যিহোবা শাসন করেন—ঈশতন্ত্রের মাধ্যমে
“যিহোবা চিরকাল রাজত্ব করবেন।”—গীতসংহিতা ১৪৬:১০, NW.
১, ২. (ক) শাসনের ক্ষেত্রে মানুষের প্রচেষ্টা কেন বিফল হয়েছে? (খ) কোন্ ধরনের সরকার কেবলমাত্র প্রকৃত সফলকামী সরকার হয়েছে?
নিম্রোদের সময়কাল থেকে মানুষ বিভিন্ন উপায়ে মানব সমাজকে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছে। একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র, কতিপয় লোক দ্বারা শাসনতন্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের গণতন্ত্র ছিল। যিহোবা সকল তন্ত্রকেই অনুমতি দিয়েছেন। বাস্তবিকই, যেহেতু ঈশ্বর হলেন সকল অধিকারের একমাত্র উৎস, তাই এক অর্থে তিনি বিভিন্ন শাসকগণকে তাদের আপেক্ষিক স্থানে স্থাপন করেছেন। (রোমীয় ১৩:১) তবুও, শাসন করার ক্ষেত্রে মানুষের সকল প্রচেষ্টা বিফল হয়েছে। কোন মানব সরকারই চিরন্তন, স্থায়ী, নীতিবান একটি সমাজ সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রায়ই ‘এক জন অন্যের উপরে তাহার অমঙ্গলার্থে কর্ত্তৃত্ব করেছে।’—উপদেশক ৮:৯.
২ এই বিষয়টি কি আমাদের আশ্চর্যান্বিত করবে? অবশ্যই না! অসিদ্ধ মানবকে নিজেদের উপর শাসন করতে সৃষ্টি করা হয়নি। “মনুষ্যের পথ তাহার বশে নয়, মনুষ্য চলিতে চলিতে আপন পাদবিক্ষেপ স্থির করিতে পারে না।” (যিরমিয় ১০:২৩) সেই কারণে, সমগ্র মানব ইতিহাসে কেবলমাত্র এক ধরনের সরকার প্রকৃতই সফল হয়েছে। কোন্টি? যিহোবা ঈশ্বরের অধীনে ঈশতন্ত্র। বাইবেলের গ্রীক ভাষায়, “ঈশতন্ত্র” শব্দের অর্থ, ঈশ্বরের [থি.অস্] দ্বারা শাসন [ক্র্যা’টোস্]। স্বয়ং যিহোবা ঈশ্বরের সরকার থেকে আর কোন সরকার উত্তম হতে পারে কি?—গীতসংহিতা ১৪৬:১০.
৩. পৃথিবীতে ঈশতন্ত্রের প্রাচীন উদাহরণগুলি কি কি?
৩ অল্পকালের জন্য এদনে ঈশতন্ত্র শাসন করে, যতদিন আদম ও হবা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেনি। (আদিপুস্তক ৩:১-৬, ২৩) অব্রাহামের সময়ে, রাজা-যাজক মল্কীষেদককে নিয়ে শালেম নগরে মনে হয় ঈশতন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল। (আদিপুস্তক ১৪:১৮-২০; ইব্রীয় ৭:১-৩) কিন্তু, সা.শ.পূ. ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে সিনয়ের প্রান্তরে যিহোবার অধীনে প্রথম জাতীয় ঈশতন্ত্রর প্রতিষ্ঠা হয়। এর কিভাবে উদ্ভব হয়? আর কিভাবে সেই ঐশিক সরকার কাজ করে?
এক ঈশতন্ত্রের সৃষ্টি হয়েছে
৪. যিহোবা কিভাবে ঐশিক ইস্রায়েল জাতি স্থাপন করেন?
৪ সা.শ.পূ. ১৫১৩ সালে, যিহোবা ইস্রায়েলীয়দের মিশরের দাসত্ব থেকে রক্ষা করেন এবং পশ্চাদ্ধাবনকারী ফরৌণের সৈন্যদের লোহিত সমুদ্রে বিনাশ করেন। তারপর তিনি ইস্রায়েলীয়দের সিনয় পর্বতে নিয়ে যান। যখন তারা পর্বতের পাদদেশে শিবির স্থাপন করে তখন তিনি তাদের মোশির মাধ্যমে বলেন: “আমি মিস্রীয়দের প্রতি যাহা করিয়াছি, এবং যেমন ঈগল পক্ষী পক্ষ দ্বারা, তেমনি তোমাদিগকে বহিয়া আপনার নিকটে আনিয়াছি, তাহা তোমরা দেখিয়াছ। এখন যদি তোমরা আমার রবে অবধান কর ও আমার নিয়ম পালন কর, তবে তোমরা সকল জাতি অপেক্ষা আমার নিজস্ব অধিকার হইবে।” ইস্রায়েলীয়রা সাড়া দেয়: “সদাপ্রভু যাহা কিছু বলিয়াছেন, আমরা সমস্তই করিব।” (যাত্রাপুস্তক ১৯:৪, ৫, ৮) একটি চুক্তি করা হয় এবং ঐশিক ইস্রায়েল জাতির সৃষ্টি হয়।—দ্বিতীয় বিবরণ ২৬:১৮, ১৯.
৫. কিভাবে বলা যেতে পারে যে যিহোবা ইস্রায়েলে শাসন করতেন?
৫ কিন্তু, ইস্রায়েল কিভাবে যিহোবার দ্বারা শাসিত ছিল, যিনি হলেন মানব চক্ষুর কাছে অদৃশ্য? (যাত্রাপুস্তক ৩৩:২০) সেই জাতির নিয়ম ও যাজকত্ব যিহোবাই দিয়েছিলেন। যারা নিয়ম মেনে চলত এবং ঐশিক আদেশপ্রাপ্ত ব্যবস্থা অনুসারে উপাসনা করত তারা মহান ঈশ্বর, যিহোবাকেই সেবা করত। এছাড়া, মহা যাজকদের কাছে ঊরীম ও তুম্মীম থাকত, যার মাধ্যমে যিহোবা ঈশ্বর জরুরী অবস্থায় নির্দেশ দিতেন। (যাত্রাপুস্তক ২৮:২৯ ৩০) আরও, যোগ্য অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা ঈশতন্ত্রে যিহোবার প্রতিনিধি ছিলেন, যারা ঈশ্বরের নিয়ম পালন করা হচ্ছে কি না তা দেখতেন। আমরা যদি এই রকম কিছু ব্যক্তিদের বিবরণ পড়ি, তাহলে আমরা আরও ভালভাবে বুঝতে পারব যে কিভাবে মানুষকে ঈশ্বরের নিয়মের প্রতি বশীভূত হতে হবে।
ঈশতন্ত্রের অধীনে অধিকার
৬. ঈশতন্ত্রে অধিকার পদে কাজ করা কেন চ্যালেঞ্জস্বরূপ ছিল এবং এই দায়িত্বের জন্য কী প্রকারের পুরুষের প্রয়োজন ছিল?
৬ ইস্রায়েলে যাদের অধিকারের স্থান দেওয়া হয়েছিল তাদের জন্য তা ছিল মহান সুযোগ কিন্তু ভারসাম্য বজায় রাখা তাদের পক্ষে একটি চ্যালেঞ্জস্বরূপ ছিল। যিহোবার নামের পবিত্রতা থেকে তাদের নিজেদের অহঙ্কার যাতে গুরুত্বপূর্ণ না হয় তার জন্য তাদের সতর্ক থাকতে হত। “মনুষ্য চলিতে চলিতে আপন পাদবিক্ষেপ স্থির করিতে পারে না,” অনুপ্রাণিত মন্তব্যটি ইস্রায়েলীয়দের ক্ষেত্রে একইরকম সত্য ছিল যেমন বাকি মানবজাতির ক্ষেত্রেও ছিল। যখন অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা স্মরণে রাখেন যে ইস্রায়েল হল ঈশতন্ত্র এবং তাদের কেবলমাত্র যিহোবার ইচ্ছা পালন করতে হবে তাদের নিজেদের ইচ্ছা নয় একমাত্র তখনই ইস্রায়েল সাফল্যলাভ করে। ইস্রায়েল স্থাপন হওয়ার পরই, মোশির শ্বশুর যিথ্রো, উত্তমরূপে বর্ণনা করেন যে সেই ব্যক্তিরা কি প্রকারের হবেন, তারা হবেন ‘কার্য্যদক্ষ পুরুষ, ঈশ্বরভীরু, সত্যবাদী ও অন্যায়-লাভ-ঘৃণাকারী ব্যক্তি।’—যাত্রাপুস্তক ১৮:২১.
৭. যারা যিহোবা ঈশ্বরের অধীনে অধিকার পদে কাজ করতেন তাদের মধ্যে মোশির উদাহরণ কিভাবে সর্বোত্তম?
৭ ইস্রায়েলে প্রথম উচ্চ অধিকার চালান মোশি। তিনি ছিলেন ঐশিক আধিকারিক চরিত্রের উত্তম উদাহরণ। সত্য, যে একটি উপলক্ষে মানব দুর্বলতা দেখা দেয়। কিন্তু, মোশি সবসময় যিহোবার প্রতি নির্ভর করতেন। যে বিষয়গুলির মীমাংশা ইতিমধ্যেই করা হয়নি সেই সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলে তিনি যিহোবার নির্দেশের অনুসন্ধান করতেন। (তুলনা করুন গণনা পুস্তক ১৫:৩২-৩৬.) নিজের মহিমার জন্য তার উচ্চ স্থানকে ব্যবহার করার প্রলোভন মোশি কিভাবে রোধ করেন? যদিও তিনি লক্ষ লক্ষ লোক নিয়ে গঠিত জাতিকে পরিচালনা করেন তবুও তিনি ‘ভূমণ্ডলস্থ মনুষ্যদের মধ্যে সকল অপেক্ষা অতিশয় মৃদুশীল ছিলেন।’ (গণনাপুস্তক ১২:৩) তার কোন ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না কিন্তু তিনি ঈশ্বরের মহিমা সম্পর্কে চিন্তিত ছিলেন। (যাত্রাপুস্তক ৩২:৭-১৪) আর মোশির ছিল দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি জাতীয় নেতা হওয়ার আগে, তার সম্বন্ধে প্রেরিত পৌল বলেন: “যিনি অদৃশ্য, তাঁহাকে যেন দেখিয়াই স্থির থাকিলেন।” (ইব্রীয় ১১:২৭) স্পষ্টতই, মোশি কখনোই ভুলে যাননি যে যিহোবা হলেন জাতির প্রকৃত শাসক। (গীতসংহিতা ৯০:১,২) আমাদের জন্য বর্তমানে কতই না উত্তম উদাহরণ!
৮. যিহোবা যিহোশূয়কে কী আজ্ঞা দেন এবং কেন এটি লক্ষ্যনীয়?
৮ একা মোশির পক্ষে যখন ইস্রায়েল তত্ত্বাবধান করা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছিল তখন ৭০ জন অভিজ্ঞ ব্যক্তির উপরে যিহোবা তাঁর আত্মা প্রদান করেন যারা জাতিকে বিচার করার জন্য মোশিকে সাহায্য করবে। (গণনাপুস্তক ১১:১৬-২৬) পরবর্তীকালে প্রত্যেকটি শহরে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা ছিলেন। (তুলনা করুন দ্বিতীয় বিবরণ ১৯:১২; ২২:১৫-১৮; ২৫:৭-৯.) মোশির মৃত্যুর পর যিহোবা যিহোশূয়কে জাতির নেতা করেন। আমরা ধারণা করতে পারি যে, এই সুযোগ লাভ করাতে, যিহোশূয়ের অনেক কিছু করার ছিল। তবুও, যিহোবা তাকে বলেন যে একটি জিনিস তার ভুলে গেলে চলবে না: “তোমার মুখ হইতে এই ব্যবস্থাপুস্তক বিচলিত না হউক; তম্মধ্যে যাহা যাহা লিখিত আছে, যত্নপূর্ব্বক সেই সকলের অনুযায়ী কর্ম্ম করণার্থে তুমি দিবারাত্র তাহা ধ্যান কর।” (যিহোশূয়ের পুস্তক ১:৮) লক্ষ্য করুন যে, যদিও যিহোশূয়ের সেবাকার্যে ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল তবুও ক্রমাগত তার নিয়ম পড়ার প্রয়োজন ছিল। আমাদেরও বাইবেল পড়ার এবং যিহোবার নিয়ম ও নীতি সম্পর্কে আমাদের মনকে সতেজ করার প্রয়োজন আছে—সেবাকার্যে আমাদের বহু দিনের অভিজ্ঞতা থাকলে অথবা আমাদের বহু সুযোগ থাকলেও।—গীতসংহিতা ১১৯:১১১, ১১২.
৯. বিচারকদের সময়ে ইস্রায়েলে কী ঘটে?
৯ যিহোশূয়ের পরে বহু বিচারকেরা এসেছেন। দুঃখের বিষয় যে, তাদের সময়কালে ইস্রায়েলীয়েরা বেশিরভাগ সময় “সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে যাহা মন্দ তাহাই করিতে লাগিল; এবং বাল দেবগণের সেবা করিতে লাগিল।” (বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ ২:১১) বিচারকদের সময়কাল সম্বন্ধে বিবরণ বলে: “তৎকালে ইস্রায়েলের মধ্যে রাজা ছিল না; যাহার দৃষ্টিতে যাহা ভাল বোধ হইত, সে তাহাই করিত।” (বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ ২১:২৫) আচারব্যবহার এবং উপাসনা সম্পর্কে প্রত্যেকে নিজ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত এবং ইতিহাস দেখায় যে বহু ইস্রায়েলীয়েরা মন্দ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। তারা প্রতিমা পূজা করতে আরম্ভ করে এবং অনেকসময় জঘন্য অপরাধও করে। (বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ ১৯:২৫-৩০) তবুও, কিছু জন উদাহরণযোগ্য বিশ্বাস প্রদর্শন করেন।—ইব্রীয় ১১:৩২-৩৮.
১০. শমূয়েলের সময়ে ইস্রায়েলের সরকারে কোন্ আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং কেন তা হয়?
১০ সর্বশেষ বিচারক, শমূয়েলের জীবনকালে ইস্রায়েল, সরকার সংক্রান্ত একটি সমস্যার মধ্যে দিয়ে যায়। তাদের চতুর্পাশ্বস্থ শত্রু জাতিগুলির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, যাদের মধ্যে সকলেই রাজা দ্বারা শাসিত ছিল, ইস্রায়েলীয়রা যুক্তি দেখায় যে তাদেরও রাজার প্রয়োজন আছে। তারা ভুলে যায় যে ইতঃপূর্বেই তাদের রাজা আছেন এবং তাদের সরকার হল ঈশতন্ত্র। যিহোবা শমূয়েলকে বলেন: “কেননা তাহারা তোমাকে অগ্রাহ্য করিল, এমন নয়, আমাকেই অগ্রাহ্য করিল, যেন আমি তাহাদের উপরে রাজত্ব না করি।” (১ শমূয়েল ৮:৭) তাদের উদাহরণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচলিত হয়ে আমাদের চারিপাশের জগতের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া কতই না সহজ।—তুলনা করুন ১ করিন্থীয় ২:১৪-১৬.
১১. (ক) সরকারের পরিবর্তন হলেও, রাজাদের অধীনে ইস্রায়েল ঈশতন্ত্রই থেকে যায় তা কিভাবে বলা যেতে পারে? (খ) ইস্রায়েলের রাজাদের যিহোবা কী আজ্ঞা দেন এবং কী উদ্দেশ্যে?
১১ তবুও, যিহোবা ইস্রায়েলীয়দের অনুরোধে সম্মত হন এবং তাদের প্রথম দুই রাজা শৌল ও দায়ূদকে মনোনীত করেন। ইস্রায়েল ঈশতন্ত্র থেকে যায়, যিহোবার দ্বারা শাসিত হতে থাকে। যাতে ইস্রায়েলের রাজারা এই বিষয়টি স্মরণে রাখতে পারে তাই প্রতিদিন পড়ার জন্য প্রত্যেককে নিয়মের এক অনুলিপি নিজের জন্য তৈরি করতে হত, “যেন সে আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুকে ভয় করিতে ও এই ব্যবস্থার সমস্ত বাক্য ও এই সকল বিধি পালন করিতে শিখে; যেন আপন ভ্রাতাদের উপরে তাহার চিত্ত উদ্ধত না হয়।” (দ্বিতীয় বিবরণ ১৭:১৯, ২০) হ্যাঁ, যিহোবা চেয়েছিলেন যে তাঁর ঈশতন্ত্রতে যারা অধিকার পদে আছে তারা যেন নিজেদের উন্নত না করে এবং তাদের কার্যাবলি যেন তাঁর নিয়মকে প্রতিফলিত করে।
১২. রাজা দায়ূদ বিশ্বস্ততার কী কৃতিত্ব রাখেন?
১২ যিহোবার প্রতি রাজা দায়ূদের অত্যন্ত বিশ্বাস ছিল এবং ঈশ্বর চুক্তি করেন যে তিনি একটি রাজবংশের পিতা হবেন যেটি চিরকাল থাকবে। (২ শমূয়েল ৭:১৬; ১ রাজাবলি ৯:৫; গীতসংহিতা ৮৯:২৯) যিহোবার প্রতি নম্ররূপে দায়ূদের বশ্যতা স্বীকার অনুকরণের যোগ্য। তিনি বলেছিলেন: “হে সদাপ্রভু, তোমার বলে রাজা আনন্দ করেন, তিনি তোমার পরিত্রাণে কতই উল্লাসিত হন।” (গীতসংহিতা ২১:১) মাংসিক দুর্বলতার জন্য যদিও দায়ূদ অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছিলেন, কিন্তু শাসন করার ক্ষেত্রে তিনি নিজের শক্তির প্রতি নয়, পরিবর্তে যিহোবার শক্তির উপর নির্ভর করেছিলেন।
অনৈশিক কার্যাবলি ও মনোভাব
১৩, ১৪. দায়ূদের উত্তরাধিকারীরা কী অনৈশিক কার্য করেন?
১৩ ইস্রায়েলীয় সকল নেতারা মোশি ও দায়ূদের মত ছিলেন না। ইস্রায়েলে মিথ্যা উপাসনার অনুমতি দিয়ে অনেকে ঐশিক ব্যবস্থার প্রতি গুরুতর অসম্মান প্রদর্শন করেন। এমনকি কিছু বিশ্বস্ত শাসকেরাও কোন কোন ক্ষেত্রে অনৈশিক কাজ করেন। শলোমনের ঘটনাটি সবচেয়ে দুঃখজনক ছিল, যাকে মহান প্রজ্ঞা ও সফলতা দেওয়া হয়। (১ রাজাবলি ৪:২, ৫, ২৯) তবুও, যিহোবার নিয়মের অসম্মান করে, তিনি বহু স্ত্রীলোককে বিবাহ করেন এবং ইস্রায়েলে প্রতিমা পূজার অনুমতি দেন। মনে হয় যে, শলোমনের শাসনের শেষের বছরগুলি অত্যাচারমূলক ছিল।—দ্বিতীয় বিবরণ ১৭:১৪-১৭; ১ রাজাবলি ১১:১-৮;১২:৪.
১৪ শলোমনের পুত্র রহবিয়ামের কাছে দাবি করা হয় যে তিনি যেন প্রজাদের ভার লঘু করেন। পরিস্থিতিকে মৃদুতার সাথে মোকাবিলা না করে তিনি তার অধিকারকে বিবাদমানরূপে জাহির করতে চান—আর বারোটি বংশের মধ্যে দশটি বংশকে হারান। (২ বংশাবলি ১০:৪-১৭) বার হয়ে আসা দশ বংশের রাজ্যের মধ্যে প্রথম রাজা ছিলেন যারবিয়াম। তার রাজ্য যাতে সহ রাজ্যের সাথে আবার যোগদান না করে তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় তিনি গো-বৎস উপাসনার প্রবর্তন করেন। রাজনীতির দিক দিয়ে এটি এক চতুর পদক্ষেপ বলে মনে হলেও তা ঈশতন্ত্রের প্রতি প্রকাশ্যে অসম্মান প্রদর্শন করে। (১ রাজাবলি ১২:২৬-৩০) পরবর্তীকালে, বহুদিনের বিশ্বস্ত সেবাকার্যের শেষের দিকে রাজা আসা অহঙ্কারের দ্বারা তার কৃতিত্বকে কলঙ্কিত হতে দেন। যিহোবার পরামর্শ নিয়ে যে ভাববাদী তার কাছে আসেন তার প্রতি তিনি দুর্ব্যবহার করেন। (২ বংশাবলি ১৬:৭-১১) হ্যাঁ, অনেকসময় অভিজ্ঞদেরও পরামর্শের প্রয়োজন হয়।
একটি ঈশতন্ত্রের অবসান
১৫. যীশু যখন পৃথিবীতে ছিলেন তখন যিহুদী নেতারা ঈশতন্ত্রে অধিকারের পদে থেকেও কিভাবে বিফল হয়?
১৫ যখন যীশু খ্রীষ্ট পৃথিবীতে ছিলেন, তখনও ইস্রায়েল ঈশতন্ত্র ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে ইস্রায়েলের বহু দায়িত্বসম্পন্ন অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা আধ্যাত্মিক মনোভাবাপন্ন ছিল না মোশি যে নম্রতা দেখিয়েছিলেন তা অর্জন করতে তারা অবশ্যই ব্যর্থ হয়েছিল। যীশু তাদের আধ্যাত্মিক কলুষতা সম্পর্কে উল্লেখ করেন যখন তিনি বলেন: “অধ্যাপক ও ফরীশীরা মোশির আসনে বসে। অতএব তাহারা তোমাদিগকে যাহা কিছু বলে, তাহা পালন করিও, মানিও, কিন্তু তাহাদের কর্ম্মের মত কর্ম্ম করিও না; কেননা তাহারা বলে, কিন্তু করে না।”—মথি ২৩:২, ৩.
১৬. প্রথম শতাব্দীর যিহুদী নেতারা কিভাবে দেখায় যে ঈশতন্ত্রের প্রতি তাদের কোন সম্মান নেই?
১৬ পন্তীয় পীলাতের কাছে যীশুকে হস্তান্তরিত করার পর যিহূদী নেতারা দেখায় যে তারা ঐশিক ব্যবস্থা থেকে কতটা দূরে সরে গেছে। পীলাত যীশুকে পরীক্ষা করেন এবং এই পরিসমাপ্তিতে আসেন যে তিনি হলেন একজন নির্দোষ ব্যক্তি। যিহুদীদের সামনে যীশুকে নিয়ে এসে, পীলাত বলেন: “দেখ, তোমাদের রাজা।” যখন যিহুদীরা যীশুর মৃত্যু কামনা করে ক্রমাগত চিৎকার করে, পীলাত জিজ্ঞাসা করেন: “তোমাদের রাজাকে কি ক্রুশে দিব?” প্রধান যাজকেরা উত্তর দেন: “কৈসর ছাড়া আমাদের অন্য রাজা নাই।” (যোহন ১৯:১৪, ১৫) তারা কৈসরকে রাজা হিসাবে স্বীকার করে কিন্তু যীশুকে করে না, ‘যিনি যিহোবার নামে এসেছিলেন।’—মথি ২১:৯.
১৭. মাংসিক ইস্রায়েল কেন আর ঐশিক জাতি থাকে না?
১৭ যীশুকে পরিত্যাগ করে যিহুদীরা ঈশতন্ত্রকে পরিত্যাগ করে, কারণ ভবিষ্যৎ ঈশতন্ত্র ব্যবস্থায় তিনিই হবেন প্রধান চরিত্র। যীশু ছিলেন দায়ূদের রাজকীয় পুত্র, যিনি চিরকাল রাজত্ব করবেন। (যিশাইয় ৯:৬, ৭; লূক ১:৩৩; ৩:২৩, ৩১) ফলে মাংসিক ইস্রায়েল আর ঈশ্বরের মনোনীত জাতি রইল না।—রোমীয় ৯:৩১-৩৩.
এক নতুন ঈশতন্ত্র
১৮. প্রথম-শতাব্দীতে কোন্ নতুন ঈশতন্ত্রের জন্ম হয়? বর্ণনা করুন।
১৮ মাংসিক ইস্রায়েলকে ঈশ্বর পরিত্যাগ করাতে পৃথিবীতে কিন্তু ঈশতন্ত্রের অবসান হয়ে যায়নি। যীশু খ্রীষ্টের মাধ্যমে যিহোবা ঈশ্বর এক নতুন ঈশতন্ত্র স্থাপন করেন। এটি ছিল অভিষিক্ত খ্রীষ্টীয় মণ্ডলী, আসলে যা ছিল একটি নতুন জাতি। (১ পিতর ২:৯) প্রেরিত পৌল তাকে “ঈশ্বরের ইস্রায়েল” বলেন এবং এর সদস্যেরা আসলে “সমুদয় বংশ ও ভাষা ও জাতি ও লোকবৃন্দ হইতে” বার হয়ে এসেছে। (গালাতীয় ৬:১৬, NW; প্রকাশিত বাক্য ৫:৯, ১০) এই নতুন ঈশতন্ত্রের সদস্যেরা মানব সরকারের অধীনে বাস করে তাদের বশীভূত হয়েও, ঈশ্বরের দ্বারাই শাসিত হয়। (১ পিতর ২:১৩, ১৪, ১৭) নতুন ঈশতন্ত্রের জন্ম হওয়ার পরই, মাংসিক ইস্রায়েলের শাসকেরা কিছু শিষ্যদের যীশুর দেওয়া একটি আজ্ঞা আর পালন না করতে জোর করে। তাদের উত্তর হয়? “মনুষ্যদের অপেক্ষা বরং ঈশ্বরের আজ্ঞা পালন করিতে হইবে।” (প্রেরিত ৫:২৯) সত্যই, এক ঐশিক দৃষ্টিভঙ্গি!
১৯. প্রথম-শতাব্দীর খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীকে কিভাবে এক ঈশতন্ত্র বলা যেতে পারে?
১৯ কিন্তু কিভাবে সেই নতুন ঈশতন্ত্র কাজ করে? সেখানে রাজা ছিল, যীশু খ্রীষ্ট, যিনি মহান ঈশ্বর যিহোবার প্রতিনিধিত্ব করতেন। (কলসীয় ১:১৩) যদিও রাজা স্বর্গে অদৃশ্য অবস্থায় ছিলেন, তাঁর শাসন প্রজাদের কাছে বাস্তব ছিল এবং তাঁর বাক্যগুলি তাদের জীবনকে পরিচালনা করত। দৃশ্যত তত্ত্বাবধানের জন্য, আধ্যাত্মিকরূপে যোগ্য ব্যক্তিদের নিযুক্ত করা হয়। যিরূশালেমে এই ধরনের একদল ব্যক্তি, পরিচালক গোষ্ঠী হিসাবে কাজ করতেন। সেই গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করতেন ভ্রমণ অধ্যক্ষেরা, যেমন পৌল, তীমথি ও তীত। আর প্রত্যেকটি মণ্ডলীকে দেখাশোনা করতেন অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বা প্রাচীনেরা। (তীত ১:৫) গুরুতর সমস্যা দেখা দিলে প্রাচীনেরা পরিচালক গোষ্ঠী বা তার এক প্রতিনিধির সাথে পরামর্শ করতেন, যেমন পৌল। (তুলনা করুন প্রেরিত ১৫:২; ১ করিন্থীয় ৭:১; ৮:১; ১২:১.) এছাড়া, ঈশতন্ত্রকে তুলে ধরতে মণ্ডলীর প্রতিটি সদস্য তাদের ভূমিকা গ্রহণ করতেন। তাদের জীবনে শাস্ত্রীয় নীতি প্রয়োগ করা সম্পর্কে প্রত্যেকে যিহোবার সামনে দায়িত্বশীল ছিল।—রোমীয় ১৪:৪, ১২.
২০. প্রেরিতদের পরবর্তী সময়কালে ঈশতন্ত্র সম্বন্ধে কী বলা যেতে পারে?
২০ পৌল সাবধান করে দিয়েছিলেন যে প্রেরিতদের মৃত্যুর পর ধর্মভ্রষ্টতা দেখা দেবে, আর ঠিক তাই হয়েছিল। (২ থিষলনীকীয় ২:৩) সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে, যারা নিজেদের খ্রীষ্টান বলে দাবি করত তাদের সংখ্যা ক্রমে লক্ষ লক্ষ থেকে কোটি কোটিতে গিয়ে পৌঁছায়। তারা বিভিন্ন ধরনের গির্জা সরকার গঠন করে, যেমন যাজকতন্ত্র, প্রেস্বিটারিয়ান ও কংগ্রিগ্রেশনাল। কিন্তু, এই গির্জাগুলির আচরণ বা বিশ্বাস কোন কিছুই যিহোবার শাসনকে প্রতিফলিত করেনি। তারা ঈশতন্ত্র ছিল না!
২১, ২২. (ক) শেষ কালে যিহোবা ঈশতন্ত্রকে কিভাবে পুনর্স্থাপন করেছেন? (খ) ঈশতন্ত্র সম্বন্ধে কোন্ প্রশ্নগুলির উত্তর পরবর্তী প্রবন্ধে দেওয়া হবে?
২১ এই বিধি ব্যবস্থার শেষ সময়ে, মিথ্যা খ্রীষ্টানদের থেকে সত্য খ্রীষ্টানদের পৃথক করার ছিল। (মথি ১৩:৩৭-৪৩) তা ঘটে ১৯১৯ সালে, ঈশতন্ত্রের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বছরে। সেই সময়ে যিশাইয় ৬৬:৮ পদের মহিমাময় ভাববাণী পরিপূর্ণ হয়: “এমন কার্য্য কে দেখিয়াছে? এক দিবসে কি কোন দেশের জন্ম হইবে? কোন জাতি কি একেবারেই ভূমিষ্ঠ হইবে?” এই প্রশ্নগুলির উত্তর প্রতিধ্বনিত হয়, এক উল্লেখযোগ্য সম্মতির মাধ্যমে! খ্রীষ্টীয় মণ্ডলী ১৯১৯ সালে এক পৃথক “জাতি” হিসাবে আবার অস্তিত্বে আসে। একটি ঐশিক “ভূমি”র এক দিনেই জন্ম হয়! শেষ কাল যতই এগিয়ে যেতে থাকে, এই নতুন জাতির সংগঠনকে যতটা সম্ভব প্রথম শতাব্দীর মত করতে চেষ্টা করা হয়। (যিশাইয় ৬০:১৭) কিন্তু তা সবসময়ই ঈশতন্ত্র ছিল। আচরণে ও বিশ্বাসে এটি সবসময় শাস্ত্রের ঐশ্বরিকরূপে অনুপ্রাণিত নিয়ম ও নীতিকে প্রতিফলিত করে। আর এটি সর্বদা সিংহাসনে আসীন যীশু খ্রীষ্টের বশীভূত ছিল।—গীতসংহিতা ৪৫:১৭;৭২:১, ২.
২২ আপনি কি এই ঈশতন্ত্রের সাথে সহভাগিতা করেন? আপনার কি এতে অধিকারের স্থান আছে? যদি থাকে, আপনি কি জানেন ঐশিকরূপে কাজ করার অর্থ কী? আপনি কি জানেন যে কোন্ ফাঁদগুলি এড়াতে হবে? পরবর্তী প্রবন্ধে শেষ প্রশ্ন দুটি আলোচনা করা হবে।
আপনি কি বর্ণনা করতে পারেন?
▫ ঈশতন্ত্র কী?
▫ ইস্রায়েল কিভাবে এক ঈশতন্ত্র ছিল?
▫ ইস্রায়েল যে এক ঈশতন্ত্র ছিল রাজাদের তা স্মরণ করিয়ে দিতে যিহোবা কী ব্যবস্থা করেন?
▫ খ্রীষ্টীয় মণ্ডলী কিরূপে এক ঈশতন্ত্র ছিল এবং এটি কিভাবে সংগঠিত হয়েছিল?
▫ আমাদের সময়ে কোন্ ঐশিক সংস্থাকে স্থাপন করা হয়েছে?
[Pictures on page 24]
ঐশিকরূপে নিযুক্ত যিহোবার রাজার পরিবর্তে, পন্তিয় পীলাতের সামনে যিহুদী শাসকেরা কৈসরকে স্বীকার করে