মিথ্যা ঈশ্বরগুলির বিরুদ্ধে সাক্ষীবৃন্দেরা
“সদাপ্রভু কহেন, তোমরাই আমার সাক্ষী, এবং আমার মনোনীত দাস।”—যিশাইয় ৪৩:১০.
১. সত্য ঈশ্বর কে এবং কোন্ বিষয়গুলিতে আজকের দিনের বহু সংখ্যক ঈশ্বর যাদের উপাসনা করা হয় তার থেকে তিনি মহান?
সত্য ঈশ্বর কে? আজকে সকল মানবজাতির সম্মুখে এটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদিও মানুষ অসংখ্য ঈশ্বরকে উপাসনা করে, কিন্তু একজন আছেন যিনি আমাদের জীবন ও সুখী ভবিষ্যৎ দিতে পারে। শুধু তাঁর সম্বন্ধে এটি বলা যেতে পারে: “কেননা তাঁহাতেই আমাদের জীবন, গতি ও সত্তা।” (প্রেরিত ১৭:২৮) সত্যই, একটি মাত্র ঈশ্বর রয়েছেন যাঁর উপাসনা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। প্রকাশিত বাক্য পুস্তকে যেমন স্বর্গীয় ঐকতান বলে: “আমাদের ঈশ্বর, যিহোবা তুমিই প্রতাপ ও সমাদর ও পরাক্রম পাওয়ার যোগ্য; কেননা তুমিই সকলই সৃষ্টি করেছ, এবং তোমার ইচ্ছাহেতু সকলই অস্তিত্বপ্রাপ্ত ও সৃষ্ট হয়েছে।”—প্রকাশিত বাক্য ৪:১১, NW.
২, ৩. (ক) কিভাবে শয়তান মিথ্যাভাবে যিহোবার উপাসনা পাওয়ার অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করেছিল? (খ) হবার নিজের জন্য এবং তার ছেলেমেয়েদের জন্য তার পাপের ফল কী হয়েছিল এবং শয়তানের জন্য এর ফল কী হয়?
২ এদন উদ্যানে, শয়তান মিথ্যাভাবে যিহোবার উপাসনা পাওয়ার অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করে। একটি সাপকে ব্যবহার করে, সে হবাকে বলে যে যদি সে যিহোবার নিয়মের বিরুদ্ধে যায় এবং যিহোবা যে বৃক্ষ থেকে খেতে নিষেধ করেছিলেন তার থেকে যদি খায়, তাহলে সে নিজে ঈশ্বরের মত হয়ে যাবে। তার কথাগুলি এই রকম ছিল: “ঈশ্বর জানেন, যে দিন তোমরা তাহা খাইবে, সেই দিন তোমাদের চক্ষু খুলিয়া যাইবে, তাহাতে তোমরা ঈশ্বরের সদৃশ হইয়া সদসদ্-জ্ঞান প্রাপ্ত হইবে।” (আদিপুস্তক ৩:৫) হবা সাপকে বিশ্বাস করে আর নিষিদ্ধ ফলটি খায়।
৩ অবশ্যই, শয়তান মিথ্যা কথা বলেছিল। (যোহন ৮:৪৪) শুধু একটি মাত্র উপায়ে হবা “ঈশ্বরের সদৃশ” হয়েছিল যখন সে পাপ করে নিজের উপর দায়িত্ব নেয়, এই সিদ্ধান্ত নিতে কী তার জন্য ঠিক এবং কী বেঠিক, এমন একটি জিনিস যা যিহোবার উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল। আর শয়তানের মিথ্যা সত্ত্বেও, পরিশেষে সে মারা যায়। হবার পাপের দ্বারা একমাত্র যে উপকারলাভ করেছিল সে হল শয়তান। অবশ্য, হবাকে পাপ করানোর পিছনে শয়তানের যে পরোক্ষ লক্ষ্যটি ছিল তা হল নিজেকে ঈশ্বর করে তোলা। যখন হবা পাপ করে, সে তার প্রথম মনুষ্য অনুসরণকারী হয় এবং শীঘ্রই আদম তার সাথে যোগ দেয়। তাদের ছেলেমেয়েদের বেশির ভাগ শুধুমাত্র “পাপে”-ই জন্ম নেয়নি কিন্তু শয়তানের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং কিছু সময়ের মধ্যে ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন একটি সম্পূর্ণ জগৎ অস্ত্বিত্বে আসে।—আদিপুস্তক ৬:৫; গীতসংহিতা ৫১:৫.
৪. (ক) এই জগতের ঈশ্বর কে? (খ) এখন অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়টি কী?
৪ সেই জগৎটি প্লাবনে ধ্বংস হয়ে যায়। (২ পিতর ৩:৬) প্লাবনের পরে যিহোবা থেকে বিচ্ছিন্ন আরেকটি জগৎ গড়ে ওঠে যা এখনও অস্তিত্বে রয়েছে। তার সম্বন্ধে বাইবেল বলে: “সমস্ত জগৎ সেই পাপাত্মার মধ্যে শুইয়া রহিয়াছে।” (১ যোহন ৫:১৯) যিহোবার আইনের আত্মা ও তা কঠোরভাবে পালন না করার দ্বারা এই জগৎ শয়তানের উদ্দেশ্যকে বৃদ্ধি করে। সেই হল এই জগতের ঈশ্বর। (২ করিন্থীয় ৪:৪) কিন্তু, সে মূলত এক অক্ষম ঈশ্বর। সে লোকেদের সুখী করতে অথবা জীবন দিতে পারে না; শুধুমাত্র যিহোবাই তা করতে পারেন। তাই, যে সব লোকেরা অর্থপূর্ণ জীবন এবং এরপর উত্তম জগৎ চায় তাদের অবশ্যই প্রথমে জানতে হবে যে যিহোবা হলেন সত্য ঈশ্বর এবং তারপর তাঁর ইচ্ছাকে পালন করতে শিখতে হবে। (গীতসংহিতা ৩৭:১৮, ২৭, ২৮; উপদেশক ১২:১৩) অতএব যিহোবার সম্বন্ধে সত্য ঘোষণা করা, বিশ্বাসী স্ত্রী ও পুরুষদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
৫. কোন্ ‘সাক্ষীমেঘ’ সম্বন্ধে পৌল উল্লেখ করেন? তিনি যে তালিকা দিয়েছেন তার থেকে কয়েকজনের নাম করুন।
৫ মানব ইতিহাসের শুরু থেকে, এইধরনের বিশ্বাসী ব্যক্তিবিশেষদের জগতের দৃশ্যপটে দেখা গেছে। প্রেরিত পৌল ইব্রীয় ১১ অধ্যায়ে, একটি দীর্ঘ তালিকা দেন এবং তাদের ‘বৃহৎ সাক্ষীমেঘ’ বলে ডাকেন। (ইব্রীয় ১২:১) আদম ও হবার দ্বিতীয় পুত্র, হেবল পৌলের তালিকাতে প্রথম ছিল। হনোক ও নোহ সম্বন্ধে প্লাবনের পূর্ব থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। (ইব্রীয় ১১:৪, ৫, ৭) অব্রাহাম এদের মধ্যে মুখ্য, যিনি যিহূদী জাতির পূর্বপুরুষ ছিলেন। অব্রাহাম, যাকে “ঈশ্বরের বন্ধু” বলা হয়েছে, তিনি “বিশ্বাস্য ও সত্যময় সাক্ষী” যীশুর পিতৃপুরুষ হন।—যাকোব ২:২৩; প্রকাশিত বাক্য ৩:১৪.
সত্যের পক্ষে অব্রাহামের সাক্ষ্য
৬, ৭. কিভাবে অব্রাহামের জীবন এবং তার কাজগুলি সাক্ষ্য দেয় যে যিহোবাই হলেন সত্য ঈশ্বর?
৬ কিভাবে অব্রাহাম সাক্ষী হিসাবে কাজ করেছিলেন? যিহোবার প্রতি তার দৃঢ় বিশ্বাস এবং একনিষ্ঠ বাধ্যতার দ্বারা। যখন তাকে ঊর শহর ছাড়তে এবং দূর দেশে তার বাকি জীবন কাটাতে বলা হয়, অব্রাহাম তা করেছিলেন। (আদিপুস্তক ১৫:৭; প্রেরিত ৭:২-৪) যাযাবরেরা প্রায়ই তাদের যাযাবর জীবন ত্যাগ করে শহরের আরও বেশি সুরক্ষিত জীবন পছন্দ করে। তাই, অব্রাহাম যখন শহরের জীবন ত্যাগ করে তাম্বুতে থাকতে শুরু করেছিলেন, তখন তিনি যিহোবা ঈশ্বরের প্রতি তার আস্থার দৃঢ় প্রমাণ দিয়েছিলেন। তার বাধ্যতা প্রত্যক্ষদর্শীদের জন্য এক সাক্ষ্য ছিল। তার বিশ্বাসের হেতু যিহোবা অব্রাহামকে অনেক আশীর্বাদ করেছিলেন। যদিও তিনি তাম্বুতে বাস করছিলেন তবুও বস্তুগত দিক দিয়ে তিনি সমৃদ্ধশালী ছিলেন। যখন লোট এবং তার পরিবারকে বন্দীদশায় নিয়ে যাওয়া হয়, যিহোবা অব্রাহামকে তার পশ্চাদ্ধাবনে সাফল্য দেন, যাতে করে তিনি তাদের উদ্ধার করতে পারেন। অব্রাহামের স্ত্রী বৃদ্ধা বয়সে পুত্র প্রসব করেছিলেন এবং এর ফলে অব্রাহামের প্রতি যিহোবার প্রতিজ্ঞা, যে তিনি এক বংশের পিতা হবেন তা দৃঢ়রূপে প্রতিপন্ন হয়েছিল। অব্রাহামের মাধ্যমে, লোকেরা দেখেছিল যে যিহোবা এক জীবন্ত ঈশ্বর যিনি তাঁর প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করেন।—আদিপুস্তক ১২:১-৩; ১৪:১৪-১৬; ২১:১-৭.
৭ লোটকে উদ্ধার করে ফিরবার সময়ে, অব্রাহাম শালমের (পরে যিরূশালেম বলা হয়) রাজা মল্কাষেদকের সাথে দেখা করেন, যিনি অব্রাহামকে এই বলে অভ্যর্থনা জানান: “অব্রাম . . . পরাৎপর ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদপাত্র হউন।” সদোমের রাজাও তার সাথে দেখা করেন এবং তাকে উপহার দিতে চান। অব্রাহাম প্রত্যাখ্যান করেন। কেন? কারণ তার আশীর্বাদের উৎস সম্বন্ধে তিনি কোন সন্দেহ রাখতে চাননি। তিনি বলেছিলেন: “আমি স্বর্গমর্ত্ত্যের অধিকারী পরাৎপর ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশে হস্ত উঠাইয়া কহিতেছি, আমি আপনার কিছুই লইব না, এক গাছি সূতা কি পাদুকার বন্ধনীও লইব না; পাছে আপনি বলেন, আমি অব্রামকে ধনবান্ করিয়াছি।” (আদিপুস্তক ১৪:১৭-২৪) অব্রাহাম কতই না উত্তম সাক্ষী ছিলেন!
সাক্ষীসমূহের এক জাতি
৮. মোশি কিভাবে যিহোবার প্রতি প্রচুর বিশ্বাস দেখিয়েছিলেন?
৮ মোশি যিনি অব্রাহামের এক বংশধর ছিলেন, তিনিও পৌলের সাক্ষীদের তালিকাতে আছেন। মোশি মিশরের ধনসম্পত্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং পরে ইস্রায়েলের সন্তানদের স্বাধীনতার পথে নেতৃত্ব দিতে মহান বিশ্বশক্তির শাসকের সামনে নির্ভীকভাবে উপস্থিত হয়েছিলেন। কোথা থেকে তিনি সাহস পেয়েছিলেন? তার বিশ্বাস থেকে। পৌল বলেন: “[মোশি] . . . যিনি অদৃশ্য, তাঁহাকে যেন দেখিয়াই স্থির থাকিলেন।” (ইব্রীয় ১১:২৭) মিশর দেশের ঈশ্বরেরা দৃশ্যত, স্পর্শনসাধ্য ছিল। এমনকি আজকেও তাদের মূর্তি লোকেদের অভিভূত করে। কিন্তু যিহোবা যদিও অদৃশ্য, অন্যান্য মিথ্যা ঈশ্বরের চাইতে মোশির কাছে আরও বেশি বাস্তব ছিলেন। যিহোবা যে অস্তিত্বে আছেন এবং তিনি যে তাঁর উপাসকদের পুরস্কৃত করবেন সেই বিষয়ে মোশির কোন সন্দেহ ছিল না। (ইব্রীয় ১১:৬) মোশি এক উল্লেখযোগ্য সাক্ষী হয়েছিলেন।
৯. যিহোবাকে কিভাবে ইস্রায়েল জাতি সাক্ষী হিসাবে সেবা করেছিল?
৯ স্বাধীনতার পথে নেতৃত্ব দেওয়ার পর, মোশি, যিহোবা এবং যাকোবের মাধ্যমে অব্রাহামের বংশধরদের মধ্যে চুক্তির মধ্যস্থ হয়েছিলেন। এর ফলে, যিহোবার বিশেষ উত্তরাধিকার হিসাবে ইস্রায়েলজাতি অস্তিত্বে এসেছিল। (যাত্রাপুস্তক ১৯:৫, ৬) এই প্রথমবার, একটি জাতীয় সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৮০০ বছর পরে, যিশাইয়ের মাধ্যমে যিহোবার বাক্যগুলি, মৌলিকরূপে এই জাতির অস্তিত্বে আসার আরম্ভ থেকে প্রযোজ্য হয়: “সদাপ্রভু কহেন, তোমরাই আমার সাক্ষী, এবং আমার মনোনীত দাস; যেন তোমরা জানিতে ও আমাতে বিশ্বাস করিতে পার, এবং বুঝিতে পার যে, আমিই তিনি।” (যিশাইয় ৪৩:১০) কিভাবে এই নতুন জাতি যিহোবার সাক্ষীবৃন্দ হিসাবে কাজ করবে? তাদের বিশ্বাস এবং বাধ্যতার দ্বারা ও তাদের পক্ষে যিহোবার কার্যকলাপের দ্বারা।
১০. ইস্রায়েলের পক্ষে যিহোবার শক্তিশালী কাজগুলি কোন্ উপায়ে সাক্ষ্য প্রদান করেছিল এবং এর পরিণাম কী হয়েছিল?
১০ এটি শুরু হওয়ার প্রায় ৪০ বছর পর, ইস্রায়েল প্রতিজ্ঞাত দেশ অধিকার করতে যাচ্ছিল। গুপ্তচরেরা যিরীহো নগর পরিদর্শনার্থে যায় এবং যিরীহোর একজন বাসিন্দা রাহব, তাদের রক্ষা করে। কেন? সে বলে: “মিসর হইতে তোমরা বাহির হইয়া আসিলে সদাপ্রভু তোমাদের সম্মুখে কি প্রকারে সূফসাগরের জল শুষ্ক করিয়াছিলেন, এবং তোমরা যর্দ্দনের ও পারস্থ সীহোন ও ওগ নামে ইমোরীয়দের দুই রাজার প্রতি যাহা করিয়াছ, তাহাদিগকে যে নিঃশেষে বিনষ্ট করিয়াছ, তাহা আমরা শুনিলাম; আর শুনিবামাত্র আমাদের হৃদয় গলিয়া গেল; তোমাদের হেতু কাহারো মনে সাহস রহিল না, কেননা তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভু উপরিস্থ স্বর্গে ও নীচস্থ পৃথিবীতে ঈশ্বর।” (যিহোশূয়ের পুস্তক ২:১০, ১১) যিহোবার শক্তিশালী কাজগুলি রাহব এবং তার পরিবারকে যিরীহো ও তার মিথ্যা ঈশ্বর ছাড়তে এবং ইস্রায়েলের সাথে যিহোবাকে উপাসনা করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। স্পষ্টতই, ইস্রায়েলের যিহোবা এক শক্তিশালী সাক্ষ্যদান করেছিলেন।—যিহোশূয়ের পুস্তক ৬:২৫.
১১. সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে সকল ইস্রায়েলীয় পিতামাতাদের কী দায়িত্ব ছিল?
১১ যখন ইস্রায়েলজাতি মিশরে ছিল, যিহোবা মোশিকে ফরৌণের কাছে পাঠিয়ে বলেছিলেন: “তুমি ফরৌণের নিকটে যাও; কেননা আমি তাহার ও তাহার দাসগণের হৃদয় ভারী করিলাম, যেন আমি তাহাদের মধ্যে আমার এই সকল চিহ্ন প্রদর্শন করি, এবং আমি মিস্রীয়দের প্রতি যাহা যাহা করিয়াছি, ও তাহাদের মধ্যে আমার যে যে চিহ্ন-কার্য্য করিয়াছি, তাহার বৃত্তান্ত যেন তুমি আপন পুত্ত্রের ও পৌত্ত্রের কর্ণগোচরে বল, এবং আমি যে সদাপ্রভু, ইহা তোমরা জ্ঞাত হও।” (যাত্রাপুস্তক ১০:১, ২) বাধ্য ইস্রায়েলীয়রা তাদের ছেলেমেয়েদের যিহোবার মহান কার্যগুলি সম্বন্ধে বলবে। পর্যায়ক্রমে, তাদের ছেলেমেয়েরা তাদের সম্বন্ধে তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের বলবে এবং এইভাবে বংশের পর বংশ তা চলতে থাকবে। এইভাবে, যিহোবার শক্তিশালী কাজগুলি স্মৃতিতে থাকবে। এইরকমভাবে আজকেও, পিতামাতাদের তাদের ছেলেমেয়েদের কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে।—দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৪-৭; হিতোপদেশ ২২:৬.
১২. শলোমন এবং ইস্রায়েলের প্রতি যিহোবার আশীর্বাদ কিরূপে সাক্ষ্যস্বরূপ ছিল?
১২ ইস্রায়েল যখন বিশ্বস্ত ছিল ইস্রায়েলের উপর যিহোবার মহৎ আশীর্বাদ পার্শ্ববর্তী জাতিগুলির কাছে এক সাক্ষ্যস্বরূপ ছিল। যিহোবার প্রতিজ্ঞাত আশীর্বাদ পুনর্বিবেচনা করার পর ঠিক যেমন মোশি বলেছিলেন: “পৃথিবীস্থ সমস্ত জাতি দেখিতে পাইবে যে, তোমার উপরে সদাপ্রভুর নাম কীর্ত্তিত হইয়াছে, এবং তাহারা তোমা হইতে ভীত হইবে।” (দ্বিতীয় বিবরণ ২৮:১০) শলোমনকে তার বিশ্বাসের হেতু প্রজ্ঞা এবং ধন দেওয়া হয়েছিল। তার অধীনে জাতিটি সমৃদ্ধিলাভ এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য শান্তি উপভোগ করেছিল। সেই সময়ের সম্বন্ধে আমরা পড়ি: “আর পৃথিবীস্থ যে সকল রাজা শলোনের জ্ঞানের সংবাদ শুনিয়াছেন, তাঁহাদের নিকট হইতে সর্ব্বদেশীয় লোক শলোমনের জ্ঞানের উক্তি শুনিতে আসিত।” (১ রাজাবলি ৪:২৫, ২৯, ৩০, ৩৪) শলোমনের দর্শনার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শিবাদেশের রাণী। জাতি এবং রাজার প্রতি যিহোবার আশীর্বাদ নিজের চোখে দেখে, তিনি বলেন: “ধন্য আপনার ঈশ্বর সদাপ্রভু, যিনি আপনার ঈশ্বর সদাপ্রভুর নিমিত্ত রাজা করণার্থে আপন সিংহাসনে আপনাকে বসাইবার জন্য আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়াছেন। ইস্রায়েল লোকদিগকে চিরস্থায়ী করণার্থে আপনার ঈশ্বর তাহাদিগকে প্রেম করেন।”—২ বংশাবলি ৯:৮.
১৩. ইস্রায়েলের সবচেয়ে কার্যকারী সাক্ষ্যদান কোন্টি ছিল এবং এর থেকে এখনও আমরা কিভাবে উপকার লাভ করি?
১৩ প্রেরিত পৌল ইস্রায়েলের হয়ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাক্ষ্যদানের কথা বলেছিলেন। রোমীয় মণ্ডলীর সাথে মাংসিক ইস্রায়েলের বিষয়ে আলোচনা করার সময়ে, তিনি বলেছিলেন: “ঈশ্বরের বচনকলাপ তাহাদের নিকটে গচ্ছিত হইয়াছিল।” (রোমীয় ৩:১, ২) মোশি থেকে শুরু হয়ে, বিশেষ কিছু বিশ্বস্ত ইস্রায়েলীয়রা, ইস্রায়েল জাতির সাথে যিহোবার ব্যবহার, সাথে সাথে তাঁর উপদেশ, তাঁর নিয়ম এবং তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীগুলি লিখতে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এই লিখনের মাধ্যমে প্রাচীনকালের ওই লেখকেরা ভবিষ্যৎ বংশধরদের—যার অন্তর্ভুক্ত বর্তমানে আমরা—সাক্ষ্যদান করে যে, শুধু একজন ঈশ্বর রয়েছেন ও তাঁর নাম হল যিহোবা।—দানিয়েল ১২:৯; ১ পিতর ১:১০-১২.
১৪. কেন কিছু লোক যারা যিহোবার হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিল নির্যাতন ভোগ করেছিল?
১৪ দুঃখের বিষয় এই যে, প্রায়ই ইস্রায়েল বিশ্বাস প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং তাই যিহোবাকে তাঁর নিজের জাতির কাছে সাক্ষীদের পাঠাতে হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকেই নির্যাতিত হয়েছিল। পৌল বলেছিলেন যে কিছু, “বিদ্রূপের ও কশাঘাতের, অধিকন্ত্ত বন্ধনের ও কারাগারের পরীক্ষা ভোগ করিলেন।” (ইব্রীয় ১১:৩৬) বাস্তবিকই তারা বিশ্বস্ত সাক্ষী! এটি কতই না দুঃখের বিষয় যে প্রায়ই তাদের নির্যাতন যিহোবার বাছাই করা জাতির সহসদস্যদের কাছ থেকে এসেছিল! (মথি ২৩:৩১, ৩৭) বাস্তবে, জাতিটির পাপ এত বেড়ে গিয়েছিল যে সা.শ.পূ. ৬০৭ সালে যিহোবা মন্দিরসহ যিরূশালেম ধ্বংস করতে বাবিলনীয়দের নিয়ে এসেছিলেন এবং বেশির ভাগ জীবিত ইস্রায়েলীয়দের নির্বাসনে নিয়ে যেতে পরিচালিত করেছিলেন। (যিরমিয় ২০:৪; ২১:১০) জাতীয়ভাবে যিহোবার নামের সাক্ষ্য দেওয়া কি শেষ হয়ে গিয়েছিল? না।
ঈশ্বরদের বিচার
১৫. এমনকি বাবিলনীয় নির্বাসনে কিভাবে সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল?
১৫ এমনকি বাবিলনে নির্বাসনে থাকাকালীনও, যিহোবার ঈশ্বরত্ব এবং শক্তি সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিতে সেই জাতির বিশ্বস্ত সদস্যেরা ইতস্ততবোধ করেননি। উদাহরণস্বরূপ, দানিয়েল নির্ভীকভাবে নবূখদ্নিৎসরের স্বপ্নগুলির ব্যাখ্যা করেছিলেন, বেল্শৎসরের জন্য দেওয়ালে লেখাটি বর্ণনা করেছিলেন এবং দারিয়াবসের সামনে প্রার্থনার বিষয়ে আপোশ করতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনজন ইব্রীয়ও, যখন মূর্তির সামনে নতজানু হতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তখন তা নবূখদ্নিৎসরকে এক উত্তম সাক্ষ্য প্রদান করেছিল।—দানিয়েল ৩:১৩-১৮; ৫:১৩-২৯; ৬:৪-২৭.
১৬. কিভাবে যিহোবা ইস্রায়েলের ফিরে আসা সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এবং এই ফিরে আসার কী উদ্দেশ্য ছিল?
১৬ তবুও, যিহোবার উদ্দেশ্য ছিল যে আবার এক জাতীয় সাক্ষ্যদান ইস্রায়েলে দেওয়া হোক। যিহিষ্কেল, যিনি বাবিলনে নির্বাসিত যিহূদীদের মধ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেই বিধ্বস্ত দেশের প্রতি যিহোবার দৃঢ় প্রত্যয় সম্বন্ধে লিখেছিলেন: “আমি তোমাদের উপরে মনুষ্যদিগকে, সমস্ত ইস্রায়েল-কূলকে, তাহার সকলকেই বহুসংখ্যক করিব; আর নগর সকল বসতিবিশিষ্ট হইবে, এবং ধ্বংসিত স্থান সকল নির্ম্মিত হইবে।” (যিহিষ্কেল ৩৬:১০) কেন যিহোবা এটি করবেন? প্রাথমিকরূপে তাঁর নিজের নামের প্রতি সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। যিহিষ্কেলের মাধ্যমে তিনি বলেছিলেন: “হে ইস্রায়েল-কূল আমি তোমাদের নিমিত্ত কার্য্য করিতেছি, তাহা নয়, কিন্তু আমার সেই পবিত্র নামের অনুরোধে কার্য্য করিতেছি, যাহা তোমরা . . . জাতিগণের মধ্যে অপবিত্র করিয়াছ।”—যিহিষ্কেল ৩৬:২২; যিরমিয় ৫০:২৮.
১৭. যিশাইয় ৪৩:১০ পদে কথাগুলির প্রসঙ্গটি কী?
১৭ বাবিলনীয় নির্বাসন থেকে ফিরে আসার ভবিষ্যদ্বাণী করার সময় ভাববাদী যিশাইয়, যিশাইয় ৪৩:১০ পদ লিখবার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, যা বলে যে ইস্রায়েল হল যিহোবার সাক্ষী, তাঁর দাস। যিশাইয় ৪৩ এবং ৪৪ অধ্যায়ে, যিহোবাকে ইস্রায়েলের সৃষ্টিকর্তা, গঠনকর্তা, ঈশ্বর, পবিত্রতম, ত্রাণকর্তা, মুক্তিদাতা, রাজা ও নির্মাণকর্তা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। (যিশাইয় ৪৩:৩, ১৪, ১৫; ৪৪:২) ইস্রায়েলকে নির্বাসনে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কারণ সেই জাতিটি বারংবার তাঁকে এইভাবে গৌরাবান্বিত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তবুও, তারা তাঁর লোক ছিল। যিহোবা তাদের বলেছিলেন: “ভয় করিও না, কেননা আমি তোমাকে মুক্ত করিয়াছি, আমি তোমার নাম ধরিয়া তোমাকে ডাকিয়াছি, তুমি আমার।” (যিশাইয় ৪৩:১) ইস্রায়েলের বাবিলনে নির্বাসন শেষ হয়ে যাবে।
১৮. কিভাবে বাবিলন থেকে ইস্রায়েলের মুক্তি দেখায় যে যিহোবা হলেন একমাত্র সত্য ঈশ্বর?
১৮ সত্যই, বাবিলন থেকে ইস্রায়েলকে মুক্তি দেওয়ার দ্বারা যিহোবা তা ঈশ্বরদের বিচারে পরিণত করে। তিনি মিথ্যা ঈশ্বরদের তাদের সাক্ষীদের নিয়ে আসতে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং তাঁর সাক্ষী হিসাবে ইস্রায়েলের নাম করেছিলেন। (যিশাইয় ৪৩:৯, ১২) যখন তিনি ইস্রায়েলীয়দের নির্বাসন থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে বাবিলনীয় ঈশ্বরগুলি আদৌ কোন ঈশ্বর ছিল না এবং তিনিই হলেন একমাত্র সত্য ঈশ্বর। (যিশাইয় ৪৩:১৪, ১৫) যখন তিনি প্রায় ২০০ বছর পূর্বে পারস্য দেশের কোরসকে যিহূদীদের নিস্তার দেওয়ার জন্য দাস হিসাবে শনাক্ত করেন, তখন তিনি তাঁর ঈশ্বরত্বের আরও প্রমাণ দিয়েছিলেন। (যিশাইয় ৪৪:২৮) ইস্রায়েল মুক্তি পাবে। কেন? যিহোবা ব্যাখ্যা করেছিলেন: “যাতে করে তারা [ইস্রায়েল] আমার প্রশংসা পুনরাবৃত্তি করে।” (যিশাইয় ৪৩:২১, NW) এটি সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আরও একটি সুযোগ দেবে।
১৯. যিরূশালমে ফিরে যাওয়ার জন্য কোরসের আমন্ত্রণ জানানোর দ্বারা এবং বিশ্বস্ত যিহূদীদের ফিরে আসার পর কাজগুলির দ্বারা কী সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল?
১৯ যখন সময় আসে, পারস্য দেশের কোরস বাবিলন জয় করেন ঠিক যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। কোরস, যদিও বা পৌত্তলিক ছিলেন, যিহোবার ঈশ্বরত্ব ঘোষণা করেছিলেন যখন তিনি বাবিলনের যিহূদীদের এই আদেশটি করেন: “তোমাদের মধ্যে, তাঁহার সমস্ত প্রজার মধ্যে, যে কেহ হউক, তাহার ঈশ্বর তাহার সহবর্ত্তী হউন; সে যিহূদা দেশস্থ যিরূশালেমে যাউক, ইস্রায়েলের ঈশ্বর সদাপ্রভুর যিরূশালেমস্থ গৃহ নির্ম্মাণ করুক; তিনিই ঈশ্বর।” (ইষ্রা ১:৩) অনেক যিহূদীরা সাড়া দিয়েছিল। তারা দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছিল প্রতিজ্ঞাত দেশের পথে এবং প্রাচীন মন্দিরের স্থানে বেদী নির্মাণ করেছিল। নিরুৎসাহ এবং কঠোর বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তারা অবশেষে মন্দির এবং যিরূশালেম শহর পুনর্নির্মাণ করতে পেরেছিল। এই সবকিছু ঘটেছিল, যেমন যিহোবা নিজেই বলেছিলেন, “পরাক্রম দ্বারা নয়, বল দ্বারাও নয়, কিন্তু [তাঁর] আত্মা দ্বারা।” (সখরিয় ৪:৬) এই সম্পাদনগুলি আরও প্রমাণ দিয়েছিল যে যিহোবা হলেন সত্য ঈশ্বর।
২০. ইস্রায়েলের দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও, প্রাচীন জগতে যিহোবার নামের পক্ষে তাদের সাক্ষ্য দেওয়া সম্বন্ধে কী বলা যেতে পারে?
২০ এইভাবে, যিহোবা ইস্রায়েলকে তাঁর সাক্ষী হিসাবে ব্যবহার করতে থাকেন, যদিও সেই জাতি অসিদ্ধ ও কয়েক সময় বিদ্রোহসুলভ ছিল। তবুও তারা তাঁর সাক্ষী ছিল। প্রাক্-খ্রীষ্টীয় জগতে, সেই জাতিটি, মন্দির এবং যাজকবর্গসহ সত্য উপাসনার এক জগৎ কেন্দ্রের প্রতিনিধি ছিল। যে কেউ হোক না কেন যারা ইব্রীয় শাস্ত্রাবলীতে ইস্রায়েল সম্পর্কিত যিহোবার কার্যগুলি পড়বে, সে নিঃসন্দেহে জানতে পারবে যে একমাত্র একজনই সত্য ঈশ্বর আছেন এবং তাঁর নাম হল যিহোবা। (দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৪; সখরিয় ১৪:৯) কিন্তু, যিহোবার নামের আরও বড় আকারে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে আর সেই বিষয়ে আমরা পরবর্তী প্রবন্ধে পড়ব।
আপনার কি মনে আছে?
◻ যিহোবা যে সত্য ঈশ্বর সেই সম্বন্ধে অব্রাহাম কিভাবে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন?
◻ মোশির উল্লেখযোগ্য কোন্ গুণটি তাকে একজন বিশ্বস্ত সাক্ষী হতে সাহায্য করেছিল?
◻ কোন্ কোন্ উপায়ে ইস্রায়েল যিহোবার সম্বন্ধে জাতীয় সাক্ষ্য দিয়েছিল?
◻ কিভাবে বাবিলন থেকে ইস্রায়েলের মুক্তি দেখায় যে যিহোবা হলেন একমাত্র সত্য ঈশ্বর?
[১০ পৃষ্ঠার চিত্র]
তার বিশ্বাস এবং বাধ্যতার মাধ্যমে অব্রাহাম যিহোবার ঈশ্বরত্বের প্রতি এক উল্লেখযোগ্য সাক্ষ্য দিয়েছিলেন