“প্রজ্ঞাই নম্রদিগের সহচরী”
একজন ব্যক্তির নিজস্ব ক্ষমতার সীমা সম্বন্ধে সচেতন থাকাকেই নম্রতা হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়; এছাড়াও এটি বিশুদ্ধতা অথবা ব্যক্তিগত পবিত্রতার সাথেও যুক্ত। ইব্রীয় ভাষার মূল ক্রিয়া পদ সানা কে মীখা ৬:৮ পদে “নম্রভাবে” এই বলে অনুবাদ করা হয়েছে, যেখানে এই অভিব্যক্তিটি একবারই মাত্র পাওয়া যায়। এ হিব্রিউ অ্যান্ড ইংলিশ লেক্সিকন অফ্ দ্যা ওল্ড টেস্টামেন্ট জানায় যে এই শব্দটি এমন এক ব্যক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে যিনি অবসরপ্রাপ্ত, নম্র অথবা বিনয়ী। “নম্রতা”, এই শব্দটি হল গ্রীক শব্দ আইডস-এর অনুবাদ। (১তীমথিয় ২:৯) আইডস শব্দটিকে যদি নৈতিক অর্থে ব্যবহার করা হয় তাহলে এটি অপরের অনুভূতি বা মতবাদের প্রতি অথবা নিজের বিবেকের প্রতি শ্রদ্ধা, বিস্ময়, সম্মান বোঝায় এবং এর ফলে লজ্জা, আত্মসম্মান, সাধুতা, সংযম এবং ভারসাম্য প্রকাশ পায়। অতএব এই আইডস শব্দটির প্রতি এক নিয়ন্ত্রণমূলক প্রভাবের সাথে বিশেষভাবে সংবেদ অন্তর্ভুক্ত।
ঈশ্বরের সামনে
নম্রতার সম্বন্ধে, বিশেষ করে নিজের বিষয় সঠিক ধারণা পোষণ করার পরিপ্রেক্ষিতে, শাস্ত্র অনেক উপদেশ দেয়। “প্রজ্ঞাই নম্রদিগের সহচরী,” হিতোপদেশ জানায়। এর কারণ হল এই যে একজন ব্যক্তি যখন নম্রতা প্রকাশ করে তখন সে সেই সব অসম্মানসূচক বিষয়গুলিকে এড়িয়ে চলতে পারে যা ঔদ্ধত্য বা অহঙ্কারের সাথে সম্পর্কযুক্ত। (হিতোপদেশ ১১:২) সে যিহোবার অনুমোদিত পথকে অনুসরণ করে সে বিজ্ঞ প্রমাণিত হয়। (হিতোপদেশ ৩:৫, ৬; ৮:১৩, ১৪) যিহোবা সেই সব ব্যক্তিকে ভালবাসেন এবং তিনি তাদের প্রজ্ঞা দিয়ে থাকেন। একটি উপায় যার মাধ্যমে আমরা যিহোবার অনুগ্রহ পেতে পারি তা হল ‘নম্রভাবে গমনাগমন করার দ্বারা।” (মীখা ৬:৮) এর অন্তর্ভুক্ত হল যিহোবার সামনে একজনের স্থানকে উপলব্ধি করা এবং যিহোবার মহানতা, শুদ্ধতা ও তাঁর পবিত্রতার বৈশাদৃশ্যে একজনের পাপপূর্ণ অবস্থার কথা স্বীকার করা। এছাড়াও একজন ব্যক্তিকে স্বীকার করতে হবে যে সে যিহোবার এক সৃষ্টি, সম্পূর্ণরূপে তাঁর উপর নির্ভরশীল ও তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রতি বশীভূত। হবা ছিল এমন একজন ব্যক্তি যে এই বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরতার প্রতি পদক্ষেপ নিয়েছিল। নম্রতা তাকে সাহায্য করতে পারত “ঈশ্বরের সদৃশ হইয়া সদসদ্ জ্ঞানপ্রাপ্ত” হওয়ার চিন্তাধারাকে মন থেকে সরিয়ে দিতে। (আদিপুস্তক ৩:৪, ৫) প্রেরিত পৌল অত্যাধিক স্বনির্ভরতা ও ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে উপদেশ দিয়েছিলেন এই বলে যে, “সভয়ে ও সকম্পে আপন আপন পরিত্রাণ সম্পন্ন কর।”—ফিলিপীয় ২:১২.
কোন্ বিষয়ে শ্লাঘা করা যেতে পারে
শ্লাঘা করা হল নম্রতার বিপরীত। নিয়মটি হল এই যে “অপরে তোমার প্রশংসা করুক, তোমার নিজ মুখ না করুক; অন্য লোকে করুক, তোমার নিজ ওষ্ঠ না করুক।” (হিতোপদেশ ২৭:২) যিহোবার নিজস্ব বাক্য জানায়: “জ্ঞানবান আপন জ্ঞানের শ্লাঘা না করুক, বিক্রমী আপন বিক্রমের শ্লাঘা না করুক, ধনবান্ আপন ধনের শ্লাঘা না করুক। কিন্তু যে ব্যক্তি শ্লাঘা করে, সে এই বিষয়ের শ্লাঘা করুক যে, সে বুঝিতে পারে ও আমার এই পরিচয় পাইয়াছে যে, আমি সদাপ্রভু পৃথিবীতে দয়া, বিচার ও ধার্ম্মিকতার অনুষ্ঠান করি, কারণ ঐ সকলে আমি প্রীত, ইহা সদাপ্রভু কহেন।”—যিরমিয় ৯:২৩, ২৪; তুলনা করুন হিতোপদেশ ১২:৯; ১৬:১৮, ১৯.
নম্রদের প্রতি ঈশ্বরের সম্মান
প্রেরিত পৌল নম্রদের প্রতি ঈশ্বরের সম্মানের কথা উল্লেখ করেন আর এছাড়াও তিনি মণ্ডলীর মধ্যে নম্র মনোভাবের এক উদাহরণস্বরূপ তার নিজের আচরণের কথাও ব্যক্ত করেন। তিনি করিন্থের খ্রীষ্টানদের উদ্দেশ্যে লেখেন: “হে ভ্রাতৃগণ, তোমাদের আহ্বান দেখ, যেহেতুক মাংস অনুসারে জ্ঞানবান্ অনেক নাই, পরাক্রমী অনেক নাই, উচ্চ পদস্থ অনেক নাই; কিন্তু ঈশ্বর জগতীস্থ মূর্খ বিষয় সকল মনোনীত করিলেন, যেন জ্ঞানবান্দিগকে লজ্জা দেন; এবং ঈশ্বর জগতের দুর্ব্বল বিষয় সকল মনোনীত করিলেন, যেন শক্তিমন্ত বিষয় সকলকে লজ্জা দেন; এবং জগতের যাহা যাহা নীচ ও যাহা যাহা তুচ্ছ, যাহা যাহা কিছু নয়, সেই সকল ঈশ্বর মনোনীত করিলেন, যেন, যাহা যাহা আছে, সে সকল অকিঞ্চন করেন; যেন কোন মর্ত্ত্য ঈশ্বরের সাক্ষাতে শ্লাঘা না করে . . . যেমন লেখা আছে, “যে ব্যক্তি শ্লাঘা করে , সে প্রভুতেই শ্লাঘা করুক।” আর, হে ভ্রাতৃগণ, আমি যখন তোমাদের নিকটে গিয়াছিলাম, তখন গিয়া বাক্যের কি জ্ঞানের উৎকৃষ্টতা অনুসারে তোমাদিগকে যে ঈশ্বরের সাক্ষ্য জ্ঞাত করিতেছিলাম, তাহা নয়। কেননা আমি মনে স্থির করিয়াছিলাম, তোমাদের কিছুই জানিব না, কেবল যীশু খ্রীষ্টকে, এবং তাঁহাকে ক্রুশে হত বলিয়াই, জানিব। আর আমি তোমাদের কাছে দুর্ব্বলতা, ভয় ও মহাকম্পযুক্ত ছিলাম, আর আমার বাক্য ও আমার প্রচার জ্ঞানের প্ররোচক বাক্যযুক্ত ছিল না, বরং আত্মার ও পরাক্রমের প্রদর্শনযুক্ত ছিল, যেন তোমাদের বিশ্বাস মনুষ্যদের জ্ঞানযুক্ত না হইয়া ঈশ্বরের পরাক্রমযুক্ত হয়।”—১করিন্থীয় ১:২৬–২:৫.
যা লেখা আছে তা অতিক্রম করবেন না
পরে তার চিঠিতে পৌল প্রত্যেকের ক্ষেত্রে নম্রতার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে জোর দিয়েছিলেন, ঠিক যেমন তিনি নিজে নম্রতা প্রদর্শন করেছিলেন, যা ছিল নিজের সম্পর্কে এক সঠিক মূল্যায়ন। করিন্থীয়রা, আপোল্লো এমনকি পৌল এইধরনের কিছু ব্যক্তিবিশেষদের নিয়ে শ্লাঘা করার এক ফাঁদে পড়েছিল। পৌল তাদের সংশোধন করে দেন এই বলে যে তারা এটা করার দ্বারা আধ্যাত্মিক নয় বরঞ্চ মাংসিক প্রমাণিত হচ্ছে, এবং তিনি বলেন: “হে ভ্রাতৃগণ, আমি আপনার ও আপল্লোর উদাহরণ দিয়া তোমাদের নিমিত্তে এই সকল কথা কহিলাম; যেন আমাদের দ্বারা তোমরা এই শিক্ষা পাও যে, যাহা লিখিত আছে, তাহা অতিক্রম করিতে নাই, তোমরা কেহ যেন এক জনের পক্ষে অন্য জনের বিপক্ষে গর্ব্ব না কর। কেননা কে তোমাকে বিশিষ্ট করে? আর যাহা না পাইয়াছ, এমনই বা তোমার কি আছে? আর যখন পাইয়াছ; তখন যেন পাও নাই, এরূপ শ্লাঘা কেন করিতেছ?” এই বিষয়টি মনে রাখা আমাদের সাহায্য করবে অহঙ্কার ও শ্লাঘাকে এড়িয়ে চলতে বিশেষকরে নিজের ও অপরের বংশ, জাতি, বর্ণ অথবা দেশ, দৈহিক সৌন্দর্য্য, ক্ষমতা, জ্ঞান, মানসিক দক্ষতা ইত্যাদির ক্ষেত্রে।—১করিন্থীয় ৪:৬, ৭.
যীশু খ্রীষ্টের উদাহরণ
নম্রতার ক্ষেত্রে যীশু খ্রীষ্ট হলেন সবচাইতে উত্তম উদাহরণ। তিনি তাঁর শিষ্যদের বলেছিলেন যে তিনি নিজের থেকে কিছুই করতে পারেন না, কিন্তু তাঁর পিতাকে যা করতে দেখেন তাই করেন এবং তাঁর পিতা তাঁর চাইতে মহান। (যোহন ৫:১৯, ৩০; ১৪:২৮) যীশু সেই উপাধিকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন যা তাঁর প্রতি প্রযোজ্য ছিল না। যখন একজন শাসক তাঁকে “সদ্গুরু” বলে সম্বোধন করে, যীশু তার উত্তরে বলেছিলেন: “আমাকে সৎ কেন বলিতেছ? এক জন ব্যতিরেকে সৎ আর কেহ নাই, তিনি ঈশ্বর।” (লূক ১৮:১৮, ১৯) এবং তিনি তাঁর শিষ্যদের বলেছিলেন যে যিহোবার দাস হিসাবে তাদের অহঙ্কার করা উচিত নয় বিশেষ করে ঈশ্বরের পরিচর্যায় যা কিছু সাধিত হয়েছে সেই ক্ষেত্রে অথবা ঈশ্বরের সম্মুখে তাদের নিজেদের মূল্যের ক্ষেত্রে। যা কিছু কাজ তাদের দেওয়া হয়েছে সেগুলি সম্পাদন করার পর তাদের এইধরনের মনোভাব থাকা উচিত যে “আমরা অনুপযোগী দাস, যাহা করিতে বাধ্য ছিলাম তাহাই করিয়াছি।” (লূক ১৭:১০.
এছাড়াও, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট, পৃথিবীতে এক সিদ্ধ ব্যক্তি হিসাবে তাঁর অসিদ্ধ শিষ্যদের তুলনায় উৎকৃষ্ট ছিলেন এবং তাঁর পিতার কাছ থেকে প্রচুর কর্তৃত্ব লাভ করেছিলেন। কিন্তু, তাঁর শিষ্যদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে তিনি তাদের সীমার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোমলতা এবং কথা বলার ক্ষেত্রে সঙ্গতি প্রকাশ করেছিলেন। সেই সময় যতটুকু তাদের সহ্য করার ক্ষমতা ছিল তার অতিরিক্ত তিনি তাদের উপর চাপিয়ে দেন নি।—যোহন ১৬:১২; তুলনা করুন মথি ১১:২৮-৩০; ২৬:৪০, ৪১.
বেশভূষা ও অন্যান্য অধিকৃত বিষয়
অধ্যক্ষ তীমথিয়কে মণ্ডলীতে সঠিক আচরণ দেখানো হচ্ছে কিনা তা লক্ষ্য রাখার বিষয় নির্দেশ দেওয়ার সময়, পৌল বলেছিলেন: “আমার বাসনা এই . . . নারীগণও সলজ্জ ও সুবুদ্ধিভাবে পরিপাটী বেশে আপনাদিগকে ভূষিতা করুক; বেণীবদ্ধ কেশপাশে ও স্বর্ণ বা মুক্তা বা বহুমূল্য পরিচ্ছদ দ্বারা নয়, কিন্তু যাহা ঈশ্বর-ভক্তি অঙ্গীকারিণী নারীগণের যোগ্য সৎক্রিয়ায় ভূষিতা হউক। (১তীমথিয় ২:৯, ১০) এখানে প্রেরিত পরিচ্ছন্নতা ও উত্তম, সুন্দর বাহ্যিক রূপের বিরুদ্ধে উপদেশ দিচ্ছেন না, কারণ তিনি “পরিপাটী বেশে” এর সপক্ষে কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি আত্মশ্লাঘা এবং জাঁকালো বেশভূষার যথার্থহীনতার কথা প্রকাশ করেছেন যা নিজের প্রতি অথবা নিজের যা আছে তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করায়। এছাড়াও নম্রতার অন্তর্ভুক্ত হল অপরের অনুভূতি, আত্মসম্মান এবং মর্যাদাবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। খ্রীষ্টানদের বেশভূষা মার্জিতবোধের বিদ্ধস্বরূপ যেন না হয়, মণ্ডলীর নৈতিক মানের ব্যঘাত যেন না ঘটায় এবং কয়েকজনকে যেন অসন্তুষ্ট না করে। বেশভূষা সম্বন্ধে এই উপদেশ বস্তুগত সম্পত্তির প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী ও ব্যবহার সম্বন্ধে যিহোবার মনোভাবকে প্রতিফলিত করে যা একজন খ্রীষ্টানের হয়ত থাকতে পারে।
নম্রতা আমাদের বিজ্ঞহীন কাজ ও মনোভাব থেকে রক্ষা করে। ঠিক যেমন হিতোপদেশ বলে, নম্রতা প্রকৃতই বিজ্ঞের কাজ।