যুবক-যুবতীদের জিজ্ঞাস্য. . . .
কেন আমি মনোযোগ দিতে পারি না?
“মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে এটি ঘটে। আমি মণ্ডলীর সভাতে বক্তৃতা শুনছি আর তখন হঠাৎই আমার মন অন্য কোথাও চলে যায়। আর দশ মিনিট পরে আমি আবার ফিরে আসি।”—জেসি।
“মনোযোগী হও!” তুমি কি প্রায়ই তোমার শিক্ষক বা বাবামার কাছ থেকে এই শব্দগুলি শুনে থাক? যদি তাই হয়, তাহলে তোমার হয়ত কোন বিষয়ের উপর মনোযোগ বজায় রাখার ব্যাপারে সমস্যা আছে। ফলস্বরূপ, ক্লাশে তুমি হয়ত কম নম্বর পাচ্ছ। আর তুমি হয়ত দেখতে পাও যে অন্যেরা তোমাকে নিচু দৃষ্টিতে দেখে, নেশাগ্রস্ত, আচ্ছন্ন কিংবা রুক্ষ হিসাবে অগ্রাহ্য করে থাকে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে, মনোযোগ দেওয়ার অক্ষমতা তোমার আধ্যাত্মিকতায় এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, বাইবেল স্বয়ং আজ্ঞা দেয়: “তোমরা কিভাবে শোন সে বিষয়ে মনোযোগী হও।” (লূক ৮:১৮, NW) বাস্তবিকপক্ষে, খ্রীষ্টানদের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলির প্রতি “অধিক আগ্রহের সহিত মনোযোগ” করতে আজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। (ইব্রীয় ২:১) আর মনোযোগ দেওয়া যদি তোমার কাছে কঠিন মনে হয়, তাহলে তোমার হয়ত এই পরামর্শের প্রতি মনোযোগ দেওয়াও কঠিন মনে হতে পারে।
সমস্যাটি কী হতে পারে? কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়ত শারীরিক সমস্যার কারণে মনোযোগ দেওয়া যায় না। উদাহরণস্বরূপ, কিছু গবেষকেরা মনে করেন যে মনোযোগের অভাবজনিত ব্যাধি মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার তন্ত্রের কাজ করার অক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।a কিছু অল্পবয়স্কদের নির্ণয় করা যায় না এমন সমস্যাগুলি থাকে, যেমন দেখতে বা শুনতে অসুবিধা। এগুলিও একজনের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাকে বাধা দিতে পারে। গবেষকেরা দেখেছেন যে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় সাধারণত অল্পবয়স্কদের মনোযোগ দেওয়ায় সমস্যা বেশি রয়েছে। অতএব, অমনোযোগী হওয়া অল্পবয়স্কদের মধ্যে সাধারণ, যদিও এটি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার কারণে খুব কমই হয়ে থাকে।
তোমার পরিবর্তনশীল চিন্তাধারা
মনোযোগ দেওয়া যদি তোমার জন্য সমস্যা হয়, তাহলে খুব সম্ভবত তুমি কেবল বয়স বাড়ার যন্ত্রণা ভোগ করছ। প্রেরিত পৌল লিখেছিলেন: “আমি যখন শিশু ছিলাম, তখন শিশুর ন্যায় কথা কহিতাম, শিশুর ন্যায় চিন্তা করিতাম, শিশুর ন্যায় বিচার করিতাম; এখন মানুষ হইয়াছি বলিয়া শিশুভাবগুলি ত্যাগ করিয়াছি।” (১ করিন্থীয় ১৩:১১) হ্যাঁ, যতই তুমি প্রাপ্তবয়স্ক হতে থাক, তোমার চিন্তাধারাও ততই পরিবর্তিত হতে থাকে। কিশোরকিশোরীদের বৃদ্ধি (ইংরাজি) বইটি অনুসারে “নতুন কল্পনাসংক্রান্ত ক্ষমতা . . . বয়ঃসন্ধিকালের প্রথম দিকে প্রকাশ পায়।” তুমি দুর্বোধ্য চিন্তা এবং ধারণাগুলি বোঝা ও বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে থাক। নৈতিকতা, নীতিবোধ, এবং অন্যান্য সাধারণ বিষয়গুলি সম্বন্ধে তোমার গভীর উপলব্ধিবোধ আসতে শুরু করে। তোমার প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থা কেমন হবে সেই ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তুমি চিন্তা করতে শুরু কর।
সমস্যাটি কী? এই সমস্ত নতুন চিন্তা, ধারণা ও কল্পনা তোমার মস্তিষ্কে ঘুরতে থাকে যেটি তোমাকে বিক্ষিপ্ত করতে পারে। তুমি আর সহজ, সরল, শিশুসুলভ চিন্তা কর না। এখন তোমার মস্তিষ্ক তুমি যা দেখ ও শুনে থাক তা বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান করতে তোমাকে বাধ্য করে। শিক্ষকের একটি মন্তব্য অথবা বক্তৃতা রোমাঞ্চকর মানসিক বিচরণ ঘটাতে পারে। কিন্তু তুমি যদি তোমার ইতস্তত চিন্তাগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে না শেখ, তাহলে তুমি মূল্যবান তথ্যগুলি হারাতে পার। আগ্রহজনকভাবে, বাইবেল বলে যে ধার্মিক ব্যক্তি ইস্হাক নীরবে ধ্যান করার জন্য সময় ব্যয় করতেন। (আদিপুস্তক ২৪:৬৩) সম্ভবত আরাম, ধ্যান এবং বিভিন্ন বিষয় সমাধান করার জন্য প্রতিদিন কিছু সময় পৃথক রাখা তোমাকে অন্য সময়ে আরও বেশি নিবিষ্ট হতে সাহায্য করতে পারে।
আবেগ এবং হরমোন
তোমার আবেগও হয়ত তোমাকে বিক্ষিপ্ত করার কারণ হতে পারে। তুমি যা পড়ছ কিংবা শুনছ তার প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে চেষ্টা করলেও, তুমি দেখ যে তুমি অন্য বিষয়গুলি সম্বন্ধেও চিন্তা করছ। তুমি কখনও একঘেয়েমিজনিত বিরক্তি কখনও উত্তেজনা, কখনও হতাশা আবার কখনও উল্লাস বোধ করে থাক। চিন্তা করো না! তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ না। খুব সম্ভবত, এটি কেবল তোমার হরমোনের একটি ব্যাপার যা তোমার মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। তুমি বয়ঃসন্ধির পরিবর্তনগুলি অভিজ্ঞতা করছ।
ক্যাথি ম্যাকয় এবং চার্লস উইবেলস্ম্যান লেখেন: “বয়ঃসন্ধির বছরগুলিতে অনুভূতি প্রবল হয় . . .। এই মানসিক অবস্থা কিছুটা কিশোরকিশোরীতে পরিণত হওয়ার অংশ। ঠিক এখন তুমি যে সমস্ত পরিবর্তনগুলি অভিজ্ঞতা করছ তার চাপের সঙ্গে এই অংশটি সম্পর্কযুক্ত।” এছাড়াও, তুমি ‘সৌকুমার্য্যের’ নিকটবর্তী হচ্ছো—যে সময় যৌন আকাঙ্ক্ষাগুলি সর্বাধিক থাকে। (১ করিন্থীয় ৭:৩৬) লেখিকা রূথ বেল বলেন: “বয়ঃসন্ধিকালে দেহের পরিবর্তনগুলি প্রায়ই প্রবল যৌন অনুভূতিগুলি নিয়ে আসে। তুমি হয়ত নিজেকে যৌনতা সম্বন্ধে অধিক চিন্তা করতে, অতি সহজেই যৌন আকাঙ্ক্ষার দ্বারা উত্তেজিত হতে, এমনকি সময়ে সময়ে যৌনতার দ্বারা অনুভূতিগুলিকে আচ্ছন্ন হতে দেখতে পাও।”b
শুরুতে উল্লেখিত জেসির মন অন্য কোথাও চলে যায় যা কিশোরকিশোরীদের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ: “মাঝে মাঝে আমি মেয়েদের বিষয়ে ভাবি বা আমার কিছু উদ্বিগ্নতা কিংবা পরবর্তী সময়ে আমি কী করতে যাচ্ছি সেই সম্বন্ধে চিন্তা করি।” পরে কোন এক সময়, আবেগপ্রবণতার ঝড় শান্ত হয়ে যাবে। ইত্যবসরে, আত্মশাসন কর। প্রেরিত পৌল লিখেছিলেন: “আমার নিজ দেহকে প্রহার করিয়া দাসত্বে রাখিতেছি।” (১ করিন্থীয় ৯:২৭) যতই তুমি তোমার আবেগগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে, ততই তুমি মনোযোগ দিতে সমর্থ হবে।
তোমার ঘুমানোর অভ্যাস
তোমাকে শারীরিকভাবে বিকাশলাভ করতে সাহায্য করার এবং প্রতিদিন তোমার মধ্যে যে সব নতুন ধারণা ও অনুভূতিগুলি আসছে সেগুলির সমাধান করার জন্য তোমার বাড়ন্ত শরীরের পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। কিন্তু অনেক কিশোরকিশোরী এমন একটি তালিকা অনুসরণ করে যাতে ঘুমের জন্য তাদের খুব অল্পই সময় থাকে। একজন স্নায়ুবিশেষজ্ঞ বলেন: “দেহ ভুলে যাবে না যে কত ঘন্টা ঘুম তার পাওনা ছিল। বিপরীতে, এটি সর্বদাই মনে রাখবে আর হঠাৎ ব্যক্তির কাছ থেকে মূল্য দাবি করবে যা স্মৃতি বিভ্রম, মনোযোগজনিত সমস্যা এবং মন্থর চিন্তা শক্তি হিসাবে প্রকাশ পেতে পারে।”
কিছু গবেষকেরা মনে করেন যে প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় কেবল এক ঘন্টা কিংবা আরও কিছুটা বাড়ালে তা একজন ব্যক্তির মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে বাড়াতে পারে। এটি সত্য যে, বাইবেল অলসতা এবং ঘুমের প্রতি আসক্তিকে নিন্দা করে। (হিতোপদেশ ২০:১৩) কিন্তু, এটি ফলপ্রসূভাবে কাজ করার জন্য যথেষ্ট বিশ্রাম নেওয়ার মূল্য সম্বন্ধে বলে।—উপদেশক ৪:৬.
খাদ্য এবং মনোযোগ
খাদ্য হয়ত অপর একটি সমস্যা। কিশোরকিশোরীরা চর্বিযুক্ত এবং মিষ্টি খাবার ভালবাসে। গবেষকেরা বলেন যে অধিক ক্যালরিযুক্ত কিন্তু কম পুত্ত্রষ্টগুণসম্পন্ন খাদ্য অত্যন্ত সুস্বাদু হলেও, সেগুলি বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা হ্রাস করে বলে মনে হয়। গবেষণাগুলি অনুরূপভাবে ইঙ্গিত করে যে শর্করাযুক্ত খাদ্য যেমন রুটি, দানাশস্য দ্বারা প্রস্তুতকৃত খাবার, ভাত অথবা ময়দার তৈরি খাবার খাওয়ার পর বুদ্ধির নৈপূণ্য হ্রাস পেতে থাকে। এটি হয়ত হতে পারে কারণ শর্করা মস্তিষ্কে সিরোটনিন নামক রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং একজন ব্যক্তিকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে তোলে। তাই কিছু পুত্ত্রষ্টবিশেষজ্ঞ কোন কাজ যার জন্য মানসিক সচেতনতার প্রয়োজন তা করার পূর্বে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য খাওয়ার পরামর্শ দেন।
টিভি এবং কম্পিউটার প্রজন্ম
বছরের পর বছর ধরে শিক্ষকগণ মনে করে আসছেন যে টিভি এবং এর দ্রুতগতিসম্পন্ন চিত্রগুলি অল্পবয়স্কদের মনোযোগের পরিধিকে ছোট করে দেয় এবং এখন কিছুজন একইভাবে কম্পিউটার কৌশলের প্রতি দোষারোপ করছেন। যদিও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনেক মতবিরোধ রয়েছে যে ঠিক কিভাবে এই আধুনিক প্রযুক্তিগুলি অল্পবয়স্কদের ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবুও টিভি দেখা অথবা কম্পিউটার গেইমগুলি খেলার ক্ষেত্রে অত্যধিক সময় ব্যয় করা খুব কমই স্বাস্থ্যকর হতে পারে। একজন অল্পবয়স্ক স্বীকার করে: “ভিডিও গেইম, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের মত বিষয়গুলির কারণে আমরা ছোটরা, যা চাই তা দ্রুত পাওয়ার জন্য অভ্যস্ত হয়ে উঠি।”
কিন্তু সমস্যাটি হল যে, জীবনে অনেক বিষয়ই কেবল প্রচেষ্টা, অধ্যবসায় এবং সেকেলে ধৈর্যের দ্বারাই লাভ করা যায়। (ইব্রীয় ৬:১২; যাকোব ৫:৭ পদগুলির সঙ্গে তুলনা কর।) সুতরাং দ্রুতগতিসম্পন্ন ও চিত্তবিনোদনমূলক বিষয়গুলিকে অতিমূল্যবান বলে মনে করো না। যদিও টিভি দেখা এবং কম্পিউটার গেইম খেলা চিত্তবিনোদনকর হতে পারে, তবুও রং করা, ছবি আকাঁ কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখ না কেন? এইধরনের দক্ষতাগুলি হয়ত তোমার মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে পারে।
তোমার মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করার আর কোন উপায় কি রয়েছে? অবশ্যই আছে আর ভবিষ্যৎ প্রবন্ধ সেগুলির কয়েকটি জানাবে।
[পাদটীকাগুলো]
a সচেতন থাক! (ইংরাজি) পত্রিকার ১৯৯৪ সালের নভেম্বর ২২ সংখ্যার পৃষ্ঠা ৩-১২; ১৯৯৬ সালের জুন ২২ সংখ্যার পৃষ্ঠা ১১-১৩ এবং ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি ২২ সংখ্যার পৃষ্ঠা ৫-১০ দেখো।
b আমাদের ১৯৯৪ সালের ৮ই আগস্টের সংখ্যায় “যুবক-যুবতীদের জিজ্ঞাস্য . . . কিভাবে আমি বিপরীত লিঙ্গ সম্বন্ধে চিন্তা করা থেকে নিজেকে বিরত করতে পারি?” নামক প্রবন্ধটি দেখো।
[২০ পৃষ্ঠার ব্লার্ব]
গবেষকেরা বলেন যে অধিক ক্যালরিযুক্ত কিন্তু কম পুত্ত্রষ্টগুণসম্পন্ন খাদ্য বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা হ্রাস করে বলে মনে হয়।
[২০ পৃষ্ঠার ব্লার্ব]
“মাঝে মাঝে আমি মেয়েদের বিষয়ে ভাবি বা আমার কিছু উদ্বিগ্নতা সম্বন্ধে চিন্তা করি”
[১৯ পৃষ্ঠার চিত্র]
তুমি কি প্রায়ই দেখ যে ক্লাশে মনোযোগ দেওয়া তোমার জন্য খুবই কঠিন?