অনন্ত জীবন কি সত্যিই সম্ভব?
“হে গুরু, অনন্ত জীবন পাইবার জন্য আমি কিরূপ সৎকর্ম্ম করিব?”—মথি ১৯:১৬.
১. মানুষের জীবন সম্পর্কে কী বলা যেতে পারে?
সাধারণ কাল পূর্ব ৪৮০ সালে পারস্য রাজ জার্কজেস ১ম, বাইবেলে যিনি অহশ্বেরশ নামে পরিচিত, যুদ্ধে পাঠাবার আগে তার সৈন্যদের পরিদর্শন করছিলেন। (ইষ্টের ১:১, ২) গ্রিক ইতিহাসবেত্তা হেরোডটাস লিখেছিলেন, রাজা তার সৈন্যদের দেখে চোখের জল ফেলেছিলেন। কেন? জার্কজেস বলেছিলেন, ‘মানুষের জীবন কতই না ছোট, এ কথা ভেবে আমার দুঃখ হয়। এই লোকেদের একজনও এখন থেকে একশ বছর পরে আর বেঁচে থাকবে না।’ আপনিও হয়ত দেখেছেন যে জীবন কত ছোট আর কেউই বুড়ো হতে, অসুস্থ হতে বা মরতে চায় না। কতই না ভাল হতো যদি আমরা সবাই তরুণ হয়ে আর ভাল স্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার আনন্দ পেতে পারতাম!—ইয়োব ১৪:১, ২.
২. অনেকেই কী বিশ্বাস করেন আর কেন?
২ নজরে পড়ার মতো বিষয় হল, ১৯৯৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা একটা প্রবন্ধ ছাপিয়েছিল যার শীর্ষক ছিল “তারা বাঁচতে চায়।” এতে একজন গবেষকের কথা উদ্ধৃতি করা হয়েছিল যিনি বলেছিলেন: “আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে আমরাই হব সেই প্রথম প্রজন্ম যারা চিরকাল বেঁচে থাকব”! হয়ত আপনিও বিশ্বাস করেন যে অনন্ত জীবন সম্ভব। আপনি হয়ত এইজন্য বিশ্বাস করেন কারণ বাইবেল প্রতিজ্ঞা করে যে আমরা এই পৃথিবীতে অনন্ত কাল বেঁচে থাকতে পারব। (গীতসংহিতা ৩৭:২৯; প্রকাশিত বাক্য ২১:৩, ৪) তবুও, বাইবেলে পাওয়া কারণগুলো ছাড়াও অন্য কিছু কারণে অনন্ত জীবন সম্ভব বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। এর কয়েকটা আলোচনা করা আমাদেরকে এই বিষয়টা বুঝতে সাহায্য করবে যে অনন্ত জীবন সত্যিই সম্ভব।
চিরকাল বেঁচে থাকার মতো করে তৈরি
৩, ৪. (ক) কেন কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে মানুষের চিরকাল বেঁচে থাকতে পারা উচিত? (খ) দায়ূদ তার রচনা সম্পর্কে কী বলেছিলেন?
৩ অনেক লোকেরা বিশ্বাস করেন যে মানুষের এইজন্য চিরকাল বেঁচে থাকতে পারা উচিত কারণ মানুষকে আশ্চর্যজনকভাবে বানানো হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মায়ের গর্ভে আমাদের রচনা সত্যিই অদ্ভুত। বার্ধক্যের বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ লিখেছিলেন, “মানুষের গর্ভাবস্থার শুরু থেকে আরম্ভ করে জন্ম হওয়া পর্যন্ত আর তারপর যৌবন থেকে শুরু করে পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার জন্য দরকারী বড় বড় অদ্ভুত কাজগুলো করার পর প্রকৃতি ঠিক করেছে যে সে বুড়ো হওয়াকে রোধ করার জন্য আর কোন কাজ করবে না যদিও তা করা অনেক সহজ।” হ্যাঁ, আমাদের শরীরের অদ্ভুত রচনার কথা চিন্তা করলে প্রশ্ন আসে যে, কেন আমাদের মরতে হয়?
৪ হাজার হাজার বছর আগে, বাইবেলের একজন লেখক দায়ূদও এই অদ্ভুত ঘটনাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন, যদিও তিনি আজকের বিজ্ঞানীদের মতো মায়ের গর্ভে কী কী ঘটে তা দেখতে পারেননি। দায়ূদ তার নিজের রচনা নিয়ে হয়ত গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন যখন তিনি লিখেছিলেন “তুমি মাতৃগর্ব্ভে আমাকে বুনিয়াছিলে।” তিনি বলেছিলেন, তখন ‘তাহার মর্ম্ম রচনা করা হইয়াছিল।’ এছাড়াও যখন তিনি বলেছিলেন যে “আমি গোপনে নির্ম্মিত হইতেছিলাম” তখন তিনি তার ‘দেহের’ রচনা সম্পর্কে বলেছিলেন। এরপর দায়ূদ “পিণ্ডাকার” অবস্থার কথা বলেছিলেন আর তার মায়ের গর্ভে থাকা সেই পিণ্ডকার অবস্থা সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন: “সমস্তই লিখিত ছিল।”—গীতসংহিতা ১৩৯:১৩-১৬.
৫. মায়ের গর্ভে আমাদের রচনার সময় কোন্ আশ্চর্যজনক ঘটনাগুলো ঘটে?
৫ এটা পরিষ্কার যে দায়ূদের মায়ের গর্ভে সত্যি করেই এমন কোন হাতে আঁকা নকশা ছিল না যাতে তার রচনা সম্বন্ধে লেখা ছিল। কিন্তু তার “মর্ম্ম,” তার “দেহ” এবং তার দেহের অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিষয়ে দায়ূদ যেভাবে ধ্যান করেছিলেন, তাতে তার মনে হয়েছিল যে এই অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে খুব বুঝেশুনে পরিকল্পনা করে বানানো হয়েছিল যে মনে হয় যেন তার সমস্ত কিছুই “লিখিত ছিল।” এটা এমন ছিল যেন তার মায়ের নিষিক্ত কোষের ভেতরে এমন কোন একটা বই ছিল যেখানে কীভাবে একটা শিশু রচিত হয় সেই সম্পর্কে বিশদ বিবরণ ছিল আর এই জটিল তথ্য প্রত্যেকটা নতুন কোষের মধ্যেই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এভাবেই, সায়েন্স ওয়ার্ল্ড পত্রিকা এই রূপক অর্থ ব্যবহার করেন, ‘বাড়তে থাকা ভ্রূণের প্রত্যেকটা কোষে যেন নকশায় ভরা এক একটা ঘর রয়েছে।’
৬. এই কথাগুলোর কী প্রমাণ রয়েছে যেমন দায়ূদ লিখেছিলেন যে আমরা “আশ্চর্য্যরূপে নির্ম্মিত”?
৬ আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন যে আমাদের দেহ কত অদ্ভুতভাবে কাজ করে? জীববিজ্ঞানী জার্ড ডায়মন্ড বলেছিলেন: “আমাদের অন্ত্রের কোষগুলো কয়েকদিন পর পর একবার, মূত্রথলির কোষগুলো দুই মাসে একবার আর আমাদের লোহিত কণিকার কোষগুলো প্রতি চার মাসে একবার করে বদল হয়।” শেষে তিনি বলেছিলেন: “প্রকৃতি আমাদের প্রতিদিন আলাদা করছে, আবার প্রতিদিন জুড়ে দিচ্ছে।” এই কথার অর্থ আসলে কী? এই কথার অর্থ হল যে আমরা যত বছরই বেঁচে থাকি না কেন—৮, ৮০ বা ৮০০ বছর—আমাদের দেহে বার্ধক্য আসার কোন প্রশ্নই ওঠে না। একজন বিজ্ঞানী একবার হিসাব করেছিলেন: “প্রায় এক বছরের মধ্যে আমাদের দেহে এখন যে অনু রয়েছে, তার প্রায় ৯৮ শতাংশই বায়ু, খাদ্য ও পানীয় থেকে পাওয়া অনু দিয়ে বদলে যাবে।” সত্যিই যেমন দায়ূদ প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন আমরা “আশ্চর্য্যরূপে নির্ম্মিত।”—গীতসংহিতা ১৩৯:১৪.
৭. আমাদের দেহের রচনাকে মাথায় রেখে কেউ কেউ কোন্ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন?
৭ আমাদের দেহের রচনার কথা মনে রেখে বার্ধক্যের কারণ নিয়ে গবেষণা করে একজন বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন: “আমরা ঠিক করে জানি না যে কেন আমাদের বুড়ো হতে হয়।” তাই, সত্যিই মনে হয় যেন আমাদের চিরকাল বেঁচে থাকা উচিত। আর এই কারণেই মানুষ তাদের প্রযুক্তিবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। অল্প কিছুদিন আগে, ডঃ আলভিন সিলভার্সটিন মৃত্যুর ওপর জয়লাভ (ইংরেজি) নামে তার বইয়ে সাহসের সঙ্গে লিখেছিলেন যে: “চিরকাল বেঁচে থাকার রহস্য আমরা বের করে ফেলব। আমরা বুঝে ফেলব . . . কীভাবে একজন মানুষ বুড়ো হয়।” এর ফলাফল কী হবে? তিনি বলেছিলেন: “কেউ ‘বুড়ো’ হবে না, কারণ যে জ্ঞান আমাদের মৃত্যুকে জয় করতে সাহায্য করবে, সেই জ্ঞানই যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করবে।” মানুষের রচনা সম্বন্ধে আজ বিজ্ঞান যা জেনেছে তা মাথায় রেখেও কি আপনার মনে হয় যে অনন্ত কাল বেঁচে থাকা সত্যিই খুব অসম্ভব? কিন্তু অনন্ত জীবন যে সত্যিই সম্ভব তা বিশ্বাস করার আরও জোরালো কারণ রয়েছে।
চিরকাল বেঁচে থাকতে চাওয়া
৮, ৯. যুগ যুগ ধরে মানুষ তাদের কোন্ আজন্ম আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করার চেষ্টা করেছে?
৮ আপনি কি কখনও লক্ষ্য করেছেন যে চিরকাল বেঁচে থাকতে চাওয়া মানুষের এক আজন্ম আকাঙ্ক্ষা? একটা জার্মান পত্রিকায় একজন ডাক্তার লিখেছিলেন: “অনন্ত জীবনের স্বপ্ন বোধহয় ততখানিই পুরনো যতখানি কিনা মানুষ।” আগেকার দিনের কিছু ইউরোপীয়দের অন্ধবিশ্বাস সম্বন্ধে বলতে গিয়ে, দ্যা নিউ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বলে: “ধনী লোকেরা চিরকাল সোনা দিয়ে মোড়ানো এক চমৎকার অট্টালিকায় বাস করবে।” আর সত্যিই, তাদের অনন্ত কাল ধরে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ করার জন্য মানুষ কত যে প্রচেষ্টা করেছে তার ঠিক নেই!
৯ দি এনসাইক্লোপিডিয়া আমেরিকানা বলে যে ২,০০০ বছরেরও কিছু আগে চিনে, “তাও ধর্মের পুরোহিতদের কথায় সম্রাট আর সেইসঙ্গে সেখানকার [সাধারণ] লোকেরা কাজ-কর্ম ছেড়ে জীবনে অমৃতের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন”—মনে করা হত যে এই অমৃত পান করলে যৌবনকে ধরে রাখা যাবে। প্রকৃতপক্ষে যুগ যুগ ধরে, লোকেরা বিশ্বাস করে এসেছে যে বিভিন্ন উপাদানে তৈরি রস পান করে বা বিশেষ কোন জল পান করে তারা যৌবনকে ধরে রাখতে পারবেন।
১০. আজকের দিনে মানুষের আয়ু বাড়ানোর জন্য কোন্ চেষ্টাগুলো করা হয়েছে?
১০ আজকের দিনেও অনন্ত কাল বাঁচার জন্য মানুষের আজন্ম আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে মানুষ যে প্রচেষ্টাগুলো করেছে তা কিছু কম নয়। এর একটা বড় উদাহরণ হল রোগে ভুগে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে বরফে রাখার রীতি। এটা এই আশা নিয়ে করা হয় যে ভবিষ্যতে যখন রোগের চিকিৎসা আবিষ্কৃত হবে তখন সেই ব্যক্তিকে আবার বাঁচানো যাবে। হিমায়িত করার এই প্রক্রিয়ার একজন সমর্থক লিখেছিলেন: “যদি আমাদের এই আশা পূর্ণ হয় আর যদি আমরা সব রোগের চিকিৎসা বের করে ফেলি, সঙ্গে সঙ্গে বুড়ো বয়সের দুর্বলতাগুলোকে শেষ করা যায়, তাহলে আজকে যারা ‘মারা’ যাচ্ছেন তারা ভবিষ্যতে অনন্ত জীবন পেয়ে যাবেন।”
১১. লোকেরা কেন চিরকাল বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা করে?
১১ আপনি হয়ত জিজ্ঞাসা করবেন যে কেন অনন্ত কাল বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা আমাদের মনে এত গভীরভাবে বাসা বেঁধেছে? এর কারণ কি এই যে এই আকাঙ্ক্ষা “[ঈশ্বর] মানুষের মনে অনাদি-অনন্ত কালের জন্য রেখেছেন”? (উপদেশক ৩:১১, রিভাইজড স্ট্যান্ডার্ড ভারসান) এটা হেলাফেলা করার মতো বিষয় নয়! একটু ভাবুন: আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকার আজন্ম আকাঙ্ক্ষা কেন থাকবে, যদি তা পূরণ করা আমাদের সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য না হয়? আর যদি তিনি আমাদের অনন্ত জীবনের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে সৃষ্টিই করেন আর তারপর সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ না করে আমাদের চিরকালের জন্য বঞ্চিত করেন, তাহলে তা কি তাঁর পক্ষে অন্যায় হবে না?—গীতসংহিতা ১৪৫:১৬.
আমরা কার ওপর ভরসা করব?
১২. কিছু লোকেরা কিসের ওপর ভরসা রাখেন কিন্তু আপনি কি মনে করেন যে এইরকম ভরসা রাখা ঠিক?
১২ অনন্ত জীবন পাওয়ার জন্য আমাদের কোথায় অথবা কিসের ওপর ভরসা রাখা দরকার? বিংশ বা একবিংশ শতাব্দীর মানব প্রযুক্তির ওপর? দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ছাপানো “তারা বাঁচতে চায়” প্রবন্ধে নতুন “দেবতা: প্রযুক্তিবিদ্যা” ও “প্রযুক্তিবিদ্যার কার্যকারিতায় প্রত্যাশা” সম্পর্কে বলা হয়েছিল। এমনকি একজন গবেষক এও বলেছিলেন যে তার “পুরোপুরি ভরসা আছে . . . জীনকে বদলে দেওয়ার প্রযুক্তি খুব শীঘ্রিই পাওয়া যাবে আর যখন বার্ধক্যকে রুখে দেওয়া যাবে ও হয়ত উল্টে বুড়ো লোককে জোয়ান করে দেওয়া যাবে।” কিন্তু বার্ধক্য রোধ করার কিংবা মৃত্যুকে জয় করার জন্য মানুষের সমস্ত প্রচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
১৩. আমাদের মস্তিষ্কের গঠন কীভাবে দেখায় যে আমরা চিরকাল বেঁচে থাকার জন্য তৈরি হয়েছি?
১৩ তাহলে এর মানে কি এই যে অনন্ত জীবন পাওয়ার কোন উপায়ই নেই? কখনই না! একটা পথ অবশ্যই আছে! আমাদের বিস্ময়কর মস্তিষ্কের গঠন, এর শেখার অসীম ক্ষমতা দেখে আমাদের বিশ্বাস জন্মানো দরকার যে চিরকাল বেঁচে থাকা সম্ভব। আণবিক জীববিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন আমাদের মস্তিষ্ককে “নিখিলবিশ্বে এই পর্যন্ত পাওয়া সমস্তকিছুর মধ্যে সবচেয়ে জটিল বস্তু” বলেছেন। আর স্নায়ুবিজ্ঞানী রিচার্ড রেসটাক বলেছিলেন: “আমাদের জানা বিশ্বে এমন কোন জিনিস নেই যা আমাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে এতটুকুও মেলে।” আমাদের যদি চিরকাল বেঁচে থেকে জীবনকে উপভোগ করার জন্যই বানানো না হতো, তাহলে কেন আমাদের সীমাহীন তথ্য নিতে ও ধরে রাখতে পারে এমন ক্ষমতা সমেত মস্তিষ্ক এবং চিরকাল কাজ করে চলতে পারে এমন একটা দেহ দেওয়া হয়েছে?
১৪. (ক) মানুষের জীবন সম্পর্কে বাইবেলের লেখকেরা কোন্ উপসংহারে পৌঁছেছেন? (খ) কেন আমাদের মানুষের ওপর নয় কিন্তু ঈশ্বরের ওপর ভরসা রাখা উচিত?
১৪ তাহলে, একমাত্র কোন্ উপসংহারে আসা আমাদের জন্য ঠিক হবে? এই উপসংহারেই কি নয় যে, আমাদের একজন সর্ব-শক্তিমান, বুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তা এমন করে তৈরি ও সৃষ্টি করেছেন যেন আমরা চিরকাল বেঁচে থাকতে পারি? (ইয়োব ১০:৮; গীতসংহিতা ৩৬:৯; ১০০:৩; মালাখি ২:১০; প্রেরিত ১৭:২৪, ২৫) তাই, আমাদের জন্য কি এটা বুদ্ধির কাজ হবে না যে আমরা বাইবেলের গীতরচকের বলা ঈশ্বরের এই আজ্ঞাকে মানি: “তোমরা নির্ভর করিও না রাজন্যগণে, বা মনুষ্য-সন্তানে, যাহার নিকটে ত্রাণ নাই”? কেন মানুষের ওপর নয়? কারণ, গীতরচক লিখেছিলেন: “তাহার শ্বাস নির্গত হয়, সে নিজ মৃত্তিকায় প্রতিগমন করে; সেই দিনেই তাহার সঙ্কল্প সকল নষ্ট হয়।” সত্যিই, চিরকাল বেঁচে থাকার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, যখন মানুষকে মৃত্যুর মুখে পড়তে হয় তখন সে একেবারেই অসহায়। এইজন্য গীতরচক উপসংহার করেন: “ধন্য সেই . . . যাহার আশাভূমি সদাপ্রভু, তাহার ঈশ্বর।”—গীতসংহিতা ১৪৬:৩-৫.
আসলে এটাই কি ঈশ্বরের উদ্দেশ্য?
১৫. কী দেখায় যে আমরা চিরকাল বেঁচে থাকি তা ঈশ্বরেরই উদ্দেশ্য?
১৫ কিন্তু আপনি হয়ত জিজ্ঞাসা করবেন অনন্ত জীবন উপভোগ করা কি আসলেই যিহোবার উদ্দেশ্য? অবশ্যই! তাঁর বাক্যে তিনি অনেকবার প্রতিজ্ঞা করেছেন। বাইবেল আমাদের আশ্বাস দেয়: “ঈশ্বরের অনুগ্রহ-দান . . . অনন্ত জীবন।” ঈশ্বরের দাস যোহন লিখেছিলেন: “ইহা [ঈশ্বরেরই] সেই প্রতিজ্ঞা, যাহা তিনি আপনি আমাদের কাছে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, তাহা অনন্ত জীবন।” তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যখন একজন যুবক যীশুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “হে গুরু, অনন্ত জীবন পাইবার জন্য আমি কিরূপ সৎকর্ম্ম করিব?” (রোমীয় ৬:২৩; ১ যোহন ২:২৫; মথি ১৯:১৬) প্রকৃতপক্ষে প্রেরিত পৌল “সেই অনন্ত জীবনের আশাযুক্ত,” কথা লিখেছিলেন “যাহা মিথ্যাকথনে অসমর্থ ঈশ্বর অতি পূর্ব্ব কালে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন।”—তীত ১:২.
১৬. এই কথার অর্থ কী যে ঈশ্বর অনন্ত জীবন দেওয়ার প্রতিজ্ঞা ‘অতি পূর্ব্ব কালে করিয়াছেন’?
১৬ অনন্ত জীবনের প্রতিজ্ঞা ঈশ্বর ‘অতি পূর্ব্ব কালে করিয়াছিলেন’ এই কথার অর্থ কী? কেউ কেউ মনে করেন প্রেরিত পৌল বুঝিয়েছিলেন যে প্রথম দম্পতি, আদম ও হবাকে সৃষ্টি করার আগেই ঈশ্বরের উদ্দেশ্য ছিল যে মানুষরা চিরকাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। কিন্তু, পৌল যদি বোঝাতেও চান যে মানুষকে সৃষ্টি করার পরই যিহোবা এই উদ্দেশ্য করেছিলেন, তাহলেও এটা স্পষ্ট যে ঈশ্বর চান মানুষ অনন্ত কাল বেঁচে থাকুক।
১৭. আদম ও হবাকে কেন এদন উদ্যান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল আর কেন এদন উদ্যানের মুখে করূবদের নিযুক্ত করা হয়েছিল?
১৭ বাইবেল বলে যে এদন উদ্যানে, “সদপ্রভু ঈশ্বর ভূমি হইতে . . . জীবনবৃক্ষ . . . উৎপন্ন করিলেন।” আদমকে এইজন্য উদ্যান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল যেন “পাছে সে হস্ত বিস্তার করিয়া জীবনবৃক্ষের ফলও পাড়িয়া ভোজন করে ও অনন্তজীবী হয়,”—চিরকাল বেঁচে থাকে! আদম ও হবাকে এদন উদ্যান থেকে বের করে দেওয়ার পর যিহোবা “জীবনবৃক্ষের পথ রক্ষা করিবার জন্য এদনস্থ উদ্যানের পূর্ব্বদিকে করূবগণকে ও ঘূর্ণায়মান তেজোময় খড়্গ রাখিলেন।”—আদিপুস্তক ২:৯; ৩:২২-২৪.
১৮. (ক) জীবনবৃক্ষের ফল খেলে আদম ও হবার কী হতো? (খ) ওই গাছ থেকে ফল খাওয়া কী বোঝায়?
১৮ আদম ও হবাকে যদি সেই জীবনবৃক্ষের ফল খেতে দেওয়া হতো তবে তাদের জন্য তা কী বোঝাত? তারা সেই সুন্দর বাগান পরমদেশে চিরকাল বেঁচে থাকার সুযোগ পেত! বাইবেলের একজন পণ্ডিত অনুমান করেছিলেন: “জীবন বৃক্ষের নিশ্চয়ই এমন কোন শক্তি ছিল যাতে মানুষের দেহকে বুড়ো হওয়া ও মারা যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারত।” এমনকি তিনি বলেছিলেন যে “সেই বাগানে এমন কিছু ভেষজ বস্তু ছিল যার [বার্ধক্যের] ফলে আসা দুর্বলতাগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করার শক্তি ছিল।” কিন্তু, জীবনবৃক্ষের এইরকম জীবন দেওয়ার মতো কোন গুণ ছিল কি না সেই বিষয়ে বাইবেল কিছু জানায় না। বরং সেই বৃক্ষ শুধু এটুকুই বোঝায় যে যারা এই বৃক্ষের ফল খেতে পাবে তাদের জন্য ঈশ্বর অনন্ত জীবনের নিশ্চয়তা দেন।—প্রকাশিত বাক্য ২:৭.
ঈশ্বরের উদ্দেশ্য বদলায়নি
১৯. আদম কেন মারা গিয়েছিল আর কেন আমরা তার সন্তানেরাও মারা যাই?
১৯ আদম যখন পাপ করেছিল, সে তার নিজের আর সমস্ত অজাত সন্তানদের জন্য অনন্ত জীবনের অধিকার হারিয়েছিল। (আদিপুস্তক ২:১৭) অবাধ্য হয়ে যখন সে পাপী হয়ে গিয়েছিল তার মধ্যে খুঁতগুলো আসতে লাগে আর সে অসিদ্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে আদমের দেহ মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়েছিল। কারণ বাইবেল বলে: “পাপের বেতন মৃত্যু।” (রোমীয় ৬:২৩) এছাড়াও, আদমের অসিদ্ধ সন্তানেরাও অনন্ত জীবনের জন্য নয় বরং মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়েছিল। বাইবেল বলে: “এক মনুষ্য [আদম] দ্বারা পাপ, পাপ দ্বারা মৃত্যু জগতে প্রবেশ করিল; আর এই প্রকারে মৃত্যু সমুদয় মনুষ্যের কাছে উপস্থিত হইল, কেননা সকলেই পাপ করিল।”—রোমীয় ৫:১২.
২০. কীসের থেকে বোঝা যায় যে মানুষকে পৃথিবীতে চিরকাল বেঁচে থাকার জন্য বানানো হয়েছিল?
২০ কিন্তু আদম যদি পাপ না করত, তাহলে কী হতো? যদি সে ঈশ্বরের অবাধ্য না হতো আর জীবনবৃক্ষ থেকে ফল খাওয়ার অনুমতি পেত, তাহলে কী হতো? তাহলে ঈশ্বরের দেওয়া উপহার অনন্ত জীবন সে কোথায় উপভোগ করত? স্বর্গে? না! আদমকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ঈশ্বর কিছুই বলেননি। তাকে এখানে পৃথিবীতে কাজ দেওয়া হয়েছিল। বাইবেল বলে যে “সদাপ্রভু ঈশ্বর ভূমি হইতে সর্ব্বজাতীয় সুদৃশ্য ও সুখাদ্য-দায়ক বৃক্ষ . . . উৎপন্ন করিলেন” আর এটা আরও বলে: “সদাপ্রভু ঈশ্বর আদমকে লইয়া এদনস্থ উদ্যানের কৃষিকর্ম্ম ও রক্ষার্থে তথায় রাখিলেন।” (আদিপুস্তক ২:৯, ১৫) আদমের সহকারিণী হিসেবে হবাকে সৃষ্টি করার পর তাদের দুজনকে এই পৃথিবীতেই আরও কাজ দেওয়া হয়েছিল। ঈশ্বর তাদের বলেছিলেন: “তোমরা প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হও, এবং পৃথিবী পরিপূর্ণ ও বশীভূত কর, আর সমুদ্রের মৎস্যগণের উপরে, আকাশের পক্ষিগণের উপরে, এবং ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় জীবজন্তুর উপরে কর্ত্তৃত্ব কর।”—আদিপুস্তক ১:২৮.
২১. আদম আর হবার সামনে কোন্ চমৎকার প্রত্যাশা ছিল?
২১ একবার চিন্তা করে দেখুন যে ঈশ্বরের ওই নির্দেশনা মানলে পৃথিবীতে আদম ও হবার ভবিষ্যৎ কতই না চমৎকার হতো! পার্থিব পরমদেশে তারা তাদের নিখুঁত স্বাস্থ্যের ছেলেমেয়েদের লালনপালন করার আশীর্বাদ পেত। তাদের প্রিয় সন্তানেরা বড় হওয়ার পর তারাও তাদের সঙ্গে সন্তানের জন্ম দিত ও এই মনোরম বাগানের দেখাশোনা করার জন্য খুশি মনে কাজ করত। তাদের বশীভূত সমস্ত পশুপাখিদের নিয়ে তাদের জীবন খুবই সুখের হতো। তারপর ভেবে দেখুন যে সারা পৃথিবীকে পরমদেশ করার জন্য এদন উদ্যানের সীমা বাড়ানো কতই না আনন্দের কথা হতো! এইরকম একটা সুন্দর ঘরে বুড়ো হওয়া ও মারা যাওয়ার চিন্তা ছাড়াই নিখুঁত সন্তানদের নিয়ে জীবন উপভোগ করতে কি আপনি চান না? আপনার মনই এর উত্তর দিক।
২২. আমরা কেন নিশ্চিত থাকতে পারি যে পৃথিবীর জন্য ঈশ্বর তাঁর উদ্দেশ্য বদলাননি?
২২ তাহলে আদম ও হবা যখন অবাধ্য হয়েছিল আর তাদের এদন উদ্যান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তখন ঈশ্বর কি মানুষের চিরকাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকার বিষয়ে তাঁর উদ্দেশ্যকে পরিবর্তন করেছিলেন? কখনও না! তা করলে তার এই মানে দাঁড়াত যে ঈশ্বরের তাঁর আদি উদ্দেশ্য পূর্ণ করার ক্ষমতা ছিল না আর তাই তিনি হার মেনে নিয়েছেন। আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে ঈশ্বর তাঁর প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করেন, যেমন তিনি নিজে বলেন: “আমার মুখনির্গত বাক্য তেমনি হইবে; তাহা নিষ্ফল হইয়া আমার কাছে ফিরিয়া আসিবে না, কিন্তু আমি যাহা ইচ্ছা করি, তাহা সম্পন্ন করিবে, এবং যে জন্য তাহা প্রেরণ করি, সে বিষয়ে সিদ্ধার্থ হইবে।”—যিশাইয় ৫৫:১০, ১১.
২৩. (ক) কোন্ বিষয়টা আমাদের নিশ্চয়তা দেয় যে ধার্মিকেরা চিরকাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে? (খ) পরের প্রবন্ধে আমরা কী আলোচনা করব?
২৩ পৃথিবীর জন্য ঈশ্বরের উদ্দেশ্য যে বদলায়নি তা বাইবেলে স্পষ্ট করে বলা রয়েছে। ঈশ্বর প্রতিজ্ঞা করেন: “ধার্ম্মিকেরা দেশের অধিকারী হইবে, তাহারা নিয়ত তথায় বাস করিবে।” যীশু খ্রীষ্টও তাঁর পর্বতে দেওয়া বিখ্যাত উপদেশে বলেন যে মৃদুশীল ব্যক্তিরা পৃথিবীর অধিকারী হবেন। (গীতসংহিতা ৩৭:২৯; মথি ৫:৫) কিন্তু, আমরা কীভাবে অনন্ত জীবন পেতে পারি আর এরকম জীবন উপভোগ করার জন্য আমাদের কী করা উচিত? পরের প্রবন্ধে এই বিষয়গুলো আলোচনা করা হবে।
আপনি কীভাবে উত্তর দেবেন?
◻ কেন অনেকে বিশ্বাস করেন যে অনন্ত জীবন সম্ভব?
◻ কোন্ বিষয় আমাদের বিশ্বাস জন্মাতে পারে যে আমরা চিরকাল বেঁচে থাকার জন্য তৈরি হয়েছিলাম?
◻ মানবজাতি ও পৃথিবী সম্বন্ধে ঈশ্বরের আদি উদ্দেশ্য কী ছিল?
◻ আমরা কেন নিশ্চিত হতে পারি যে ঈশ্বর তাঁর আদি উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেন?