বাইবেলে লেখা কথাগুলোর মধ্যে কি কোনো অমিল রয়েছে?
বাইবেলের উত্তর
না, এমনটা নয়। বাইবেলে লেখা সমস্ত কথার মধ্যে মিল রয়েছে। এটা ঠিক যে, বাইবেলের কিছু অংশ পড়ার সময় এমনটা মনে হতে পারে যে, একই বিষয়ে বলা কথাগুলোর মধ্যে একটার সঙ্গে আরেকটার মিল নেই। কিন্তু, নীচে দেওয়া কিছু নীতির উপর মনোযোগ দিলে এই বিষয়ে সঠিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে:
কোনো ঘটনার প্রসঙ্গ লক্ষ করুন। যদি আগে ও পরের ঘটনার উপর মনোযোগ না দেওয়া হয়, তা হলে যেকোনো লেখকের লেখা কথাগুলোর ভুল অর্থ দেখা দিতে পারে।
লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে মনে রাখুন। দু-জন চাক্ষুষ সাক্ষি কোনো ঘটনার বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারে। তবে, তারা একই শব্দ বা একই খুঁটিনাটি তথ্য নাও ব্যবহার করতে পারে।
ঐতিহাসিক সত্য এবং রীতিনীতির বিষয়ও বিবেচনা করে দেখুন।
মনে রাখবেন, একটা শব্দকে দু-ভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন প্রথমত, সেটার আক্ষরিক অর্থ বোঝানোর জন্য আর দ্বিতীয়ত সেটার রূপক অর্থ বোঝানোর জন্য।
মনে রাখবেন যে, কোনো কাজ একজন ব্যক্তি নাও করতে পারেন, তারপরও সেই কাজের জন্য তাকে প্রশংসা করা যেতে পারে।a
সঠিকভাবে অনুবাদ করা হয়েছে এমন বাইবেল পড়ুন।
কোনো ভুল বা জনপ্রিয় ধর্মীয় শিক্ষাকে বাইবেলের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করবেন না।
নীচে দেওয়া উদাহরণগুলো দেখায়, এই নীতিগুলো ব্যবহার করে কীভাবে সেই বিষয়গুলো বোঝা যায়, যেগুলো পড়ে মনে হতে পারে, এগুলোর মধ্যে কোনো মিল নেই।
প্রথম নীতি: আগে ও পরে দেওয়া ঘটনা
বাইবেলের আদিপুস্তক বই সৃষ্টির বিষয়ে বলে যে, ঈশ্বর “সেই সপ্তম দিনে আপনার কৃত সমস্ত কার্য্য হইতে বিশ্রাম করিলেন।” (আদিপুস্তক ২:২-৪) কিন্তু, এই বিবরণে দেওয়া আগে ও পরের ঘটনা পড়ে বোঝা যায় যে, এই কাজ বলতে পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সৃষ্টির কাজকে বোঝানো হয়েছে। যিশু যখন বলেছিলেন যে, ঈশ্বর “এখনও কাজ করছেন,” তখন তিনি আদিপুস্তক বইয়ে লেখা বিষয়কে ভুল বলে প্রমাণিত করছিলেন না। (যোহন ৫:১৭) তিনি ঈশ্বরের করা অন্যান্য কাজের বিষয়ে বলছিলেন, যেমন বাইবেল লেখানো, মানুষকে নির্দেশনা দেওয়া এবং তাদের যত্ন নেওয়া।—গীতসংহিতা ২০:৬; ১০৫:৫; ২ পিতর ১:২১.
দ্বিতীয় ও তৃতীয় নীতি: দৃষ্টিভঙ্গি এবং ঐতিহাসিক সত্য
লূক বই জানায় যে, যিশু “যিরীহোর কাছাকাছি” আসার পর একজন অন্ধ ব্যক্তিকে সুস্থ করেছিলেন। কিন্তু, মথি বই এই বিষয় বলে যে, যিশু শুধুমাত্র একজন নয় বরং দু-জন অন্ধ ব্যক্তিকে সুস্থ করেছিলেন। আর এটা তখন করেছিলেন, যখন তিনি “যিরীহো থেকে চলে যাচ্ছিলেন।” (লূক ১৮:৩৫-৪৩; মথি ২০:২৯-৩৪) এই ঘটনাকে দু-জন লেখক নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লিখেছেন, তাই আমরা এই ঘটনার কিছু তথ্য লূক বইয়ে পাই আবার কিছু তথ্য মথি বইয়ে পাই। সেখানে থাকা ব্যক্তির সংখ্যার বিষয়ে মথি একটু বেশি তথ্য দিয়েছিলেন যে, সেখানে দু-জন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু, যিশু যে-ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছিলেন, লূক শুধু তার বিষয়টাই উল্লেখ করেছিলেন। আর যিরীহো নগরের বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা জানতে পেরেছেন যে, সেই সময় যিরীহো নামে দু-টো নগর ছিল, একটা পুরোনো ছিল, যেটাতে যিহুদিরা বাস করত আর অন্যটা নতুন ছিল, যেখানে রোমের লোকেরা বাস করত। এই দুই নগরের মধ্যে দূরত্ব ছিল দেড় কিলোমিটার (১ মাইল)। যিশু যখন এই অলৌকিক কাজ করেছিলেন, তখন তিনি হয়তো এই দুটো নগরের মাঝামাঝি জায়গায় ছিলেন।
চতুর্থ নীতি: আক্ষরিক অর্থ এবং রূপক অর্থ
উপদেশক ১:৪ পদ বলে, “পৃথিবী চিরস্থায়ী।” কিন্তু, বাইবেলে আরেক জায়গায় লেখা আছে: ‘পৃথিবী এবং এর কাজগুলো আগুনে পুড়ে যাবে।’ (২ পিতর ৩:১০, পাদটীকা) এই শাস্ত্রপদগুলো পড়ে মনে হতে পারে যে, এদের মধ্যে কোনো মিল নেই। কিন্তু, বাইবেলে “পৃথিবী” শব্দকে দুই অর্থে বোঝানো হয়েছে। একটা হল আক্ষরিক অর্থ অর্থাৎ আমাদের গ্রহ এবং আরেকটা হল রূপক অর্থ অর্থাৎ পৃথিবীর লোকেরা। (আদিপুস্তক ১:১; ১১:১) তাই, ২ পিতর ৩:১০ পদে যখন ‘পৃথিবীর’ ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে, তখন এর মানে এই নয় যে, আমাদের গ্রহ আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে, বরং এর মানে হল, ‘ঈশ্বরভক্তিহীন লোকেরা ধ্বংস’ হয়ে যাবে।—২ পিতর ৩:৭.
পঞ্চম নীতি: প্রশংসা
মথি ৮:৫, ৬ পদে লেখা আছে, একজন সেনাপতি যিশুর কাছে এসেছিলেন। আবার লূক ৭:৩ পদে লেখা আছে, সেনাপতি যিশুর কাছে কয়েক জন বয়স্ক যিহুদি নেতাকে পাঠিয়েছিলেন। এটা পড়ে এমনটা মনে হতে পারে, এই দুই শাস্ত্রপদের মধ্যে মিল নেই। কিন্তু বিষয়টা হল, সেনাপতি নিজেই এই বিনতি করেছিলেন, তবে তিনি কয়েক জন বয়স্ক ব্যক্তিকে তার হয়ে যিশুর সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন।
ষষ্ঠ নীতি: সঠিকভাবে অনুবাদ করা বাইবেল
বাইবেল শিক্ষা দেয়, প্রথম মানব আদমের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা সবাই পাপ পেয়েছি। (রোমীয় ৫:১২) কিন্তু, বাইবেলের কিছু অনুবাদে বলা হয়েছে যে, ভালো লোকেরা “পাপ করে না।” (১ যোহন ৩:৬, পবিত্র বাইবেল) ১ যোহন ৩:৬ পদে “পাপ” শব্দটার জন্য যে-গ্রিক ক্রিয়া পদ ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা হল বর্তমান কাল, তাই সেটা ঘটে চলা কোনো কাজকে বোঝায়। কিন্তু, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পাপ থেকে কোনো মানুষই পালাতে পারবে না। এই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পাপ এবং জেনে-বুঝে ক্রমাগত ঈশ্বরের আজ্ঞার অমান্য হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই, কিছু বাইবেলে এই কথাকে এভাবে অনুবাদ করা হয়েছে: “পাপ করে চলে না।”
সপ্তম নীতি: ভুল ধর্মীয় শিক্ষাকে বাইবেলের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করবেন না
একবার যিশু বলেছিলেন, “আমি ও পিতা, আমরা এক।” কিন্তু আরেক জায়গায় তিনি বলেছিলেন, “পিতা আমার চেয়ে মহান।” (যোহন ১০:৩০,পবিত্র বাইবেল; ১৪:২৮) এই শাস্ত্রপদগুলোর সঠিক অর্থ জানার জন্য আমাদের প্রথমে জানতে হবে, বাইবেল যিহোবা ও যিশু সম্বন্ধে কী শিক্ষা দেয়। আমাদের এই শিক্ষার সঙ্গে ত্রিত্বের শিক্ষাকে এক করা উচিত নয় কারণ এই শিক্ষা বাইবেলের উপর ভিত্তি করে নয়। বাইবেল স্পষ্টভাবে জানায়, যিহোবা হলেন যিশুর পিতা আর সেইসঙ্গে তাঁর ঈশ্বর। যিশু তাঁর উপাসনা করেন। (মথি ৪:১০; মার্ক ১৫:৩৪; যোহন ১৭:৩; ২০:১৭; ২ করিন্থীয় ১:৩) এখান থেকে বোঝা যায়, যিশু ঈশ্বরের সমান নন।
যিশু যখন বলেছিলেন, “আমি ও পিতা, আমরা এক,” তখন এই শাস্ত্রপদের আগে ও পরের পদ পড়ে বোঝা যায় যে, যিশু এবং তাঁর পিতা যিহোবার উদ্দেশ্য এক। পরে যিশু বলেছিলেন, “পিতা আমার সঙ্গে একতাবদ্ধ আর আমিও পিতার সঙ্গে একতাবদ্ধ।” (যোহন ১০:৩৮) যিশু তাঁর শিষ্যদের বলেছিলেন, তাদেরও এই একই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এমনকী, যিশু ঈশ্বরের কাছে তাদের বিষয় প্রার্থনা করেছিলেন: “তুমি আমাকে যে-মহিমা দিয়েছ, তা আমি তাদের দিয়েছি, যেন তারা পরস্পর একতাবদ্ধ হয়, ঠিক যেমন আমরা পরস্পর একতাবদ্ধ। আমি তাদের সঙ্গে একতাবদ্ধ রয়েছি এবং তুমি আমার সঙ্গে একতাবদ্ধ রয়েছ।”—যোহন ১৭:২২, ২৩.
a উদাহরণ স্বরূপ, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা-র একটা প্রবন্ধ তাজমহলের বিষয়ে বলে, “এটা মুঘল সম্রাট শাহজাহান তৈরি করেছেন।” কিন্তু, এটার মানে এই নয় যে, তিনি নিজে তা তৈরি করেছেন। এই প্রবন্ধ জানায় যে, “তাজমহল তৈরি করতে ২০,০০০-রেরও বেশি শ্রমিককে রাখা হয়েছিল।”