যেভাবে আপনার দান ব্যবহার করা হয়
পরিবেশবান্ধব সমাধান ব্যবহার করে ভাই-বোনদের ও সেইসঙ্গে পৃথিবীর উপকার করা
এপ্রিল ১, ২০২৫
এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আর এর জন্য মানুষই দায়ী। কিন্তু, যিহোবার সাক্ষি হিসেবে আমরা জানি, যিহোবা ঈশ্বর খুব শীঘ্রই সেই মানুষদের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য পদক্ষেপ নেবেন। (প্রকাশিত বাক্য ১১:১৮) তবে, সেই দিন না আসা পর্যন্ত এই পৃথিবীর যত্ন নেওয়ার জন্য আমাদের পক্ষে যতটা করা সম্ভব, আমরা তা করি। এর একটা উদাহরণ হল, আমরা পরিবেশবান্ধব সমাধান (গ্রিন সলিউশন) ব্যবহার করে আমাদের বিল্ডিংগুলো ডিজাইন করি।
পরিবেশবান্ধব সমাধান হল এমন এক সমাধান, যেটার লক্ষ্য হল এমনভাবে কাজ করা, যাতে পরিবেশকে যতটা সম্ভব ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো যায়। কোন কোন পরিবেশবান্ধব প্রকল্প আমরা ইতিমধ্যেই শেষ করেছি? আর এটা কীভাবে দান হিসেবে পাওয়া অর্থকে ভালোভাবে ব্যবহার করতে আমাদের সাহায্য করেছে?
একটা সম্মেলন হল ঠাণ্ডা রাখার পরিবেশবান্ধব সমাধান
মোজাম্বিকের মাটোলা সম্মেলন হল যখন তৈরি করা হয়, তখন এর চারপাশ খোলা রাখা হয় এবং উপরে টিনের ছাদ দেওয়া হয়। দিনের বেলায় টিনের এই ছাদ থেকে প্রচণ্ড গরম নামত। স্থানীয় একজন ভাই বলেন: “গরমে আমরা সবাই ঘেমে যেতাম! প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাই-বোনেরা দ্রুত হলের বাইরে চলে যেত, যাতে তারা খোলা বাতাসে শ্বাস নিয়ে একটু স্বস্তি পেতে পারে।” ভাই-বোনেরা যাতে এই হলের ভিতরে বসে মন দিয়ে সম্মেলনের বিষয়বস্তু শুনতে পারে, সেইজন্য আমরা কোন ব্যবস্থা করি?
আমরা একটা পরিবেশবান্ধব সমাধান ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিই। সমাধানটা হল সেই বিল্ডিংয়ে বাতাসচালিত ফ্যান এবং ইনসুলেশন অর্থাৎ ছাদে তাপনিরোধক স্তর লাগানো। ইনসুলেশন লাগানো হলে বিল্ডিংয়ের ভিতরে সূর্যের তাপ খুবই কম পৌঁছাবে আর ফ্যানগুলোর কারণে হলের ভিতরে সবসময়ই বাতাস চলাচল করবে। এই ফ্যানগুলো চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। এগুলো বাতাসে চলে। কীভাবে? বাতাস ঠাণ্ডা থেকে গরমের দিকে প্রবাহিত হয় আর এই ফ্যানগুলো বাতাসের এই স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবহার করে হলের ভিতরের গরম বাতাস বাইরে বের করে দেয়। এইরকম একটা ফ্যানের দাম প্রায় ৫০ ডলার।a
মাটোলা সম্মেলন হলে সারিবদ্ধ বাতাসচালিত ফ্যান
এই সমাধান ব্যবহার করার ফলে এই সম্মেলন হলের ভিতরে বাতাসের গুণগত মান খুব উন্নত হয়। যেহেতু হলের ভিতরে বাতাস আর বদ্ধ থাকে না, তাই হলের ভিতরের আর্দ্রতা স্বাভাবিক থাকে আর হলটা আগের মতো স্যাঁতস্যাঁতে হয় না। এ ছাড়া, সবসময় বাতাস চলাচল করার কারণে হলের ভিতরে অক্সিজেনের প্রবাহ থাকে এবং কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা বেশি বেড়ে যেতে পারে না। এর ফলে, ভাই-বোনেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে না বরং মন দিয়ে এক স্বাস্থ্যকর পরিবেশে সম্মেলন শুনতে পারে। আগে উল্লেখ করা সেই স্থানীয় ভাই বলেন: “এখন আমরা প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হল থেকে বেরিয়ে যাই না। এর পরিবর্তে, আমরা দুপুরের বিরতির সময়ে হলের ভিতরেই থাকি আর বন্ধুদের সঙ্গে কথাবার্তা বলি। এখন এই নতুন ছাদের নীচে বসে মনে হয় যেন আমরা একটা বড়ো গাছের তলায় বসে আছি!”
আমাদের ভাই-বোনেরা এখন তাদের সীমা ও আঞ্চলিক সম্মেলন আরও বেশি করে উপভোগ করতে পারে
প্রাকৃতিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন
পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের যে-বিল্ডিংগুলো রয়েছে, সেগুলোর বেশ কয়েকটাতে আমরা সোলার প্যানেল লাগিয়েছি, যেটা ফটোভোলটাইক সিস্টেম নামে পরিচিত। এই সোলার প্যানেলগুলো সৌরশক্তিকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত করে। এই প্যানেলগুলো লাগানোর ফলে কয়লা, তেল অথবা গ্যাস থেকে তৈরি বিদ্যুতের উপর আমাদের আর বেশি নির্ভর করতে হয় না, যেগুলো পরিবেশ দূষিত করে। তাই, ফটোভোলটাইক সিস্টেম ব্যবহার করে আমরা পরিবেশ দূষণ কম করতে পেরেছি আর আমাদের দানের অর্থকেও বাঁচাতে পেরেছি।
২০২৩ সালে আমরা স্লোভেনিয়া শাখা অফিসে একটা ফটোভোলটাইক সিস্টেম লাগাই। এই শাখা অফিসের ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ এই সিস্টেম থেকে আসে। এই সিস্টেমটা যদি প্রয়োজনের থেকে বেশি বিদ্যুৎ তৈরি করে ফেলে, তা হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ স্থানীয় সরকারকে দেওয়া হয়। এই সিস্টেমটা লাগাতে ৩ লক্ষ ৬০ হাজার ডলার খরচ হয়েছে। তবে, যেহেতু এই শাখা অফিসকে এখন কম বিদ্যুতের বিল দিতে হয়, তাই এই সিস্টেমের পিছনে খরচ করা অর্থ চার বছরেই উঠে আসবে।
স্লোভেনিয়া শাখা অফিস
২০২৪ সালে আমরা শ্রীলঙ্কা শাখা অফিসে ফটোভোলটাইক সিস্টেম এবং একটা বড়ো ব্যাটারি লাগাই। এগুলো লাগাতে প্রায় ৩০ লক্ষ ডলার খরচ হয়েছে আর এই শাখা অফিসের ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ এই সিস্টেম থেকে আসে। এই সিস্টেমের পিছনে খরচ করা অর্থ তিন বছরেই উঠে আসবে। এই একই সালে আমরা নেদারল্যান্ডস শাখা অফিসে ১১ লক্ষ ডলার খরচ করে ফটোভোলটাইক সিস্টেম লাগাই, যেটা এই অফিসের ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ তৈরি করে। আর এই খরচ করা অর্থ ৯ বছরেই উঠে আসবে।
নেদারল্যান্ডস শাখা অফিস
আমরা মেক্সিকোর বিভিন্ন দূরবর্তী অনুবাদ অফিসেও (আরটিও) ফটোভোলটাইক সিস্টেম লাগাই। এর একটা উদাহরণ হল চিহুয়াহুয়াতে অবস্থিত তারাহুমারা (সেন্ট্রাল) আরটিও। শীত কালে সেখানকার তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে নেমে যেতে পারে আর গ্রীষ্ম কালে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে! তবে, বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি হওয়ার আরটিওর ভাই-বোনেরা তাদের হিটার এবং এসি খুব-একটা চালাত না। এই আরটিওতে জোনাথন নামে একজন ভাই কাজ করেন। তিনি বলেন: “আমরা শীত কালে কম্বল ও মোটা চাদর ব্যবহার করতাম এবং গ্রীষ্ম কালে জানালা খুলে রাখতাম।”
২০২৪ সালে আমরা এই আরটিওতে একটা ফটোভোলটাইক সিস্টেম লাগাই আর এর জন্য ২১ হাজার ৪৮০ ডলার খরচ হয়। কিন্তু, খরচ করা এই অর্থ মাত্র ৫ বছরেই উঠে আসবে। এখন আমাদের ভাই-বোনেরা তাদের হিটার এবং এসি যখন ইচ্ছা চালাতে পারে। ভাই জোনাথন বলেন: “এখন আমরা আরও আনন্দের সঙ্গে কাজ করতে পারি এবং কাজে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারি। এর পাশাপাশি আমরা এটা জেনে খুশি যে, আমাদের আরটিও সংগঠনের অর্থকে বিজ্ঞতার সঙ্গে ব্যবহার করছে এবং এমন উপায়ে ব্যবহার করছে, যেটা পরিবেশের জন্যও ভালো।”
তারাহুমারা (সেন্ট্রাল) অনুবাদ দল এখন আরও আনন্দের সঙ্গে কাজ করছে
বৃষ্টির জল ধরে রাখা
আফ্রিকার অনেক কিংডম হলে জলের সুব্যবস্থা নেই। এই কারণে কিছু কিংডম হলের ভাই-বোনদের অনেক কিলোমিটার দূর থেকে জল বয়ে নিয়ে আসতে হয়। অন্যান্য হলে ট্রাকে করে জল দিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু, এটা বেশ দাম দিয়ে কিনতে হয় আর এই ব্যবস্থাটা পরিবেশবান্ধবও নয়।
ভাই-বোনদের জন্য জলের ব্যবস্থা করতে আমরা আফ্রিকার বিভিন্ন কিংডম হলের টিনের চাল বা ছাদের চারিদিকে পাইপ লাগাই আর সেটা একটা বড়ো জলের ট্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত করে দিই, যাতে বৃষ্টির জল ধরে রাখা যায়। একটা কিংডম হলে বৃষ্টির জল যাতে ভালোভাবে ধরে রাখা যায়, সেইজন্য ভাইয়েরা সেই এলাকার আবহাওয়া ভালোভাবে স্টাডি করে আর তারপর সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতিতে সরঞ্জামগুলো লাগায়। একেকটা কিংডম হলে এই সরঞ্জাম লাগাতে ৬০০ থেকে ৩০০০ ডলার পর্যন্ত খরচ হয়। তবে, এটা কিংডম হলের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক কমিয়ে দেয়, কারণ ভাইদের আর টাকাপয়সা দিয়ে জল কিনতে হয় না।
দক্ষিণ আফ্রিকার ফুথাদিত্ঝাবা শহরের একটা কিংডম হলে একটা জলের ট্যাঙ্ক
বৃষ্টির জল ধরে রাখার এই ব্যবস্থা থেকে ভাই-বোনেরা অনেক উপকৃত হয়েছে। বোন নোয়েমিয়া, যিনি মোজাম্বিকে থাকেন, বলেন: “কিংডম হলে জল আনার জন্য আগে আমরা অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে যেতাম। আমরা যখন জল নিয়ে হলে ফিরে আসতাম, তখন খুবই ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পরতাম। আর যেহেতু জল সহজেই পাওয়া যেত না, তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা আমাদের জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু, এখন আমরা প্রত্যেকে নিজেদের হাত ধুতে পারি। আর আমরা কিংডম হলে পৌঁছে বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ি না এবং সবাই ভালোভাবে সভা উপভোগ করতে পারি। আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ!”
ধরে রাখা বৃষ্টির জল ব্যবহার করে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন বোন ও তার ছেলে হাত ধুচ্ছেন
এই পরিবেশবান্ধব সমাধানগুলোর খরচ কীভাবে মেটানো হয়? বিশ্বব্যাপী কাজের জন্য দেওয়া দানের মাধ্যমে। এইরকম দানের অধিকাংশই donate.jw.org-এ পাওয়া বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে দেওয়া হয়। আপনাদের উদারভাবে করা দানের জন্য অনেক ধন্যবাদ!
a এই প্রবন্ধে লেখা সমস্ত ডলারই আমেরিকান ডলারকে বোঝায়।