বাবামা আমাদের ঈশ্বরকে ভালবাসতে শিখিয়েছিলেন
এলিজাবেথ ট্র্যাসি দ্বারা কথিত
যে সশস্ত্র লোকেরা সকাল বেলায় আমাদের পিছনে গুণ্ডাদলকে লাগিয়ে দিয়েছিল তারা এখন জোর করে মা ও বাবাকে গাড়ি থেকে বের করে দেয়। আমার দিদি আর আমাকে গাড়ির পিছনের আসনে ফেলে রেখে তারা চলে যায়, আমরা ভয়ে ভয়ে ভাবছিলাম যে আমরা আর কখনও আমাদের বাবামাকে দেখতে পাব কি না। ১৯৪১ সালে আমেরিকার আলাবামার সেলমা শহরে কী জন্য এই ভয়াবহ ঘটনাটা ঘটেছিল? আর আমাদের বাবামা আমাদের যা শিখিয়েছিলেন তার সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কী ছিল?
আমার ঠাকুরদা ঠাকুরমা যখন মারা যান তখন আমার বাবা ডিউই ফাউনটেইন খুবই ছোট ছিলেন। তাই বাবা টেক্সাসে আমার পিসি পিসেমশাইয়ের খামার বাড়িতে মানুষ হয়েছিলেন। পরে বাবা তেলের ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য চলে যান। ১৯২২ সালে, ২৩ বছর বয়সে বাবা টেক্সাসের একজন সুন্দরী তরুণী উইনিকে বিয়ে করেন আর সেখানেই স্থায়ীভাবে থাকার ও পরিবার গড়ে তোলার জন্য নানারকম পরিকল্পনা করতে শুরু করেন।
পূর্ব টেক্সাসের কাঠ-খড়ি অঞ্চলের ছোট্ট শহর গ্যারিসনে বাবা একটা সুন্দর বাড়ি তৈরি করেন। আর সেখানেই তিনি নানারকম শস্য চাষ করতেন, যার মধ্যে তুলা ও ভুট্টাও ছিল। এছাড়াও বাবা সবধরনের গৃহপালিত পশুপাখি পুষতেন। এরপর, আমরা তাদের কোলে আসি অর্থাৎ ১৯২৪ সালের মে মাসে ডিউই জুনিয়ের জন্ম হয়, ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এডউইনা আর এর পর ১৯২৯ সালের জুন মাসে আমি হই।
বাইবেল সত্য শেখা
চার্চ অফ ক্রাইস্টের সদস্য হওয়ায় আমার বাবামা ভাবতেন যে তারা বাইবেলের সবকিছু জানেন। কিন্তু ১৯৩২ সালে আমার জ্যাঠামশাই মনরো ফাউনটেইনের কাছে জি. ডাব্লু. কুক নামে একজন ভদ্রলোক আসেন এবং ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির প্রকাশিত মুক্তি (ইংরেজি) ও সরকার (ইংরেজি) বই দুটো দিয়ে যান। মনরো জ্যাঠামশাই যা কিছুই শিখছিলেন সেগুলো আমার বাবামাকে বলার জন্য সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন আর তাই তিনি প্রায় সকালেই নাস্তার সময়ে আসতেন এবং প্রহরীদুর্গ থেকে একটা দুটো প্রবন্ধ পড়তেন তারপর ইচ্ছা করেই “ভুলবশত” পত্রিকাটা ফেলে যেতেন যাতে পরে বাবামা সেটা পড়তে পারেন।
এক রবিবার সকালে জ্যাঠামশাই এক বাইবেল অধ্যয়নে যোগ দেওয়ার জন্য বাবাকে একজন প্রতিবেশীর বাসায় আসতে বলেন। তিনি বাবাকে বলেন যে মি. কুক বাইবেল থেকে তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। অধ্যয়ন থেকে ফিরে এসে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাবা আমাদের বলেছিলেন: “আজ আমি আমার সব প্রশ্নের উত্তর তো পেয়েছিই তার ওপর আবার আরও অনেক কিছু জেনেছি! আমি ভেবেছিলাম যে আমি বুঝি সবকিছু জানি কিন্তু নরক, আত্মা, পৃথিবী সম্বন্ধে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য ও ঈশ্বরের রাজ্য তা কীভাবে আনবে এই বিষয়গুলো নিয়ে মি. কুক যখন আলোচনা করছিলেন, আমি বুঝতে পারছিলাম যে আসলে বাইবেল সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না!”
আমাদের বাড়িটা ছিল যেন একটা আড্ডাখানা। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের আসা যাওয়ার পালা চলতেই থাকত আর মিষ্টি ও মোয়া তৈরি করা হতো, তারপর গানবাজনা হতো আর মাও পিয়ানো বাজাতেন। কিন্তু আস্তে আস্তে আমরা ওই সময়ে বাইবেলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করি। আমরা ছেলেমেয়েরা যদিও সবকিছু বুঝতে পারতাম না, তবুও ঈশ্বর ও বাইবেলের প্রতি আমাদের বাবামায়ের এত ভালবাসা দেখে আমরা সব ভাইবোনেরা ঈশ্বর ও তাঁর বাক্যকে ওইরকম করেই ভালবাসতে শিখি।
পরে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরাও তাদের ঘরে সপ্তাহে একদিন বাইবেল আলোচনা করতে শুরু করেছিলেন আর সেখানে সাধারণত নতুন নতুন প্রহরীদুর্গ থেকে আমরা আলোচনা করতাম। যখন প্রতিবেশী শহর এপেলবি ও ন্যাকাডোসেজের কোন বাড়িতে সভা হতো তখন বৃষ্টিই পড়ুক বা কাঠফাটা রোদই হোক আমরা আমাদের ফোর্ড গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম।
তারা যা শিখেছিলেন সেই মতো কাজ করা
বাবামার বুঝতে খুব বেশি সময় লাগেনি যে তাদের কিছু কাজ করা দরকার। ঈশ্বরকে ভালবাসতে হলে একজন যা কিছু শেখেন তা অন্যদের জানানো দরকার। (প্রেরিত ২০:৩৫) কিন্তু এই কাজ করা অর্থাৎ ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার করা ছিল একটা কঠিন ব্যাপার আর বিশেষ করে আমাদের বাবামার জন্য এটা আরও বেশি কঠিন ছিল কারণ তারা ছিলেন লাজুক ও নম্র প্রকৃতির লোক। তবুও, ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা তাদের এতখানিই শক্তি জুগিয়েছিল যে তারা আমাদেরও যিহোবাতে পুরোপুরি আস্থা রাখতে শিখিয়েছিলেন। এই কথাগুলোই বাবা এইভাবে বলেছিলেন: “মটর চাষীকে যিহোবা সুসমাচার প্রচারক করে তুলছেন!” এর পর পরই বাবামা নিজেদেরকে যিহোবার কাছে উৎসর্গ করেন ও সবার সামনে তা দেখানোর জন্য ১৯৩৩ সালে টেক্সাস, হেন্ডারসনের কাছাকাছি একটা পুকুরে বাপ্তিস্ম নেন।
১৯৩৫ সালের গোড়ার দিকে, বাবা অনন্ত জীবন সম্বন্ধে খ্রীষ্টানদের আশার বিষয়ে অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটিকে চিঠি লিখেছিলেন। (যোহন ১৪:২; ২ তীমথিয় ২:১১, ১২; প্রকাশিত বাক্য ১৪:১, ৩; ২০:৬) উত্তরে বাবা সোসাইটির তখনকার প্রেসিডেন্ট, জোসেফ এফ. রাদারফোর্ডের কাছ থেকে সরাসরি চিঠি পেয়েছিলেন। ভাই রাদারফোর্ড বাবাকে তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মে মাসে ওয়াসিংটন ডি.সি. শহরে যিহোবার সাক্ষিদের সম্মেলনে আসতে বলেছিলেন।
বাবা ভেবেছিলেন, ‘এ তো অসম্ভব ব্যাপার! ৬৫ একর জমিতে শাকসবজি চাষ করা হয়েছিল। সবকিছু তখন কাটতে হবে আর হাটে-বাজারে নিয়ে যেতে হবে।’ কিন্তু, বাবার এইসমস্ত ওজর দূর হয়ে যায় কারণ অল্প কিছুদিন পরেই এক বন্যায় সব ফসল, বেড়া-বাঁধ, সাঁকো সবকিছু ভেসে যায়। সুতরাং আমরা অন্যান্য সাক্ষিদের সঙ্গে একটা স্কুলের বাস ভাড়া করে ১,৬০০ কিলোমিটার উত্তরপূর্বাঞ্চলে গিয়ে সম্মেলনে যোগ দিই।
সম্মেলনে “বিরাট জনতা”-কে স্পষ্টভাবে চিনিয়ে দেওয়া হয়েছিল আর বলা হয়েছিল যে “মহাক্লেশের” মধ্যে থেকে তারা রক্ষা পাবে। এই সবকিছু শুনে বাবামা শিহরিত হয়েছিলেন। (প্রকাশিত বাক্য ৭:৯, ১৪, কিং জেমস্ ভারসন্) পরমদেশ পৃথিবীতে অনন্ত জীবনের আশা বাবামাকে সারা জীবন ধরে শক্তি জুগিয়েছিল আর তারা আমাদেরও “প্রকৃতরূপে জীবন, . . . ধরিয়া রাখিতে” শিখিয়েছিলেন, আমাদের কাছে যার মানে ছিল পৃথিবীতে চিরকাল বেঁচে থাকা যা যিহোবা ঈশ্বর আমাদের দেবেন। (১ তীমথিয় ৬:১৯; গীতসংহিতা ৩৭:২৯; প্রকাশিত বাক্য ২১:৩, ৪) সেইসময় আমার বয়স যদিও মাত্র পাঁচ বছর ছিল, তবুও সেই সম্মেলনে বাড়ির সবার সঙ্গে আমিও খুব আনন্দ করেছিলাম।
সম্মেলন থেকে ফিরে আসার পর, আমরা আবার ফসল লাগাই আর ওইবার এত বেশি ফসল হয়েছিল যা আগে কখনও হয়নি। এই ব্যাপারটায় বাবামা আরও নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে যিহোবার ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখলে তা কখনও বিফলে যাবে না। তারা এক বিশেষ ধরনের প্রচার কাজে লেগে পড়েন যেজন্য তাদের মাসে ৫২ ঘন্টা করে প্রচার করতে হয়েছিল। আর তারপরের বছর ফসল লাগানোর সময়ে আমরা আমাদের বাড়িঘর, জায়গাজমি সবকিছু বিক্রি করে দিই! বাবার ৬ মিটার লম্বা ও ২.৪ মিটার চওড়া একটা ট্রেইলার ছিল, তিনি সেটার মধ্যে আমাদের পাঁচজনের থাকার মতো ঘর বানান এবং সেটাকে চালানোর জন্য দুটো দরজাওয়ালা একেবারে নতুন ফোর্ড সিডন গাড়ি কিনে আনেন। আমাদের জ্যাঠামশাইও আমাদের মতোই করেছিলেন আর তিনিও তার পরিবারকে নিয়ে একটা ট্রেইলারের মধ্যে থাকতে শুরু করেন।
আমাদের সত্য শেখানো
১৯৩৬ সালের অক্টোবর মাসে বাবামা অগ্রগামীর কাজ করতে শুরু করেন যাকে এখন পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যা বলা হয়। এইভাবে আমরা ঘরের সবাই পূর্ব টেক্সাসের কাউন্টিজে প্রচার করতে শুরু করি। এর আগে হয়তো কেউই কখনও সেখানে গিয়ে রাজ্যের বার্তা শোনাননি। এরপর প্রায় এক বছর ধরে আমরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে গিয়ে প্রচার করেছি আর এইভাবে জীবন কাটানোকে আমরা সত্যিই উপভোগ করেছিলাম। বাবামা সবসময় তাদের কথা ও উদাহরণ দিয়ে আমাদের প্রাথমিক খ্রীষ্টানদের মতো হতে শিখিয়েছিলেন যারা বাইবেলের সত্য অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাদের নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
আমাদের মা তার বাড়িঘর বিক্রি করতে দিয়ে যে অসাধারণ আত্মত্যাগ করেছিলেন আমরা তা দেখেছিলাম। কিন্তু একটা জিনিস মা কোনভাবে হাত ছাড়া করেননি, সেটা ছিল তার সেলাই মেশিন। আর এর থেকেও স্পষ্ট হয়েছিল যে মা বুদ্ধিমতী স্ত্রী। সেলাইয়ে নিপুণ হওয়ায় মা আমাদেরকে তার সাধ্যমতো সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড় সেলাই করে দিতেন। আর প্রত্যেকটা সম্মেলনে আমরা চোখ জুড়ানো নতুন নতুন জামা-কাপড় পেতাম।
আজও আমার খুব ভাল মনে আছে যে হারম্যান জি. হেন্সেল তার পরিবার সমেত আমাদের অঞ্চলে এসেছিলেন আর তিনি ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির একটা ট্রাক নিয়ে এসেছিলেন যাতে সাউন্ড সিস্টেম ছিল। তিনি ট্রাকটাকে একটা ভীড় জায়গায় রাখতেন আর রেকর্ড করা একটা ছোট বক্তৃতা বাজিয়ে শোনাতেন এরপর তারা নিজেরা লোকেদের কাছে গিয়ে আরও তথ্যাদি জানাতেন। ডিউই জুনিয়র ও ভাই হারম্যানের ছেলে মিলটন যার বয়স তখন ছিল পনের-ষোল বছর, দুজনে খুব ভাল বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। আজকে সেই মিলটন হলেন ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির প্রেসিডেন্ট।
১৯৩৭ সালে কলম্বাস ওহাইওর যে সম্মেলনে এডউইনা বাপ্তিস্ম নিয়েছিল সেই সম্মেলনেই বাবামাকে বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে কাজ করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল। সেই সময়ে এই কাজ করতে হলে প্রত্যেক মাসে কম পক্ষে ২০০ ঘন্টা করে প্রচার করতে হতো। আমি যখন পুরনো কথা মনে করি, আমি বুঝি যে মায়ের উদাহরণ থেকে আমি কত কিছু শিখেছি আর তাই আজকে আমি আমার স্বামীকে সাহায্য করতে পারি যাতে সে তার খ্রীষ্টীয় দায়িত্বগুলো ভালভাবে পালন করতে পারে।
যখনই বাবা বাইবেল অধ্যয়ন করানোর জন্য কারোর বাড়ি যেতেন আমাদের ভাইবোনদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। বাবা আমাদেরকে দিয়ে বাইবেলের কিছু পদ পড়াতেন আর সেইসঙ্গে কিছু সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে বলতেন। এইভাবে বাবা আমাদের ভাল উদাহরণ অন্য ছেলেমেয়েদের দেখাতেন আর এর ফলে অনেক ছেলেমেয়েরা যাদের সঙ্গে আমরা সেই সময় অধ্যয়ন করেছিলাম আজকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে যিহোবার সেবা করে চলেছে। সত্যিই, আমাদের জন্য এক মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছিল যার জন্য আমরা সবসময় ঈশ্বরকে ভালবাসতে পেরেছি।
বড় হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাদার ওই ছোট্ট ঘরে আমাদের দুই বোনের সঙ্গে থাকতে অসুবিধা হতো। তাই ১৯৪০ সালে সে আলাদা থাকবে বলে ঠিক করে ও একজন সাক্ষি ভাইয়ের সঙ্গে থেকে অগ্রগামীর কাজ শুরু করে। এর পরেই দাদা অড্রি ব্যারনকে বিয়ে করে। আর অড্রিও আমাদের বাবামার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিল আর তাই সে বাবামাকে খুব ভালবেসে ফেলেছিল। পরে ১৯৪৪ সালে যখন দাদাকে তার খ্রীষ্টীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কারণে জেলে যেতে হয় তখন অড্রি বেশ কিছু সময় ধরে আমাদের সঙ্গে ওই ছোট্ট ট্রেইলারে থাকার জন্য চলে আসে।
১৯৪১ সালে সেন্ট লুইস মিসৌরিতে এক বিশাল সম্মেলন হয়েছিল, সেখানে পাঁচ থেকে আঠারো বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের সামনের এক বিশেষ সারিতে বসতে বলা হয়েছিল আর ভাই রাদারফোর্ড তাদের উদ্দেশে সরাসরি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এডউইনা আর আমি তার শান্ত ও স্পষ্ট কণ্ঠস্বর শুনেছিলাম; তিনি এত মিষ্টি করে কথা বলছিলেন যে মনে হচ্ছিল যেন একজন বাবা তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলছেন। বাবামায়েদের উৎসাহ দিয়ে তিনি বলেছিলেন: “আজকে খ্রীষ্ট যীশু তাঁর চুক্তির লোকেদের তাঁর সামনে একত্র করেছেন আর খুব জোরালোভাবে তিনি তাদের বলছেন যে তারা যেন তাদের সন্তানদেরকে সত্যের পথে চলতে শেখান।” এরপর তিনি বলেন: “সন্তানদের নিজেদের কাছে রাখুন ও সত্য শেখান!” আনন্দের বিষয় যে আমাদের বাবামা ঠিক তাই করেছিলেন!
ওই সম্মেলনে, আমরা একটা নতুন পুস্তিকা পেয়েছিলাম যার নাম ছিল যিহোবার দাসেরা রক্ষা পেয়েছেন (ইংরেজি)। এই পুস্তিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ও অন্যান্য আদালতে যে মামলা-মকদ্দমাগুলোয় যিহোবার সাক্ষিরা জয়ী হয়েছিলেন সেই বিষয়ে লেখা হয়েছিল। বাবা পুস্তিকাটা থেকে আমাদের সঙ্গে অধ্যয়ন করেছিলেন। সেইসময়ে আমরা একেবারেই বুঝতে পারিনি যে কয়েক সপ্তাহ পরেই আমাদের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হবে কিন্তু আলাবামা, সেলমাতে যখন এই ঘটনা ঘটেছিল তখন এই পুস্তিকা থেকে আমরা যা শিখেছিলাম তা আমাদের খুবই সাহায্য করেছিল।
সেলমাতে গুণ্ডাদলের হামলা
সেই ভয়াবহ ঘটনার দিন সকালবেলায় বাবা সেলমার সরকারি কর্মকর্তা, মেয়র ও পুলিশ অফিসারের কাছে গিয়ে গিয়ে একটা করে চিঠি দিয়েছিলেন যাতে লেখা ছিল যে সংবিধান আমাদের প্রচার করার অধিকার দেয় আর আইন আমাদের সমর্থন করে। কিন্তু তারা আমাদেরকে শহর ছাড়া করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল।
ওইদিন সন্ধ্যার দিকে পাঁচজন সশস্ত্র লোক আমাদের ট্রেইলারের মধ্যে ঢুকে পড়ে আর আমাকে, মাকে ও দিদিকে তারা নড়তে পর্যন্ত দেয়নি। তারা আমাদের ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেছিল যেন তারা ধ্বংসাত্মক কিছু জিনিস খুঁজছে। বাবা বাইরে ছিলেন, তারা বাবার ওপর পিস্তল ধরে বাবাকে আমাদের ট্রেইলারটাকে তাদের গাড়ির সঙ্গে আটকানোর হুকুম দিয়েছিল। আমি কিন্তু একেবারেই ভয় পাইনি। এই লোকেরা মনে করেছিল যে আমরা বুঝি বিপদজনক লোক তা ভেবে আমার খুব মজা লাগছিল আর তাই আমি ও দিদি ফিকফিক করে হেসে দিয়েছিলাম। কিন্তু বাবার দিকে এক ঝলক তাকিয়েই আমরা আবার তাড়াতাড়ি গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলাম।
আমরা যাওয়ার জন্য তৈরি হলে ওই লোকগুলো চেয়েছিল যে এডউইনা ও আমি যেন তাদের সঙ্গে তাদেরই গাড়িতে উঠি। তখন বাবা দৃঢ়কণ্ঠে কথা বলেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “আমি জীবিত থাকতে নয়!” কিছুক্ষণ আলোচনা করার পর আমাদের ঘরের সবাইকে একসঙ্গে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তবে ওই সশস্ত্র লোকগুলো তাদের গাড়ি নিয়ে আমাদের পিছন পিছন আসছিল। শহর থেকে বেরিয়ে প্রায় ২৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর তারা আমাদেরকে বড় রাস্তার পাশে থামার জন্য ইশারা করেছিল আর মা ও বাবাকে গাড়ির ভিতর থেকে ঠেলে বের করে দিয়েছিল। ওই লোকগুলো বাবামাকে বার বার বলেছিল: “এই ধর্ম ছেড়ে দিন। আবার চাষবাষ করুন আর মেয়েদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করে গড়ে দিন!” বাবা তাদেরকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
শেষে, তাদের একজন বলেছিল: “এখান থেকে চলে যান আর যদি কখনও আপনারা এই ডালাস কাউন্টিতে ফিরে আসেন, তাহলে আপনাদের সবাইকে জানে শেষ করে দেব!”
তাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আমরা অনেক ঘন্টা ধরে পথ চলেছিলাম ও তারপর সেই রাতটা কাটানোর জন্য এক জায়গায় থেমেছিলাম। আমরা তাদের গাড়ির নম্বরটা টুকে নিয়েছিলাম। বাবা খুব তাড়াতাড়ি ওই ঘটনার পুরো বৃত্তান্ত ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির কাছে জানিয়েছিলেন এবং কয়েক মাস পর ওই লোকগুলোকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
গিলিয়েড মিশনারি স্কুলের উদ্দেশে
১৯৪৬ সালে নিউ ইয়র্ক, সাউথ ল্যানসিং-এ ওয়াচটাওয়ার বাইবেল স্কুল অফ গিলিয়েডের ৭তম ক্লাসে যোগ দেওয়ার জন্য এডউইনা ডাক পায়। ওই ক্লাসের একজন শিক্ষক এলবার্ট স্রোয়েডার তার প্রাক্তন অগ্রগামী সঙ্গী বিল এলরোডকে এডউইনার ভাল গুণের কথা বলেছিলেন। সেইসময় তিনি যিহোবার সাক্ষিদের প্রধান কার্যালয় নিউ ইয়র্ক, ব্রুকলিন বেথেলে সেবা করছিলেন।a এডউইনার সঙ্গে বিলের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং গিলিয়েড স্কুল থেকে এডউইনা গ্র্যাজুয়েট হওয়ার প্রায় এক বছর পরে তাদের বিয়ে হয়। তারা অনেক বছর পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যা করেন যার মধ্যে পাঁচ বছর তারা বেথেলে ছিলেন। তারপর ১৯৫৯ সালে একদিন ভাই স্রোয়েডার ৩৪তম গিলিয়েড ক্লাসে এসে বলেছিলেন যে তার প্রিয় বন্ধু বিল, যমজ ছেলেমেয়ের অর্থাৎ এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা হয়েছেন।
আমি যখন মিসিসিপি, মেরিডিয়ানে আমার বাবামায়ের সঙ্গে প্রচার কাজ করছিলাম সেইসময় ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে ১১তম গিলিয়েড ক্লাসে যোগ দেওয়ার জন্য আমাদের তিনজনকে ডাকা হয়। আমরা খুব অবাক হয়ে যাই কারণ ক্লাসে যোগ দেওয়ার জন্য আমার বয়স ছিল খুবই কম আর বাবামার বয়স ছিল অনেক বেশি। কিন্তু আমাদেরকে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল আর এইভাবে আমরা বাইবেলের গভীর বিষয়গুলো শেখার আশীর্বাদ পেয়েছিলাম।
বাবামায়ের সঙ্গে মিশনারি কাজ
আমাদের মিশনারি কাজের এলাকা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া। ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আমাদের গ্র্যাজুয়েট হওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আমাদের সেখানে যেতে বলা হয়েছিল। আমরা বোগোটায় একটা মিশনারি হোমে গিয়েছিলাম যেখানে ইতিমধ্যেই আরও তিনজন ছিলেন। প্রথমে, বাবা প্রায় ধরেই নিয়েছিলেন যে তার পক্ষে স্প্যানিশ শেখার চেয়ে লোকেদেরকে ইংরেজি শেখানো আরও বেশি সহজ হবে! আমাদের অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল কিন্তু আমাদের অনেক আশীর্বাদও ছিল! ১৯৪৯ সালে কলম্বিয়ায় তখন একশ জনের চেয়েও কম সাক্ষি ছিলেন আর এখন সেখানে ১,০০,০০০ জনেরও বেশি সাক্ষি আছেন!
পাঁচ বছর ধরে বোগোটায় পরিচর্যা করার পর, মা ও বাবাকে ক্যালি শহরে পাঠানো হয়েছিল। এরই মধ্যে ১৯৫২ সালে, কলম্বিয়াতেই একজন সঙ্গী মিশনারি রবার্ট ট্র্যাসির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়।b আমরা ১৯৮২ সাল পর্যন্ত কলম্বিয়ায় ছিলাম। তারপর আমাদেরকে মেক্সিকোতে পাঠানো হয় যেখানে আমরা আজও কাজ করে চলেছি। শেষে, ১৯৬৮ সালে আমার বাবামাকে চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় ফিরে আসতে হয়েছিল। সুস্থ হওয়ার পর তারা আলাবামা, মোবাইলের কাছাকাছি বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে কাজ করতে থাকেন।
বাবামায়ের দেখাশোনা করা
বছরগুলো কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মা ও বাবা বৃদ্ধ হতে থাকেন আর তাই তাদের আরও বেশি সাহায্য করা ও দেখাশোনা করা দরকার হয়ে পড়ে। কিন্তু বাবামাই অনুরোধ করেছিলেন যে তাদের যেন এথেন্সের আলবামায় যেখানে এডউইনা ও বিল থাকতেন সেখানে অগ্রগামীর কাজ করতে দেওয়া হয়। পরে দাদা ভেবেছিল যে দক্ষিণ ক্যারোলিনায় সবাই কাছাকাছি থাকা ভাল হবে। তাই বিল আর এডউইনা বাবামাকে নিয়ে গ্রিনউডে চলে আসেন। এই ব্যবস্থার জন্যই রবার্ট ও আমি নিশ্চিন্তে কলম্বিয়ায় আমাদের মিশনারি কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম কারণ আমরা জানতাম যে আমাদের বাবামা ভাল আছেন।
এরপর, ১৯৮৫ সালে বাবার স্ট্রোক হয় ফলে বাবা বাক্শক্তি হারিয়ে ফেলেন ও একেবারে বিছানায় পড়ে যান। আমরা সবাই মিলে বসে আলোচনা করেছিলাম যে কীভাবে আমরা সবচেয়ে ভালভাবে আমাদের বাবামার দেখাশোনা করতে পারি। তারপর ঠিক করা হয়েছিল যে বাবাকে পুরোপুরি দেখার ভার অড্রি নেবে আর রবার্ট ও আমি প্রত্যেক সপ্তাহে উৎসাহমূলক চিঠি লিখব ও যতটা সম্ভব ঘন ঘন দেখা করতে আসব।
বাবার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হওয়ার কথা আমার স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করে। বাবা সাধারণত কথা বলতে পারতেন না কিন্তু আমাদেরকে যে আবার মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হচ্ছে তা তাকে বলার পর বাবা অনেক চেষ্টা করে কোনরকমে একটা কথাই বলেছিলেন, “বিদায়!” এই কথাতেই আমরা বুঝে নিয়েছিলাম যে বাবা অন্তর থেকে আমাদের মিশনারি কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছিলেন। ১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে বাবা মারা যান আর তার নয় মাস পরে মা মারা যান।
আমরা তিন ভাইবোনই আমাদের বাবামা সম্বন্ধে যেমন মনে করতাম তা আমার বিধবা দিদি আমাকে যে চিঠি লিখেছিল তাতে লেখা ছিল। সে লিখেছিল “বাবামার কাছ থেকে আমি যে খ্রীষ্টীয় সত্য পেয়েছি তার জন্য আমি সত্যিই গর্বিত। তাই তো একটা মুহূর্তের জন্যেও আমার কখনও মনে হয়নি যে বাবামা যদি আমাদের অন্যভাবে মানুষ করতেন, তাহলে হয়তো আরও ভাল হতো। বাবামার বিশ্বাস, ত্যাগ ও যিহোবার ওপর পূর্ণ আস্থার উদাহরণই আমার জীবনের হতাশাজনক মুহূর্তগুলোকে সামলে নিতে আমায় সাহায্য করে।” এডউইনা এই লিখে শেষ করে: “আমি যিহোবাকে বার বার ধন্যবাদ দিই যে তিনি আমাদের এত ভাল বাবামা দিয়েছিলেন। বাবামা আমাদেরকে তাদের কথা ও কাজ দিয়ে শিখিয়েছিলেন যে আমরাও তাদের মতো সুখী হতে পারি, যদি আমরা সারা জীবন আমাদের প্রেমময় পিতা যিহোবা ঈশ্বরের সেবা করে চলি।”
[পাদটীকাগুলো]
a ১৯৮৮ সালের ১লা মার্চ সংখ্যার প্রহরীদুর্গ (ইংরেজি) এর ১১-১২ পৃষ্ঠা দেখুন।
b ১৯৬০ সালের ১৫ই মার্চ সংখ্যার প্রহরীদুর্গ (ইংরেজি) এর ১৮৯-৯১ পৃষ্ঠা দেখুন।
[২২, ২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]
ফাউনটেইন পরিবার: (বাঁ দিক থেকে ডানে) ডিউই, এডউইনা, উইনি, এলিজাবেথ ও ডিউই জুনিয়র, ডানে: এলিজাবেথ ও ডিউই জুনিয়র হেন্সেলের সাউন্ড ট্রাকের ফেন্ডারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে (১৯৩৭); নিচে ডানে: ষোল বছরের এলিজাবেথ প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে প্রচার করছে