আমাদের একটি মহামূল্যবান মুক্তা দেওয়া হয়
রিচার্ড গুন্থার দ্বারা কথিত
সময়টি ছিল সেপ্টেম্বর মাস ১৯৫৯ সাল। ইটালিয়ান জাহাজ জুলিও সিসার-এ করে আমরা অতলান্তিক মহাসাগর পার হয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে স্পেনের কাডিজে যাচ্ছিলাম। ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটি, আমার সাথে আমার স্ত্রী রীতা এবং আরেকটি মিশনারি দম্পতি পল ও এভলিন্ হান্ডার্টমার্ককে আইবেরিয়ান দেশে কার্যভার দেয়। আমরা অনেক সমস্যাপূর্ণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে চলেছিলাম। কিন্তু কেন আমরা মিশনারির কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম?
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জারসিতে, যিহোবা সাক্ষীরূপে ১৯৫০ সালে আমি ও রীতা বাপ্তিস্ম গ্রহণ করি। এর পরে, আমরা একটি সিদ্ধান্ত নিই যা আমাদের সামনে একটি উত্তম মুক্তা হিসাবে হয়ে উঠবে। আমরা এমন একটি মণ্ডলীতে ছিলাম যেখানে এলাকার জন্য পর্যাপ্ত ভাই ও বোনেরা ছিল। সুতরাং এমন একটি এলাকাতে যেতে আমরা বাধ্য হই যেখানে আরও বেশি প্রচারকের দরকার ছিল। ১৯৫৮ সালের গ্রীষ্মে যিহোবার সাক্ষীদের আন্তর্জাতিক অধিবেশন যা নিউ ইয়র্কে হয়, সেখানে মিশনারি কাজের জন্য আমরা আবেদন করি।
ঠিক কিছুদিন পরে, আমাদের ওয়াচটাওয়ার বাইবেল স্কুল অফ গিলিয়াড থেকে আমন্ত্রণ আসে এবং এক বছরের মধ্যে মিশনারি হিসাবে স্পেনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হই। অনেক ব্যবস্থা করার এবং খুব উত্তেজনার দরুন আমাদের কী দেওয়া হয়েছিল তা আমরা বুঝতে পারিনি। যীশু এক মহামূল্যবান মুক্তার কথা বলেছিলেন। (মথি ১৩:৪৫, ৪৬) যদিও তা তাঁর শিক্ষামূলক দৃষ্টান্তের মূল বিষয় ছিল না, কিন্তু মিশনারি হিসাবে পরিচর্যা করার সুযোগ আমাদের কাছে সেই মুক্তার তুল্য। বিগত দিনের কথা চিন্তা করলে যিহোবার সংগঠনে এই উত্তম কাজটি, আমরা এখন আরও বেশি করে উপলব্ধি করি।
এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা
তখনকার দিনে, নিউ ইয়র্ক স্টেটের ফিন্গার লেক এলাকার মনোরম পরিবেশে গিলিয়াড মিশনারি শিক্ষাদান পরিচালিত হত। এই জগতের কাজ এবং সমস্যাগুলি থেকে দূরে, বাইবেল অধ্যয়ন এবং প্রকৃত খ্রীষ্টীয় মেলামেশায় নিমর্জিত হয়ে আমরা সেখানে ছয়টি উত্তম মাস অতিবাহিত করি। আমাদের সহ ছাত্র-ছাত্রীরা জগতের বিভিন্ন জায়গার ছিল যেমন, অস্ট্রেলিয়া, বলিভিয়া, ব্রিটেন, গ্রীস এবং নিউ জীল্যান্ড। খুব তাড়াতাড়ি গ্রাজুয়েশন দিন চলে আসে। ১৯৫৯ সালের আগস্ট মাসে অশ্রুজলের সাথে আমরা বিদায় সম্ভাষণ জানাই এবং আমাদের নিয়োজিত মিশনারি দেশগুলিতে জাহাজে করে চলে যাই। এক মাস বাদে আমরা স্পেনের মাটিতে এসে পৌঁছাই।
এক নতুন সংস্কৃতি
আমরা দক্ষিণ বন্দর এলজেসিরাসে, যা বৃহৎ রক্ অফ জিব্রল্টারের পাশে ছিল সেখানে এসে পৌঁছাই। সেই রাত্রে আমরা চারজন, রীতা ও আমি এবং আমাদের সাথে হান্ডার্টমার্করা রেলে করে মাড্রিদের জন্য রওনা দিই। আমরা মেরকাদর হোটেলে এসে উঠি, যতক্ষণ না সোসাইটির গুপ্ত শাখা অফিস আমাদের সাথে যোগাযোগ করে ততক্ষণ সেখানেই আমাদের থাকতে হয়। স্পেন তখন জেনেরালিসমো ফ্রানসিসকো ফ্রান্কোর একনায়ক সংক্রান্ত রাজত্বের অধীনে ছিল। এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে শুধুমাত্র এই দেশেতে রোমান ক্যাথলিক চার্চ ছিল আইনত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ধর্ম ছিল। জনসাধারণ্যে অন্যান্য ধর্ম অভ্যাস করা বেআইনি ছিল এবং যিহোবার সাক্ষীদের গৃহ থেকে গৃহ প্রচার কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। এমনকি ধর্মীয় সভাগুলি নিষিদ্ধ ছিল, তাই তখনকার দিনে স্পেনে ৩০টি মণ্ডলীতে যিহোবার সাক্ষীরা যাদের সংখ্যা ছিল ১,২০০ জন, অন্যান্য দেশগুলির মত কিংডম হলে মিলিত হতে পারত না। তাই আমাদের ব্যক্তিগত ঘরে গোপনভাবে মিলিত হতে হত।
স্পানিশ শেখা এবং প্রস্তুত হওয়া
আমাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল ভাষা শেখা। প্রথম মাসে আমরা স্পানিশ ভাষা শেখবার জন্য ১১ ঘন্টা ব্যয় করতাম—সকালে ৪ ঘন্টা ক্লাসে এবং তারপর ঘরেতে ৭ ঘন্টা ব্যক্তিগত অধ্যয়নে। দ্বিতীয় মাসে সকালের তালিকা একই ছিল, কিন্তু দুপুরে গৃহ থেকে গৃহ প্রচার কাজে ব্যয় করতাম। আপনি কি চিন্তা করতে পারছেন? তখনও পর্যন্ত ভাষা না জানা সত্ত্বেও শুধু একটি কার্ডে লেখা ভূমিকা মুখস্থ করে, রীতা এবং আমি গৃহ থেকে গৃহ প্রচার কাজে যেতাম!
ভালাকাস, মাড্রিদের কর্মী-শ্রেণীর এলাকাতে আমার মনে পড়ে একটা দরজায় আমি কড়া নাড়া দিই। যদি কার্ডের দরকার পড়ে তাই আমি তা হাতে করে নিয়ে, স্পানিশ ভাষায় বলি: “সুপ্রভাত। আমরা একটি খ্রীষ্টীয় কাজ করছি। বাইবেল বলে (আমরা একটি শাস্ত্র পড়তাম)। আমরা চাই যে আপনি এই পুস্তিকাটি রাখুন।” সেই মহিলাটি শুধু আমাদের দিকে তাকাল, তারপর পুস্তিকাটি নিয়ে নিল। যখন আমরা পুনর্সাক্ষাৎ করি, সেই মহিলাটি আমাদের ভিতরে ডাকে এবং যখন আমরা কথা বলছিলাম সে শুধু তাকিয়েছিল। আমাদের স্বল্প ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমরা তার সাথে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করি এবং অধ্যয়নের সময় সে শুধু শুনছিল ও তাকিয়েছিল। কিছু সময় পরে সে অবশেষে বলে যে প্রথম সাক্ষাতে সে কিছুই বুঝতে পারেনি, কিন্তু ডিয়স (ঈশ্বর) কথা শোনার পর সে বুঝতে পারে যে এটি ভাল জিনিস। সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে সে অনেকখানি বাইবেল সম্বন্ধীয় জ্ঞান নেয় এবং বাপ্তিস্মিত হয়ে একজন যিহোবার সাক্ষী হয়।
আমার পক্ষে স্পানিশ শেখা খুব কষ্টকর ছিল। শহরে ঘুরবার সময়ে আমি ক্রিয়া ধাতুরূপগুলি মুখস্থ করতাম। যা আমি প্রথম সপ্তাহে মুখস্থ করতাম তা আমি পরের সপ্তাহে ভুলে যেতাম! এটি খুব নিরুৎসাহজনক ছিল। অনেকবার আমি প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। যেহেতু আমি এত খারাপ স্পানিশ বলতাম, তাই যখন আমি নেতৃত্ব নিতাম তখন স্পানিশ ভাইদের খুব ধৈর্য ধরতে হত। একটি জেলা সম্মেলনে প্ল্যাটফর্ম থেকে পড়ার জন্য একটি ভাই আমাকে হাতে লেখা ঘোষণাপত্র দেন। তার লেখা পড়ায় অসুবিধার ফলে, আমি পড়ি: “কালকে স্টেডিয়ামে আপনারা মুলেটাস (ক্রাচ) নিয়ে আসবেন।” সেটি এই হওয়ার কথা ছিল, “কালকে আপনারা স্টেডিয়ামে মালেটাস (মালপত্র) নিয়ে আসবেন।” অবশ্যই, লোকেরা হেসেছিল এবং আমিও স্বভাবতই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম।
মাড্রিদে প্রাথমিক পরীক্ষাগুলি
মাড্রিদে প্রথম কয়েকটি বছর আমার ও রীতার পক্ষে মানসিক দিক দিয়ে খুব কষ্টকর ছিল। আমাদের ঘর ও বন্ধুবান্ধবদের অভাব আমরা বুঝতে পারছিলাম। যখনই আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিঠি পেতাম আমাদের স্বদেশে ফিরবার কাতরতার এক ঢেউ বহে যেত। এই আকুলতার কালগুলি খুব জোরদার ছিল, কিন্তু তা চলে যেত। কারণ আমরা বাড়ি, পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে দিয়ে এক উত্তম মুক্তা বেছে নিয়েছিলাম। আমাদের মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
মাড্রিদে শুরুতে আমরা নিকৃষ্ট বর্ডিংহাউসে থাকি। আমাদের একটি ঘর ছিল ও দিনে তিনবার খাওয়া দেওয়া হত। ঘরটি ছোট ও অন্ধকার ছিল এবং আমাদের গদি খড় দিয়ে তৈরি ছিল। আমাদের সাধারণ মাসিক বেতন ঘর ভাড়াতে চলে যেত। দুপুরবেলায় আমরা সাধারণত সেখানে খাবার খেতাম এবং বাড়িওয়ালি আমাদের রাতের খাবার ওভেনে রেখে দিত যাতে করে খুব রাতে ফিরে এসে আমরা তা খেতে পারি। কিন্তু, সকালে ও সন্ধ্যাবেলায় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমাদের খিদে পেয়ে যেত। আমাদের বেতন ফুরিয়ে গেলে আমাদের সীমিত ব্যক্তিগত পয়সা থেকে সবচেয়ে কমদামি যে চকলেট পাওয়া যেত তা আমরা কিনতাম। সোসাইটির আঞ্চলিক অধ্যক্ষের পরিদর্শনের পরে খুব অল্প সময়ের মধ্যে কিন্তু এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। তিনি আমাদের পরিস্থিতি দেখেন এবং বলেন মিশনারি হোম হিসাবে ব্যবহারের জন্য আমরা একটি অ্যাপার্টমেন্ট দেখতে পারি। রান্না ঘরের মেজেতে গোল গামলার মধ্যে দাঁড়িয়ে স্নান করার থেকে এটা অনেক ভাল ছিল। এখন আমাদের একটি শাওয়ার হবে, খাবার রাখবার জন্য রেফ্রিজেরাটর এবং খাবার রান্না করার জন্য ইলেকট্রিক বার্নার থাকবে। এই বিবেচনার জন্য আমরা খুবই কৃতজ্ঞ ছিলাম।
মাড্রিদে অপূর্ব অভিজ্ঞতাগুলি
গৃহ থেকে গৃহ প্রচার কাজ খুব সতর্কতার সাথে করা হত। মাড্রিদের দৈনন্দিনের ভীড় আমাদের দৃষ্টি-আকর্ষক হওয়া থেকে লুকিয়ে রাখত। আমরা অন্যদের মত বেশ-ভূষা ও আচরণ করার চেষ্টা করতাম যাতে করে আমাদের বিদেশী বলে চেনা না যায়। আমাদের ঘরে ঘরে প্রচারের প্রণালী ছিল অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকা, দরজায় কড়া নাড়া, ব্যক্তির সাথে কথা বলা আর তারপর সেই বাড়িটি, রাস্তা ও এলাকা ছেড়ে চলে আসা। সবসময় এই সম্ভাবনা ছিল যে গৃহকর্তা পুলিশ ডাকবে এবং তাই সেই এলাকাতে থাকা বিজ্ঞতার কাজ ছিল না। বস্তুত, এই প্রণালী ব্যবহারের ক্ষেত্রে যতই তারা সতর্ক হোক না কেন, পল ও ইভলিন্ হান্ডার্টমার্ক কে ধরা হয় আর সেই দেশ থেকে ১৯৬০ সালে বিতারিত করা হয়। তারা প্রতিবেশী দেশ পোর্তুগালে যায় এবং সেখানে অনেক বছর পরিচর্যা করে, পল গুপ্ত শাখা দপ্তরের দেখাশোনা করেন। এখন তিনি ক্যালিফর্নীয়ার, সান ডিয়েগো শহর অধ্যক্ষ।
কিন্তু, আমাদের জন্য সাম্যভাব ফিরে আসে। কিছু মাস পরে ছয়জন মিশনারি যাদের পোর্তুগালে কাজ করার জন্য ভার দেওয়া হয়েছিল তাদের দেশ ছেড়ে দিতে আদেশ দেওয়া হয়! এর ফলে একটি আনন্দপূর্ণ ঘটনা ঘটে কারণ এরিক্ এবং হেজেল বেভেরিজ যারা আমাদের সাথে গিলিয়াড ক্লাসে ছিল তাদের পোর্তুগাল ছেড়ে দিয়ে স্পেনে আসতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তাই আমরা আবার ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হোটেল মেরকাডরে এসে পৌঁছাই—এইবার এরিক্ ও হেজেলকে অভিবাদন জানানোর জন্য।
মাড্রিদের এই প্রাথমিক দিনগুলিতে রীতা ও আমার ধর্মীয় ভন্ডামির সাথে ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় হয়। আমরা বার্ণার্ডো ও মারিয়া নামক এক দম্পতির সাথে বাইবেল অধ্যয়ন করি, যারা এক নিকৃষ্ট ঘরে বাস করত এবং সেই ঘরটি ফেলে দেওয়া নির্মাণের সারঞ্জাম যা বার্ণার্ডো কুড়িয়ে পেয়েছিল তা দিয়ে তৈরি ছিল। অনেক রাত পর্যন্ত তাদের সাথে আমরা অধ্যয়ন করতাম এবং অধ্যয়নের শেষে তারা আমাদের রুটি, ওয়াইন ও কিছু পনির বা যা কিছু থাকত তাই দিত। আমি বুঝতে পারলাম যে এই পনির ঠিক আমেরিকান পনিরের মত ছিল। একদিন রাতে অধ্যয়নের পরে তারা যে টিনে করে পনিরটা পেত তা তারা বার করে নিয়ে আসে। বড় বড় অক্ষরে ইংরাজিতে তার উপর লেখা ছিল, “আমেরিকান লোকেদের কাছ থেকে স্পানিশ লোকেদের জন্য—বিক্রির জন্য নয়।” এই পনিরটি এই পরিবার কী করে পেল? এটি দরিদ্রদের বিতরণ করার জন্য সরকার ক্যাথলিক গির্জাকে ব্যবহার করে। কিন্তু পাদ্রি তা বিক্রি করছিল!
মিলিটারীর কাছে ফলপ্রদ পরিচর্যা
খুব তাড়াতাড়ি একটি ঘটনা ঘটে যা আমাদের ও অন্যদের জন্য উৎকৃষ্ট আশীর্বাদস্বরূপ ছিল। আমরা শাখা অফিস থেকে একটি নোটিস পাই যা আমাদের ওয়াল্টার কিডাশ নামক ব্যক্তি যিনি ইউ.এস এয়ার ফোর্স, যা টরেজন অবস্থিত ছিল যা মাড্রিদ থেকে কিছু কিলোমিটার দূরে ছিল সেখানে গিয়ে তার সাথে দেখা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আমরা তাকে ও তার স্ত্রীর সাথে দেখা করি ও তাদের সাথে ও আরেকটি এয়ার ফোর্স দম্পতির সাথে বাইবেল অধ্যয়ন করি।
সেই সময়ে, ইউ.এস. কর্মীবৃদন্দের সাথে আমি পাঁচটি বাইবেল অধ্যয়ন করছিলাম, অবশ্যই সবই ইংরাজিতে। পরে এর মধ্যে থেকে সাতজন বাপ্তিস্ম গ্রহণ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার পর এদের মধ্যে চারজন মণ্ডলীর প্রাচীন হয়।
আমাদের কাজের উপর নিষেধাজ্ঞার দরুন সেই সময় বই, পত্রিকা এবং বাইবেল দেশেতে নিয়ে আসার জন্য খুব অল্প পথ ছিল। কিন্তু, কিছু সাহিত্যাদি ভ্রমণকারীরা ও আমাদের আমেরিকান বন্ধুরা নিয়ে আসত। শাখা আমাকে গুপ্ত সাহিত্যাদির কেন্দ্র পরিচালনা করার ভার দেয়। এটি অবস্থিত ছিল ভালেকাসে একটি স্টেশনারী দোকানের গুদাম ঘরে। মালিকের স্ত্রী ছিলেন একজন যিহোবার সাক্ষী। যদিও তিনি সাক্ষী ছিলেন না, সেই মালিকটি আমাদের কাজকে সম্মান করতেন আর যদিও তার ও তার ব্যবসার ক্ষতি হতে পারত, কিন্তু তিনি পিছনের জায়গাটা আমাদের দেন যাতে করে দেশের সমস্ত শহরগুলিতে আমরা বাক্স ভরতি সাহিত্যাদি পাঠাতে পারি। যেহেতু এই ঘরটিকে সাধারণভাবে যেরকম থাকা উচিত—ধুলো, চারিদিকে পিচবোর্ডের বাক্স দিয়ে ভর্তি—সেরকম রাখার জন্য আমাকে একটি কাজের বেঞ্চ ও বইয়ের শেল্ফ তৈরি করতে হয় যা খুব তাড়াতাড়ি স্থাপন করা যায় এবং খুব অল্প সমায়ের মধ্যে লুকানো যায়। দিনের শেষে যখন কোন লোক সেই দোকানে থাকত না তখন আমি আমার বাক্সগুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম।
আধ্যাত্মিক খাদ্য যেমন প্রহরীদুর্গ ও আওয়েক! পত্রিকা এবং অন্যান্য সাহিত্যাদি সারা দেশব্যাপী বিতরণ করা সত্যই এক সুযোগ ছিল। এই সময়গুলি সত্যই উত্তেজনামূলক সময় ছিল।
রীতা ১৬টি গৃহ বাইবেল অধ্যয়ন করার আনন্দ উপভোগ করে যাদের মধ্যে থেকে অর্ধেকজন বাপ্তাইজিত যিহোবার সাক্ষী হয়। ডলরেস্ একজন বিবাহিত যুবতী স্ত্রী ছিলেন যিনি শীতের সময় হৃদরোগের দরুন বিছানায় শুয়ে থাকতেন। বসন্তকালে তিনি উঠতে ও কিছুটা চলাফেরা করতে পারতেন। ডলরেসের বিশ্বাস খুব দৃঢ় ছিল, তাই যখন টুলূস, ফ্রান্সে জেলা সম্মেলনের সময় আসে তার যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। তার হৃদয়ের পরিস্থিতি দেখে তার ডাক্তার যাওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেন। শুধু হাউসকোট আর চটি পরে ও মালপত্রবিহীন তিনি তার স্বামী, তার মা ও অন্যান্যদের অভিবাদন জানাতে স্টেশনে আসেন। কান্না চোখে ও তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া, তা সহ্য করতে না পেরে তিনি ট্রেনে চড়ে বসেন ও তাদের সাথে ফ্রান্সে যাওয়ার জন্য রওনা দেন! রীতা জানত না যে এই ঘটনাটি ঘটেছে। সম্মেলনে সে ডলরেস্কে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খুব অবাক হয়!
এক অস্বাভাবিক বাইবেল অধ্যয়ন
মাড্রিদে আমাদের কার্যভার সম্বন্ধীয় আমাদের বিবরণি শেষ করতে পারি না যদি না আমরা ডন বেনিগনো ফ্রান্কো, “এল প্রফেসর” এর কথা অন্তর্ভুক্ত না করি। এক স্থানীয় সাক্ষী আমাকে একজন বয়স্ক ভদ্রলোকের সাথে দেখা করার জন্য নিয়ে যায় যিনি তার স্ত্রীর সাথে এক দরিদ্র অ্যাপার্টমেন্ট ঘরে বাস করতেন। আমি তার সাথে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করি। প্রায় দেড় বছর পড়ার পর তিনি বাপ্তিস্ম নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং যিহোবার সাক্ষী হন।
এই বয়স্ক ভদ্রলোকটি ডন বেনিগনো ফ্রান্কো, ফ্রানসিস্কো ফ্রান্কোর যিনি স্পেনের একনায়ক শাসক ছিলেন তার ভাইপো ছিলেন। এটি বুঝা গিয়েছিল যে ডন বেনিগনো সবসময় স্বাধীনচেতা ব্যক্তি ছিলেন। স্পেনীয় গৃহ যুদ্ধের সময় তিনি রিপাবলিক প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন এবং তার ভাইপোর বিরুদ্ধে ছিলেন—সেনাধ্যক্ষ যিনি যুদ্ধটি জয় করেন এবং ক্যাথলিক একনায়ক শাসন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৯ সাল থেকে, ডন বেনিগনোকে কাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং তিনি খুব অল্প জীবিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন। অতএব এইভাবে জেনেরালিস্মো ফ্রানসিস্কো ফ্রান্কো, স্পেনের কৌডিলোর ভাইপো একজন যিহোবার সাক্ষী হন।
হঠাৎ আমন্ত্রণ
বার্সিলোনাতে সীমার কাজ করার জন্য স্পেনের শাখা দপ্তর আমাদের ১৯৬৫ সালে ডাকে। এর মানে হল যে সব ভাইদের সাথে যাদের সঙ্গে মাড্রিদে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম তাদের ছাড়তে হবে। এটা শুধু আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতাই নয় বরং এক পরীক্ষাও ছিল। এই অভিজ্ঞতাটি খুব ভয়াবহ ছিল কারণ আমি সবসময় আমার ক্ষমতাকে সন্দেহ করতাম। আমি খুব ভাল করে জানি যে পরিচর্যার এই ক্ষেত্রে কার্যকারী হতে যিহোবা আমাকে সাহায্য করেছেন।
প্রতি সপ্তাহে একটি মণ্ডলীকে পরিদর্শন করার অর্থ হল ভাইদের ঘরেতে থাকা। আমাদের স্থায়ী থাকবার জায়গা ছিল না, প্রায় দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর আমাদের আরেকটি ঘরে যেতে হত। মেয়ের পক্ষে এটি বিশেষ করে কষ্টকর ছিল। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি হোসে ও রোসের এসকুদা যারা বার্সিলোনাতে থাকত অনেকদিন থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। এটি তাদের পক্ষে প্রেমের এক প্রকাশ ছিল কারণ এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, এখন আমাদের স্থায়ী জায়গা থাকবে যেখানে আমরা আমাদের নিজস্ব জিনিসপত্র এবং রবিবার সন্ধ্যাবেলায় ফিরবার জন্য নিয়মিত স্থানে আসতে পারব।
রীতা এবং আমি এর পরের চারটি বছর ক্যাটেলনিয়ায় যা মধ্য সাগর উপকূলে অবস্থিত সেখানে সীমার কাজে ব্যয় করি। আমাদের সমস্ত বাইবেল সভাগুলি গোপনে লোকেদের বাড়িতে হত এবং আমাদের গৃহ থেকে গৃহে প্রচার কাজ খুব বিচক্ষণতার সাথে করা হত যাতে করে তা লোকেদের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে। কয়েকসময় আমরা মণ্ডলীগতভাবে রবিবার সবাই, বিশেষ করে সীমা অধিবেশন আয়োজন করার জন্য জঙ্গলে “পিকনিক” করতে যেতাম।
নিজেদের কাজ ও স্বাধীনতা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা সত্ত্বেও তারা মণ্ডলীকে ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় রাখতে যে প্রচেষ্টা করেছে এমন অনেক আধ্যাত্মিক ভাই বোনেদের আমরা প্রশংসা করি। এদের মধ্যে অনেকজন এই কাজকে শহর থেকে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়। ১৯৭০ সালে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ারও ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করার পর যে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে তার ভিত্তিমূল হল এটি।
আমাদের বিদেশী কার্যভার ছেড়ে যাওয়া
স্পেনেতে আমাদের দশ বছর থাকাকালীন এবং আমাদের যিহোবাকে সেবা করার যে বিশেষ অধিকার তা কিছুটা পরিমিত হয় আমাদের বাবামাদের পরিস্থিতির দরুন। অনেক সময়ে, আমার মা ও বাবার যত্ন নেওয়ার জন্য আমাদের প্রায় কার্যভার ছেড়ে বাড়িতে চলে যেতে হচ্ছিল। কিন্তু, আমার বাবামাদের নিকটবর্তী মণ্ডলীগুলির প্রেমপূর্ণ ভাই ও বোনেদের জন্য আমরা স্পেনে থাকতে পেরেছিলাম। হ্যাঁ, মিশনারী কাজের সুযোগের যে বছরগুলি তা কিছুটা ক্ষেত্রে সম্ভব হতে পেরেছে অন্যান্যদের দরুন যারা আমাদের সাথে ঈশ্বরের রাজ্যের আগ্রহকে প্রথমে রেখেছিল।
অবশেষে, ডিসেম্বর ১৯৬৮ সালে আমরা আমার মাকে যত্ন নেওয়ার জন্য বাড়ি ফিরে যাই। সেই একই মাসে আমার বাবা মারা যায় এবং আমার মা একা হয়ে পড়েন। পূর্ণ-সময়ের কাজের আংশিকভাবে খালি হওয়ার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রে, সীমার কাজ করার কার্যভার পাই। পরের ২০টা বছর ধরে স্প্যানিশ সীমাতে পরিচর্যা করি। যদিও আমরা মিশনারি কাজের মহামূল্যবান মুক্তা হারিয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের হাতে আরেকটি এসে পড়েছিল।
ড্রাগ ও দৌরাত্ম্যের মাঝে প্রচার করা
যে সব ভাই ও বোনেরা শহরের অপরাধ-সঙ্কুল এলাকাতে বাস করত তাদের সাথে এখন আমরা কাজ করতে আরম্ভ করি। নিউ ইয়র্ক, ব্রুকলিনে আমাদের সীমার কাজের প্রথম সপ্তাহে রীতার পকেট বই কেঁড়ে নেওয়া হয়।
আরেকটি সময়ে নিউ ইয়র্ক শহরের অন্য একটি এলাকাতে আমি ও রীতা একটি দলের সাথে গৃহ থেকে গৃহে প্রচার কাজে লিপ্ত ছিলাম। মোড় ঘুরবার পর, একটি পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে গর্তের চারিপাশে কিছু লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। সেই রাস্তায় আরও কিছুটা যাওয়ার পর আমরা আরেকটি যুবক ব্যক্তিকে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি যে আমাদের দিকে তাকিয়েছিল। পুলিশের গাড়ি দেখবার জন্য রাস্তার শেষ প্রান্তে আরেকজন দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা ড্রাগের চোরা চালানের মাঝখানে এসে পড়েছিলাম! প্রথম ব্যক্তি অবাক হয়ে পড়ে কিন্তু যখন আমাদের হাতে সে প্রহরীদুর্গ পত্রিকা দেখে তখন তার উপশম হয়। আমি হয়ত পুলিশ অফিসার হতে পারতাম! তারপর সে স্পানিশ ভাষায় জোরে বলতে লাগল “ইলোস এটালায়াস! ইলোস এটালায়াস!” (প্রহরীদুর্গেরা! প্রহরীদুর্গেরা!)। পত্রিকা দেখে তারা আমাদের শনাক্ত করতে পারে এবং তারপর সবকিছু ঠিক হয়ে যায়। তার কাছ থেকে যাওয়ার সময়, আমি তাকে বলি, “বুওনস ডিয়াস, কোমো ইস্টা?” (সুপ্রভাত, আপনি কেমন আছেন?) সে উত্তর দেয় যে তার বিষয় যেন আমি প্রার্থনা করি!
একটি কঠিন সিদ্ধান্ত
১৯৯০ সালে এটি স্পষ্ট হয়ে গেল যে আমাকে, মায়ের সাথে প্রতিদিন থাকতে হবে। আমরা ভ্রমণ কাজে থাকবার চেষ্টা করি, কিন্তু বিবেক বলে যে আমরা একই সাথে দুটি কাজ করতে পারব না। আমরা বাস্তবিকই নিশ্চিত হতে চাইছিলাম যে মায়ের যেন প্রেমময় যত্ন নেওয়া হয়। কিন্তু আবার আমাদের একটি মহামূল্যবান মুক্তা ছাড়তে হচ্ছিল যা আমাদের কাছে অতি মূল্যবান ছিল। যিহোবার সংগঠনে মিশনারি হিসাবে কাজ অথবা ভ্রমণ অধ্যক্ষের কাজের রত্নগুলি, জগতের সমস্ত প্রকৃত রত্ন ও তা যা আমাদের জন্য করতে পারে তার তুলনায় খুবই অল্প।
রীতা এবং আমার বয়স এখন ৬০ বছর। স্থানীয় একটি স্পানিশ-ভাষার মণ্ডলীতে কাজ করতে পেরে আমরা পরিতৃপ্ত এবং আনন্দিত। যিহোবার সেবায় আমাদের বিগত জীবনের কথা চিন্তা করলে আমাদের কিছু মহামূল্যবান মুক্তা গচ্ছিত রাখার জন্য আমরা তাঁকে ধন্যবাদ দিতে চাই।
[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]
রীতা ও পৌল এবং এভলিন হান্ডার্টমার্কের সাথে (ডানদিকে) মাড্রিদে বুলরিঙের বাইরে
[২৪ পৃষ্ঠার চিত্র]
জঙ্গলে “পিকনিক” করতে গিয়ে একটি মণ্ডলীকে সেবা করা