প্রাণের জন্য এক উত্তম আশা
রোমীয় সৈন্যরা এটি প্রত্যাশা করেনি। যখন তারা যিহূদী বিদ্রোহী শক্তির শেষ সুরক্ষিত আশ্রয়, মাসাডার পার্বত্য নগরদুর্গ আক্রমণ করে, তারা নিজেদের তাদের শত্রুদের হত্যার জন্য, সেনাদের চিৎকারের জন্য, স্ত্রী ও শিশুদের আর্তনাদের জন্য প্রস্তুত করেছিল। কিন্তু পরিবর্তে তারা কেবলমাত্র আগুন জ্বলার শব্দ পায়। যখন তারা সেই জলন্ত নগরদুর্গে অনুসন্ধান করে, তখন রোমীয়রা এক ভয়ঙ্কর সত্য জানতে পারে—তাদের শত্রুরা—যাদের সংখ্যা প্রায় ৯৬০ জন—ইতিমধ্যেই মৃত! যথাক্রমে, যিহূদী সেনারা তাদের নিজস্ব পরিবারগুলিকে এবং তারপর একে অপরকে হত্যা করেছিল। শেষ ব্যক্তিটি নিজেই নিজেকে হত্যা করেছিল।a কী তাদের এই ব্যাপক ভয়ঙ্কর হত্যা ও আত্মহত্যা করতে পরিচালিত করেছিল?
সমকালীন ঐতিহাসিক যোসেফাসের বিবরণ অনুযায়ী প্রাণের অমরত্ব সম্বন্ধীয় বিশ্বাস ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাসাডার ধর্মান্ধ যিহূদীদের নেতা, ইলিয়াসর বেন জাইর প্রথমে তার লোকেদের এই বিষয়টি বিশ্বাস করানোর জন্য প্ররোচিত করতে চেষ্টা করেছিলেন যে রোমীয়দের হাতে মৃত্যু অথবা দাসত্বে যাওয়ার চাইতে আত্মহত্যা করা অনেক বেশি সম্মানীয়। তাদের ইতস্তত করতে দেখে তিনি প্রাণ সম্বন্ধে এক আবেগপূর্ণ বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। তিনি তাদের বলেছিলেন যে দেহ কেবল একটি বোঝামাত্র, প্রাণের জন্য এক বন্দীগৃহস্বরূপ। “কিন্তু যখন তা দেহমুক্ত হয় যা এটিকে পৃথিবীতে নিয়ে আসে এবং এটিকে আবৃত করে রাখে” তিনি বলে চলেন “তখন প্রাণ তার নিজস্ব জায়গায় ফিরে যায়, তারপর প্রকৃতপক্ষে এটি এক আশীর্বাদযুক্ত ক্ষমতা এবং সম্পূর্ণভাবে অসীম সামর্থ্যের অধিকারী হয়, মনুষ্য দৃষ্টির অগোচর হিসাবে স্বয়ং ঈশ্বরের মত অবস্থিতি করে।”
এর প্রতিক্রিয়া কী হয়? যোসেফাস বর্ণনা করেন যে ইলিয়াসর তার বক্তব্য এই সর্বাত্মক প্রক্রিয়ায় বলার পর “তার সমস্ত শ্রোতারা তার বক্তব্যের মাঝে বাধা দেয় এবং প্রবল উদ্দীপনার সাথে দ্রুত হত্যা করতে প্রবৃত্ত হয়।” যোসেফাস আরও বলেন: “যেন প্রত্যেকজন এই ধারণার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে একে অপরের চেয়ে দ্রুতগতিতে কাজটি করার জন্য উৎসাহিত হয়ে ওঠে, . . . সুতরাং এক দুর্নিবার ইচ্ছা তাদের স্ত্রী, সন্তান ও নিজেদেরকে হত্যা করার জন্য তাদের প্ররোচিত করেছিল।”
এই ঘৃণ্য উদাহরণ ব্যাখ্যা করে যে অমর প্রাণ সম্বন্ধীয় এই মতবাদ মৃত্যু সম্বন্ধে মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কত গভীরভাবে পরিবর্তিত করতে পারে। বিশ্বাসীদের মৃত্যুকে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শেখান হয় যে তা মানুষের সর্বাপেক্ষা খারাপ শত্রু নয়, কিন্তু তা কেবলমাত্র এক প্রবেশপথ যা প্রাণকে এক উচ্চতর অস্তিত্ব উপভোগ করার জন্য মুক্ত করে। কিন্তু কেন এই ধর্মান্ধ যিহূদীরা এই বিষয়টি বিশ্বাস করেছিল? অনেকেই অনুমান করেছিল যে তাদের পবিত্র লেখাগুলি, ইব্রীয় শাস্ত্রাবলী শেখায় যে মানুষের অভ্যন্তরে এক সচেতন আত্মা আছে, এক প্রাণ যা মৃত্যুর পরে জীবিত থাকার জন্য মুক্ত হয়। এটি কি প্রকৃতই এইরকম?
ইব্রীয় শাস্ত্রাবলীতে প্রাণ
এককথায় বলতে গেলে, না। বাইবেলের সর্বপ্রথম বই, আদিপুস্তকে আমাদের বলা হয়েছে যে প্রাণ এমন কোন বস্তু নয় যা আপনার আছে, এটি হচ্ছে এমন কিছু যা আপনি নিজে। আমরা প্রথম মনুষ্যপ্রাণী, আদমের সৃষ্টির বিবরণে পড়ি: “মনুষ্য সজীব প্রাণী হইল।” (বাঁকা অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।) (আদিপুস্তক ২:৭) এখানে প্রাণের জন্য যে ইব্রীয় শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল নেফিস, যা সমগ্র ইব্রীয় শাস্ত্রাবলীতে ৭০০ বারেরও বেশি উল্লেখিত হয়েছে, যা একবারের জন্যও এক পৃথক, অশরীরী, মানুষের আত্মিক অংশ এই ধারণা প্রকাশ করেনি। বিপরীতভাবে প্রাণ হচ্ছে আয়ত্তাধীন, মূর্ত, শরীরী।
আপনার নিজস্ব বাইবেলে নিম্নে উল্লেখিত শাস্ত্রপদগুলি পরীক্ষা করুন কারণ সেগুলির প্রত্যেকটিতে ইব্রীয় শব্দ নেফিস ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। সেগুলি স্পষ্টভাবে দেখায় যে প্রাণ ঝুঁকি ও বিপদের মুখোমুখি হতে পারে এবং এমনকি তা অপহৃতও হয় (দ্বিতীয় বিবরণ ২৪:৭; বিচারকর্ত্তৃগণ ৯:১৭; ১ শমূয়েল ১৯:১১); বস্তুকে স্পর্শ করতে পারে (ইয়োব ৬:৭); লৌহ দ্বারা বদ্ধ করা যেতে পারে (গীতসংহিতা ১০৫:১৮) খাদ্য গ্রহণের জন্য আকাঙ্ক্ষিত হতে পারে, খাদ্যের অভাবে পীড়িত হতে পারে ও ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় মুর্চ্ছিত হতে পারে; এবং ক্ষয়রোগের কারণে কষ্টভোগ করে এমনকি শোকের ফলস্বরূপ নিদ্রাহীনতাও ভোগ করতে পারে। (দ্বিতীয় বিবরণ ১২:২০; গীতসংহিতা ৩৫:১৩; ৬৯:১০; ১০৬:১৫; ১০৭:৯; ১১৯:২৮) আর এক কথায় যেহেতু আপনিই আপনার প্রাণ, আপনার সত্ত্বা, তাই আপনার প্রাণ সেই সমস্ত কিছুই অভিজ্ঞতা করতে পারে যা আপনি অভিজ্ঞতা করেন।b
তাহলে এর অর্থ কি এই যে প্রকৃতপক্ষেই প্রাণের মৃত্যু হতে পারে? হ্যাঁ। অমর হওয়ার সম্পূর্ণ বিপরীতে মানব প্রাণ সম্বন্ধে ইব্রীয় শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে অন্যায় করার কারণে তা ‘উচ্ছিন্ন হয়’ অথবা দণ্ড ভোগ করে, নিদারুণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, হত হয়, ধ্বংস হয় এবং টুকরো টুকরো করা যায়। (যাত্রাপুস্তক ৩১:১৪; দ্বিতীয় বিবরণ ১৯:৬; ২২:২৬; গীতসংহিতা ৭:২) “যে প্রাণী পাপ করে—সেই মরিবে,” যিহিষ্কেল ১৮:৪ পদ বলে। স্পষ্টতই মৃত্যু হচ্ছে মনুষ্য প্রাণের সাধারণ পরিসমাপ্তি, যেহেতু আমরা সকলে পাপ করি। (গীতসংহিতা ৫১:৫) প্রথম মনুষ্য আদমকে বলা হয়েছিল পাপের দণ্ড মৃত্যু—আত্মিক জগতে স্থানান্তরিত এবং অমরত্ব প্রাপ্তি নয়। (আদিপুস্তক ২:১৭) আর যখন সে পাপ করেছিল, শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছিল: “কেননা তুমি ধূলি, এবং ধূলিতে প্রতিগমন করিবে।” (আদিপুস্তক ৩:১৯) যখন আদম এবং হবার মৃত্যু হয়েছিল, তখন বাইবেল প্রায়ই ‘মৃত’ অথবা ‘শব’ হিসাবে যা নির্দেশ করে, তারা সাধারণভাবে তাই হয়েছিল।—গণনাপুস্তক ৫:২ ৬:৬.
আশ্চর্যের বিষয় নয় যে ইব্রীয় শাস্ত্রের প্রাণ সম্বন্ধে দ্যা এনসাইক্লোপিডিয়া আমেরিকানা বলে: “মানুষ সম্বন্ধে পুরাতন নিয়মের ধারণা প্রাণ ও দেহের সংযুক্ত অবস্থা নয়, কিন্তু এক অখণ্ড সত্ত্বা।” এটি আরও জানায়: “নেফিস . . . সম্বন্ধে কখনও এমন কল্পনা করা হয়নি যে তা দেহ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।”
সুতরাং, বিশ্বস্ত যিহূদীরা মৃত্যু কী সে সম্বন্ধে কী বিশ্বাস করত? সহজভাবে বলা যায়, তারা বিশ্বাস করত যে মৃত্যু জীবনের বিপরীত। যখন আত্মা বা জীবনী-শক্তি এক মনুষ্যপ্রাণীকে ছেড়ে চলে যায় তখন কী ঘটে সেই সম্বন্ধে গীতসংহিতা ১৪৬:৪ পদ বলে: “তাহার শ্বাস [“আত্মা,” NW] নির্গত হয়, সে নিজ মৃত্তিকায় প্রতিগমন করে; সেই দিনেই তাহার সঙ্কল্প সকল নষ্ট হয়।”c অনুরূপভাবে, রাজা শলোমন লিখেছিলেন যে মৃতেরা “কিছুই জানে না।”—উপদেশক ৯:৫.
তাহলে কেন প্রথম শতাব্দীর অনেক যিহূদীরা, যেমন মাসাডার ধর্মান্ধ যিহূদীরা প্রাণের অমরত্বের বিষয়ে এতখানি প্রভাবিত হয়েছিল?
গ্রীক প্রভাব
যিহূদীরা এই ধারণাটি বাইবেল থেকে নয়, কিন্তু গ্রীকদের কাছ থেকে পেয়েছিল। সা.শ.পূ. সপ্তম এবং পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে দেখা যায় যে এই ধারণাটি রহস্যময় গ্রীক ধর্মীয় সম্প্রদায় থেকে গ্রীক দর্শনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। জীবনোত্তর অস্তিত্বের ধারণা, যেখানে মন্দ প্রাণেরা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করে, দীর্ঘসময় ধরে খুবই আবেদনমূলক ছিল এবং সেই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত ও বিস্তৃত হয়েছিল। দার্শনিকেরা অন্তহীনভাবে প্রাণের নির্দিষ্ট প্রকৃতি সম্বন্ধে বিতর্ক করেছিলেন। হোমার দাবি করেছিলেন যে মৃত্যুর সময় প্রাণ শ্রুতিসাধ্য গুঞ্জন, কিচমিচ অথবা মর্মরধ্বনির শব্দ করে অস্থিরভাবে বের হয়ে যায়। এপিকিউরাস বলেছিলেন যে প্রকৃতপক্ষে প্রাণের মধ্যে উপাদান আছে, আর তাই তা এক অতি ক্ষুদ্র পদার্থ।d
কিন্তু প্রাণের অমরত্বের সর্বাপেক্ষা বড় সমর্থক ছিলেন সা.শ.পূ. চতুর্থ শতাব্দীর গ্রীক দার্শনিক প্লেটো। তার শিক্ষক সক্রেটিসের মৃত্যু সম্বন্ধে তার বর্ণনা অনেকাংশে বহু শতাব্দী পরে মাসাডার ধর্মান্ধ যিহূদীদের মত সমরূপ বিশ্বাস প্রকাশ করে। যেমন পণ্ডিত অস্কার কুলমান বিষয়টিকে এইভাবে বলেন, “প্লেটো আমাদের দেখান কিভাবে সক্রেটিস সম্পূর্ণ শান্তিতে ও সমাহিতভাবে মৃত্যু বরণ করেন। সক্রেটিসের মৃত্যু এক সুন্দর মৃত্যু। সেখানে মৃত্যুভয়ের কিছুই দেখা যায়নি। সক্রেটিস মৃত্যুকে ভয় করতে পারেন না, কারণ সত্যিই এটি আমাদের দেহ থেকে মুক্তি দেয়। . . . মৃত্যু প্রাণের মহান বন্ধু। সুতরাং এটি তারই শিক্ষা; আর সেই শিক্ষার সাথে অপূর্ব সামঞ্জস্য রেখে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।”
এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান যে খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে ম্যাকাবীয়দের সময়কালে যিহূদীরা গ্রীকদের কাছ থেকে এই শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। যোসেফাস আমাদের বলেন, সা.শ. প্রথম শতাব্দীতে ফরীশী ও অ্যাসীনীয়রা—শক্তিশালী ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলি—এই মতবাদকে বিস্তৃত করেছিল। কিছু কবিতা যা সম্ভবত সেই যুগে রচিত হয়েছিল তা একই বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে।
কিন্তু, যীশু খ্রীষ্ট সম্বন্ধে কী বলা যায়? তিনি ও তাঁর অনুগামীরা কি একইভাবে গ্রীক ধর্ম থেকে এই ধারণা সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়েছিলেন?
প্রাণ সম্বন্ধে প্রাথমিক খ্রীষ্টানদের ধারণা
প্রথম-শতাব্দীর খ্রীষ্টানেরা প্রাণকে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতেন না যেমন গ্রীকেরা দেখতেন। উদাহরণস্বরূপ, যীশুর বন্ধু লাসারের মৃত্যুর কথা বিবেচনা করুন। যদি লাসারের এক অমর প্রাণ থাকত যা মৃত্যুর সময় মুক্ত ও সুখী অবস্থায় বের হয়ে যেত, তাহলে যোহন ১১ অধ্যায়ের বিবরণটি কি একেবারে অন্যভাবে পড়া হত না? যদি লাসার স্বর্গে জীবিত, সুখী ও সচেতন অবস্থায় থাকত; তাহলে নিশ্চয়ই যীশু তাঁর অনুগামীদের বলতেন, কিন্তু পরিবর্তে, তিনি ইব্রীয় শাস্ত্রের প্রতিধ্বনি করেছিলেন এবং তাদের বলেছিলেন যে লাসার নিদ্রিত ও অচেতন অবস্থায় ছিল। (১১ পদ) নিশ্চয়ই যীশু আনন্দ করতেন যদি তাঁর বন্ধু এক অপূর্ব নতুন অস্তিত্ব উপভোগ করত; পরিবর্তে আমরা তাঁকে এই মৃত্যুর জন্য সাধারণ্যে কাঁদতে দেখি। (৩৫ পদ) নিশ্চয়ই, যদি লাসারের প্রাণ স্বর্গে থাকত আর সুখদায়ক অমরত্ব উপভোগ করত, যীশু কখনও এমন নিষ্ঠুর হতেন না যে কেবলমাত্র অসুস্থ এবং মরণশীল মানবজাতির মধ্যে এক অসিদ্ধ মানব দেহের “বন্দীগৃহে” আবার অল্প কিছু বছরের জন্য জীবনে ফিরে আসতে তাকে আহ্বান করতেন।
লাসার কি স্বাধীন, বিদেহী আত্মিক প্রাণীরূপে তার রোমাঞ্চকর চারদিনের উত্তেজনাপূর্ণ বিবরণ নিয়ে মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছিল? না, তার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। প্রাণের অমরত্বে বিশ্বাসীরা এইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে যে এটি এইরকম ছিল কারণ কোন মানুষের সেই সময়ে যে অভিজ্ঞতা হয় তা বর্ণনা করা অসাধ্য। কিন্তু এই যুক্তি আমাদের প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়; কারণ লাসার কি তার প্রিয়জনদের অন্তত এটুকুও বলত না—যে তার বর্ণনাতীত এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল? পরিবর্তে, লাসার মৃত্যুতে তার যে কোন অভিজ্ঞতা হয়েছিল সে সম্বন্ধে কিছুই বলেনি। এই বিষয়টি চিন্তা করুন—এমন একটি বিষয়ে নীরবতা যে বিষয়ের উপর মানুষের ঔৎসুক্য অন্যান্য যে কোন বিষয়ের চেয়ে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত: মৃত্যু কীরকম! এই নীরবতাকে কেবলমাত্র একটি উপায়েই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। বলার কিছুই ছিল না। মৃতেরা নিদ্রিত এবং অচেতন।
সুতরাং বাইবেল কি প্রাণের বন্ধু হিসাবে মৃত্যুকে উপস্থিত করে, অস্তিত্বের স্তরের মধ্যে কেবলমাত্র এক আচারগত উত্তরণ? না! সত্য খ্রীষ্টানদের, যেমন প্রেরিত পৌলের কাছে মৃত্যু বন্ধু ছিল না; এটি ছিল “শেষ শত্রু।” (১ করিন্থীয় ১৫:২৬) খ্রীষ্টানেরা মৃত্যুকে স্বাভাবিক এক বিষয় হিসাবে দেখে না, কিন্তু এক ভয়ঙ্কর, অস্বাভাবিক বিষয় হিসাবে দেখে কারণ এটি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ ও বিদ্রোহের সরাসরি ফল। (রোমীয় ৫:১২; ৬:২৩) এটি কখনও মানবজাতির জন্য ঈশ্বরের আদি উদ্দেশ্যের অংশ ছিল না।
যাইহোক, সত্য খ্রীষ্টানেরা যখন প্রাণের মৃত্যু ঘটে এমনকি তখনও আশাহীন নয়। লাসারের পুনরুত্থান বাইবেলের অনেক বিবরণের মধ্যে একটি যা স্পষ্টভাবে আমাদের মৃত প্রাণের জন্য সত্য, শাস্ত্রীয় আশা সম্বন্ধে দেখায়—পুনরুত্থান। বাইবেল দুই ভিন্ন ধরনের পুনরুত্থান সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়ে থাকে। মানবজাতির এক বিশাল অংশের জন্য যারা কবরে ঘুমন্ত অবস্থায় আছে, তারা ধার্মিক অথবা অধার্মিক যাই হোক না কেন, তাদের জন্য এই পৃথিবীর পরমদেশে অনন্তকালীন জীবনে পুনরুত্থানের আশা রয়েছে। (লূক ২৩:৪৩; যোহন ৫:২৮, ২৯; প্রেরিত ২৪:১৫) একটি ক্ষুদ্র দলের জন্য যাদের যীশু তাঁর “ক্ষুদ্র মেষপাল” বলে উল্লেখ করেছেন, তারা স্বর্গে আত্মিক প্রাণীরূপে অমর জীবনে পুনরুত্থিত হবে। এই ব্যক্তিরা যারা খ্রীষ্টের প্রেরিতদের অন্তর্ভুক্ত, খ্রীষ্ট যীশুর সাথে মানবজাতির উপর শাসন করবে এবং তাদের সিদ্ধতায় ফিরিয়ে আনবে।—লূক ১২:৩২; ১ করিন্থীয় ১৫:৫৩, ৫৪; প্রকাশিত বাক্য ২০:৬.
তাহলে, কেন আমরা দেখি যে খ্রীষ্টীয়জগতের গির্জাগুলি পুনরুত্থানের শিক্ষা দেয় না, কিন্তু মানব প্রাণের অমরত্ব সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়ে থাকে? ১৯৫৯ সালে দ্যা হার্ভাড থিওলজিক্যাল রিভিউ এ ঈশ্বরতত্ত্ববিদ ওয়ারনার জেগার যে উত্তর দেন তা বিবেচনা করুন: “খ্রীষ্টীয় মতবাদের ইতিহাসে এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যে খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের জনক, অরিগেন ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়া বিদ্যালয়ের এক প্লেটোনিক দার্শনিক। তিনি খ্রীষ্টীয় মতবাদে প্রাণ সম্বন্ধীয় সমস্ত শিক্ষার সূচনা করেছিলেন যা তিনি প্লেটোর কাছে থেকে গ্রহণ করেছিলেন।” সুতরাং, গির্জা ঠিক তাই করেছিল যা বহু শতাব্দী পূর্বে যিহূদীরা করেছিল! তারা গ্রীক দর্শনের সমর্থনে বাইবেলের শিক্ষাগুলিকে পরিত্যাগ করেছিল।
মতবাদের প্রকৃত উৎস
এখন, প্রাণের অমরত্ব এই মতবাদের সমর্থনে কিছুজন হয়ত জিজ্ঞাসা করতে পারে, জগতের অধিকাংশ ধর্মগুলিতে কেন কোন না কোন রূপে এই একই মতবাদ শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে? কেন জগতের ধর্ম সম্প্রদায়গুলির মধ্যে এই শিক্ষা এত অধিক প্রভাব বিস্তারকারী সে বিষয়ে শাস্ত্র আমাদের নির্ভরযোগ্য কারণ প্রদান করে।
বাইবেল আমাদের বলে “সমস্ত জগৎ সেই পাপাত্মার মধ্যে শুইয়া রহিয়াছে” এবং তা নির্দিষ্টভাবে শয়তানকে “এ জগতের অধিপতি” হিসাবে শনাক্ত করে। (১ যোহন ৫:১৯; যোহন ১২:৩১) স্পষ্টতই, জগতের ধর্মগুলি শয়তানের প্রভাব মুক্ত নয়। বিপরীতভাবে, আজকের জগতের সমস্যা ও বিবাদে ভীষণভাবে তাদের অবদান আছে। আর প্রাণ সম্বন্ধীয় বিষয়ে তারা স্পষ্টভাবে শয়তানের মনোভাব প্রতিফলিত করে। সেটি কিভাবে?
স্মরণ করুন প্রথম মিথ্যার কথা যা কখনও বলা হয়েছিল। ঈশ্বর আদম ও হবাকে বলেছিলেন যদি তারা তাঁর বিরুদ্ধে পাপ করে তাহলে তার ফল হবে মৃত্যু। কিন্তু শয়তান হবাকে নিশ্চয়তা দিয়েছিল: “কোন ক্রমে মরিবে না।” (আদিপুস্তক ৩:৪) অবশ্যই, আদম ও হবা মারা গিয়েছিল; তারা ধুলিতে প্রতিগমন করেছিল যেমন ঈশ্বর বলেছিলেন। ‘মিথ্যাবাদীর পিতা,’ শয়তান তার প্রথম মিথ্যাকে কখনও পরিত্যাগ করেনি। (যোহন ৮:৪৪) অসংখ্য ধর্মগুলি যেগুলি বাইবেলের মতবাদ থেকে বিচ্যুত হয়েছে অথবা সরাসরি এটিকে অবজ্ঞা করেছে, এখনও একই ধারণা সরবরাহ করে আসছে: ‘তুমি কোন ক্রমে মরবে না। তোমার দেহ বিনষ্ট হবে কিন্তু তোমার প্রাণ চিরকাল বেঁচে থাকবে—ঈশ্বরের মত!’ আগ্রহজনকভাবে, শয়তানও হবাকে এই কথা বলেছিল যে সে “ঈশ্বরের সদৃশ” হবে!—আদিপুস্তক ৩:৫.
এমন এক আশা থাকা কতই না উপকারজনক যা মিথ্যা বা মনুষ্য দর্শনগুলির উপর নয়, কিন্তু সত্য ভিত্তিক। অমর প্রাণের অবস্থান সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন হওয়ার চাইতে এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া কতই না উত্তম যে আমাদের মৃত প্রিয়জনেরা কবরে সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় রয়েছে! মৃতদের এই নিদ্রা আমাদের সন্ত্রস্ত বা হতাশ করে না। এক অর্থে, আমরা মৃতদের এই দৃষ্টিতে দেখতে পারি যে তারা এক সুরক্ষিত বিশ্রামের স্থানে রয়েছে। কেন সুরক্ষিত? কারণ বাইবেল আমাদের নিশ্চয়তা দেয় যে মৃত ব্যক্তিরা যাদের যিহোবা ভালবাসেন তারা এক বিশেষ অর্থে জীবিত। (লূক ২০:৩৮) তারা তাঁর স্মৃতিতে জীবিত আছে। এটি এক উল্লেখযোগ্য সান্ত্বনাদায়ক চিন্তাধারা কারণ তাঁর স্মৃতি অসীম। তিনি অগণিত লক্ষ লক্ষ প্রিয় মনুষ্যদের জীবনে ফিরিয়ে আনতে এবং পরমদেশ পৃথিবীতে অনন্ত জীবন উপভোগ করার সুযোগ দিতে আগ্রহী।—তুলনা করুন ইয়োব ১৪:১৪, ১৫.
পুনরুত্থানের সেই গৌরবময় দিন আসবে যখন যিহোবার সমস্ত প্রতিজ্ঞা অবশ্যই পরিপূর্ণ হবে। (যিশাইয় ৫৫:১০, ১১) কেবলমাত্র চিন্তা করে দেখুন এই ভবিষ্যদ্বাণীটি পরিপূর্ণতা লাভ করছে: “কিন্তু তোমার মৃতেরা জীবিত হবে, তাদের দেহগুলি আবার উত্থিত হবে; যারা পৃথিবীর বুকে ঘুমিয়ে আছে, তারা জাগ্রত হবে, এবং আনন্দ গান করবে; কারণ তোমার শিশির দীপ্তির শিশির তুল্য, এবং ভূমি দীর্ঘদিন যাবৎ যারা মৃত তাদের ভূমিষ্ঠ করবে।” (যিশাইয় ২৬:১৯, দ্যা নিউ ইংলিশ বাইবেল) সুতরাং মৃতেরা যারা কবরে নিদ্রিত অবস্থায় রয়েছে, তারা মাতৃগর্ভে থাকা এক শিশুর মত সুরক্ষিত অবস্থায় আছে। শীঘ্রই তারা “ভূমিষ্ঠ” হবে, আর পরমদেশ পৃথিবীতে জীবনে ফিরে আসবে!
আর কোন আশা এর চেয়ে উত্তম হতে পারে?
[পাদটীকাগুলো]
a উক্তি অনুযায়ী দুজন স্ত্রীলোক এবং পাঁচটি শিশু লুকিয়ে রক্ষা পেয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই স্ত্রীলোকেরা তাদের বন্দীকারী রোমীয়দের কাছে তা বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছিল।
b অবশ্যই, যেমন অনেক শব্দেরই এক ব্যাপক প্রয়োগ থাকে, সেইভাবে নেফিস শব্দেরও অর্থের বিভিন্ন দিক আছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশেষত গভীর অনুভূতি সম্বন্ধে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে এটি এক অন্তর্নিহিত ব্যক্তিকে উল্লেখ করতে পারে। (১ শমূয়েল ১৮:১) এছাড়া প্রাণ হিসাবে একজন ব্যক্তি যা উপভোগ করে সেই জীবনকেও এটি ইঙ্গিত করতে পারে।—১ রাজাবলি ১৭:২১-২৩.
c “আত্মার জন্য” ব্যবহৃত ইব্রীয় শব্দ রূয়াক এর অর্থ “শ্বাসপ্রশ্বাস” অথবা “বাতাস।” মনুষ্যপ্রাণী সম্পর্কে এটি এক সচেতন আত্মিক অস্তিত্বকে উল্লেখ করে না, বরং দ্যা নিউ ইন্টারন্যাশনাল ডিকসনারী অফ নিউ টেস্টামেন্ট থিওলজি এটিকে প্রয়োগ করে “এক ব্যক্তির জীবনীশক্তি” রূপে।
d এইপ্রকার অদ্ভুত প্রক্রিয়ায় চিন্তা করার ক্ষেত্রে তিনিই শেষ ব্যক্তি ছিলেন না। এই শতাব্দীর প্রথমভাগে, এক বৈজ্ঞানিক প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন ব্যক্তির প্রাণের ওজন পরিমাপ করার বিষয়ে দাবি করেছিলেন, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে নেওয়া ওজন থেকে মৃত্যুর ঠিক পরেই নেওয়া ওজন বিয়োগ করে তা পরিমাপ করার মাধ্যমে।
[৭ পৃষ্ঠার চিত্র]
মাসাডার ধর্মান্ধ যিহূদীরা বিশ্বাস করত যে মৃত্যু তাদের প্রাণকে মুক্ত করবে