ওয়াচটাওয়ার অনলাইন লাইব্রেরি
ওয়াচটাওয়ার
অনলাইন লাইব্রেরি
বাংলা
  • বাইবেল
  • প্রকাশনাদি
  • সভা
  • w৯৫ ২/১ পৃষ্ঠা ২০-২৫
  • “আমরা এই পরিচর্য্যা-পদ প্রাপ্ত হওয়ায় . . . নিরুৎসাহিত হই না”

এই বাছাইয়ের সঙ্গে কোনো ভিডিও প্রাপ্তিসাধ্য নেই।

দুঃখিত, ভিডিওটা চালানো সম্বভব হচ্ছে না।

  • “আমরা এই পরিচর্য্যা-পদ প্রাপ্ত হওয়ায় . . . নিরুৎসাহিত হই না”
  • ১৯৯৫ প্রহরীদুর্গ যিহোবার রাজ্য ঘোষণা করে
  • উপশিরোনাম
  • অনুরূপ বিষয়বস্ত‌ু
  • এক স্পেনীয় কনে ও স্পেনীয় দায়িত্ব
  • বিতাড়ন
  • নিরুৎসাহের বিরুদ্ধে লড়াই
  • আমাদের একটি মহামূল্যবান মুক্তা দেওয়া হয়
    ১৯৯৫ প্রহরীদুর্গ যিহোবার রাজ্য ঘোষণা করে
  • যিহোবার সেবায় বিস্ময়ে ভরা এক জীবন
    ২০০১ প্রহরীদুর্গ যিহোবার রাজ্য ঘোষণা করে
  • ৮০ বছর বয়সে কার্যভারের পরিবর্তন
    ১৯৯৮ প্রহরীদুর্গ যিহোবার রাজ্য ঘোষণা করে
১৯৯৫ প্রহরীদুর্গ যিহোবার রাজ্য ঘোষণা করে
w৯৫ ২/১ পৃষ্ঠা ২০-২৫

“আমরা এই পরিচর্য্যা-পদ প্রাপ্ত হওয়ায় . . . নিরুৎসাহিত হই না”

রোনাল্ড টেলর দ্বারা কথিত

১৯৬৩ সালের গ্রীষ্মকালে আমি উপলব্ধি করি যে আমার জীবন বিপন্ন। সমুদ্রতীরে জলের মধ্য দিয়ে হাঁটার সময়ে আমি এক গর্তে পা দিয়ে ফেলি ও গভীর জলে তলিয়ে যেতে আরম্ভ করি। সমুদ্রতীর থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে আমি ডুবে যাচ্ছিলাম কারণ আমি তখন সাঁতার জানতাম না। ইতিমধ্যেই তিনবার আমি ডুবে হাবুডুবু খেয়ে বেশ কয়েক ঢোক সমুদ্রের জল পান করে ফেলেছিলাম, যখন আমার এক বন্ধু এই দুর্দশা দেখে আমাকে টেনে পাড়ে তুলে আনে। খুব তাড়াতাড়ি তারা আমার ফুসফুসে কৃত্তিম উপায়ে শ্বাস দেওয়ার প্রচেষ্টা করায় আমি বেঁচে যাই।

এটা প্রথমবার নয় যে আমি হাল না ছেড়ে দেওয়ার গুরুত্বকে উপলব্ধি করছি—এমনকি যদিও পরিস্থিতি দেখে নিরাশ মনে হয়। খুব ছোটবেলা থেকে আমাকে আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য লড়াই করতে হয়।

সেটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলি, যে সময়ে আমি প্রথম খ্রীষ্টীয় সত্যের সান্নিধ্যে আসি। আমি ছিলাম সেই সমস্ত হাজার হাজার শিশুদের মধ্যে একজন, যাদের লন্ডনের বিপজ্জনক স্থান থেকে বোমা বর্ষণের ভয়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। যেহেতু আমার বয়স ছিল তখন মাত্র ১২ বছর, সেজন্য সে যুদ্ধ আমার কাছে বিশেষ কোন অর্থ রাখেনি; সেটা আমার কাছে একটা উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতার মত ছিল।

দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের ওয়েস্টন-সুপার-মার থেকে একটি বয়স্ক দম্পতি আমার দেখাশোনা করেছিল। সেই দম্পতির গৃহে পৌঁছানোর পর থেকেই কিছু অগ্রগামী পরিচারকেরা আমাদের দেখতে আসতে শুরু করে। এরা ছিল সেই হারগ্রেভ পরিবার; তাদের চারজনই—রেজ্‌, ম্যাব্‌স, প্যামেলা এবং ভ্যালেরি—ছিল বিশেষ অগ্রগামী। আমার পালক পিতামাতারা সত্যকে গ্রহণ করেছিল এবং ঈশ্বরের বীণা (ইংরাজি) বইটি পড়ার পরেই আমিও যিহোবাকে সেবা করার সিদ্ধান্ত নিই। ঠিক ছয় সপ্তাহ পরেই আমাকে প্রচার কাজের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

আমার এখনও ক্ষেত্রের পরিচর্যার প্রথম দিনটি মনে আছে। কোন প্রস্তুতি ছাড়াই আমাকে কয়েকটি বুকলেট দেওয়া হয় ও বলা হয়: “রাস্তার ওই ধার ধরে কাজ করে যাও”। আর এইভাবেই আমি প্রচারের প্রথম দিনটি কাটাই। সেসময়ে আমরা প্রায়ই ধ্বনিগ্রাহী-যন্ত্রের মাধ্যমে প্রচার করতাম, যার মধ্যে থাকতো শক্তিশালী বার্তা। আমার সবচেয়ে সুখের মুহূর্তগুলি ছিল সেটাই যখন ধ্বনিগ্রাহী যন্ত্রটিকে নিয়ে ঘরে ঘরে যেতাম এবং রেকর্ড করা বক্তৃতাগুলি শোনাতাম। এই কাজের সুযোগ পাওয়ার জন্য আমি নিজেকে খুব ধন্য মনে করতাম।

স্কুলেতে আমি অনেক সাক্ষ্যদান করেছিলাম এবং আমার স্মরণে আছে যে প্রধান শিক্ষকের কাছে আমি বাইবেল বিষয়ক একগুচ্ছ বই অর্পণ করেছিলাম। ১৩ বছর বয়সে আমি বাথ নামক স্থানে একটি সম্মেলনে বাপ্তিস্ম নিই। যুদ্ধকালীন আর একটি সম্মেলনের কথা আমি কখনও ভুলবো না যা ল্যাঙ্কেষ্টারে ১৯৪১ সালে ডি মন্টফর্ট হলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শিশুসন্তান (ইংরাজি) নামে বইটির আমার কপিটি নেওয়ার জন্য মঞ্চে গিয়েছিলাম যেটিতে ভাই রাদারফোর্ড থেকে ব্যক্তিগত এক বার্তা ছিল, যিনি ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির তৎকালীন সভাপতি ছিলেন। উপস্থিত সকল যুবকের জন্য তার চাঞ্চল্যকর বক্তৃতা যিহোবাকে চিরকাল সেবা করার ইচ্ছা আমার মধ্যে পুনরায় জাগিয়ে তুলেছিল।

এইভাবে আমি আমার পালক পিতামাতার সঙ্গে সুখময় দুবছর অতিবাহিত করি সত্যে বড় হয়ে ওঠার জন্য। কিন্তু ১৪ বছর বয়সে আমাকে লন্ডনে ফিরে যেতে এবং জীবিকার্জনের জন্য কাজ করতে হয়। যদিও আমি আমার পরিবারের সঙ্গে পুনরায় একত্রিত হই, কিন্তু আধ্যাত্মিক বিষয়েও আমাকে এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়, কারণ এই গৃহে আমার বিশ্বাসের সহভাগী কেউ ছিল না। শীঘ্রই যিহোবা আমার প্রয়োজনীয় সাহায্য যোগান। লন্ডনে পৌঁছাবার ঠিক তিন সপ্তাহ পরে এক ভাই আমার বাড়িতে আসেন ও আমার বাবার অনুমতি নেন আমাকে স্থানীয় কিংডম হলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এই ভাইটি ছিলেন জন বার্‌ যিনি এখন যিহোবার সাক্ষীদের পরিচালক গোষ্ঠীর একজন সদস্য। সেই কষ্টকর কৈশরের বছরগুলিতে তিনি ছিলেন আমার একজন আধ্যাত্মিক “পিতা”।—মথি ১৯:২৯.

আমি প্যাডিংটন মণ্ডলীতে যোগদান করতে শুরু করি, যার অবস্থান ছিল ক্রাভেন টেরেস অঞ্চলে এবং লন্ডনের বেথেল গৃহের সীমানার মধ্যে। যেহেতু আধ্যাত্মিকভাবে আমি ছিলাম অনাথ, “পপ্‌” হামফ্রেস নামে এক বয়স্ক অভিষিক্ত ভাইকে আমার প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাস্তবিকই এটা ছিল আমার কাছে এক বিশেষ আশীর্বাদস্বরূপ, কারণ সেই মণ্ডলীর সঙ্গে যুক্ত অনেক অভিষিক্ত ভাইবোনেদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমাদের মধ্যে যাদের পার্থিব আশা ছিল—যাদের বলা হত যিহোনাদব—তাদের সদস্য সংখ্যা ছিল খুবই অল্প। আসলে, আমি মণ্ডলীর যে বুক স্টাডি দলে যোগ দিতাম, সেখানে একমাত্র আমিই ছিলাম যিহোনাদব শ্রেণীভুক্ত। যদিও আমার সমবয়সীদের সঙ্গে আমার খুব একটা মেলামেশা ছিল না, কিন্তু বয়স্ক পরিপক্ব ভাইদের সঙ্গে মূল্যবান সহচর্য আমাকে অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় শিখিয়েছিল। যে সব বিষয় শিখেছিলাম, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে যিহোবার সেবাকে আমরা যেন কখনও ত্যাগ না করি।

তখনকার দিনে, আমরা সপ্তাহশেষের দিনগুলি সর্বান্তকরণে প্রচার কাজে ব্যস্ত থাকতাম। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল “সাউন্ড সরঞ্জামের গাড়ি”-র যত্ন নিতে, যেটা ছিল তিন চাকাবিশিষ্ট একটি সাইকেল, যাতে একটি গাড়ির ব্যাটারি ও সাউন্ডের সরঞ্জামসকল থাকতো। প্রতি শনিবারে আমি এই গাড়িটি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম এবং রাস্তার মোড়গুলিতে রেখে কিছু গান বাজাতাম ও তারপরে ভাই রাদারফোর্ডের বক্তৃতাগুলির একটি শোনাতাম। এছাড়া শনিবারগুলি ছিল রাস্তায় সমিতির তৈরি ব্যাগেতে করে পত্রিকাদিবসে যোগদান করার জন্য। রবিবার ঘরে ঘরে প্রচারের কাজে ব্যস্ত থাকতাম এবং বুকলেট ও বাঁধানো বইগুলি ব্যবহার করতাম।

উদ্যোগী প্রাচীন ভায়েদের সংসর্গ আমার অন্তরে অগ্রগামীর কাজ করার প্রেরণাকে উদ্দীপিত করে তোলে। জেলা সম্মেলনগুলিতে যখন অগ্রগামীদের বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়া হত, তখন তা শুনে আমি আত্মিকভাবে বল পেতাম। একটি সম্মেলন যা আমার জীবনের উপর প্রগাঢ় প্রভাব ফেলেছিল, তা হল ১৯৪৭ সালে আর্ল কোর্ট, লন্ডনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনটি। তার দুমাস পরে আমি অগ্রগামীর কাজের তালিকায় নাম লেখাই এবং তখন থেকে আমি বরাবর অগ্রগামীর আত্মাকে বজায় রাখার প্রয়াস করে চলেছি। ফলপ্রসূ বাইবেল অধ্যয়নগুলি পরিচালনা করে আমি যে আনন্দ পেতাম, তা আমাকে দৃঢ়নিশ্চিত করেছিল যে আমার পূর্বসিদ্ধান্ত ছিল সঠিক।

এক স্পেনীয় কনে ও স্পেনীয় দায়িত্ব

১৯৫৭ সালে, আমি যখন প্যাডিংটন মণ্ডলীতে অগ্রগামীর কাজ করতাম, তখন রাফেলা নামে এক সুন্দরী স্পেনীয় বোনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। কয়েক মাস পরেই আমাদের বিবাহ হয়। আমাদের লক্ষ্য ছিল দুজনে মিলে অগ্রগামীর কাজ করার, কিন্তু প্রথমে আমরা যাই মাড্রিডে, যাতে করে রাফেলার বাবামার সঙ্গে আমি দেখা করতে পারতাম। এটা ছিল এমন এক সাক্ষাৎ, যা আমার জীবনের মোড়কে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। মাড্রিডে থাকাকালীন, স্পেনের শাখা অফিসের অধ্যক্ষ ভাই রয় ডুসিনবার্‌ আমাকে স্পেনে কাজ করার জন্য আবেদন করেন, কারণ সেখানে তখন অভিজ্ঞ ভাইয়ের অস্বাভাবিক প্রয়োজন ছিল।

কিভাবে আমরা এমন এক আমন্ত্রণকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি? সেজন্য, ১৯৫৮ সালে আমরা একযোগে স্পেনেতে পূর্ণ-সময়ের কাজে যোগ দিই। সে সময়ে দেশটি ছিল ফ্রাঙ্কোর শাসনাধীনে ও আমাদের কাজও আইনত গ্রাহ্য ছিল না, যার ফলে সেখানে আমাদের প্রচার কাজ হয়ে উঠেছিল অতিশয় কষ্টকর। এছাড়াও আমাকে স্পেনীয় ভাষা শেখার জন্যও প্রথম কয়েক বছর কষ্ট করতে হয়। আবার আমাকে হাল ছেড়ে না দেওয়ার জন্য দৃঢ় হতে হয়, এমনকি যদিও বেশ কয়েকবার আমাকে চোখের জলও ফেলতে হয় মণ্ডলীতে ভাইদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে না পারার জন্য।

অধ্যক্ষদের প্রয়োজন এতই বেশি ছিল যে স্পেনীয় ভাষাতে কথা বলতে না পারলেও এক মাসের মধ্যেই আমি একটি ছোট দলকে দেখাশোনা করা শুরু করি। আমাদের কাজ গুপ্ত প্রকৃতির হওয়ার দরুন, ১৫ থেকে ২০ জন প্রকাশকদের নিয়ে দলবদ্ধ হতাম, যা একরকম ছোটখাট একটি মণ্ডলীর মত কাজ করতো। প্রথমদিকে, সভাগুলিকে পরিচালনা করা ছিল যন্ত্রণাদায়ক, কারণ আমি শ্রোতাদের উত্তরগুলি সবসময়ে বুঝতে পারতাম না। যাইহোক, আমার স্ত্রী একেরারে পিছনের সারিতে বসে আমাকে যখন বিভ্রান্ত হতে দেখতো, তখন বিচক্ষণতার সাথে মাথা নেড়ে আমাকে জানিয়ে দিত কোন উত্তরটি ঠিক।

নতুন ভাষা শেখার প্রবণতা আমার মধ্যে না থাকার দরুন বেশ কয়েকবার আমি ইংল্যাণ্ডে ফিরে যাব বলে মনে মনে ভেবেছিলাম, যেখানে আমি সবকিছু আরও সহজভাবে করতে পারতাম। যাইহোক, স্পেনীয় ভাইবোনেদের প্রেম ও বন্ধুত্ব, ভাষার বিষয়ে আমার যে হতাশা ছিল, তা নিবারণ করেছিল। আর যিহোবা আমাকে বিশেষ সুযোগ দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন যাতে সবকিছুই উপযুক্ত মনে হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে, আমাকে নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে স্পেনের প্রতিনিধিরূপে যোগদান করতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তারপর ১৯৬২ সালে, আমি রাজ্যের পরিচর্যা বিদ্যালয়ের অমূল্য প্রশিক্ষণ পাই যা মরক্কোর ট্যাংগিয়ারে সংগঠিত হয়েছিল।

ভাষা ছাড়াও আর একটি যে সমস্যার সম্মুখীন আমি হয়েছিলাম, তা হল সবসময়ে পুলিসের হাতে গ্রেপ্তারের ভয়। বিদেশী হিসাবে আমি জানতাম যে গ্রেপ্তার হওয়ার অর্থ হল সরাসরি নির্বাসন। এই ঝুঁকিকে এড়াবার জন্য আমরা দুজন করে একসঙ্গে কাজ করতাম। যখন একজন সাক্ষ্যদান করতাম, আর একজন কোন বিপদের চিহ্ন আছে কিনা সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতো। প্রায়ই বহুতলা বিশিষ্ট বাড়িগুলির উপর তলার দু একটা ঘরে সাক্ষাতের পরে আমরা আবার দু তিনটি মোড় পেরিয়ে পুনরায় আর একটি ঘরে সাক্ষাৎ করতাম। আমরা বাইবেল বেশি করে ব্যবহার করতাম ও অল্প কিছু পুস্তিকা আমাদের ওভারকোটের ভিতরে লুকিয়ে রাখতাম ও সেগুলি শুধুমাত্র আগ্রহী ব্যক্তিদের দিতাম।

মাড্রিডে এক বছর কাটাবার পরে আমাদের দক্ষিণ স্পেনের একটি বড় শহর, ভিগোতে পাঠানো হয় যেখানে আদৌ কোন যিহোবার সাক্ষী ছিল না। প্রথম দু এক মাসের জন্য সমিতি আমাদের পরামর্শ দেয় যে আমার স্ত্রী যেন অধিকাংশ সাক্ষ্যদানের কাজ করে—যাতে লোকেরা যেন মনে করে যে আমরা ছিলাম শুধুমাত্র ভ্রমণকারী। আমাদের দেখতে নিম্নমানের হওয়া সত্ত্বেও আমাদের প্রচার লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এক মাসের মধ্যেই ক্যাথলিকদের পুরোহিতরা রেডিওতে আমাদের বিরুদ্ধে দোষারোপ করতে শুরু করে। তারা তাদের গির্জার সদস্যদের সতর্ক করে দেয় যে এক বিবাহিত দম্পতি ঘরে ঘরে গিয়ে বাইবেল সম্পর্কে আলোচনা করছে—সে সময়ে বাইবেল ছিল অপ্রচলিত বই। “পুলিস কর্তৃক অনুসন্ধিত এই দম্পতি”-র বিবরণ দেওয়া হয়েছিল যে একজন বিদেশী পুরুষ ও তার স্পেনীয় স্ত্রী, যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কথা বলে থাকে!

পুরোহিতবর্গ এও হুকুম জারি করে যে এই বিপজ্জনক দম্পতির সঙ্গে এমনকি কথা বলাও হল পাপ এবং তার ক্ষমা তখনই হতে পারে যদি সঙ্গে সঙ্গে তা কোন পুরোহিতের কাছে স্বীকার করা হয়। আর সত্য সত্যই এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে মনোরম আলোচনার শেষে মহিলাটি আমাদের অপরাধ স্বীকারমূলক ভঙ্গিতে জানায় যে এক্ষুনি তাকে যেতে হবে ও পাপ স্বীকার করতে হবে। আমরা তার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর লক্ষ্য করি যে সে সত্বর গির্জার দিকে যাচ্ছে।

বিতাড়ন

ভিগোতে পৌঁছানোর ঠিক দুমাস পরেই পুলিস আমাদের উপর বাজপাখির মত নজর রেখে গ্রেপ্তার করে। যে পুলিসটি আমাদের গ্রেপ্তার করে সে ছিল সহৃদয় ও থানায় নিয়ে যাওয়ার সময়ে আমাদের হাতকড়া লাগায়নি। থানাতে এক পরিচিত মুখ আমরা দেখতে পাই, একজন টাইপিষ্ট, যাকে সম্প্রতি আমরা সাক্ষ্যদান করেছিলাম। আমাদের সঙ্গে অপরাধীদের মত ব্যবহার করা দেখে সে খুব বিহ্বল হয়ে পড়ে ও তাড়াতাড়ি এসে আমাদের আশ্বস্ত করে যে আমাদের বিরুদ্ধে তার কোন অভিযোগ নেই। যাইহোক, আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয় যে আমরা “স্পেনের আধ্যাত্মিক একতাকে” ভেঙ্গে দিচ্ছি এবং ছয় সপ্তাহ পরে আমাদের বিতাড়িত করা হয়।

এটা আমাদের উন্নতিতে বাধা দিয়েছিল, কিন্তু আমাদের হাল ছেড়ে দেওয়ার মনোভাব আসেনি। আইবেরিয়ান উপদ্বীপে তখনও অনেক কিছু করার বাকি ছিল। তিনমাস তাঞ্জিয়ারে থাকার পরে আমাদের জিব্রাল্টারে পাঠানো হয়—আর একটি সম্পূর্ণ নূতন এলাকা। প্রেরিত পৌল যেমন বলেছিলেন, আমরা যদি আমাদের পরিচর্যাকে মহামূল্যবান বলে মনে করি, তাহলে আমরা ক্রমাগত এগোতেই থাকবো ও তার পুরস্কারও পাবো। (২ করিন্থীয় ৪:১, ৭, ৮) আমাদের ক্ষেত্রে তা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। জিব্রাল্টারের প্রথম গৃহের সাক্ষাৎকারেই আমরা সমগ্র পরিবারটির সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করে দিই। বেশি দিন অতিবাহিত হবার আগেই আমরা দুজনেই ১৭টি করে বাইবেল অধ্যয়ন করতে থাকি। যাদের সঙ্গে আমরা অধ্যয়ন করছিলাম, তাদের অনেকেই যিহোবার সাক্ষী হয়েছিল এবং মাত্র দুবছরের মধ্যে সেখানে ২৫ জন প্রকাশকবিশিষ্ট একটি মণ্ডলী গঠিত হয়েছিল।

কিন্তু, ভিগোর মত এখানেও যাজকেরা আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করে। জিব্রাল্টারের অ্যাংলিক্যান গির্জার যাজক পুলিস কর্তৃপক্ষের দারোগাকে সাবধান করে বলেছিল যে আমরা ছিলাম “অভ্যর্থনা পাওয়ার অনুপযুক্ত” ব্যক্তিবিশেষ এবং তার এই গোপনে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা শেষপর্যন্ত কার্যকারী হয়। ১৯৬২ সালের জানুয়ারি মাসে আমাদের জিব্রাল্টার থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়। এরপর আমরা কোথায় যাবো? স্পেনেতে তখনও খুব বেশি প্রয়োজন ছিল, তাই আমরা সেখানে ফিরে যাই, এই আশা নিয়ে যে আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেটা হয়তো এখন পুলিস কর্তৃপক্ষের কাছে আর মনোযোগের বিষয়বস্তু নয়।

সেভিলির সানি শহরে ছিল আমাদের নতুন বাসগৃহ। সেখানে রয় ও প্যাট করকপ নামে অন্য এক অগ্রগামী দম্পতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করায় প্রভূত আনন্দ আমরা পেয়েছিলাম। যদিও সেভিলির অধিবাসী ছিল পাঁচ লক্ষ মাত্র, কিন্তু আমরা ছিলাম মাত্র ২১ জন প্রকাশক, সুতরাং সেখানে অনেক কিছুই করার ছিল। এখন সেখানে ১,৫০০ জন প্রকাশককে নিয়ে ১৫টি মণ্ডলী আছে। এক বছর পরে আমাদের সামনে আসে এক মনোরম অপ্রত্যাশিত সুযোগ; বারসেলোনা অঞ্চলে আমাদের ভ্রমণ অধ্যক্ষের কাজের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।

যে সব দেশে আমাদের কাজ আইনত স্বীকৃতি পায়নি, সেখানে আমাদের সীমার কাজ ছিল কিছুটা অন্যরকম। প্রতি সপ্তাহে আমরা ছোট ছোট দলগুলির পরিদর্শন করতাম, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যোগ্য ভাই ছিল না। এইসব কঠোর পরিশ্রমী ভাইদের প্রয়োজন ছিল সহায়তা ও শিক্ষার, যেগুলি আমরা তাদের দিতে পারতাম। এই কাজ ছিল আমাদের প্রিয়! যেসব অঞ্চলে খুব অল্প অথবা একেবারেই সাক্ষী নেই, তেমন জায়গায় অনেক বছর কাজ করার পরে এত ভাইবোনদের একসঙ্গে পেয়ে আমরা খুব উৎফুল্ল হয়েছিলাম। এছাড়াও বারসেলোনাতে প্রচার কাজ ছিল সহজ ও বহু ব্যক্তি বাইবেল অধ্যয়ন করতে ইচ্ছুক ছিল।

নিরুৎসাহের বিরুদ্ধে লড়াই

যাইহোক, ঠিক ছয়মাস পরে, আমার জীবনে এক নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন ঘটে। আমাদের প্রথম ছুটি যখন সমুদ্রতীরে কাটাচ্ছিলাম, তখন এক দুঃখদায়ক ঘটনা ঘটে, যে বিষয়ে আমি আগেই উল্লেখ করেছি। শারীরিকভাবে আমি খুব তাড়াতাড়ি আরোগ্যলাভ করেছিলাম, তথাপি ডুবে যাওয়ার যে আঘাত আমার নার্ভতন্ত্রের উপরে পড়েছিল, তা মুছে ফেলা যায় না।

কয়েক মাস আমি সীমার কাজে লেগে থাকার জন্য সংগ্রাম চালাই, কিন্তু শেষপর্যন্ত চিকিৎসার জন্য আমাকে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে হয়। দুবছর বাদে আমি যথেষ্টভাবে সুস্থ হয়ে উঠি স্পেনে ফিরে যাওয়ার জন্য, যেখানে আমি পুনরায় সীমার কাজের দায়িত্ব নিই। তৎসত্ত্বেও, এটা ছিল অল্পকালের জন্য। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি দারুনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে পূর্ণ-সময়ের কাজে ইস্তফা দিই তাদের দেখাশুনা করার জন্য।

জীবন আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে ১৯৬৮ সালে, যখন আমি স্নায়বিক দুর্বলতায় সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে পড়ি। এমন সময়ও আসে যখন রাফেলা ও আমি দুজনেই ভেবেছিলাম যে আমি আর কখনও সুস্থ হতে পারবো না। এটা এমন অবস্থা ছিল যে আমি যেন আবার ডুবে যাচ্ছিলাম, কিন্তু অন্য অর্থে! অতিরিক্ত মাত্রায় নিরুৎসাহিত হওয়া ছাড়াও এটা আমার সমস্ত শক্তিকে হরণ করে নিয়েছিল। আমি নিদারুন শ্রান্তির পর্যায়ে ভুগছিলাম, যার জন্য আমি বাধ্য হয়েছিলাম প্রায় সবসময়ের জন্য বিশ্রাম নিতে। সেই সময়ে আমার সমস্যার কথা সব ভাইরা উপলব্ধি করতে পারেনি; অবশ্যই আমি জানতাম যে যিহোবা তা বুঝতে পেরেছিলেন। প্রহরীদুর্গ ও সচেতন থাক! পত্রিকার বিস্ময়কর প্রবন্ধগুলি পড়ে আমি দারুন পরিতৃপ্তি পেয়েছিলাম যা একজন নিরুৎসাহিত ব্যক্তির জন্য সাহায্যকারী ও বোধশক্তিদায়ক।

এই কষ্টকর দিনগুলির সবসময়ে, আমার স্ত্রী ছিল আমার কাছে ক্রমাগতভাবে এক উৎসাহের উৎসস্বরূপ। একযোগে সমস্যার মোকাবিলা করা সত্যি সত্যিই বিবাহের বন্ধনকে দৃঢ় করে। রাফেলার বাবামা মারা যায় আর ১২ পরে আমার স্বাস্থ্য এমন এক পর্যায়ে আসে যখন আমি আবার পূর্ণ-সময়ের কাজে ফিরে যাবার জন্য উপযুক্ত মনে করি। ১৯৮১ সালে, আমাদের আবার সীমার কাজের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় যাতে আমরা আশ্চর্য হই ও আনন্দও পাই।

আমাদের অতীতে ভ্রমণরত পরিচর্যার কাজে যে অভিজ্ঞতা ছিল, এখন স্পেনে ঐশিক কাজকর্মের তালিকায় প্রভূত পরিবর্তন ঘটেছে। এখন অবাধে প্রচার করা যেতে পারে, আর সেজন্য আমাকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। তৎসত্ত্বেও, আর একবার সীমা অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করা ছিল এক বিরাট সুযোগ। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকে আমাদের অগ্রগামীর কাজের অভিজ্ঞতা অন্যান্য অগ্রগামীদের যাদের সমস্যা ছিল তাদের উৎসাহ দিতে সাহায্য করেছিল। আর প্রায়ই আমরা অন্যদের, অগ্রগামীর কাজে যোগ দিতে ও সাহায্য করতে সমর্থ হয়েছিলাম।

মাড্রিড ও বারসেলোনাতে ১১ বছর ভ্রমণের কাজে থাকার পরে, অসুস্থতার কারণে আবার আমাদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে কাজের ধারা পরিবর্তন করার। বিশেষ অগ্রগামী হিসাবে আমাদের সালামাংকা শহরে পাঠানো হয় যেখানে একজন প্রাচীনের কাজের জন্য আমি উপযোগী ছিলাম। সালামাংকার ভাইরা আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। এক বছর বাদে আর এক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল যা আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছিল।

রাফেলা সম্পূর্ণরূপে রক্তহীন হয়ে পড়ে এবং পরীক্ষা করে দেখা যায় যে তার মলাশয়ে ক্যানসার হয়েছে। এখন আমাকে হতে হয় দৃঢ় ও আমার স্ত্রীকে সকল রকমের সহায়তা দিতে হয়। আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় অবিশ্বাস ও তারপর ভয়। রাফেলা কি এর থেকে রেহাই পাবে? এইসব মুহূর্তগুলিতে যিহোবার উপরে সম্পূর্ণ বিশ্বাস আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। আমি আনন্দের সঙ্গে বলছি যে রাফেলার অপারেশন সফল হয়েছিল এবং আমরা আশা করি যে ক্যানসার যেন আর দেখা না দেয়।

যদিও ৩৬ বছর স্পেনে অতিবাহিত করার সময়ে আমাদের অনেক উত্থান-পতন ঘটেছিল, তথাপি এই আধ্যাত্মিক অগ্রগতির বছরগুলি অতিবাহিত করা কত উৎসাহজনক। আমরা দেখেছি ১৯৫৮ সালে ৮০০ জনের একটি ছোট দলকে বৃদ্ধি পেয়ে আজ ১,০০,০০০ জনেরও বেশি প্রকাশকের এক বাহিনীতে পরিণত হতে। আমাদের কষ্ট লাঘব হয়ে যেত বহু আনন্দের দ্বারা—অপরকে সত্য গ্রহণ করতে ও পরিপক্ব হতে সাহায্য করে, স্বামীস্ত্রী একত্রে কাজ করে এবং সেইসঙ্গে এই মনে করে যে আমরা আমাদের জীবনকে সর্বোৎকৃষ্ট উপায়ে কাটিয়েছি।

পৌল তার করিন্থীয়দের প্রতি লিখিত দ্বিতীয় পত্রে বলেন: “আমরা এই পরিচর্য্যা-পদ প্রাপ্ত হওয়ায়, যেরূপে দয়া পাইয়াছি, তদনুসারে নিরুৎসাহ না হই।” (২ করিন্থীয় ৪:১) অতীতের দিকে ফিরে তাকালে আমি বুঝতে পারি যে আমার জীবনের বেশ কিছু বিষয় আমাকে হাল ছেড়ে দেওয়ার থেকে রক্ষা করেছিল। বিশ্বস্ত অভিষিক্ত ভাইরা যারা আমার যত্ন নিয়েছিলেন, তাদের উদাহরণ আমার জীবনের গঠনমূলক বছরগুলিতে এক দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এমন একজন, যে আমার একই আত্মিক লক্ষ্যের সাথী, তাকে পাওয়া এক অপূর্ব সাহায্য; যখন আমি নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তাম, যখন রাফেলা আমাকে উঠাতো, আর যখন রাফেলা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তো, আমি সেই একই কাজ করতাম। তাল মিলিয়ে চলাও হল এক বিরাট সম্পদ। ভাইদের সাথে হাসাহাসি করা—এবং নিজেদের দেখে হাসাও—একভাবে আমাদের সমস্যায় ভারাক্রান্ত হওয়া থেকে হাল্কা করে।

কিন্তু সবার উপরে, পরীক্ষার সময়ে ধৈর্য প্রদর্শন করার জন্য প্রয়োজন যিহোবার শক্তি। আমি সর্বদা পৌলের কথাগুলি স্মরণ করি: “যিনি আমাকে শক্তি দেন, তাঁহাতে আমি সকলই করিতে পারি।” যখন যিহোবা আমাদের সঙ্গে আছেন, তখন হাল ছেড়ে দেওয়ার কোন যুক্তিই থাকতে পারে না।—ফিলিপীয় ৪:১৩.

[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]

রোনাল্ড এবং রাফেলা টেলর ১৯৫৮ সালে

[২৪, ২৫ পৃষ্ঠার চিত্র]

স্পেনেতে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সভা (১৯৬৯)

    বাংলা প্রকাশনা (১৯৮৯-২০২৬)
    লগ আউট
    লগ ইন
    • বাংলা
    • শেয়ার
    • পছন্দসমূহ
    • Copyright © 2026 Watch Tower Bible and Tract Society of Pennsylvania
    • ব্যবহারের শর্ত
    • গোপনীয়তার নীতি
    • গোপনীয়তার সেটিং
    • JW.ORG
    • লগ ইন
    শেয়ার