাদের নিরপেক্ষতাকে ভঙ্গ করবে কি না সেই বিষয়ে যেহেতু আমরা নিশ্চিত ছিলাম না, তাই আমরা উভয়েই এতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
আমাদের সিদ্ধান্ত কিছুটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আমাদেরকে চামড়ার চাবুক দিয়ে মারা হয়েছিল এবং পরে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সম্বন্ধে ভাবার জন্য আমাদের এক মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল যে আমরা যদি আমাদের সংকল্প পরিবর্তন না করি, তাহলে আমাদের গুলি করা হবে। আমরা বলেছিলাম যে এই বিষয়ে ভাবার জন্য আমাদের কোন সময়ের প্রয়োজন নেই কারণ আমরা মনস্থির করে ফেলেছি। কিন্তু, যেহেতু শিবিরের কমান্ডার উপস্থিত ছিলেন না এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার একমাত্র কর্তৃত্ব তার ছিল, তাই আমাদের মৃত্যুদণ্ডকে বিলম্বিত করতে হয়েছিল।
এর মধ্যে আমাদের সারা দিন শিবিরের উঠানে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। দুজন সশস্ত্র সৈন্য প্রতি দুই ঘন্টা পর পর একজন করে আমাদের পাহারা দিয়েছিলেন। আমাদের কোন খাবার দেওয়া হয়নি এবং ফেব্রুয়ারি মাস থাকার কারণে আমরা তখন ঠাণ্ডায় ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। এক সপ্তাহ ধরে এই অবস্থা চলেছিল কিন্তু কমান্ডারের দেখা মেলেনি। তাই আমাদের একটি ট্রাকের পিছনে উঠানো হয়েছিল এবং আমরা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যখন আমরা নিজেদেরকে বেরগেন-বেলসেনে খুঁজে পেয়েছিলাম।
তখন ওলগা ও আমি ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যে ছিলাম। আমার অধিকাংশ চুল পড়ে গিয়েছিল এবং আমার প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল। কেবল সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে আমি সামান্য কাজ করতে পারতাম। প্রতিদিন অপুষ্ট বাঁধাকপির সুরুয়া ও ছোট এক টুকরো রুটি যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু আমাদের কাজ বাধ্যতামূলক ছিল কারণ যারা করতে পারত না তাদের মেরে ফেলা হত। রান্নাঘরে আমার সাথে যে জার্মান বোনেরা কাজ করতেন তারা আমাকে কিছুটা বিশ্রাম নিতে সাহায্য করতেন। পরিদর্শনকারী পাহারাদারেরা যখন আসতে থাকতেন তখন বোনেরা আমাকে সতর্ক করতেন যাতে আমি কাজ করার বেঞ্চিতে দাঁড়াতে পারি যেন মনে হয় আমি কাজে ব্যস্ত।
একদিন ওলগার তার কর্মস্থলে যাওয়ার মত এতটুকু শক্তিও ছিল না এবং এর পরে আমরা তাকে আর দেখতে পাইনি। আমি একজন সাহসী বন্ধু ও সঙ্গী হারিয়েছিলাম যিনি শিবিরের ওই কঠিন মাসগুলিতে আমাকে অত্যন্ত সাহায্য করেছিলেন। আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টের একজন অভিষিক্ত অনুগামী হিসাবে তিনি অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে তার স্বর্গীয় পুরস্কার লাভ করেছিলেন।—প্রকাশিত বাক্য ১৪:১৩.
মুক্তি এবং পরবর্তী জীবন
১৯৪৫ সালের মে মাসে যখন যুদ্ধ শেষ হয় ও আমরা মুক্ত হই, তখন আমি এতই দুর্বল ছিলাম যে বিরোধীদের যোঁয়ালি অবশেষে চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে যাওয়ায় আমি আনন্দও করতে পারিনি; আমি মুক্তিপ্রাপ্তদের বহনকারী পরিবহণগুলির সাথে যেতে পারিনি যেগুলি তাদেরকে সেই দেশগুলিতে নিয়ে গিয়েছিল যারা তাদের গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিল। শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য আমি একটি হাসপাতালে তিন মাস ছিলাম। পরে আমাকে সুইডেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেটি আমার নতুন আবাসে পরিণত হয়েছিল। অবিলম্বে আমি আমার খ্রীষ্টীয় ভাইবোনেদের সাথে যোগাযোগ করি ও অল্প দিন পরে ক্ষেত্রের পরিচর্যার মহামূল্যবান ধন পুনরায় গ্রহণ করি।
১৯৪৯ সালে আমি লেনার্ট যোসেফসনকে বিয়ে করি যিনি অনেক বছর ধরে যিহোবার সাক্ষীদের একজন ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসাবে সেবা করেছিলেন। তার বিশ্বাস বজায় রাখার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তাকেও কারবদ্ধ থাকতে হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বরে আমরা একত্রে আমাদের অগ্রগামী জীবন শুরু করি এবং বোরাস শহরে পরিচর্যা করার কার্যভার পাই। সেখানে আমাদের প্রথম বছরে, আমরা নিয়মিতভাবে আগ্রহী ব্যক্তিদের সাথে প্রতি সপ্তাহে দশটি বাইবেল অধ্যয়ন পরিচালনা করতাম। বোরাসে নয় বছরের মধ্যে তিনটি মণ্ডলী গড়ে উঠতে দেখার আনন্দ আমাদের ছিল আর এখন সেখানে পাঁচটি মণ্ডলী।
১৯৫০ সালে আমি দীর্ঘ সময়ের জন্য অগ্রগামী থাকতে পারিনি কারণ আমরা একটি মেয়ের এবং দুই বছর পরে একটি ছেলের বাবামা হয়েছিলাম। এইভাবে আমাদের সন্তানদেরকে মূল্যবান সত্য সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ার আনন্দদায়ক সুযোগ আমার হয়েছিল যা হাঙ্গেরিতে প্রিয় ভাই আমাকে শিখিয়েছিলেন যখন আমার মাত্র ১৬ বছর বয়স ছিল, যেমন: “যিহোবার সেবা করাই হল সর্বাধিক সম্মান যা একজন মানুষের থাকতে পারে।”
আমার জীবনের দিকে ফিরে তাকানোর মাধ্যমে আমি উপলব্ধি করি যে ইয়োবের ধৈর্য সম্বন্ধে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সময় শিষ্য যাকোব যে সত্য সম্বন্ধে লিখেছিলেন তা আমি অভিজ্ঞতা করেছি: “প্রভু [“যিহোবা,” “NW”] স্নেহপূর্ণ ও দয়াময়।” (যাকোব ৫:১১) যদিও আমি ভয়ঙ্কর পরীক্ষা ভোগ করেছিলাম, তথাপি আমি দুটি সন্তান, তাদের সাথী ও ছয়জন নাতিনাতনী যাদের সকলে যিহোবার উপাসক তাদের দ্বারা প্রচুররূপে আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়েছি। তাছাড়াও, আমার অনেক আধ্যাত্মিক সন্তান ও নাতিনাতনী আছে যাদের কয়েকজন অগ্রগামী ও মিশনারি হিসাবে সেবা করছে। এখন আমার মহান আশা হল মৃত্যুতে ঘুমিয়ে থাকা প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হওয়া ও তাদের আলিঙ্গন করা যখন তারা তাদের কবর থেকে উত্থিত হবেন।—যোহন ৫:২৮, ২৯.
[৩১ পৃষ্ঠার চিত্র]
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সুইডেনে পরিচর্যায়
[৩১ পৃষ্ঠার চিত্র]
আমার স্বামীর সাথে