প্রেমের উৎকৃষ্টতর পথ
ঈশ্বরের, মতই প্রেম এত অপূর্ব যে এটিকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। এটি কিভাবে কাজ করে তা বলা বেশি সহজ। বিষয়টি সম্বন্ধে লেখার সময়, প্রেরিত পৌল প্রথমে জোর দেন যে একজন খ্রীষ্টান বিশ্বাসীর জন্য এটি কতখানি অপরিহার্য এবং পরে বিস্তারিত বর্ণনা করেন কিভাবে এটি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে: “প্রেম চিরসহিষ্ণু, প্রেম মধুর, ঈর্ষা করে না, প্রেম আত্মশ্লাঘা করে না, গর্ব্ব করে না, অশিষ্টাচরণ করে না, স্বার্থ চেষ্টা করে না, রাগিয়া উঠে না, অপকার গণনা করে না, অধার্ম্মিকতায় আনন্দ করে না, কিন্তু সত্যের সহিত আনন্দ করে; সকলই বহন করে, সকলই বিশ্বাস করে, সকলই প্রত্যাশা করে, সকলই ধৈর্য্যপূর্ব্বক সহ্য করে।” (১ করিন্থীয় ১৩:৪-৭)
ঈশ্বরীয় প্রেম কিভাবে কাজ করে
“প্রেম চিরসহিষ্ণু, প্রেম মধুর।” এটি প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং অন্যের ভুল কাজগুলিকে ধৈর্যসহকারে সহ্য করতে সাহায্য করে এবং তা এই উদ্দেশ্যসহ যে, যারা ভুল কাজ করছে অথবা অন্যান্যেরা যারা পরিস্থিতির সাথে যুক্ত তাদের শেষ পর্যন্ত পরিত্রাণের জন্য কাজ করা আর সেই সাথে পরিশেষে, ঈশ্বরের নামের প্রতি সম্মান এবং মহিমা নিয়ে আসা। (২ পিতর ৩:১৫) যতই প্ররোচনা আসুক না কেন, প্রেম মধুর। অন্যের প্রতি রূঢ়তা অথবা কঠোরতা একজন খ্রীষ্টানের পক্ষে উত্তম কিছু সম্পাদন করে না। তথাপি, প্রেম ধার্মিকতার পক্ষে দৃঢ় হতে পারে এবং ন্যায় সহকারে কাজ করতে পারে। যাদের কর্তৃত্ব রয়েছে হয়ত অন্যায়কারীকে শাসন করতে পারে, কিন্তু তারপরেও, তাদের দয়া দেখাতে হবে। নিষ্ঠুরতা, দয়াহীন পরামর্শদাতা অথবা যে অধার্মিকতা করে, কারও জন্য উপকার আনবে না বরং এটি সেই ব্যক্তিকে এমনকি অনুতাপ এবং সঠিক কাজ করা থেকে আরও দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে।—রোমীয় ২:৪.
“প্রেম (NW) ঈর্ষা করে না।” অন্যান্যদের প্রতি ভাল কিছু ঘটায় এটি ঈর্ষান্বিত হয় না। এটি একজন সহমানবকে বিশিষ্ট দায়িত্বপূর্ণ পদ লাভ করতে দেখে আনন্দ করে। এমনকি এটি একজনের শত্রুদের ভাল জিনিস প্রাপ্ত হতে দেখেও বিদ্বেষপরায়ণ হয় না।
প্রেম “আত্মশ্লাঘা করে না, গর্ব্ব করে না।” এটি মনুষ্যদের উচ্চস্বরে সমর্থন এবং প্রশংসা অন্বেষণ করে না। (যিহূদা ১৬) যে ব্যক্তির প্রেম রয়েছে সে অন্যকে নিচে নামিয়ে নিজেকে বড় দেখাতে চায় না। বরং, সে ঈশ্বরকে উচ্চীকৃত করবে এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের অকৃত্রিমভাবে উৎসাহ দেবে এবং গড়ে তুলবে। (কলসীয় ১:৩-৫) সে অন্য এক খ্রীষ্টানকে উন্নতি করতে দেখে খুশি হবে। আর সে যা করতে যাচ্ছে তা নিয়ে সে দম্ভ করবে না। (হিতোপদেশ ২৭:১) সে উপলব্ধি করবে যে সে যা কিছু করে তা যিহোবার কাছ থেকে পাওয়া শক্তির মাধ্যমে করে।—গীতসংহিতা ৩৪:২.
প্রেম “অশিষ্টাচরণ করে না।” এটি অভদ্র নয়। এটি অশোভন আচরণে জড়িত হয় না, যেমন যৌন অপব্যবহার অথবা জঘন্য আচরণ। এটি কারও প্রতি রুক্ষ, অশ্লীল, অমার্জিত, উদ্ধত, মন্দ অথবা অসম্মানজনক নয়। এক ব্যক্তি যার প্রেম রয়েছে সে এমন কাজ এড়িয়ে চলবে যা বাহ্যিক আচরণ অথবা কাজে তার খ্রীষ্টীয় ভাইয়েদের বিরক্ত করে। এছাড়াও এটি এক ব্যক্তিকে, যারা খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসী নয় তাদের সাথে সম্মানজনকভাবে চলতে তৎপর করবে।—রোমীয় ১৩:১৩.
প্রেম “স্বার্থ চেষ্টা করে না।” এটি এই নীতিটিকে অনুসরণ করে: “কেহই স্বার্থ চেষ্টা না করুক, বরং প্রত্যেক জন পরের মঙ্গল চেষ্টা করুক।” (১ করিন্থীয় ১০:২৪) এটি এমন এক ক্ষেত্র যেখানে অন্যের চির মঙ্গলের জন্য বিবেচনা নিজে থেকেই প্রকাশ পায়। অন্যের জন্য এই আন্তরিক বিবেচনা প্রেমে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী উদ্বুদ্ধকারী শক্তি আর সেইসাথে এর ফলও অত্যধিক সুফলদায়ক এবং উপকারজনক। প্রেমের অধিকারী ব্যক্তি সবকিছু তার পথ অনুযায়ী করা হোক তা চাইবে না। এমনকি প্রেম নিজ “অধিকার” দাবি করে না; বরং এটি অন্য ব্যক্তির আধ্যাত্মিক মঙ্গলের বিষয়ে সর্বাধিক চিন্তা করে।—রোমীয় ১৪:১৩, ১৫.
প্রেম “রাগিয়া উঠে না।” এটি ক্রোধের জন্য সুযোগ অথবা ওজরের অনুসন্ধান করে না। এটি আকস্মিক ক্রোধের প্রতি পরিচালিত করে না যা মাংসের একটি কাজ। (গালাতীয় ৫:১৯, ২০) যার প্রেম রয়েছে সে অন্যান্যদের কথা অথবা কাজ দ্বারা সহজেই মর্মাহত হয় না।
প্রেম “অপকার গণনা করে না।” এটি নিজেকে আঘাতপ্রাপ্ত বলে মনে করে না এবং তাই সেই আঘাতের কারণে স্থায়ীভাবে অথবা যথাসময়ে প্রতিহিংসা নেওয়ার জন্য ‘হিসাবের বইয়ে’ জমিয়ে রাখে না মধ্যবর্তী সময়ে আঘাতপ্রাপ্ত এবং আঘাতকারী ব্যক্তির মধ্যে কোন সম্পর্ক না রেখে। তাহলে সেটি প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মা হবে যাকে বাইবেলে নিন্দা করা হয়। (রোমীয় ১২:১৯) প্রেম অন্যের প্রতি মন্দ মনোভাব আরোপ করবে না, বরং অনুমোদন প্রবণ হবে এবং অন্যান্যদের অনিশ্চিত বিষয়ে উপকার প্রদান করবে।—রোমীয় ১৪:১, ৫.
প্রেম “অধার্ম্মিকতায় আনন্দ করে না, কিন্তু সত্যের সহিত আনন্দ করে।” প্রেম সত্যের সাথে আনন্দ করে এমনকি যদিও এটি পূর্ব বিশ্বাসের শিক্ষা অথবা বিবরণগুলিকে অকার্যকর করে দেয়। এটি ঈশ্বরের সত্যের বাক্যের সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে। এটি সবসময়ে সঠিক বিষয়ের পক্ষ গ্রহণ করে, ভুল, মিথ্যা অথবা কোন ধরনের অন্যায়ের মধ্যে আনন্দ খোঁজে না, তা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যেই হোক না কেন, এমনকি যদি সে একজন শত্রুও হয়। কিন্তু, যদি একটি বিষয় ভুল অথবা বিপথে পরিচালনাকারী হয়, তাহলে প্রেম সত্যের পক্ষে অথবা অন্যান্যদের প্রয়োজনে স্পষ্ট ভাষায় বলে উঠতে ভয় পায় না। (গালাতীয় ২:১১-১৪) এছাড়াও, এটি বিষয়টিকে সমাধান করার চেষ্টায় আরেকটি ভুল করার চেয়ে ক্ষতি ভোগ করাকে বেছে নেয়।—রোমীয় ১২:১৭, ২০.
প্রেম “সকলই বহন করে।” এটি সহ্য করতে, ধার্মিকতার কারণে দুঃখভোগ করতে ইচ্ছুক। একজন ব্যক্তি যার প্রেম রয়েছে, যে তার প্রতি অন্যায় করে তার সম্বন্ধে সে অন্যান্যদের কাছে প্রকাশে তৎপর হবে না। যদি অপরাধ খুবই গুরুতর না হয়, সে তা উপেক্ষা করবে। অন্যথায়, যে ক্ষেত্রে যীশুর সুপারিশকৃত মথি ১৮:১৫-১৭ পদে উদুল্লখিত বিষয়টি প্রযোজ্য, সে তা অনুসরণ করবে।
প্রেম “সকলই বিশ্বাস করে।” ঈশ্বর তাঁর সত্যের বাক্যে যা বলেছেন সেই বিষয়ে প্রেম বিশ্বাস রাখে, এমনকি যদিও বাইরের পরিস্থিতি এর বিরোধী এবং অবিশ্বাসী জগৎ উপহাস করে। বিশেষভাবে ঈশ্বরের প্রতি এই প্রেম হল, তাঁর বিশ্বস্ততা এবং নির্ভরতার বিবৃতির উপর ভিত্তি করে তাঁর সত্যতার একটি শনাক্তিকরণ চিহ্ন, ঠিক যেমন আমরা একজন সত্য, বিশ্বস্ত বন্ধুকে জানি ও ভালবাসি এবং কোন সন্দেহ করি না যখন সে আমাদের কিছু বলে, যে সম্বন্ধে হয়ত আমাদের কাছে কোন প্রমাণ নেই। (যিহোশূয় ২৩:১৪) প্রেম বিশ্বস্ত খ্রীষ্টান ভাইয়েদের প্রতি একজনের আস্থা উৎপন্ন করে; একজন খ্রীষ্টান তাদের সন্দেহ অথবা অবিশ্বাস করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না চূড়ান্ত প্রমাণ থাকে যে তারা ভুল ছিল।—গালাতীয় ৫:১০; ফিলীমন ২১.
প্রেম “সকলই প্রত্যাশা করে।” যিহোবা যা কিছু প্রতিজ্ঞা করেছেন সেই সমস্ত বিষয়ে প্রেম প্রত্যাশা রাখে। (রোমীয় ১২:১২) এটি ক্রমাগত কাজ করে চলে এবং ফল উৎপাদন ও বিষয়টির বৃদ্ধির জন্য যিহোবার প্রতি ধৈর্যসহকারে অপেক্ষা করে। (১ করিন্থীয় ৩:৭) যে ব্যক্তির প্রেম রয়েছে সে তার খ্রীষ্টীয় ভাইয়েদের জন্য সর্বোত্তম প্রত্যাশা করবে, তা তারা যে কোন পরিস্থিতিতেই থাকুক না কেন, এমনকি যদিও কেউ কেউ হয়ত বিশ্বাসে দুর্বল হয়ে থাকে। সে উপলব্ধি করবে যে যদি যিহোবা সেই সমস্ত দুর্বল ব্যক্তিদের প্রতি ধৈর্যশীল হন, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তারও সেই একই মনোভাব গ্রহণ করা উচিত। (২ পিতর ৩:১৫)
প্রেম “সকলই ধৈর্য্যপূর্ব্বক সহ্য করে।” যিহোবা ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ততা বজায় রাখার জন্য খ্রীষ্টানের প্রেমের প্রয়োজন রয়েছে। ঈশ্বরের প্রতি খ্রীষ্টীয় ভক্তি এবং বিশ্বস্ততার গভীরতা পরীক্ষা করার জন্য দিয়াবল যাই করুক না কেন, তৎসদুত্ত্বও, প্রেম এমনভাবে ধৈর্য বজায় রাখবে যা ঈশ্বরের প্রতি খ্রীষ্টীয় সত্যকে ধরে রাখে।—রোমীয় ৫:৩-৫.
“প্রেম কখনও শেষ হয় না।” এটি কখনও শেষ অথবা অস্তিত্বহীন হবে না। নতুন জ্ঞান এবং বোধগম্যতা হয়ত আমরা একসময় যা বিশ্বাস করতাম তা সংশোধন করতে পারে; প্রত্যাশা পরিবর্তিত হয় যতই প্রত্যাশিত বিষয় উপলব্ধ এবং নতুন বিষয় প্রত্যাশা করা হয়, কিন্তু প্রেম সর্বদাই এর পূর্ণতা বজায় রাখে এবং দৃঢ় থেকে দৃঢ়তরভাবে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। সত্যই, এই সমস্ত বিষয় এক উৎকৃষ্টতর গুণ হিসাবে ঈশ্বরীয় প্রেমকে সুপারিশ করে যেটি আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে উৎপন্ন করার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা করা উচিত।—১ করিন্থীয় ১৩:৮-১৩.