এক রাজা যিহোবার ধর্মধামকে অপবিত্র করেন
“যে প্রজারা আপন ঈশ্বরকে জানে, তাহারা বলবান হইয়া কার্য্য করিবে।”—দানিয়েল ১১:৩২.
১, ২. মানবজাতির ইতিহাসে, ২,০০০ বছরেরও বেশি সময় থেকে কোন্ নাটকীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসছে?
প্রভুত্ব লাভ করার জন্য, দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে একে অপরের সঙ্গে লড়ছে। দুই হাজারেরও বেশি বছর ধরে সেই লড়াই চলাকালীন, প্রথমে একজন এবং তারপরে অন্যজন কর্তৃত্ব লাভ করে। আমাদের দিনে সেই লড়াই পৃথিবীতে অধিকাংশ লোকেদের প্রভাবিত করেছে এবং ঈশ্বরের লোকেদের বিশ্বস্ততাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এই লড়াই শেষ হয় একটি ঘটনার মাধ্যমে যা দুটি শক্তির কেউই আশা করতে পারেনি। এই নাটকীয় ইতিহাস সম্বন্ধে প্রাচীনকালের ভাববাদী দানিয়েলকে পূর্বাভাষ দেওয়া হয়েছিল।—দানিয়েল, ১০ থেকে ১২ অধ্যায়।
২ উত্তর এবং দক্ষিণের রাজার মধ্যে চলমান শত্রুতার সঙ্গে এই ভবিষ্যদ্বাণীর সম্পর্ক আছে এবং এই সম্পর্কে “পৃথিবীতে তোমার ইচ্ছা সিদ্ধ হোক” বইতে (ইংরাজিতে পাওয়া যায়) বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।a সেখানে দেখানো হয়েছে যে প্রথমত উত্তরের রাজা ছিল ইস্রায়েলের উত্তরে অবস্থিত সিরিয়া। পরে, রোম সেই ভূমিকা গ্রহণ করে। আর শুরুতে, দক্ষিণের রাজা ছিল মিশর।
শেষকালের সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
৩. স্বর্গদূতের কথা অনুযায়ী, উত্তর এবং দক্ষিণের রাজাদের সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী কখন বুঝতে পারা যাবে এবং কিভাবে?
৩ দানিয়েলের কাছে এই বিষয়গুলি যে স্বর্গদূতটি প্রকাশ করছিলেন, তিনি বলেছিলেন: “কিন্তু হে দানিয়েল, তুমি শেষকাল পর্য্যন্ত এই বাক্য সকল রুদ্ধ করিয়া রাখ, এই পুস্তক মুদ্রাঙ্কিত করিয়া রাখ; অনেকে ইতস্ততঃ ধাবমান হইবে, এবং জ্ঞানের বৃদ্ধি হইবে।” (দানিয়েল ১২:৪) হ্যাঁ, শেষকালের সঙ্গে সেই ভবিষ্যদ্বাণীর সম্পর্ক ছিল—১৯১৪ সাল থেকে যে কাল শুরু হয়েছে। সেই চিহ্নিত সময়ে, পবিত্র শাস্ত্রে অনেকে “ইতস্ততঃ ধাবমান” হবে আর পবিত্র আত্মার সাহায্যে বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী সম্বন্ধে উপলব্ধিসহ সত্য জ্ঞান প্রচুর বৃদ্ধি পাবে। (হিতোপদেশ ৪:১৮) সেই কাল যত অতিবাহিত হচ্ছে, দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীর সূক্ষ্ম বিষয়গুলি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠছে। সুতরাং, “পৃথিবীতে তোমার ইচ্ছা সিদ্ধ হোক” বইটি প্রকাশিত হওয়ার ৩৫ বছর পরে, ১৯৯৩ সালে উত্তর এবং দক্ষিণের রাজাদের সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণীটি আমাদের কিভাবে বোঝা উচিত?
৪, ৫. (ক) উত্তর এবং দক্ষিণের রাজাদের সম্বন্ধে দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীতে ১৯১৪ সালের স্থান কোথায়? (খ) স্বর্গদূতের কথা অনুযায়ী, ১৯১৪ সালে কী হবে?
৪ প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ এবং যীশু যে অন্যান্য বিশ্ব-সঙ্কটের পূর্বাভাষ দিয়েছিলেন, সেই সমস্ত কিছুর মাধ্যমে ১৯১৪ সালে শেষকালের সূচনা হয়েছিল। (মথি ২৪:৩, ৭, ৮) দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীতে আমরা কি সেই বছরটিকে শনাক্ত করতে পারি? হ্যাঁ, পারি। দানিয়েল ১১:২৯ পদে উল্লিখিত “নিরূপিত কাল” হল শেষকালের শুরু। (“পৃথিবীতে তোমার ইচ্ছা সিদ্ধ হোক” বইয়ের পৃষ্ঠা ২৬৯-৭০ দেখুন।) এই সময়টি, দানিয়েলের দিনেই যিহোবা নিরূপিত করেছিলেন, কারণ ২,৫২০ বছরের শেষে তা শুরু হয়েছিল যার প্রতি দানিয়েল ৪ অধ্যায়ের ভবিষ্যদ্বাণী হিসাবে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলির মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
৫ দানিয়েলের যৌবনকালে, সা.শ.পূ. ৬০৭ সালে যিরূশালেমের ধ্বংস থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত সেই ২,৫২০ বছরকে বলা হত “জাতিগণের সময়।” (লূক ২১:২৪) কোন্ রাজনৈতিক ঘটনাবলী সেই সময়ের শেষকে চিহ্নিত করবে? এক স্বর্গদূত দানিয়েলের কাছে তা প্রকাশ করেছিলেন: “নিরূপিত কালে সে [উত্তরের রাজা] ফিরিয়া আসিবে, দক্ষিণ দেশে প্রবেশ করিবে, কিন্তু পূর্ব্বকালে যেমন ছিল, উত্তরকালে তেমন হইবে না।”—দানিয়েল ১১:২৯.
রাজা একটি যুদ্ধে পরাজিত হয়
৬. উনিশ্শো চোদ্দ সালে, উত্তর এবং দক্ষিণের রাজা কারা ছিলেন?
৬ জার্মানী, যার নেতা ছিল কাইজার উইল্হেলম্ (“কাইজার,” রোমান উপাধি “কৈসর” থেকে), ১৯১৪ সাল নাগাদ উত্তরের রাজার ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হওয়া ছিল উত্তর এবং দক্ষিণের রাজার মধ্যে বহুকালব্যাপী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি অধ্যায় মাত্র। দক্ষিণের প্রথম রাজা মিশরের কাছ থেকে এখন ব্রিটেন দক্ষিণের রাজার ভূমিকা গ্রহণ করেছে। যুদ্ধ চলাকালীন, ব্রিটেনের প্রাক্তন উপনিবেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল। অ্যাংলো-আমেরিকা বিশ্ব শক্তি এখন দক্ষিণের রাজা হয়, ইতিহাসে সর্বাধিক শক্তিশালী সাম্রাজ্য।
৭, ৮. (ক) প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে, কিভাবে “পূর্বকালে যেমন ছিল,” পরে তেমন হল না? (খ) প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের ফলাফল কী ছিল, কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, উত্তরের রাজার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল?
৭ পূর্বে, দুই রাজার মধ্যে যুদ্ধে, উত্তরের রাজা হিসাবে রোমীয় সাম্রাজ্য ক্রমাগত বিজয়ী হয়েছিল। এইবার, ‘পূর্বকালে যেমন ছিল, উত্তরকালে তেমন হল না।’ কেন? কারণ উত্তরের রাজা যুদ্ধে হেরে যায়। এর একটি কারণ ছিল, “কিত্তীমের জাহাজ সকল” উত্তরের রাজার বিরুদ্ধে এসেছিল। (দানিয়েল ১১:৩০) এই জাহাজগুলি কাদের ছিল? দানিয়েলের সময়ে, কিত্তীম ছিল সাইপ্রাস আর প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের শুরুর দিকে ব্রিটেন সাইপ্রাসকে জয় করে নেয়। এছাড়াও, দ্যা জন্ডারভান পিক্টোরিয়াল এন্সাইক্লোপিডিয়া অফ্ দ্যা বাইবেল অনুযায়ী, “প[শ্চিমের] প্রতিও, বিশে[ষত] প[শ্চিমের] সমুদ্র-যাত্রারত দেশগুলির প্রতি” কিত্তীম নামটি প্রযোজ্য। নিউ ইন্টারন্যাশনাল সংস্ককরণ, “কিত্তীমের জাহাজ সকল” অভিব্যক্তিটিকে “পশ্চিম উপকূলবর্তী দেশগুলির জাহাজ” বলে উল্লেখ করেছে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে কিত্তীমের জাহাজসকল ছিল ইউরোপের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ব্রিটেনের জাহাজগুলি। পরে, পশ্চিমের মহাদেশ, উত্তর আমেরিকার জাহাজগুলি ব্রিটেনের নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল।
৮ এই আক্রমণের সম্মুখে, “বিষণ্ণ” হয়ে উত্তরের রাজা ১৯১৮ সালে হার স্বীকার করে নেয়। কিন্তু সে সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়নি। “সে . . . ফিরিয়া যাইবে, ও পবিত্র নিয়মের বিরুদ্ধে ক্রোধ করিয়া কার্য্য করিবে; সে ফিরিয়া আসিবে, যাহারা পবিত্র নিয়ম ত্যাগ করে, তাহাদের প্রতি মনোযোগ করিবে।” (দানিয়েল ১১:৩০) স্বর্গদূত এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আর ঠিক তাই হয়েছিল।
রাজা কার্যকারী হয়ে ওঠে
৯. এডল্ফ্ হিটলারকে ক্ষমতায় আসতে কী সাহায্য করেছিল আর কিভাবে তিনি ‘কার্যকারী’ হয়ে উঠেছিলেন?
৯ যুদ্ধের পরে, ১৯১৮ সালে, সম্মিলিত বিজয়ী দেশগুলি শাস্তি হিসাবে জার্মানীর প্রতি একটি শান্তি চুক্তি জারি করে, সবেত অনির্দিষ্টকাল ধরে জার্মান লোকেদের প্রায় অনাহারে রাখবার জন্য। এর ফলে, কয়েক বছর প্রচণ্ড সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পর, এডল্ফ্ হিটলারের ক্ষমতায় আসার জন্য জার্মানী প্রস্তুত ছিল। তিনি ১৯৩৩ সালে সর্বাধিক ক্ষমতাশালী হওয়ার পর, সঙ্গে সঙ্গে “পবিত্র নিয়ম,” যার প্রতিনিধি যীশু খ্রীষ্টের অভিষিক্ত ভাইয়েরা, তাদের বিরুদ্ধে হিংস্র আক্রমণ শুরু করেছিলেন। এইভাবে, তিনি এই বিশ্বস্ত খ্রীষ্টানদের বিরুদ্ধে কার্যকারী হয়েছিলেন, নিষ্ঠুরভাবে তাদের অনেককে নির্যাতন করেছিলেন।
১০. সমর্থন পাওয়ার জন্য, হিটলার কার সাহায্যপ্রার্থী হয়েছিলেন এবং তার ফল কী হয়েছিল?
১০ অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও হিটলার সাফল্য লাভ করেছিলেন, সেই ক্ষেত্রগুলিতেও কার্যকারী হয়েছিলেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে, তিনি জার্মানীকে একটি উল্লেখযোগ্য শক্তিতে পরিণত করেছিলেন, আর এই কাজে “যাহারা পবিত্র নিয়ম ত্যাগ করে” তাদের সাহায্য তিনি পেয়েছিলেন। এরা কারা? স্পষ্টতই এরা ছিল খ্রীষ্টজগতের নেতারা, যারা দাবি করে যে ঈশ্বর এবং তাদের মধ্যে একটি চুক্তিবদ্ধ সম্পর্ক আছে কিন্তু বহু আগেই যারা যীশু খ্রীষ্টের শিষ্য হওয়া ত্যাগ করেছিল। সাফল্যের সাথে হিটলার “যাহারা পবিত্র নিয়ম ত্যাগ করে” তাদের সমর্থন চেয়েছিলেন। রোমের পোপ্ হিটলারের সাথে একটি ধর্মীয় চুক্তি স্থাপন করেছিলেন এবং রোমান ক্যাথলিক গির্জার সাথে জার্মানীর প্রোটেস্টান্ট গির্জাগুলিও তার আতঙ্কজনক রাজত্বের সম্পূর্ণ ১২ বছর ধরে তাকে সমর্থন করেছিলেন।
১১. উত্তরের রাজা কিভাবে “ধর্ম্মধাম অশুচি” করেছিল এবং “নিত্য নৈবেদ্য নিবৃত্ত” করেছিল?
১১ হিটলার এতই সফল হয়েছিলেন যে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, স্বর্গদূত যেমন বলেছিলেন: “আর তাহার নিকট হইতে সৈন্যগণ উঠিবে, ধর্ম্মধাম অর্থাৎ দুর্গ অশুচি করিবে, নিত্য নৈবেদ্য নিবৃত্ত করিবে।” (দানিয়েল ১১:৩১ক) প্রাচীন ইস্রায়েলে ধর্মধাম ছিল যিরূশালেমের মন্দিরের অংশ। কিন্তু, যিহূদীরা যখন যীশুকে অস্বীকার করেছিল, তখন যিহোবাও তাদের এবং তাদের মন্দিরকে পরিত্যাগ করেছিলেন। (মথি ২৩:৩৭–২৪:২) প্রথম শতাব্দী থেকে, যিহোবার মন্দির প্রকৃতপক্ষে একটি আত্মিক মন্দির হিসাবে আছে, তার মহাপবিত্র স্থান আসলে স্বর্গে এবং পৃথিবীতে একটি আত্মিক প্রাঙ্গণ রয়েছে, যেখানে প্রধান যাজক, যীশুর অভিষিক্ত ভাইয়েরা পরিচর্যা করেন। উনিশ্শো তিরিশের দশক থেকে, বিস্তর লোকেরা অভিষিক্ত অবশিষ্টাংশদের সাথে উপাসনা করেছে; সুতরাং বলা হয়েছে যে তারাও ‘ঈশ্বরের মন্দিরে’ পরিচর্যা করছে। (প্রকাশিত বাক্য ৭:৯, ১৫; ১১:১, ২; ইব্রীয় ৯:১১, ১২, ২৪) যে দেশগুলিতে উত্তরের রাজা কর্তৃত্ব করছিল, সেখানে অভিষিক্ত অবশিষ্টাংশ এবং তাদের সহচরদের ক্রমাগত নির্যাতনের দ্বারা মন্দিরের পার্থিব প্রাঙ্গণকে অপবিত্র করা হয়েছিল। এই নির্যাতন এতই তীব্র ছিল যে, নিত্য নৈবেদ্য—প্রকাশ্যে যিহোবার নামের প্রশংসা করা—নিবৃত্ত করতে হয়েছিল। (ইব্রীয় ১৩:১৫) তবুও, ইতিহাস দেখায় যে প্রচণ্ড কষ্ট সহ্য করা সত্ত্বেও, “অপর মেষের” সাথে বিশ্বস্ত অভিষিক্ত খ্রীষ্টানেরা গোপনে প্রচার করা বজায় রেখেছিলেন।—যোহন ১০:১৬.
“ঘৃণার্হ বস্তু”
১২, ১৩. “ঘৃণার্হ বস্তু” কী ছিল আর—বিশ্বস্ত এবং বুদ্ধিমান দাস যেমন পূর্বাভাষ পেয়েছিলেন—কখন এবং কিভাবে তা পুনর্স্থাপন করা হয়েছিল?
১২ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ যখন শেষ হয়ে আসছিল, তখন আরেকটি ঘটনা ঘটে। “তাহারা . . . ধ্বংসকারী ঘৃণার্হ বস্তু স্থাপন করিবে।” (দানিয়েল ১১:৩১খ) এই “ঘৃণার্হ বস্তু” যার বিষয়ে যীশুও উল্লেখ করেছিলেন, ইতিমধ্যেই তাকে জাতিপুঞ্জ হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে, সেই সিন্দুর-বর্ণ বন্য পশু, প্রকাশিত বাক্য অনুযায়ী যে অগাধলোকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। (মথি ২৪:১৫; প্রকাশিত বাক্য ১৭:৮; জ্যোতি (ইংরাজি), দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪ দেখুন।) দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়ে তা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪২ সালে যিহোবার সাক্ষীদের নতুন জগৎ ঐশিক সম্মেলনে, ওয়াচ টাওয়ার বাইবেল অ্যাণ্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটির তৃতীয় সভাপতি নেথান্ এইচ্. নর্, প্রকাশিত বাক্য ১৭ অধ্যায়ের ভবিষ্যদ্বাণীটি আলোচনা করে সাবাধান করে দিয়েছিলেন যে পশুটি আবার অগাধলোক থেকে উঠে আসবে।
১৩ ইতিহাস তার কথাগুলির সত্যতা প্রমাণ করেছে। আগস্ট এবং অক্টোবর মাসের মধ্যে, ১৯৪৪ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের ডাম্বারটন ওকস্-এ, যে সংস্থাকে রাষ্ট্রসংঘ বলা হবে, তার ফারমান তৈরি করা শুরু হয়েছিল। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ, ৫১টি দেশ সেই ফারমান স্বীকার করে নেয়, আর অক্টোবর ২৪, ১৯৪৫ সালে যখন তা প্রয়োগ করা হয়, বলা যেতে পারে যে তখন নিষ্ক্রিয় জাতিপুঞ্জ অগাধলোক থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
১৪. উত্তরের রাজার পরিচিতিতে কখন এবং কিভাবে পরিবর্তন হয়েছিল?
১৪ দুটি বিশ্ব যুদ্ধের সময়েই, দক্ষিণের রাজার প্রধান শত্রু ছিল জার্মানী। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে, জার্মানীর একটি অংশ দক্ষিণের রাজার বন্ধুপক্ষ হওয়ার জন্য নিজেদের নতুন করে প্রস্তুত করে নিয়েছিল। কিন্তু জার্মানীর অন্য অংশটি এখন আরেকটি সম্ভাব্য সাম্রাজ্যের সাথে যোগ দিল। জার্মানীর কিছুটা অংশ সমেত কমিউনিস্ট বর্গ, প্রবলভাবে অ্যাংলো-আমেরিকার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল আর দুই রাজার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটি ঠাণ্ডা লড়াইতে পরিণত হল।—“পৃথিবীতে তোমার ইচ্ছা সিদ্ধ হোক,” পৃষ্ঠা ২৬৪-৮৪ দেখুন।
রাজা এবং নিয়ম
১৫. ‘যারা নিয়ম সম্বন্ধে দুষ্কার্য্য করে’ তারা কারা এবং উত্তরের রাজার সঙ্গে তাদের কী সম্পর্ক আছে?
১৫ এবারে স্বর্গদূত বলেছেন: “যাহারা সেই নিয়ম সম্বন্ধে দুষ্কার্য্য করে, সে তাহাদিগকে চাটুবাদ দ্বারা ভ্রষ্ট করিবে।” (দানিয়েল ১১:৩২ক) নিয়মের বিরুদ্ধে কারা এই দুষ্কার্য করছে? তারা একমাত্র খ্রীষ্টজগতের নেতারা হতে পারে, যারা নিজেদের খ্রীষ্টান বলে দাবি করে কিন্তু কাজের মাধ্যমে যারা খ্রীষ্টতত্ত্বের নাম অপবিত্র করে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে, “সোভিয়েত সরকার, মাতৃভূমির রক্ষার্থে গির্জাগুলির কাছ থেকে আর্থিক এবং নৈতিক সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করেছিল।” (ওয়াল্টার কোলার্জ লিখিত সোভিয়েত ইউনিয়নে ধর্ম) যুদ্ধের পরে, উত্তরের রাজার নিরীশ্বরবাদী মনোবৃত্তি সত্ত্বেও, গির্জার নেতারা সেই বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চেষ্টা করেছিল।b এইভাবে, খ্রীষ্টজগত সবচেয়ে বেশি করে এই জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল—যিহোবার দৃষ্টিতে একটি ঘৃণার্হ ধর্মভ্রষ্টতার কাজ।—যোহন ১৭:১৪; যাকোব ৪:৪.
১৬, ১৭. যারা “বুদ্ধিমান” তারা কারা আর উত্তরের রাজার অধীনে কিভাবে তারা তাদের কাজ চালিয়ে গেছেন?
১৬ কিন্তু প্রকৃত খ্রীষ্টানদের সম্বন্ধে কী? “যে প্রজারা আপন ঈশ্বরকে জানে, তাহারা বলবান হইয়া কার্য্য করিবে। আর প্রজাদের মধ্যে যাহারা বুদ্ধিমান, তাহারা অনেককে উপদেশ দিবে; তথাপি কিছু দিন পর্য্যন্ত তাহারা খড়্গে ও অগ্নিশিখায়, বন্দিদশায় ও লুটে পতিত হইবে।” (দানিয়েল ১১:৩২খ, ৩৩) উত্তরের রাজার অধীনে বসবাসকারী খ্রীষ্টানেরা উপযুক্তরূপে “প্রাধান্যপ্রাপ্ত কর্ত্তৃপক্ষদের বশীভূত” থাকলেও, জগতের অংশ হয়নি। (রোমীয় ১৩:১; যোহন ১৮:৩৬) কৈসরের জিনিস কৈসরকে ফিরত দিতে সতর্ক থাকলেও, “ঈশ্বরের যাহা যাহা, ঈশ্বরকে” তা তারা দিয়েছে। (মথি ২২:২১) এইজন্য তাদের বিশ্বস্ততা পরীক্ষিত হয়েছিল।—২ তীমথিয় ৩:১২.
১৭ তার ফল? তারা ‘বলবানও’ হয় এবং ‘পতিতও’ হয়। এই অর্থে তারা পতিত হয় যে তাদের অনেককে প্রচণ্ড নির্যাতন এবং কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল, কয়েকজন এমনকি মারাও গিয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা বলবান থেকেছিল কারণ তারা বিশ্বাস রেখেছিল। হ্যাঁ, তারা জগতকে জয় করেছিল, ঠিক যেমন যীশু করেছিলেন। (যোহন ১৬:৩৩) এছাড়াও, তারা কখনও প্রচার করা বন্ধ করে দেয়নি, কারাগার অথবা কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে থেকেও না। এইভাবে প্রচার করে তারা ‘অনেককে উপদেশ দিয়েছে।’ নির্যাতন সত্ত্বেও, উত্তরের রাজার শাসনাধীনে অধিকাংশ দেশে যিহোবার সাক্ষীদের সংখ্যায় বৃদ্ধি হয়েছে। “যারা বুদ্ধিমান” তাদের ধন্যবাদ, কারণ ক্রমাগত বৃদ্ধিরত “বিস্তর লোকের” এক দল সেই দেশগুলিতে দেখা দিয়েছে।—প্রকাশিত বাক্য ৭:৯-১৪.
১৮. উত্তরের রাজার অধীনে বসবাসকারী অভিষিক্ত অবশিষ্টাংশ কিভাবে “অল্প সাহায্য” পেয়েছে?
১৮ ঈশ্বরের লোকেদের নির্যাতন সম্বন্ধে সেই স্বর্গদূত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: “যখন পড়িবে, তখন তাহারা অল্প সাহায্য প্রাপ্ত হইবে।” (দানিয়েল ১১:৩৪ক) কিভাবে তা হয়েছিল? প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে দক্ষিণের রাজার জয়লাভ, শত্রুপক্ষের রাজার অধীনে বসবাসকারী খ্রীষ্টানদের নির্যাতন অনেকটা লাঘব করেছিল। (প্রকাশিত বাক্য ১২:১৫, ১৬ তুলনা করুন।) তারপর, যারা পরবর্তী রাজার দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিল তারা মাঝে মধ্যে উপশম লাভ করেছিল আর ঠাণ্ডা লড়াই যত কমে আসতে লাগল, বহু নেতারা উপলব্ধি করতে লাগলেন যে বিশ্বস্ত খ্রীষ্টানদের থেকে ভয়ের কোন কারণ নেই এবং তাদের আইনত স্বীকৃতি দিতে লাগলেন।c বিস্তর লোকেদের বৃদ্ধিরত বিশাল সংখ্যা থেকেও প্রচুর সাহায্য এসেছে, যারা অভিষিক্ত ব্যক্তিদের বিশ্বস্ত প্রচার কাজে সাড়া দিয়েছে এবং তাদের সাহায্য করেছে, মথি ২৫:৩৪-৪০ পদে যেমন বর্ণনা করা আছে।
ঈশ্বরের লোকেদের পরিষ্কৃতকরণ
১৯. (ক) কিভাবে “অনেকে চাটুবাদ দ্বারা তাহাদিগেতে আসক্ত” হয়েছিল? (খ) “শেষ পর্য্যন্ত” উক্তিটির অর্থ কী? (ফুটনোট দেখুন।)
১৯ এই সময়ে ঈশ্বরকে সেবা করতে যারা আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, তাদের সকলের উদ্দেশ্য ভাল ছিল না। স্বর্গদূত সাবধান করে দিয়েছিলেন: “অনেকে চাটুবাদ দ্বারা তাহাদিগেতে আসক্ত হইবে। আর বুদ্ধিমানদের মধ্যে কেহ কেহ পতিত হইবে, যেন তাহারা পরীক্ষাসিদ্ধ, পরিষ্কৃত ও শুক্লীকৃত হয়; শেষ পর্য্যন্ত ইহা হইবে; কেননা তখনও নিরূপিত কালের অপেক্ষা করা যাইবে।”d (দানিয়েল ১১:৩৪খ, ৩৫) কয়েকজন সত্যের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল কিন্তু ঈশ্বরকে সেবা করতে প্রকৃত উৎসর্গীকরণ করতে আগ্রহী ছিল না। অন্য কয়েকজন, যাদের দেখে মনে হয়েছিল যে তারা সুসমাচার গ্রহণ করেছে, আসলে তারা কর্তৃপক্ষদের গুপ্তচর ছিল। একটি দেশ থেকে এই রিপোর্ট জানানো হয়েছে: “এই বিবেকবর্জিত ব্যক্তিদের কয়েকজন ছিল কট্টর কমিউনিস্ট যারা ঈশ্বরের সংগঠনে ঢুকে পড়ে, প্রচণ্ড উদ্যোগ প্রকাশ করে আর এমনকি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও তাদের নিয়োগ করা হয়েছিল।”
২০. ভণ্ড গুপ্তচরদের জন্য কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বাধা পেতে যিহোবা কেন অনুমতি দিয়েছিলেন?
২০ গুপ্তচরদের জন্য কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তি কর্তৃপক্ষদের কাছে ধরা পড়েছিলেন। যিহোবা কেন এইসব হতে দিয়েছিলেন? পরিষ্কৃত বা বিশুদ্ধ করবার জন্য। ঠিক যেমন যীশু “যে সকল দুঃখভোগ করিয়াছিলেন, তদ্বারা আজ্ঞাবহতা শিক্ষা” করেছিলেন, সেইভাবে এই বিশ্বস্ত ব্যক্তিরাও তাদের বিশ্বাসের পরীক্ষার মাধ্যমে ধৈর্য রাখতে শিখেছিলেন। (ইব্রীয় ৫:৮; যাকোব ১:২, ৩; মালাখি ৩:৩ তুলনা করুন।) এইভাবে তারা ‘পরীক্ষাসিদ্ধ, পরিষ্কৃত ও শুক্লীকৃত’ হয়েছিলেন। ধৈর্য রাখার জন্য যখন এই বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার নিরূপিত সময় আসবে তখন তাদের সামনে থাকবে অফুরন্ত আনন্দ। দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণী সম্বন্ধে আরও আলোচনা করার সময়ে আমরা তা দেখতে পাব। (w93 11/1)
[পাদটীকাগুলো]
a ওয়াচটাওয়ার বাইবেল অ্যাণ্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটি দ্বারা ইংরাজিতে প্রকাশিত এবং যিহোবার সাক্ষীদের “ঐশ্বরিক ইচ্ছা” আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১৯৫৮ সালে বিতরণ করা হয়েছিল।
b নভেম্বর ১৯৯২ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস রিভিউ-তে দ্যা টোরন্টো স্টার থেকে প্রবন্ধ প্রকাশিত করা হয়েছিল যেখানে বলা হয়েছে: “বহু বছর ধরে, রাশিয়ান্রা তাদের দেশের ইতিহাস সম্বন্ধে একসময়ে-দুর্ভেদ্য অনেক অলীক বিশ্বাসকে, সত্যের সামনে ভেঙে পড়তে দেখেছে। কিন্তু কমিউনিস্ট শাসনের সঙ্গে গির্জার যোগ দেওয়া হয়ত সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল।”
c জুলাই ১৫, ১৯৯১ সালের প্রহরীদুর্গ, পৃষ্ঠা ৮-১১ দেখুন।
d “শেষ পর্য্যন্ত”-র অর্থ হতে পারে “শেষকাল চলাকালীন।” এখানে যে শব্দটিকে “পর্য্যন্ত” অনুবাদ করা হয়েছে তা দানিয়েল ৭:২৫ পদের অ্যারামিক্ লিপিতে পাওয়া যায় আর সেখানে তার অর্থ “সময়কালীন” অথবা “সময়ে।” দ্বিতীয় রাজাবলি ৯:২২, ইয়োব ২০:৫ এবং বিচারকর্ত্তৃগণ ৩:২৬ পদের ইব্রীয় শাস্ত্রে এই শব্দটি একই অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে, দানিয়েল ১১:৩৫ পদের শব্দটি “পর্য্যন্ত” অনুবাদ করা হয়েছে আর এটিই যদি সঠিক অর্থ হয় তাহলে “শেষ পর্য্যন্ত” এখানে হবে ঈশ্বরের লোকেদের ধৈর্য রাখা শেষ হওয়া পর্যন্ত।—“পৃথিবীতে তোমার ইচ্ছা সিদ্ধ হোক,” পৃষ্ঠা ২৮৬ তুলনা করুন।
আপনার কি মনে আছে?
▫ আমরা এখন কেন দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণী সম্বন্ধে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়ার আশা রাখতে পারি?
▫ উত্তরের রাজা কিভাবে ‘ক্রোধিত হয়ে কার্য করেছিল’?
▫ “ঘৃণার্হ বস্তুর” পুনরায় আবির্ভাব সম্বন্ধে দাস শ্রেণী কিভাবে পূর্বাভাষ পেয়েছিলেন?
▫ অভিষিক্ত অবশিষ্টাংশ কিভাবে ‘পতিত ও বলবান হবে এবং অল্প সাহায্য’ পাবে?
[Pictures on page 14]
হিটলারের অধীনে, ১৯১৮ সালে দক্ষিণের রাজার কাছে পরাজয়ের প্রভাব থেকে, উত্তরের রাজা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়েছিল
[Pictures on page 15]
খ্রীষ্টজগতের নেতারা, উত্তরের রাজার সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল
[সজন্যে]
Zoran/Sipa Press