মূল-তত্ত্ববাদ—এটি কী?
মূল-তত্ত্ববাদ কোথায় শুরু হয়েছিল? গত শতাব্দীর শেষে, সংস্কারমুক্ত ঈশ্বরতত্ত্ববিদেরা বাইবেলের ব্যাপক সমালোচনা এবং ক্রমবিবর্তনবাদের মত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সমন্বয়বিধান করার জন্য তাদের বিশ্বাসগুলির পরিবর্তন করছিল। পরিণতিস্বরূপ, বাইবেলের উপর লোকেদের আস্থা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতারা, তারা যেটিকে বিশ্বাসের মূল-তত্ত্বa বলত, তা প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে, তারা এই মূল-তত্ত্বগুলির উপর এক আলোচনা একটি ধারাবাহিক খণ্ডে প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল মূল-তত্ত্বগুলি: সত্যের প্রতি এক সাক্ষ্য। (ইংরাজি) এই শিরোনামটি থেকে “মূল-তত্ত্ববাদ” নামকরণটি এসেছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, সময়ে সময়ে মূল-তত্ত্ববাদ এক আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯২৫ সালে ধর্মীয় মূল-তত্ত্ববাদীরা যুক্তরাষ্ট্র টেনেসির একজন বিদ্যালয় শিক্ষক জন স্কপস্কে আদালতে নিয়ে যায় যা স্কপ মামলা নামে আখ্যাত হয়েছিল। তার অপরাধ কী ছিল? তিনি ক্রমবিবর্তনবাদ সম্বন্ধে শিক্ষা দিচ্ছিলেন আর যেটি রাষ্ট্র আইনের বিরোধী ছিল। সেই দিনগুলিতে, কেউ কেউ বিশ্বাস করত যে মূল-তত্ত্ববাদ ক্ষণস্থায়ী হবে। ১৯২৬ সালে, খ্রীষ্টীয় শতাব্দী (ইংরাজি) নামক একটি প্রোটেস্টান্ট পত্রিকা বলেছিল যে এটি ছিল “বাহ্যিক ও কৃত্রিম” এবং “সম্পূর্ণভাবে গঠনমূলক সফলতা অথবা দীর্ঘ স্থায়ীত্বের গুণাবলির অভাবযুক্ত।” সেই মূল্যায়ন কতই না ভুল ছিল!
সেই ১৯৭০ এর দশক থেকে মূল-তত্ত্ববাদ ক্রমাগত সংবাদের অংশ হয়ে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ক্যালিফোর্ণিয়ার ফুলার ঈশ্বরতত্ত্ব সংক্রান্ত শিক্ষাস্থানের অধ্যাপক মাইরোস্ল্যাভ ওয়োল্ফ বলেন: “মূল-তত্ত্ববাদ শুধুমাত্র দীর্ঘস্থায়ীই হয়নি, বরঞ্চ প্রসারলাভও করেছে।” আজকে “মূল-তত্ত্ববাদ” শব্দটি শুধু প্রোটেস্টান্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রেই প্রযুক্ত হয় না কিন্তু অন্যান্য ধর্মগুলির প্রতিও প্রযোজ্য, যেমন ক্যাথলিকবাদ, ইসলাম, যিহূদীবাদ এবং হিন্দুবাদ।
আমাদের সময়ের প্রতি প্রতিক্রিয়া
কেন এই মূল-তত্ত্ববাদের বিস্তার? যারা এই বিষয়ে অধ্যয়ন করে, তারা আমাদের সময়ের নৈতিক এবং ধর্মীয় অনিশ্চয়তার জন্য এটিকে অন্তত অশংতঃ দায়ী বলে গণ্য করে। বিগত বছরগুলিতে, অধিকাংশ সমাজ নৈতিক নিশ্চয়তার এক পরিবেশে বাস করত যা পরম্পরাগত বিশ্বাস ভিত্তিক ছিল। বর্তমানে ঐ বিশ্বাসগুলি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন অথবা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অনেক বুদ্ধিজীবীরা দাবি করেন যে, ঈশ্বর নেই এবং মানুষ এক প্রতিকূল মহাবিশ্বে একা। বহু বিজ্ঞানীরা শিক্ষা দেন যে মানুষ আকস্মিক ক্রমবিবর্তনের ফল, একজন প্রেমময় সৃষ্টিকর্তার কাজের ফল নয়। একটি প্রশ্রয়কর মানসিকতা লক্ষণীয়ভাবে বিদ্যমান। সমাজের সর্বস্তরে জগৎ নৈতিক মূল্যবোধের অভাবে জর্জরিত।—২ তীমথিয় ৩:৪, ৫, ১৩.
মূল-তত্ত্ববাদীরা পুরাতন নিশ্চয়তার জন্য আকাঙ্ক্ষী এবং কেউ কেউ চেষ্টা করে তাদের সম্প্রদায় ও জাতিগুলিকে সেইস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে, যাকে তারা যথার্থ নীতি এবং মতবাদ সংক্রান্ত ভিত্তি বলে মনে করে। এক “সঠিক” নৈতিক নিয়মাবলী এবং মতবাদ সংক্রান্ত বিশ্বাসের ব্যবস্থা অনুসারে চলার জন্য তারা অন্যদের উপর তাদের ক্ষমতার সাধ্যানুসারে বল প্রয়োগ করে থাকে। একজন মূল-তত্ত্ববাদী দৃঢ়ভাবে প্রত্যয়ী যে তিনিই সঠিক এবং অন্যেরা ভুল। অধ্যাপক জেমস্ বার মূল-তত্ত্ববাদ (ইংরাজি) নামক তার বইতে বলেন যে মূল-তত্ত্ববাদকে “প্রায়ই বিদ্রোহী, নিন্দনীয় পরিভাষা হিসাবে বিবেচনা করা হয় যা সংকীর্ণতা, গোঁড়ামি, জ্ঞানবন্টন বিরোধী ও সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে।”
যেহেতু কেউই সংকীর্ণ, গোঁড়া অথবা সীমাবদ্ধ বলে পরিচিত হতে চায় না, তাই এই বিষয়ে কেউ একমত হয় না যে কে মূল-তত্ত্ববাদী এবং কে নয়। যাইহোক, নির্দিষ্ট কিছু দিক রয়েছে যা ধর্মীয় মূল-তত্ত্ববাদকে চিহ্নিত করে।
একজন মূল-তত্ত্ববাদীকে শনাক্ত করা
ধর্মীয় মূল-তত্ত্ববাদ সাধারণতঃ একটি সংস্কৃতির মূল পরম্পরাগত অথবা ধর্মীয় বিশ্বাস হিসাবে যেটিকে মনে করা হয় তা অক্ষুণ্ণ রাখার একটি প্রচেষ্টা এবং জগতের স্বতন্ত্র মনোভাব হিসাবে যা প্রত্যক্ষ হয় তার বিরোধিতা করা। এটি বলার অর্থ এই নয় যে, মূল-তত্ত্ববাদীরা সমস্ত আধুনিক বিষয়ের বিরোধিতা করে। কেউ কেউ তাদের দৃষ্টিভঙ্গিগুলিকে উন্নত করার জন্য অধিক কার্যকরভাবে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে। কিন্তু তারা সমাজের জাগতিকীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।b
কিছু মূল-তত্ত্ববাদীরা একটি পরম্পরাগত মতবাদ সংক্রান্ত কাঠামো অথবা জীবনের পথকে শুধুমাত্র নিজেদের জন্য সংরক্ষিত রাখতেই দৃঢ়সংকল্পিত নয়, কিন্তু সামাজিক কাঠামোকে পরিবর্তন করার জন্য এগুলি অন্যদের উপর আরোপ করতেও সচেষ্ট, যাতে করে তারা মূল-তত্ত্ববাদীদের বিশ্বাসের উপযোগী হতে পারে। অতএব, ক্যাথলিক মূল-তত্ত্ববাদী গর্ভপাত প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টির মধ্যে নিজেকেই সীমাবদ্ধ রাখবে না। সে হয়ত তার দেশের আইনপ্রণেতাদের গর্ভপাতকে আইন বিরুদ্ধ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পোল্যাণ্ডে লা রিপাবলিকা সংবাদপত্র অনুসারে, গর্ভপাত বিরোধী একটি আইন অনুমোদিত করার জন্য, ক্যাথলিক গির্জা “একটি ‘সংগ্রাম’ পরিচালনা করে, যাতে তাদের সমস্ত ক্ষমতা এবং প্রভাব প্রয়োগ করে।” এইরূপ করার দ্বারা গির্জা কর্তৃপক্ষেরা প্রায় মূল-তত্ত্ববাদীদের মতই আচরণ করছিল। যুক্তরাষ্ট্রে, প্রোটেস্টান্ট খ্রীষ্টান কোয়ালিশনও অনুরূপ “সংগ্রামগুলি” করে।
সর্বোপরি, মূল-তত্ত্ববাদীদের তাদের দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমেই পৃথক করা যায়। অতএব, একজন প্রোটেস্টান্ট মূল-তত্ত্ববাদী বাইবেলের আক্ষরিক ভাষান্তরের প্রত্যয়ী সমর্থক হবেন, সম্ভবত যা সেই বিশ্বাসকে অন্তর্ভুক্ত করে যে, পৃথিবী আক্ষরিক ছয়টি দিনে সৃষ্টি হয়েছিল। একজন ক্যাথলিক মূল-তত্ত্ববাদী পোপের অভ্রান্ততা সম্বন্ধে কোন সন্দেহ রাখেন না।
অতএব, এটি বোধগম্য যে কেন “মূল-তত্ত্ববাদ” পরিভাষাটি অযৌক্তিক ধর্মান্ধতার এক মানসিক প্রতিচ্ছবিকে জাগিয়ে তোলে এবং যারা মূল-তত্ত্ববাদী নয় তারা কেন উদ্বিগ্ন হয় যখন তারা দেখে যে মূল-তত্ত্ববাদ বিস্তারলাভ করছে। ব্যক্তিগতভাবে আমরা হয়ত মূল-তত্ত্ববাদীদের সাথে ভিন্নমত হতে পারি এবং তাদের রাজনৈতিক কৌশলতা ও মাঝে মাঝে তাদের হিংসাত্মক কার্যকলাপে মর্মাহত হতে পারি। বাস্তবিকই একটি ধর্মের মূল-তত্ত্ববাদীরা হয়ত অপর এক ধর্মের এইরূপ ব্যক্তিদের কার্যকলাপ দেখে আতঙ্কগ্রস্ত হতে পারে! তবুও, অনেক চিন্তাশীল ব্যক্তিরা সেই বিষয়গুলি সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন যা মূল-তত্ত্ববাদের বিস্তারকে প্ররোচিত করে—ক্রমবর্ধমান নৈতিক শিথিলতা, বিশ্বাসের অভাব এবং আধুনিক সমাজের আধ্যাত্মিকতার প্রত্যাখ্যান।
এই সমস্ত প্রবণতাগুলির জন্য মূল-তত্ত্ববাদই কি একমাত্র উত্তর? যদি তা না হয়, তাহলে বিকল্পটি কী?
[পাদটীকাগুলো]
a মূল-তত্ত্ববাদের তথা-কথিত পাঁচটি বিষয়, যা ১৮৯৫ সালে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল, তা ছিল “(১) শাস্ত্রের সম্পূর্ণ অনুপ্রেরণা এবং অভ্রান্ততা; (২) যীশু খ্রীষ্টের দেবত্ব; (৩) কুমারী গর্ভে খ্রীষ্টের জন্ম; (৪) যাতনাদণ্ডের উপরে খ্রীষ্টের বিকল্প প্রায়শ্চিত্ত; (৫) খ্রীষ্টের দৈহিক পুনরুত্থান এবং পৃথিবীতে তাঁর ব্যক্তিগত ও দৈহিক দ্বিতীয় আগমন।”—স্টাডি ডি টিওলজিয়া (ঈশ্বরতত্ত্বের অধ্যয়ন)।
b “জাগতিকীকরণ” এর অর্থ হচ্ছে জাগতিক বিষয়ের উপর জোর দেওয়া, যা আধ্যাত্মিকতা অথবা পবিত্রতা বিরোধী। জাগতিক বিষয় ধর্ম অথবা ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়।
[৫ পৃষ্ঠার ব্লার্ব]
১৯২৬ সালে, একটি প্রোটেস্টান্ট পত্রিকা মূল-তত্ত্ববাদকে “বাহ্যিক ও কৃত্রিম” এবং “সম্পূর্ণভাবে গঠনমূলক সফলতা অথবা দীর্ঘ স্থায়ীত্বের গুণাবলির অভাবযুক্ত,” বলে বর্ণনা করেছিল