তর্ত্তিয়—পৌলের বিশ্বস্ত সচিব
তর্ত্তিয় একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। রোমে সহখ্রীষ্টানদের উদ্দেশ্যে এক দীর্ঘ পত্র লেখার সময়ে পৌল তাকে তার সচিব হিসাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। এটি একটি কঠিন কাজ ছিল।
সা.কা. প্রথম শতাব্দীতে একজন সচিব হওয়া কেন খুব কঠিন ছিল? কিভাবে এইরূপ কাজ করা হত? কোন্ লেখনী উপকরণগুলি তখন পাওয়া যেত?
প্রাচীনকালের সচিবেরা
প্রাচীন গ্রীক-রোমীয় সমাজে, বিভিন্ন ধরনের সচিবেরা ছিলেন। কিছু লোক সরকারী সচিব হিসাবে কাজ করতেন অর্থাৎ চ্যান্সেলার কার্যালয়ে কর্মরত জনসাধারণের আধিকারিক। এছাড়া জনসাধারণের সচিবেরাও ছিলেন যারা জনসমাবেশের স্থানে নাগরিকদের জন্য তাদের কাজগুলি করতেন। ব্যক্তিগত সচিবদের (প্রায়ই ক্রীতদাসদের) ধনীরাই নিযুক্ত করত। এছাড়া, এমন ইচ্ছুক বন্ধুরাও ছিলেন যারা অন্যদের জন্য পত্রগুলি লিখতে খুশি হতেন। পণ্ডিত ই. রেনডোল্ফ রিচার্ডের মতানুসারে, এই সমস্ত বেসরকারী সচিবদের দক্ষতা “ভাষা ও লিখন প্রণালীর ক্ষেত্রে যৎসামান্য যোগ্যতা থেকে আরম্ভ করে অতি উচ্চমানের কুশলতাসহ একটি সঠিক, যথার্থ এবং মুগ্ধকর চিঠি লেখার ক্ষমতা পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল।”
কারা সচিবদের ব্যবহার করত? প্রথমত, যারা পড়তে এবং লিখতে জানত না। বহু প্রাচীন চুক্তিপত্র এবং ব্যবসায়িক পত্রগুলি টীকা দিয়ে শেষ করা হত যেগুলিতে সচিবের স্বীকারোক্তি থাকত যে তিনি দলিলটি লিখেছিলেন সেই ব্যক্তির অক্ষমতার জন্য যে তার কাছে এই কাজটি অর্পণ করেছিল। একজন সচিবকে কর্মে নিযুক্ত করার দ্বিতীয় কারণটি মিশরের থিবস থেকে প্রাপ্ত একটি প্রাচীন পত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। জনৈক আস্কলিপিয়াডেসের জন্য লিখিত পত্রের উপসংহারে এটি জানিয়েছিল: “অরমার পুত্র, ইভমিলীস তার জন্য লিখেছেন . . . কারণ তিনি একটু ধীরে ধীরে লেখেন।”
তবুও এটি মনে হয় না যে পড়তে বা লিখতে জানাই একজন সচিবকে ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করার প্রধান বিষয় নয়। বাইবেলের ব্যাখ্যাকার জন্ এল. মেকনজির মতানুসারে, “সহজপাঠ্যের বিষয়টি সম্ভবত বিবেচনার বিষয় ছিল না বরঞ্চ সৌন্দর্য বা অন্ততপক্ষে পরিচ্ছন্নতাই ছিল উদ্বিগ্নতার বিষয়” যা একজন সচিবের কাজগুলির সাহায্য নিতে লোকেদের বাধ্য করত। এমনকি শিক্ষিতদের পক্ষেও লেখা ক্লান্তিকর ছিল, বিশেষত যেখানে দীর্ঘ এবং সম্প্রসারিত পাঠ্য বিষয়গুলি সংশ্লিষ্ট থাকত। পণ্ডিত জে. এ. ইস্লিমান বলেন যে, এমন কোন ব্যক্তি যে তা করতে পারত “আনন্দের সাথে এই লেখাকে এড়িয়ে চলত এবং দাসেদের তত্ত্বাবধানে, পেশাদারী অধ্যক্ষদের কাছে এটিকে অর্পণ করা হত।” অধিকন্তু, সহজেই বোঝা যায় যে কেন লোকেরা তাদের নিজেদের পত্রগুলি লিখতে পছন্দ করত না যখন ব্যবহৃত উপাদানগুলি এবং কাজের পরিস্থিতির কথা চিন্তা করা হয়।
সা.কা. প্রথম শতাব্দীতে সাধারণভাবে লেখার জন্য যে উপাদান ব্যবহৃত হত তা ছিল প্যাপিরাস। দৈর্ঘ-বরাবর এর কাণ্ডগুলির আঁশ কেটে এই গাছ থেকে পাতলা ছাল ছাড়িয়ে বের করে নেওয়া হত। ছালগুলিকে একটি স্তরে বিন্যস্ত করা হত। অন্য স্তরটি প্রথম স্তরের উপর ডান দিকে কোণ করে রাখা হত। “কাগজের” একটি পাত উৎপাদন করতে দুটিকে চেপে বাঁধা হত।
এর উপরে লেখা সহজ ছিল না। এটি ছিল অমসৃণ এবং তন্তুময়। পণ্ডিত এঞ্জোলো পিন্নার মতানুসারে, “প্যাপিরাস স্পঞ্জের তন্তুটি কালির প্রসারণকে বাড়িয়ে দিত, বিশেষ করে ক্ষুদ্র প্রণালীগুলির মধ্যে যেটি পাতলা ছালের মাঝে অবশিষ্ট থাকত।” সচিব হয়ত মাটির উপর এক পায়ের উপর আরেক পা আড়াআড়িভাবে রেখে বসে কাজ করতেন এবং এক হাত দিয়ে একটি বোর্ডের উপর পাতটি ধরে থাকতেন। যদি তিনি অনভিজ্ঞ হতেন অথবা উপাদানগুলি সর্বোত্তম মানের না হত, তাহলে তার পালকের কলম অথবা নলখাগড়ার কলম প্যাপিরাসে আটকে যেতে, পাতটি ছিঁড়ে যেতে অথবা লেখা সহজপাঠ্য নাও হতে পারত।
ঝুল ও আঠার এক মিশ্রণ থেকে কালি তৈরি করা হত। এটি শক্ত টুকরোর আকারে বিক্রিত হত, লেখার জন্য এটি ব্যবহৃত হওয়ার আগে কালি রাখার একটি পাত্রে এটিকে জলের সাথে মিশিয়ে পাতলা করা হত। অন্যান্য উপাদানের মধ্যে, যা সম্ভবত তর্ত্তিয়ের মত একজন সচিবের কাছে থাকত, তা হল নলখাগড়ার কলমকে ধার দেওয়ার জন্য একটি ছুরি এবং তার ভুলগুলিকে মুছে ফেলার জন্য একটি ভিজে স্পঞ্জ। প্রতিটি অক্ষর যত্নের সাথে লিখতে হত। তাই লেখা ধীরে ধীরে এবং কিছুটা অসুবিধার মধ্যে অগ্রসর হত।
‘আমি তর্ত্তিয় তোমাদিগকে মঙ্গলবাদ করিতেছি’
রোমীয়দের উদ্দেশ্যে লেখা পত্রের শেষে যে মঙ্গলবাদগুলি ছিল তার মধ্যে পৌলের সচিবের মঙ্গলবাদটি ছিল যিনি লিখেছিলেন: “আমি তর্ত্তিয় প্রভুতে তোমাদিগকে মঙ্গলবাদ করিতেছি।” (রোমীয় ১৬:২২) পৌলের লেখাগুলির মধ্যে এটিই ছিল একমাত্র উপলক্ষ যেখানে তার সচিবদের একজন সম্বন্ধে বিশদ উল্লেখ করা হয়েছে।
আমরা তর্ত্তিয় সম্বন্ধে অল্পই জানি। “প্রভুতে” তার মঙ্গলবাদ কথাটি থেকে আমরা হয়ত এই উপসংহার করতে পারি যে তিনি একজন বিশ্বস্ত খ্রীষ্টান ছিলেন। সম্ভবত তিনি করিন্থে মণ্ডলীর একজন সদস্য ছিলেন এবং হয়ত রোমের অনেক খ্রীষ্টানের কাছে পরিচিত ছিলেন। বাইবেলের পণ্ডিত জুজেপ্পী বারবালিও বলেন যে তর্ত্তিয় একজন ক্রীতদাস অথবা মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাস ছিলেন। কেন? কারণ প্রথমত, “লেখকেরা সাধারণভাবে এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত; এছাড়া, তার ল্যাটিন নাম . . . ক্রীতদাস এবং মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাসদের মধ্যে খুবই সাধারণ ছিল।” বারবালিও বলেন, “সেইজন্য, তিনি একজন ‘সক্রিয়’ পেশাদারী লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সহকর্মী যিনি এইভাবে পৌলকে তার সুদীর্ঘ এবং লেখার সবচেয়ে স্পষ্ট অংশটি সঙ্কলন করতে সাহায্য করেছিলেন: এক মহামূল্যবান সেবা যেটি পৌলকে সময় এবং শ্রম বাঁচাতে সক্ষম করেছিল।”
তর্ত্তিয়ের এই কাজটি নিশ্চিতভাবেই মহামূল্যবান। যিরমিয়ের জন্য বারূক একই কাজ করেছিলেন, এমনকি যেমন পিতরের জন্য সীল করেছিলেন। (যিরমিয় ৩৬:৪; ১ পিতর ৫:১২) এইধরনের সহকর্মীদের কী মহান সুযোগই না ছিল!
রোমীয়দের উদ্দেশ্যে লেখা
সম্ভবত করিন্থে, পৌল যখন গায়ের একজন অতিথি হয়েছিলেন, সেই সময়ে রোমীয়দের উদ্দেশ্যে পত্রটি লেখা হয়েছিল। সেটি ছিল প্রায় সা.কা. ৫৬ সালে, প্রেরিতের তৃতীয় মিশনারী যাত্রার সময়ে। (রোমীয় ১৬:২৩) যদিও নিঃসন্দেহে আমরা জানি যে পৌল তার সচিব হিসাবে এই পত্রটি লিখতে তর্ত্তিয়কে ব্যবহার করেছিলেন, তবুও আমরা সঠিকভাবে জানি না তিনি ঠিক কিভাবে তাকে ব্যবহার করেছিলেন। যে পদ্ধতিই ব্যবহার করা হয়ে থাকুক না কেন, কাজটি সহজে সম্পাদন করা যায়নি। কিন্তু এই বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারি: বাইবেলের বাকি অংশের মত, রোমীয়দের উদ্দেশ্যে পৌলের পত্রটি ছিল “ঈশ্বর-নিশ্বসিত।”—২ তীমথিয় ৩:১৬, ১৭.
যখন এই পত্রটি শেষ হয়েছিল, প্যাপিরাসের বিভিন্ন পাত ব্যবহার করে তর্ত্তিয় এবং পৌল হাজার হাজার বাক্য লিখেছিলেন। পাতের প্রান্ত বরাবর একটির সাথে অন্যটিকে আঠা দিয়ে জুড়ে দেওয়ার পর, এই পাতগুলি পাণ্ডুলিপির আকার নিত, সম্ভবত তিন থেকে চার মিটার দীর্ঘ। পত্রটি যত্নপূর্বক গোটান এবং মুদ্রাঙ্কিত করা হয়েছিল। তারপর মনে হয় পৌল এটি কিংক্রিয়াবাসী একজন বোন ফৈবীর কাছে অর্পণ করেছিলেন, যিনি রোমের উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য প্রায় প্রস্তুত ছিলেন।—রোমীয় ১৬:১, ২.
প্রথম শতাব্দীর পর থেকে লিখিত উপাদান উৎপাদন করতে ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু সমগ্র শতাব্দীগুলি ধরে, রোমীয় খ্রীষ্টানদের উদ্দেশ্যে লেখা পত্রটি ঈশ্বরের দ্বারা সংরক্ষিত থেকেছে। যিহোবার বাক্যের এই অংশটির জন্য আমরা কতই না কৃতজ্ঞ হতে পারি, যেটি পৌলের বিশ্বস্ত এবং কঠোর পরিশ্রমী সচিব তর্ত্তিয়ের সাহায্যে লেখা হয়েছিল!