অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রতি খ্রীষ্টীয় দৃষ্টিভঙ্গি
প্রিয়জনের আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত মৃত্যু বিশেষভাবে মর্মান্তিক। এটি আঘাত নিয়ে আসে যা প্রচণ্ড আবেগগত বেদনা উৎপন্ন করে। দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক রোগভোগের পর প্রিয়জন মৃত্যুতে ঘুমিয়ে পড়েছেন দেখা খুব আশ্চর্যজনক নয়, তবুও শোক ও হারানোর গভীর অনুভূতি রয়ে যায়।
প্রিয়জনের মৃত্যুর পরিস্থিতি যাই হোক না কেন শোকার্তদের সমর্থন ও সান্ত্বনার প্রয়োজন। এমন একজন শোকার্ত খ্রীষ্টান হয়ত তাদের কাছ থেকেও তাড়নার সম্মুখীন হতে পারেন, যারা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অশাস্ত্রীয় প্রথাগুলি পালন করার জন্য চাপ দিয়ে থাকেন। আফ্রিকার অধিকাংশ দেশগুলিতে ও পৃথিবীর অন্যান্য কিছু অংশেও এটি সাধারণ।
কোন্ বিষয়টি একজন শোকার্ত খ্রীষ্টানকে অশাস্ত্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রথাগুলি এড়াতে সাহায্য করবে? পরীক্ষার এই সময়ে সহবিশ্বাসীরা কিভাবে সমর্থনকারী হতে পারেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর তাদের সকলেরই বিবেচনার বিষয় যারা যিহোবাকে সন্তুষ্ট করতে চান কারণ “ক্লেশাপন্ন পিতৃমাতৃহীনদের ও বিধবাদের তত্ত্বাবধান করা, এবং সংসার হইতে আপনাকে নিষ্কলঙ্করূপে রক্ষা করাই পিতা ঈশ্বরের কাছে শুচি ও বিমল ধর্ম্ম।”—যাকোব ১:২৭.
এক সাধারণ বিশ্বাসের দ্বারা সংযুক্ত
অনেক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া প্রথার একটি সাধারণ বিষয় হল, এই বিষয়ে বিশ্বাস যে মৃতেরা পূর্বপুরুষদের কোন এক অদৃশ্য জগতে বসবাস করেন। তাদের তৃপ্ত করার জন্য অনেক শোকার্ত ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে বাধ্যতা অনুভব করেন। অথবা তারা প্রতিবেশীদের অসন্তুষ্ট করতে ভয় পান যারা বিশ্বাস করেন যে যদি এই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা না হয় তাহলে এটি সম্পূর্ণ সমাজের উপর ক্ষতি আনবে।
একজন সত্য খ্রীষ্টান অবশ্যই মনুষ্য ভয়ের কাছে নতি স্বীকার করবেন না ও যে প্রথাগুলি ঈশ্বরকে অসন্তুষ্ট করে সেগুলিতে অংশ নেবেন না। (হিতোপদেশ ২৯:২৫; মথি ১০:২৮) বাইবেল দেখায় যে মৃতেরা অচেতন আর তাই এটি বলে: “জীবিত লোকেরা জানে যে, তাহারা মরিবে; কিন্তু মৃতেরা কিছুই জানে না, . . . তুমি যে স্থানে যাইতেছ, সেই পাতালে কোন কার্য্য কি সঙ্কল্প, কি বিদ্যা কি প্রজ্ঞা, কিছুই নাই।” (উপদেশক ৯:৫, ১০) সুতরাং যিহোবা ঈশ্বর তাঁর প্রাচীন কালের লোকেদের, মৃত ব্যক্তিদের তৃপ্ত বা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করার জন্য সাবধান করেছিলেন। (দ্বিতীয় বিবরণ ১৪:১; ১৮:১০-১২; যিশাইয় ৮:১৯, ২০) বাইবেলের এই সত্য অনেক জনপ্রিয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রথার সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে।
“যৌন শুদ্ধিকরণ” সম্বন্ধে কী?
মধ্য আফ্রিকার কিছু দেশে শোকার্ত স্বামী বা স্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় যে তারা মৃতব্যক্তির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবেন। বিশ্বাস করা হয় যে যদি এটি না করা হয় তাহলে মৃতব্যক্তি জীবিত পরিবারটির ক্ষতি করবে। এই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানটিকে “যৌন শুদ্ধিকরণ” বলা হয়। কিন্তু বাইবেল বিবাহের বাইরে যে কোন যৌন সম্পর্ককে “ব্যভিচার” বলে সংজ্ঞায়িত করে। যেহেতু খ্রীষ্টানদের “ব্যভিচার হইতে পলায়ন” করা উচিত, তারা সাহসের সঙ্গে এই অশাস্ত্রীয় প্রথার বিরোধিতা করেন।—১ করিন্থীয় ৬:১৮.
মারসী নামে এক বিধবার কথা চিন্তা করুন।a ১৯৮৯ সালে যখন তার স্বামী মারা যান, আত্মীয়েরা চেয়েছিলেন যে একজন পুরুষ আত্মীয়ের সঙ্গে যেন তিনি “যৌন শুদ্ধিকরণ” প্রথা সম্পন্ন করেন। তিনি এই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ঈশ্বরের ব্যবস্থার বিরোধী এই বিষয়ে ব্যাখ্যা করে তা করতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ব্যর্থ হয়ে তার আত্মীয়েরা তাকে অকথ্য গালিগালাজ করেছিলেন। একমাস পরে তারা তার ঘরের ছাদ থেকে লোহার পাতগুলি খুলে নিয়ে তার ঘর তছনছ করে দিয়েছিলেন। আর তারা বলেছিলেন “তোমার ধর্ম তোমার দেখাশোনা করবে।”
মণ্ডলী মারসীকে সান্ত্বনা দিয়েছিল ও এমনকি তার জন্য একটি নতুন ঘর তৈরি করে দিয়েছিল। প্রতিবেশীরা এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে কিছুজন এই নির্মাণ কাজে অংশ নেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর গ্রামের প্রধানের স্ত্রী যিনি ক্যাথলিক ছিলেন সবচেয়ে প্রথমে ছাদের জন্য ঘাস নিয়ে এসেছিলেন। মারসীর বিশ্বস্ত আচরণ তার সন্তানদের উৎসাহিত করেছিল। সেই সময় থেকে তাদের মধ্যে চারজন যিহোবা ঈশ্বরের প্রতি নিজেদের উৎসর্গ করেছে ও একজন সম্প্রতি পরিচারক দাস প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়ে যোগদান করেছে।
যৌন শুদ্ধিকরণ প্রথার কারণে কিছু খ্রীষ্টানেরা অবিশ্বাসীদের সঙ্গে বিবাহ করার চাপের মধ্যে পড়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, ৭০ বছর বয়স্ক এক বিপত্নীক ব্যক্তি তার মৃত স্ত্রীর এক যুবতী আত্মীয়কে শীঘ্রই বিবাহ করেছিলেন। এটি করার দ্বারা তিনি দাবি করতে পারতেন যে তিনি যৌন শুদ্ধিকরণের প্রথা পালন করেছেন। কিন্তু এইধরনের পদক্ষেপ খ্রীষ্টানদের যে “কেবল প্রভুতেই” বিবাহ করা উচিত, বাইবেলের এই পরামর্শের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধায়।—১ করিন্থীয় ৭:৩৯.
সারা রাত জেগে অনুষ্ঠান
অনেক দেশে শোকার্তেরা মৃত ব্যক্তির ঘরে একত্রিত হন আর সারা রাত জেগে থাকেন। এই জাগরণের সময় প্রায়ই খাওয়া দাওয়া ও উচ্চৈঃস্বরে গান বাজনা করা হয়ে থাকে। বিশ্বাস করা হয় যে এটি মৃত ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করবে আর জীবিত পরিবারকে ডাকিনী প্রভাব থেকে রক্ষা করবে। মৃত ব্যক্তির অনুগ্রহ লাভ করার জন্য তোষামোদপূর্ণ ভাষণ দেওয়া হয়ে থাকে। একটি ভাষণের পর হয়ত শোকার্তেরা একটি ধর্মীয় গান গাইতে পারেন ও তারপর আরেকজন ব্যক্তি ভাষণ দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ান। এটি হয়ত ভোর হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে।b
সত্য খ্রীষ্টানেরা এই সারা রাত ধরে জেগে থাকার অনুষ্ঠানে যোগ দেন না কারণ বাইবেল দেখায় যে মৃতেরা জীবিতদের সাহায্য বা ক্ষতি করতে অসমর্থ। (আদিপুস্তক ৩:১৯; গীতসংহিতা ১৪৬:৩, ৪; যোহন ১১:১১-১৪) শাস্ত্র প্রেতচর্চার অভ্যাসকে নিন্দা করে। (প্রকাশিত বাক্য ৯:২১; ২২:১৫) তবুও, একজন খ্রীষ্টান বিধবা হয়ত অন্যদের প্রেতচর্চার সঙ্গে যুক্ত অভ্যাসগুলি পালন করাকে প্রতিরোধ করা কঠিন বলে মনে করতে পারেন। তারা হয়ত জোর করে তার ঘরে সারা রাত ধরে জেগে থাকার জন্য ব্যবস্থা করতে পারেন। সহবিশ্বাসীরা সেই শোকার্ত খ্রীষ্টানকে সাহায্য করার জন্য কী করতে পারেন যিনি এই অতিরিক্ত ক্লেশ ভোগ করছেন?
তাদের আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুক্তি করার দ্বারা মণ্ডলীর প্রাচীনেরা প্রায়ই এক শোকার্ত পরিবারকে সহায়তা করতে পেরেছেন। এইধরনের যুক্তি করার পর এই ব্যক্তিরা হয়ত শান্তিপূর্ণভাবে সেই ঘর থেকে চলে আসতে ও অন্যদিন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কাজের জন্য আবার একত্রিত হতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু যদি কিছুজন প্রতিরোধী হন তখন কী করা যেতে পারে? ক্রমাগত যুক্তি করে চলার প্রচেষ্টার ফলে হয়ত ঝামেলার সৃষ্টি হতে পারে। “যুদ্ধ করা প্রভুর দাসের উপযুক্ত নহে; . . . কিন্তু সকলের প্রতি সহনশীল হওয়া উচিত।” (২ তীমথিয় ২:২৪, ২৫) তাই যদি অসহযোগী আত্মীয়েরা সংঘাতমূলক কাজ করেন, তাহলে একজন খ্রীষ্টান বিধবা ও তার সন্তানেরা হয়ত এটি প্রতিরোধ করতে পারবেন না। কিন্তু তারা কোন মিথ্যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না যা তাদের ঘরেতেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে কারণ তারা বাইবেলের আজ্ঞা পালন করেন: “তোমরা অবিশ্বাসীদের সহিত অসমভাবে যোঁয়ালিতে বদ্ধ হইও না।”—২ করিন্থীয় ৬:১৪.
এই নীতি সমাধির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যিহোবার সাক্ষীরা মিথ্যা ধর্মের এক পরিচারকের দ্বারা নির্দেশকৃত গান, প্রার্থনা অথবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন না। সেই সমস্ত খ্রীষ্টানদের পরিবারের নিকটতম সদস্যেরা যদি এইধরনের এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা জরুরি বলে মনে করেন, তবুও তারা অংশ গ্রহণ করবেন না।—২ করিন্থীয় ৬:১৭; প্রকাশিত বাক্য ১৮:৪
মর্যাদাপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান
যিহোবার সাক্ষীদের দ্বারা কৃত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান মৃতদের সন্তুষ্ট করার জন্য অভিপ্রেত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলিকে জড়িত করে না। হয় কিংডম হলে, মৃত ব্যক্তির গৃহে অথবা কবরস্থানে বাইবেল ভিত্তিক এক বক্তৃতা দেওয়া হয়। এই বক্তৃতার উদ্দেশ্য হল বাইবেল মৃত ব্যক্তিদের ও পুনরুত্থানের আশা সম্বন্ধে কী জানায় তা ব্যক্ত করার দ্বারা শোকার্তদের সান্ত্বনা দেওয়া। (যোহন ১১:২৫; রোমীয় ৫:১২; ২ পিতর ৩:১৩) শাস্ত্রভিত্তিক একটি গান হয়ত গাওয়া হয়ে থাকে আর অনুষ্ঠানটি এক সান্ত্বনাজনক প্রার্থনার দ্বারা শেষ করা হয়।
সম্প্রতি, একজন যিহোবার সাক্ষীর জন্য এইধরনের একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হয়েছিল, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি নেলসন মেন্ডেলার বোন ছিলেন। অনুষ্ঠানের পর, রাষ্ট্রপতি বক্তাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। অনেক গণ্যমান্য ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। “আমার দেখা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে এটিই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাপূর্ণ,” মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রী বলেছিলেন।
শোকের পোশাক কি গ্রহণযোগ্য?
যিহোবার সাক্ষীরা প্রিয়জনদের মৃত্যুতে শোক করেন। যীশুর মত তারা অশ্রুপাতও করেন। (যোহন ১১:৩৫, ৩৬) কিন্তু তারা লোক জানাজানি করে জনসমক্ষে কিছু প্রতীকের দ্বারা তাদের দুঃখ প্রকাশ করাকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন না। (মথি ৬:১৬-১৮ পদের সাথে তুলনা করুন।) অনেক দেশে আশা করা হয় যে বিধবারা মৃত ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিশেষ শোকের পোশাক পরবেন। এই পোশাক অবশ্যই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরেও বেশ কিছু মাস বা এমনকি একবছর পরতে হবে আর সেটি ছাড়ার জন্য আর একটি বড় অনুষ্ঠান করা হবে।
শোকের চিহ্ন দেখাতে ব্যর্থ হওয়া মৃত ব্যক্তিকে অপমান করা বলে মনে করা হয়। এই কারণে সোয়াজিল্যান্ডের কিছু অংশের আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রধান ব্যক্তিরা যিহোবার সাক্ষীদের তাদের ঘর ও জায়গা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই বিশ্বস্ত খ্রীষ্টানেরা সর্বদা বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী তাদের আধ্যাত্মিক ভাইদের দ্বারা যত্ন পেয়েছেন।
সোয়াজিল্যান্ড উচ্চ আদালত যিহোবার সাক্ষীদের স্বপক্ষে রায় দিয়েছে যে তারা তাদের ঘরে ও জায়গায় ফিরে আসতে পারবেন। আরেকটি ক্ষেত্রে, একজন খ্রীষ্টান বিধবা একটি চিঠি ও টেপ সকলকে শোনানোর পরে তার নিজের জায়গায় থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন যাতে তার প্রয়াত স্বামী স্পষ্ট করে বলে গিয়েছিলেন যে তার স্ত্রী কোন শোকের পোশাক পরবেন না। তাই তিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন যে তিনি প্রকৃতই তার স্বামীকে সম্মান করেন।
একজনের মৃত্যুর পূর্বেই স্পষ্টভাবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নির্দেশাবলি জানিয়ে রাখার প্রচুর মূল্য রয়েছে, বিশেষভাবে সেই স্থানগুলিতে যেখানে অশাস্ত্রীয় অভ্যাসগুলি প্রচুররূপে বিদ্যমান। ক্যামেরুনের অধিবাসী ভিক্টরের উদাহরণটি বিবেচনা করুন। তিনি তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যে কার্যক্রম পালন করা হবে সেই সম্বন্ধে লিখে গিয়েছিলেন। তার পরিবারে অনেক প্রভাবসম্পন্ন ব্যক্তিরা ছিলেন, যাদের সংস্কৃতিতে মৃতদের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য কিছু দৃঢ় পরম্পরাগত প্রথা পালন করা হত, যেটির অন্তর্ভুক্ত ছিল মানুষের মাথার খুলির উপাসনা। যেহেতু ভিক্টর পরিবারের একজন সম্মানিত সদস্য ছিলেন, তাই তিনি জানতেন যে তার মাথার খুলির জন্যও সম্ভবত তাই করা হবে। তাই যিহোবার সাক্ষীরা তার অন্ত্যেষ্ট্রিক্রিয়া কিভাবে সম্পন্ন করবেন, সেই সম্বন্ধে তিনি স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। এটি তার বিধবা স্ত্রী ও তার সন্তানদের জন্য পরিস্থিতিকে সহজ করে দিয়েছিল এবং সমাজের কাছে এক ভাল সাক্ষ্য দেওয়া গিয়েছিল।
অশাস্ত্রীয় প্রথাগুলি অনুকরণ করাকে এড়িয়ে চলুন
বাইবেলের জ্ঞানসম্পন্ন কিছু ব্যক্তিরা নিজেদের পৃথক হিসাবে দেখাতে ভয় পান। উৎপীড়ন এড়ানোর জন্য, মৃতদের জন্য সারারাত ধরে জেগে থাকার পরম্পরাগত প্রথা পালন করার দ্বারা তারা তাদের প্রতিবেশীদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। শোকার্ত পরিবারকে ব্যক্তিগতভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাদের কাছে যাওয়া যদিও প্রশংসনীয় কিন্তু এর জন্য প্রকৃত অন্ত্যেষ্টিক্রয়ার অনুষ্ঠানের পূর্বে, সম্প্রতি মৃত ব্যক্তির গৃহে প্রতিদিন ছোট আকারে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান করার কোন প্রয়োজন নেই। এটি করা হয়ত উপস্থিত অন্যান্যদের বিঘ্ন জন্মাতে পারে কারণ এটি হয়ত তাদের এই ধারণা দিতে পারে যে অংশগ্রহণকারীরা আসলে মৃতদের অবস্থা সম্বন্ধে বাইবেল যা বলে সেই সম্বন্ধে প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাস করেন না।—১ করিন্থীয় ১০:৩২.
বাইবেল খ্রীষ্টানদের তাদের জীবনে ঈশ্বরের উপাসনাকে প্রথম স্থানে রাখতে এবং তাদের সময় বিজ্ঞতার সঙ্গে ব্যবহার করার জন্য পরামর্শ দেয়। (মথি ৬:৩৩; ইফিষীয় ৫:১৫, ১৬) কিছু স্থানে, একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানের জন্য এক সপ্তাহ অথবা তারও বেশি সময়ের জন্য মণ্ডলীর কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই সমস্যাটি আফ্রিকায় নতুন নয়। একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান সম্বন্ধে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা একটি বিবৃতি জানায়: “তিনটি খ্রীষ্টীয় সভায় উপস্থিতি অনেক কম ছিল। প্রায় দশ দিনের মত ক্ষেত্রের পরিচর্যায় কেউ আসেননি। আমাদের কিছু ভাইবোনেরা এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন, তা দেখে এমনকি মণ্ডলীর বাইরের লোক এবং বাইবেল ছাত্ররাও আশ্চর্য ও হতাশ হয়েছিলেন।”
কিছু সমাজে, এক শোকার্ত পরিবার হয়ত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানের পর কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে তাদের ঘরে হালকা জলখাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। কিন্তু আফ্রিকার কিছু অংশে শত শত ব্যক্তি যারা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দেন তারা সেই মৃত ব্যক্তির গৃহে উপস্থিত হন এবং একটি ভোজের আশা করেন, যেখানে প্রায়ই পশু হত্যা করা হয়। খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত কিছু ব্যক্তিরা এই প্রথাকে অনুকরণ করেছেন যা এই ধারণা প্রদান করে যে তারা মৃতদের তৃপ্ত করার জন্য প্রথাগত ভোজকে পালন করছেন।
যিহোবার সাক্ষীদের দ্বারা পরিচালিত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান শোকার্ত ব্যক্তিদের উপর খরচের বোঝা চাপিয়ে দেয় না। তাই অত্যন্ত ব্যয়বহুল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচ মেটাতে, উপস্থিত ব্যক্তিদের অর্থ দেওয়ার জন্য কোন বিশেষ ব্যবস্থা করার প্রয়োজন নেই। দরিদ্র বিধবারা যদি প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে না পারেন, মণ্ডলীর অন্যান্যেরা নিঃসন্দেহে তাকে সাহায্য করার জন্য আনন্দিত হবেন। এইধরনের সাহায্য যদি অপর্যাপ্ত হয়, প্রাচীনেরা হয়ত যোগ্য ব্যক্তিদের বস্তুগত সাহায্য প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারেন।—১ তীমথিয় ৫:৩, ৪.
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রথা সর্বদা বাইবেলের নীতিগুলির সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধায় না। যখন সেগুলি সংঘর্ষের সৃষ্টি করে, খ্রীষ্টানেরা শাস্ত্রের সঙ্গে সংগতি রাখার জন্য স্থিরপ্রতিজ্ঞ থাকেন।c (প্রেরিত ৫:২৯) এটি হয়ত অতিরিক্ত ক্লেশ আনতে পারে কিন্তু ঈশ্বরের অনেক দাসেরা সাক্ষ্য দিতে পারেন যে তারা এইধরনের পরীক্ষাগুলি থেকে সফলতার সঙ্গে উর্ত্তীর্ণ হয়েছেন। তারা “সমস্ত সান্ত্বনার ঈশ্বর,” যিহোবার শক্তিতে এবং সহবিশ্বাসীরা যারা তাদের ক্লেশের সময় সান্ত্বনা দিয়েছিলেন তাদের প্রেমময় সাহায্যের ফলে সেরূপ করেছেন।—২ করিন্থীয় ১:৩, ৪.
[পাদটীকাগুলো]
a এই প্রবন্ধে বিকল্প নামগুলি ব্যবহার করা হয়েছে।
b কিছু কিছু ভাষা ও সংস্কৃতির লোকেদের কাছে “জেগে থাকা” এই পরিভাষাটি শোকার্তদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকে বোঝায়। সেটির সঙ্গে অশাস্ত্রীয় কিছু হয়ত যুক্ত নেই। ১৯৭৯ সালের মে ২২, সচেতন থাক! (ইংরাজি) পত্রিকার পৃষ্ঠা ২৭-৮ দেখুন।
c অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রথাগুলি যেহেতু খ্রীষ্টানদের উপর চরম পরীক্ষা নিয়ে আসতে পারে, প্রাচীনেরা বাপ্তিস্ম প্রার্থীদেরকে সামনে যা ঘটতে পারে তার জন্য প্রস্তুত করতে পারেন। এই নতুন ব্যক্তিদের সঙ্গে আমাদের পরিচর্যা সম্পাদন করতে সংগঠিত (ইংরাজি) বইটি থেকে প্রশ্নাদি আলোচনা করার সময় “প্রাণ, পাপ ও মৃত্যু” এবং “আন্তধর্মীয় বিশ্বাস” বিভাগগুলি আলোচনা করার সময় বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত। এই দুটিতেই আলোচনার জন্য ঐচ্ছিক প্রশ্নগুলি রয়েছে। এই সময়েই প্রাচীনেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অশাস্ত্রীয় প্রথাগুলি আলোচনা করতে পারেন যাতে বাপ্তিস্ম প্রার্থীরা জানতে পারেন যে এইধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে তাদের কী করা উচিত আর সেই সম্বন্ধে ঈশ্বরের বাক্য তাদের কাছ থেকে কী চায়।
[২৩ পৃষ্ঠার বাক্স]
তাদের দৃঢ় পদক্ষেপের জন্য আশীর্বাদপ্রাপ্ত
সিবোনগিলি, সোয়াজিল্যান্ডে বসবাসরত একজন সাহসী খ্রীষ্টান। সম্প্রতি তিনি তার স্বামীর মৃত্যুর পর মৃতদের তৃপ্ত করার জন্য লোকেদের মনগড়া প্রথাগুলি অনুসরণ করতে প্রত্যাখ্যান করেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি তার মাথার চুল কেটে ফেলেননি। (দ্বিতীয় বিবরণ ১৪:১) পরিবারের আটজন সদস্য তার উপর রেগে গিয়েছিলেন ও জোর করে তার মাথার চুল কেটে দিয়েছিলেন। এছাড়াও তারা সিবোনগিলিকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য যিহোবার সাক্ষীদের ঘরে আসাকেও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজ্যের বার্তার প্রতি আগ্রহী অন্যান্য ব্যক্তিবিশেষেরা প্রাচীনদের দ্বারা লিখিত উৎসাহমূলক চিঠিগুলি নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে আসতে আনন্দিত ছিলেন। একদিন যখন প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে সিবোনগিলি বিশেষধরনের শোকের পোশাক পরবেন, সেদিন আশ্চর্যজনক কিছু ঘটেছিল। পরিবারের এক প্রভাবশালী সদস্য তার পরম্পরাগত শোকের প্রথাগুলি পালন করার প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি আলোচনা করার জন্য একটি সভা আহ্বান করেন।
সিবোনগিলি বর্ণনা করেন: “তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে আমার ধর্মীয় পদ্ধতি আমাকে কালো শোকের পোশাক পরে দুঃখ প্রকাশ করতে অনুমতি দেয় কি না। আমার অবস্থা সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করার পর তারা আমাকে বলেছিলেন যে তারা আমাকে জোর করবেন না। আমি আরও আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম যখন তারা সকলে আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার ও আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার চুল কেটে দেওয়ার দোষ স্বীকার করেছিলেন। তারা সকলে আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।” পরবর্তী সময়ে, সিবোনগিলির বোন তার মতামত প্রকাশ করেছিলেন যে যিহোবার সাক্ষীরাই সত্য ধর্ম পালন করেন আর তিনি একটি বাইবেল অধ্যয়নের জন্য অনুরোধ জানান।
আরেকটি উদাহরণ বিবেচনা করুন: বেঞ্জামিন নামে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন ব্যক্তি ২৯ বছর বয়স্ক ছিলেন যখন তিনি তার পিতার আকস্মিক মৃত্যুর কথা শোনেন। সেই সময়ে বেঞ্জামিন তার পরিবারে কেবল একাই সাক্ষী ছিলেন। সমাধি অনুষ্ঠানের সময় সকলের কাছে প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে তারা কবরের চতুর্দিকে ঘুরে শবাধারের উপর একমুঠো মাটি দেবেন।d সমাধি হয়ে যাওয়ার পর সমস্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়েরা তাদের চুল কেটে ফেলেন। যেহেতু বেঞ্জামিন এই ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানে অংশ নেননি, তাই প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যেরা অনুমান করেছিলেন যে পিতার মৃত আত্মা তাকে শাস্তি দেবে।
“যেহেতু আমি যিহোবার উপর আস্থা রেখেছিলাম, তাই আমার কিছুই হয়নি,” বেঞ্জামিন বলেন। তার ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল তা পরিবারের সদস্যেরা লক্ষ্য করেছিলেন। কালক্রমে, তাদের মধ্যে অনেকে যিহোবার সাক্ষীদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করতে শুরু করেছিলেন ও ঈশ্বরের কাছে তাদের জীবন উৎসর্গীকরণের প্রতীকস্বরূপ বাপ্তিস্ম নিয়েছিলেন। আর বেঞ্জামিন? তিনি পূর্ণ সময়ের সুসমাচার প্রচারকের কাজে প্রবেশ করেছিলেন। বিগত কয়েক বছর ধরে তিনি ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসাবে যিহোবার সাক্ষীদের মণ্ডলীগুলিতে সেবা করার উত্তম সুযোগ উপভোগ করছেন।
[পাদটীকা]
d কিছুজন কবরে ফুল ছুঁড়ে দেওয়া বা একমুঠো মাটি দেওয়াকে ভুল বলে মনে করেন না। কিন্তু একজন খ্রীষ্টান এই অভ্যাসকে এড়িয়ে চলবেন যদি সমাজ এটিকে মৃত ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করার বা মিথ্যা ধর্মের একজন পরিচারকের দ্বারা পরিচালিত অনুষ্ঠানের একটি অংশ হিসাবে মনে করেন।—১৯৯৭ সালের মার্চ ২২, সচেতন থাক! (ইংরাজি) পত্রিকার পৃষ্ঠা ১৫ দেখুন।