জ্যোতি বাহকগণ—কী উদ্দেশ্যে?
“আমি তোমাদিগকে জাতিগণের জ্যোতিস্বরূপ করিয়াছি।”—প্রেরিত ১৩:৪৭, NW.
১. প্রেরিত ১৩:৪৭ পদে দেওয়া আদেশের দ্বারা প্রেরিত পৌল কিভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন?
‘যিহোবা আমাদিগকে এইরূপ আজ্ঞা দিয়াছেন, “আমি তোমাদিগকে জাতিগণের জ্যোতিস্বরূপ করিয়াছি, যেন তোমরা পৃথিবীর সীমা পর্য্যন্ত পরিত্রাণস্বরূপ হও,”’ প্রেরিত পৌল বলেছিলেন। (প্রেরিত ১৩:৪৭, NW.) তিনি শুধু তা বলেননি কিন্তু তার গুরুত্বও উপলব্ধি করেছিলেন। একজন খ্রীষ্টান হওয়ার পরে, সেই আজ্ঞা পালন করার প্রতি পৌল তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। (প্রেরিত ২৬:১৪-২০) সেই আজ্ঞা কি আমাদেরও দেওয়া হয়েছে? যদি হয়, আমাদের দিনে কেন তা গুরুত্বপূর্ণ?
যখন মানবজাতির জন্য ‘জ্যোতি নিভে গিয়েছিল’
২. (ক) জগৎ শেষকালে প্রবেশ করার সময়ে, কী ঘটেছিল যা তার আত্মিক এবং নৈতিক পরিবেশ প্রভূতভাবে পরিবর্তন করেছিল? (খ) একজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ১৯১৪ সালের আগস্ট মাসে যা ঘটতে দেখেন সেই বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া দেখান?
২ বর্তমানে জীবিত লোকেদের অধিকাংশই জন্মাবার আগে, এই জগৎ তার শেষকালে প্রবেশ করেছিল। উপর্যুপরি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি ঘটতে থাকে। আত্মিক এবং নৈতিক অন্ধকারের প্রধান উদ্যোক্তা, শয়তান দিয়াবলকে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। (ইফিষীয় ৬:১২; প্রকাশিত বাক্য ১২:৭-১২) মানবজাতিকে ইতিমধ্যেই তার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। উনিশ্শো চোদ্দ সালের আগস্ট মাসের প্রথমদিকে যখন যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল, তখন লন্ডনে তার অফিসের জানালায় দাঁড়িয়ে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র সচিব, স্যার এড্ওয়ার্ড গ্রে বলেছিলেন: “সমস্ত ইউরোপে আলো নিভে যাচ্ছে; আমাদের জীবনকালে আর আমরা সেগুলিকে জ্বলে উঠতে দেখব না।”
৩. মানবজাতির আশা উজ্জ্বল করতে জগতের নেতারা কতটা সফল হয়েছেন?
৩ সেই জ্যোতিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায়, ১৯২০ সালে জাতিপুঞ্জকে কার্যকারী করা হয়েছিল। কিন্তু জ্যোতি সামান্যই জ্বলেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, জগতের নেতারা আবার চেষ্টা করেন, এইবার রাষ্ট্রসংঘের মাধ্যমে। আবারও, জ্যোতি উজ্জ্বলভাবে জ্বলে উঠল না। কিন্তু, আরও আধুনিক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে, জগতের নেতারা একটি “নতুন জগৎ ব্যবস্থা” সম্বন্ধে কথা বলছেন। কিন্তু তাদের তৈরী কোন “নতুন জগৎ” যে প্রকৃত শান্তি এবং নিরাপত্তা এনেছে, তা বলা যায় না। বরং, সশস্ত্র যুদ্ধ, জাতিভেদগত বিদ্বেষ, অপরাধ, বেকারত্ব, পরিবেশদূষণ, এবং রোগব্যাধি এই সমস্তই জীবন উপভোগ করা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে চলেছে।
৪, ৫. (ক) কখন এবং কিভাবে মানবজাতি অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়? (খ) উপশম পাওয়ার জন্য কিসের প্রয়োজন?
৪ প্রকৃতপক্ষে, ১৯১৪ সালের বহু আগে মানবজাতির জন্য জ্যোতি নিভে গিয়েছিল। প্রায় ৬,০০০ বছর আগে এদোন উদ্যানে, যখন আমাদের প্রথম মানব পিতামাতা, ঈশ্বরের প্রকাশিত ইচ্ছার প্রতি সম্মান না দেখিয়ে নিজেরা সিদ্ধান্ত করা বেছে নিয়েছিল, তখন তা ঘটে। সেই সময় থেকে মানবজাতির দুঃখজনক অভিজ্ঞতাগুলি, বাইবেল যাকে “অন্ধকারের কর্ত্তৃত্ব” বলে চিহ্নিত করে তার অধীনস্থ পর্বমাত্র। (কলসীয় ১:১৩) শয়তান দিয়াবলের প্রভাবে প্রথম মানব, আদম জগতকে পাপের পথে নিয়ে গিয়েছিল; আর আদম থেকে পাপ এবং মৃত্যু সমস্ত মানবজাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। (আদিপুস্তক ৩:১-৬; রোমীয় ৫:১২) এইভাবে মানবজাতি, জ্যোতি এবং জীবনের উৎস, যিহোবার অনুমোদন হারিয়ে ফেলে।—গীতসংহিতা ৩৬:৯.
৫ যে কোন লোকের জন্য জ্যোতি আবার উজ্জ্বল করার একমাত্র উপায় হল যদি তারা মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা, যিহোবা ঈশ্বরের অনুমোদন ফিরে পায়। তাহলে, “সর্ব্বদেশীয় লোকেরা যে ঘোমটায় আচ্ছাদিত আছে,” পাপের জন্য যে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পাবে। তা কিভাবে সম্ভব হবে?—যিশাইয় ২৫:৭.
যাঁকে “পরজাতিগণের জ্যোতি” হিসাবে দেওয়া হয়েছে
৬. যীশু খ্রীষ্টের মাধ্যমে যিহোবা কোন্ অপূর্ব প্রত্যাশা আমাদের জন্য সম্ভব করেছেন?
৬ আদম এবং হবাকে পরমদেশ থেকে নির্বাসিত করার আগেই, যিহোবা এক “বীজ” সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যিনি ধার্মিকতার প্রেমিকদের পরিত্রাতা হবেন। (আদিপুস্তক ৩:১৫) সেই প্রতিজ্ঞাত বীজের মানবজন্মের পর, যিহোবা যিরূশালেমের মন্দিরে বয়োবৃদ্ধ শিমিয়োনের দ্বারা তাঁকে “পরজাতিগণের প্রতি প্রকাশিত হইবার জ্যোতি” হিসাবে শনাক্ত করান। (লূক ২:২৯-৩২) যীশুর সিদ্ধ মানবজীবনের উৎসর্গের প্রতি বিশ্বাসের মাধ্যমে, মানবজাতি জন্মগত পাপজাত দন্ডাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেতে পারে। (যোহন ৩:৩৬) যিহোবার ইচ্ছানুযায়ী, এখন তারা স্বর্গীয় রাজ্যের অংশ অথবা তার প্রজা হিসাবে অনন্তকাল সিদ্ধ জীবনের আশা রাখতে পারে। কী অপূর্ব ব্যবস্থা!
৭. কেন যিশাইয় ৪২:১-৪ পদের প্রতিজ্ঞা এবং প্রথম শতাব্দীতে তার পরিপূর্ণতা আমাদের আশায় ভরিয়ে দেয়?
৭ যীশু খ্রীষ্ট নিজে এই সব অপূর্ব প্রত্যাশার পূর্ণতার নিশ্চয়তাস্বরূপ। যীশুর অসুস্থ লোকেদের সুস্থ করা সম্বন্ধে, প্রেরিত মথি যিশাইয় ৪২:১-৪ পদে যা লেখা আছে তা তাঁর প্রতি প্রয়োগ করেছেন। সেই শাস্ত্রপদে, আংশিকভাবে বলা হয়েছে: “ঐ দেখ, আমার দাস, আমি তাঁহাকে ধারণ করি; তিনি আমার মনোনীত, আমার প্রাণ তাঁহাতে প্রীত; আমি তাঁহার উপরে আপন আত্মাকে স্থাপন করিলাম; তিনি জাতিগণের কাছে ন্যায়বিচার উপস্থিত করিবেন।” আর সমস্ত জাতির লোকেদের কি এই রকমই কিছুর প্রয়োজন নেই? সেই ভবিষ্যদ্বাণী আরও বলে: “তিনি চীৎকার করিবেন না, উচ্চশব্দ করিবেন না, পথে আপন রব শুনাইবেন না। তিনি থেৎলা নল ভাঙ্গিবেন না; সধূম শলিতা নির্ব্বাণ করিবেন না।” এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, যে লোকেরা ইতিমধ্যেই পীড়িত ছিল যীশু তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেননি। তিনি তাদের প্রতি করুণা দেখিয়েছিলেন, যিহোবার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাদের শিখিয়েছিলেন, এবং তাদের সুস্থ করেছিলেন।—মথি ১২:১৫-২১.
৮. কোন্ অর্থে যিহোবা যীশুকে “প্রজাগণের নিয়মস্বরূপ ও জাতিগণের জ্যোতিস্বরূপ” দিয়েছিলেন?
৮ এই ভবিষ্যদ্বাণীদাতা তাঁর সেবক, যীশুকে উদ্দেশ্য করে বলেন: “আমি যিহোবা ধর্ম্মশীলতায় তোমাকে আহ্বান করিয়াছি, আর আমি তোমার হস্ত ধরিব, তোমাকে রক্ষা করিব; এবং তোমাকে প্রজাগণের নিয়মস্বরূপ ও জাতিগণের জ্যোতিস্বরূপ করিয়া নিযুক্ত করিব; তুমি অন্ধদিগকে চক্ষু দিবে, তুমি কারাকূপ হইতে অন্ধকারবাসিগণকে বাহির করিয়া আনিবে।” (যিশাইয় ৪২:৬, ৭, NW.) হ্যাঁ, যিহোবা এক চুক্তি হিসাবে, এক পবিত্র অঙ্গীকারপূর্ণ নিশ্চয়তা হিসাবে যীশু খ্রীষ্টকে দিয়েছেন। এই নিশ্চয়তা কত উৎসাহজনক! পৃথিবীতে থাকাকালীন যীশু মানবজাতির জন্য প্রকৃত উদ্বেগ দেখিয়েছিলেন; তিনি এমনকি মানবজাতির জন্য তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর হাতেই যিহোবা সমস্ত জাতিগণের শাসনভার অর্পণ করেছেন। কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় যে যিহোবা তাঁকে জাতিগণের জ্যোতি হিসাবে সম্বোধন করেছেন। যীশু নিজে বলেছিলেন: “আমি জগতের জ্যোতি।”—যোহন ৮:১২.
৯. তখনকার শাসনব্যবস্থা সংশোধন করতে কেন যীশু তাঁর জীবন উৎসর্গ করেননি?
৯ কী উদ্দেশ্যে যীশু জগতের জ্যোতি হিসাবে কাজ করেছিলেন? অবশ্যই কোন জাগতিক অথবা বস্তুবাদিতা-সংক্রান্ত উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। তখনকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা সংশোধন করতে তিনি অস্বীকার করেছিলেন এবং জগতের অধিপতি, শয়তান অথবা মানুষের কাছ থেকে তিনি রাজপদ গ্রহণ করেননি। (লূক ৪:৫-৮; যোহন ৬:১৫; ১৪:৩০) যারা পীড়িত ছিল যীশু তাদের প্রতি প্রচুর সমবেদনা দেখিয়েছিলেন এবং এমনভাবে তাদের কষ্ট উপশম করেছিলেন যেভাবে অন্য কেউ পারে না। কিন্তু তিনি জানতেন যে যতক্ষণ মানবসমাজের কাঠামো জন্মগত পাপের জন্য এবং অদৃশ্য মন্দ আত্মাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার জন্য ঐশ্বরিক দন্ডাজ্ঞার অধীনে রয়েছে, ততক্ষণ স্থায়ী উপশম পাওয়া সবে নয়। ঈশ্বরতুল্য অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে, যীশু তাঁর সমস্ত জীবন, ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন করাকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছিলেন।—ইব্রীয় ১০:৭.
১০. কিভাবে এবং কোন্ উদ্দেশ্যে যীশু জগতের জ্যোতি হিসাবে কাজ করেছিলেন?
১০ সুতরাং, কিভাবে এবং কী উদ্দেশ্য নিয়ে যীশু জগতের জ্যোতি হিসাবে কাজ করেছিলেন? তিনি ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করার প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। (লূক ৪:৪৩; যোহন ১৮:৩৭) যিহোবার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সত্যের প্রতি সাক্ষ্য দিয়ে, যীশু তাঁর স্বর্গীয় পিতার নামও গৌরবান্বিত করেছিলেন। (যোহন ১৭:৪, ৬) উপরন্তু, জগতের জ্যোতি হিসাবে, যীশু ধর্মীয় মিথ্যা শিক্ষাগুলির উন্মোচন করেছিলেন এবং সেইভাবে যারা ধর্মের বন্ধনে ছিল তাদের মুক্তি দিয়েছিলেন। শয়তানকে তিনি তাদের অদৃশ্য পরিচালক হিসাবে প্রকাশ করেছিলেন যারা তাকে নিজেদের ব্যবহার করতে দেয়। আরও যীশু স্পষ্টরূপে অন্ধকারের ক্রিয়া সকল শনাক্ত করেছিলেন। (মথি ১৫:৩-৯; যোহন ৩:১৯-২১; ৮:৪৪) লক্ষণীয়ভাবে, তাঁর সিদ্ধ জীবন মুক্তির মূল্য হিসাবে দান করে তিনি নিজেকে জগতের জ্যোতি হিসাবে প্রমাণ করেছিলেন, যার দ্বারা তিনি যারা এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে তাদের পাপের ক্ষমা, ঈশ্বরের সঙ্গে প্রীতিজনক সম্পর্ক, এবং যিহোবার আন্তর্জাতিক পরিবারের সদস্য হিসাবে অনন্ত জীবনের প্রত্যাশা লাভ করার পথ খুলে দিয়েছিলেন। (মথি ২০:২৮; যোহন ৩:১৬) আর সবশেষে, সারা জীবন নিখুঁত ঐশিক ভক্তি বজায় রেখে, যীশু যিহোবার সার্বভৌমত্বকে তুলে ধরেছিলেন এবং শয়তানকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করেছিলেন, আর এইভাবে ধার্মিকতার প্রেমিকদের অনন্ত উপকার পাওয়া সবে করেছিলেন। কিন্তু যীশুই কি একমাত্র জ্যোতি বাহক হওয়ার ছিলেন?
“তোমরা জগতের জ্যোতি”
১১. জ্যোতি বাহক হওয়ার জন্য, যীশুর শিষ্যদের কী করতে হত?
১১ মথি ৫:১৪ পদে যীশু তাঁর শিষ্যদের বলেছিলেন: “তোমরা জগতের জ্যোতি।” তাদের তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করতে হত। তাদের জীবনধারা এবং প্রচার, উভয়ের দ্বারাই, যিহোবা যে প্রকৃত জ্ঞানার্জনের উৎস সেই বিষয়ে অন্যদের জানাতে হত। যীশুকে অনুকরণ করে, তাদের যিহোবার নাম অন্যদের জানাতে হত এবং তাঁর সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করতে হত। যীশু যেমন করেছিলেন, তেমনই তাদেরও মানবজাতির একমাত্র আশা হিসাবে ঈশ্বরের রাজ্যের প্রচার করতে হত। আরও, ধর্মীয় মিথ্যা শিক্ষা, অন্ধকারের ক্রিয়া সকল এবং এই সমস্ত কাজের পিছনে যে পাপাত্মা আছে, তাদেরও প্রকাশ করতে হত। খ্রীষ্টের অনুগামীদের যীশু খ্রীষ্টের মাধ্যমে যিহোবার প্রেমময় পরিত্রাণের ব্যবস্থা সর্বত্র লোকেদের জানাতে হত। প্রথমে যিরূশালেম ও যিহূদিয়ায় শুরু করে তারপর শমরিয়ায়, ঠিক যেমন যীশু আদেশ দিয়েছিলেন, কী উদ্যোগের সাথেই প্রারম্ভিক খ্রীষ্টানরা এই কার্যভার পালন করেছিলেন!—প্রেরিত ১:৮.
১২. (ক) আত্মিক জ্যোতি কতদূর ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল? (খ) যিশাইয় ৪২:৬ পদ সম্বন্ধে যিহোবার আত্মা পৌলকে কী বুঝতে সাহায্য করেছিল, এবং এই ভবিষ্যদ্বাণী দ্বারা আমাদের জীবন কিভাবে প্রভাবিত হওয়া উচিৎ?
১২ কিন্তু, সুসমাচার প্রচার এই ক্ষেত্রটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যীশু তাঁর অনুগামীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন “সমুদয় জাতিকে শিষ্য” করতে। (মথি ২৮:১৯) তার্ষের শৌলের পরিবর্তনের সময়ে, প্রভু নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে দিয়েছিলেন যে শৌল (যিনি প্রেরিত পৌল হয়েছিলেন) শুধুমাত্র যিহূদীদের কাছে নয় কিন্তু পরজাতীয়দের কাছেও প্রচার করবেন। (প্রেরিত ৯:১৫) পবিত্র আত্মার সাহায্যে, কী করতে হবে তা পৌল উপলব্ধি করেছিলেন। সুতরাং, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে যিশাইয় ৪২:৬ পদের ভবিষ্যদ্বাণী, যা প্রত্যক্ষভাবে যীশু খ্রীষ্টের মাধ্যমে পূর্ণ হয়েছে, তা যারা খ্রীষ্টে বিশ্বাস করেন তাদের সকলের প্রতিও প্রযোজ্য একটি আদেশ। সেই জন্য, প্রেরিত ১৩:৪৭ (NW) পদে, যিশাইয় থেকে উদ্ধৃতি করার সময়ে, পৌল বলেছিলেন: ‘কেননা যিহোবা আমাদিগকে এইরূপ আজ্ঞা দিয়াছেন, “আমি তোমাদিগকে জাতিগণের জ্যোতিস্বরূপ করিয়াছি, যেন তোমরা পৃথিবীর সীমা পর্য্যন্ত পরিত্রাণস্বরূপ হও”’ আপনার সম্বন্ধে কী? একজন জ্যোতিবাহক হওয়ার দায়িত্ব কি আপনি গুরুত্বপূর্ণরূপে নিয়েছেন? যীশু এবং পৌলের মত, আপনি কি আপনার জীবন, ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন করাকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলছেন?
আমাদের পরিচালনা করতে ঈশ্বর থেকে জ্যোতি এবং সত্য
১৩. গীতসংহিতা ৪৩:৩ পদের সঙ্গে সমতা রেখে, আমাদের একান্ত প্রার্থনা কী, এবং কিসের বিরুদ্ধে তা আমাদের রক্ষা করে?
১৩ যদি আমাদের নিজেদের বুদ্ধিতে মানুষের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে সেই ‘জ্যোতিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার’ প্রচেষ্টা করি, তাহলে ঈশ্বরের অনুপ্রাণীত বাক্যের উদ্দেশ্য আমরা গুরুতররূপে উপেক্ষা করব। জগৎ সাধারণত যা করছে, তা সত্ত্বেও, সত্য খ্রীষ্টানরা জ্যোতির প্রকৃত উৎস হিসাবে যিহোবার প্রতি আশা রাখেন। তাদের প্রার্থনা গীতসংহিতা ৪৩:৩ (NW) পদের প্রার্থনার মত, যেখানে বলা হয়েছে: “তোমার জ্যোতি ও তোমার সত্য প্রেরণ কর; তাহারাই আমার পথপ্রদর্শক হউক, তোমার পবিত্র গিরিতে ও তোমার আবাসে আমাকে উপস্থিত করুক।”
১৪, ১৫. (ক) কিভাবে এখন যিহোবা তাঁর জ্যোতি এবং সত্য প্রেরণ করছেন? (খ) কিভাবে আমরা দেখাতে পারি যে ঈশ্বরের জ্যোতি এবং সত্য প্রকৃতই আমাদের পথপ্রদর্শক?
১৪ যিহোবা এখনও তাঁর বিশ্বস্ত সেবকদের এই প্রার্থনার উত্তর দেন। তিনি জ্যোতি প্রেরণ করেন তাঁর উদ্দেশ্য ঘোষণা করে, তাঁর সেবকদের তা বুঝিয়ে দিয়ে, আর তারপর তিনি যা ঘোষণা করেছেন তা পূর্ণ করে। আমরা যখন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তা শুধুমাত্র পবিত্রতার ভান করার জন্য লোক-দেখানো নয়। আমাদের একান্ত ইচ্ছা যে যিহোবার প্রেরিত জ্যোতি আমাদের পথ দেখাবে, যেমন সেই গীতে বলা হয়েছে। ঈশ্বরের প্রেরিত জ্যোতির সঙ্গে যে দায়িত্বভার আসে আমরা তা গ্রহণ করি। প্রেরিত পৌলের মত, আমরা বুঝতে পারি যে যিহোবার বাক্যের পূর্ণতার সঙ্গে, যারা তাতে বিশ্বাস করে, তাদের প্রতি একটি আদেশের ইঙ্গিত রয়েছে। ঈশ্বর আমাদের যে সুসমাচার দিয়েছেন প্রচার করার জন্য, তা যতক্ষণ অন্যদের না জানানো হচ্ছে ততক্ষণ আমরা তাদের কাছে নিজেদের ঋণী মনে করি।—রোমীয় ১:১৪, ১৫.
১৫ আমাদের দিনে যিহোবা যে জ্যোতি এবং সত্য প্রেরণ করেছেন তা নিশ্চিৎ করে যে যীশু খ্রীষ্ট সক্রিয়ভাবে তাঁর স্বর্গীয় সিংহাসন থেকে শাসন করছেন। (গীতসংহিতা ২:৬-৮; প্রকাশিত বাক্য ১১:১৫) যীশু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে তাঁর রাজকীয় উপস্থিতির সময়ে, সর্ব জাতির কাছে সাক্ষ্য দেবার জন্য রাজ্যের এই সুসমাচার সারা জগতে প্রচার করা হবে। (মথি ২৪:৩, ১৪) এই কাজ এখন সারা বিশ্বে তীব্রভাবে করা হচ্ছে। যদি এই কাজকে আমরা আমাদের জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করে নিই, তাহলে যেমন গীতরচক বলেছিলেন, ঈশ্বরের জ্যোতি এবং সত্য আমাদের পথপ্রদর্শক হয়েছে।
যিহোবার সেই প্রতাপ উদিত হয়েছে
১৬, ১৭. কিভাবে যিহোবা তাঁর নারীতুল্য সংগঠনের প্রতি ১৯১৪ সালে তাঁর প্রতাপ উদিত করেছিলেন, এবং তিনি তাকে কী আদেশ দিয়েছিলেন?
১৬ সর্বত্র লোকেদের কাছে ঐশ্বরিক জ্যোতি কিভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তা শাস্ত্রে সাড়া-জাগানো ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। যিশাইয় ৬০:১-৩ (NW) পদে, যেখানে যিহোবার “নারী,” অথবা তাঁর বিশ্বস্ত দাসেদের স্বর্গীয় সংগঠনকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে: “উঠ, হে নারী, জ্যোতির্ময়ী হও, কেননা তোমার জ্যোতি উপস্থিত, যিহোবার প্রতাপ তোমার উপরে উদিত হইল। কেননা, দেখ, অন্ধকার পৃথিবীকে, ঘোর তিমির জাতিগণকে, আচ্ছন্ন করিতেছে, কিন্তু তোমার উপরে যিহোবা উদিত হইবেন, এবং তাঁহার প্রতাপ তোমার উপরে দৃষ্ট হইবে। আর জাতিগণ তোমার জ্যোতির কাছে আগমন করিবে, রাজগণ তোমার অরুণোদয়ের আলোর কাছে আসিবে।”
১৭ যিহোবার প্রতাপ তাঁর নারীস্বরূপ স্বর্গীয় সংগঠনের উপরে উদিত হয়েছিল ১৯১৪ সালে, যখন বহুকাল অপেক্ষা করার পর, সেই সংগঠন মশীহ রাজ্যের জন্ম দেয়, যার রাজা যীশু খ্রীষ্ট। (প্রকাশিত বাক্য ১২:১-৫) যিহোবার গৌরবময় জ্যোতি সমস্ত পৃথিবীর জন্য ন্যায্য সরকার হিসাবে সেই রাজ্যের উপরে সমর্থনসহ উদিত হয়েছে।
১৮. (ক) কেন অন্ধকার পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করেছে, যেমন যিশাইয় ৬০:২ পদে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে? (খ) কিভাবে ব্যক্তিগতভাবে লোকেরা পৃথিবীর অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে পারে?
১৮ অপরপক্ষে, অন্ধকার পৃথিবীকে, ঘোর তিমির জাতিগণকে, আচ্ছন্ন করেছে। কেন? কারণ জাতিগণ মানব শাসনের পক্ষ নিয়ে ঈশ্বরের প্রিয় পুত্রের সরকারকে অগ্রাহ্য করেছে। তারা মনে করে যে এক ধরনের সরকারকে পরিত্যাগ করে আরেক ধরনের শাসন প্রয়োগ করে, তারা তাদের সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু যে সমাধানের অপেক্ষা তারা করছে, এই পদ্ধতি তা আনবে না। আত্মিক জগৎ থেকে, তাদের অজান্তে, কে সমস্ত জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে তা বুঝতে তারা অক্ষম হয়েছে। (২ করিন্থীয় ৪:৪) তারা প্রকৃত জ্যোতির উৎসকে প্রত্যাখ্যান করেছে আর সেই জন্য অন্ধকারে রয়েছে। (ইফিষীয় ৬:১২) জাতিগণ যাই করুক না কেন, ব্যক্তিগতভাবে লোকেরা অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে পারে। কিভাবে? ঈশ্বরের রাজ্যের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তার বশীভূত হয়ে।
১৯, ২০. (ক) কেন এবং কিভাবে যীশুর অভিষিক্ত অনুগামীদের উপরে যিহোবার প্রতাপ উদিত হয়েছে? (খ) কোন্ কারণে যিহোবা তাঁর অভিষিক্ত ব্যক্তিদের জ্যোতি বাহক করেছেন? (গ) যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, কিভাবে “রাজগণ” এবং “জাতিগণ” ঈশ্বর-দত্ত জ্যোতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে?
১৯ খ্রীষ্টজগৎ ঈশ্বরের রাজ্যে বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তার বশীভূত হয়নি। কিন্তু যীশু খ্রীষ্টের আত্মাভিষিক্ত অনুগামীরা হয়েছেন। ফলস্বরূপ, ঐশ্বরিক অনুমোদনতুল্য যিহোবার জ্যোতি তাঁর স্বর্গীয় নারীর দৃশ্যত প্রতিনিধিদের উপরে উদিত হয়েছে, এবং তাঁর প্রতাপ তাদের উপরে প্রকট হয়েছে। (যিশাইয় ৬০:১৯-২১) তারা যে আত্মিক জ্যোতি উপভোগ করে, তা জগতের রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে কোন পরিবর্তনই সরিয়ে নিতে পারবে না। তারা মহতী বাবিলের হাত থেকে যিহোবার পরিত্রাণ উপলব্ধি করেছেন। (প্রকাশিত বাক্য ১৮:৪) তাঁর অনুশাসন গ্রহণ করার জন্য এবং বিশ্বস্তভাবে তাঁর সার্বভৌমত্বকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার জন্য তারা তাঁর অনুমোদন লাভ করেছেন। ভবিষ্যতের জন্য তাদের আশা উজ্জ্বল, এবং যে প্রত্যাশা তাদের সামনে রাখা হয়েছে সেই জন্য তারা আনন্দিত।
২০ কিন্তু কী উদ্দেশ্য নিয়ে যিহোবা তাদের সঙ্গে এইরূপ ব্যবহার করেছেন? যেমন তিনি নিজেই যিশাইয় ৬০:২১ পদে বলেছেন, যাতে তিনি “বিভূষিত” হন, যাতে অন্যেরা তাদের নিজেদের স্থায়ী উপকারার্থে—একমাত্র সত্য ঈশ্বর হিসাবে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়। এর সাথে সমতা রেখে, ১৯৩১ সালে সত্য ঈশ্বরের এই উপাসকেরা যিহোবার সাক্ষীবৃন্দ নাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের প্রচারের ফলস্বরূপ, যিশাইয় যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন “রাজগণ” কি তাদের জ্যোতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন? হ্যাঁ! পৃথিবীর রাজনৈতিক নেতারা নয়, কিন্তু স্বর্গীয় রাজ্যে খ্রীষ্টের সাথে রাজা হিসাবে যাদের শাসন করার কথা, তাদের অবশিষ্ট সংখ্যা আকৃষ্ট হয়েছিল। (প্রকাশিত বাক্য ১:৫, ৬; ২১:২৪) আর “জাতিগণ” সম্বন্ধে কী? তারা কি এই জ্যোতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে? অবশ্যই হয়েছে! পৃথকভাবে কোন রাজনৈতিক জাতি হয়নি, কিন্তু প্রত্যেক জাতির মধ্যে থেকে বিস্তর লোক ঈশ্বরের রাজ্যের পক্ষে স্থান নিয়েছে, আর তারা আগ্রহসহকারে ঈশ্বরের নতুন জগতে পরিত্রাণ পাওয়ার অপেক্ষা করছে। যে নতুন জগতে প্রকৃতই ধার্মিকতা বসতি করবে।—২ পিতর ৩:১৩; প্রকাশিত বাক্য ৭:৯, ১০.
২১. কিভাবে আমরা দেখাতে পারি যে যিহোবার ইচ্ছাসকল জানতে দিয়ে তিনি আমাদের প্রতি যে অযাচিত করুণা দেখিয়েছেন, তার উদ্দেশ্য আমরা উপেক্ষা করছি না?
২১ বৃদ্ধিরত জ্যোতি বাহকগণের সংখ্যার মধ্যে আপনি কি একজন? যিহোবা তাঁর ইচ্ছা বোঝবার শক্তি আমাদের দিয়েছেন যাতে, যীশুর মত, আমরাও জ্যোতি বাহক হতে পারি। বর্তমানে যিহোবা তাঁর সেবকদের যে কার্যভার দিয়েছেন তার প্রতি উদ্যোগ প্রদর্শন করে, আমরা সকলে যেন দেখাই যে আমাদের প্রতি ঈশ্বরের অযাচিত করুণার উদ্দেশ্য আমরা উপেক্ষা করছি না। (২ করিন্থীয় ৬:১, ২) আমাদের দিনে আর কোন কাজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। আর যিহোবার কাছ থেকে যে গৌরবময় জ্যোতি আমরা পেয়েছি তা অন্যদের প্রতিও প্রতিফলিত করে তাঁকে গৌরবান্বিত করার চাইতে বড় সুযোগ আর আমরা পেতে পারি না। (w93 1/15)
আপনি কিভাবে উত্তর দেবেন?
▫ মানবজাতির দুঃখজনক সমস্যাগুলির মূল কারণ কী কী?
▫ কিভাবে যীশু এবং তাঁর শিষ্যরা, উভয়েই “জগতের জ্যোতি”?
▫ যিহোবার জ্যোতি এবং সত্য কিভাবে আমাদের পরিচালনা করছে?
▫ কিভাবে তাঁর সংগঠনের উপর, যিহোবা তাঁর জ্যোতি প্রকাশ হতে দিয়েছেন?
▫ কী উদ্দেশ্যে যিহোবা তাঁর লোকেদের জ্যোতি বাহক করেছেন?
[Pictures on page 15] This pecture is not printed but caption is there in the text
এদোনে একটি ঘটনা বর্তমানে মানবজাতির দুঃখজনক সমস্যাগুলির কারণ সম্বন্ধে জানতে আমাদের সাহায্য করে
[Credit Lines]
Tom Haley/Sipa
Paringaux/Sipa