“ইপিকুরেয়দের”—থেকে সাবধান
“তিনি খুব ভাল! তিনি উচ্চ নৈতিক মানগুলির দ্বারা জীবনযাপন করেন। তিনি ধূমপান করেন না, নেশাকর ওষুধের অপব্যবহার করেন না কিংবা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেন না। বস্তুতপক্ষে, খ্রীষ্টান বলে দাবি করে এমন কিছু ব্যক্তির চেয়ে তিনি অনেক বেশি ভাল!”
অনুপযুক্ত বন্ধুত্ব গড়ে তোলার বৈধতা দেখানোর জন্য আপনি কি কিছুজনকে এইধরনের যুক্তিধারা ব্যবহার করতে শুনেছেন? এটি কি শাস্ত্রীয় পরীক্ষার অধীনে আসে? একটি প্রাথমিক খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর এক উদাহরণ এই বিষয়টির উপর আলোকপাত করে।
প্রথম শতাব্দীতে, প্রেরিত পৌল করিন্থীয় মণ্ডলীকে সাবধান করেছিলেন: “ভ্রান্ত হইও না, কুসংসর্গ শিষ্টাচার নষ্ট করে।” সম্ভবত, কিছু খ্রীষ্টানেরা এমন ব্যক্তিবিশেষদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করছিল যারা গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিল আর যার মধ্যে এই ইপিকুরেয়রাও ছিল। এই ইপিকুরেয়রা কারা? কেন তারা করিন্থের খ্রীষ্টানদের কাছে এক আধ্যাত্মিক ভীতিস্বরূপ হবে? আজকের দিনে কি তাদের মত লোকেরা রয়েছে, যাদের থেকে আমাদের নিজেদেরকে রক্ষা করা উচিত?—১ করিন্থীয় ১৫:৩৩.
এই ইপিকুরেয়রা কারা?
ইপিকুরেয়রা গ্রীক দার্শনিক ইপিকুরাসের অনুগামী ছিল, যিনি সা.কা.পূ. ৩৪১ থেকে ২৭০ সালের মধ্যে জীবিত ছিলেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন যে সুখই জীবনের একমাত্র অথবা মুখ্য বিষয়। এর অর্থ কি এই যে ক্রমাগত সুখ খোঁজার জন্য ইপিকুরেয়রা নিম্নগামী অভ্যাসগুলিতে রত থেকে কলঙ্কপূর্ণভাবে, নীতিহীন জীবন যাপন করত? আশ্চর্যের বিষয় যে, ইপিকুরাস তার অনুগামীদের সেইভাবে জীবন যাপন করতে শিক্ষা দেননি! বরঞ্চ, তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন যে বিচক্ষণতা, সাহস, আত্ম-সংযম এবং ন্যায়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জীবনধারণের দ্বারা অর্জিত সুখই সর্বোত্তম। তিনি তাৎক্ষণিক এবং ক্ষণস্থায়ী সুখ নয় কিন্তু সমগ্র জীবনব্যাপী চিরস্থায়ী সুখ লাভের চেষ্টাকে সমর্থন করেছিলেন। তাই যারা গুরুতর পাপাভ্যাস করে তাদের তুলনায় ইপিকুরেয়রা হয়ত সদ্গুণসম্পন্ন বলে প্রতীয়মান হয়েছে।—তীত ১:১২ পদের সাথে তুলনা করুন।
খ্রীষ্টতত্ত্বের অনুরূপ?
আপনি যদি প্রাথমিক করিন্থীয় মণ্ডলীর একজন সদস্য হতেন, আপনি কি ইপিকুরেয়দের দ্বারা প্রভাবিত হতেন? কেউ কেউ হয়ত যুক্তি করেছিল ইপিকুরেয়দের আপাত উচ্চ নীতিবোধ তাদেরকে খ্রীষ্টানদের নিরাপদ সঙ্গী করে তুলেছিল। যুক্তিসহকারে আরও বিচার করে করিন্থীয়রা হয়ত ইপিকুরেয় মানগুলি এবং ঈশ্বরের বাক্যের মানের মধ্যে সাদৃশ্য লক্ষ্য করেছিল।
উদাহরণস্বরূপ, ইপিকুরেয়রা তাদের সুখ উপভোগ করার ক্ষেত্রে পরিমিতি অবলম্বন করেছিল। তারা শারীরিক সুখের চাইতে মনের সুখকে মূল্যবান বলে গণ্য করেছিল। একজন ব্যক্তি কী ভোজন করেছে তা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ সেই ব্যক্তির সাথে তার সম্পর্ক যার সাথে সে তা ভোজন করছে। ইপিকুরেয়রা এমনকি রাজনৈতিক সংসর্গ এবং গুপ্ত মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকত। এটি ধারণা করা কতই না সহজ ছিল যে: “তারা একেবারে আমাদের মত!”
কিন্তু, ইপিকুরেয়রা কি সত্যই প্রাথমিক খ্রীষ্টানদের মত ছিল? একেবারেই নয়। যাদের জ্ঞানেন্দ্রিয় সকল সঠিকভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল, তারা তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্যগুলিকে নির্ণয় করতে পেরেছিল। (ইব্রীয় ৫:১৪) আপনি কি পারেন? আসুন আমরা ইপিকুরাসের শিক্ষার প্রতি নিবিড়ভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি।
ইপিকুরেয়বাদের অন্ধকারময় দিকটি
দেবদেবীদের এবং মৃত্যুর ভয়কে অতিক্রম করতে লোকেদের সাহায্য করার জন্য, ইপিকুরাস শিক্ষা দিয়েছিলেন যে মানবজাতির সম্বন্ধে দেবতাদের কোন আগ্রহ নেই এবং তারা মানুষের বিষয়গুলিতে কোনরকম হস্তক্ষেপও করে না। ইপিকুরাসের মতানুসারে, দেবতারা বিশ্ব সৃষ্টি করেনি আর জীবন আকস্মিকভাবে অস্তিত্বে এসেছে। এটি কি বাইবেলের সেই শিক্ষার সাথে স্পষ্টভাবে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে না যা বলে “একজন ঈশ্বর,” সৃষ্টিকর্তা আছেন আর তিনি তাঁর মনুষ্য প্রাণীদের জন্য চিন্তা করেন?—১ করিন্থীয় ৮:৬; ইফিষীয় ৪:৬; ১ পিতর ৫:৬, ৭.
ইপিকুরাস এও শিক্ষা দিয়েছিলেন যে মৃত্যুর পরে কোন জীবন থাকতে পারে না। এটি অবশ্যই বাইবেলের পুনরুত্থান সম্বন্ধীয় শিক্ষার বিপরীত। বস্তুতপক্ষে, প্রেরিত পৌল যখন আরেয়পাগে কথা বলেছিলেন, তখন সম্ভবত ইপিকুরেয়রা তাদের মধ্যে ছিল যারা পুনরুত্থানের মতবাদ সম্বন্ধে পৌলের সাথে মতবিরোধ করেছিল।—প্রেরিত ১৭:১৮, ৩১, ৩২; ১ করিন্থীয় ১৫:১২-১৪.
হয়ত ইপিকুরাসের দর্শনের সর্বাপেক্ষা বিপদজনক উপকরণটি সবচেয়ে বেশি দুর্বোধ্য ছিল। পরবর্তী এক জীবনের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা তাকে এই উপসংহারে নিয়ে এসেছিল যে পৃথিবীতে তার সংক্ষিপ্ত সময়কালের মধ্যে যতটা সম্ভব মানুষের সুখে জীবন যাপন করা উচিত। যেমন আমরা দেখেছি, তার মতবাদটি আবশ্যিকভাবে পাপপূর্ণ জীবনযাপন করা সম্বন্ধীয় ছিল না বরঞ্চ, তা ছিল বর্তমানকে উপভোগ করা, যেহেতু এর পরে আর কোন জীবন নেই।
তাই, প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়কে এড়ানোর জন্য ইপিকুরাস গুপ্তভাবে অন্যায় করাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন যা বর্তমান সুখের ক্ষেত্রে এক নিশ্চিত বাধাস্বরূপ। মাত্রাতিরিক্তের পরিণামকে এড়ানোর জন্য তিনি পরিমিতিকে উৎসাহিত করেছিলেন যা বর্তমান সুখের পক্ষে আরেকটি প্রতিবন্ধক। এছাড়া তিনি অন্যদের সাথে উত্তম সম্পর্ক রাখার বিষয়টিকে উৎসাহিত করেছিলেন কারণ পারস্পরিক বিনিময় উপকারজনক হয়। অবশ্যই, গুপ্তভাবে অন্যায় করাকে এড়িয়ে চলা, পরিমিতি অভ্যাস করা এবং বন্ধুত্ব গড়ে তোলা প্রশংসনীয় কাজ। তাহলে ইপিকুরাসের দর্শন কেন একজন খ্রীষ্টানের জন্য বিপদজনক ছিল? কারণ তার উপদেশ তার এই বিশ্বাসহীন দৃষ্টিভঙ্গি ভিত্তিক ছিল: “‘আইস, আমরা ভোজন পান করি, কেননা কল্য মরিব’।”—১ করিন্থীয় ১৫:৩২.
এটি স্বীকার্য যে, বাইবেল লোকেদের দেখায়, কিভাবে এখন সুখে জীবনযাপন করা যায়। কিন্তু, এটি উপদেশ দেয়: “ঈশ্বরের প্রেমে আপনাদিগকে রক্ষা কর, এবং অনন্ত জীবনের জন্য আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টের দয়ার অপেক্ষায় থাক।” (যিহূদা ২১) হ্যাঁ, বাইবেল ক্ষণস্থায়ী বর্তমানের উপর নয় কিন্তু অনন্তকালীন ভবিষ্যতের উপরে বেশি জোর দেয়। একজন খ্রীষ্টানের জন্য, ঈশ্বরের সেবা করাই হল মুখ্য বিষয় আর তাই যখন সে ঈশ্বরকে প্রথম স্থানে রাখে, সে সুখী এবং পূর্ণতা খুঁজে পায়। অনুরূপভাবে, যীশু তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত আগ্রহগুলির দ্বারা আবিষ্ট হওয়ার চাইতে তাঁর শক্তিকে নিঃস্বার্থভাবে যিহোবার সেবায় এবং লোকেদের সাহায্য করায় ব্যয় করেছিলেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের অন্যদের প্রতি ভাল করতে শিক্ষা দিয়েছিলেন কিছু পাওয়ার আশায় নয় কিন্তু তাদের জন্য অকৃত্রিম প্রেমবশত। স্পষ্টতই, ইপিকুরেয়বাদ এবং খ্রীষ্টতত্ত্বের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলি একেবারে আলাদা।—মার্ক ১২:২৮-৩১; লূক ৬:৩২-৩৬; গালাতীয় ৫:১৪; ফিলিপীয় ২:২-৪.
এক দুর্বোধ্য ঝুঁকি
কর্তৃত্বব্যাঞ্জকরূপে, সুখী হওয়ার উপর ইপিকুরেয়রা এইরকম জোর দেওয়া সত্ত্বেও, প্রকৃত অর্থে তাদের সুখ খুবই সীমিত ছিল। “সদাপ্রভুতে যে আনন্দ” তার অভাব থাকায় ইপিকুরাস জীবনকে এক “তীক্ত উপহার” বলে অভিহিত করেছিলেন। (নহিমিয় ৮:১০) তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক খ্রীষ্টানেরা কতই না সুখী ছিল! যীশু নিজেকে বঞ্চিত করে এক অসুখী জীবনের সুপারিশ করছিলেন না। বস্তুতপক্ষে, তাঁর পথ অনুসরণ করা হল মহত্তর সুখের পথ।—মথি ৫:৩-১২.
যদি করিন্থ মণ্ডলীর কিছু সদস্য ভেবে থাকে যে তাদের বিশ্বাস বিপন্ন না করেই তারা ইপিকুরেয়ীয় চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা করতে পারে, তাহলে তারা ভুল ছিল। করিন্থীয়দের উদ্দেশ্যে পৌল যখন তার প্রথম পত্রটি লেখেন, সেই সময়ে ইতিমধ্যেই তাদের কিছুজন পুনরুত্থান সম্বন্ধে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল।—১ করিন্থীয় ১৫:১২-১৯.
আজকে ইপিকুরেয়বাদ?
যদিও সা.কা. চতুর্থ শতাব্দীতে ইপিকুরেয়বাদ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, তবুও আজকের দিনে এমন ব্যক্তিরা আছে যারা বর্তমান জীবনই সবকিছু এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। এই লোকেরা অনন্ত জীবন সম্বন্ধে ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞায় অল্পই বিশ্বাস করে অথবা একেবারেই করে না। তবুও, এদের কিছুজনের আচরণের ক্ষেত্রে আপেক্ষিক উচ্চ মানগুলি রয়েছে।
একজন খ্রীষ্টান হয়ত এই প্রকার ব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে প্রলুব্ধ হতে পারে, সম্ভবত এই যুক্তি দেখিয়ে যে তাদের শোভনীয় গুণগুলি বন্ধুত্বের যোগ্যতা রাখে। কিন্তু যদিও আমরা নিজেদের উৎকৃষ্ট বলে বিবেচনা করি না, তবুও আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে সমস্ত “কুসংসর্গ”—যার অন্তর্ভুক্ত তারা যাদের প্রভাব আরও বেশি দুর্বোধ্য—“শিষ্টাচার নষ্ট করে।”
এছাড়া বর্তমান জীবনই সবকিছু দর্শন কিছু বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে, আত্ম সাহায্যের বইগুলি, উপন্যাস, চলচিত্র, দূরদর্শন কার্যক্রম এবং সংগীতে খুবই সুলভ। যদিও সরাসরিভাবে পাপপূর্ণ আচরণকে উন্নীত করে না কিন্তু এই বিশ্বাসহীন দৃষ্টিভঙ্গি কি দুর্বোধ্য উপায়গুলির দ্বারা আমাদের প্রভাবিত করতে পারে? উদাহরণস্বরূপ, আমরা কি আত্ম পরিপূর্ণতায় এত বেশি আবিষ্ট হয়ে যাই যে আমরা যিহোবার সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সম্বন্ধে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলি? ‘প্রভুর কার্য্যে উপচিয়া পড়ার’ পরিবর্তে আমরা কি এই চিন্তাধারার দ্বারা পথভ্রষ্ট হব যে ‘অল্প করাই’ যথেষ্ট? অথবা আমরা কি যিহোবার মানদণ্ডের সঠিকতা এবং উপকারিতাগুলিকে সন্দেহ করার দ্বারা বিপথে চালিত হতে পারি? আমাদের অনৈতিকতা, দৌরাত্ম্য ও প্রেতচর্চার সরাসরি প্রকাশ এবং যারা জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রভাবিত তাদের সম্পর্কেও সাবধান থাকতে হবে!—১ করিন্থীয় ১৫:৫৮; কলসীয় ২:৮.
সুতরাং, আসুন আমরা প্রধানত তাদের সাথে সাহচর্য গড়ে তুলি যারা পূর্ণ হৃদয়ে যিহোবার নির্দেশনা অনুসরণ করে। (যিশাইয় ৪৮:১৭) ফলস্বরূপ, আমাদের শিষ্টাচার শক্তিশালী হবে। আমাদের বিশ্বাস বলশালী হবে। আর আমরা অনন্ত জীবন দৃষ্টিতে রেখে কেবলমাত্র এখনই নয় কিন্তু ভবিষ্যতে সুখে বাস করব।—গীতসংহিতা ২৬:৪, ৫; হিতোপদেশ ১৩:২০.
[২৪ পৃষ্ঠার চিত্র]
ইপিকুরাস শিক্ষা দিয়েছিলেন যে মানবজাতির সম্বন্ধে দেবতাদের কোন আগ্রহ নেই
[সজন্যে]
Courtesy of The British Museum