মহান অধ্যক্ষ মীখায়েলের শেষ জয়
“তৎকালে যে মহান্ অধ্যক্ষ তোমার জাতির সন্তানদের পক্ষে দাঁড়াইয়া থাকেন, সেই মীখায়েল উঠিয়া দাঁড়াইবেন।”—দানিয়েল ১২:১.
১. পৃথিবীর বহু নেতারা যিহোবার সার্বভৌমত্বের প্রতি কী মনোভাব দেখিয়েছেন এবং উত্তরের রাজা কিভাবে তার কোন ব্যতিক্রম ছিল না?
“যিহোবা কে, যে আমি তাহার কথা শুনিয়া ইস্রায়েলকে ছাড়িয়া দিব?” (যাত্রাপুস্তক ৫:২, NW) মোশিকে চ্যালেঞ্জ করে ফরৌণ এই কথাগুলি বলেছিলেন। যিহোবার সার্বভৌম ঈশ্বর-পদকে মেনে নিতে অস্বীকার করে ইস্রায়েলকে দাসত্বে রাখতে ফরৌণ বদ্ধ পরিকর ছিলেন। অন্য শাসকেরাও যিহোবার প্রতি একই রকম অবজ্ঞা দেখিয়েছেন আর দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীর রাজারা এর কোন ব্যতিক্রম নয়। (যিশাইয় ৩৬:১৩-২০) বাস্তবপক্ষে, উত্তরের রাজা আরও বেশি কিছু করেছে। স্বর্গদূত বলেছেন: “সে সমস্ত দেবতা অপেক্ষা আপনাকে বড় করিয়া দেখাইবে, ও দর্প করিবে, এবং ঈশ্বরদের ঈশ্বরের বিপরীতে অদ্ভুত কথা কহিবে, . . . আর সে আপন পিতৃপুরুষদের দেবগণকে মানিবে না, এবং স্ত্রীলোকদের কামনাকে কিম্বা কোন দেবতাকে মানিবে না; কেননা সে সর্ব্বাপেক্ষা আপনাকেই বড় করিয়া দেখাইবে।”—দানিয়েল ১১:৩৬, ৩৭.
২, ৩. উত্তরের রাজা কিভাবে তার “পিতৃপুরুষদের দেবগণকে” পরিত্যাগ করে আরেকজন “দেবতার” উপাসনা গ্রহণ করেছিল?
২ এই ভবিষ্যদ্বাণীমূলক কথাগুলির পরিপূর্ণতাস্বরূপ, উত্তরের রাজা তার “পিতৃপুরুষদের দেবগণকে” (অথবা, “তার পূর্বপুরুষদের দেবতাকে,” দ্যা নিউ ইংলিশ্ বাইবেল) পরিত্যাগ করেছিল, তা রোমের পৌত্তলিক দেবতারাই হোক অথবা খ্রীষ্টজগতের ত্রিত্ব-ঈশ্বরই হোক। হিটলার খ্রীষ্টজগতকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন কিন্তু স্পষ্টতই, তার পরিবর্তে তিনি একটি নতুন জার্মানিক গির্জা গড়ে তুলবার পরিকল্পনা করছিলেন। তার উত্তরাধিকারী প্রত্যক্ষভাবে নিরীশ্বরবাদ ঘোষণা করেছিলেন। এইভাবে উত্তরের রাজা নিজেদের ঈশ্বরের পদে বসিয়েছিল, ‘নিজেকেই সর্ব্বাপেক্ষা বড় করে দেখিয়েছিল।’
৩ ভবিষ্যদ্বাণীতে আরও বলা হয়েছে: “সে স্বস্থানে দুর্গ-দেবের সম্মান করিবে, এবং আপন পিতৃপুরুষদের অজ্ঞাত দেবকে স্বর্ণ, রৌপ্য, মণি ও মনোরম্য বস্তু দিয়া সম্মান করিবে।” (দানিয়েল ১১:৩৮) প্রকৃতপক্ষে, উত্তরের রাজা “দুর্গ-দেব” অথবা আধুনিক বিজ্ঞানগঠিত সামরিক শাসনের উপরে নির্ভর করেছিল। শেষকালের শুরু থেকেই সে এই “দেবতার” কাছে পরিত্রাণ চেয়েছে, তার বেদীতে বিপুল ধনসম্পদ উৎসর্গ করেছে।
৪. উত্তরের রাজা কী সাফল্য পেয়েছিল?
৪ “সে বিজাতীয় দেবের সাহায্যে অতি দৃঢ় দুর্গ সকলের বিরুদ্ধে ব্যাপৃত হইবে; যত লোক তাহাকে স্বীকার করিবে, তাহাদিগকে সে অতি সম্মানিত করিবে; তাহাদিগকে অনেকের উপরে কর্ত্তৃত্বপদ দিবে, ও পারিতোষিকরূপে ভূমি বিভাগ করিয়া দিবে।” (দানিয়েল ১১:৩৯) রণনৈতিক “বিজাতীয় দেবের” উপরে ভরসা রেখে, উত্তরের রাজা অত্যন্ত ‘কার্যকারী’ হয়েছে, “শেষকালে” একটি উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তি হয়ে উঠেছে। (২ তীমথিয় ৩:১) যারা তার মতবাদ সমর্থন করেছিল, তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কখনও কখনও সামরিক সমর্থন দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
“শেষকালে”
৫, ৬. দক্ষিণের রাজা কিভাবে ‘ঢুসিয়েছে’ এবং তাতে উত্তরের রাজার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছে?
৫ দানিয়েল ১১:৪০ক পদে লেখা আছে: “পরে শেষকালে দক্ষিণ দেশের রাজা তাহাকে ঢুসাইবে।” এই পদটি এবং এর পরেরগুলির পরিপূর্ণতা আমাদের ভবিষ্যতে হবে বলে মনে করা হয়েছে। কিন্তু, এখানে “শেষকালের” অর্থ যদি দানিয়েল ১২:৪, ৯ পদের সঙ্গে একই হয় তাহলে এই কথাগুলির পরিপূর্ণতা সম্পূর্ণ শেষকাল ধরে হবে বলে আমাদের আশা করা উচিত। এই সময়ে দক্ষিণের রাজা কি উত্তরের রাজাকে ‘ঢুসিয়েছে’? হ্যাঁ। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পরে, শাস্তিমূলক শান্তি চুক্তিটি অবশ্যই ‘ঢুসাবার’ মত, পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য উত্তেজিত করে তুলবার চেষ্টা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জয়ের পরে, দক্ষিণের রাজা তার প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য ভয়ঙ্কর সমস্ত আনবিক অস্ত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল আর তার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামরিক সংস্থা গড়ে তুলেছিল যার নাম ন্যাটো (NATO)। ক্রমে, ‘ঢুসানোর’ অন্তর্ভুক্ত হল উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে গুপ্তচরবৃত্তি এবং অন্যান্য কূটনৈতিক এবং সামরিক আক্রমণ।
৬ উত্তরের রাজার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? “উত্তর দেশের রাজা রথের, অশ্বারোহীদের ও অনেক জাহাজের সহিত ঘূর্ণ্যবায়ুর ন্যায় তাহার বিরুদ্ধে আসিবে; এবং নানা দেশের মধ্যে প্রবেশ করিবে ও উথলিয়া উঠিয়া বাড়িতে থাকিবে।” (দানিয়েল ১১:৪০খ) শেষকালের ইতিহাসের একটি মুখ্য বিষয় হল উত্তরের রাজার রাজত্বের বৃদ্ধির কথা। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে, নাৎসি “রাজা” প্রতিবেশী দেশগুলির উপরে তার সীমানা বিস্তার করেছিল। যুদ্ধের শেষে, উত্তরাধিকারী “রাজা” নিজের দেশের সীমানার বাইরে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। ঠাণ্ডা লড়াই চলাকালীন, উত্তরের রাজা এবং তার প্রতিপক্ষ, বিভিন্ন যুদ্ধে বিপরীত পক্ষকে সমর্থন করেছিল এবং আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকাতে বিপ্লবীদের সাহায্য করেছিল। সত্য খ্রীষ্টানদের সে নির্যাতন করেছিল, তাদের কাজ সীমিত করেছিল (কিন্তু কোনভাবেই বন্ধ করতে পারেনি)। আর তার সামরিক ও রাজনৈতিক অভিযান বহু দেশকে তার ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল। স্বর্গদূতের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ঠিক তা হয়েছিল: “সে রত্নস্বরূপ দেশেও [ঈশ্বরের লোকেদের আত্মিক দেশে] প্রবেশ করিবে, তাহাতে অনেক দেশ পরাভূত হইবে।”—দানিয়েল ১১:৪১ক.
৭. উত্তরের রাজার সাম্রাজ্যবৃদ্ধিতে কী সীমা ছিল?
৭ কিন্তু—তার শত্রুপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে—উত্তরের রাজার উপস্থিতি বিপজ্জনক হলেও, বিশ্ব জয় করতে সে পারেনি। “কিন্তু ইদোম ও মোয়াব এবং অম্মোন-সন্তানদের শ্রেষ্ঠাংশ তাহার হস্ত হইতে রক্ষা পাইবে।” (দানিয়েল ১১:৪১খ) প্রাচীনকালে ইদোম, মোয়াব ও অম্মোন অবস্থিত ছিল মিশর এবং সিরিয়ার মধ্যবর্তী জায়গায়। বর্তমানে যে সমস্ত দেশ ও সংগঠনকে নিজের আয়ত্বে আনতে উত্তরের রাজা চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি, তাদের দ্বারা সেইগুলিকে চিত্রিত করা যায়।
‘মিশর রক্ষা পাবে না’
৮, ৯. উত্তরের রাজার প্রভাব, এমনকি তার প্রধান বিরোধীপক্ষও কিভাবে পেয়েছে?
৮ স্বর্গদূত আরও বলেছেন: “আর সে নানা দেশের উপরে হস্ত প্রসারণ করিবে, আর মিসর দেশ রক্ষা পাইবে না। মিস্রীয়দের স্বর্ণ ও রৌপ্যের ভাণ্ডারসকল ও সমস্ত রত্ন তাহার হস্তগত হইবে, এবং লুবীয়েরা ও কূশীয়েরা তাহার অনুচর হইবে।” (দানিয়েল ১১:৪২, ৪৩) এমনকি দক্ষিণের রাজা “মিশরও” উত্তরের রাজার রাজ্য-বৃদ্ধি নীতি থেকে রক্ষা পায়নি। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনামে সে বেশ ভাল করেই পরাজিত হয়েছিল। আর “লুবীয় ও কূশীয়দের” সম্বন্ধে কী? প্রাচীন মিশরের এই প্রতিবেশীরা ভৌগলিক অর্থে উপযুক্তরূপেই আধুনিক “মিশরের” প্রতিবেশী দেশগুলিকে চিত্রিত করতে পারে, যারা কখনও কখনও উত্তরের রাজার অনুগামী হয়েছে, ‘তার অনুচর হয়েছে।’
৯ উত্তরের রাজা কি মিশরের ‘ভাণ্ডারসকলের’ কর্তৃত্ব পেয়েছে? সে অবশ্যই দক্ষিণের রাজাকে পরাজিত করতে পারেনি আর ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত জগতের পরিস্থিতি দেখে মনে হয়নি যে সে আর তা পারবে। কিন্তু দক্ষিণের রাজার অর্থনীতির উপরে সে বেশ জোরালো প্রভাব ফেলেছে। শত্রুপক্ষের ভয়ে, দক্ষিণের রাজা একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর পিছনে প্রত্যেক বছর বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় করেছে। এই অর্থে, বলা যেতে পারে যে উত্তরের রাজা, দক্ষিণের রাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপরে ‘কর্তৃত্ব’ অথবা নিয়ন্ত্রণ করেছে।
উত্তরের রাজার শেষ অভিযান
১০. দুই রাজার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শেষ সম্বন্ধে স্বর্গদূত কীভাবে বর্ণনা করেছেন?
১০ দুই রাজার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে? না। স্বর্গদূত দানিয়েলকে বলেছিলেন: “কিন্তু পূর্ব্ব ও উত্তর দেশ হইতে আগত সংবাদ তাহাকে [উত্তরের রাজাকে] বিহ্বল করিবে, এবং সে অনেককে উচ্ছিন্ন ও নিঃশেষে বিনষ্ট করণার্থে মহাক্রোধে যাত্রা করিবে। আর সে সমুদ্রের ও পবিত্র গিরিরত্নের মধ্যে রাজকীয় তাম্বু স্থাপন করিবে; তথাপি তাহার শেষকাল উপস্থিত হইবে, কেহ তাহার সাহায্য করিবে না।”—দানিয়েল ১১:৪৪, ৪৫.
১১, ১২. উত্তর এবং দক্ষিণের রাজার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে কোন্ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলির যোগ আছে এবং আমাদের এখনও কী জানতে বাকি আছে?
১১ এই ঘটনাগুলি ভবিষ্যতে ঘটবে, সুতরাং ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক কিভাবে পরিপূর্ণ হবে আমরা তা বিস্তারিতভাবে বলতে পারি না। সম্প্রতি, দুই রাজার রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে প্রবল রেষারেষি ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। এছাড়াও, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়াকে বিভক্ত করা হয় এবং এখন আর তার অস্তিত্ব নেই।—মার্চ ১, ১৯৯২ সালের প্রহরীদুর্গ, পৃষ্ঠা ৪, ৫ দেখুন।
১২ তাহলে এখন উত্তরের রাজা কে? পুরনো সোভিয়েত রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত কোন দেশ হিসাবে কি তাকে শনাক্ত করা যায়? অথবা সে সম্পূর্ণরূপে নিজের পরিচিতি বদলে ফেলছে, যেমন সে আগেও অনেকবার করেছে? আমরা তা বলতে পারি না। দানিয়েল ১১:৪৪, ৪৫ পদ পূর্ণ হওয়ার সময়ে উত্তরের রাজা কে হবে? দুই রাজার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি আবার জেগে উঠবে? আর বহু দেশে যে প্রচুর পরিমাণ আনবিক অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে, সেগুলি সম্বন্ধে কী? এই প্রশ্নগুলির উত্তর আমরা একমাত্র ভবিষ্যতেই পেতে পারি।
১৩, ১৪. দুই রাজার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আমরা কী জানি?
১৩ একটি বিষয় অবশ্য আমরা জানি। শীঘ্রই, “পূর্ব্ব ও উত্তর দেশ হইতে আগত সংবাদ তাহাকে বিহ্বল” করার জন্য, উত্তরের রাজা একটি আক্রমণাত্মক অভিযান চালাবে। এই অভিযানের ঠিক পরেই তার “শেষ” আসবে। বাইবেলের অন্যান্য ভবিষ্যদ্বাণী বিবেচনা করলে আমরা এই “সংবাদ” সম্বন্ধে আরও জানতে পারব।
১৪ কিন্তু প্রথমে, লক্ষ্য করুন যে উত্তরের রাজার এই অভিযান, দক্ষিণের রাজার বিরুদ্ধে হবে, তা বলা হয়নি। তার প্রধান শত্রুর হাতে তার শেষ হবে না। একইভাবে, উত্তরের রাজার হাতে দক্ষিণের রাজা ধ্বংস হবে না। দক্ষিণের রাজা (অন্যান্য ভবিষ্যদ্বাণীতে যাকে বন্য পশুর মাথায় শেষ শৃঙ্গ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে) ঈশ্বরের রাজ্যের মাধ্যমে, ‘মনুষ্য হস্ত বিনা’ ধ্বংস হবে। (দানিয়েল ৭:২৬; ৮:২৫) বাস্তবপক্ষে, হর্মাগিদোনের যুদ্ধে সমস্ত পার্থিব রাজা ঈশ্বরের রাজ্যের দ্বারা ধ্বংস হবে আর উত্তরের রাজারও হয়ত একই পরিণতি হবে। (দানিয়েল ২:৪৪; ১২:১; প্রকাশিত বাক্য ১৬:১৪, ১৬) দানিয়েল ১১:৪৪, ৪৫ পদে, সেই অন্তিম যুদ্ধের প্রতি যাওয়ার পথে যে সব ঘটনা ঘটবে তা বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং, উত্তরের রাজার ধ্বংসের সময়ে “কেহ তাহার সাহায্য করিবে না,” তা কিছু আশ্চর্যের বিষয় নয়!
১৫. কোন্ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি এখনও বিবেচনা করা বাকি আছে?
১৫ ‘অনেককে নিঃশেষে বিনষ্ট করতে’ যে “সংবাদ” উত্তরের রাজাকে প্ররোচিত করবে সেই সম্বন্ধে অন্য কোন্ ভবিষ্যদ্বাণীগুলি আলোচনা করেছে? আর এই “অনেককে” কারা, যাদের সে ধ্বংস করতে চাইবে?
পূর্ব দেশ থেকে সংবাদ
১৬. (ক) হর্মাগিদোনের আগে, কোন্ উল্লেখযোগ্য ঘটনা অবশ্যই ঘটবে? (খ) “সূর্য্যোদয় স্থান হইতে আগমনকারী রাজারা” কারা?
১৬ শেষ যুদ্ধ হর্মাগিদোনের আগে, সত্য উপাসনার এক প্রবল শত্রু—বেশ্যাতুল্য মহতী বাবিল, মিথ্যা ধর্মের বিশ্ব সাম্রাজ্যেকে ধ্বংস হতে হবে। (প্রকাশিত বাক্য ১৮:৩-৮) রূপক ইউফ্রেটীস নদীতে ঈশ্বরের ক্রোধের ষষ্ঠ বাটি ঢেলে দেওয়ার মাধ্যমে তার ধ্বংস সম্বন্ধে পূর্বাভাষ দেওয়া হয়েছে। নদীটি শুকিয়ে যাবে, “যেন সূর্য্যোদয় স্থান হইতে আগমনকারী রাজাদের জন্য পথ প্রস্তুত করা যাইতে পারে।” (প্রকাশিত বাক্য ১৬:১২) এই রাজারা কারা? যিহোবা ঈশ্বর এবং যীশু খ্রীষ্ট বিনা অন্য কেউ নয়!a
১৭. (ক) মহতী বাবিলের ধ্বংস সম্পর্কে বাইবেল আমাদের কী বলেছে? (খ) “সূর্য্যোদয় স্থান হইতে” সংবাদ কী হতে পারে?
১৭ প্রকাশিত বাক্যে, মহতী বাবিলের ধ্বংস সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে: “তুমি যে ঐ দশ শৃঙ্গ [শেষকালে শাসনরত ‘রাজারা’] এবং পশুটা [সিঁদুর-বর্ণ পশু যা রাষ্ট্রসঙ্ঘকে চিত্রিত করে] দেখিলে তাহারা সেই বেশ্যাকে ঘৃণা করিবে, এবং তাহাকে অনাথা ও নগ্না করিবে, তাহার মাংস ভক্ষণ করিবে, এবং তাহাকে আগুনে পোড়াইয়া দিবে।” (প্রকাশিত বাক্য ১৭:১৬) সত্যিই, জাতিগণ ‘যথেষ্ট মাংস ভোজন’ ধ্বংস করবে! (দানিয়েল ৭:৫) কিন্তু উত্তরের রাজার সঙ্গে অন্যান্য শাসকেরা কেন মহতী বাবিলকে ধ্বংস করবে? কারণ ‘ঈশ্বর তাদের হৃদয়ে এই মনোবৃত্তি দেবেন যেন তারা তাঁরই ইচ্ছা পূর্ণ করে।’ (প্রকাশিত বাক্য ১৭:১৭) “সূর্য্যোদয় স্থান হইতে” সংবাদ যিহোবার এই কাজকে উপযুক্তরূপে চিত্রিত করতে পারে যখন ধর্মীয় মহা বেশ্যাকে ধ্বংস করতে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তিনি মানব শাসকদের হৃদয়ে প্রবৃত্তি জাগিয়ে তুলবেন।—দানিয়েল ১১:৪৪.
উত্তর দেশ থেকে সংবাদ
১৮. উত্তরের রাজার অন্য কোন্ লক্ষ্যবস্তু আছে এবং তার পতন হওয়ার সময়ে সে নিজেকে কোথায় স্থাপন করবে?
১৮ কিন্তু উত্তরের রাজার ক্রোধের আরেকটি লক্ষ্যবস্তু আছে। স্বর্গদূত বলেছেন যে “সে সমুদ্রের ও পবিত্র গিরিরত্নের মধ্যে রাজকীয় তাম্বু স্থাপন করিবে।” (দানিয়েল ১১:৪৫) দানিয়েলের দিনে সমুদ্র বলতে ভূমধ্য সাগরকে বোঝানো হত আর পবিত্র গিরি ছিল সিয়োন, একসময়ে যেখানে ঈশ্বরের মন্দির অবস্থিত ছিল। সুতরাং, ভবিষ্যদ্বাণীটির পরিপূর্ণতায় উত্তরের রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে ঈশ্বরের লোকেদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাবে! বর্তমানে আত্মিক অর্থে, “সমুদ্রের ও পবিত্র গিরিরত্নের মধ্যের” অর্থ সে ঈশ্বরের অভিষিক্ত সেবকদের আত্মিক সম্পত্তিতে নিজেকে স্থাপন করবে, যারা বিক্ষিপ্ত মানবজাতির “সমুদ্র” থেকে বেরিয়ে এসে যীশু খ্রীষ্টের সঙ্গে স্বর্গীয় সিয়োন পর্বতে রাজত্ব করার আশা রাখে।—যিশাইয় ৫৭:২০; ইব্রীয় ১২:২২; প্রকাশিত বাক্য ১৪:১.
১৯. যিহিষ্কেলের ভবিষ্যদ্বাণীতে যেমন ইঙ্গিত করা হয়েছে, যে সংবাদের জন্য গোগ আক্রমণ করতে প্ররোচিত হবে, তা আমরা কিভাবে শনাক্ত করতে পারি? (ফুটনোট দেখুন।)
১৯ দানিয়েলের সমসাময়িক যিহিষ্কেলও “শেষকালে” ঈশ্বরের লোকেদের প্রতি আক্রমণ সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে এই আক্রমণ শুরু করবে মাগোগ দেশের গোগ, যে শয়তান দিয়াবলকে চিত্রিত করছে। (যিহিষ্কেল ৩৮:১৬) রূপকভাবে, গোগ কোন্ দিক থেকে আসবে? যিহিষ্কেলের মাধ্যমে যিহোবা বলেছেন: “তুমি আপন স্থান হইতে, উত্তরদিকের প্রান্ত হইতে, আসিবে।” (যিহিষ্কেল ৩৮:১৫) সুতরাং, “উত্তর দেশ” থেকে সংবাদ হয়ত ঈশ্বরের লোকেদের আক্রমণ করতে উত্তরের রাজা এবং অন্যান্য রাজাদের প্রতি শয়তানের প্ররোচণা হতে পারে।b—প্রকাশিত বাক্য ১৬:১৩, ১৪; ১৭:১৪ তুলনা করুন।
২০, ২১. (ক) ঈশ্বরের লোকেদের আক্রমণ করতে, উত্তরের রাজা সমেত পৃথিবীর জাতিগুলিকে গোগ কেন প্ররোচিত করবে? (খ) তার আক্রমণ কি সফল হবে?
২০ গোগ এই তীব্র আক্রমণের নেতৃত্ব দেবে কারণ “ঈশ্বরের ইস্রায়েল” বেশ সমৃদ্ধিশালী হয় উঠবে, যারা অপর মেষের বিস্তর লোকেদের সঙ্গে আর এই জগতের অংশ নয়। (গালাতীয় ৬:১৬; যোহন ১০:১৬; ১৭:১৫, ১৬; ১ যোহন ৫:১৯) ‘জাতিগণের মধ্য হইতে সংগৃহীত, আর [আত্মিক] ধনসম্পদপ্রাপ্ত’ লোকেদের গোগ ঘৃণার চোখে দেখে। (যিহিষ্কেল ৩৮:১২; প্রকাশিত বাক্য ৫:৯; ৭:৯) এই কথাগুলির পরিপূর্ণতায়, যিহোবার লোকেরা আজ সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধিশালী হয়ে উঠছে। ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বহু দেশে, একসময়ে যেখানে কাজ নিষিদ্ধ ছিল, এখন সেখানে তারা স্বাধীনভাবে উপাসনা করতে পারে। আর ১৯৮৭ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে, জাতিগণের মধ্যে থেকে দশ লক্ষেরও বেশি “মনোরম্য বস্তু” বেরিয়ে এসে যিহোবার সত্য উপাসনার গৃহে যোগ দিয়েছে। আধ্যাত্মিকভাবে, তারা ধনী এবং শান্তিপূর্ণ।—হগয় ২:৭; যিশাইয় ২:২-৪; ২ করিন্থীয় ৮:৯.
২১ খ্রীষ্টীয় আত্মিক সম্পত্তিকে সহজপ্রাপ্য “অপ্রাচীর গ্রামপূর্ণ দেশ” মনে করে, মানবজাতির উপরে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব পাওয়ার পথে এই বাধাকে সরিয়ে দিতে গোগ শেষবারের মত আপ্রাণ চেষ্টা করবে। (যিহিষ্কেল ৩৮:১১) কিন্তু সে বিফল হবে। পৃথিবীর রাজারা যখন যিহোবার লোকেদের আক্রমণ করবে, তখন ‘তাদের শেষকাল উপস্থিত হবে।’ কিভাবে?
এক তৃতীয় রাজা
২২, ২৩. গোগ যখন আক্রমণ করবে, তখন কে ঈশ্বরের লোকেদের পক্ষে দাঁড়িয়ে উঠবেন এবং তার ফল কী হবে?
২২ যিহিষ্কেল বলেছেন যে গোগের আক্রমণ হবে যিহোবা ঈশ্বরের জন্য একটি সঙ্কেতস্বরূপ, যখন তিনি তাঁর লোকেদের জন্য কার্যকারী হয়ে “ইস্রায়েলের পর্ব্বতসমূহে” গোগের বাহিনীকে ধ্বংস করবেন। (যিহিষ্কেল ৩৮:১৮; ৩৯:৪) এই বিষয়টি, স্বর্গদূত দানিয়েলকে কী বলেছিলেন তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়: “তৎকালে যে মহান্ অধ্যক্ষ তোমার জাতির সন্তানদের পক্ষে দাঁড়াইয়া থাকেন, সেই মীখায়েল উঠিয়া দাঁড়াইবেন, আর এমন সঙ্কটের কাল উপস্থিত হইবে, যাহা মনুষ্যজাতির স্থিতিকাল অবধি সেই সময় পর্য্যন্ত কখনও হয় নাই; কিন্তু তৎকালে তোমার স্বজাতীয় যে কাহারও নাম পুস্তকে লিখিত পাওয়া যাইবে, সে উদ্ধার পাইবে।”—দানিয়েল ১২:১.
২৩ স্বর্গীয় যোদ্ধা মীখায়েল—যীশু—১৯১৪ সালে ঈশ্বরের স্বর্গীয় রাজ্যের রাজা হয়েছিলেন। (প্রকাশিত বাক্য ১১:১৫; ১২:৭-৯) তখন থেকে, তিনি ‘দানিয়েলের জাতির সন্তানদের পক্ষে’ দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু শীঘ্রই, একজন দুর্জয় যোদ্ধা-রাজা হিসাবে তিনি যিহোবার নামের জন্য ‘দাঁড়িয়ে’ উঠবেন, “যাহারা ঈশ্বরকে জানে না ও যাহারা আমাদের প্রভু যীশুর সুসমসাচারের আজ্ঞাবহ হয় না, তাহাদিগকে সমুচিত দণ্ড দিবেন।” (২ থিষলনীকীয় ১:৮) পৃথিবীর সমস্ত জাতি, এমনকি দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীর রাজারাও, “বিলাপ করিবে।” (মথি ২৪:৩০) তাদের হৃদয়ে তখনও ‘দানিয়েলের জাতির’ প্রতি কুচিন্তা রেখে, তারা ‘মহান অধ্যক্ষ, মীখায়েলের’ হাতে চিরতরে ধ্বংস হবে।—প্রকাশিত বাক্য ১৯:১১-২১.
২৪. দানিয়েলের এই ভবিষ্যদ্বাণীর অধ্যয়ন থেকে আমাদের উপরে কী প্রভাব আসা উচিত?
২৪ মীখায়েল এবং তাঁর ঈশ্বর, যিহোবার এই মহান বিজয় আমরা কি স্বচক্ষে দেখতে আশা রাখি না? কারণ সেই বিজয়ের অর্থ হবে সত্য খ্রীষ্টানদের জন্য “উদ্ধার” অথবা রক্ষা। (মালাখি ৪:১-৩ পদ তুলনা করুন।) সুতরাং, সাগ্রহে ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রেখে আমরা প্রেরিত পৌলের এই কথাগুলি স্মরণে রাখি: “তুমি বাক্য প্রচার কর, সময়ে অসময়ে কার্য্যে অনুরক্ত হও।” (২ তীমথিয় ৪:২) আসুন আমরা জীবনের বাক্য দৃঢ়ভাবে ধরে রাখি এবং উপযুক্ত সময় যতদিন থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত একাগ্রতার সাথে যিহোবার মেষেদের অনুসন্ধান করি। জীবনের দৌড়ের শেষ পর্যায়ে আমরা এসে পৌঁছেছি। পুরস্কার আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা সকলে যেন শেষ পর্যন্ত ধৈর্য রাখতে দৃঢ় সঙ্কল্প করি, তাহলে যারা রক্ষা পাবে আমরা তাদের মধ্যে থাকব।—মথি ২৪:১৩; ইব্রীয় ১২:১. (w93 11/1)
[পাদটীকাগুলো]
a ওয়াচটাওয়ার বাইবেল অ্যাণ্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটির বই প্রকাশিত বাক্য—তার মহান পরিপূর্ণতা সন্নিকট!, পৃষ্ঠা ২২৯-৩০ দেখুন।
b অথবা, “উত্তর দেশ” থেকে সংবাদ যিহোবার কাছ থেকেও আসতে পারে, কারণ তিনি গোগকে এই কথাগুলি বলেছিলেন: “আমি . . . তোমার হনূ ফুঁড়িব, আর তোমাকে . . . বাহিরে আনিব।” “উত্তরদিকের প্রান্ত হইতে তোমাকে আনাইব, এবং ইস্রায়েলের পর্ব্বতসমূহে তোমাকে উপস্থিত করিব।”—যিহিষ্কেল ৩৮:৪; ৩৯:২; গীতসংহিতা ৪৮:২ তুলনা করুন।
আপনি কি বুঝতে পেরেছেন?
▫ সম্পূর্ণ শেষকাল ধরে দক্ষিণের রাজা কিভাবে উত্তরের রাজাকে ঢুসিয়েছে?
▫ দুই রাজার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পর্কে আমাদের এখনও কী জানতে বাকি আছে?
▫ হর্মাগিদোনের আগে কোন্ দুটি ঘটনার সঙ্গে উত্তরের রাজা অবশ্যই জড়িত থাকবে?
▫ ‘মহান্ অধ্যক্ষ, মীখায়েল’ কিভাবে ঈশ্বরের লোকেদের রক্ষা করবেন?
▫ দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণী অধ্যয়ন করে আমাদের কী প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত?
[Pictures on page 18]
উত্তরের রাজা তার পূর্বপুরুষদের দেবতাদের থেকে অন্য এক দেবতাকে উপাসনা করেছে
[সজন্যে]
Top left and middle: UPI/Bettmann; bottom left: Reuters/Bettmann; bottom right: Jasmin/Gamma Liaison