যিহোবা যেমন ক্ষমা করেন আপনি কি তেমন করেন?
“তোমরা যদি লোকের অপরাধ ক্ষমা কর, তবে তোমাদের স্বর্গীয় পিতা তোমাদিগকেও ক্ষমা করিবেন। কিন্তু তোমরা যদি লোকদিগকে ক্ষমা না কর, তবে তোমাদের পিতা তোমাদেরও অপরাধ ক্ষমা করিবেন না।”—মথি ৬:১৪, ১৫.
১, ২. কী ধরনের ঈশ্বরের আমাদের প্রয়োজন এবং কেন?
“যিহোবা স্নেহশীল ও কৃপাময়, ক্রোধে ধীর ও দয়াতে মহান। তিনি সবসময়ে অনুযোগ করবেন না, চিরকাল ক্রোধ রাখবেন না। তিনি আমাদের প্রতি আমাদের পাপানুযায়ী ব্যবহার করেন না, আমাদের অধর্ম্মানুযায়ী প্রতিফল আমাদিগকে দেন না। কারণ পৃথিবীর উপরে আকাশমণ্ডল যত উচ্চ, যারা তাঁকে ভয় করে, তাদের উপরে তাঁর দয়া তত মহৎ। পশ্চিম দিক্ থেকে পূর্ব্ব দিক্ যেমন দূরবর্ত্তী, তিনি আমাদের থেকে আমাদের অপরাধ সকল তেমনি দূরবর্ত্তী করেছেন। পিতা সন্তানদের প্রতি যেমন করুণা করে, যারা সদাপ্রভুকে ভয় করে, তাদের প্রতি তিনি তেমনি করুণা করেন। কারণ তিনিই আমাদের গঠন জানেন; আমরা যে ধূলিমাত্র, এটা তাঁর স্মরণে আছে।”—গীতসংহিতা ১০৩:৮-১৪, NW.
২ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অসিদ্ধতার সাথে সাথে পাপে গর্ভে ধারণ ও অপরাধে জন্ম আমাদেরকে সর্বদাই পাপের নিয়মে আবদ্ধ হতে পরিচালিত করে, তাই আমাদের একান্তভাবে একজন ঈশ্বরের প্রয়োজন যিনি ‘আমরা যে ধূলিমাত্র, তা স্মরণে রাখেন।’ গীত ১০৩ অধ্যায়ে দায়ূদের যিহোবাকে খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করার তিনশো বছর পরে, আর একজন বাইবেল লেখক মীখা, একজনের পাপের প্রতি তাঁর কৃপাময় ক্ষমার জন্য একইভাবে সেই একই ঈশ্বরের উচ্চ-প্রশংসা করেন: “তোমার সাথে কোন্ ঈশ্বরের তুলনা করা যেতে পারে: দোষ অপসারণকারী, অপরাধ ক্ষমাকারী, যিনি চিরকাল ক্রোধ রাখেন না, কিন্তু তিনি দয়ায় প্রীত? তিনি পুনরায় আমাদের প্রতি করুণা করবেন; তিনি আমাদের সমস্ত পাপ পদতলে দলিত করবেন; আমাদের সমস্ত পাপ সমুদ্রের অগাধ জলে নিক্ষেপ করবেন।”—মীখা ৭:১৮, ১৯, দ্যা যিরূশালেম বাইবেল
৩. ক্ষমা করার অর্থ কী?
৩ গ্রীক শাস্ত্রাবলীতে “ক্ষমা করা” কথাটির অর্থ “ছেড়ে দেওয়া।” লক্ষ্য করুন, দায়ূদ ও মীখা উপরে যা উদ্ধৃতি করেছেন, মনোরম ও চিত্রানুগ বাক্যগুলিতে তা একই অর্থ জ্ঞাপন করে। যিহোবার বিস্ময়াভিভূত ব্যাপক ক্ষমাশীলতাকে পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে, আসুন বহু উদাহরণগুলির মধ্যে কয়েকটি পুনরালোচনা করি। প্রথমটি দেখায় যে যিহোবার মন ধ্বংস করা থেকে ক্ষমা করাতে পরিবর্তন করা যায়।
মোশি মধ্যস্থতা করেন—যিহোবা শোনেন
৪. যিহোবার ক্ষমতার কোন্ কোন্ নমুনা দেখানোর পরও ইস্রায়েলীয়রা প্রতিজ্ঞাত দেশে প্রবেশ করতে ভয় পেয়েছিল?
৪ যিহোবা ইস্রায়েল জাতিকে নিরাপদে মিশর থেকে বার করে আনেন এবং দেশটিকে তাদের মাতৃভূমি হিসাবে দেবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন তার কাছে নিয়ে আসেন, কিন্তু কেবলমাত্র কনানের লোকেদের ভয়ে ভীত হয়ে তারা এগোতে অস্বীকার করে। মিশর থেকে তাদের উদ্ধার করতে যিহোবার মারাত্মক দশটি আঘাত, লোহিত সমুদ্রের মধ্য দিয়ে পালাবার পথ খুলে দেওয়া, তাদের পশ্চাৎধাবণকারী মিশরীয় সৈন্যদের ধ্বংস, সিনয় পর্বতে তাদের সাথে নিয়ম চুক্তি প্রবর্তন যা তাদের যিহোবার মনোনীত জাতি করে এবং তাদের বাঁচিয়ে রাখতে অলৌকিকভাবে স্বর্গ থেকে প্রতিদিন মান্না যোগানো, এই সব দেখার পরও তারা কিছু দৈত্য-তুল্য কনানীয়দের দেখে প্রতিজ্ঞাত দেশে প্রবেশ করতে ভয় পায়।—গণনাপুস্তক ১৪:১-৪.
৫. দুইজন বিশ্বস্ত চর কিভাবে ইস্রায়েলকে চেতনাবোধ দেবার চেষ্টা করেছিলেন?
৫ মোশি ও হারোণ হতবুদ্ধি হয়ে তাদের সম্মুখে উবুড় হয়ে পড়েন। দুইজন বিশ্বস্ত চর, যিহোশূয় ও কালেব ইস্রায়েলকে নতুন চেতনাবোধ দান করতে চেষ্টা করেন: ‘সে দেশ এক অতি উত্তম, দুগ্ধ দুগ্ধমধুপ্রবাহী দেশ সে দেশের লোকদের ভয় করোও না; সদাপ্রভু আমাদের সহবর্ত্তী।’ এই কথাগুলির দ্বারা উৎসাহিত হওয়ার পরিবর্তে, আতঙ্কিত, বিদ্রোহী লোকেরা যিহোশূয় ও কালেবকে পাথর দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করে।—গণনাপুস্তক ১৪:৫-১০.
৬, ৭. (ক) যখন ইস্রায়েল প্রতিজ্ঞাত দেশে প্রবেশ করতে বিমুখ হয় যিহোবা কী করতে মনস্থ করেছিলেন? (খ) কেন মোশি ইস্রায়েলের উপর যিহোবার বিচারাজ্ঞার প্রতিবাদ করেছিলেন এবং ফল কী হয়েছিল?
৬ যিহোবা ক্রুদ্ধ হন! “আর সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, এই লোকেরা কত কাল আমাকে অবজ্ঞা করিবে? এবং আমি ইহাদের মধ্যে যে সকল চিহ্ন-কার্য্য করিয়াছি, তাহা দেখিয়াও ইহারা কত কাল আমার প্রতি অবিশ্বাসী থাকিবে? আমি মহামারী দ্বারা ইহাদিগকে আঘাত করিব, ইহাদিগকে অধিকার-বঞ্চিত করিব, এবং তোমাকেই ইহাদের অপেক্ষা বৃহৎ ও বলবান্ জাতি করিব। তাহাতে মোশি সদাপ্রভুকে কহিলেন, তাহা করিলে মিস্রীয়েরা তাহা শুনিবে, কেননা তাহাদেরই মধ্য হইতে তুমি আপন শক্তি দ্বারা এই লোকদিগকে আনিয়াছ; আর তাহারা এই দেশনিবাসী লোকদিগকেও তাহার সংবাদ দিবে। . . . এখন যদি তুমি এই লোকদিগকে এক ব্যক্তির ন্যায় বধ কর, তবে ঐ যে জাতিগণ তোমার খ্যাতি শুনিয়াছে, তাহারা বলিবে, সদাপ্রভু এই লোকদিগকে যে দেশ দিতে শপথ করিয়াছিলেন, সেই দেশে তাহাদিগকে প্রবেশ করাইতে অপারক হইলেন; এই জন্য প্রান্তরে তাহাদিগকে সংহার করিলেন।”—গণনাপুস্তক ১৪:১১-১৬.
৭ মোশি যিহোবার নামে, ক্ষমা প্রার্থনা করেন: “বিনয় করি, তোমার দয়ার মহত্ত্বানুসারে, এবং মিসর দেশ হইতে এ পর্য্যন্ত এই লোকদিগকে যেমন ক্ষমা করিয়া আসিতেছ, তদনুসারে এই লোকদের অপরাধ ক্ষমা কর। তখন সদাপ্রভু কহিলেন, তোমার বাক্যানুসারে আমি ক্ষমা করিলাম।”—গণনাপুস্তক ১৪:১৯, ২০.
মনঃশির প্রতিমাপূজা এবং দায়ূদের ব্যভিচার
৮. যিহূদার রাজা মনঃশি কী ধরনের রেকর্ড রেখেছিলেন?
৮ যিহোবার ক্ষমাশীলতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল, উত্তম রাজা হিষ্কিয়ের পুত্র মনঃশির ব্যাপারটি। মনঃশির যখন ১২ বছর বয়স, তিনি যিরূশালেমে রাজত্ব করতে আরম্ভ করেন। তিনি উচ্চস্থলী নির্মাণ করেন, বাল দেবগণের জন্য যজ্ঞবেদি প্রস্তুত করেন, পবিত্র স্তম্ভ নির্মাণ করেন, আকাশের নক্ষত্রদের কাছে প্রণিপাত করেন, ভূতড়িয়া ও গুণীদের রাখেন, খোদিত এক প্রতিমা যিহোবার মন্দিরে স্থাপন করেন এবং আপন সন্তানদের হিন্নোম উপত্যকায় অগ্নির মধ্যে দিয়ে গমন করান। “তিনি সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে বহুল কদাচরণ করিয়া তাঁহাকে অসন্তুষ্ট করিলেন।” আর “যিহূদাকে ও যিরূশালেম-নিবাসীদিগকে বিপথগামী করিলেন, তাহাতে সদাপ্রভু ইস্রায়েল-সন্তানদের সম্মুখ হইতে যে জাতিদিগকে বিনষ্ট করিয়াছিলেন, উহারা তাহাদের অপেক্ষা অধিক কদাচরণ করিত।”—২ বংশাবলি ৩৩:১-৯.
৯. মনঃশির প্রতি যিহোবার ক্রোধ কিভাবে কোমল হয়েছিল এবং এর ফল কী হয়েছিল?
৯ অবশেষে, যিহোবা যিহূদার বিরুদ্ধে অশূরীয়দের আনেন এবং তারা মনঃশিকে বন্দী করে বাবিলনে নিয়ে যায়। “তখন সঙ্কটাপন্ন হইয়া তিনি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর কাছে বিনতি করিলেন, ও আপন পিতৃপুরুষদের ঈশ্বরের সম্মুখে আপনাকে অতিশয় অবনত করিলেন। এইরূপে তাঁহার কাছে প্রার্থনা করিলে তিনি তাঁহার প্রার্থনা গ্রাহ্য করিলেন, তাঁহার বিনতি শুনিয়া তাঁহাকে পুনর্ব্বার যিরূশালেমে তাঁহার রাজ্যে আনিলেন।” (২ বংশাবলি ৩৩:১১-১৩) তারপর মনঃশি বিজাতীয় দেবগণকে, প্রতিমাগণকে ও যজ্ঞবেদি সকল সরিয়ে, সেগুলিকে নগর থেকে বার করে দিলেন। তিনি যিহোবার বেদির উপর বলি উৎসর্গ করতে আরম্ভ করেন আর যিহূদাকে সত্য ঈশ্বরের সেবা করতে আরম্ভ করান। যিহোবার স্বেচ্ছায় ক্ষমা করার এটি ছিল এক বিস্ময়কর নমুনা, যখন নম্রতা, প্রার্থনা, সংশোধনকারী কাজ অনুতাপের উপযুক্ত হয়ে ফল উৎপন্ন করে!—২ বংশাবলি ৩৩:১৫, ১৬.
১০. ঊরিয়ের স্ত্রীয়ের সাথে তার পাপ দায়ূদ কিভাবে ঢাকতে চেষ্টা করেছিলেন?
১০ হিত্তীয় ঊরিয়ের স্ত্রীয়ের সাথে রাজা দায়ূদের ব্যভিচারমূলক পাপ হল সুপরিচিত। তিনি কেবলমাত্র তার সাথে ব্যভিচারই করেননি কিন্তু যখন সে গর্ভবতী হয়, তখন তা ঢাকবার জন্য তিনি এক বিরাট মিথ্যা জাল পাতেন। সে তার ঘরে গিয়ে তার স্ত্রীর সাথে যৌনসহবাস করবে এই আশায়, রাজা ঊরিয়কে যুদ্ধস্থল থেকে ছুটি দেন। কিন্তু, যুদ্ধক্ষেত্রে তার সহসৈন্যদের প্রতি শ্রদ্ধাবশত, ঊরিয় তা প্রত্যাখ্যান করে। তারপর দায়ূদ তাকে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে তাকে মত্ত করেন, কিন্তু তবুও ঊরিয় তার স্ত্রীর কাছে গেল না। তখন দায়ূদ তার প্রধান সেনাপতির কাছে সংবাদ পাঠান ঊরিয়কে যুদ্ধের সামনে নিযুক্ত করতে যাতে ঊরিয় মারা যায়, আর সেটাই ঘটে।—২ শমূয়েল ১১:২-২৫.
১১. দায়ূদ তার পাপের জন্য কিভাবে অনুতাপ দেখিয়েছিলেন, তথাপি কী তিনি ভোগ করেছিলেন?
১১ রাজার পাপকে প্রকাশ করতে যিহোবা তাঁর ভাববাদী নাথনকে দায়ূদের কাছে পাঠান। “তখন দায়ূদ নাথনকে কহিলেন, আমি সদাপ্রভুর বিরুদ্ধে পাপ করিয়াছি। নাথন দায়ূদকে কহিলেন, সদাপ্রভুও আপনার পাপ দূর করিলেন, আপনি মরিবেন না।” (২ শমূয়েল ১২:১৩) দায়ূদ তার পাপের জন্য খুবই দোষী মনে করেন আর যিহোবাকে আন্তরিক প্রার্থনায় তার অনুশোচনা প্রকাশ করেন: “কেননা তুমি বলিদানে প্রীত নহ, হইলে তাহা দিতাম হোমে তোমার সন্তোষ নাই। ঈশ্বরের গ্রাহ্যবলি ভগ্ন আত্মা; হে ঈশ্বর, তুমি ভগ্ন ও চূর্ণ অন্তঃকরণ তুচ্ছ করিবে না।” (গীতসংহিতা ৫১:১৬, ১৭) ভগ্ন হৃদয় থেকে দায়ূদের নিবেদিত প্রার্থনা যিহোবা তুচ্ছ করেননি। তবুও, ক্ষমা সম্বন্ধে যাত্রাপুস্তক ৩৪:৬, ৭ পদে “তিনি অবশ্য [পাপের] দণ্ড দেন,” যিহোবার এই বিবৃতির সাথে মিল রেখে দায়ূদকে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়।
শলোমনের মন্দিরের উৎসর্গীকরণ
১২. মন্দির উৎসর্গের সময়ে শলোমন কী প্রার্থনা করেছিলেন এবং যিহোবা কী উত্তর দিয়েছিলেন?
১২ যখন শলোমন যিহোবার মন্দিরের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন, তিনি উৎসর্গের প্রার্থনায় বলেছিলেন: “তোমার দাস ও তোমার লোক ইস্রায়েল যখন এই স্থানের অভিমুখে প্রার্থনা করিবে, তখন তাহাদের সকল বিনতিতে কর্ণপাত করিও; তোমার নিবাস-স্থান হইতে, স্বর্গ হইতে, তাহা শুনিও, এবং শুনিয়া ক্ষমা করিও।” যিহোবা উত্তর দিয়েছিলেন: “আমি যদি আকাশ রুদ্ধ করি, আর বৃষ্টি না হয়, কিম্বা দেশ বিনষ্ট করিতে পঙ্গপালদিগকে আজ্ঞা করি, অথবা আপন প্রজাদের মধ্যে মহামারী প্রেরণ করি, আমার প্রজারা, যাহাদের উপরে আমার নাম কীর্ত্তিত হইয়াছে, তাহারা যদি নম্র হইয়া প্রার্থনা করে ও আমার মুখের অন্বেষণ করে, এবং আপনাদের কুপথ হইতে ফিরে, তবে আমি স্বর্গ হইতে তাহা শুনিব, তাহাদের পাপ ক্ষমা করিব ও তাহাদের দেশ আরোগ্য করিব।”—২ বংশাবলি ৬:২১; ৭:১৩, ১৪.
১৩. একজন ব্যক্তির বিষয়ে যিহোবার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে যিহিষ্কেল ৩৩:১৩-১৬ পদ কী দেখায়?
১৩ যখন যিহোবা আপনার প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তিনি আপনি বর্তমানে যা আছেন সেটাই দেখে আপনাকে গ্রহণ করেন, আপনি কী ছিলেন তা দেখে নয়। এটি হবে যেমন যিহিষ্কেল ৩৩:১৩-১৬ পদ বল তার মত: “যখন আমি ধার্ম্মিকের উদ্দেশে বলি, সে অবশ্য বাঁচিবে, তখন যদি সে আপন ধার্ম্মিকতায় নির্ভর করিয়া অন্যায় করে, তবে তাহার সমস্ত ধর্ম্মকর্ম্ম আর স্মরণ হইবে না; সে যে অন্যায় করিয়াছে, তাহাতেই মরিবে। আর, যখন আমি দুষ্টকে বলি, তুমি মরিবেই মরিবে, তখন যদি সে আপন পাপ হইতে ফিরিয়া ন্যায় ও ধর্ম্মাচরণ করে - সেই দুষ্ট যদি বন্ধক ফিরাইয়া দেয়, অপহৃত দ্রব্য পরিশোধ করে, এবং অন্যায় না করিয়া জীবনদায়ক বিধি-পথে চলে - তবে অবশ্য বাঁচিবে, সে মরিবে না। তাহার কৃত সমস্ত পাপ আর তাহার বলিয়া স্মরণ হইবে না; সে ন্যায় ও ধর্ম্মাচরণ করিয়াছে, অবশ্য বাঁচিবে।”—যিহিষ্কেল ৩৩:১৩-১৬.
১৪. যিহোবার ক্ষমাশীলতার বৈশিষ্ট্য কী?
১৪ যে ক্ষমা যিহোবা আমাদের প্রদান করেন তার একটি বৈশিষ্ট্যসূচক প্রকৃতি আছে, যা মনুষ্য প্রাণীদের পক্ষে একে অপরের প্রতি ক্ষমা করার সময় অন্তর্ভুক্ত করতে কঠিন হয়ে পড়ে—তিনি উভয়ই, ক্ষমা করেন এবং ভুলে যান। কেউ কেউ বলবে, ‘আপনি যা করেছেন আমি ক্ষমা করতে পারি, কিন্তু আমি তা ভুলে যেতে পারি না (অথবা চাই না)।’ বিপরীতে, লক্ষ্য করুন, যিহোবা কী করবেন বলে তিনি বলেন: “আমি তাহাদের অপরাধ ক্ষমা করিব, এবং তাহাদের পাপ আর স্মরণে আনিব না।”—যিরমিয় ৩১:৩৪.
১৫. যিহোবার ক্ষমাশীলতার কী রেকর্ড আছে?
১৫ হাজার হাজার বছর ধরে যিহোবা পৃথিবীতে তাঁর উপাসকদের ক্ষমা করছেন। যে পাপগুলি সম্পর্কে তারা সচেতন এবং যেগুলি সম্পর্কে সচেতন নয়, তা তিনি ক্ষমা করছেন। তাঁর দয়া, দীর্ঘসহিষ্ণুতা ও ক্ষমা প্রদানের কোন শেষ নেই। যিশাইয় ৫৫:৭ পদ বলে: “দুষ্ট আপন পথ, অধার্ম্মিক আপন সঙ্কল্প ত্যাগ করুক; এবং সে সদাপ্রভুর প্রতি ফিরিয়া আইসুক, তাহাতে তিনি তাহার প্রতি করুণা করিবেন; আমাদের ঈশ্বরের প্রতি ফিরিয়া আইসুক, কেননা তিনি প্রচুররূপে ক্ষমা করিবেন।”
খ্রীষ্টীয় গ্রীকশাস্ত্রাবলীতে ক্ষমা
১৬. কেন আমরা বলতে পারি যীশুর ক্ষমাশীলতার অনুশীলন যিহোবার সাথে সামঞ্জস্য?
১৬ ঈশ্বরের ক্ষমাশীলতার বিবরণ খ্রীষ্টীয় গ্রীকশাস্ত্রাবলীতে ব্যাপকভাবে লিপিবদ্ধ। এই বিষয়ে তিনি যে যিহোবার সাথে একমত, তা দেখিয়ে যীশু প্রায়ই এই সম্পর্কে কথা বলতেন। যিহোবার কাছ থেকেই যীশুর চিন্তাধারা আসে, তিনি যিহোবাকে প্রতিফলিত করেন, তিনি একেবারে অবিকল যিহোবার প্রতিরূপ হন; তাঁকে দেখা মানে যে যিহোবাকে দেখা।—যোহন ১২:৪৫-৫০; ১৪:৯; ইব্রীয় ১:৩.
১৭. যিহোবার “প্রচুররূপে” ক্ষমা করাকে যীশু কিভাবে চিত্রিত করেছিলেন?
১৭ যিহোবা যে প্রচুররূপে ক্ষমা করেন তা নির্দেশিত হয় যীশুর দৃষ্টান্তগুলির একটিতে, যেটি ছিল একজন রাজার যিনি একটি দাসের ১০,০০০ তালন্ত (প্রায় ৩,৩০,০০,০০০ আমেরিকান ডলার) ঋণ ক্ষমা করেন। কিন্তু যখন সেই দাসটি একজন সহদাসের এক শত সিকি (প্রায় ৬০ আমেরিকান ডলার) ঋণ ক্ষমা করে না, রাজা ক্রোধান্বিত হন। “দুষ্ট দাস! “তুমি আমার কাছে বিনতি করাতে আমি তোমার ঐ সমস্ত ঋণ ক্ষমা করিয়াছিলাম; আমি যেমন তোমার প্রতি দয়া করিয়াছিলাম, তেমনি তোমার সহদাসের প্রতি দয়া করা কি তোমারও উচিত ছিল না? আর তাহার প্রভু ক্রুদ্ধ হইয়া পীড়নকারীদের নিকটে তাহাকে সমর্পণ করিলেন, যে পর্য্যন্ত সে সমস্ত ঋণ পরিশোধ না করে।” তারপর যীশু প্রয়োগটি করেন: “আমার স্বর্গীয় পিতাও তোমাদের প্রতি এইরূপ করিবেন, যদি তোমরা প্রতিজন অন্তঃকরণের সহিত আপন আপন ভ্রাতাকে ক্ষমা না কর।”—মথি ১৮:২৩-৩৫.
১৮. পিতরের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে যীশুর ক্ষমার দৃষ্টিভঙ্গি কিভাবে তুলনা করা যায়?
১৮ যীশুর উপরোক্ত দৃষ্টান্তটি দেওয়ার ঠিক আগে, পিতর যীশুর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন: “প্রভু, আমার ভ্রাতা আমার নিকটে কত বার অপরাধ করিলে আমি তাহাকে ক্ষমা করিব? কি সাত বার পর্য্যন্ত?” পিতর মনে করেছিলেন তিনি খুব উদার ছিলেন। যদিও অধ্যাপক ও ফরীশীরা ক্ষমাশীলতার উপর একটি সীমা নির্ধারণ করেছিল, যীশু পিতরকে বলেন: “তোমাকে বলিতেছি না, সাত বার পর্য্যন্ত, কিন্তু সত্তর গুণ সাত বার পর্য্যন্ত।” (মথি ১৮:২১, ২২) এক দিনের জন্য সাত বার খুবই কম হবে, যেমন যীশু বলেন: “তোমরা আপনাদের বিষয়ে সাবধান থাক। তোমার ভ্রাতা যদি পাপ করে, তাহাকে অনুযোগ করিও; আর সে যদি অনুতাপ করে, তাহাকে ক্ষমা করিও। আর যদি সে এক দিনের মধ্যে সাত বার তোমার বিরুদ্ধে পাপ করে, আর সাত বার তোমার কাছে ফিরিয়া আসিয়া বলে, অনুতাপ করিলাম, তবে তাহাকে ক্ষমা করিও।” (লূক ১৭:২-৩; ১৭:৩-৪) যখন যিহোবা আমাদের ক্ষমা করেন, তিনি আমাদের পাপের হিসাব রাখেন না—আমাদের জন্য তা আনন্দের।
১৯. যিহোবার ক্ষমা লাভ করতে আমাদের অবশ্যই কী করতে হবে?
১৯ আমরা যদি অনুতপ্ত হতে ও আমাদের পাপ স্বীকার করতে নম্রতা দেখাই, যিহোবা আমাদের অনুকূলে সাড়া দিতে সম্মত হন: “যদি আমরা আপন আপন পাপ স্বীকার করি, তিনি বিশ্বস্ত ও ধার্ম্মিক, সুতরাং আমাদের পাপ সকল মোচন করিবেন, এবং আমাদিগকে সমস্ত অধার্ম্মিকতা হইতে শুচি করিবেন।”—১ যোহন ১:৯.
২০. পাপ ক্ষমা করার বিষয়ে স্তিফান কী ইচ্ছা দেখিয়েছিলেন?
২০ এক ক্রুদ্ধ জনতা যখন তাকে পাথর ছুড়ে আঘাত করছিল তখন যীশুর অনুসরণকারী স্তিফান উচ্চঃস্বরে এই প্রার্থনা করে ক্ষমাশীলতার এক লক্ষণীয় আত্মা প্রদর্শন করেন: “হে প্রভু যীশু, আমার আত্মাকে গ্রহণ কর। পরে তিনি হাঁটু পাতিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, প্রভু ইহাদের বিপক্ষে এই পাপ ধরিও না। ইহা বলিয়া তিনি নিদ্রাগত হইলেন।”—প্রেরিত ৭:৫৯, ৬০.
২১. রোমীয় সৈন্যদেরকে যীশুর ক্ষমা করার ইচ্ছা কেন অতীব আশ্চর্যের ছিল?
২১ এমনকি যীশু ক্ষমা করার ইচ্ছার আরও বেশি অভিনব এক উদাহরণ স্থাপন করেন। তাঁর শত্রুরা তাঁকে গ্রেপ্তার করে, অবৈধভাবে তাঁকে জেরা করে, অপরাধী বলে প্রতিপন্ন করে, তাঁকে ঠাট্টা করে, তাঁর উপর থুথু দেয়, চাবুকের আগায় লাগান ফিতা যার আগায় সম্ভবত হাড় ও ধাতুর টুকরো থাকত তা দিয়ে প্রহার করে এবং অবশেষে বেশ কিছু ঘন্টার জন্য তাঁকে কাষ্ঠদণ্ডে পেরেকে বিদ্ধ করে রাখে। রোমীয়েরা বেশি করে এতে জড়িত ছিল। তথাপি, যখন যীশু কাষ্ঠদণ্ডে মারা যাচ্ছেন, তিনি তাঁর স্বর্গীয় পিতাকে সেই সৈন্যদের সম্বন্ধে, যারা তাঁকে বিদ্ধ করেছিল বলেন: “পিতঃ, ইহাদিগকে ক্ষমা কর, কেননা ইহারা কি করিতেছে, তাহা জানে না।”—লূক ২৩:৩৪.
২২. পর্বতে দত্ত উপদেশ থেকে কোন্ কথাগুলি আমাদের অবশ্যই অনুশীলন করতে চেষ্টা করা উচিত?
২২ তাঁর পর্বতে দত্ত উপদেশে, যীশু বলেছিলেন: “তোমরা আপন আপন শত্রুদিগকে প্রেম করিও, এবং যাহারা তোমাদিগকে তাড়না করে তাহাদের জন্য প্রার্থনা করিও।” তাঁর পার্থিব পরিচর্যার শেষ পর্যন্ত, তিনি নিজে সেই নীতিকে পালন করেছিলেন। সেটি আমাদের পক্ষে কি খুব কঠিন, আমরা যারা মাংসিক দুর্বলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি? তাঁর অনুসরণকারীদের আদর্শ প্রার্থনা সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ার পর যীশু যে কথাগুলি বলেছিলেন, অন্ততপক্ষে আমাদের তা অনুশীলন করতে চেষ্টা করা উচিত: “তোমরা যদি লোকের অপরাধ ক্ষমা কর, তবে তোমাদের স্বর্গীয় পিতা তোমাদিগকেও ক্ষমা করিবেন। কিন্তু তোমরা যদি লোকদিগকে ক্ষমা না কর, তবে তোমাদের পিতা তোমাদেরও অপরাধ ক্ষমা করিবেন না।” (মথি ৫:৪৪; ৬:১৪, ১৫) যিহোবা যেমন ক্ষমা করেন, আমরা যদি তা করি, তাহলে আমরাও ক্ষমা করব ও ভুলে যাব।
আপনার কি স্মরণে আছে?
◻ যিহোবা আমাদের পাপের সাথে কিরূপ আচরণ করেন এবং কেন?
◻ কেন মনঃশি তার রাজপদে পুনর্প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন?
◻ যিহোবার ক্ষমাশীলতার কোন্ বৈশিষ্ট্য মানুষের পক্ষে অনুকরণ করা চ্যালেঞ্জস্বরূপ?
◻ কিভাবে যীশুর ক্ষমা করার ইচ্ছা অতীব আশ্চর্যজনক ছিল?
[২৭ পৃষ্ঠার চিত্র]
ইশ্বরের ক্ষমা পেতে কী প্রয়োজন তা দেখতে নাথন দায়ূদকে সাহায্য করেছিলেন