“ঈশ্বরের পর্বত” এর দেশে এক “সাক্ষী স্তূপ”
মহাদেশের একটি মানচিত্রে, যদি আপনি পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল-রেখা অনুসরণ করেন এবং পূর্বদিকে গিনি উপসাগরীয় অঞ্চলের অভিমুখ বরাবর অগ্রসর হন, যেখানে উপকূল দক্ষিণদিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে আপনি কামেরুণ দেখতে পাবেন। যদি আপনি উপকূল বরাবর দক্ষিণদিকে ক্রমাগত চলতে থাকেন, আপনি এক বিশাল প্রসারিত কালো বালুকাময় সমুদ্রসৈকতে এসে পৌঁছাবেন। কালো বালি কামেরুণ পর্বতের আগ্নেয়গিরিসংক্রান্ত কার্যকলাপের ফল।
এই শঙ্কু অকৃতি, ৪,০৭০ মিটার উচ্চ পর্বত চূড়া সম্পূর্ণভাবে এলাকাটির উপর কর্তৃত্ব করে। যখন অস্তগামী সূর্যের আলো কামেরুণ পর্বতের ঢালে এসে পড়ে তখন এটি চমৎকার প্রাণবন্ত রঙের দৃষ্টি আকর্ষক প্রদর্শনী হয়ে ওঠে—বেগুনি, কমলা, সোনালী এবং গাঢ় লাল। পৃথিবী থেকে আকাশকে পৃথক করা একেবারে অসম্ভব করে দিয়ে, সমুদ্র ও নিকটবর্তী জলাভূমি এই সমস্ত রঙের আভাকে আয়নার মত প্রতিফলিত করে। তাই এটি বোঝা সহজ যে কেন ওই অঞ্চলের অ্যানিমিষ্ট গোষ্ঠী এই পর্বতের নাম দিয়েছে মনগো মা লোবা; যার অনুবাদ হল “দেবতাদের রথ,” অথবা আরও প্রচলিতভাবে “ঈশ্বরের পর্বত।”
আরও দক্ষিণে, অনেক কিলোমিটার বিস্তৃত সাদা বালুকাময় সমুদ্রসৈকত যেখানে সারিবদ্ধ নারকেল গাছ দেখা যায়। মনোরম উপকূলভাগ ছাড়া দেশের অধিকাংশ অংশই গহন নিরক্ষীয় বনভূমি দ্বারা আবৃত, যা কঙ্গো ও মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র এবং নাইজেরিয়ার উত্তর দিক ও সাহারার নিকটবর্তী চাদ অঞ্চলের প্রান্ত পর্যন্ত প্রসারিত। দেশের পশ্চিম ভাগ পর্বতময়, যা ভ্রমণকারীদের ইউরোপের কিছু অংশের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু, উষ্ণ আবহাওয়া আপনাকে ভুলে যেতে দেয় না যে আপনি নিরক্ষবৃত্তের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন। এর গ্রামাঞ্চলের বৈচিত্র্য অনেক পর্যটক পথনির্দেশকদের কামেরুণকে আফ্রিকার অবিকল প্রতিরূপ, ক্ষুদ্র সংস্করণ বলে বর্ণনা করতে পরিচালিত করে। এই ধারণা আরও জোরালো হয় এর বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী এবং ২২০টিরও বেশি নথিভুক্ত ভাষা এবং আঞ্চলিক ভাষাগোষ্ঠীর অবস্থানে।
কামেরুণে বেড়াতে গিয়ে আপনি হয়ত দুয়ালার সমুদ্রবন্দরে, অথবা রাজধানী শহর ইয়াউণ্ডের একটি বড় হোটেলে থাকবেন। কিন্তু আপনি লোকেদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে কিছু বিষয় জানার সুযোগ হারাবেন, বিশেষত ২৪,০০০ জনেরও বেশি যিহোবার সাক্ষী যারা সম্পূর্ণ “ঈশ্বরের পর্বত” দেশ ব্যাপী এক “সাক্ষী স্তূপ” গঠন করতে ব্যস্ত।a তাদের কিছুজনের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য দেশের মধ্যে একবার ভ্রমণ করুন না কেন? পশ্চিম আফ্রিকার এই ভূভাগে আপনার ভ্রমণ নিশ্চয়ই প্রচুরভাবে পুরস্কৃত হবে।
কাঠের গুঁড়ির তৈরি নৌকা, ছোট গাড়ি অথবা সাইকেলের সাহায্যে?
যেখানে কামেরুণের দীর্ঘতম নদী সানেগা সমুদ্রে মিশেছে সেখানে এটি একটি বৃহৎ দ্বীপ সৃষ্টি করেছে। এই বিস্তৃত অঞ্চলের সমস্ত জনসাধারণের কাছে পৌঁছাতে যিহোবার সাক্ষীদের প্রায়ই কাঠের গুঁড়ির তৈরি নৌকায় ভ্রমণ করতে হয়। এমবিয়াকোর নয়জন রাজ্য প্রকাশকের ছোট দলটি এই রকমই করে থাকে। তাদের মধ্যে দুজন ২৫ কিলোমিটার দূরে ইয়ো গ্রামে থাকেন। এমবিয়াকোয় পৌঁছাতে তাদের সক্রিয়ভাবে দাঁড় বাওয়ার প্রয়োজন হত, তবুও তারা সর্বদা খ্রীষ্টীয় সভাগুলিতে উপস্থিত থাকেন। এই দলটি পরিদর্শন করার সময়, এক ভ্রমণ অধ্যক্ষ যিহোবা সাক্ষীবৃন্দেরা—নামের পিছনে যে সংগঠনটি (ইংরাজি) নামক ভিডিওটি দেখানোর জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু সেটি বলা সহজ হলেও করা কঠিন ছিল। এইপ্রকার এক দূরবর্তী গ্রামে কোথায় তিনি একটি ভিডিও ক্যাসেট রেকর্ডার, একটি টেলিভিশন সেট এবং সেগুলি চালাবার জন্য বিদ্যুৎ পাবেন?
পরিদর্শনের সপ্তাহে, কিছু প্রকাশককেরা স্থানীয় এক গির্জার পুরোহিতের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তাদের আশ্চর্য করে দিয়ে পুরোহিতটি তাদের আন্তরিক স্বাগত জানান এবং তার সাথে তাদের এক প্রাণোজ্জ্বল বাইবেল আলোচনা হয়। সেই পুরোহিতটি কেবলমাত্র একটি ভি. সি. আর. এর মালিক নন কিন্তু তার কাছে একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটারও আছে এটি লক্ষ্য করে ভাইয়েরা সাহস করে জিজ্ঞাসা করেন যে তারা তার সরঞ্জামগুলি ধার করতে পারে কি না। পূর্বেই বাইবেল আলোচনা উপভোগ করায় পুরোহিতটি সাহায্য করতে রাজি হয়েছিলেন। শনিবার সন্ধ্যায় ১০২ জন ব্যক্তি সেটি দেখতে এসেছিল যার অন্তর্ভুক্ত ছিল সেই পুরোহিত ও তার গির্জার অধিকাংশ সদস্য। ইয়ো থেকে দুজন সাক্ষী দুটো নৌকায় করে অনেক আগ্রহী ব্যক্তিদের নিয়ে এসেছিলেন। তারা বৃদ্ধিরত জোয়ারের বিদ্যুতের বিপরীতে দাঁড় বাওয়াকে খুব বেশি কষ্টকর বলে বিবেচনা করেননি। ভিডিও দেখার পর তারা গভীরভাবে প্রভাবিত ও উৎসাহিত হয়েছিলেন এবং তারা এইপ্রকার এক বৃহৎ সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়ায় গর্বিত হয়েছিলেন যে সংগঠনের লক্ষ্য হল যিহোবার গৌরব করা।
যেখানে কাঠের গুঁড়ির তৈরি নৌকাগুলি পৌঁছায় না, সেখানে যেতে একজন ছোট গাড়ি ব্যবহার করতে পারে। গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকার এলাকা যেখানে এই গাড়িগুলি যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করে সর্বদা কর্মচঞ্চল থাকে। এলাকাটি ঠাণ্ডা জল বিক্রেতা, কলা বিক্রতা ও কুলিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকায়, সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়া খুব স্বাভাবিক। কুলিদের কাজ হল অপেক্ষারত ছোট গাড়িগুলির জন্য যাত্রী সংগ্রহ করা, তাদের কথা অনুযায়ী যার সবগুলিই “যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।” কিন্তু, “প্রস্তুত” শব্দটি কেবলমাত্র হালকা অর্থে নেওয়া উচিত। ভ্রমণকারীদের ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে কাটাতে হবে, এমনকি কখনও কখনও একটি দিনও। একবার সমস্ত যাত্রী গাদাগাদি করে এর ভিতরে ঢোকার পর ও চালক মালপত্র এবং কখনও কখনও এমনকি মুরগী ও ছাগল ছাদের তাকে ঠেসে ভর্তি করার পর এই ছোট গাড়ি উঁচু নিচু, ধুলিপূর্ণ রাস্তা দিয়ে চলতে আরম্ভ করে।
এক ভ্রমণ পরিচারক, এই যানবাহন ব্যবস্থায় ক্লান্ত হয়ে গিয়ে, স্বাধীনভাবে চলার জন্য বিকল্প সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এখন তার সমস্ত যাত্রা সাইকেলে করেন। তিনি বলেন: “যখন থেকে আমি মণ্ডলী থেকে মণ্ডলীগুলিতে ভ্রমণ করার জন্য সাইকেল ব্যবহার করা মনস্থ করি, আমি সর্বদা পরিদর্শনের জন্য সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারি। এটি সত্য যে, এই যাত্রা হয়ত কিছু ঘন্টা সময় নিয়ে নেয়, কিন্তু ছোট গাড়ির জন্য অন্তত আমাকে একদিন বা দুইদিন অপেক্ষা করে কাটাতে হয় না। বর্ষাকালে কিছু রাস্তা প্রায় সম্পূর্ণভাবে অত্যধিক জলের কারণে অদৃশ্য হয়ে যায়। আপনাকে আপনার জুতো খুলে এই বিস্তৃত জল ও কাদার রাস্তা পার হতে হবে। একদিন আমার একটি জুতো স্রোতের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল আর সেটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, যখন না বেশ কিছু সপ্তাহ পর এক সাক্ষীর মেয়ে মাছ ধরার সময় আকস্মিকভাবে সেটিকে খুঁজে পায়! এদের একটি কিছু সময় মাছেদের সাথে কাটালেও আমি আবার এই জুতোজোড়া পরতে পেরে খুশি হয়েছিলাম। কখনও কখনও আমি সেই অঞ্চলগুলিতে যাই যেখানে যিহোবার সাক্ষীরা আগে কখনও প্রচার করেনি। গ্রামবাসীরা সবসময় আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি কী এনেছি? সুতরাং আমি পত্রিকা ও ব্রোশার হাতের কাছে রাখি। প্রত্যেকবার আমি যখন থামি, আমি এই বাইবেল-ভিত্তিক সাহিত্যাদি অর্পণ করি এবং এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষ্য দিই। আমি বিশ্বাস করি যিহোবা সত্যের এই বীজগুলিকে বৃদ্ধি করবেন।”
প্রত্যন্ত অঞ্চলের গভীরে
যিহোবার সাক্ষীরা অন্যদের সাথে রাজ্য সুসমাচার বন্টন করে নেওয়ার প্রচেষ্টা করে এমনকি কামেরুণের গভীরে গহন অরণ্যের মধ্যে লুকানো গ্রামগুলিতেও। এর জন্য এক বৃহৎ প্রচেষ্টার প্রয়োজন কিন্তু তা হৃদয়উদ্রেককারী ফল নিয়ে আসে।
মারী এক পূর্ণ-সময়ের পরিচারক আর্লেট নামক এক যুবতীর সাথে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করেছিলেন। প্রথম অধ্যয়ন শেষ হওয়ার পর মারী আর্লেটকে দরজা পর্যন্ত তার সাথে সঙ্গ দেওয়ার জন্য বলেছিলেন, যেহেতু এটি আফ্রিকার সেই অঞ্চলের প্রথা ছিল। কিন্তু, এই যুবতীটি ব্যাখ্যা করেছিল যে তার পায়ের ব্যথার কারণে তার পক্ষে হাঁটা খুবই কঠিন। আর্লেটের পা একধরনের মাছি দ্বারা আক্রান্ত ছিল যার স্ত্রীমাছি মাংসে গর্তের সৃষ্টি করত যার ফলে পুঁজযুক্ত ফোড়া হত। মারী সাহসের সাথে একটা একটা করে মাছিগুলিকে সরিয়ে ফেলেন। পরে তিনি আরও জেনেছিলেন যে রাতের বেলা মন্দ আত্মারা এই যুবতীটিকে যন্ত্রনা দিত। মারী ধৈর্যের সাথে ব্যাখ্যা করেছিলেন কিভাবে যিহোবার উপর একজন তার সম্পূর্ণ নির্ভরতা অর্পণ করতে পারে, বিশেষত প্রার্থনায় তাঁর নাম ধরে সজোরে ডাকার মাধ্যমে।—হিতোপদেশ ১৮:১০.
আর্লেট দ্রুত উন্নতি করেছিল। শারীরিক ও বৌদ্ধিক এই উভয়ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি করায় প্রথমদিকে তার পরিবার এই অধ্যয়নে কোন অন্যায় দেখতে পায়নি। কিন্তু যখন তারা বুঝতে পারে যে সে একজন যিহোবার সাক্ষী হতে চলেছে, তারা তাকে অধ্যয়ন ক্রমাগত চালিয়ে যেতে নিষেধ করে। তিন সপ্তাহ পর আর্লেটের মা বুঝতে পারেন যে তার মেয়ে কত দুঃখ পেয়েছে আর তাই তিনি মারীর সাথে যোগাযোগ করেন ও তাকে অধ্যয়ন পুনরারম্ভ করতে বলেন।
যখন একটি সীমা অধিবেশনে উপস্থিত হওয়ার সময় এসেছিল মারী এক ট্যাক্সি চালককে ভাড়া দিয়ে আর্লেটকে দুদিনের জন্য নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু চালক, আর্লেটের বাড়ি পর্যন্ত যেতে অস্বীকার করেছিল এই ভেবে যে তার বাড়ি থেকে রাস্তায় আসার পথটি যাওয়ার পক্ষে অযোগ্য। সুতরাং মারী মেয়েটিকে রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। নিশ্চতভাবে যিহোবা এই প্রচেষ্টাগুলিকে আশীর্বাদযুক্ত করেছিলেন। আজকে আর্লেট মণ্ডলীর সমস্ত সভাগুলিতে যোগ দেয়। এটি করতে তাকে সাহায্য করার জন্য মারী অক্লান্তভাবে তাকে নিতে আসেন। একবারের যাওয়ার পথে তারা একসাথে ৭৫ মিনিট হাঁটেন। যেহেতু রবিবারের সভা সকাল ৮:৩০ মিনিটে শুরু হয়, তাই মারীকে ৬:৩০ মিনিটে বাড়ি থেকে বের হতে হয়; তবুও তারা সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারেন। আর্লেট আশা করে যে শীঘ্রই সে তার উৎসর্গীকরণের প্রতীক, জলে বাপ্তিস্ম গ্রহণের দ্বারা প্রদর্শন করতে পারবে। মারী বর্ণনা করেন: “যে তাকে অধ্যয়ন শুরু হওয়ার সময় দেখেনি সে কল্পনা করতে পারবে না যে মেয়েটি কতখানি পরিবর্তিত হয়েছে। আমি যিহোবাকে ভীষণভাবে ধন্যবাদ জানাই তিনি যেভাবে তাকে আশীর্বাদ করেছেন তার জন্য।” মারী নিশ্চিতভাবেই নিঃস্বার্থ প্রেমের এক উত্তম উদাহরণ।
সুদূর উত্তরে
উত্তর কামেরুণ বৈপরীত্য ও বিস্ময়ে পরিপূর্ণ। বর্ষা কালে এটি একটি বৃহৎ সমৃদ্ধ বাগানে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু যখন তাপদগ্ধ সূর্য উপরে আসে তখন ঘাসগুলো শুকিয়ে যায়। দুপুরবেলা সূর্য যখন তার সর্বোচ্চ শিখরে থাকে তখন ছায়া খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে, ভেড়াগুলি নিজেদের সঙ্কুচিত করে লাল-মাটির দেওয়ালের ঘরগুলি ঘেঁষে থাকে। বালি ও শুকনো ঘাসের মধ্যে সবুজের একমাত্র সাক্ষ্য বাওবব গাছের কিছু পাতা। এমনকি যদিও এগুলি নিরক্ষীয় বনভূমিতে অবস্থিত তাদের বর্গের অন্যান্য গাছের মত এত বড় নয়, কিন্তু এগুলি বেশ শক্তসমর্থ। প্রতিকূল আবহাওয়াকে সহ্য করার তাদের ক্ষমতা স্পষ্টভাবে অল্পসংখ্যক সাক্ষীদের উদ্যোগ ও সাহস সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে যারা সুসমাচারের দীপ্তি প্রজ্জ্বলিত করার উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে বাস করে চলেছেন।
এই অঞ্চলের কিছু কিছু মণ্ডলী ৫০০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে অবস্থিত, যার ফলে বিচ্ছিন্নতার মনোভাব গড়ে ওঠা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের মধ্যে প্রচুর উৎসাহ আছে। অন্যান্য অঞ্চলের সাক্ষীরা সাহায্য করার জন্য এখানে আসে। পরিচর্যায় ফলপ্রসূ হওয়ার জন্য তাদের স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষা ফুফুলদা শিখতে হয়েছে।
গেরুয়ার এক সাক্ষী স্থির করেছিলেন যে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তার নিজস্ব গ্রামে তিনি কিছু দিন প্রচার করে কাটাবেন। তিনি কিছু আগ্রহ দেখতে পেয়েছিলেন, কিন্তু যাতায়াতের জন্য উচ্চ মূল্য তাকে নিয়মিতভাবে ফিরে যেতে বাধা সৃষ্টি করেছিল। কয়েক সপ্তাহ পরে তিনি এক আগ্রহী ব্যক্তির কাছ থেকে একটি চিঠি পান যে তাকে পুনরায় গিয়ে দেখা করতে অনুরোধ করে। তবুও ভাড়ার পয়সার অভাব থাকায় তিনি যেতে পারেননি। কল্পনা করুন সেই সাক্ষী কতই আশ্চর্য হয়েছিলেন যখন সেই ব্যক্তি গেরুয়ায় তার ঘরে এসে জানায় যে সেই গ্রামের দশ জন লোক তার পরিদর্শনের জন্য অপেক্ষা করছে!
চাদের প্রান্তের কাছে অপর একটি গ্রামে ৫০ জন আগ্রহী ব্যক্তির একটি দল তাদের নিজস্ব বাইবেল অধ্যয়ন সংগঠিত করেছিল। তারা তাদের তিন জনের জন্য চাদের নিকটবর্তী মণ্ডলীতে উপস্থিত হওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। ফিরে এসে এই ব্যক্তিরা তারপর সমগ্র দলটির সাথে বাইবেল অধ্যয়ন পরিচালনা করত। সত্যই যীশুর বাক্য এখানে উপযুক্তভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে: “শস্য প্রচুর বটে, কিন্তু কার্য্যকারী লোক অল্প; অতএব শস্যক্ষেত্রের স্বামীর নিকটে প্রার্থনা কর, যেন তিনি নিজ শস্যক্ষেত্রে কার্য্যকারী লোক পাঠাইয়া দেন।”—মথি ৯:৩৭, ৩৮.
শহরগুলিতে সাক্ষ্যদান করা
অনেক বছর অভাব থাকার পর প্রায় দুবছর আগে কামেরুণে প্রহরীদুর্গ এবং সচেতন থাক! পত্রিকা সহজভাবে প্রাপ্তিসাধ্য হয়েছিল। এই পত্রিকাগুলির প্রতি খুবই উৎসাহ ও আগ্রহ দেখা যায় যেহেতু অনেক লোকেরা এগুলিকে প্রথমবার পড়ছে। এক অল্পবয়স্ক বিশেষ অগ্রগামী দম্পতি তাদের কার্যভারের একটি শহরে, তাদের নতুন এলাকায় প্রথমবার সকালের প্রচারে ৮৬টি পত্রিকা অর্পণ করেন। কিছু প্রকাশক এক মাসে ২৫০টি পর্যন্ত পত্রিকা অর্পণ করেছেন! তাদের সাফল্যের রহস্যটি কী? প্রত্যেকের কাছে পত্রিকা অর্পণ করা।
একজন সাক্ষী যিনি জনসাধারণের একটি অফিসে কাজ করতেন যেখানে সবসময় পত্রিকাগুলিকে প্রদর্শন করার জন্য সামনে রাখতেন। এক মহিলা পত্রিকাগুলি দেখেন, কিন্তু একটিও নেন না। সাক্ষীটি তার আগ্রহ উপলব্ধি করেছিলেন এবং তাকে একটি কপি অর্পণ করেছিলেন, যেটি তিনি গ্রহণ করেছিলেন। পরের দিন তাকে ফিরে আসতে দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তিনি কেবলমাত্র যে পত্রিকাটি নিয়েছিলেন সেটির জন্য মূল্য দিতেই চাননি, কিন্তু আরও পত্রিকার বিষয়ে জিজ্ঞাসাও করেছিলেন। কেন? ধর্ষণের শিকার হওয়ায় তিনি ওই বিষয় ভিত্তিক পত্রিকাটি বেছে নিয়েছিলেন। যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তিনি তা সারারাত ধরে পড়েন এবং আবারও পড়েন। অনেকখানি স্বস্তি পেয়ে তিনি যিহোবার সাক্ষীদের সম্বন্ধে আরও জানতে চেয়েছিলেন।
এমনকি ছোট বাচ্চাও বাইবেলের আশার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। যখন এক ছয় বছর বয়স্ক সাক্ষী মেয়েকে তার শিক্ষক একটি ক্যাথলিক স্তোত্র গাইতে বলেছিলেন, তখন সে একজন যিহোবার সাক্ষী এটি উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। এরপর শিক্ষক তাকে তার নিজস্ব ধর্মের একটি গান গাইতে বলেছিলেন যাতে তিনি তার গানের উপর তার অগ্রগতির ক্রমমাত্রা নির্ধারণ করতে পারেন। সে একটি গান নির্বাচন করেছিল যার শিরোনাম ছিল “পরমদেশ সম্পর্কে ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা” এবং স্মৃতি থেকে এটি সে গেয়েছিল। শিক্ষক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন এই বলে: “তুমি তোমার গানে পরমদেশের কথা উল্লেখ করেছো। কোথায় এই পরমদেশ?” মেয়েটি খুব শীঘ্র পৃথিবীতে ঈশ্বরের পরমদেশ প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করেছিল। তার উত্তরে আশ্চর্য হয়ে, তিনি তার বাবামার কাছে যে বইটি সে অধ্যয়ন করেছিল সেটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। ধর্ম সম্বন্ধে শিক্ষাক্রমে সে যা শিখেছে তার উপর ক্রম নির্ধারণ করার চেয়ে বরং এর উপর তার ক্রম নির্ধারণ করতে শিক্ষক ইচ্ছুক ছিলেন। মেয়েটির বাবামা শিক্ষকের কাছে প্রস্তাব করেছিলেন যে যদি তিনি সঠিকভাবে অগ্রগতির ক্রম নির্ধারণ করতে চান, তাহলে প্রথমে তার নিজের বইটি অধ্যয়ন করা উচিত। তার সাথে একটি বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করা হয়েছিল।
এক পরিদর্শনের পরিকল্পনা করা?
আজকে পৃথিবীর অধিকাংশ অংশে লোকেরা রাজ্যের সুসমাচারের প্রতি উদাসীন। না ঈশ্বর, না বাইবেল কিছুই তাদের আগ্রহী করতে পারে না। অন্যেরা ভয়ের দ্বারা আক্রান্ত এবং সহজভাবে দরজায় এক অপরিচিত ব্যক্তির প্রতি সাড়া দিতে প্রত্যাখ্যান করে। যিহোবার সাক্ষীদের পক্ষে তাদের পরিচর্যায় এই সমস্ত কিছু প্রকৃতই এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাস্বরূপ। কিন্তু কামেরুণে তা কতই না ভিন্ন প্রকৃতির!
গৃহ থেকে গৃহে প্রচার এখানে এক অতিশয় আনন্দের বিষয়। দরজায় করাঘাত করার পরিবর্তে এটি এখানকার প্রথা যে “কং, কং, কং” বলে ডাকা। তারপর ভিতর থেকে একটি কণ্ঠস্বর উত্তর দেয়, “কে?” এরপর আমরা নিজেদের যিহোবার সাক্ষী হিসাবে পরিচয় দিই। সাধারণত, বাবামায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের বেঞ্চ নিয়ে আসতে এবং সেগুলিকে গাছের ছায়ায় সম্ভবত আম গাছের তলায় রাখতে বলেন। তারপর একটি মনোরম সময় অতিবাহিত করা যায় ঈশ্বরের রাজ্য কী এবং মানবজাতির দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে তাকে নিষ্কৃতি দিতে এটি কী করবে সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা করে।
ঠিক এইপ্রকার এক আলোচনার পরে, এক মহিলা এই বলে তার মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন: “যে সত্যের অন্বেষণ আমি করছিলাম তা আমি যে ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি ও যাতে আমি বৃদ্ধ হয়েছি সেখানে খুঁজে না পেয়ে আমি হতাশ হয়েছিলাম। আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই কারণ তিনি আমাকে সত্য দেখিয়েছেন। আমি আমার গির্জার উচ্চপদস্থ যাজক ছিলাম। কুমারী মেরীর মূর্তি প্রত্যেক যাজকের ঘরে এক সপ্তাহের জন্য থাকত যাতে করে তারা প্রত্যেকে তার কাছে অনুরোধ করতে পারে। সত্য জানতে আমাকে সাহায্য করার জন্য আমি সর্বদা মেরীর কাছে আবেদন করতাম। এখন ঈশ্বর আমাকে দেখিয়েছেন যে সত্য তার কাছে নেই। আমি যিহোবাকে ধন্যবাদ জানাই।”
সুতরাং যদি কোনদিন আপনি একান্ত আনন্দ অভিজ্ঞতা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, যা ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার প্রচারের মাধ্যমে পাওয়া যায়, তাহলে পশ্চিম আফ্রিকার এই অংশে পরিদর্শন করুন না কেন? নৌকা, ছোট গাড়ি অথবা সাইকেল যাতে করেই হোক না কেন “ক্ষুদ্রাকার আফ্রিকা” আবিষ্কার করা ছাড়াও “ঈশ্বরের পর্বত” এর দেশে যে “সাক্ষী স্তূপ” গড়ে উঠেছে তাতে আপনিও কিছু অবদান রাখতে পারবেন।
[পাদটীকাগুলো]
a “সাক্ষী স্তূপ” হচ্ছে সেই ইব্রীয় শব্দের সম্ভাব্য অর্থ যা অনুবাদিত হয়েছে “গিলিয়াড।” ১৯৪৩ সাল থেকে ওয়াচটাওয়ার বাইবেল স্কুল অফ গিলিয়াড বিশ্বব্যাপী প্রচার কাজকে প্রসারিত করার জন্য মিশনারীদের পাঠিয়েছে যার অন্তর্ভুক্ত কামেরুণ।
[Credit Line on page 22]
Map: Mountain High Maps® Copyright © 1995 Digital Wisdom, Inc.