ধর্ম—এটা কি টাকাপয়সা ইনকাম করার একটা উপায়?
আপনি কি লক্ষ করেছেন, বেশিরভাগ ধর্ম লোকদের সঠিক পথ দেখানোর পরিবর্তে টাকাপয়সা ইনকাম করার উপর মনোযোগ দিচ্ছে? তারা ধর্মীয় সভা করে, বিভিন্ন বিষয়ে বিজ্ঞাপন দেয় আর সেগুলো বিক্রি করে। বেশিরভাগ ধর্মগুরুই মোটা অঙ্কের বেতন পায় আর তারা আরাম-আয়েশের জীবন কাটায়। আসুন, কিছু উদাহরণ লক্ষ করি:
একটা রিসার্চ থেকে জানা গিয়েছে যে, একজন ক্যাথলিক বিশপ ১৩ বছর ধরে চার্চের পয়সা দিয়ে প্রায় ১৫০ বার প্রাইভেট জেট আর প্রায় ২০০ বার লিমোসিন অর্থাৎ সবচেয়ে বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া, চার্চ তাকে থাকার জন্য যে-বাড়ি দিয়েছিল, সেটাকে মেরামত করার জন্য তিনি চার্চের ৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থাৎ ৪০ কোটিরও বেশি টাকা খরচ করেছেন।
আফ্রিকার একটা দেশে একজন পাদরি সবসময় বড়ো বড়ো প্রার্থনা সভা রাখে আর সেখানে হাজার হাজার লোক আসে। তার চার্চটা খুবই বড়ো আর সেখানে সমস্ত কিছু কেনা-বেচা হয়, যেমন “আলৌকিক তেল” থেকে শুরু করে ভালো ভালো ব্র্যান্ডের তোয়ালে ও টি-শার্ট। তার প্রার্থনা সভায় আসা বেশিরভাগ লোকই গরিব, কিন্তু সেই পাদরি খুবই আরাম-আয়েশে দিন কাটায়।
চিন দেশে বৌদ্ধ ধর্মের চারটে পর্বত রয়েছে আর সেগুলোর মধ্যে দুটো পর্বতকে বড়ো বড়ো কোম্পানির মধ্যে ধরা হয়। সেখানকার পরিচিত শাওলিন মঠ বিভিন্ন ধরনের ব্যাবসা চালায়। সেখানকার ভিক্ষুকে “সি.ই.ও ভিক্ষু” বলা হয়।
আমেরিকার বড়ো বড়ো কোম্পানি এখন ধার্মিক পরামর্শদাতাদের ভাড়া করে, যাতে তারা নতুন নতুন ধর্মীয় রীতিনীতি শুরু করে আর তাদের কর্মচারীদের ধর্মীয় বিষয়ে পরামর্শ দেয়।
ধর্ম যে একটা ব্যাবসায় পরিণত হয়ে গিয়েছে, এটা দেখে আপনার কেমন লাগে? আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন যে, ঈশ্বর তাদের কেমন চোখে দেখেন, যারা ধর্মের নামে লোকদের কাছ থেকে টাকাপয়সা লুট করে?
ধর্ম যে একটা ব্যাবসায় পরিণত হয়ে গিয়েছে, এটা দেখে ঈশ্বরের কেমন লাগে?
ঈশ্বর এটা কখনোই পছন্দ করেন না। বাইবেল বলে, ঈশ্বর অতীতে কিছু লোকের উপর খুব রেগে গিয়েছিলেন, যারা লোকদের কাছ থেকে “বেতন লইয়া” তাঁর সম্বন্ধে শিক্ষা দিত। (মীখা ৩:১১) আর কিছু লোভী ব্যক্তি যখন ঈশ্বরের মন্দিরে ব্যাবসা করতে শুরু করেছিল এবং সেটাকে “ডাকাতদের গুহা” বানিয়ে দিয়েছিল, তখন ঈশ্বর বলেছিলেন যে, এটা অনেক খারাপ এক কাজ।—যিরমিয় ৭:১১.
ঈশ্বরের মতো যিশুও সেই লোকদের পছন্দ করতেন না, যারা ধর্মের নামে লোকদের কাছ থেকে টাকাপয়সা লুট করত। তাঁর দিনে ধর্মগুরুরাই জেরুসালেম মন্দিরে ব্যবসায়ীদের ব্যাবসা করার অনুমতি দিয়েছিল আর এর পরিবর্তে তারা সেই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা পেত। মন্দিরে উপাসনা করার জন্য যারা আসত, তাদের কাছে সেই ব্যবসায়ীরা চড়া দামে জিনিসপত্র বিক্রি করত আর এভাবে তাদের কাছ থেকে টাকাপয়সা লুট করত। যিশু সাহসের সঙ্গে তাদের মন্দির থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন: “আমার পিতার গৃহকে বাণিজ্যের গৃহ করে তুলো না!”—যোহন ২:১৪-১৬.
যিশু যেভাবে লোকদের সেবা করেছিলেন, সেটা থেকেও বোঝা যায় যে, তিনি ঈশ্বরের মতো চিন্তা করতেন। (যোহন ৮:২৮, ২৯) লোকদের ঈশ্বর সম্বন্ধে শেখানোর সময়ে তিনি তাদের কাছ থেকে কোনো টাকাপয়সা নেননি। তিনি অনেক অলৌকিক কাজ করেছিলেন, অসুস্থদের সুস্থ করেছিলেন, খাবারের প্রয়োজন ছিল এমন লোকদের খাবার জুগিয়েছিলেন আর মৃত ব্যক্তিদের পুনরুত্থিত করেছিলেন। তবে, এগুলোর জন্য তিনি কোনোদিন টাকাপয়সা চাননি। তিনি লোকদের সেবা করে ধনসম্পদ অর্জন করতে চাননি। এমনকী তাঁর থাকার মতো নিজের বাড়িও ছিল না।—লূক ৯:৫৮.
প্রথম শতাব্দীর খ্রিস্টানেরা কীভাবে ধর্মকে ব্যাবসাবাণিজ্য থেকে আলাদা রেখেছিল?
যিশু তাঁর শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন যেন তারা ধর্মীয় কাজ করে লোকদের কাছ থেকে টাকাপয়সা না নেয়। তিনি বলেছিলেন: “তোমরা বিনা মূল্যে পেয়েছ, বিনা মূল্যেই দিয়ো।” (মথি ১০:৮) এই শিষ্যেরা পরে গিয়ে খ্রিস্টান হিসেবে পরিচিত হয়েছিল আর তারা যিশুর বলা কথা মেনে চলেছিল। কিছু ঘটনার উপর মনোযোগ দিন:
পিতর নামে যিশুর একজন শিষ্যকে শিমোন নামে একজন ব্যক্তি কিছু টাকা দিয়ে বলেছিলেন যেন পিতর তাকে উঁচু পদ দেন। পিতর সঙ্গেসঙ্গে তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন: “তোমার রৌপ্যমুদ্রা তোমার সঙ্গে বিনষ্ট হোক, কারণ তুমি মনে করছ, ঈশ্বরের দান তুমি টাকা দিয়ে লাভ করতে পার।”—প্রেরিত ৮:১৮-২০.
পৌল নামে একজন খ্রিস্টান দূরদূরান্তে গিয়ে প্রচার করতেন। যদিও তিনি অনেক বছর ধরে খ্রিস্টীয় মণ্ডলীতে সেবা করেছিলেন, কিন্তু তিনি কখনো এর বিনিময় টাকাপয়সা চাননি। পৌল এবং তার সময়কার অন্য খ্রিস্টানেরা “অনেকের মতো ঈশ্বরের বাক্য কেনা-বেচা” করত না। (২ করিন্থীয় ২:১৭) পৌল লিখেছিলেন: “আমরা যখন তোমাদের কাছে ঈশ্বরের সুসমাচার প্রচার করেছিলাম, তখন দিন-রাত কাজ করেছি, যেন আমরা তোমাদের কারো উপর ভারী বোঝা না হই।”—১ থিষলনীকীয় ২:৯.
এটা ঠিক যে, সেই সময়কার খ্রিস্টানদের দূরদূরান্তে গিয়ে প্রচার কাজ করার এবং অন্যদের সাহায্য করার জন্য টাকাপয়সার প্রয়োজন হত। তবে, এরজন্য তারা কখনো লোকদের কাছ থেকে টাকা চায়নি। লোকেরা চাইলে নিজের ইচ্ছায় দান দিতে পারত। কিন্তু, তাদের নীচে দেওয়া বিষয়গুলো মনে রাখতে হত:
২ করিন্থীয় ৮:১২: “হৃদয় থেকে করা দান, ঈশ্বরকে খুশি করে। কারণ ঈশ্বর চান, একজন ব্যক্তি যেন তার যা রয়েছে, সেই অনুসারে দান করে, যা নেই, সেই অনুসারে নয়।”
এর অর্থ: একজন ব্যক্তি কত দান দিচ্ছেন, এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হল, তিনি হৃদয় থেকে দিচ্ছেন কি না।
২ করিন্থীয় ৯:৭: “প্রত্যেকে মনে মনে যা ঠিক করে রেখেছে, সেই অনুযায়ী দান করুক, মনে দুঃখ নিয়ে কিংবা দিতে হবে বলে না দিক। কারণ ঈশ্বর সেই ব্যক্তিকেই ভালোবাসেন, যে খুশিমনে দান করে।”
এর অর্থ: ঈশ্বর কাউকে দান দেওয়ার জন্য জোর করেন না। কেউ যখন স্বেচ্ছায় দান দেয়, তখন ঈশ্বর অনেক খুশি হন।
খুব শীঘ্রই এই লোভী ধর্মগুলোর কী হবে?
বাইবেল স্পষ্টভাবে জানায়, ঈশ্বর সমস্ত ধর্মকে অনুমোদন করেন না। (মথি ৭:২১-২৩) বাইবেলে সমস্ত মিথ্যা ধর্মকে এক বেশ্যার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তারা টাকাপয়সা অর্জন করার জন্য এবং নিজেদের কাজ হাসিল করার জন্য সরকারগুলোর সঙ্গে হাত মেলায় আর বিভিন্ন দেশের লোকদের কাছ থেকে টাকাপয়সা লুট করে। (প্রকাশিত বাক্য ১৭:১-৩; ১৮:৩) বাইবেলে লেখা আছে, ঈশ্বর খুব শীঘ্রই সমস্ত মিথ্যা ধর্মকে ধ্বংস করে দেবেন।—প্রকাশিত বাক্য ১৭:১৫-১৭; ১৮:৭.
বর্তমানে ঈশ্বর চান না যেন লোকেরা মিথ্যা ধর্মের কারণে ভ্রান্ত হয় অথবা তাদের কাজগুলোর কারণে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যায়। (মথি ২৪:১১, ১২) ঈশ্বর চান যেন সৎহৃদয়ের ব্যক্তিরা কীভাবে সঠিক উপায়ে তাঁকে উপাসনা করতে হয়, তা জানতে পারে এবং মিথ্যা ধর্ম থেকে পালিয়ে আসে।—২ করিন্থীয় ৬:১৬, ১৭.