“দায়ূদের গৃহ”—বাস্তব অথবা কাহিনী?
দায়ূদ—মেষপালক বালক যিনি একজন বাদক, একজন কবি, একজন সৈনিক, একজন ভাববাদী এবং একজন রাজা হয়েছিলেন—যাকে বাইবেলে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তার নাম ১,১৩৮ বার উল্লেখিত হয়েছে; “দায়ূদের গৃহ” অভিব্যক্তিটি—যা প্রায়ই দায়ূদের রাজবংশকে চিত্রিত করে—২৫ বার ব্যবহৃত হয়েছে। (১ শমূয়েল ২০:১৬) রাজা দায়ূদ এবং তার রাজবংশ শুধুই কি কাহিনী ছিল? প্রত্নতত্ত্ব কী প্রকাশ করে? উত্তর গালীলে তেল দানের এক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন স্থানে এক সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার, দায়ূদ এবং তার রাজবংশের ঐতিহাসিকতা সমর্থন করে বলে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৩ সালের গ্রীষ্মকালে, অধ্যাপক অ্যাভরাহাম বিরান দ্বারা পরিচালিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক দল প্রাচীন দানের বহিঃস্থ দ্বারের বাইরের একটি অঞ্চল থেকে অপ্রয়োজনীয় বস্তু অপসারণ করেছিল। তারা একটি বাঁধানো চক আবিষ্কার করেছিল। ভূমি থেকে বাইরের দিকে প্রসারিত একটি কালো আগ্নেয় শিলা সহজেই সরানো গিয়েছিল। যখন শিলাটিকে অপরাহ্নের সূর্যের দিকে ঘোরানো হয়েছিল, তখন শিলার উপর অক্ষরগুলি জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। অধ্যাপক বিরান বিস্ময়ে চিৎকার করে বলেন, “হে আমার ঈশ্বর, আমাদের একটি শিলালিপি রয়েছে!”
অধ্যাপক বিরান এবং তার সহকর্মী, যিরূশালেমের ইব্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যোসেফ নাভে, অবিলম্বে শিলালিপিটির উপরে একটি বৈজ্ঞানিক বিবৃতি লিখেছিলেন। এই বিবৃতিটির উপরে ভিত্তি করে, বাইবেলের প্রত্নতাত্ত্বিক পুনরালোচনা (ইংরাজি) নামক পত্রিকা, মার্চ/এপ্রিল ১৯৯৪ সালের একটি প্রবন্ধ এইভাবে পড়া হয়: “নিউ ইয়র্ক টাইমস এর প্রথম পৃষ্ঠায় প্রায়ই প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সম্বন্ধীয় কোন বিষয় থাকে না (এমনকি টাইম পত্রিকায়ও নয়)। কিন্তু গত গ্রীষ্মে তেল দানে একটি আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তা ঘটে, যেটি উত্তর গালীলে, যর্দন নদীর একটি প্রধান স্রোতের পাশে হামোন পর্বতের পাদদেশে একটি সুন্দর পাথরের ঢিবি।”
“সেখানে অ্যাভরাহাম বিরান এবং তার প্রত্নতত্ত্ববিদ্দের দলটি সা.শ.পূ. নবম শতাব্দীর একটি উল্লেখযোগ্য শিলালিপি পেয়েছিল যেটি ‘দায়ূদের গৃহ’ এবং ‘ইস্রায়েলের রাজা’ উভয়ের সম্বন্ধেই উল্লেখ করে। এটি হচ্ছে প্রথম যখন দায়ূদের নাম বাইবেল ছাড়া প্রাচীন কোন শিলালিপিতে পাওয়া গেছে। ঐ শিলালিপিটি শুধু কোন এক ‘দায়ূদকে’ নয়, বরং দায়ূদের গৃহ, মহান ইস্রায়েলীয় রাজার রাজবংশ সম্বন্ধে উল্লেখ করে যেটি এমনকি আরও বেশি উল্লেখযোগ্য।
“‘ইস্রায়েলের রাজা’ এমন একটি শব্দ যা বহুসংখ্যক বার বাইবেলে পাওয়া যায়, বিশেষ করে রাজাবলির পুস্তকে। যাইহোক, এটি হয়ত ইস্রায়েলে সেমেটিক লিপিতে লেখা বাইবেলের বাইরে সবচেয়ে পুরনো উল্লেখ। যদি এই শিলালিপি কিছু প্রমাণ করে, তাহলে বাইবেলকে ছোট করে দেখে এমন কিছু পণ্ডিতদের দাবিগুলির বিপরীতে, এটি দেখায় যে ইস্রায়েল এবং যিহূদা উভয়ই এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল।”
সময় নির্ণয়, অক্ষরগুলির আকার, পাথর খণ্ডের কাছে প্রাপ্ত পাত্রগুলির বিশ্লেষণ এবং শিলালিপির বিষয়বস্তুর উপর নির্ভর করে। এই তিনটি পদ্ধতিই একই সময়কে ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ সা.শ.পূ. নবম শতাব্দী, যা রাজা দায়ূদের একশ বছরের কিছুটা বেশি সময় পরে। পণ্ডিতেরা মনে করেন যে এই শিলালিপিটি এক অরামীয় দ্বারা দানে রচিত এক বিজয় কীর্তিস্তম্ভের অংশ, যে “ইস্রায়েলের রাজা” এবং “দায়ূদের গৃহের [রাজা]” উভয়ের শত্রু ছিল। জনপ্রিয় বিপর্যয়কারী দেবতা, হেডেডের উপাসনাকারী অরামীয়েরা পূর্বদিকে বাস করত।
১৯৯৪ সালের গ্রীষ্মকালে, এই প্রস্তরের আরও দুটি খণ্ড পাওয়া যায়। অধ্যাপক বিরান বিবৃতি দেন: “এই দুটি খণ্ডে অরামীয় দেবতা হেডেডের নাম রয়েছে, আর সেই সাথে ইস্রায়েলীয় এবং অরামীয়দের মধ্যে একটি যুদ্ধ সম্বন্ধেও উল্লেখ পাওয়া যায়।”
১৯৯৩ সালে প্রধান খণ্ডটি আবিষ্কৃত হয়, যেটিতে পুরনো ইব্রীয় লেখায় ১৩টি আংশিক দৃশ্যতঃ লাইন ছিল। সেই সময়ে, একটি পাঠে শব্দগুলিকে পৃথক করার জন্য বিন্দুকে শব্দ বিভাজক হিসাবে ব্যবহার করা হত। কিন্তু, “দায়ূদের গৃহ” কথাটি “byt” (গৃহ), একটি বিন্দু এবং তারপর “dwd” (দায়ূদ) লেখার পরিবর্তে একটি শব্দ হিসাবে “bytdwd” (রোমীয় অক্ষরে বর্ণান্তরিত) অক্ষরগুলি দ্বারা লেখা হয়েছিল। বোধগম্যভাবেই, “bytdwd” এর অনুবাদ সম্বন্ধে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
ভাষাতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এনসেন রেইনি বর্ণনা করেন: “যোসেফ নাভে এবং অ্যাভরাহাম বিরান বিশদভাবে শিলালিপিটি ব্যাখ্যা করেননি, কারণ হয়ত তারা ধরে নিয়েছিলেন পাঠকেরা জানে যে এইধরনের কাঠামোতে দুটি অংশের মধ্যে শব্দ বিভাজক প্রায়ই বাদ দেওয়া হয়, বিশেষ করে যদি সন্ধিযুক্ত শব্দ দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত যথাযথ নাম হয়। সা.শ.পূ. নবম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে ‘দায়ূদের গৃহ’ নিশ্চিতভাবে সেই ধরনের একটি যথাযথ রাজনৈতিক এবং ভৌগলিক নাম ছিল।”
আরেকটি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ
এই আবিষ্কারের পর, মেশা প্রস্তরের (মোয়াবীয় প্রস্তরও বলা হয়) একজন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আন্দ্রে লেমার, জানিয়েছিলেন যে এটিও “দায়ূদের গৃহ”-কে উল্লেখ করে।a ১৮৬৮ সালে আবিষ্কৃত মেশা প্রস্তরটি তেল দানের প্রস্তরটির সাথে অনেক দিক দিয়ে একরকম। উভয়ই সা.শ.পূ. নবম শতাব্দীর সময়কার, একই উপাদানে গঠিত, আকারে একইরকম এবং প্রায় অভিন্ন সেমেটিক লিপিতে লিখিত।
মেশা প্রস্তরের ক্ষতিগ্রস্ত পঙ্ক্তিগুলির নতুন পুনর্গঠন সম্বন্ধে অধ্যাপক লেমার লিখেছিলেন: “তেল দানের খণ্ডটি আবিষ্কারের প্রায় দুই বছর আগে আমি উপসংহার করেছিলাম যে মেশা প্রস্তরে ‘দায়ূদের গৃহ’ সম্বন্ধে উল্লেখ পাওয়া যায়। . . . হয়ত মেশা প্রস্তরের কখনও উপযুক্ত এডিটিও প্রিনকেবস্ [প্রথম সংস্করণ] ছিল না, এই তথ্যটির কারণে ‘দায়ূদের গৃহ’ প্রসঙ্গটি পূর্বে কখনও উল্লেখ করা হয়নি। মেশা প্রস্তর আবিষ্কারের ১২৫ বছর পর সেটিই আমি প্রস্তুত করছি।”
এইধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য আগ্রহজনক, কারণ একজন দূত, যীশু নিজে, তাঁর শিষ্যেরা এবং সাধারণ লোকেরা দায়ূদের ঐতিহাসিকতা সম্বন্ধে প্রমাণ দিয়েছেন। (মথি ১:১; ১২:৩; ২১:৯; লূক ১:৩২; প্রেরিত ২:২৯) প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলি স্পষ্টভাবেই একমত যে তিনি এবং তার রাজবংশ, “দায়ূদের গৃহ” হল বাস্তব, কাহিনী নয়।
[পাদটীকা]
a মেশা প্রস্তরটি ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির সাহিত্যাদির পাঠকদের কাছে পরিচিত। (প্রহরীদুর্গ, (ইংরাজি), এপ্রিল ১৫, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ৩০-১ দেখুন।) এটি প্যারিসের লুভরে যাদুঘরে রয়েছে।
[৩১ পৃষ্ঠার চিত্র]
তেল দান খণ্ডটি,* উত্তর গালীলের দান নগরে ১৯৯৩ সালে আবিষ্কৃত হয়েছিল
* ইস্রায়েল এক্সপ্লোরেশন জার্নাল-এ আসা একটি আলোকচিত্রের উপর ভিত্তি করে অঙ্কন করা হয়েছে।