“সদাপ্রভু আপন প্রজাদিগকে দূর করিবেন না”
“ধার্ম্মিকের বিপদ অনেক, কিন্তু সেই সকল হইতে সদাপ্রভু তাহাকে উদ্ধার করেন।”—গীতসংহিতা ৩৪:১৯.
১, ২. (ক) বর্তমানে যিহোবা কিভাবে তাঁর লোকেদের আশীর্বাদ করছেন? (খ) অনেক খ্রীষ্টানেরা কিসের সম্মুখীন হচ্ছে এবং কোন্ প্রশ্নগুলির উদ্ভব হয়?
বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূর্ণতা অনুসারে, যিহোবার উপাসকেরা আধ্যাত্মিক পরমদেশে বাস করে। (২ করিন্থীয় ১২:১-৪) যিহোবার সাক্ষীরা এক আন্তর্জাতিক সাহচর্যের অংশ যা প্রেম এবং একতার দ্বারা বিশেষভাবে চিহ্নিত। (যোহন ১৩:৩৫) তারা বাইবেলের সত্যগুলির গভীর এবং ব্যাপক জ্ঞান উপভোগ করে থাকে। (যিশাইয় ৫৪:১৩) তারা যিহোবার কাছে কতই না কৃতজ্ঞ যে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক তাম্বুতে তাদের অতিথি হওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন!—গীতসংহিতা ১৫:১.
২ যদিও যিহোবার সংগঠনের সকলে আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধি উপভোগ করে থাকে কিন্তু কয়েকজন তুলনামূলকভাবে শান্তি এবং উদ্বেগহীন জীবনযাপন করছে আর অপরদিকে অন্যেরা বিভিন্ন ধরনের কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছে। বহু খ্রীষ্টানেরা নিজেদের দীর্ঘ সময় ধরে দুঃখজনক পরিস্থিতিতে দেখতে পায় যেখানে উপশমের কোন আশা নেই। এইধরনের পরিস্থিতিতে নিরুৎসাহিত হওয়া স্বাভাবিক। (হিতোপদেশ ১৩:১২) দুর্দশাগুলি কি ঈশ্বরের অসন্তোষের প্রমাণ? যিহোবা কি কিছু খ্রীষ্টানের প্রতি বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা করছেন আর অন্যান্যদের পরিত্যাগ করছেন?
৩. (ক) তাঁর লোকেদের দুঃখকষ্টগুলির জন্য কি যিহোবা দায়ী? (খ) এমনকি যিহোবার বিশ্বস্ত উপাসকেরাও কেন মানবিক দুঃখভোগ সহ্য করে?
৩ বাইবেল উত্তর দেয়: “পরীক্ষার সময়ে কেহ না বলুক, ঈশ্বর হইতে আমার পরীক্ষা হইতেছে; কেননা মন্দ বিষয়ের দ্বারা ঈশ্বরের পরীক্ষা করা যাইতে পারে না, আর তিনি কাহারও পরীক্ষা করেন না।” (যাকোব ১:১৩) যিহোবা তাঁর লোকেদের রক্ষক এবং সংরক্ষণকর্তা। (গীতসংহিতা ৯১:২-৬) “সদাপ্রভু আপন প্রজাদিগকে দূর করিবেন না।” (গীতসংহিতা ৯৪:১৪) এর অর্থ এই নয় যে, বিশ্বস্ত উপাসকেরা ক্লেশ ভোগ করবে না। বর্তমান জগতের বিধিব্যবস্থা এমন ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যারা সহজাতভাবে অসিদ্ধ। অনেকেই কলুষিত এবং অল্পসংখ্যক পুরোপুরি মন্দ। এদের মধ্যে কেউই প্রজ্ঞার জন্য যিহোবার দিকে তাকায় না। ফলে মানুষের প্রতি আরও বেশি ক্লেশ ঘটছে। বাইবেল স্পষ্টভাবে বলে যে যিহোবার লোকেরা মানব অসিদ্ধতা এবং দুষ্টতার দুঃখদায়ক পরিণামগুলি সবসময় এড়াতে পারে না।—প্রেরিত ১৪:২২.
নিষ্ঠাবান খ্রীষ্টানেরা দুঃখভোগ আশা করতে পারে
৪. সমস্ত খ্রীষ্টানেরা এই দুষ্ট জগতে যতদিন বেঁচে থাকবে তারা কী আশা করতে পারে এবং কেন?
৪ যদিও জগতের অংশ নয়, তবুও যীশুর অনুগামীরা এই বিধিব্যবস্থার মধ্যেই বাস করে। (যোহন ১৭:১৫, ১৬) বাইবেলে শয়তানকে এই জগতের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসাবে প্রকাশ করা হয়েছে। (১ যোহন ৫:১৯) অতএব, সমস্ত খ্রীষ্টানেরা কখনও না কখনও গুরুতর সমস্যাগুলির সম্মুখীন হওয়ার আশা রাখতে পারে। এটি মনে রেখে, প্রেরিত পিতর বলেন: “তোমরা প্রবুদ্ধ হও, জাগিয়া থাক; তোমাদের বিপক্ষ দিয়াবল, গর্জ্জনকারী সিংহের ন্যায়, কাহাকে গ্রাস করিবে, তাহার অন্বেষণ করিয়া বেড়াইতেছে। তোমরা বিশ্বাসে অটল থাকিয়া তাহার প্রতিরোধ কর; তোমরা জান, জগতে অবস্থিত তোমাদের ভ্রাতৃবর্গেও সেই প্রকার নানা দুঃখভোগ সম্পন্ন হইতেছে।” (১ পিতর ৫:৮, ৯) হ্যাঁ, খ্রীষ্টানদের সমগ্র দলটি দুঃখভোগ আশা করতে পারে।
৫. যীশু কিভাবে স্পষ্ট করেছেন যে বিশ্বস্ত খ্রীষ্টানেরা জীবনে দুঃখজনক বিষয় ভোগ করবে?
৫ যদিও আমরা যিহোবাকে গভীরভাবে প্রেম করি এবং তাঁর মানগুলির প্রতি নিষ্ঠাবান থাকি, তবুও আমরা জীবনে দুঃখজনক বিষয়গুলি ভোগ করব। মথি ৭:২৪-২৭ পদে লিপিবদ্ধ তাঁর দৃষ্টান্তে যীশু তা স্পষ্ট করেছিলেন, যেখানে তিনি যারা তাঁর বাক্যগুলি পালন করে এবং যারা করে না তাদের মধ্যে বৈসাদৃশ্য তুলে ধরেন। তিনি বাধ্য শিষ্যদের একজন বিচক্ষণ ব্যক্তির সাথে তুলনা করেন যে শক্ত পাথরের উপর গৃহ নির্মাণ করে। যারা তাঁর বাক্যগুলি পালন করে না, তাদের তিনি এমন নির্বোধ ব্যক্তির সাথে তুলনা করেন যে বালির উপর তার গৃহ নির্মাণ করেছিল। এক ভয়াবহ ঝড়ের পর, শুধুমাত্র পাথরের উপর নির্মিত গৃহটি রক্ষা পায়। বিচক্ষণ ব্যক্তিটির গৃহের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করুন, “বৃষ্টি নামিল, বন্যা আসিল, বায়ু বহিল, এবং সেই গৃহে লাগিল, তথাপি তাহা পড়িল না।” যীশু প্রতিজ্ঞা করেননি যে বিচক্ষণ ব্যক্তি সবসময় শান্তি এবং উদ্বেগহীনতা উপভোগ করবে। বরঞ্চ, ব্যক্তিটির বিচক্ষণতা ঝড়ের বিরুদ্ধে তাকে নিরাপদে উত্তীর্ণ হতে প্রস্তুত করবে। রোপনকারীর দৃষ্টান্তেও অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করা হয়েছে। এখানে যীশু ব্যাখ্যা করেন যে এমনকি “সৎ ও উত্তম হৃদয়ে”-র বাধ্য উপাসকেরাও “ধৈর্য্য সহকারে ফল উৎপন্ন” করবে।—লূক ৮:৪-১৫.
৬. পৌলের অগ্নি প্রতিরোধক বস্তুগুলির দৃষ্টান্তে কারা অগ্নিময় পরীক্ষা ভোগ করে?
৬ করিন্থীয়দের প্রতি লিখিত পত্রে, প্রেরিত পৌল স্থায়ী গুণাবলি যা আমাদের পরীক্ষাগুলিকে মোকাবিলা করতে সাহায্য করে, তার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে রূপক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। স্বর্ণ, রৌপ্য এবং বহুমূল্য পাথরগুলির ন্যায় সেই অগ্নি প্রতিরোধক বস্তুগুলি ঈশ্বরীয় গুণাবলির অনুরূপ। (হিতোপদেশ ৩:১৩-১৫; ১ পিতর ১:৬, ৭ পদের সাথে তুলনা করুন।) অন্যদিকে, মাংসিক প্রবণতাগুলিকে সহজে দাহ্য এমন বস্তুগুলির সাথে তুলনা করা হয়েছে। এরপর পৌল বলেন: “প্রত্যেক ব্যক্তির কর্ম্ম সপ্রকাশ হইবে। কারণ সেই দিন তাহা ব্যক্ত করিবে, কেননা সেই দিনের প্রকাশ অগ্নিতেই হয়; আর প্রত্যেকের কর্ম্ম যে কি প্রকার, সেই অগ্নিই তাহার পরীক্ষা করিবে; যে যাহা গাঁথিয়াছে, তাহার সেই কর্ম্ম যদি থাকে, তবে সে বেতন পাইবে।” (১ করিন্থীয় ৩:১০-১৪) এখানে আবার, বাইবেল বর্ণনা করে যে আমাদের সকলকে অপরিহার্যভাবে কয়েক ধরনের অগ্নিময় পরীক্ষার মোকাবিলা করতে হবে।
৭. রোমীয় ১৫:৪ পদ অনুসারে কিভাবে শাস্ত্র আমাদের পরীক্ষাগুলি সহ্য করতে সাহায্য করে?
৭ বাইবেলে ঈশ্বরের নিষ্ঠাবান দাসেদের বহু ঘটনা রয়েছে যাদের দুর্দশাগুলিকে সহ্য করতে হয়েছিল, কখনও কখনও দীর্ঘ সময় ধরে। তথাপি, যিহোবা তাদের পরিত্যাগ করেননি। প্রেরিত পৌলের হয়ত সেই ধরনের উদাহরণগুলি মনে ছিল যখন তিনি বলেছিলেন: “পূর্ব্বকালে যাহা যাহা লিখিত হইয়াছিল, সে সকল আমাদের শিক্ষার নিমিত্তে লিখিত হইয়াছিল, যেন শাস্ত্রমূলক ধৈর্য্য ও সান্ত্বনা দ্বারা আমরা প্রত্যাশা প্রাপ্ত হই।” (রোমীয় ১৫:৪) তিনজন পুরুষের উদাহরণ বিবেচনা করুন যারা ঈশ্বরের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উপভোগ করার সাথে সাথে বহু দুর্দশা সহ্য করেছিলেন।
বাইবেলের ঘটনাগুলি থেকে আমরা কী শিখি
৮. যোষেফের ক্ষেত্রে যিহোবা কী অনুমোদন করেছিলেন এবং কতদিনের জন্য?
৮ যাকোবের পুত্র যোষেফ অল্প বয়স থেকেই যিহোবার কাছে অনুগ্রহ পেয়েছিলেন। তবুও তার নিজের দোষ না থাকা সত্ত্বেও তিনি একটার পর একটা দুর্দশা ভোগ করেছিলেন। তিনি নিজের ভাইদের দ্বারা অপহৃত হয়েছিলেন এবং তারা তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছিল। অপরিচিত এক দেশে একজন দাস হিসাবে তাকে বিক্রি করা হয়েছিল যেখানে তিনি মিথ্যাভাবে অভিযুক্ত হন এবং তাকে “কারাকূপে” রাখা হয়। (আদিপুস্তক ৪০:১৫) সেখানে, “লোকে বেড়ী দ্বারা তাঁহার চরণকে ক্লেশ দিল; তাঁহার প্রাণ লৌহে বদ্ধ হইল।” (গীতসংহিতা ১০৫:১৭, ১৮) তার দাসত্ব এবং কারাবরণের সময়ে, কোন সন্দেহ নেই যে যোষেফ মুক্তির জন্য বার বার যিহোবার কাছে মিনতি করেছিলেন। তবুও প্রায় ১৩ বছর, যিহোবার দ্বারা নানাভাবে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও একজন দাস অথবা এক বন্দী হিসাবে প্রত্যেক সকালে তার ঘুম ভাঙত।—আদিপুস্তক ৩৭:২; ৪১:৪৬.
৯. বহু বছর ধরে দায়ূদকে কী সহ্য করতে হয়েছিল?
৯ দায়ূদের ক্ষেত্রটিও ঠিক একই রকম। যখন যিহোবা ইস্রায়েলকে শাসন করার জন্য যোগ্য ব্যক্তিকে বাছাই করছিলেন, তিনি বলেছিলেন: “আমি যিশয়ের পুত্ত্র দায়ূদকে পাইয়াছি, সে আমার মনের মত লোক।” (প্রেরিত ১৩:২২) যিহোবার দৃষ্টিতে তার প্রতি অনুগ্রহ থাকা সত্ত্বেও, দায়ূদ যথেষ্ট দুঃখ ভোগ করেছিলেন। মারাত্মক বিপদে, তিনি বহু বছর ধরে প্রান্তরে, গুহায়, ফাটলে এবং বিদেশী এলাকায় লুকিয়েছিলেন। বন্য পশুর ন্যায় ধাবিত হয়ে তিনি নিরুৎসাহ এবং আশঙ্কা বোধ করেছিলেন। তৎসত্ত্বেও, তিনি যিহোবার শক্তিতে তা সহ্য করেছিলেন। দায়ূদ তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যথার্যভাবে বলতে পেরেছিলেন: “ধার্ম্মিকের বিপদ অনেক, কিন্তু সেই সকল হইতে সদাপ্রভু তাহাকে উদ্ধার করেন।”—গীতসংহিতা ৩৪:১৯.
১০. নাবোৎ এবং তার পরিবারের উপর কোন্ চরম দুর্দশা নেমে এসেছিল?
১০ ভাববাদী এলিয়ের দিনে, ইস্রায়েলে শুধুমাত্র ৭,০০০ জন ছিল যারা মিথ্যা ঈশ্বর বালের কাছে নতজানু হয়নি। (১ রাজাবলি ১৯:১৮; রোমীয় ১১:৪) নাবোৎ, যিনি হয়ত এদের মধ্যে একজন ছিলেন, যাকে ভয়ংকর অবিচারের শিকার হতে হয়েছিল। ঈশ্বর নিন্দার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে তাকে লজ্জাজনক অবস্থায় পড়তে হয়েছিল। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায়, তাকে অপরাধী বলে প্রতিপন্ন করা হয়েছিল ও রাজকীয় আইনে পাথর মারার দ্বারা মৃত্যুর দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছিল এবং তার রক্ত কুকুরেরা চেটে খেয়েছিল। এমনকি তার সন্তানদেরও হত্যা করা হয়েছিল! তথাপি, এই অভিযোগে তিনি নির্দোষ ছিলেন। তার বিরুদ্ধে সাক্ষীরা মিথ্যাবাদী ছিল। সমস্ত ব্যাপারটি রাণী ঈষেবলের দ্বারা তৈরি একটি ষড়যন্ত্র ছিল যাতে করে নাবোতের দ্রাক্ষাক্ষেত্র রাজার আয়ত্তে আসতে পারে।—১ রাজাবলি ২১:১-১৯; ২ রাজাবলি ৯:২৬.
১১. প্রেরিত পৌল বাইবেলের ইতিহাসে বিশ্বস্ত পুরুষ এবং স্ত্রীলোকেদের সম্বন্ধে কী বলেছেন?
১১ যোষেফ, দায়ূদ এবং নাবোৎ এই তিনজন ছাড়াও বাইবেলে উল্লেখিত অনেক বিশ্বস্ত পুরুষ ও নারী আছে যারা দুর্দশা ভোগ করেছিলেন। প্রেরিত পৌল সর্বকালের যিহোবার দাসেদের একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করেন। সেখানে তিনি তাদের কথা বলেছিলেন যারা “বিদ্রূপের ও কশাঘাতের, অধিকন্তু বন্ধনের ও কারাগারের পরীক্ষা ভোগ করিলেন; তাঁহারা প্রস্তরাঘাতে হত, পরীক্ষিত, করাত দ্বারা বিদীর্ণ, খড়গ দ্বারা নিহত হইলেন; তাঁহারা মেষের ও ছাগের চর্ম্ম পরিয়া বেড়াইতেন, দীনহীন, ক্লিষ্ট, উপদ্রুত হইতেন; এই জগৎ যাঁহাদের যোগ্য ছিল না, তাঁহারা প্রান্তরে প্রান্তরে, পাহাড়ে পাহাড়ে, গুহায় গুহায় ও পৃথিবীর গহ্বরে গহ্বরে ভ্রমণ করিতেন।” (ইব্রীয় ১১:৩৬-৩৮) কিন্তু যিহোবা তাদের পরিত্যাগ করেননি।
যারা দুঃখ ভোগ করে যিহোবা তাদের যত্ন নেন
১২. কিছু দুঃখকষ্ট কী যা বর্তমানে যিহোবার সাক্ষীরা ভোগ করছে?
১২ বর্তমানে যিহোবার লোকেদের সম্বন্ধে কী বলা যায়? একটি সংগঠন হিসাবে, আমরা শেষকাল এবং মহাক্লেশের মধ্যে দিয়ে ঐশিক সুরক্ষা এবং অক্ষত পথের আশা করতে পারি। (যিশাইয় ৫৪:১৭; প্রকাশিত বাক্য ৭:৯-১৭) কিন্তু, ব্যক্তিগতভাবে আমরা উপলব্ধি করি যে সকল মানুষের প্রতি “কাল ও দৈব ঘটে।” (উপদেশক ৯:১১) আজকে অনেক বিশ্বস্ত খ্রীষ্টানেরা রয়েছে যারা দুর্দশাগুলি ভোগ করছে। কেউ কেউ চরম দরিদ্রতা সহ্য করছে। বাইবেল খ্রীষ্টীয় “পিতৃমাতৃহীনদের ও বিধবাদের” কথা বলে যাদের ক্লেশ রয়েছে। (যাকোব ১:২৭) অন্যান্যেরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, অপরাধ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসুস্থতা এবং মৃত্যুর কারণে দুঃখ ভোগ করে।
১৩. সম্প্রতি কোন্ কষ্টকর অভিজ্ঞতাগুলি রিপোর্ট করা হয়েছে?
১৩ উদাহরণস্বরূপ, যিহোবার সাক্ষীদের পরিচালক গোষ্ঠীর কাছে তাদের ১৯৯৬ সালের রিপোর্টে, ওয়াচ টাওয়ার শাখার কার্যালয়গুলি বর্ণনা করে যে আমাদের ভাই এবং বোনেদের মধ্যে কেউ কেউ বাইবেলের প্রতি আনুগত্যের কারণে দুঃখজনক পরিস্থিতিতে কারাবরণ ভোগ করছে। দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশে, তিনটি মণ্ডলীকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল যখন গেরিলা দলগুলি শত শত সাক্ষীদের এলাকা থেকে সরে যাওয়ার জন্য জোর করে। পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশে, কিছু সাক্ষীরা এক গৃহ-যুদ্ধের দাঙ্গায় পড়ে নিহত হয়েছিল। মধ্য আমেরিকার একটি দেশে, কিছু ভাইদের ইতিমধ্যেই সংকটপূর্ণ অর্থনৈতিক অবস্থা প্রবল সামুদ্রিক ঝড়ের প্রচণ্ড আক্রমণের দ্বারা আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অন্যান্য জায়গায় যেখানে দরিদ্রতা এবং খাদ্যের অভাব হয়ত গুরুতর সমস্যা নয় কিন্তু নেতিবাচক প্রভাবগুলি হয়ত কারও কারও আনন্দ হ্রাস করে দিয়েছে। অন্যেরা আবার আধুনিক দিনের জীবনপ্রণালীর চাপগুলি দ্বারা ভারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। জনসাধারণের উদাসীনতার কারণে, অন্যান্যেরা হয়ত নিরুৎসাহ বোধ করে থাকে যখন তারা রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করে।
১৪. (ক) ইয়োবের উদাহরণ থেকে আমরা কী শিখি? (খ) যখন কষ্ট ভোগ করছি তখন নেতিবাচক চিন্তা করার পরিবর্তে আমাদের কী করা উচিত?
১৪ এইসকল পরিস্থিতিগুলিকে ঈশ্বরের অসন্তোষের প্রমাণ হিসাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। ইয়োবের ঘটনাটি এবং তার সাথে তিনি যে অনেক দুঃখকষ্ট ভোগ করেছিলেন সেই বিষয়টি স্মরণ করুন। তিনি “সিদ্ধ ও সরল” ব্যক্তি ছিলেন। (ইয়োব ১:৮) ইয়োব কতই না হতাশা বোধ করেছেন যখন ইলীফস তাকে অপরাধ করার অভিযোগ করেছিল! (ইয়োব, ৪, ৫, ২২ অধ্যায়গুলি) আমরা শীঘ্রই এই সিদ্ধান্তে আসতে চাই না যে আমরা কোনভাবে যিহোবাকে নিরাশ করেছি অথবা যিহোবা তাঁর আশীর্বাদ সরিয়ে নিয়েছেন বলে আমরা দুর্দশাগুলি ভোগ করছি। ক্লেশের সম্মুখে নেতিবাচক চিন্তা করা আমাদের বিশ্বাসকে দুর্বল করে দিতে পারে। (১ থিষলনীকীয় ৩:১-৩, ৫) যখন নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করি, তখন এই বিষয়ের উপর ধ্যান করা উত্তম যে, যাই ঘটুক না কেন যিহোবা এবং যীশু ধার্মিকের নিকটবর্তী রয়েছেন।
১৫. কিভাবে আমরা জানতে পারি যে যিহোবা দুর্দশাগুলির সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তা করেন যা তাঁর লোকেরা ভোগ করছে?
১৫ প্রেরিত পৌল আমাদের পুনরায় আশ্বস্ত করেন যখন তিনি বলেন: “খ্রীষ্টের প্রেম হইতে কে আমাদিগকে পৃথক্ করিবে? কি ক্লেশ? কি সঙ্কট? কি তাড়না? কি দুর্ভিক্ষ? কি উলঙ্গতা? কি প্রাণ-সংশয়? কি খড়গ? . . . আমি নিশ্চয় জানি, কি মৃত্যু, কি জীবন, কি দূতগণ, কি আধিপত্য সকল, কি উপস্থিত বিষয় সকল, কি ভাবী বিষয় সকল, কি পরাক্রম সকল, কি ঊর্দ্ধ্ব স্থান, কি গভীর স্থান, কি অন্য কোন সৃষ্ট বস্তু, কিছুই আমাদের প্রভু খ্রীষ্ট যীশুতে অবস্থিত ঈশ্বরের প্রেম হইতে আমাদিগকে পৃথক্ করিতে পারিবে না।” (রোমীয় ৮:৩৫, ৩৮, ৩৯) যিহোবা আমাদের সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তা করেন এবং আমাদের দুঃখভোগ সম্বন্ধে অবগত আছেন। এমনকি পলাতক অবস্থায় থাকার সময়েও দায়ূদ লিখেছিলেন: “ধার্ম্মিকগণের প্রতি সদাপ্রভুর দৃষ্টি আছে, তাহাদের আর্ত্তনাদের প্রতি তাঁহার কর্ণ আছে। সদাপ্রভু ভগ্নচিত্তদের নিকটবর্ত্তী।” (গীতসংহিতা ৩৪:১৫, ১৮; মথি ১৮:৬, ১৪) আমাদের স্বর্গীয় পিতা আমাদের প্রতি যত্ন নেন এবং যারা দুঃখভোগ করে তাদের জন্য ব্যথিত হন। (১ পিতর ৫:৬, ৭) আমরা যাই দুঃখভোগ করি না কেন, তিনি আমাদের সহ্য করার জন্য যা প্রয়োজন তা যুগিয়ে থাকেন।
যিহোবার দানগুলি আমাদের সংরক্ষিত রাখে
১৬. যিহোবার কাছ থেকে আসা কোন্ ব্যবস্থা আমাদের ধৈর্য রাখতে সাহায্য করে এবং কিভাবে?
১৬ যদিও আমরা এই পুরনো বিধিব্যবস্থার মধ্যে এক দুঃখকষ্টমুক্ত জীবন আশা করতে পারি না, তবুও আমরা “পরিত্যক্ত হই না।” (২ করিন্থীয় ৪:৮, ৯) যীশু তাঁর অনুগামীদের জন্য এক সহায়ের ব্যবস্থা করবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “আমি পিতার নিকটে নিবেদন করিব, এবং তিনি আর এক সহায় তোমাদিগকে দিবেন, যেন তিনি চিরকাল তোমাদের সঙ্গে থাকেন; তিনি সত্যের আত্মা।” (যোহন ১৪:১৬, ১৭) সা.কা. ৩৩ সালে পঞ্চাশত্তমীর দিনে, প্রেরিত পিতর তার শ্রোতাদের বলেছিলেন যে তারা “পবিত্র আত্মারূপ দান” পাবে। (প্রেরিত ২:৩৮) বর্তমানে পবিত্র আত্মা কি আমাদের সাহায্য করছে? হ্যাঁ! যিহোবার কার্যকরী শক্তি আমাদের চমৎকার ফলসমূহ প্রদান করে: “প্রেম, আনন্দ, শান্তি, দীর্ঘসহিষ্ণুতা, মাধুর্য্য, মঙ্গলভাব, বিশ্বস্ততা, মৃদুতা, ইন্দ্রিয়দমন।” (গালাতীয় ৫:২২, ২৩) এই সমস্তই হল অমূল্য গুণ যা আমাদের ধৈর্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
১৭. কিছু বাইবেল সত্য কী যা যিহোবার উপর ধৈর্য সহকারে নির্ভর করতে আমাদের বিশ্বাস এবং সংকল্পকে শক্তিশালী করে?
১৭ এছাড়া পবিত্র আত্মা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে বর্তমান ক্লেশসমূহ “ক্ষণস্থায়ী এবং লঘু” যখন অনন্ত জীবনের পুরস্কারের সাথে এর তুলনা করা হয়। (২ করিন্থীয় ৪:১৬-১৮, NW) আমরা নিশ্চিত যে ঈশ্বর আমাদের কাজগুলি এবং তাঁর প্রতি আমরা যে প্রেম প্রদর্শন করি তা ভুলে যাবেন না। (ইব্রীয় ৬:৯-১২) বাইবেলের অনুপ্রাণিত বাক্যগুলি পড়ার দ্বারা আমরা প্রাচীনকালের বিশ্বস্ত দাসেদের উদাহরণগুলি থেকে সান্ত্বনা পাই, যারা অনেক দুর্দশা সহ্য করেছে অথচ যাদের সুখী বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। যাকোব লেখেন: “হে ভ্রাতৃগণ, যে ভাববাদীরা প্রভুর নামে কথা বলিয়াছিলেন, তাঁহাদিগকে দুঃখভোগের ও দীর্ঘসহিষ্ণুতার দৃষ্টান্ত বলিয়া মান। দেখ, যাহারা স্থির রহিয়াছে, তাহাদিগকে আমরা ধন্য বলি।” (যাকোব ৫:১০, ১১) বাইবেল “পরাক্রমের উৎকর্ষ” সম্বন্ধে প্রতিজ্ঞা করে, যা আমাদের পরীক্ষগুলি সহ্য করতে সাহায্য করে। এছাড়াও যিহোবা আমাদের পুনরুত্থানের আশার দ্বারা আশীর্বাদ করেন। (২ করিন্থীয় ১:৮-১০; ৪:৭) প্রতিদিন বাইবেল পড়া এবং এই সমস্ত প্রতিজ্ঞাগুলির উপর ধ্যান করার দ্বারা আমরা আমাদের বিশ্বাস এবং ঈশ্বরের উপর ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করার সংকল্পকে শক্তিশালী করতে পারব।—গীতসংহিতা ৪২:৫.
১৮. (ক) ২ করিন্থীয় ১:৩, ৪ পদে আমাদের কী করতে উৎসাহিত করা হয়েছে? (খ) কিভাবে খ্রীষ্টীয় অধ্যক্ষেরা সান্ত্বনা এবং সতেজতার উৎস হিসাবে প্রমাণিত হতে পারে?
১৮ তাছাড়া, যিহোবা আমাদের আধ্যাত্মিক পরমদেশ দিয়েছেন যেখানে আমরা আমাদের খ্রীষ্টীয় ভাই বোনদের প্রকৃত ভালবাসা উপভোগ করতে পারি। আমাদের সকলের একে অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভূমিকা রয়েছে। (২ করিন্থীয় ১:৩, ৪) বিশেষ করে খ্রীষ্টীয় অধ্যক্ষেরা সান্ত্বনা এবং সতেজতার এক প্রধান উৎস হতে পারেন। (যিশাইয় ৩২:২) “মনুষ্যদিগকে নানা বর” হিসাবে “ক্ষীণসাহসদিগকে সান্ত্বনা” এবং “দুর্ব্বলদিগের সাহায্য” করার জন্য তাদের নিযুক্ত করা হয়েছে সেই সমস্ত ব্যক্তিদের গড়ে তুলতে যারা দুঃখভোগ করে। (ইফিষীয় ৪:৮, ১১, ১২; ১ থিষলনীকীয় ৫:১৪) প্রাচীনদের “বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাস” দ্বারা আয়োজিত প্রহরীদুর্গ এবং সচেতন থাক! পত্রিকা আর এর সাথে অন্যান্য প্রকাশনাদির সদ্ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। (মথি ২৪:৪৫-৪৭) এতে বাইবেল-ভিত্তিক পরামর্শের প্রাচুর্য রয়েছে যা কিছু সমস্যা যেগুলি আমাদের উদ্বিগ্ন করে তা সমাধান—এমনকি প্রতিরোধ—করতে আমাদের সাহায্য করে। আসুন কষ্টের সময়ে আমরা যেন একে অন্যকে সান্ত্বনা এবং উৎসাহ প্রদান করার দ্বারা যিহোবাকে অনুকরণ করি।
১৯. (ক) কী আমাদের কিছু দুঃখকষ্ট এড়াতে সাহায্য করে? (খ) অবশেষে, কার উপর আমরা অবশ্যই আস্থা রাখব এবং কী আমাদের পরীক্ষাগুলি মোকাবিলা করতে সক্ষম করবে?
১৯ যতই আমরা শেষকাল এবং বর্তমান বিধিব্যবস্থার আরও মন্দ পরিস্থিতির গভীরে অগ্রসর হই, খ্রীষ্টানেরা দুর্দশাগুলিকে এড়ানোর জন্য যা করতে পারে তা করে। (হিতোপদেশ ২২:৩) উত্তম বিচার, মনের দৃঢ়তা এবং বাইবেলের মানগুলির জ্ঞান আমাদের সঠিক সিদ্ধান্তগুলি নিতে সাহায্য করতে পারে। (হিতোপদেশ ৩:২১, ২২) আমরা যিহোবার বাক্যের প্রতি মনোযোগ দিই এবং অনাবশ্যক ভুলগুলি এড়াতে তা মেনে চলি। (গীতসংহিতা ৩৮:৪) তৎসত্ত্বেও, আমরা উপলব্ধি করি যে আমাদের কোন প্রচেষ্টাই আমাদের জীবন থেকে দুঃখভোগ সম্পূর্ণভাবে দূর করতে পারে না। এই বিধিব্যবস্থায়, বহু ধার্মিক ব্যক্তি নিদারুণ দুঃখকষ্টগুলির মোকাবিলা করে থাকে। কিন্তু, আমরা সম্পূর্ণ এই আস্থার সাথে আমাদের পরীক্ষাগুলির মোকাবিলা করতে পারি যে “সদাপ্রভু আপন প্রজাদিগকে দূর করিবেন না।” (গীতসংহিতা ৯৪:১৪) আর আমরা জানি যে এই বিধিব্যবস্থা এবং এর যন্ত্রণাগুলি খুব শীঘ্রই চলে যাবে। অতএব, আমরা নিশ্চিত থাকব যেন “সৎকর্ম্ম করিতে করিতে নিরুৎসাহ না হই; কেননা ক্লান্ত না হইলে যথাসময়ে শস্য পাইব।”—গালাতীয় ৬:৯.
আমরা কী শিখলাম?
◻ খ্রীষ্টানদের সমগ্র দলটি কোন্ পরীক্ষাগুলি ভোগ করেছে?
◻ বাইবেলের কোন্ উদাহরণগুলি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে দুর্দশাগুলি যিহোবার অসন্তোষের প্রমাণ নয়?
◻ যিহোবা দুঃখকষ্টগুলি সম্বন্ধে কেমন বোধ করেন যা তাঁর লোকেরা ভোগ করে থাকে?
◻ যিহোবার কাছ থেকে আসা কিছু দান কী যা আমাদের পরীক্ষাগুলি সহ্য করতে সাহায্য করে?
[১০ পৃষ্ঠার চিত্র]
দায়ূদ, নাবোৎ এবং যোষেফ হলেন তিনজন যারা দুর্দশা ভোগ করেছিলেন