ঐশিক সার্বভৌমত্বের জন্য খ্রীষ্টীয় সাক্ষীবৃন্দেরা
“‘তাঁহারই গুণকীর্ত্তন কর,’ যিনি তোমাদিগকে অন্ধকার হইতে আপনার আশ্চর্য্য জ্যোতির মধ্যে আহ্বান করিয়াছেন।”—১ পিতর ২:৯.
১. প্রাক্-খ্রীষ্টীয় সময়ে যিহোবা সম্বন্ধে কোন্ কার্যকারী সাক্ষ্যদান করা হয়েছিল?
প্রাক্-খ্রীষ্টীয় সময়ে, সাক্ষীদের এক দীর্ঘ তালিকা সাহসের সাথে সাক্ষ্য দিয়েছিল যে যিহোবা হলেন একমাত্র সত্য ঈশ্বর। (ইব্রীয় ১১:৪–১২:১) বিশ্বাসে দৃঢ় থেকে, নির্ভয়ে তারা যিহোবার আইন মেনে চলেছিল এবং উপাসনার ক্ষেত্রে আপোশ করতে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা যিহোবার সার্বিক সার্বভৌমত্বের প্রতি এক শক্তিশালী সাক্ষ্য দান করেছিল।—গীতসংহিতা ১৮:২১-২৩; ৪৭:১, ২.
২. (ক) যিহোবার সর্বমহান সাক্ষী কে? (খ) যিহোবার সাক্ষী হিসাবে কারা ইস্রায়েল জাতির স্থান নেয়? কিভাবে আমরা তা জানি?
২ শেষ এবং সর্বমহান প্রাক্-খ্রীষ্টীয় সাক্ষী ছিলেন যোহন বাপ্তাইজক। (মথি ১১:১১) মনোনীত ব্যক্তির আসা সম্বন্ধে ঘোষণা করার বিশেষ সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন এবং যীশুকে তিনি প্রতিজ্ঞাত মশীহ বলে পরিচিত করিয়েছিলেন। (যোহন ১:২৯-৩৪) যীশু হলেন যিহোবার সর্বমহান সাক্ষী, “যিনি বিশ্বাস্য ও সত্যময় সাক্ষী।” (প্রকাশিত বাক্য ৩:১৪) যেহেতু মাংসিক ইস্রায়েল যীশুকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাই যিহোবা তাদের প্রত্যাখ্যান করেন এবং একটি নতুন জাতি, ঈশ্বরের আত্মিক ইস্রায়েলকে তাঁর সাক্ষী হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। (যিশাইয় ৪২:.৮-১২; যোহন ১:১১, ১২; গালাতীয় ৬:১৬) ইস্রায়েল সম্বন্ধে পিতর এক ভবিষ্যদ্বাণী উদ্ধৃত করেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন যে তা ‘ঈশ্বরের ইস্রায়েল,’ খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর প্রতি প্রযোজ্য, যখন তিনি বলেছিলেন: “তোমরা মনোনীত বংশ, রাজকীয় যাজকবর্গ, পবিত্র জাতি, ঈশ্বরের নিজস্ব প্রজাবৃন্দ, যেন তাঁহারই গুণকীর্ত্তন কর, যিনি তোমাদিগকে অন্ধকার হইতে আপনার আশ্চর্য্য জ্যোতির মধ্যে আহ্বান করিয়াছেন।”—১ পিতর ২:৯; যাত্রাপুস্তক ১৯:৫, ৬; যিশাইয় ৪৩:২১; ৬০:২.
৩. ঈশ্বরের ইস্রায়েল এবং “বিস্তর লোক” এর মুখ্য দায়িত্ব কী?
৩ পিতরের বাক্যগুলি দেখায় যে ঈশ্বরের ইস্রায়েলের মুখ্য দায়িত্ব হল যিহোবার মহিমা সম্বন্ধে জনসাধারণে সাক্ষ্য দেওয়া। আমাদের দিনে এই আত্মিক জাতি “বিস্তর লোক” সমূহের সাক্ষীর দ্বারা যুক্ত হয়েছে যারা ঈশ্বরকে জনসাধারণ্যে প্রশংসা করে। যাতে করে সকলে শুনতে পায় তার জন্য তারা উচ্চস্বরে ঘোষণা করে: “পরিত্রাণ আমাদের ঈশ্বরের, যিনি সিংহাসনে বসিয়া আছেন, এবং মেষশাবকের দান।” (প্রকাশিত বাক্য ৭:৯, ১০; যিশাইয় ৬০:৮-১০) কিভাবে ঈশ্বরের ইস্রায়েল এবং তাদের সাথীরা তাদের সাক্ষ্যদান সম্পন্ন করতে পারে? তাদের বিশ্বাস এবং বাধ্যতার দ্বারা।
মিথ্যা সাক্ষীরা
৪. যীশুর দিনের যিহূদীরা কেন মিথ্যা সাক্ষীবৃন্দ ছিল?
৪ বিশ্বাস এবং বাধ্যতার অন্তর্ভুক্ত হল ঈশ্বরীয় নীতিগুলি অনুযায়ী জীবনযাপন করা। যীশু তাঁর দিনের যিহূদী ধর্মীয় নেতাদের সম্বন্ধে যা বলেছিলেন তার থেকে এর গুরুত্ব বোঝা যায়: আইনের শিক্ষক হিসাবে তারা “মোশির আসনে বসে।” তারা এমনকি অবিশ্বাসীদের পরিবর্তন করার জন্য মিশনারিদের পাঠায়। তবুও, যীশু তাদের বলেছিলেন: “একজনকে যিহূদী-ধর্ম্মাবলম্বী করিবার জন্য তোমরা সমুদ্রে ও স্থলে পরিভ্রমণ করিয়া থাক; আর যখন কেহ হয়, তখন তাহাকে তোমাদের অপেক্ষা দ্বিগুণ নারকী করিয়া তুল।” এই ধর্মাবলম্বীরা মিথ্যা সাক্ষীবৃন্দ—উদ্ধত, কপট এবং নির্দয় ছিল। (মথি ২৩:১-১২, ১৫) একবার যীশু কিছু যিহূদীদের বলেছিলেন: “তোমরা আপনাদের পিতা দিয়াবলের, এবং তোমাদের পিতার অভিলাষ সকল পালন করাই তোমাদের ইচ্ছা।” ঈশ্বরের মনোনীত জাতির সদস্যদের প্রতি তিনি এইরূপ কথা কেন বলেছিলেন? কারণ তারা যিহোবার সর্বমহান সাক্ষীর কথার প্রতি সাড়া দেয়নি বলে।—যোহন ৮:৪১, ৪৪, ৪৭.
৫. আমরা কিভাবে জানি যে ঈশ্বর সম্বন্ধে খ্রীষ্টীয়জগৎ মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করেছে?
৫ একইভাবে, যীশুর সময়ের পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে, খ্রীষ্টীয়জগৎ দাবি করেছে যে তারা হল তাঁর শিষ্য। কিন্তু, তারা ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন করেনি এবং তাই তারা যীশুর দ্বারা স্বীকৃতি পাইনি। (মথি ৭:২১-২৩; ১ করিন্থীয় ১৩:১-৩) খ্রীষ্টীয়জগৎ মিশনারিদের পাঠিয়েছে এবং এদের মধ্যে অনেকে নিঃসন্দেহে ছলনাহীন ছিল। তবুও, তারা এক ত্রিত্বের ঈশ্বরকে উপাসনা করতে শিখিয়েছে যে পাপীদের নরকাগ্নিতে জ্বালায় এবং তাদের মধ্যে ধর্মান্তরিতেরা খ্রীষ্টান হওয়ার খুব কমই প্রমাণ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকান দেশ রুয়ান্ডাতে রোমান ক্যাথলিক মিশনারিদের জন্য এটি একটি ফলপ্রদ স্থান। তবুও, রুয়ান্ডার ক্যাথলিকেরা সেই দেশের সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক যুদ্ধে পূর্ণ হৃদয়ে যোগদান করেছে। মিশনারিদের ক্ষেত্রের ফল থেকে বোঝা যায় যে তারা খ্রীষ্টীয়জগতের কাছ থেকে প্রকৃত খ্রীষ্টীয় সাক্ষ্য পায়নি।—মথি ৭:১৫-২০.
ঈশ্বরীয় নীতি অনুযায়ী জীবনযাপন করা
৬. কোন্ কোন্ দিক দিয়ে সঠিক আচরণ সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক?
৬ যারা খ্রীষ্টান বলে দাবি করে তাদের কাছ থেকে মন্দ আচরণের জন্য ‘সত্যের পথের’ উপর নিন্দা নিয়ে আসে। (২ পিতর ২:২) একজন সত্য খ্রীষ্টান ঈশ্বরীয় নীতি অনুযায়ী জীবনযাপন করে। সে চুরি করে না, মিথ্যা বলে না, ঠকায় না অথবা অনৈতিকতা করে না। (রোমীয় ২:২২) অবশ্যই সে তার প্রতিবেশীকে হত্যা করে না। খ্রীষ্টীয় স্বামীরা তাদের পরিবারকে প্রেম সহকারে তত্ত্বাবধান করে। স্ত্রীরা সেই তত্ত্বাবধানকে সম্মানের সাথে সমর্থন করে। ছেলেমেয়েরা পিতামাতাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পায় এবং তার ফলে দায়িত্বশীল খ্রীষ্টীয় ব্যক্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। (ইফিষীয় ৫:২১–৬:৪) সত্য, আমরা সকলেই অসিদ্ধ এবং ভুল করে থাকি। কিন্তু এক সত্য খ্রীষ্টান বাইবেলের মানকে শ্রদ্ধা করে এবং তা প্রয়োগ করতে প্রকৃত চেষ্টা করে। অন্যেরা এটি লক্ষ্য করে এবং তা একটি উত্তম সাক্ষ্য প্রদান করে। কয়েক সময় যারা পূর্বে সত্যকে বিরোধিতা করত তারা কোন খ্রীষ্টানের সঠিক আচরণ দেখে আর এর ফলে তাদের জয়লাভ করা গেছে।—১ পিতর ২:১২, ১৫; ৩:১.
৭. খ্রীষ্টানদের একে অপরকে প্রেম করা কত গুরুত্বপূর্ণ?
৭ যীশু, খ্রীষ্টীয় আচরণের এক গুরুত্বপূর্ণ দিকটি দেখান যখন তিনি বলেছিলেন: “তোমার যদি আপনাদের মধ্যে পরস্পর প্রেম রাখ, তবে তাহাতেই সকলে জানিবে যে, তোমরা আমার শিষ্য।” (যোহন ১৩:৩৫) শয়তানের জগতের বৈশিষ্ট্য হল, “অধার্ম্মিকতা, দুষ্টতা, লোভ ও হিংসাতে পরিপূরিত, মাৎসর্য্য, বধ, বিবাদ, ছল ও দুর্বৃত্তিতে পূর্ণ; কর্ণেজপ, পরীবাদক, ঈশ্বর-ঘৃণিত, দুর্বিনীত, উদ্ধত, আত্মশ্লাঘী, মন্দ বিষয়ের উৎপাদক, পিতামাতার অনাজ্ঞাবহ।” (রোমীয় ১:২৯, ৩০) এইধরনের একটি পরিবেশে, পৃথিবীব্যাপী একটি সংগঠন যার বৈশিষ্ট্য হল প্রেম তা ঈশ্বরের আত্মা যে কার্যকারী তার এক শক্তিশালী প্রমাণ—এক কার্যকারী সাক্ষী। যিহোবার সাক্ষীরা হল এইধরনের একটি সংগঠন।—১ পিতর ২:১৭.
সাক্ষীরা হল বাইবেলের ছাত্র
৮, ৯. (ক) কিভাবে গীতরচক ঈশ্বরের নিয়ম পড়া এবং তার উপর ধ্যান করার দ্বারা শক্তি লাভ করেছিলেন? (খ) কোন্ কোন্ উপায়ে বাইবেল অধ্যয়ন এবং ধ্যান করা সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের শক্তি প্রদান করতে পারে?
৮ উত্তম সাক্ষ্য দান করাতে সাফল্য লাভ করার জন্য, একজন খ্রীষ্টানের অবশ্যই যিহোবার ধার্মিক নীতিগুলি জানা এবং প্রেম করা উচিত এবং প্রকৃত অর্থে এই জগতের কলুষতাকে ঘৃণা করা উচিত। (গীতসংহিতা ৯৭:১০) জগৎ নিজের তার চিন্তাধারা তুলে ধরতে ক্ষমতাসম্পন্ন এবং এর মনোভাব প্রতিরোধ করা কষ্টকর হতে পারে। (ইফিষীয় ২:১-৩; ১ যোহন ২:১৫, ১৬) সঠিক মানসিক মনোভাব বজায় রাখতে কী আমাদের সাহায্য করতে পারে? নিয়মিত এবং অর্থপূর্ণ বাইবেল অধ্যয়ন। গীতসংহিতা ১১৯ এর লেখক যিহোবার নিয়মের প্রতি তার প্রেম অনেকবার উল্লেখ করেন। তিনি তা পড়তেন এবং “সমস্ত দিন” অনবরতভাবে তার উপর ধ্যান করতেন। (গীতসংহিতা ১১৯:৯২, ৯৩, ৯৭-১০৫) এর ফলে তিনি লিখতে পেরেছিলেন: “আমি মিথ্যাকে দ্বেষ করি, ঘৃণা করি, তোমার ব্যবস্থাই ভালবাসি।” এছাড়াও, তার প্রগাঢ় প্রেম তাকে কাজ করতে প্ররোচিত করেছিল। তিনি বলেন: “আমি দিনে সাত বার তোমার স্তব করি, তোমার ধর্ম্মময় শাসনকলাপের জন্য।”—গীতসংহিতা ১১৯:১৬৩, ১৬৪.
৯ ঠিক একইভাবে, আমাদের নিয়মিত ঈশ্বরের বাক্যের অধ্যয়ন এবং ধ্যান করা আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ এবং ‘তাঁকে স্তব করতে’ প্ররোচিত করবে—যিহোবা সম্বন্ধে সাক্ষ্যদান—প্রায়ই, এমনকি “দিনে সাত বার” পর্যন্ত। (রোমীয় ১০:১০) এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে, প্রথম গীতসংহিতার লেখক বলেন যে, যে ব্যক্তি নিয়মিতভাবে যিহোবার বাক্যগুলির উপর ধ্যান করে সে, “জলস্রোতের তীরে রোপিত বৃক্ষের সদৃশ হইবে, যাহা যথাসময়ে ফল দেয়, যাহার পত্র ম্লান হয় না; আর সে যাহা কিছু করে, তাহাতেই কৃতকার্য্য হয়।” (গীতসংহিতা ১:৩) প্রেরিত পৌলও ঈশ্বরের বাক্যের শক্তি তুলে ধরেন যখন তিনি লিখেছিলেন: “ঈশ্বর-নিশ্বসিত প্রত্যেক শাস্ত্রলিপি আবার শিক্ষার, অনুযোগের, সংশোধনের, ধার্ম্মিকতা সম্বন্ধীয় শাসনের নিমিত্ত উপকারী, যেন ঈশ্বরের লোক পরিপক্ব, সমস্ত সৎকর্ম্মের জন্য সুসজ্জীভূত হয়।”—২ তীমথিয় ৩:১৬, ১৭.
১০. এই শেষকালে যিহোবার লোকেদের সম্বন্ধে কী প্রতীয়মান হচ্ছে?
১০ এই বিংশ শতাব্দীতে দ্রুতগতিতে সত্য উপাসকদের বৃদ্ধি প্রমাণ দেয় যে যিহোবার আশীর্বাদ রয়েছে। নিঃসন্দেহে, দল হিসাবে, ঐশিক সার্বভৌমত্বের প্রতি এই আধুনিক দিনের সাক্ষীবৃন্দেরা তাদের হৃদয়ে যিহোবার নিয়মের প্রতি প্রেম গড়ে তুলেছে। গীতরচকের মত, তারাও তাঁর নিয়মের প্রতি বাধ্য হয় এবং বিশ্বস্ততার সাথে “দিবারাত্র” যিহোবার মহিমা সম্বন্ধে সাক্ষ্য দেয়।—প্রকাশিত বাক্য ৭:১৫.
যিহোবার শক্তিশালী কাজগুলি
১১, ১২. যীশু এবং তাঁর অনুগামীদের দ্বারা সম্পাদিত অলৌকিক কাজগুলি কী সম্পাদন করে?
১১ প্রথম শতাব্দীতে, পবিত্র আত্মা বিশ্বস্ত খ্রীষ্টীয় সাক্ষীদের অলৌকিক কাজ সম্পন্ন করতে শক্তি দিয়েছিল যা দৃঢ় প্রমাণ দেয় যে তাদের সাক্ষ্যদান সত্য ছিল। যখন যোহন বাপ্তাইজক জেলে ছিলেন, তিনি শিষ্যদের পাঠিয়েছিলেন যীশুকে এই জিজ্ঞাসা করার জন্য: “যাঁহার আগমন হইবে, সেই ব্যক্তি কি আপনি? না আমরা অন্যের অপেক্ষায় থাকিব?” যীশু হ্যাঁ কিংবা না বলেননি। পরিবর্তে, তিনি বলেছিলেন: “তোমরা যাও, যাহা যাহা শুনিতেছ ও দেখিতেছ, তাহার সংবাদ যোহনকে দেও; অন্ধেরা দেখিতে পাইতেছে ও খঞ্জেরা চলিতেছে, কুষ্ঠীরা শুচীকৃত হইতেছে ও বধিরেরা শুনিতেছে, এবং মৃতেরা উত্থাপিত হইতেছে ও দরিদ্রদের নিকটে সুসমাচার প্রচারিত হইতেছে; আর ধন্য সেই ব্যক্তি, যে আমাতে বিঘ্নের কারণ না পায়।” (মথি ১১:৩-৬) এই শক্তিশালী কাজগুলি যোহনের কাছে সাক্ষ্যস্বরূপ ছিল যে যীশুই ছিলেন প্রকৃতই সেই ব্যক্তি “যাঁহার আগমন হইবে।”—প্রেরিত ২:২২.
১২ ঠিক একইভাবে, যীশুর কিছু অনুগামীরা অসুস্থদের সুস্থ করেছিলেন এবং এমনকি মৃতদেরও উত্থাপন করেছিলেন। (প্রেরিত ৫:১৫, ১৬; ২০:৯-১২) তাদের পক্ষে এই অলৌকিক কাজগুলি স্বয়ং ঈশ্বর থেকে সাক্ষ্যস্বরূপ ছিল। (ইব্রীয় ২:৪) আর এই কাজগুলি যিহোবা মহানশক্তি ক্ষমতা প্রদর্শন করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, এটি সত্য যে শয়তান, “জগতের অধিপতি” তার উপায় রয়েছে মৃত্যু আনার। (যোহন ১৪:৩০; ইব্রীয় ২:১৪) কিন্তু পিতর যখন বিশ্বস্ত নারী দর্কাকে মৃত্যু থেকে উত্থাপন করেছিলেন, তখন তিনি শুধুমাত্র যিহোবার শক্তির দ্বারা তা করতে পেরেছিলেন, কারণ শুধু তিনিই জীবন পুনরায় ফিরাতে পারেন।—গীতসংহিতা ১৬:১০; ৩৬:৯; প্রেরিত ২:২৫-২৭; ৯:৩৬-৪৩.
১৩. (ক) কোন্ দিক দিয়ে অলৌকিক কাজগুলি এখনও যিহোবার শক্তির প্রতি সাক্ষ্য দান করে? (খ) যিহোবার ঈশ্বরত্ব প্রমাণ করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা কিভাবে মুখ্য ভূমিকা পালন করে?
১৩ আজকে, সেই অলৌকিক কাজগুলি আর ঘটে না। তাদের উদ্দেশ্য সম্পন্ন হয়ে গেছে। (১ করিন্থীয় ১৩:৮) তবুও, প্রত্যক্ষদর্শী দ্বারা সাক্ষ্যদান প্রাপ্ত এগুলি বাইবেলে লিপিবদ্ধ করা রয়েছে। যখন খ্রীষ্টানেরা আজকে এই ঐতিহাসিক বিবরণগুলির প্রতি মনোযোগ আনে, এই কাজগুলি যিহোবা সম্বন্ধে এক কার্যকারী সাক্ষ্যদান প্রদান করে। (১ করিন্থীয় ১৫:৩-৬) এছাড়াও, যিশাইয়ের দিনে, যিহোবা নির্দেশ করেছিলেন যে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী হল এক উল্লেখযোগ্য প্রমাণ যা দেখায় যে তিনি হলেন সত্য ঈশ্বর। (যিশাইয় ৪৬:৮-১১) অনেক ঐশিক অনুপ্রাণিত বাইবেল ভবিষ্যদ্বাণী আজকে পরিপূর্ণ হচ্ছে—কয়েকটি খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর উপরে। (যিশাইয় ৬০:৮-১০; দানিয়েল ১২:৬-১২; মালাখি ৩:১৭, ১৮; মথি ২৪:৯; প্রকাশিত বাক্য ১১:১-১৩) “শেষকালে” আমরা বাস করছি তা নির্দেশ করার সাথে সাথে, এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলির পরিপূর্ণতা যিহোবাকে একমাত্র সত্য ঈশ্বর হিসাবে মহিমান্বিত করে।—২ তীমথিয় ৩:১.
১৪. যিহোবা যে সার্বভৌম প্রভু কিভাবে যিহোবার সাক্ষীদের বর্তমান দিনের ইতিহাস হল তার এক শক্তিশালী সাক্ষ্য?
১৪ অবশেষে, যিহোবা এখনও তাঁর লোকেদের জন্য মহান কার্যগুলি, উত্তম জিনিস করেন। বাইবেলের সত্যের উপর বৃদ্ধিরত আলো যিহোবার আত্মার দ্বারা পরিচালিত। (গীতসংহিতা ৮৬:১০; প্রকাশিত বাক্য ৪:৫, ৬) জগদ্ব্যাপী উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির যে রিপোর্ট পাওয়া যায় তা প্রমাণ দেয় যে যিহোবা ‘যথাকালে ইহা সম্পন্ন করিতে সত্বর হয়েছেন।’ (যিশাইয় ৬০:২২) সমগ্র শেষকালে যখন দেশের পর দেশে কঠোর নির্যাতন শুরু হয়, যিহোবার লোকেদের পক্ষে সাহসের সাথে ধৈর্য রাখা সম্ভব হয়েছে পবিত্র আত্মার শক্তিশালী সহায়তার দ্বারা। (গীতসংহিতা ১৮:১, ২, ১৭, ১৮; ২ করিন্থীয় ১:৮-১০) হ্যাঁ, যিহোবার সাক্ষীদের আধুনিক দিনের ইতিহাস স্বয়ং একটি শক্তিশালী সাক্ষ্য যে যিহোবা হলেন সার্বভৌম প্রভু।—সখরিয় ৪:৬.
সুসমাচার প্রচারিত হবে
১৫. খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর দ্বারা কোন্ ব্যাপক সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল?
১৫ যিহোবা ইস্রায়েলকে জাতির সম্মুখে সাক্ষী হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। (যিশাইয় ৪৩:১০) কিন্তু, শুধু কয়েকজন ইস্রায়েলীয়রা যেতে এবং ন-ইস্রায়েলীয়দের কাছে প্রচার করতে ঐশিকভাবে আদেশ পেয়েছিল এবং সাধারণত তা যিহোবার ন্যায়বিচার ঘোষণা করার জন্য করা হয়েছিল। (যিরমিয় ১:৫; যোনা ১:১, ২) তথাপি, ইব্রীয় শাস্ত্রের ভবিষ্যদ্বাণীগুলি ইঙ্গিত করে যে একদিন তিনি জাতিগণের প্রতি ব্যাপকভাবে মনোযোগ দেবেন এবং তিনি তা করেছেন আত্মিক ইস্রায়েলের মাধ্যমে। (যিশাইয় ২:২-৪; ৬২:২) স্বর্গারোহণ করার পূর্বে, যীশু তাঁর অনুগামীদের আদেশ দিয়েছিলেন: “তোমরা গিয়া সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর।” (মথি ২৮:১৯) যদিও যীশু “ইস্রায়েল কুলের হারান মেষ” এর প্রতি মনোযোগ দিয়েছিলেন, তাঁর অনুগামীদের “সমুদয় জাতিকে,” এমনকি “পৃথিবীর প্রান্ত পর্য্যন্ত” পাঠানো হয়েছিল। (মথি ১৫:২৪; প্রেরিত ১:৮) খ্রীষ্টীয় সাক্ষ্যদান সমুদয় মানবজাতির কাছে শোনাবার কথা ছিল।
১৬. প্রথম শতাব্দীর খ্রীষ্টীয় মণ্ডলী কোন্ কাজ পরিপূর্ণ করেছিল এবং তা কত ব্যাপক ছিল?
১৬ পৌল দেখিয়েছিলেন যে তিনি তা ভালভাবে বুঝেছিলেন। সা.শ. ৬১ সালের মধ্যে, তিনি বলতে পেরেছিলেন যে সুসমাচার “সমস্ত জগতেও ফলবান্ ও বর্দ্ধিষ্ণু হইতেছে।” সুসমাচার শুধু একটি জাতি অথবা ধর্মাবলম্বী যেমন যারা “দূতগণের পূজায়” রত ছিল তাদের কাছেই সীমিত ছিল না। বরং, তা খোলাখুলিভাবে “আকাশমণ্ডলের অধঃস্থিত সমস্ত সৃষ্টির কাছে প্রচারিত হইয়াছে।” (কলসীয় ১:৬, ২৩; ২:১৩, ১৪, ১৬-১৮) এইভাবে, প্রথম শতাব্দীর ঈশ্বরের ইস্রায়েল তাদের কাজ “‘তাঁহারই গুণকীর্ত্তন কর,’ যিনি [তাহাদিগকে] অন্ধকার হইতে আপনার আশ্চর্য্য জ্যোতির মধ্যে আহ্বান করিয়াছেন,” তা পূর্ণ করে।
১৭. কিভাবে মথি ২৪:১৪ পদ বড় আকারে পরিপূর্ণ হয়ে চলেছে?
১৭ তবুও, সেই প্রথম শতাব্দীর প্রচার কাজ শেষকালে যা পূর্ণ হবে এটি ছিল তার একটা পূর্বআস্বাদমাত্র। আমাদের সময়ের বিষয়ে চিন্তা করে, যীশু বলেছিলেন: “আর সর্ব্ব জাতির কাছে সাক্ষ্য দিবার নিমিত্ত রাজ্যের এই সুসমাচার সমুদয় জগতে প্রচার করা যাইবে; আর তখন শেষ উপস্থিত হইবে।” (মথি ২৪:১৪; মার্ক ১৩:১০) এই ভবিষ্যদ্বাণী কি পূর্ণ হয়েছে? হ্যাঁ, তা হয়েছে। ১৯১৯ সালে ছোট আকারে শুরু হওয়ার পর থেকে, সুসমাচার প্রচার এখন ২৩০টির অধিক দেশেতে ছড়িয়ে পড়েছে। সাক্ষ্যদান শীতল উত্তরে এবং গরম গ্রীষ্মমন্ডলে শোনা যায়। বৃহৎ মহাদেশ এবং বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলিতে যাওয়া হয় যাতে করে সেখানকার বাসিন্দারা সাক্ষ্যদান পেতে পারে। এমনকি বৈপ্লবিক আন্দোলনের মধ্যে, যেমন বসনিয়া এবং হেরজেগোবিনায় যুদ্ধের মধ্যে সুসমাচার প্রচারিত হচ্ছে। প্রথম শতাব্দীর মত, সাক্ষ্যদান ‘সমস্ত জগতে’ ফল উৎপাদন করছে। সুসমাচার খোলাখুলিভাবে “আকাশমণ্ডলের অধঃস্থিত সমস্ত সৃষ্টির কাছে” ঘোষণা করা হচ্ছে। এর ফল কী হয়েছে? প্রথমত, ঈশ্বরের ইস্রায়েলের অবশিষ্টাংশদের “সমুদয় বংশ ও ভাষা ও জাতি ও লোকবৃন্দ হইতে” একত্রিত করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, “প্রত্যক জাতির ও বংশের ও প্রজাবৃন্দের ও ভাষার” মধ্য থেকে লক্ষ লক্ষ ‘বিস্তর লোককে’ নিয়ে আসা হচ্ছে। (প্রকাশিত বাক্য ৫:৯; ৭:৯) মথি ২৪:১৪ পদ খুব বৃহদাকারে পরিপূর্ণতা লাভ করে চলেছে।
১৮. কিছু বিষয় কী যা জগদ্ব্যাপী সুসমাচার প্রচার করার দ্বারা সম্পাদিত হচ্ছে?
১৮ যীশুর রাজকীয় উপস্থিতি যে শুরু হয়ে গেছে তা জগদ্ব্যাপী সুসমাচার প্রচার আমাদের প্রমাণ করতে সাহায্য করে। (মথি ২৪:৩) এছাড়াও, এটি হল মুখ্য উপায় যার দ্বারা “পৃথিবীর শস্য” কাটা হচ্ছে, কারণ এটি যিহোবার রাজ্য মানবজাতির একমাত্র সত্য আশা হিসাবে লোকেদের তার দিকে পরিচালিত করে। (প্রকাশিত বাক্য ১৪:১৫, ১৬) যেহেতু শুধুমাত্র সত্য খ্রীষ্টানেরা সুসমাচার প্রচারে ভাগ নিচ্ছে, তাই এই কাজটি সত্য খ্রীষ্টান ও মিথ্যা খ্রীষ্টানের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। (মালাখি ৩:১৮) এইভাবে, এর পরিণামে পরিত্রাণ হয় উভয়ের জন্য যারা প্রচার করে ও যারা তাতে সাড়া দেয়। (১ তীমথিয় ৪:১৬) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে, সুসমাচার প্রচার যিহোবা ঈশ্বরের প্রতি প্রশংসা ও সম্মান নিয়ে আসে, যিনি তা করতে আদেশ দেন, যিনি তাদের সমর্থন করেন যারা তা করে এবং যিনি এটিকে ফলপ্রসূ করেন।—২ করিন্থীয় ৪:৭.
১৯. নতুন পরিচর্যা বছরে যাওয়ার সাথে সাথে সকল খ্রীষ্টানদের কী সঙ্কল্পবদ্ধ করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে?
১৯ এটি অবাক হওয়ার বিষয় নয় প্রেরিত পৌল প্ররোচিত হয়েছিলেন এই বলতে যে: “ধিক্ আমাকে, যদি আমি সুসমাচার প্রচার না করি।” (১ করিন্থীয় ৯:১৬) খ্রীষ্টানেরা আজকে একই মনে করে। এটি একটি মহান সুযোগ এবং এক মহান দায়িত্ব “ঈশ্বরের সহকর্মী” হয়ে এই অন্ধকারাচ্ছান্ন জগতে সত্যের জ্যোতি প্রকাশ করা। (১ করিন্থীয় ৩:৯; যিশাইয় ৬০:২, ৩) ছোট আকারে যে কাজ ১৯১৯ সালে শুরু হয়েছিল তা আজকে বৃহৎ আকারে পৌঁছেছে। প্রায় ৫০ লক্ষ খ্রীষ্টানেরা ঐশিক সার্বভৌমত্বের পক্ষে সাক্ষ্যদান করছে, যাতে করে অন্যদের কাছে পরিত্রাণের বার্তা পৌঁছাতে পারে তার জন্য তারা বছরে ১০০ কোটির বেশি ঘন্টা ব্যয় করছে। যিহোবার নামকে মহিমান্বিত করার এই কাজে অংশ থাকা কতই আনন্দের বিষয়! যেমন আমরা ১৯৯৬ সালের পরিচর্যা বছরে আসছি, আসুন আমরা শিথিল না হওয়ার পরিকল্পনা নিই। পরিবর্তে, তীমথিয়ের প্রতি পৌলের বাক্যগুলি আগের থেকে আরও বেশি করে আমরা মনোযোগ দেব: “বাক্য প্রচার কর . . . অনুরক্ত হও।” (২ তীমথিয় ৪:২) যখন আমরা তা করে চলব, আমরা পূর্ণ হৃদয়ে প্রার্থনা করি যে যিহোবা আমাদের প্রচেষ্টাকে আশীর্বাদ করে চলবেন।
আপনার কি মনে আছে?
◻ ইস্রায়েলের স্থানে কারা জাতিগণের কাছে যিহোবার “সাক্ষী” হিসাবে আসে?
◻ সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে কিভাবে খ্রীষ্টীয় আচরণ সাহায্য করে?
◻ খ্রীষ্টীনদের জন্য বাইবেল অধ্যয়ন এবং তার উপর ধ্যান করা কেন অত্যাবশ্যকীয়?
◻ বর্তমান দিনের যিহোবার সাক্ষীদের ইতিহাস কিভাবে প্রমাণ দেয় যে যিহোবা হলেন সত্য ঈশ্বর?
◻ সুসমাচার প্রচার করার দ্বারা কী সম্পাদিত হয়?
[Pictures on page 15]
বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার চাইতে, এখন সুসমাচার “আকাশমণ্ডলের অধঃস্থিত সমস্ত সৃষ্টির কাছে” ঘোষিত হচ্ছে