প্রাণ কি অমর?
শান্তভাবে, বন্ধু এবং পরিজনেরা উন্মুক্ত শবাধারটির পাশ দিয়ে হাঁটছেন। তারা স্থির দৃষ্টিতে দেহটির দিকে তাকিয়ে আছেন, যেটি হল ১৭ বছর বয়সী একটি ছেলের। তার স্কুলের বন্ধুদের পক্ষে তাকে চিনতে পারা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। কেমোথেরাপির ফলে তার চুল পাতলা হয়ে গেছে; ক্যানসার তার অনেকখানি ওজন কমিয়ে দিয়েছে। এটি কি সত্যই তাদের সেই বন্ধু? কেবলমাত্র কিছু সপ্তাহ আগেই সে জীবন সম্বন্ধীয়—অনেক পরিকল্পনা, জিজ্ঞাসা ও প্রাণপ্রাচুর্যে পরিপূর্ণ ছিল! ছেলেটির মা কাঁদতে কাঁদতে বার বার বলতে থাকে: “টমী এখন অনেক বেশি সুখী। ঈশ্বর টমীকে তাঁর কাছে স্বর্গে নিয়ে নিয়েছেন।”
যে কোন ভাবেই হোক তার পুত্র এখনও জীবিত আছে, এই ধারণাটি থেকে এই শোকার্ত মা কিছু পরিমাণ আশা ও সান্ত্বনা খুঁজে পান। গির্জায় তিনি শিখেছেন যে প্রাণ অমর, তাই এটি হল ব্যক্তিত্ব, চিন্তা, স্মৃতির কেন্দ্রস্থল—এক “সত্ত্বা।” তিনি বিশ্বাস করেন যে তার পুত্রের প্রাণ একেবারেই মারা যায়নি; এক জীবন্ত আত্মিক প্রাণী, মৃত্যুতে তার দেহ ছেড়ে স্বর্গে ঈশ্বর এবং দূতেদের কাছে গিয়েছে।
শোকের এই মুহূর্তে, মানুষের হৃদয় আশার যে কোন আভাসকে মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরতে চায়, তাই এটি বোঝা কঠিন নয় যে কেন এই বিশ্বাস এতখানি আবেদনপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ ঈশ্বরতত্ত্ববিদ্ জে. প্যাটারসন-স্মিথ পরলোকের সুসমাচার (ইংরাজি) পুস্তকে নিজেকে যেভাবে ব্যক্ত করেছেন তা বিবেচনা করুন: “এর পরে যা আসে তার সাথে তুলনায় মৃত্যু খুবই নগণ্য বিষয়—সেটি এক অপূর্ব মনোরম জগৎ যেখানে মৃত্যু আমাদের নিয়ে যায়।”
জগদ্ব্যাপী এবং অধিকাংশ ধর্ম ও সংস্কৃতির লোকেরা বিশ্বাস করে যে মানুষের মধ্যে এক মৃত্যুহীন প্রাণ রয়েছে, এক সচেতন আত্মা যা দেহের মৃত্যু ঘটার পরেও ক্রমাগতভাবে জীবিত থাকে। এই বিশ্বাস খ্রীষ্টীয়জগতের সহস্রাধিক ধর্ম ও সম্প্রদায়ে প্রায় সর্বজনীন। এটি যিহূদীবাদেও এক স্বীকৃত মতবাদ। হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে আত্মা বা প্রাণ প্রারম্ভিক সময়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল, যা জন্মগ্রহণের সময়ে দেহে বন্দী করে দেওয়া হয় এবং পুনর্জন্মের ক্রমাবর্তিত চক্র অনুযায়ী মৃত্যুতে অপর একটি দেহে স্থানান্তরিত হয়। মুসলিমেরা বিশ্বাস করে যে প্রাণ দেহের সাথে অস্তিত্বে আসে এবং দেহের মৃত্যু ঘটার পরও তা জীবিত থাকে। অন্যান্য বিশ্বাস—আফ্রিকার সর্বপ্রাণবাদী, শিন্টো, এমনকি বৌদ্ধরাও যে কোন প্রকারে—এই একই মূল বিষয়ের উপর বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা দিয়ে থাকে।
কিছু সমস্যামূলক প্রশ্নাবলী
যখন অমর প্রাণের ধারণার এক অনস্বীকার্য এবং প্রায় সর্বজনীন আবেদন আছে তখন তা অবশ্যই কিছু উদ্বেগ সৃষ্টিকারী প্রশ্ন উত্থাপন করে। উদাহরণস্বরূপ, লোকেরা ভাবতে থাকে যে তাদের সেই প্রিয়জনের প্রাণ কোথায় যায় যে সম্পূর্ণভাবে এক আদর্শ জীবন যাপন করেনি। সে কি কোন নিম্নমানের জীবনে পুর্নজন্ম লাভ করবে? অথবা তাকে কি পুরগাতরীতে পাঠান হবে, যেখানে সে কিছু অগ্নিময় পদ্ধতিতে পরিশুদ্ধ হবে যতক্ষণ না সে স্বর্গে যাওয়ার জন্য যোগ্য ব্যক্তিতে পরিণত হয়? এর চেয়েও অধিকতর মন্দ বিষয় হল, সে কি চিরকাল অগ্নিময় নরকে যন্ত্রণা ভোগ করবে? অথবা যেমন অনেক সর্বপ্রাণবাদী ধর্মগুলি শিক্ষা দেয়, সে কি একটি আত্মা যাকে অবশ্যই তৃপ্ত করতে হবে?
এইপ্রকার ধারণাগুলি জীবিতদের জন্য এক সম্ভাব্য বোঝা সৃষ্টি করে। আমাদের কি আমাদের প্রিয় ব্যক্তিদের আত্মাকে তৃপ্ত করতে হবে এই ভয়ে যে তা না হলে তারা আমাদের উপর প্রতিশোধ নেবে? আমরা কি তাদের সেই ভয়ঙ্কর পুরগাতরী থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করতে পারি? অথবা আমরা কেবলমাত্র নরকে তাদের যন্ত্রণাভোগের কথা চিন্তা করে অসহায় বিভীষিকায় আতঙ্কিত হব? অথবা আমরা কি কিছু জীবিত প্রাণীদের সাথে সেইভাবে ব্যবহার করব যেন তারা ওই মৃত ব্যক্তিদের প্রাণ ধারণ করেছে?
স্বয়ং ঈশ্বর সম্বন্ধে যে প্রশ্নগুলি উত্থাপিত হয় সেগুলিও নিশ্চিতভাবেই সান্ত্বনাদায়ক নয়। উদাহরণস্বরূপ, অনেক পিতামাতা, সেই মায়ের মত যার সম্বন্ধে সূচনাতেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে সান্ত্বনা পেয়ে থাকেন এই বিষয়টি কল্পনা করে যে ঈশ্বর তাদের সন্তানদের অমর প্রাণকে তাঁর সাথে বসবাস করার জন্য স্বর্গে “নিয়ে গিয়েছেন।” কিন্তু অনেকের কাছে এটি কেবলমাত্র ক্ষণিকের বিষয়, যার পরেই তারা আশ্চর্য হয়ে চিন্তা করতে শুরু করেন কিধরনের ঈশ্বর এক নিরপরাধ শিশুর উপর এমন ভয়ঙ্কর অসুস্থতা নিয়ে আসতে পারেন এবং তার শোকার্ত পিতামাতার কাছ থেকে সেই মহামূল্যবান শিশুটিকে নিয়ে নেন এই কারণে, কেবলমাত্র নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শিশুটিকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এইপ্রকার এক ঈশ্বরের ন্যায়বিচার, প্রেম, করুণা কোথায়? কিছুজন এমনকি এইপ্রকার এক ঈশ্বরের প্রজ্ঞা সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। তারা প্রশ্ন করে যদি পরিশেষে তাদের সবাইকে যে কোন প্রকারে স্বর্গেই বসবাস করতে হয় তাহলে কেন এক প্রজ্ঞাবান ঈশ্বর এই সমস্ত প্রাণীদের পৃথিবীতে নিয়ে আসেন? এর অর্থ কি এই নয় যে প্রকৃতপক্ষেই এই পৃথিবীর সৃষ্টি এক অস্বাভাবিক অপচয় ছিল?—তুলনা করুন দ্বিতীয় বিবরণ ৩২:৪; গীতসংহিতা ১০৩:৮; যিশাইয় ৪৫:১৮; ১ যোহন ৪:৮.
তাহলে, স্পষ্টতই মানব প্রাণের অমরত্ব সম্বন্ধীয় মতবাদ তা যে কোন ভাবেই সেই মতবাদকে শিখিয়ে থাকা হোক না কেন, বিভ্রান্তিজনক প্রশ্নগুলির উৎপত্তি ঘটায় এমনকি অসঙ্গতি সৃষ্টি করে থাকে। কেন? সমস্যার অধিকাংশই এই শিক্ষার উৎস থেকে শুরু হয়। আপনি হয়ত সংক্ষিপ্তভাবে এই উৎসগুলিকে অনুসন্ধান করাকে আলোকপ্রাপ্তি বলে মনে করতে পারেন; আর আপনি হয়ত বাইবেল স্বয়ং প্রাণ সম্বন্ধে যা বলে তা জেনে চমৎকৃত হবেন। জগতের ধর্মগুলি সাধারণত যা শিখিয়ে থাকে তার পরিবর্তে এটি মৃত্যুর পর জীবনের জন্য আরও অধিক উত্তম এক আশা প্রদান করে থাকে।