পাঠকদের থেকে প্রশ্নসকল
অপরাধীদের জন্য প্রাণদণ্ড অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড সম্বন্ধে বাইবেল কী নির্দেশ করে?
স্বাভাবিকভাবেই, আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা অথবা পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে, আমাদের প্রত্যেকেরই হয়ত এই বিষয়ে নিজস্ব ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলি আছে। তবুও, সেই রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলি সম্বন্ধে নিরপেক্ষ থাকার সাথে সাথে যেমন অনেকে এই বিষয়ে নিয়ে থাকে, যিহোবার সাক্ষী হিসাবে আমাদের প্রাণদণ্ড সম্বন্ধে ঈশ্বরের চিন্তাধারার উপযোগী হতে চেষ্টা করা উচিত।
সংক্ষিপ্তভাবে বলতে গেলে, তাঁর লিখিত বাক্যে ঈশ্বর এমন ইঙ্গিত দেন না যে প্রাণদণ্ড ভুল।
মানব ইতিহাসের প্রারম্ভে, যিহোবা এই বিষয়ে তাঁর চিন্তাধারা প্রকাশ করেছিলেন, যেমন আমরা আদিপুস্তক ৯ অধ্যায়ে পড়ি। এটি নোহ ও তার পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল যারা সমগ্র মানব পরিবারের পূর্বপুরুষ হয়েছিলেন। তারা জাহাজ থেকে বাইরে আসার পর ঈশ্বর বলেছিলেন যে তারা পশুর মাংস খেতে পারে—যার অর্থ পশু হত্যা করা, তার রক্ত ঢেলে দেওয়া এবং সেটি খাওয়া যেতে পারে। তারপর আদিপুস্তক ৯:৫, ৬ পদে ঈশ্বর বলেছিলেন: “তোমাদের রক্তপাত হইলে আমি তোমাদের প্রাণের পক্ষে তাহার পরিশোধ অবশ্য লইব; সকল পশুর নিকটে তাহার পরিশোধ লইব, এবং মনুষ্যের ভ্রাতা মনুষ্যের নিকটে আমি মনুষ্যের প্রাণের পরিশোধ লইব। যে কেহ মনুষ্যের রক্তপাত করিবে, মনুষ্য কর্ত্তৃক তাহার রক্তপাত করা যাইবে; কেননা ঈশ্বর আপন প্রতিমূর্ত্তিতে মনুষ্যকে নির্ম্মাণ করিয়াছেন।” সুতরাং যিহোবা হত্যাকারীর ক্ষেত্রে প্রাণদণ্ড অনুমোদন করেছিলেন।
যখন ঈশ্বর তাঁর লোক হিসাবে ইস্রায়েলের সাথে ব্যবহার করেছিলেন, ঐশিক নিয়মের বিরুদ্ধে আরও অন্যান্য গুরুতর অপরাধের জন্য শাস্তি ছিল মৃত্যু। গণনাপুস্তক ১৫:৩০ পদে আমরা এই ব্যাপক উক্তিটি পড়ি: “স্বজাতীয় কি বিদেশী যে ব্যক্তি ঊর্দ্ধ্বহস্তে পাপ করে, সে সদাপ্রভুর নিন্দা করে; সেই ব্যক্তি আপন লোকদের মধ্য হইতে উচ্ছিন্ন হইবে।”
কিন্তু খ্রীষ্টীয় মণ্ডলী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরবর্তী সময় সম্বন্ধে কী বলা যায়? হ্যাঁ, আমরা জানি যে যিহোবা মনুষ্য সরকারগুলিকে অস্তিত্বে থাকার জন্য অনুমতি দিয়েছেন এবং তিনি সেগুলিকে প্রধান্যপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বলে সম্বোধন করেছেন। বস্তুতপক্ষে, এইধরনের সরকারি কর্তৃপক্ষদের বাধ্য হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়ার পরে বাইবেল বলে যে “সদাচরণের নিমিত্ত তিনি তোমার পক্ষে ঈশ্বরেরই পরিচারক। কিন্তু যদি মন্দ আচরণ কর, তবে ভীত হও, কেননা তিনি বৃথা খড়গ ধারণ করেন না; কারণ তিনি ঈশ্বরের পরিচারক, যে মন্দ আচরণ করে, ক্রোধ সাধনের জন্য তাহার প্রতিশোধদাতা।”—রোমীয় ১৩:১-৪.
এর অর্থ কি এই যে যারা গুরুতর পাপ করে সরকারগুলি তাদের এমনকি জীবন পর্যন্ত নেওয়ার অধিকারী? ১ পিতর ৪:১৫ পদের বাক্যগুলি থেকে আমরা এই উপসংহারে পৌঁছাতে পারি যে, হ্যাঁ। সেই অনুচ্ছেদটিতে প্রেরিত তার ভাইয়েদের পরামর্শ দিয়েছিলেন: “তোমাদের মধ্যে কেহ যেন নরঘাতক কি চোর কি দুষ্কর্ম্মকারী কি পরাধিকারচর্চ্চক বলিয়া দুঃখভোগ না করে।” আপনি কি লক্ষ্য করেছেন যে “তোমাদের মধ্যে কেহ যেন নরঘাতক . . . বলিয়া দুঃখভোগ না করে”? পিতর এটি নির্দেশ করেননি যে সরকারগুলির একজন হত্যাকারীকে তার অপরাধের জন্য শাস্তিভোগ করতে দেওয়ার অধিকার ছিল না। বিপরীতে, তিনি নির্দেশ করেছিলেন একজন হত্যাকারী যথার্থভাবে তার প্রাপ্য শাস্তি পাবে। সেটি কি মৃত্যু দ্বারা শাস্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করে?
এটি হতে পারে। প্রেরিত ২৫ অধ্যায়ে পাওয়া পৌলের বাক্যগুলি থেকে এটি পরিষ্কার হয়। যিহূদীরা তাদের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপরাধ করার জন্য পৌলকে অভিযুক্ত করেছিল। তার বন্দী, পৌলকে রোমীয় দেশাধ্যক্ষের কাছে পাঠানোর সময় সেই সামরিক কর্মচারী বিবৃতি দিয়েছিল, যেমন প্রেরিত ২৩:২৯ পদে উল্লেখ করা হয়েছে: “তাহাতে আমি বুঝিলাম, তাহাদের ব্যবস্থা সম্বন্ধীয় কোন কোন বিবাদ প্রযুক্ত ইহার উপরে দোষারোপ হইয়াছে, কিন্তু প্রাণদণ্ডের বা শৃঙ্খলের যোগ্য কোন দোষ প্রযুক্ত ইহার নামে অভিযোগ হয় নাই।” (বাকাঁ অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।) দুই বছর পরে পৌলকে স্বয়ং রাজ্যপাল ফীষ্টের সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল। প্রেরিত ২৫:৮ পদে আমরা পড়ি: “পৌল আপনার পক্ষ সমর্থন করিয়া বলিলেন, যিহূদীদের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, ধর্ম্মধামের বিরুদ্ধে, কিম্বা কৈসরের বিরুদ্ধে আমি কোন অপরাধ করি নাই।” কিন্তু এখন শাস্তি সম্বন্ধে, এমনকি প্রাণদণ্ড সম্বন্ধে তার মন্তব্যগুলির উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করুন। প্রেরিত ২৫:১০, ১১ পদে আমরা পড়ি:
“পৌল বলিলেন, আমি কৈসরের বিচারাসনের সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছি, এখানে আমার বিচার হওয়া উচিত। আমি যিহূদীদের প্রতি কিছু অন্যায় করি নাই, ইহা আপনিও বিলক্ষণ জানেন। তবে যদি আমি অপরাধী হই, এবং মৃত্যুর যোগ্য কিছু করিয়া থাকি, তাহা হইলে মরিতে অস্বীকার করি না; কিন্তু ইহারা আমার উপরে যে সকল দোষারোপ করিতেছে, এ সকল যদি কিছুই না হয় তবে ইহাদের হস্তে আমাকে সমর্পণ করিতে কাহারও অধিকার নাই; আমি কৈসরের নিকটে আপীল করি।” (বাকাঁ অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।)
বৈধভাবে নিযুক্ত এক কর্তৃপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে পৌল স্বীকার করেছিলেন যে অন্যায়কারীদের শাস্তি দেওয়ার অধিকার কৈসরের আছে, এমনকি তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ারও। তিনি তার ক্ষেত্রেও শাস্তির বিষয়ে প্রতিবাদ করেননি, যদি তিনি দোষ করে থাকেন। এছাড়াও, তিনি বলেননি যে কৈসর কেবলমাত্র হত্যাকারীদের জন্য প্রাণদণ্ড প্রয়োগ করতে পারেন।
এটি স্বীকার্য যে, রোমীয় বিচারব্যাবস্থা নিখুঁত ছিল না; আর আজকের মনুষ্য আদালত ব্যবস্থাও নয়। সেই সময়ে এবং আজকেও কিছু নিরাপরাধ লোকেদের অভিযুক্ত করা ও শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এমনকি পীলাত যীশু সম্বন্ধে বলেছিলেন: “আমি ইহার প্রাণদণ্ডের যোগ্য কোন দোষই পাই নাই, অতএব ইহাকে শাস্তি দিয়া ছাড়িয়া দিব।” হ্যাঁ, এমনকি যদিও সরকারি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছিল যে যীশু নিরপরাধ ছিলেন, তবুও এই নিরপরাধ ব্যক্তি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।—লূক ২৩:২২-২৫.
এইধরনের অন্যায়গুলি পৌল অথবা পিতরকে এই বিষয়ে তর্ক করতে পরিচালিত করেনি যে প্রাণদণ্ড মূলত নীতিবহির্ভূত। বরং, এই বিষয়ে ঈশ্বরের চিন্তাধারা হল যে যতক্ষণ পর্যন্ত কৈসরের প্রধান্যপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষেরা অস্তিত্বে আছে, তারা ‘খড়গ ধারণ করেন যারা মন্দ আচরণ করে, ক্রোধ সাধনের জন্য তাহার প্রতিশোধদাতা।’ এটি প্রাণদণ্ড প্রয়োগ করার অর্থে খড়গ ব্যবহার করাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু যখন এই বিতর্কমূলক প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় যে এই জগতের কোন সরকারের হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করা উচিত কি না, সেই ক্ষেত্রে প্রকৃত খ্রীষ্টানেরা সতর্কতার সাথে নিরপেক্ষ থাকে। খ্রীষ্টীয় জগতের যাজকদের বৈসাদৃশ্যে তারা এই বিষয়ে কোনরকম বিতর্কে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকে।