যিহোবাকে সন্তুষ্ট করাই আমার প্রধান চিন্তা
থিওডোরস নেরোস দ্বারা কথিত
জেলে আমার ছোট্ট কক্ষের দরজাটি সবেগে খুলে গিয়েছিল আর একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন: “নেরোস কে?” আমি আমার পরিচয় দিলে তিনি আদেশ দিয়েছিলেন: “উঠে এসো। আমরা তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে যাচ্ছি।” ১৯৫২ সালে গ্রিসের করিন্থের একটি সৈন্য শিবিরে এই ঘটনাটি ঘটেছিল। আমার জীবন কেন এতটা অনিশ্চিতয়তার মধ্যে ছিল তা বর্ণনা করার আগে, আমার পটভূমি সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই।
১৯২৫ সালের দিকে বাইবেল ছাত্রদের (যিহোবার সাক্ষীরা তখন এই নামে পরিচিত ছিলেন) সঙ্গে আমার বাবার যোগাযোগ হয়েছিল। শীঘ্রই তিনি তাদের একজন হন এবং তার আটজন ভাইবোনকে তার বিশ্বাস সম্বন্ধে জানান, যারা সকলেই বাইবেল সত্য গ্রহণ করেছিলেন। তার বাবামাও তা গ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি বিয়ে করেন আর আমি ১৯২৯ সালে গ্রিসের আগ্রিনিওতে জন্মগ্রহণ করি।
গ্রিসের জন্য ওই বছরগুলি কী ভয়াবহই না ছিল! প্রথমত সেখানে জেনারেল মেটাক্সাসের নিষ্ঠুর স্বৈরাচার শাসন ছিল। তারপর ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই নাৎসীরা সেই দেশটি দখল করে নেয়। রোগ এবং দুর্ভিক্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফুলে ওঠা মৃত দেহগুলি একটি ছোট ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হতো। এই জগতের নিষ্ঠুরতা এতই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে ঈশ্বরের রাজ্য অপরিহার্যভাবে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল
উৎসর্গীকৃত পরিচর্যা
১৯৪২ সালে ২০ই আগস্ট আমরা সভা করার জন্য থিষলনীকীর বাইরে মিলিত হয়েছিলাম। সেখানে আমাদের পরিচালক অধ্যক্ষ ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানগুলি শহরের উপর যে বোমা নিক্ষেপ করছিল তা উল্লেখ করেছিলেন এবং ‘সমাজে সভাস্থ হওয়া পরিত্যাগ না করার,’ পরামর্শের প্রতি বাধ্য হয়ে যেভাবে রক্ষা পেয়েছিলাম সেই বিষয়ের উপর জোর দিয়েছিলেন। (ইব্রীয় ১০:২৫) সেই দিন আমরা একটি সমুদ্র উপকূলে মিলিত হয়েছিলাম আর সেখানে যারা বাপ্তিস্ম নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। জল থেকে উঠে আসার পর, আমরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াই এবং আমাদের এই সিদ্ধান্তের জন্য ভাইবোনেরা আমাদের প্রশংসা করে একটি গান গেয়েছিলেন। সেই দিনটির কথা আমি ভুলতে পারব না!
এর কিছুদিন পর, আমি ও আর একটি ছেলে যখন ঘরে ঘরে প্রচার করছিলাম, পুলিশেরা আমাদের গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যান। আমাদের সাম্যবাদী বলে মনে করা হয় এবং আমাদের প্রচার কাজ নিষিদ্ধ ছিল এই কারণে তারা আমাদের মেরেছিলেন এবং বলেছিলেন: “মূর্খরা, যিহোবা এবং স্টালিন একই!”
তখন গ্রিসে গৃহযুদ্ধ বেড়ে চলেছিল আর সাম্যবাদ বিরোধীদের উন্মাদনাও চরমে পৌঁছেছিল। তাই পরের দিন আমাদেরকে অপরাধীদের মতো হাতকড়া পরিয়ে ঘর থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আমার পরীক্ষা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি।
বিদ্যালয়ে বিশ্বাসের পরীক্ষাগুলি
১৯৪৪ সালের প্রথম দিকে আমি তখনও একজন ছাত্র ছিলাম আর নাৎসীরা থিষলনীকী শহর দখল করেই চলেছিল। একদিন আমাদের বিদ্যালয়ের ধর্ম বিষয়ক অধ্যাপক একজন অর্থোডক্স পাদ্রি আমাকে বলেন যে ওই দিনের পাঠের উপর আমার পরীক্ষা নেওয়া হবে। “ও অর্থোডক্স খ্রীষ্টান নয়,” অন্যান্য ছাত্ররা বলে ওঠে।
“তাহলে ও কী?” অধ্যাপক জিজ্ঞাসা করেন।
“আমি একজন যিহোবার সাক্ষী,” আমি উত্তর দিই।
“মেষেদের মধ্যে নেকড়ে,” এই বলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন আর আমাকে জোরে চেপে ধরে আমার গালে চড় মারেন।
আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, ‘এটা কি হতে পারে যে মেষ নেকড়েকে মারছে?’
কয়েক দিন পর, আমরা প্রায় ৩৫০ জন দুপুরের খাবারের জন্য টেবিলে বসেছি। তত্ত্বাবধায়ক বললেন: “নেরোস প্রার্থনা করবে।” আমি তথাকথিত ‘আমাদের পিতা’ প্রার্থনাটি পুনরাবৃত্তি করি, যেটি যীশু তাঁর শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন, যা মথি ৬:৯-১৩ পদে রয়েছে। এটি তত্ত্বাবধায়কের পছন্দ মতো হয়নি, তাই তিনি রেগে গিয়ে তার জায়গা থেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “কেন তুমি এইরকম প্রার্থনা করলে?”
“কারণ আমি একজন যিহোবার সাক্ষী,” আমি উত্তর দিই। এই উত্তর দেওয়ায় তিনিও আমার গালে চড় মারেন। পরে আরেকজন শিক্ষক ওইদিনই আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে বলেন: “শাবাশ, নেরোস, তুমি যা বিশ্বাস কর তাতে অটল থাকো, হাল ছেড়ে দিও না।” সেই রাতে আমার বাবা আমাকে প্রেরিত পৌলের এই কথাগুলি দ্বারা উৎসাহিত করেছিলেন: “যত লোক ভক্তিভাবে খ্রীষ্ট যীশুতে জীবন ধারণ করিতে ইচ্ছা করে, সেই সকলের প্রতি তাড়না ঘটিবে।”—২ তীমথিয় ৩:১২.
আমার উচ্চবিদ্যালয়ের পড়াশুনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি কোন্ পেশায় যেতে চাই তা আমাকে বাছতে হয়েছিল। গ্রিসে সাম্প্রদায়িক কলহ থাকায়, আমার সামনে খ্রীষ্টীয় নিরপেক্ষতার প্রশ্ন আসে। (যিশাইয় ২:৪; মথি ২৬:৫২) ফলস্বরূপ, ১৯৫২ সালের প্রথম দিকে, গ্রিকের ইতিহাসের সেই কঠিন দিনগুলিতে আমি অস্ত্র নিতে অস্বীকার করায় আমাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
আমার খ্রীষ্টীয় নিরপেক্ষতা পরীক্ষিত হয়
আমি যখন মিসোলংইয়োং এবং করিন্থের সৈন্য শিবিরে আটক ছিলাম, তখন আমার সেনা কমান্ডারদের কাছে বলার সুযোগ হয়েছিল যে আমার বাইবেল শিক্ষিত বিবেক আমাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলি সমর্থন করার জন্য একজন সৈনিক হওয়াকে অনুমোদন করবে না। “আমি ইতিমধ্যেই যীশুর সৈনিক,” ২ তীমথিয় ২:৩ পদ উল্লেখ করে আমি তা বলি। যখন আমাকে পুনর্বিবেচনা করতে বলা হয়, আমি বলেছিলাম যে আমি দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নিইনি বরং গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং ঈশ্বরের ইচ্ছা পালনার্থে তাঁর কাছে আমার উৎসর্গের কথা মূল্যায়ন করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ফলস্বরূপ, আমাকে বাধ্যতামূলকভাবে কাজ করতে হয়েছিল, ২০ দিন আমাকে একদিন অন্তর একদিন খেতে দেওয়া হতো আর তিন ফুট চওড়া ও ছয় ফুট লম্বা একটি ছোট ঘরের সিমেন্টের মেঝেতে আমি শুতাম। আর আমার সঙ্গে আরও দুজন সাক্ষী সেই ঘরে থাকতেন! এটি সেই করিন্থ শিবিরের কথা যেখান থেকে আমাকে মৃত্যুদণ্ডের জন্য ডাকা হয়েছিল।
আমরা যখন বধ্যভূমির দিকে রওনা হই, তখন কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি কি কিছুই বলতে চাও না?”
“না,” আমি উত্তর দিই।
“তোমার পরিবারকে তুমি কিছু লিখবে না?”
“না,” আমি আবারও উত্তর দিই। “তারা ইতিমধ্যেই জেনেছে যে এখানে আমাকে হয়ত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।”
আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পর আমাকে দেওয়ালের সামনে দাঁড়াতে আদেশ দেওয়া হয়। তারপর সৈনিকদের গুলি করতে আদেশ দেওয়ার পরিবর্তে অফিসার আদেশ দেন, “ওকে ভিতরে নিয়ে যাও।” এইসমস্ত কিছুই আমার দৃঢ়সংকল্পকে পরীক্ষা করার জন্য সাজানো, মিথ্যা পরিকল্পনা ছিল।
এরপর, আমাকে ম্যাকরোনিসস দ্বীপে পাঠানো হয়, যেখানে আমাকে বাইবেল ছাড়া আর কোন সাহিত্যাদি রাখার অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রায় ৫০০ জন অপরাধী কয়েদির মধ্যে থেকে ১৩ জন সাক্ষীকে একটি ছোট ঘরে আলাদা করে রাখা হয়েছিল। তবুও, সাহিত্যাদি কোন না কোনভাবে গোপন পথে আমাদের কাছে আসত। উদাহরণস্বরূপ, একদিন আমার কাছে লুকোমিয়ার (জনপ্রিয় চকলেট) একটি বাক্স পাঠানো হয়েছিল। দারোগারা লুকোমিয়া খাওয়ায় এতই উৎসুক ছিলেন যে নিচে লুকানো প্রহরীদুর্গ পত্রিকা তারা দেখতে পাননি। “সৈন্যরা লুকোমিয়া খেয়েছিলেন কিন্তু আমরা ‘খেয়েছিলাম’ প্রহরীদুর্গ!” একজন সাক্ষী বলেছিলেন।
সেইসময় প্রকাশিত মানবজাতির জন্য ধর্ম কী করেছে? (ইংরাজি) নামক বইটির একটি কপি আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় এবং ইংরাজি জানতেন এমন একজন সাক্ষী কয়েদি এটিকে অনুবাদ করেছিলেন। আমরা একত্রে প্রহরীদুর্গ অধ্যয়নও করতাম, গোপনে সভাগুলি চালাতাম। আমরা জেলকে একটা বিদ্যালয় বলে মনে করতাম যেখানে আমরা আমাদের আধ্যাত্মিকতাকে শক্তিশালী করার সুযোগ পাই। সর্বোপরি আমরা এটি জেনে আনন্দিত ছিলাম যে আমাদের বিশ্বস্ততা যিহোবাকে সন্তুষ্ট করে।
সবশেষে আমি পূর্ব পিলোপন্নিসসের টিরেনথার কারাগারে বন্দি ছিলাম আর সেখানে এক সহবন্দির সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করার সময় লক্ষ্য করেছিলাম যে একজন প্রহরী তা মনোযোগের সঙ্গে শুনতেন। কয়েক বছর পর থিষলনীকীয়ায় সেই প্রহরীকে দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম! ইতিমধ্যেই তিনি একজন যিহোবার সাক্ষী হয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার এক সন্তানকে প্রহরীর কাজ করার জন্য নয় কিন্তু একজন বন্দি হিসাবে জেলে পাঠানো হয়েছিল। আমি যে কারণে জেলে এসেছিলাম তাকেও সেই একই কারণে জেলে আসতে হয়েছিল।
মুক্তির পর আবার কাজ শুরু করা
জেলে ২০ বছরের মধ্যে বলতে গেলে মাত্র তিন বছরই আমি আসল বন্দিত্ব ভোগ করেছিলাম। মুক্তির পর আমি এথেন্সে থাকার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু এর পরপরই আমার প্লুরিসি হয় আর আমি থিষলনীকীতে ফিরে যেতে বাধ্য হই। দুই মাস আমি বিছানায় ছিলাম। এরপর কুলা নামে এক সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় এবং ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা বিয়ে করি। ১৯৬২ সালে সে অগ্রগামী পরিচর্যা শুরু করে, যিহোবার সাক্ষীদের পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যাকারীদের তখন এই নামে ডাকা হতো। তিন বছর পর আমি তার সঙ্গে অগ্রগামী কাজে যোগ দিতে পেরেছিলাম।
১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে, মণ্ডলীগুলিকে আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করে তোলার জন্য আমাদের সীমার কাজে নিযুক্ত করা হয়। ওই গ্রীষ্মে আমরা অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে আমাদের প্রথম বৃহৎ জেলা সম্মেলনে যোগ দেওয়ারও সুযোগ পেয়েছিলাম। এটি গ্রিসের তুলনায় অন্যরকম ছিল কেননা সেখানে আমাদের কাজ নিষিদ্ধ ছিল বলে আমরা জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে মিলিত হতাম। ১৯৬৫ সালের শেষদিকে আমরা এথেন্সে যিহোবার সাক্ষীদের শাখা অফিসে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ পাই। কিন্তু আমার কিছু আত্মীয়স্বজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় ১৯৬৭ সালে আমাদের থিষলনীকীতে ফিরে যেতে হয়েছিল।
পরিবারের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সুসমাচার প্রচারের কাজেও লেগে ছিলাম। একবার, কোসটাস নামে আমার এক কাকাত ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সময়, আমি তাকে ঈশ্বরের সংগঠনের চমৎকার বৈশিষ্ট্যগুলি এবং এখানে যে প্রেম, একতা ও ঈশ্বরের প্রতি বাধ্যতা রয়েছে সেই বিষয়ে বর্ণনা করেছিলাম। সে বলেছিল, “এই বিষয়গুলি অত্যন্ত চমৎকার হতো যদি আদৌ ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকত।” ঈশ্বর আছেন কী নেই সেই সম্পর্কে পরীক্ষা করে দেখার জন্য সে আমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে। আমরা তাকে বলি যে আমরা ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে জার্মানির নুরেমবার্গে যিহোবার সাক্ষীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যাব। সে আমাদের জিজ্ঞাসা করে যে সে আমাদের সঙ্গে আসতে পারে কি না আর তার বন্ধু অ্যালেক্স যে আমাদের সঙ্গে অধ্যয়ন করছিল সেও আমাদের সঙ্গে আসতে চায়।
নুরেমবার্গ সম্মেলনটি অসাধারণ ছিল! সম্মেলনটি একটি বিশাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল যেখানে হিটলার তার সামরিক বিজয় উদ্যাপন করেছিলেন। আমাদের উপস্থিতির সংখ্যা ১,৫০,০০০ জনকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং যিহোবার আত্মা সমস্ত কাজে প্রতীয়মান হয়েছিল। শীঘ্রই কোসটাস এবং অ্যালেক্স বাপ্তিস্ম নিয়েছিলেন। তারা দুজনেই বর্তমানে খ্রীষ্টীয় প্রাচীন হিসাবে সেবা করছেন এবং তাদের পরিবারের সকলেই যিহোবার উপাসক।
আমি একজন আগ্রহী মহিলার সঙ্গে অধ্যয়ন শুরু করেছিলাম। তার স্বামী জানিয়েছিলেন যে তিনি আমাদের বিশ্বাসগুলি পরীক্ষা করে দেখতে চান আর এর অল্পকিছু দিন পরেই তিনি আমাকে বলেন যে মি. সাক্কোস নামে একজন গ্রিক অর্থোডক্স ঈশ্বরতত্ত্ববিদকে তিনি এই বিতর্কের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মহিলার স্বামী আমাদের দুজনকেই কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলেন। মি. সাক্কোস একজন যাজককে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। আমরা যে ভদ্রলোকের ঘরে গিয়েছিলাম তিনি এই বলে কথা শুরু করেন, “প্রথমত, আমি চাই মি. সাক্কোস আমার তিনিটি প্রশ্নের উত্তর দেবেন।”
আমরা আমাদের আলোচনায় যে বাইবেলের অনুবাদটি ব্যবহার করতাম সেটি তুলে ধরে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করেন, “প্রথম প্রশ্নটি হল: এটি কি একটি প্রকৃত বাইবেল অথবা এটি সাক্ষীদের বাইবেল?” মি. সাক্কোস উত্তর দিলেন যে এটি একটি নির্ভরযোগ্য অনুবাদ, এছাড়াও তিনি ব্যাখ্যা করেন যে যিহোবার সাক্ষীরা “বাইবেলের প্রেমিক।”
এরপর ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করেন, “দ্বিতীয় প্রশ্নটি হল: যিহোবার সাক্ষীরা কি সচ্চরিত্রের লোক?” আসলে তিনি জানতে চেয়েছিলেন কীধরনের লোকেদের সঙ্গে তার স্ত্রী মেলামেশা করতে শুরু করেছে। ঈশ্বরতত্ত্ববিদ উত্তর দেন যে অবশ্যই তারা সচ্চরিত্রের লোক।
“তৃতীয় প্রশ্নটি হল,” ভদ্রলোক বলে চলেন, “যিহোবার সাক্ষীদের কি বেতন দেওয়া হয়?” “না,” ঈশ্বরতত্ত্ববিদ উত্তর দেন।
“আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি,” ভদ্রলোক এই বলে শেষ করেন। তারপর থেকে ভদ্রলোক তার বাইবেল অধ্যয়ন চালিয়ে যান এবং অল্প দিনের মধ্যেই বাপ্তিস্ম নিয়ে একজন যিহোবার সাক্ষী হন।
এক সমৃদ্ধশীল, পুরস্কারজনক জীবন
আমি ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে আবারও একজন সীমা অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ শুরু করি। প্রায় ছয় বছর পর, আমি গ্রিসে প্রচারের এক নতুন দিক—রাস্তায় সাক্ষ্যদানে নেতৃত্ব নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। তারপর ১৯৯১ সালের অক্টোবর মাসে, আমি এবং আমার স্ত্রী বিশেষ অগ্রগামী হিসাবে সেবা করা শুরু করি। এর কয়েক মাস পর, আমাকে চতুর্থবারের মতো বাইপাস হার্ট অপারেশন করতে হয়েছিল আর তা সফলভাবে হয়েছিল। এখন আমার শরীর সম্পূর্ণ ভাল আর আমি পূর্ণ-সময়ের প্রচার কাজ আবার শুরু করতে পেরেছি। এছাড়া আমি থিষলনীকীর একটি মণ্ডলীতে একজন প্রাচীন হিসাবে সেবা করছি আর সেই সঙ্গে আমি যাদের চিকিৎসাগত প্রয়োজন আছে তাদেরকে সহোযোগিতা করার জন্য স্থানীয় হাসপাতাল যোগাযোগ কমিটির সঙ্গে কাজ করি।
আমার জীবনের অতীত দিনগুলির কথা মনে পড়লে আমি উপলব্ধি করি যে আমাদের স্বর্গীয় পিতার সন্তোষজনক কাজ করা জীবনে কতটাই না পরিতৃপ্তি নিয়ে এসেছে। আমি আনন্দিত যে বহুদিন পূর্বেই আমি তাঁর এই সনির্বন্ধ আবেদনে সাড়া দিয়েছিলাম: “বৎস, জ্ঞানবান হও; আমার চিত্তকে আনন্দিত কর; তাহাতে যে আমাকে টিট্কারি দেয়, তাহাকে উত্তর দিতে পারিব।” (হিতোপদেশ ২৭:১১) আন্তরিক লোকেরা যারা যিহোবার সংগঠনভুক্ত হচ্ছেন তাদের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধি পাচ্ছে তা দেখে সত্যই আমি আনন্দিত হই। বাইবেল সত্যের দ্বারা লোকেদেরকে স্বাধীন করার কাজে অংশ নিয়ে তাদের সামনে এক ধার্মিক নতুন জগতে অনন্ত জীবনের আশা খুলে দেওয়া সত্যিই এক বড় সুযোগ!—যোহন ৮:৩২; ২ পিতর ৩:১৩.
আমরা সবসময় যিহোবার যুবক দাসেদের তাদের সময় এবং শক্তি যিহোবার কাজে নিয়োজিত করার জন্য অর্থাৎ পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যাকে তাদের জীবনের লক্ষ্য হিসাবে স্থাপন করার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা করি। বাস্তবিকই, যিহোবার উপর নির্ভর করা ও তাঁর হৃদয়কে খুশি করে আনন্দ পাওয়াই একজনের জীবনে পূর্ণতা এনে দিতে পারে!—হিতোপদেশ ৩:৫; উপদেশক ১২:১.
[২১ পৃষ্ঠার চিত্র]
(বাম থেকে ডানে)
১৯৬৫ সালে বেথেলের রান্নাঘরে
১৯৭০ সালে আমাদের প্রচার কাজ নিষিদ্ধ থাকাকালে আমি বক্তৃতা দিচ্ছি
১৯৫৯ সালে আমার স্ত্রীর সঙ্গে
[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]
আমার স্ত্রী, কুলার সঙ্গে