আধুনিক উপাসনায় সংগীতের স্থান
গান গাওয়া ঈশ্বর থেকে একটি উপহারস্বরূপ। আমাদের উচ্চৈঃস্বরে গান গাওয়া আমাদের এবং আমাদের সৃষ্টিকর্তার জন্য আনন্দ আনতে পারে। আমরা এর মাধ্যমে শোক ও আনন্দ আমাদের এই উভয় ভাবাবেগ প্রকাশ করতে পারি। এছাড়াও গানের উদ্যোক্তা যিহোবার জন্য আমরা আমাদের প্রেম, আরাধনা এবং প্রশংসা করতে পারি।
সংগীত সম্বন্ধে প্রায় তিনশ বাইবেল উদাহরণগুলির মধ্যে বেশির ভাগ যিহোবার উপাসনার সাথে সম্পর্কিত। এছাড়া গান গাওয়াও আনন্দের সাথে সংযুক্ত—কেবলমাত্র যারা গান গায় তাদেরই আনন্দ নয়, বরং এইভাবে যিহোবার ক্ষেত্রেও আনন্দ। গীতরচক লিখেছিলেন: “তাঁহার প্রশংসা গান করুক; কেননা সদাপ্রভু আপন প্রজাদিগেতে প্রীত।”—গীতসংহিতা ১৪৯:৩, ৪.
কিন্তু আধুনিক উপাসনায় গান গাওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বর্তমানে যিহোবার লোকেরা উচ্চৈঃস্বরে গান গাওয়ার মাধ্যমে কিভাবে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারে? সত্য উপাসনায় সংগীতের কোন্ স্থান থাকা উচিত? উপাসনার ক্ষেত্রে সংগীতের ইতিহাস সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে সাহায্য করবে।
উপাসনায় সংগীতের ঐতিহাসিক স্থান
সংগীত সম্পর্কে প্রথম বাইবেলের উল্লেখটি যিহোবার উপাসনার সাথে সুনির্দিষ্টভাবে সংযুক্ত নয়। আদিপুস্তক ৪:২১ পদে, যূবল কৃতিদুত্বর সাথে হয়ত প্রথম সংগীতের বাদ্যযন্ত্রগুলির উদ্ভাবন করে অথবা সম্ভবত কয়েক ধরনের সংগীত সংক্রান্ত কার্যের প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু, এমনকি মনুষ্য সৃষ্টির পূর্বেও সংগীত যিহোবার উপাসনার একটি অংশ ছিল। কিছুসংখ্যক বাইবেল অনুবাদকেরা দূতেদের গান সম্বন্ধে বর্ণনা করেন। ইয়োব ৩৮:৭ পদটি বলে স্বর্গদূতগণ আনন্দরব করলেন এবং “জয়ধ্বনি করিল।” তাই, মানুষ দৃশ্যপটে আসার বহু পূর্বে যিহোবার উপাসনায় গান করা যে প্রচলিত ছিল, তা বিশ্বাস করার শাস্ত্রীয় কারণ রয়েছে।
কোন কোন ইতিহাসবেত্তা তর্ক করে থাকেন যে, সমর্থক ঐকতান ব্যতিরেকে প্রাচীন ইব্রীয় সংগীত কেবলমাত্র সুরেলা ধ্বনি ছিল। কিন্তু, বাইবেল একটি বাদ্যযন্ত্র বীণা সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, যার মাধ্যমে একইসাথে একের অধিক বৈশিদুষ্ট্যর সুর বাজান যেত। বাদ্যযন্ত্রে নির্দিষ্ট স্বরগ্রামে সুর ও স্পন্দনের মিলনে ঐকতান সৃষ্টি করা যেত তা বীণাবাদকেরা অবশ্যই লক্ষ্য করেছেন। তাদের সংগীত সেকেলে হওয়ার চেয়ে বরঞ্চ, সন্দেহাতীতভাবে খুবই উন্নত ছিল। আর ইব্রীয় শাস্ত্রগুলির পদ্য এবং গদ্য অনুসারে বিচার করলে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে, ইস্রায়েলীয় সংগীত উচ্চ গুণসম্পন্ন ছিল। নিশ্চিতভাবেই, সংগীত রচনাগুলির জন্য প্রেরণার উৎস ছিল পার্শ্ববর্তী জাতিগুলির চেয়ে যথেষ্ট উৎকৃষ্ট।
প্রাচীন মন্দির সংগঠনটি মন্দিরের উপাসনায় বাদ্যযন্ত্র বিন্যাস এবং কণ্ঠ দেওয়ার জটিল ব্যবস্থা সমূহকে সম্ভব করেছিল। (২ বংশাবলি ২৯:২৭, ২৮) সেখানে “পরিচালক” “গুরু” “শিষ্য” এবং “গায়কদের প্রধান বর্গ” ছিলেন। (১ বংশাবলি ১৫:২১; ২৫:৭, ৮; নহিমিয় ১২:৪৬) তাদের সংগীত বিষয়ক উন্নতমানের দক্ষতার উপর মন্তব্য করে, ইতিহাসবেত্তা কার্ট স্যাক্স লেখেন: “যিরূশালেমের মন্দিরের সাথে সংযুক্ত সমবেত সংগীত গায়কেরা এবং ঐকতান-বাদক দলেরা তারা সংগীতবিষয়ক শিক্ষা, দক্ষতা এবং জ্ঞানের এক উচ্চমানের ধারণা দান করেন। . . . যদিও আমরা জানি না যে সেই প্রাচীন সংগীত শুনতে কেমন ছিল, কিন্তু আমাদের কাছে এর ক্ষমতা, মর্যাদা এবং পাণ্ডিত্যের পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে।” (প্রাচীন জগতে সংগীতের উত্থান: পূর্ব এবং পশ্চিম, ১৯৪৩, পৃষ্ঠা ৪৮, ১০১-২) (ইংরাজি) শলোমনের পরমগীতটি হচ্ছে ইব্রীয় সংগীত রচনাগুলির সৃজনশীলতা এবং গুণমাণের একটি উদাহরণ। এটি একটি গীতিকাহিনী যেটি গীতিনাট্যের বই অথবা অনুরূপ। গানটি ইব্রীয় মূল গ্রন্থে “শ্রেষ্ঠ সংগীত” হিসাবে নামকরণ করা হয়, সেইটি হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট গীত। গান প্রাচীন ইব্রীয়দের জন্য উপাসনার একটি অপরিহার্য অংশ ছিল। আর এটি তাদের যিহোবার প্রশংসায় ইতিবাচক ভাবাবেগজনিত অভিব্যক্তিকে অনুমতি প্রদান করেছিল।
প্রথম শতাব্দীর খ্রীষ্টানদের গান
প্রাথমিক খ্রীষ্টানদের মধ্য সংগীত উপাসনার একটি নিয়মিত অংশ হয়ে থাকত। অনুপ্রাণিত গীতসংহিতা থাকা ছাড়াও, মনে হয় তারা উপাসনার জন্য নতুন সংগীত ও গীতিকবিতাগুলি রচনা করে এবং আধুনিক দিনে খ্রীষ্টীয় গানগুলি রচনার জন্য একটি পূর্ব নিদর্শন স্থাপন করে। (ইফিষীয় ৫:১৯) ওয়াল্ডো সেল্ডন প্র্যাটের সংগীতের ইতিহাস (ইংরাজি) বইটি ব্যাখ্যা করে: “প্রাথমিক খ্রীষ্টানদের জন্য জনসাধারণ্যে এবং ব্যক্তিগত উপাসনায় গান গাওয়া প্রথাস্বরূপ ছিল। যিহূদী ধর্মান্তরিতদের জন্য এটি তাদের সমাজগৃহের প্রথাগুলির এক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মত ছিল . . . ইব্রীয় গীতসংহিতার অতিরিক্ত . . . , নতুন বিশ্বাসটি নতুন স্তোত্রগীতি বিরামহীনভাবে তৈরি করার প্রবণতা দেখায় যেগুলি মনে হয় প্রথমে আবেগবিহ্বল সংগীত রূপে গঠিত।”a
গান গাওয়ার মূল্যের গুরুত্ব আরোপ করে, যীশু যখন প্রভুর সান্ধ্যভোজ প্রবর্তন করেছিলেন তখন তিনি এবং প্রেরিতেরা খুব সম্ভবত প্রশংসা গীত গেয়েছিলেন। (মথি ২৬:২৬-৩০) এইগুলি যিহোবার প্রশংসার উদ্দেশ্যে গাওয়া গান যা গীতসংহিতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং নিস্তারপর্ব উদ্যাপনের সাথে সংযোগ রেখে গাওয়া হত।—গীতসংহিতা ১১৫-১১৮.
মিথ্যা উপাসনার প্রভাব
তথা কথিত অন্ধকার যুগে, ধর্মীয় সংগীত হ্রাস পেয়ে শুধু শোকাচ্ছাদিত স্তবে পরিণত হয়েছিল। প্রায় সা.শ. ২০০ সালে আলেকজান্দ্রিয়ার ক্লেমেন্ট বলেছিলেন: “আমাদের একটি বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োজন: বীণা, অথবা ঢাক বা বাঁশী কিংবা তূরী নয়, কিন্তু কণ্ঠস্বরের শান্তিপূর্ণ বাক্য।” সীমাবদ্ধগুলি আরোপ করা হয়েছিল, ফলে গির্জার সংগীত শুধুমাত্র কদুণ্ঠ সীমিত হয়। এই ধরণটি স্তব অথবা ঐকতান-সংগীত হিসাবে পরিচিত হয়। “কন্স্টান্টটিনোপলের উত্তোলনের চল্লিশেরও কম বছর পরে, লায়দিকিয়ার পরিষদ (৩৬৭ খ্রীষ্টাব্দে) গির্জার জনসাধারণের প্রার্থনা অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র এবং মণ্ডলীগুলির উভয়েরই অংশগ্রহণকে নিষিদ্ধ করেছিল। অর্থোডক্স সংগীত পুরোপুরি কদুণ্ঠ হয়েছে,” আমাদের সংগীত বিষয়ক ঐতিহ্য (ইংরাজি) বইটি বলে। (বাঁকা অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।) প্রাথমিক খ্রীষ্টধর্মে এই সীমাবদ্ধতাগুলির কোন ভিত্তি নেই।
অন্ধকার যুগে বাইবেল সাধারণ লোকেদের কাছে অপরিচিত এবং দুর্লভ ছিল। খ্রীষ্টানেরা যারা বাইবেল পড়তে অথবা নিজেরা পেতে দুঃসাহস দেখাত তাদের নির্যাতন ও এমনকি হত্যা করা হত। তাই, এটি আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, ইতিহাসে অন্ধকার যুগে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রশংসার গান করা খুব কম দেখা যেত। মোটের উপর, সাধারণ লোকেরা যদি শাস্ত্রগুলি না পেত তাহলে তারা কিভাবে জানবে যে সম্পূর্ণ বাইবেলের দশ ভাগের একাংশই গান? এই সম্পর্কে কে তাদের জানাবে যে যিহোবা তাঁর উপাসনাকারীদের আদেশ দিয়েছিলেন “সদাপ্রভুর উদ্দেশে নূতন গীত গাও; সাধুগণের সমাজে তাঁহার প্রশংসা গাও”?—গীতসংহিতা ১৪৯:১.
উপাসনায় সংগীতকে এর যথাযথ স্থানে পুনঃস্থাপন
সংগীত ও গান গাওয়াকে যথাস্থানে ফিরিয়ে আনার জন্য যিহোবার সংগঠন অনেক কিছু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফেব্রুয়ারি ১, ১৮৯৬, সিয়োনের প্রহরীদুর্গ (ইংরাজি) সংখ্যাতে শুধুমাত্র গান সম্পর্কে আছে। এটিকে “প্রারম্ভে সিয়োনের মনোরম গান সকল” নামে আখ্যায়িত করা হয়।
১৯৩৮ সালে গান গাওয়া মণ্ডলীর সভাগুলিতে প্রায়ই বাতিল হয়েছিল। কিন্তু, প্রজ্ঞার সাথে প্রেরিতদের উদাহরণ এবং নির্দেশনা অনুসরণ করার ফলে সত্বর সাফল্য লাভ করেছিল। ১৯৪৪ সালে জেলা সম্মেলনে এফ.ডব্লিউ ফ্র্যান্জ “রাজ্যের পরিচর্যার গান” সম্পর্কে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি দেখান যে যিহোবার উদ্দেশ্যে প্রশংসা গীত মানুষ সৃষ্টির বহু পূর্বে ঈশ্বরের স্বর্গীয় প্রাণীদের মাধ্যমে করা হত এবং তিনি বলেন: “ঈশ্বরের কাছে আক্ষরিক গানের মাধ্যমে তাঁর পার্থিব দাসেদের উচ্চৈঃস্বরে গাওয়া সঠিক এবং সুমধুর।” উপাসনায় গানের স্বপক্ষে অন্তর্নিহিত আলাপ-আলোচনার পর, সাপ্তাহিক পরিচর্যা সভাগুলিতে ব্যবহার করার জন্য তিনি রাজ্যের পরিচর্যার গান বই প্রকাশ ঘোষণা করেন।b তারপর ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বরে ইন্ফরম্যান্ট-এ (বর্তমানে আমাদের রাজ্যের পরিচর্য্যা বলা হয়) ঘোষণা করা হয় যে অন্যান্য সভাগুলিতে আরম্ভে এবং শেষে গানগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। গান গাওয়া আরেকবার যিহোবার উপাসনার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
‘আমাদের অন্তঃকরণে যিহোবার উদ্দেশ্যে গান গাওয়া’
আমাদের পূর্ব ইউরোপ এবং আফ্রিকার ভাইয়েরা বহু বছর ধরে যারা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা এবং তাড়না ভোগ করেছে, তারা আন্তরিকভাবে গানের মূল্য প্রদর্শন করে। লোথার ভাগ্নার সাত বছর নির্জন কারাযাপন করেছিলেন। কিভাবে তিনি করেছিলেন? “আমি কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার স্মৃতির ভিতর যে রাজ্যের গানগুলি ছিল তা পূর্ণ করতে নিবিষ্ট থাকি। যখন আমি সঠিকভাবে পদটি জানতাম না তখন শুধুমাত্র একটি কিংবা দুইটি স্তবক রচনা করতাম। . . . আমাদের রাজ্যের গানগুলির মধ্যে কতই না পর্যাপ্ত পরিমাণে উদ্দীপনামূলক এবং গঠনমূলক চিন্তাধারা রয়েছে!”—১৯৭৪ সালের যিহোবার সাক্ষীদের বর্ষপুস্তক (ইংরাজি) পৃষ্ঠা ২২৬-৮.
হেরাল্ড কিং তার দৃঢ় বিশ্বস্তার জন্য নির্জন কারাবাসের পাঁচ বছরের মধ্যে, যিহোবার উদ্দেশ্যে প্রশংসা গীত রচনা এবং গাওয়ার মাধ্যমে সান্ত্বনা পেয়েছিলেন। তার রচনাগুলির কিছু সংখ্যক বর্তমানে যিহোবার সাক্ষীরা তাদের উপাসনায় ব্যবহার করে থাকে। গানের সাথে সংযুক্ত আনন্দ একজনকে শক্তিদান করে। কিন্তু আমাদের ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রশংসা গীতের মূল্য বোঝার জন্য তাড়না ভোগ করার প্রয়োজন হবে না।
যিহোবার সকল লোকেরা গানে আনন্দ পেতে পারে। এমনকি আমাদের নিজেদের মৌখিকভাবে বলার ক্ষেত্রে হয়ত কিছুজনের সঙ্কোচ আছে, যখন আমরা গানে কণ্ঠ দিই, স্বচ্ছন্দ্যে যিহোবার প্রতি তখন আমাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি। প্রেরিত পৌল দেখান কিভাবে আমরা প্রশংসা গান করে আনন্দ পেতে পারি, যখন তিনি খ্রীষ্টীয়দের উদ্দেশ্যে উপদেশ দিয়েছিলেন: “গীত, স্তোত্র ও আত্মিক সঙ্কীর্ত্তনে পরস্পর আলাপ কর; আপন আপন অন্তঃকরণে প্রভুর [“যিহোবার,” NW] উদ্দেশে গান ও বাদ্য কর।” (ইফিষীয় ৫:১৯) আমাদের হৃদয় আধ্যাত্মিক বিষয়ে পূর্ণ হয়ে গেলে আমরা গানে জোরাল ভাব খুঁজে পাই। সুতরাং গানের উন্নতি করার চাবিকাঠি হচ্ছে সঠিক অন্তঃকরণ।
যিহোবার সাথে এক উত্তম সম্পর্ক স্থাপন, এক আনন্দিত আত্মা, কথা বলার জন্য আমাদের পরিচালিত করে, গান এবং উচ্চৈঃস্বরে যিহোবার প্রশংসা প্রদানে সাহায্য করে। (গীতসংহিতা ১৪৬:২, ৫) আমরা যা কিছু উপভোগ করি সেই সম্পর্কে আন্তরিকভাবে গান করে থাকি। আর আমরা যদি গান কিংবা গানের ভাব পছন্দ করি তাহলে খুব সম্ভবত তা প্রকৃত আবেগের সঙ্গে গাইব।
একজনকে আবেগের সঙ্গে গাইবার জন্য চিৎকার করতে হয় না। উত্তম গানের সাথে চিৎকার করে গান গাওয়ার অবশ্যই কোন সংযোগ নেই; আবার আওয়াজ শোনা না গেলেও সেই গান গাওয়া ঠিক নয়। এমনকি গান হয়ত কোমল হবে তথাপি কিছুজনের স্বাভাবিক প্রতিস্বরের সাথে কণ্ঠ দৃঢ় হয়ে থাকে। একটি দলের সঙ্গে সুন্দর করে গান গাওয়ার চ্যালেঞ্জের একটি অংশ হল দলের সঙ্গে মিলেমিশে গান করতে শেখা। আপনি একতানে অথবা সমস্বরে গান করছেন কি না, আপনার আশেপাশের কণ্ঠধ্বনির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে নিলে তা হবে মধুর ও সমরূপ। একজনকে উদ্দীপনার সাথে গান গাওয়ার ভারসাম্যতা অর্জনের জন্য খ্রীষ্টীয় নম্রতা এবং শ্রবণীয় কান সাহায্য করে, আর তখনই কারও কণ্ঠ অত্যন্ত প্রবল হবে না। যাইহোক, যারা দক্ষতার সাথে গান করে কিংবা ব্যতিক্রমভাবে সুকদুণ্ঠর অধিকারী তাদের গান গাওয়ার ক্ষেত্রে কখনও নিরুৎসাহিত হওয়া উচিত নয়। একটি সুন্দর কদুণ্ঠ যিহোবার উদ্দেশ্যে প্রশংসা গীত গাওয়ার মাধ্যমে একটি মণ্ডলীকে দৃঢ় সমর্থন যোগাতে পারে।
আমাদের সভাগুলিতে গান করারও সুরগুলির সাথে গানের অংশিক একতানের মধ্যে এক যথার্থ সুরসংযোজনাও যোগায়। যাদের একতানের সাথে স্বরগ্রামে সুর করার অনুভবশক্তি রয়েছে অথবা যারা গান বইয়ের পঙ্ক্তির সাথে মিলিয়ে পড়তে ও কণ্ঠ দিতে পারে, তাদের মণ্ডলীর গানের সাথে সুর মিলিয়ে এবং সংগীতের সৌন্দর্যে যোগ দিয়ে গাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।c
কিছুজন হয়ত দাবি করতে পারে, ‘আমি ঠিকসুরে গাইতে পারি না’ অথবা ‘আমার কণ্ঠস্বর অত্যন্ত বেসুরা; উচ্চ সোপানগুলিতে কণ্ঠস্বর কর্কশ।’ এই কারণে, এমনকি তারা কিংডম হলে একটি দলের মধ্যে থেকেও, গান গাওয়ার সময়ে ভয় পায়। এটি সত্য যে উচ্চৈঃস্বরে যিহোবার উদ্দেশ্যে যে কোন প্রশংসা গীত গাওয়া, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে “বেসুরা” নয়। ঠিক যেমন অভ্যাস করা এবং ঐশিক পরিচর্যা বিদ্যালয়ে প্রদত্ত সহায়কমূলক পরামর্শ অনুসরণের মাধ্যমে একজনের কথা বলার কণ্ঠস্বরকে উন্নতি করতে পারে, তেমনি একজন তার গান গাওয়াকে উন্নতি করতে পারে। কিছুজন কাজ করার সময়ে শুধুমাত্র গুনগুন করে গান গাওয়ার মাধ্যমে তাদের কণ্ঠস্বরের উন্নতি করেছে। গুনগুন করার সাহায্যে কণ্ঠস্বরের সুরধ্বনি মসৃণ করে। যখন আমরা একা থাকি অথবা অন্যেরা বিরক্ত হবে না এমন জায়গায় কাজ করি, রাজ্যের গানগুলি গাওয়া কণ্ঠস্বরের জন্য চমৎকার অনুশীলন ও একজনকে অনন্দিত এবং প্রশমিত মেজাজে রাখে।
সমাবেশে রাজ্যের গানগুলির অল্প কয়েকটি গান গাইতেও আমরা উৎসাহিত করতে পারি। এইধরনের গানের সাথে একটি বাদ্যযন্ত্র যেমন গীটার কিংবা পিয়ানো অথবা সমিতির রেকর্ড করা পিয়ানোর সুরসংগীত, আমাদের সমাবেশের ক্ষেত্রে একটি আধ্যাত্মিক আমেজ প্রদান করে। এতে গানগুলি শিখতেও সাহায্যকারী হয় এবং মণ্ডলীর সভাগুলিতে সুন্দরভাবে সেগুলি গাওয়া যায়।
সভাগুলিতে গানের মাধ্যমে মণ্ডলীগুলিকে প্রাণবন্তণ করার সাহায্যের জন্য সমিতি এর সাথে রেকর্ড করা সুরেলা যন্ত্রসংগীতের ব্যবস্থা করেছে। এগুলি বাজানোর সময়, যিনি সাউণ্ড সিদুস্টম পরিচালনা করেন তার কণ্ঠধ্বনি সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। যদি যন্ত্রসংগীতটি যথেষ্ট জোরে না হয় তাহলে মণ্ডলী হয়ত গান গাইতে ভয় পাবে। যেহেতু ভাই যিনি সাউণ্ড সিদুস্টম নিয়ন্ত্রণ করার সাথে সাথে মণ্ডলীর সঙ্গে গান করেন, তাই তিনি ধরতে পারবেন যে যন্ত্রসংগীতটি সহায়ক পরিচালনা দিতে পারছে কি পারছে না।
যিহোবার উদ্দেশ্যে গান করা
আমাদের সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে আমাদের অনুভূতিগুলিকে প্রকাশ করার জন্য গান গাওয়া আমাদের সুযোগ দিয়ে থাকে। (গীতসংহিতা ১৪৯:১, ৩) এটি কেবলমাত্র অনুভূতির বহিঃপ্রকাশই নয়, বরং এক নিয়ন্ত্রিত, যুক্তিযুক্ত এবং আমাদের প্রশংসার আনন্দপূর্ণ অভিব্যক্তি। মণ্ডলীর গানে আমাদের হৃদয় ঢেলে দেওয়া পরবর্তী কার্যক্রমে আমাদের হৃদয় ও মনের ভাবকে ঠিক স্থানে স্থাপন করতে পারে এবং যিহোবার উপাসনায় এক বৃহতর অংশগ্রহণে আমাদের উদ্দীপ্ত করতে পারে। যদিও গানের আবেগময় প্রভাব রয়েছে, তথাপি গানের কথাগুলি আমাদের জন্য নির্দেশনার কাজ করতে পারে। সুতরাং সমস্বরে এবং ঐকতানে আমাদের নিজেদেরকে প্রকাশ করার মাধ্যমে, আমাদের অন্তর মৃদু এবং নম্রভাবে প্রস্তুত করছি যেন আমরা সংগঠিত লোক হিসাবে একসাথে শিখতে পারি।—তুলনা করুন গীতসংহিতা ১০:১৭.
গান সবর্দা যিহোবার উপাসনার একটি অংশ হবে। এইজন্য আমাদের গীতরচকের অনুভূতির সাথে অনন্তকাল অংশগ্রহণ করার প্রত্যাশা রয়েছে: “আমি যাবজ্জীবন সদাপ্রভুর প্রশংসা করিব; আমি যত কাল বাঁচিয়া থাকি, আমার ঈশ্বরের প্রশংসা গান করিব।”—গীতসংহিতা ১৪৬:২.
[পাদটীকাগুলো]
a আবেগবিহ্বল সংগীত হল একটি সুরেলা যন্ত্র যা বিভিন্ন অংশে এক স্বাধীন ভাবের মাধ্যমে শনাক্ত। আবেগবিহ্বল সংগীত প্রায়ই বিরোচিত ঘটনা অথবা চরিত্রগুলির উচ্চপ্রশংসা করে।
b মনে হয় প্রথম করিন্থীয় ১৪:১৫ পদটি ইঙ্গিত করে যে গান প্রথম শতাব্দীর খ্রীষ্টীয় উপাসনার একটি নিয়মিত বৈশিষ্ট্য ছিল।
c যিহোবার উদ্দেশ্যে প্রশংসা গীত গাও (ইংরাজি) আমাদের চলতি গান বইয়ের মধ্যে কিছু গানগুলির চার-অংশে রাখা একতানের রীতিটি তাদের জন্য উপকারী যারা গানের একতানের অংশবিশেষ উপভোগ করে। কিন্তু, বেশির ভাগ গানগুলি আন্তর্জাতিক মূল সুরৈক্য বজায় রাখার চেষ্টায় পিয়ানোর সাথে এবং সুরসংগীতে রূপায়িত করার মাধ্যমে উপযোগী করে নেওয়া হয়েছে। ঐকতানের বৈশিষ্ট্যগুলি বাজাতে বাজাতে সুর সৃষ্টি করার জন্য সংক্ষিপ্ত চার-অংশের সাদৃশ্যবিধান ছাড়াই গানগুলি লেখা হয়েছে যার ফলে হয়ত সভাগুলিতে আমাদের গান গাওয়াকে প্রীতিপ্রদ মনোমুগ্ধকর করে তুলবে।
[২৭ পৃষ্ঠার বাক্স]
ভাল গানের জন্য কিছু পরামর্শ
১. গান গাওয়ার সময়ে গান বইটি উপরের দিকে তুলে ধরে গান করুন। এটি একজনকে আরও বেশি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে সাহায্য করে।
২. প্রত্যেক বাক্যাংশের শুরুতে ভালভাবে শ্বাস নিন।
৩. প্রথমে যতখানি মুখ খোলা একজনের পক্ষে সুবিধাজনক তার চেয়ে একটু বেশি খোলা স্বাভাবিকভাবেই স্বর ও স্বরের অনুরণনকে বৃদ্ধি করবে।
৪. সর্বোপরি, যে গানটি গাওয়া হচ্ছে তার অনুভূতির প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখুন।