আমার বাবামায়ের পদচিহ্ন অনুসরণ করে
হিলডা প্যাজেট দ্বারা কথিত
“আমার জীবন পরাৎপরের পরিচর্যার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত,” একটি প্রেস রিপোর্ট জানায়, “এবং আমি দুই কর্তার দাসত্ব করতে পারি না।” ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ মিনিস্ট্রি অফ লেবার অ্যান্ড ন্যাশন্যাল সার্ভিস অথোরিটির প্রতি আমার বিবৃতির এই বাক্যগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের দেওয়া বাধ্যতামূলকভাবে হাসপাতালের কার্যভারকে, আমার প্রত্যাখ্যানের কারণস্বরূপ ছিল। এই প্রত্যাখ্যানের অল্প কিছুদিন পরেই আমি দণ্ডিত ও তিন মাসের জন্য কারারুদ্ধ হই।
কোন্ বিষয়টি আমাকে এই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থায় নিয়ে এসেছিল? না, এটি যৌবনের কোন আকস্মিক খেয়াল বা বিদ্রোহিসুলভ আচরণের জন্য ছিল না। বরং কারণটি ছিল অনেক দিন পূর্বেকার যখন আমি শুধুমাত্র একটি শিশু ছিলাম।
রাজ্যের জন্য বাবার উদ্যোগ
উত্তর ইংল্যান্ডে লীডস এর কাছে হর্সফোর্থ নামক স্থানে ১৯১৪ সালের ৫ই জুন আমি জন্মগ্রহণ করি। আমার বাবামা অ্যাটকিনসন এবং প্যাটী প্যাজেট সানডে-স্কুলের শিক্ষক ও প্রাচীন মেথডিস্ট উপাসনালয়ের গায়কদলের সদস্য ছিলেন যেখানে বাবা অরগ্যান বাজাতেন। আমি যখন শিশু ছিলাম, একটি বিষয় ছাড়া আমাদের পরিবার সুখী ছিল। জগতের পরিস্থিতি আমার বাবাকে উদ্বিগ্ন করত। তিনি যুদ্ধ ও নৃশংসতা ঘৃণা করতেন এবং বাইবেলের এই আদেশে বিশ্বাস করতেন: “নরহত্যা করিও না।”—যাত্রাপুস্তক ২০:১৩, কিং জেমস ভারসন।
১৯১৫ সালে সরকার সমস্ত যুবক ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করে যাতে করে বাধ্যতামূলকভাবে সৈন্যদলে যোগদানকে এড়ানো যেতে পারে। কিছু অমঙ্গলের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও বাবা একজন সৈনিক হিসাবে নাম নথীভুক্ত করার জন্য সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। তার পরের দিনই তার সম্পূর্ণ জীবন পরিবর্তিত হয়!
যখন একটি বড় বাড়িতে একজন প্লাম্বার হিসাবে কাজ করছিলেন, তখন তিনি অন্যান্য কর্মীদের সাথে জগতের ঘটনাগুলি নিয়ে কথা বলতেন। বাগানের মালী তাকে প্রভুর মূল্যবান ব্যক্তিদের একত্রিত করা (ইংরাজি) নামে একটি ছোট ট্র্যাক্ট দেয়। বাবা এটি ঘরে নিয়ে আসেন, এটি পড়েন এবং পুনরায় এটি পড়েন। “যদি এটি সত্য হয়” তিনি বলেন, “তাহলে বাকি সমস্ত কিছু ভুল।” পরের দিন তিনি আরও তথ্যের জন্য অনুরোধ জানান এবং তিন সপ্তাহ প্রতিদিন ভোর হওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ রাত তিনি বাইবেল অধ্যয়ন করেন। তিনি জানতেন যে তিনি সত্য খুঁজে পেয়েছেন! ১৯১৬ সালের ২রা জানুয়ারি রবিবার, তার ডাইরী জানায়: “সকালে উপাসনালয়-তে গিয়েছিলাম, রাতে আই. বি. এস. এ. [আন্তর্জাতিক বাইবেল ছাত্রদের সঙ্ঘ, যিহোবার সাক্ষীরা তখন ইংল্যান্ডে ওই নামে পরিচিত ছিল] যাই—ইব্রীয় ৬:৯-২০ পদ অধ্যয়ন করা হয়—ভাইয়েদের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ।”
শীঘ্রই বিরোধিতা আসতে আরম্ভ করেছিল। আমাদের আত্মীয় ও উপাসনালয়ের বন্ধুরা বাবাকে পাগল ভেবেছিল। কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন। সভা এবং অধ্যয়ন তার জীবনে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং মার্চ মাসের মধ্যে তিনি যিহোবার কাছে উৎসর্গের প্রতীকস্বরূপ জলে বাপ্তিস্ম নিয়েছিলেন। বাবা কিছু সপ্তাহ একাকী সভায় যাওয়ার পর মা সভায় যাওয়ার বিরোধিতা করা বন্ধ করে দেন। তিনি আমাকে প্যারাম্বুলেটরে বসিয়ে লীডসের দিকে ৮ কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে সভা শেষ হওয়ার ঠিক পরেই সেখানে উপস্থিত হন। আপনি বাবার আনন্দ কল্পনা করতে পারেন। তখন থেকে আমাদের পরিবার যিহোবার সেবায় একত্রিত হয়।
বাবার পরিস্থিতি খুব কঠিন ছিল—সেনাবাহিনীর একজন স্বেচ্ছাসেবক এবং তারপর কিছু সপ্তাহের মধ্যেই সেনাবাহিনীতে কাজ করতে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি। যখন ডাকা হয় তিনি বন্দুক বহন করতে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ১৯১৬ সালের জুলাই মাসে তিনি পাঁচবারের মধ্যে প্রথমবার সামরিক বিচারালয়ের সম্মুখীন হন, ৯০ দিনের জন্য দণ্ডিত হয়ে কারাগারে থাকেন। প্রথম দণ্ডাদেশ ভোগ করার পর, বাবা দুসপ্তাহের জন্য মুক্তি পান, পরে আরেকটি সামরিক বিচারালয়ের দ্বারা দণ্ডিত হয়ে আরও ৯০ দিন তাকে কারাগারে থাকতে হয়। তার বন্দী অবস্থার এই দ্বিতীয়বারে তাকে রয়াল আর্মি মেডিকেল বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয় এবং ১৯১৭ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি সৈন্য পরিবহনকারী জাহাজে ফ্রান্সের রৌয়েনে পাঠানো হয়। তার ডাইরী বর্ণনা করে যে সেখানে তার প্রতিদিনের পরিস্থিতি আরও বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল। তিনি বুঝেছিলেন যে তাকে কেবলমাত্র আহত সৈন্যদের যত্ন নিতে হচ্ছে যাতে তারা আবার ফিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে পারে।
আবার তিনি সহযোগিতা করতে প্রত্যাখ্যান করেন। এবার সামরিক বিচারালয় তাকে রৌয়েনের ব্রিটিশ সামরিক জেলে পাঁচ বছরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। সেনাবাহিনীতে যোগদানে অনিচ্ছুক ব্যক্তি হিসাবে বাবা যখন একটি অসামরিক জেলে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য আবেদন করেন, তখন তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তিন মাস রুটি এবং জল খেতে দেওয়া হয় এবং তারপর জেলের রোজকার খাদ্য তাকে দেওয়া হয় যতদিন না তার ওজন বেড়ে ওঠে; আর এই পদ্ধতিটির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল। তার হাত দিনের বেলা পিছনে এবং রাতে ও খাওয়ার সময় সামনে বেঁধে হাত-কড়া পরানো থাকত। সারা জীবন তিনি তার কব্জিতে এই ক্ষতচিহ্ন বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছিলেন, হাতকড়াগুলি খুব ছোট হওয়ায় তা তার মাংসে চেপে বসে যার ফলে দূষিত ক্ষত হয়। তাছাড়াও তার কোমর থেকে পা পর্যন্ত শিকল দিয়ে বাঁধা ছিল।
সেনা কর্তৃপক্ষ তার মনোবল নষ্ট করার জন্য সম্ভাব্য সমস্ত রকম প্রচেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তার কাছ থেকে তার বাইবেল ও বইগুলি নিয়ে নেওয়া হয়। বাড়ির কোনো চিঠি তিনি পেতেন না, বা তিনি নিজেও পাঠাতে পারতেন না। দুই বছর পরে তিনি স্থির করেন সততা দেখানোর জন্য তিনি অনশন করবেন। সাতদিন তিনি কিছু না খেয়ে ও পান না করে তার সংকল্পে স্থির ছিলেন, আর এর ফলে তাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় জেলের হাসপাতালে পাঠাতে হয়। তিনি তার সততা প্রমাণ করেছিলেন যদিও এর জন্য তিনি প্রায় তার জীবন হারাতে বসেছিলেন। পরবর্তী বছরগুলিতে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে এইভাবে জীবন বিপন্ন করে তিনি ভুল করেছেন এবং তিনি আর কখনও এইধরনের কাজ করবেন না।
১৯১৮ সালের নভেম্বরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও বাবা রৌয়েনের জেলে ছিলেন, কিন্তু পরের বছরের প্রথম দিকে তাকে ইংল্যান্ডের একটি অসামরিক জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। তার মূল্যবান বাইবেল ও বইগুলি সমেত জমা হওয়া মায়ের সমস্ত চিঠি ও পার্সেলগুলি পেয়ে বাবার সেই আনন্দের কথা কল্পনা করে দেখুন! তাকে উইনশিসট্যার জেলে আনা হয় সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে এক যুবক ভাইয়ের সাথে তার সাক্ষাৎ হয় যার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা তারই মতো ছিল। তার নাম ফ্রাঙ্ক প্ল্যাট, যিনি পরে অনেক বছর লন্ডন বেথেলে পরিচর্যা করেছিলেন। তারা পরের দিন দেখা করার ব্যবস্থা করেন, কিন্তু তখন ফ্রাঙ্ককে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।
১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে মা একটি টেলিগ্রাম পান: “হাল্লিলূয়া! ঘরে ফিরছি—লন্ডন বেথেলকে জানাচ্ছি।” তিন বছর ধরে পরীক্ষা, তাড়না এবং বিচ্ছেদের পর এটি কত আনন্দের সময়ই না ছিল! যে বিষয়টি বাবার প্রথমেই মনে এসেছিল তা হল লন্ডন বেথেলের ভাইয়েদের ফোন করা ও তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা। ৩৪ ক্রাভেন টেরাশে তাকে প্রেমপূর্ণ স্বাগত জানানো হয়। স্নান ও দাঁড়ি কাটার পর অন্যের কাছ থেকে নেওয়া স্যুট ও টুপি পড়ে বাবা ঘরে ফিরেছিলেন। আমাদের পূণর্মিলন আপনি কল্পনা করতে পারেন? আমি তখন প্রায় পাঁচ বছরের ছিলাম এবং আমি তাকে মনে করতে পারছিলাম না।
মুক্তি লাভের পর বাবার প্রথম সভাটি ছিল স্মরণার্থক সভা। হলের সিঁড়িতে পা রেখে প্রথম যে ভাইয়ের সাথে তার সাক্ষাৎ হয় তিনি ছিলেন ফ্রাঙ্ক প্ল্যাট যাকে লীডসের একটি সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তারা তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করে কী আনন্দই না পেয়েছিলেন! তখন থেকে শুরু করে ছাড়া পাওয়া পর্যন্ত ফ্রাঙ্ক প্রায়ই আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন।
মায়ের বিশ্বস্ত পরিচর্যা
বাবার অনুপস্থিতিতে মা সরকার থেকে প্রাপ্ত তার স্বল্প আয়ের সম্পূরক হিসাবে অন্যদের কাপড় পরিষ্কার করতেন। ভাইয়েরা আমাদের প্রতি খুব সদয় ছিলেন। কিছু সপ্তাহ অন্তর মণ্ডলীর একজন প্রাচীন তার হাতে একটি ছোটো খাম দিতেন যার ভিতরে নামহীন উপহার থাকত। মা সবসময় বলতেন যে এটি হচ্ছে ভাইয়েদের প্রেম যা তাকে যিহোবার নিকটে আসতে এবং এই পরীক্ষার মধ্যে ধৈর্য রাখতে সাহায্য করেছে। তিনি বাবার অনুপস্থিতিতেও বিশ্বস্ততার সাথে মণ্ডলীর সভাগুলিতে উপস্থিত থেকেছেন। তার জন্য সবচেয়ে চরম পরীক্ষা ছিল সেইসময় যখন এক বছরের জন্য তিনি জানতেন না বাবা জীবিত আছেন না মারা গেছেন। অতিরিক্ত চাপস্বরূপ ১৯১৮ সালে মায়ের এবং আমার দুজনেরই স্প্যানিস ফ্লু হয়। আমাদের চারধারে লোকেরা মারা যাচ্ছিল। যেসব প্রতিবেশীরা অপর প্রতিবেশীদের সাহায্য করতে গিয়েছিল তারাও এই রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয় ও মারা যায়। কোন সন্দেহ নেই যে সেই সময়কার খাদ্যাভাব লোকেদের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছিল।
প্রেরিত পিতরের বাক্যগুলি আমাদের পরিবারের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল: “ঈশ্বর, . . . তোমাদের ক্ষণিক দুঃখভোগের পর তোমাদিগকে . . . সবল, বদ্ধমূল করিবেন”! (১ পিতর ৫:১০) আমার বাবামায়েরর দুখঃভোগ তাদের যিহোবার প্রতি অটল বিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল, এক পূর্ণ নিশ্চয়তা যে তিনি আমাদের যত্ন নেবেন এবং কোনকিছু ঈশ্বরের প্রেম থেকে আমাদের বিচ্ছেদ করতে পারবে না। এইধরনের বিশ্বাসে প্রতিপালিত হওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য আমি বিশেষভাবে আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়েছিলাম।—রোমীয় ৮:৩৮, ৩৯; ১ পিতর ৫:৭.
যুবকাবস্থার পরিচর্যা
বাবার মুক্তির পর রাজ্যের পরিচর্যা আমাদের জীবনে মুখ্য স্থান নেয়। আমি স্মরণে আনতে পারি না যে কেবলমাত্র অসুস্থতা ছাড়া আমি একটি সভাতেও অনুপস্থিত থেকেছি বলে। ঘরে ফেরার কিছুদিন পরেই বাবা একটি সম্মেলনে যোগ দিতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের জন্য তার প্লেট ক্যামেরা এবং মায়ের সোনার ব্রেসলেটটি বিক্রি করে দেন। যদিও ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার মতো অবস্থা আমাদের ছিল না, তবুও আমরা কখনও এই জনসমাবেশে যোগ দেওয়ার সুযোগ হারায়নি যার অন্তর্ভুক্ত ছিল লন্ডনের সম্মেলনগুলিও।
যুদ্ধের পরের প্রথম দুই তিন বছর ছিল সতেজতামূলক। বাবা ও মা মেলামেশা করার প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিলেন। আমি স্মরণ করতে পারি কিভাবে আমরা অন্যান্য ভাই এবং বোনদের সাথে সাক্ষাৎ করতাম আর ছোট বয়সে আমি যখন ছবি আঁকতাম, তখন আমার বয়ঃজ্যেষ্ঠরা ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের নতুন শেখা সত্য সম্বন্ধে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করত। একসাথে কথা বলা, অর্গান বাজিয়ে গান করা, মধুর সাহচর্য উপভোগ করা তাদের খুব খুশি ও সতেজ করেছিল।
আমাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যাপারে আমার বাবামা কঠোর নিয়মানুবর্তী ছিলেন। বিদ্যালয়ে এমনকি পাঁচ বছর বয়সেও আমি স্বতন্ত্র ছিলাম, যখন শ্রেনীতে ধর্মীয় তত্ব প্রশ্নত্তোরের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হত তখন আমি আমার “নূতন নিয়ম” পড়তাম। পরে আমাকে সমস্ত বিদ্যালয়ের সামনে “সচেতন প্রতিবাদী” হিসাবে প্রতিপন্ন করা হয় কারণ আমি প্রবীণ সৈনিকদের স্মরণার্থক সভায় অংশ নিইনি।a এইভাবে বড় হয়ে ওঠার দরুন আমার কোন অনুশোচনা হয়নি। বস্তুতপক্ষে, এটি সুরক্ষাস্বরূপ ছিল এবং ‘সঙ্কীর্ণ পথে’ থাকাকে সহজ করে তুলেছিল। আমার বাবামা সভা ও পরিচর্যার জন্য যেখানেই যেতেন আমি তাদের সাথে যেতাম।—মথি ৭:১৩, ১৪.
আমি বিশেষভাবে রবিবারের সেই সকালটির কথা স্মরণে আনতে পারি যেদিন আমি নিজে প্রথম প্রচার করা শুরু করি। আমি ঠিক ১২ বছরের ছিলাম। আমার কিশোরী অবস্থার একটি রবিবারের কথা মনে আছে যেদিন আমি ঘরে থাকব বলে মনস্থির করেছিলাম। কেউ আমার সমালোচনা করেনি অথবা প্রচারে যাওয়ার জন্য জোর করেনি, সুতরাং আমি বাগানে বসে বাইবেল অধ্যয়ন করছিলাম আর খুবই অস্বস্তিবোধ করছিলাম। এর এক অথবা দুই সপ্তাহ পরে আমি বাবাকে বলেছিলাম: “আমি ভাবছি আজকে সকালে আমি তোমার সাথে যাব!” তারপর থেকে আমি কখনও ফিরে তাকাইনি।
১৯৩১ সালটি কতই না উত্তম বছর ছিল! কেবলমাত্র আমরা আমাদের নতুন নাম যিহোবার সাক্ষী গ্রহণই করিনি, কিন্তু লন্ডনের আলেকজান্দ্রা প্যালেসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনে আমি বাপ্তিস্ম নিয়েছিলাম। সেই দিনটি আমি কখনও ভুলব না। আমরা লম্বা, কালো পোশাক পরেছিলাম আর আমারটি অপর একজন বাপ্তিস্ম প্রার্থী ইতিমধ্যেই ব্যবহার করার দরুন ভিজে ছিল!
শিশু হিসাবে সর্বদা আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল একজন কল্পটুর হওয়া যে নামে পূর্ণ-সময়ের প্রচারকরা তখন পরিচিত ছিল। বেড়ে ওঠার সাথে সাথে আমি অনুভব করি যিহোবার সেবায় আমার আরও কিছু করার আছে। সুতরাং ১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে ১৮ বছর বয়সে আমি পূর্ণ-সময়ের পরিচারক হিসাবে যোগ দিই।
কোনো বড় শহরে “অগ্রগামী সপ্তাহ” ছিল আমাদের জন্য একটি বিশেষ আনন্দের বিষয়, যখন এক ডজন পূর্ণ-সময়ের পরিচারক একত্রে আসত, স্থানীয় ভাইয়েদের সাথে থাকত, এবং একটি দল হিসাবে কাজ করত। আমরা ধর্মীয় নেতা ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পুস্তিকা বিতরণ করতাম। তাদের সমীপবর্তী হওয়ার জন্য সাহসের প্রয়োজন ছিল। আমাদের অধিকাংশই অবজ্ঞাপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যাত হত, অনেকে আমাদের মুখের উপর সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিত। এগুলি আমাদের উদ্বিগ্ন করত না, কারণ আমাদের উদ্যম এত প্রবল ছিল যে আমরা খ্রীষ্টের নামের জন্য তিরস্কৃত হতে আনন্দিত ছিলাম।—মথি ৫:১১, ১২.
লীডসে ট্রানসক্রিপসন মেসিনগুলি বহন করার জন্য আমরা প্যারাম্বুলেটর, ট্রাইসাইকেল, বাবার মোটরসাইকেল ও সাইডকার এবং পরে বাবার গাড়িটিও ব্যবহার করি। দুজন ভাই এই মেসিনটি সঙ্গে করে একটি রাস্তায় যেতেন ও লোকেদের মনোযোগ আকর্ষণ করবার ও তাদের ঘরের দরজার কাছে আনবার জন্য একটি সুরেলা রেকর্ড বাজাতেন আর তারপর ভাই রাদারফোর্ডের রেকর্ড করা একটি পাঁচ মিনিটের বক্তৃতা বাজানো হত। তারপর তারা পরের রাস্তায় যেতেন আর আমরা প্রকাশকেরা তাদের অনুসরণ করতাম আর বাইবেল সাহিত্যাদি অর্পণ করতাম।
কিছু বছর ধরে প্রত্যেক রবিবার সভার পর আমরা টাউন হল স্কয়ারে যেতাম যেখানে বক্তৃতা দেওয়ার একটি জায়গা ছিল এবং আমরা ভাই রাদারফোর্ডের দেওয়া এক ঘন্টা ব্যাপী একটি রেকর্ড করা বক্তৃতা শুনে সমর্থন জানাতাম, অন্যদের হাতে ছোট কাগজ তুলে দিতাম ও যারা আগ্রহ দেখাত তাদের সাথে যোগাযোগ করতাম। আমরা সেখানে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলাম। এমনকি পুলিশরাও আমাদের সম্মান করত। একদিন সন্ধ্যাবেলা যখন আমরা প্রতিদিনের মতো একত্র হয়েছিলাম কিছু দূরে আমরা ড্রাম ও ব্যান্ডের শব্দ শুনতে পাই। শীঘ্রই প্রায় একশ জন ফ্যাসিস্টদের একটি দল সেই রাস্তায় আসে। তারা আমাদের পিছনে এসে দাঁড়ায় ও তাদের পতাকা উত্তোলন করে। ব্যান্ড থেমে যায়, চারিদিকে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে যতক্ষণ না ভাই রাদারফোর্ডের গুরুগম্ভীর আওয়াজ শোনা যায়: “তাদেরকে তাদের পতাকাকে অভিবাদন করতে দাও এবং যদি তারা ইচ্ছা করে তবে মানুষকে সেবা করুক। আমরা কেবলমাত্র যিহোবাকে আমাদের ঈশ্বরকে উপাসনা ও প্রণিপাত করব!” আমরা ভাবছিলাম পরে কী ঘটবে! একটি উত্তম সাক্ষ্য পাওয়া ছাড়া আর কিছুই ঘটেনি এবং পুলিশেরা তাদের শান্ত করে রেখেছিল যাতে সেই জনসাধারণের বক্তৃতার বাকি অংশটুকু আমরা শুনতে পারি।
এইসময় থেকে ফোনোগ্রাফ আমাদের বিস্তারিতভাবে সাক্ষ্য দেওয়ার পক্ষে সাহায্যস্বরূপ হয়েছিল। আমরা দরজার সামনে সতর্ক দৃষ্টি রেখে লোকদের উৎসাহিত করতাম পাঁচ মিনিটের রেকর্ড করা সম্পূর্ণ বাইবেল ভিত্তিক বক্তৃতাটি শুনতে। প্রায়ই গৃহকর্তারা আমাদের ভিতরে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন এবং আমাদের আবার ফিরে আসা ও আরও রেকর্ড বাজানোতে খুশি হতেন।
১৯৩৯ সালটি ছিল বিরোধিতা ও নৃশংসতার প্রাদুর্ভাবে ভরা এক ব্যস্ত ও কষ্টকর বছর। আমাদের একটি সম্মেলনের আগে ভাইয়েদের রাস্তায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও চিৎকার শোনার এক অভিজ্ঞতা হয়। সুতরাং সম্মেলন চলাকালীন তারা ভাইয়েদের একটি ছোট দল তৈরি করার পরিকল্পনা নেন ওই সমস্যাপূর্ণ এলাকায় প্রচার করার জন্য যাতে বোনেরা ও অন্যান্য ভাইয়েরা নিরাপদ স্থানে যেতে পারে। একটি রাস্তায় দলের সাথে কাজ করার সময় রাস্তার পিছন দিকের একটি গলির একটি ঘরে আমি যাই। একটি দরজার কাছে গিয়ে আমি প্রচণ্ড হইচই শুরু হওয়ার আভাস পাই—রাস্তায় চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। আমি সেই দরজায় ব্যক্তিটির সাথে কথা বলতে থাকি এবং কথপোকথন চালিয়ে যেতে থাকি যতক্ষণ না পরিস্থিতি শান্ত হয়। তারপর আমি গলি দিয়ে হেঁটে রাস্তায় আসি আর দেখি যে অন্যান্য ভাইবোনেরা আমাকে দেখতে না পেয়ে ভয় পেয়ে গিয়েছিল! পরে যদিও ওই উত্তেজনা সৃষ্টিকারীরা আমাদের সভা ভেঙে দিতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমাদের ভাইয়েরা তার সামাল দেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়
এই সময় জোর করে সৈন্যদলে নিযুক্ত হতে বাধ্য করা হয় এবং ৩ থেকে ১২ মাসের মধ্যে অনেক যুবক ভাইয়েদের জেলে বন্দী করা হয়। বাবা তখন একটি অতিরিক্ত সুযোগ পান, অর্থাৎ জেলে ভাইয়েদের দেখতে যাওয়ার অনুমতি। প্রত্যেক রবিবার তিনি স্থানীয় জেলে ওয়াচটাওয়ার অধ্যয়ন পরিচালনা করতেন। বুধবার সন্ধ্যায় তিনি ভাইয়েদের তাদের ক্ষুদ্র কক্ষে দেখতে যেতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তার নিজের জেল সম্বন্ধে একটি দীর্ঘ ও কঠিন অভিজ্ঞতা থাকার দরুন যারা অনুরূপ কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তাদের যত্ন নিতে পেরে তিনি বিশেষভাবে খুশি হয়েছিলেন। এটি তিনি ১৯৫৯ সালে তার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে করে গেছেন।
১৯৪১ সাল থেকে আমরা তিক্ত পরিস্থিতি ও শত্রুতার সম্মুখীন হতে থাকি যা অনেকে আমাদের নিরপেক্ষ অবস্থার জন্য প্রকাশ করত। রাস্তায় পত্রিকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ও এর মোকাবিলা করা সহজ ছিল না। একই সময়ে আমরা আমাদের এলাকায় বসবাসকারী শরণার্থীদের সাহায্য করতে পেরে আনন্দিত হই। লাটভিয়ান, পোল, এস্টোনিয়ান এবং জার্মানরা—যখন তারা প্রহরীদুর্গ অথবা কনসোলেশন পত্রিকা (এখন সচেতন থাক!) তাদের নিজেদের ভাষায় দেখে তখন তাদের আনন্দোজ্জ্বল চোখগুলি দেখা কতই না আনন্দের বিষয় ছিল!
এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে নিরপেক্ষ পদক্ষেপ আমি নিয়েছিলাম তার জন্য আমাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। প্রত্যেক ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৯ ঘন্টা ক্ষুদ্র কক্ষে বন্ধ থাকার ফলে আমার এই বন্দী জীবন অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছিল। প্রথম তিন দিন ছিল কঠিনতম, কারণ এই দিনগুলিতে আমি একা ছিলাম। চতুর্থ দিনে, আমাকে গভর্নরের অফিসে ডাকা হয় যেখানে আমি আরও দুজন মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। একটি মেয়ে আমাকে ফিসফিস করে বলে: “কী কারণে তুমি এখানে?” আমি বলেছিলাম: “যদি তুমি জানতে পার তাহলে আশ্চর্য হবে।” চাপা উত্তেজনায় সে আবার ফিসফস করে বলেছিল: “তুমি কি একজন যিহোবার সাক্ষী?” অন্য মেয়েটি তার কথা শুনেছিল ও আমাদের দুজনকেই জিজ্ঞাসা করেছিল: “তোমরা যিহোবার সাক্ষী?” এবং তারপর আমরা তিনজন আমাদের বাহু প্রসারিত করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমরা আর একা নই!
আনন্দদায়ক পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যা
জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আমি আমার পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যা চালিয়ে যেতে থাকি এবং একটি ১৬ বছরের কিশোরী মেয়ে যে সদ্য বিদ্যালয় শেষ করেছিল, আমার সাথে যোগ দেয়। আমরা ইয়র্কসায়ার-ডেলস এর প্রান্তে ইল্কলে নামক সুন্দর শহরটিতে যাই। সম্পূর্ণ ছয় মাস ধরে আমাদের সভাগুলির জন্য একটি উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে আমরা কঠোর পরিশ্রম করি। পরিশেষে আমরা একটি ছোট গ্যারেজ ভাড়া করে সেটিকে কিংডম হলে পরিণত করি। বাবা আলো ও তাপ সরবরাহ করে এই কঠিন কাজে আমাদের সাহায্য করেন। তিনি আমাদের জন্য গৃহটি সাজিয়েও দেন। বেশ কিছু বছর ধরে নিকটস্থ মণ্ডলীটি প্রত্যেক সপ্তাহে জনসাধারণের বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ভাইয়েদের নিযুক্ত করে আমাদের সহায়তা করেছিল। যিহোবার আশীর্বাদে আমরা উন্নতি ও বৃদ্ধি লাভ করি এবং কালক্রমে একটি মণ্ডলী স্থাপিত হয়।
১৯৫৯ সালের জানুয়ারি মাসে বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমাকে বাড়িতে ডেকে আনা হয় এবং তিনি এপ্রিল মাসে মারা যান। পরবর্তী বছরগুলি ছিল কঠোরতর। মায়ের স্বাস্থ্য এবং সেই সঙ্গে স্মৃতিশক্তিও ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল আর এটি আমার জন্য একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাস্বরূপ ছিল। কিন্তু যিহোবার আত্মা আমাকে চলতে সাহায্য করেছে এবং ১৯৬৩ সালে তার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমি সঠিকভাবে তার যত্ন নিতে পেরেছিলাম।
বহু বছর ধরে আমি যিহোবার কাছ থেকে প্রচুর আশীর্বাদ পেয়েছি। এগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা দেওয়ার পক্ষে অতিরিক্ত। আমি আমার নিজস্ব মণ্ডলীকে বৃদ্ধি পেতে ও চারবার বিভক্ত হতে দেখেছি, প্রকাশক ও অগ্রগামীদের বাইরে পাঠাতে, কিছুজনকে মিশনারী হিসাবে অনেক দূরবর্তী দেশগুলিতে যেমন বলিভিয়া, লোওস, এবং উগান্ডায় পাঠাতে দেখেছি। পরিস্থিতির প্রতিকূলতার জন্য আমি বিবাহ করতে ও পরিবার স্থাপন করতে পারিনি। এটি আমাকে কখনও দুঃখিত করেনি; আমি খুব ব্যস্ত জীবন অতিবাহিত করি। যদিও আমার নিজের কোনো আত্মীয় ছিল না, কিন্তু প্রভুতে আমার অনেক সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনি ছিল এমনকি সত্যিই শতগুণ।—মার্ক ১০:২৯, ৩০.
খ্রীষ্টীয় মেলামেশা উপভোগ করার জন্য আমি প্রায়ই অল্পবয়স্ক অগ্রগামী ও অন্যান্য অল্পবয়স্ক যুবক-যুবতীদের আমার ঘরে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকি। আমরা ওয়াচটাওয়ার পাঠ একসাথে প্রস্তুত করি। ঠিক যেমন আমার বাবা-মা করতেন সেইরকম আমরাও অভিজ্ঞতাগুলি বর্ণনা করি ও রাজ্য গানগুলি গাই। অল্পবয়স্ক ব্যক্তিদের একটি আনন্দপূর্ণ দল দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকায় আমি একটি সতেজ ও সুখী দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে সমর্থ হয়েছিলাম। অগ্রগামী হিসাবে পরিচর্যা করা ব্যতীত আর কোন ভাল জীবন আমার জন্য ছিল না। আমার বাবামায়ের পদচিহ্ন অনুসরণ করার সুযোগ পাওয়ায় আমি যিহোবার কাছে কৃতজ্ঞ। আমার প্রার্থনা এই যে, আমি যেন চিরকাল যিহোবার সেবা করে যেতে পারি।
[পাদটীকাগুলো]
a যুদ্ধবিগ্রহের সমাপ্তি উপলক্ষে ১৯১৮ এবং পরে ১৯৪৫ সালে স্মৃতিরক্ষার্থক উৎসব।
[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]
বাবামা অ্যাটকিনসন ও প্যাটীর সাথে হিলডা প্যাজেট
[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]
সেই ট্র্যাক্টটি যা সত্যের প্রতি বাবার আগ্রহকে জাগিয়েছিল