যিহোবা, আশ্চর্য্য-কার্য্যকারী
“কারণ তুমি মহান্ এবং আশ্চর্য্য-কার্য্যকারী; তুমিই একমাত্র ঈশ্বর।—গীতসংহিতা ৮৬:১০.
১, ২. (ক) মানুষের আবিষ্কার জগতকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে? (খ) আরও ভাল পরিস্থিতির জন্য আমরা কোথায় আশা পেতে পারি?
আধুনিক মানুষ হয়ত গর্ব করতে পারে যে তার আবিষ্কারগুলি আশ্চর্যজনক—বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, টেলিযোগাযোগ, ভিডিও, মোটরগাড়ি, জেট প্লেনে ভ্রমণ, এবং কম্পিউটার প্রযুক্তিবিদ্যা। এইগুলি জগতকে একটি সমাজের মধ্যে আবদ্ধ করেছে। কিন্তু কী সমাজ! সকলের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি, এবং প্রাচুর্যের পরিবর্তে, ধ্বংসাত্বক যুদ্ধ, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশদূষণ, রোগব্যাধি, এবং দারিদ্রের দ্বারা মানবজাতি জর্জরিত হয়েছে। আর পৃথিবীতে যে পারমানবিক অস্ত্রশস্ত্র ছড়ানো রয়েছে, সংখ্যায় তা কমলেও, এখনও মানবজাতিকে ধ্বংস করতে পারে। মৃত্যুর ব্যবসায়ীরা, অস্ত্রনির্মাতারা, এখনও পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, এবং দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছে। কেউ কি কোন সমাধান খুঁজে বার করতে পারে?
২ হ্যাঁ! কারণ একজন আছেন যিনি পরিত্রাণের নিশ্চয়তা দেন, যিনি “উচ্চপদান্বিত লোক অপেক্ষা উচ্চতর পদান্বিত,” যিহোবা ঈশ্বর। (উপদেশক ৫:৮) তিনি গীতসংহিতা লিখতে অনুপ্রাণীত করেছিলেন, যেখানে দুঃখদুর্দশার সময়ের জন্য সান্ত্বনা এবং জ্ঞানবান উপদেশ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে গীত ৮৬ একটি, যার একটি সাধারণ শিরোনাম-লিখন রয়েছে: “দায়ূদের প্রার্থনা।” এই প্রার্থনাটি আপনি নিজের করে নিতে পারেন।
দুঃখী কিন্তু অনুগত
৩. এই সময়ে, দায়ূদ আমাদের জন্য কী উৎসাহজনক উদাহরণ দিয়েছেন?
৩ দায়ূদ এই গীত লিখেছিলেন যখন তিনি দুঃখজনক পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন। আমরা যারা বর্তমানে শয়তানের ব্যবস্থার “শেষ কালে” বাস করছি, যখন “বিষম সময় উপস্থিত,” আমরাও একই রকম পরীক্ষার সম্মুখীন হই। (২ তীমথিয় ৩:১; আরও দেখুন মথি ২৪:৯-১৩.) আমাদের মত, দায়ূদও তাঁর সামনে যে সমস্যাগুলি আসত সেইজন্য উদ্বেগ এবং মানসিক অবসাদে ভুগতেন। কিন্তু তিনি কখনও এই পরীক্ষাগুলিকে তাঁর স্রষ্টার প্রতি অনুগত আস্থাকে কমিয়ে দিতে দেননি। তিনি উচ্চৈঃস্বরে আবেদন করেন: “হে যিহোবা, কর্ণপাত কর, আমাকে উত্তর দেও, কেননা আমি দুঃখী ও দরিদ্র। আমার প্রাণ রক্ষা কর, কেননা আমি অনুগত। হে আমার ঈশ্বর, তোমাতে বিশ্বাসকারী তোমার দাসকে তুমিই ত্রাণ কর।”—গীতসংহিতা ৮৬:১, ২, NW.
৪. আমরা কিভাবে আমাদের নির্ভরতা দেখাতে পারি?
৪ আমরা নিশ্চিৎ হতে পারি, যেমন দায়ূদ ছিলেন, যে “সমস্ত সান্ত্বনার ঈশ্বর,” যিহোবা, এই পৃথিবীর প্রতি কর্ণপাত করবেন এবং আমাদের বিনীত প্রার্থনা শুনবেন। (২ করিন্থীয় ১:৩, ৪) একান্তভাবে আমাদের ঈশ্বরের উপর আস্থা রেখে, আমরা দায়ূদের উপদেশ অনুযায়ী চলতে পারি: “তুমি সদাপ্রভুতে আপনার ভার অর্পণ কর; তিনিই তোমাকে ধরিয়া রাখিবেন, কখনও ধার্ম্মিককে বিচলিত হইতে দিবেন না।”—গীতসংহিতা ৫৫:২২.
যিহোবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
৫. (ক) কিভাবে কিছু যত্নসহকারে করা অনুবাদ যিহূদী অধ্যাপকদের ভুল সংশোধন করেছে? (খ) কিভাবে ৮৫তম এবং ৮৬তম গীত যিহোবার নাম মহিমান্বিত করেছে? (পাদটীকা দেখুন)
৫ ৮৬তম গীতে, দায়ূদ “হে যিহোবা” শব্দটি ১১ বার ব্যবহার করেছেন। দায়ূদের প্রার্থনা কত সনির্বন্ধ ছিল আর যিহোবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কত ঘনিষ্ঠ! পরে, এইরকম আন্তরিকভাবে ঈশ্বরের নামের ব্যবহার যিহূদী অধ্যাপকরা, উল্লেখযোগ্যরূপে সোফেরীমরা, অপছন্দ করতে শুরু করে। ঈশ্বরের নামের অপব্যবহার করার একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভয় তাদের মনে ছিল। মানুষকে যে ঈশ্বরের সাদৃশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিল তা উপেক্ষা করে, মানুষেও যে গুণাবলী প্রদর্শন করে তা ঈশ্বরের প্রতি আরোপ করতে তারা অস্বীকার করে। সুতরাং, এই একটি গীতের ইব্রীয় লেখায় যেখানে ঐশ্বরিক নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেই ১১ জায়গার মধ্যে ৭ জায়গায় তারা YHWH (যিহোবা) নামের বদলে ‘অ্যাধো-নাই’ (প্রভু) উপাধি প্রতিস্থাপিত করে। আমরা কৃতজ্ঞ হতে পারি যে নিউ ওয়ার্ল্ড ট্রান্সলেশন অফ দ্যা হোলী স্ক্রিপচারস্, এবং আরও অনেকগুলি যত্নসহকারে করা অনুবাদে, ঐশ্বরিক নামকে ঈশ্বরের বাক্যে তার স্বস্থানে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, যিহোবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের উপর জোর দেওয়া হয়, যেমন তা দেওয়া উচিৎ।a
৬. কিভাবে আমরা দেখাতে পারি যে যিহোবার নাম আমাদের কাছে মহা মূল্যবান?
৬ দায়ূদ তাঁর প্রার্থনায় আরও বলেন: “হে যিহোবা, আমার প্রতি কৃপা কর, কেননা আমি সমস্ত দিন তোমাকে ডাকি। নিজ দাসের প্রাণ আনন্দিত কর, কেননা, হে যিহোবা, আমি তোমার উদ্দেশে আমার প্রাণ উত্তোলন করি।” (গীতসংহিতা ৮৬:৩, ৪, NW) লক্ষ্য করুন যে দায়ূদ “সমস্ত দিন” যিহোবাকে ডাকতেন। বাস্তবিকই, তিনি প্রায়ই সারা রাত প্রার্থনা করতেন, যেমন যখন তিনি প্রান্তরে একজন পলাতক হিসাবে ছিলেন। (গীতসংহিতা ৬৩:৬, ৭) একইভাবে, বর্তমানেও যখন কোন সাক্ষীরা ধর্ষণ অথবা অন্যান্য অপরাধমূলক আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছে তখন তারা উচ্চৈঃস্বরে যিহোবার কাছে আবেদন করেছে। অনেক সময়ে তারা এর আনন্দজনক ফল দেখে আশ্চর্য হয়েছে।# যিহোবার নাম আমাদের কাছে মহা মূল্যবান, ঠিক যেমন “দায়ূদের সন্তান,” যীশু খ্রীষ্ট যখন পৃথিবীতে ছিলেন, তখন তাঁর কাছে ছিল। যীশু তাঁর শিষ্যদের যিহোবার নাম মহিমান্বিত হওয়ার জন্য প্রার্থনা করতে শিখিয়েছিলেন এবং তাদের জানিয়েছিলেন সেই নামের অর্থ কী?—মথি ১:১; ৬:৯; যোহন ১৭:৬, ২৫, ২৬.
৭. যিহোবা যে তাঁর সেবকদের প্রাণ আনন্দিত করেন তার কী উদাহরণ আছে, আর আমরা কিরূপে সাড়া দেব?
৭ দায়ূদ যিহোবার প্রতি তাঁর প্রাণ, তাঁর সমস্ত সত্তাকে তুলে ধরেছিলেন। তিনি আমাদেরও একইরকম করতে বলেন, গীতসংহিতা ৩৭:৫ পদে তিনি উৎসাহ দেন: “তোমার গতি সদাপ্রভুতে অর্পণ কর, তাঁহাতে নির্ভর কর, তিনিই কার্য্য সাধন করিবেন।” সুতরাং আমাদের আনন্দিত করে তোলার জন্য যিহোবার কাছে আমাদের আবেদন অনুত্তরিত থাকবে না। যিহোবার বহু বিশ্বস্ততা-রক্ষাকারী সেবক এখনও তাঁর পরিচর্য্যায় গভীর আনন্দ পায়—দুঃখকষ্ট, উৎপীড়ন, এবং রোগব্যাধি সত্ত্বেও। আফ্রিকাতে, যুদ্ধে রত দেশগুলিতে, যেমন আঙ্গোলা, লাইবেরিয়া, মোজাম্বিক, এবং জাইর-এ, আমাদের ভাইরা ক্রমাগত যিহোবার পরিচর্য্যাকে তাদের জীবনে প্রথম স্থান দিয়েছে।* সত্যই তিনি প্রচুর আত্মিক ফসল সংগ্রহের মাধ্যমে তাদের আনন্দিত করেছেন। তারা যেমন সহ্য করেছিল, আমাদেরও করা উচিৎ। (রোমীয় ৫:৩-৫) যদি আমরা সহ্য করি, তাহলে আমাদের আশ্বাসবাণী দেওয়া হয়েছে: “এই দর্শন এখনও নিরূপিত কালের নিমিত্ত, ও তাহা পরিনামের আকাঙ্ক্ষা করিতেছে, . . . যথাকালে বিলম্ব করিবে না।” (হবক্কূক ২:৩) যিহোবার প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভরতা এবং আস্থার সাথে আমরাও যেন “পরিনামের আকাঙ্ক্ষা” করি।
যিহোবার মঙ্গলভাব
৮. যিহোবার সাথে আমাদের কিরকম অন্তরঙ্গতা থাকতে পারে, আর তাঁর মঙ্গলভাব তিনি কিভাবে দেখিয়েছেন?
৮ দায়ূদ আরও আবেগপূর্ণ আবেদন করেন: “হে যিহোবা, তুমি মঙ্গলময় ও ক্ষমাবান্, এবং যাহারা তোমাকে ডাকে, তুমি সেই সকলের পক্ষে দয়াতে মহান্। হে যিহোবা, আমার প্রার্থনায় কর্ণপাত কর, আমার বিনতির রবে অবধান কর। সঙ্কটের দিনে আমি তোমাকে ডাকিব, কেননা তুমি আমাকে উত্তর দিবে।” (গীতসংহিতা ৮৬:৫-৭, NW) “হে যিহোবা”—বারংবার এই অভিব্যক্তির অন্তরঙ্গতায় আমরা উচ্ছ্বসিত হই। এই অন্তরঙ্গতা প্রার্থনার মাধ্যমে ক্রমাগত আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলা যায়। আরেকটি পরিস্থিতিতে দায়ূদ প্রার্থনা করেছিলেন: “আমার যৌবনের পাপ ও আমার অধর্ম্ম সকল স্মরণ করিও না, সদাপ্রভু, তোমার মঙ্গলভাবের অনুরোধে, তোমার দয়ানুসারে আমাকে স্মরণ কর।” (গীতসংহিতা ২৫:৭) যিহোবা মঙ্গলভাবের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি—কারণ তিনি যীশুর মাধ্যমে মুক্তির মূল্য দিয়েছেন, অনুতপ্ত পাপীদের প্রতি দয়া করেছেন, এবং তাঁর অনুগত এবং প্রশংসাকারী সাক্ষীদের প্রতি প্রেমপূর্ণ দয়া বর্ষণ করেছেন।—গীতসংহিতা ১০০:৩-৫; মালাখী ৩:১০.
৯. কোন্ আশ্বাসবাণী অনুতপ্ত পাপীদের বিবেচনা করা উচিৎ?
৯ অতীতের ভুলের জন্য আমাদের কি অস্বস্তি বোধ করা উচিৎ? এখন যদি আমরা আপন আপন চরণের জন্য সরল পথ প্রস্তুত করি, অনুতপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি প্রেরিত পিতরের আশ্বাসবাণী স্মরণ করে আমরা উৎসাহিত হই যে যিহোবার কাছ থেকে “তাপশান্তির সময়” উপস্থিত হবে। (প্রেরিত ৩:১৯) আসুন আমরা প্রার্থনায় যিহোবার সঙ্গে নিকট সম্পর্কে থাকি, আমাদের মুক্তিদাতা যীশুর মাধ্যমে, যিনি প্রেমের সাথে বলেছিলেন: “হে পরিশ্রান্ত ও ভারাক্রান্ত লোক সকল, আমার নিকটে আইস, আমি তোমাদিগকে বিশ্রাম দিব। আমার যোঁয়ালি আপনাদের উপরে তুলিয়া লও, এবং আমার কাছে শিক্ষা কর, কেননা আমি মৃদুশীল ও নম্রচিত্ত; তাহাতে তোমরা আপন আপন প্রাণের জন্য বিশ্রাম পাইবে।” বর্তমানে যখন অনুগত সাক্ষীরা যীশুর মূল্যবান নামে যিহোবার কাছে প্রার্থনা করে, প্রকৃতই তারা বিশ্রাম পায়।—মথি ১১:২৮, ২৯; যোহন ১৫:১৬.
১০. গীতসংহিতার পুস্তক যিহোবার প্রেমপূর্ণ দয়াকে কিভাবে গুরুত্ব দিয়েছে?
১০ গীতসংহিতাতে যিহোবার “প্রেমপূর্ণ দয়া” সম্বন্ধে একশ বারেরও বেশী উল্লেখ করা হয়েছে। এইরকম প্রেমপূর্ণ দয়া অবশ্যই প্রভূত পরিমাণ! ১১৮তম গীতের প্রথম চারটি পদ ঈশ্বরের সেবকদের যিহোবাকে ধন্যবাদ দিতে আবেদন জানায় চারবার “তাঁহার দয়া অনন্তকালস্থায়ী” পুনরাবৃত্তি করে। ১৩৬তম গীত তাঁর “প্রেমপূর্ণ দয়ার” চিরস্থায়িত্ব গুণটির উপর ২৬ বার জোর দেয়। আমরা যে কোন ভাবেই ভুল করি না কেন—আর যেমন যাকোব ৩:২ বলে, “আমরা সকলে অনেক প্রকারে উছোট খাই”—যিহোবার করুণা এবং প্রেমপূর্ণ দয়া সম্বন্ধে নিশ্চিৎ হয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিৎ। তাঁর প্রেমপূর্ণ দয়া আমাদের প্রতি তাঁর বিশ্বস্ত প্রেমের অভিব্যক্তি। যদি আমরা অনুগতভাবে ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন করে যাই, সমস্ত পরীক্ষায় সফল হতে আমাদের শক্তি দিয়ে তিনি তাঁর বিশ্বস্ত প্রেম দেখাবেন।—১ করিন্থীয় ১০:১৩.
১১. প্রাচীনরা পদক্ষেপ নিলে, কিভাবে তা কাউকে অপরাধী বোধ না করতে সাহায্য করতে পারে?
১১ কয়েকসময়ে আমরা অন্যদের দ্বারা উছোট খেতে পারি। শৈশবে মানসিক অথবা শারীরিক নির্যাতনের জন্য অনেকের অপরাধবোধ অথবা সম্পূর্ণ অযোগ্যতার মনোভাব থেকে যেতে পারে। এইরকম ব্যক্তি যিহোবাকে ডাকতে পারে, এবং তিনি যে উত্তর দেবেন সেই সম্বন্ধে নিশ্চিৎ হতে পারে। (গীতসংহিতা ৫৫:১৬, ১৭) একজন দয়ালু প্রাচীন হয়তো এই ব্যক্তিকে বুঝাতে সাহায্য করার ভার নিতে পারেন, যে তার কোন দোষ ছিল না। তারপর, মাঝে মাঝেই এই প্রাচীন তাকে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে ফোন করলে তার সাহায্য হবে যতক্ষণ না অবশেষে সে নিজেই ‘ভার বহন’ করতে পারছে।—গালাতীয় ৬:২, ৫.
১২. কিভাবে সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু কিভাবে আমরা সাফল্যের সাথে তার মোকাবিলা করতে পারি?
১২ বর্তমানে যিহোবার লোকেদের আরও অনেক সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ থেকে শুরু করে, পৃথিবীতে চরম দুর্দশা দেখা দিতে শুরু করে। যীশু যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন “এ সকলই যাতনার আরম্ভ” ছিল। যত আমরা “যুগান্তের” শেষের দিকে যাচ্ছি তত সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। (মথি ২৪:৩, ৮) দিয়াবলের “সংক্ষিপ্ত কাল” তার চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। (প্রকাশিত বাক্য ১২:১২) শিকারের সন্ধানে “গর্জ্জনকারী সিংহের” মত, সেই মহা-বিপক্ষ ঈশ্বরের পাল থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করার জন্য যত রকম সম্ভব কৌশল ব্যবহার করছে। (১ পিতর ৫:৮) কিন্তু সে সফল হবে না! কারণ, দায়ূদের মত, আমরা আমাদের একমাত্র ঈশ্বর যিহোবার প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রাখি।
১৩. কিভাবে পিতামাতারা এবং তাদের সন্তানরা যিহোবার মঙ্গলভাব থেকে উপকার পেতে পারে?
১৩ নিঃসন্দেহে, দায়ূদ তাঁর সন্তান শলোমনের হৃদয়ে যিহোবার মঙ্গলভাবের উপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা গেঁথে দিয়েছিলেন। সেইজন্য, শলোমন তাঁর নিজের সন্তানকে নির্দেশ দিতে পেরেছিলেন: “তুমি সমস্ত চিত্তে সদাপ্রভুতে বিশ্বাস কর; তোমার নিজ বিবেচনায় নির্ভর করিও না; তোমার সমস্ত পথে তাঁহাকে স্বীকার কর; তাহাতে তিনি তোমার পথ সকল সরল করিবেন। আপনার দৃষ্টিতে জ্ঞানবান হইও না; সদাপ্রভুকে ভয় কর, মন্দ হইতে দূরে যাও।” (হিতোপদেশ ৩:৫-৭) একইভাবে বর্তমানে পিতামাতাদের তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়া উচিৎ কিভাবে যিহোবার প্রতি আস্থাসহকারে প্রার্থনা করা যায় এবং একটি নির্দয় জগতের আক্রমণের সাথে কিভাবে মোকাবিলা করা যায়—যেমন স্কুলে বন্ধুবান্ধবদের থেকে চাপ এবং অনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়বার প্রলোভন। আপনার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে প্রতি দিন সত্য অনুযায়ী কাজ করলে তাদের নবীন হৃদয়ে যিহোবার প্রতি প্রকৃত প্রেম এবং তাঁর প্রতি প্রার্থনাপূর্বক নির্ভরতার ছাপ ফেলবে।—দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৪-৯; ১১:১৮, ১৯.
যিহোবার অতুলনীয় কর্মসকল
১৪, ১৫. যিহোবার অতুলনীয় কাজগুলির মধ্যে কয়েকটি কাজ কী?
১৪ দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দায়ূদ বলেন: “হে যিহোবা, দেবগণের মধ্যে তোমার তুল্য কেহই নাই, তোমার কর্ম্ম সকলের তুল্য কিছুই নাই।” (গীতসংহিতা ৮৬:৮, NW) একজন মানুষ যতটা কল্পনা করতে পারে যিহোবার কর্মসকল তার থেকেও বড়, মহান, এবং রাজকীয়। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, এই সৃষ্ট বিশ্বব্রহ্মাণ্ড—বিশালতায়, সমন্বয়ে, বিস্ময়করতায়—দায়ূদ যা উপলব্ধি করেছিলেন তার থেকে অনেক বেশী আশ্চর্যজনক। তবুও, তিনি এইরকম বলতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন: “আকাশমণ্ডল ঈশ্বরের গৌরব বর্ণনা করে, বিতান তাঁহার হস্তকৃত কর্ম্ম জ্ঞাপন করে।”—গীতসংহিতা ১৯:১.
১৫ যিহোবার কর্মসকল সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়, যেভাবে তিনি পৃথিবীকে তৈরী ও স্থাপন করেছেন দিন এবং রাত, ঋতু, বীজরোপণ এবং ফসল কাটা, এবং ভবিষ্যতে মানুষের উপভোগ্য প্রচুর মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করে, তার মাধ্যমে। আর আমরা নিজেরা কত আশ্চর্যজনকভাবে তৈরী এবং প্রস্তুত, যাতে আমাদের চারিপাশে যিহোবার সমস্ত কর্ম আমরা উপভোগ করতে পারি।—আদিপুস্তক ২:৭-৯; ৮:২২; গীতসংহিতা ১৩৯:১৪.
১৬. যিহোবার মঙ্গলভাবের সর্বমহান অভিব্যক্তি কী, যা আরও কী অতুলনীয় কাজের দিকে পরিচালিত করবে?
১৬ আমাদের প্রথম পিতামাতা ঈশ্বরের অবাধ্য হয়ে বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবী যে সংকটের সম্মুখীন হয় তার সূচনা করার পর, প্রেমের বশবর্তী হয়ে যিহোবা তাঁর পুত্রকে ঈশ্বরের রাজ্য ঘোষণা করার জন্য এবং মানবজাতির প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে মৃত্যুবরণ করার জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়ে, একটি আশ্চর্য-কার্য সাধন করেন। আর অতি আশ্চর্যের বিষয়! যিহোবা তারপর খ্রীষ্টকে পুনরুত্থান করেন তাঁর নির্বাচিত সহ-শাসক হওয়ার জন্য। আরও অনুগত মানবদের মধ্যে থেকে ঈশ্বর এক “নূতন সৃষ্টিকে” বেছে নিয়েছেন যারা খ্রীষ্টের সাথে “নূতন পৃথিবী সমাজ,” যার মধ্যে থাকবে কোটি কোটি পুনরুত্থিত মানুষ, তার উপরে “নূতন আকাশমণ্ডল” হিসাবে হিতকারী শাসন করবে। (২ করিন্থীয় ৫:১৭; প্রকাশিত বাক্য ২১:১, ৫-৭; ১ করিন্থীয় ১৫:২২-২৬) যিহোবার কর্মসকল এইভাবে একটি মহিমাময় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে! সত্যই, আমরা বিস্ময়ের সাথে বলতে পারি: “হে যিহোবা, . . . তোমার দত্ত মঙ্গল কেমন মহৎ, যাহা তুমি তোমার ভয়কারীদের জন্য সঞ্চয় করিয়াছ।”—গীতসংহিতা ৩১:১৭-১৯, NW.
১৭. যিহোবার কর্ম সম্বন্ধে, গীতসংহিতা ৮৬:৯ কিভাবে এখন পূর্ণতা লাভ করছে?
১৭ যিহোবার বর্তমান দিনের কর্মসকল অন্তর্ভুক্ত করে দায়ূদ যা গীতসংহিতা ৮৬:৯ (NW) পদে বর্ণনা করেছেন: “হে যিহোবা, তোমার বিরচিত সর্ব্বজাতি আসিয়া তোমার সম্মুখে প্রণিপাত করিবে, তাহারা তোমার নামের গৌরব করিবে।” মানবজাতির মধ্যে থেকে তাঁর নূতন সৃষ্টির অবশিষ্টাংশকে, রাজ্যের উত্তরাধীকারী “ক্ষুদ্র মেষপালকে” ডেকে নেওয়ার পরে, যিহোবা “প্রত্যেক জাতি” থেকে “অপর মেষের” “এক বিরাট জনতা,” লক্ষ লক্ষ লোক যারাও যীশুর পাতিত রক্তের প্রতি বিশ্বাস দেখিয়েছে, তাদের একত্রিত করা শুরু করেছেন। এদের তিনি একটি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করেছেন, বর্তমান পৃথিবীতে একমাত্র বিশ্বব্যাপী শান্তিপ্রেমী সমাজ। এই সমস্ত দেখে, স্বর্গীয় দূতেরা যিহোবার সামনে প্রণিপাত করে ঘোষণা করে: “ধন্যবাদ ও গৌরব ও জ্ঞান ও প্রশংসা ও সমাদর ও পরাক্রম ও শক্তি যুগপর্য্যায়ের যুগে যুগে আমাদের ঈশ্বরের প্রতি বর্ত্তুক।” বিরাট জনতাও ঈশ্বরের নামের গৌরব করে, “দিবারাত্র” তাঁর সেবা করে, এই জগতের ধ্বংস থেকে রক্ষা পেয়ে একটি পরমদেশ পৃথিবীতে অনন্তকাল বেঁচে থাকার আশা নিয়ে।—লূক ১২:৩২; প্রকাশিত বাক্য ৭:৯-১৭; যোহন ১০:১৬.
যিহোবার মহত্ত্ব
১৮. কিভাবে যিহোবা দেখিয়েছেন যে তিনিই ‘একমাত্র ঈশ্বর’?
১৮ দায়ূদ এরপর যিহোবার ঈশ্বরত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, এই বলে: “তুমি মহান, এবং আশ্চর্য্য-কার্য্যকারী; তুমিই একমাত্র ঈশ্বর।” (গীতসংহিতা ৮৬:১০) প্রাচীনকাল থেকে, যিহোবা প্রদর্শন করে আসছেন, যে বাস্তবিকই তিনি ‘একমাত্র ঈশ্বর।’ মিশরের এক অত্যাচারী ফরৌণ মোশিকে চ্যালেঞ্জ করে: “যিহোবা কে, যে আমি তাহার কথা শুনিয়া ইস্রায়েলকে ছাড়িয়া দিব? আমি যিহোবাকে জানি না।” কিন্তু শীঘ্রই তাকে শিখতে হয়েছিল যিহোবা কত মহান! ধ্বংসাত্বক মহামারী এনে, মিশরের প্রথমজাত সন্তানদের বিনাশ করে, এবং ফরৌণের সেরা সৈন্যদলকে লোহিত সাগরে নিশ্চিহ্ন করে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর মিশরের দেবতাদের এবং মন্ত্রবেত্তাদের হেয় করেছিলেন। সত্যই, দেবতাদের মধ্যে যিহোবার তুল্য কেউ নেই!—যাত্রাপুস্তক ৫:২; ১৫:১১, ১২.
১৯, ২০. (ক) কখন প্রকাশিত বাক্য ১৫:৩, ৪ পদের গীত সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ পাবে? (খ) কিভাবে আমরা এখনই যিহোবার কাজে অংশ নিতে পারি?
১৯ একমাত্র ঈশ্বর হিসাবে, আধুনিক মিশর—শয়তানের জগৎ থেকে তাঁর অনুগত উপাসকদের পরিত্রাণ দেওয়ার প্রস্তুতি হিসাবে যিহোবা অনেক আশ্চর্য-কার্য করেছেন। ইতিহাসে সর্বাধিক বিস্তৃত আকারে প্রচার অভিযানের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে সাক্ষ্য হিসাবে তিনি তাঁর ঐশ্বরিক বিচারাজ্ঞা ঘোষণা করিয়েছেন, আর এইভাবে মথি ২৪:১৪ পদের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণতা লাভ করেছে। শীঘ্রই, “শেষ” অবশ্যই আসবে, যখন পৃথিবী থেকে সমস্ত দুষ্টতা নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যিহোবা অভূতপূর্ব আকারে তাঁর মহত্ত্ব প্রকাশ করবেন। (গীতসংহিতা ১৪৫:২০) তখন মোশির গীত এবং মেষশাবকের গীত চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে: “মহৎ ও আশ্চর্য্য তোমার ক্রিয়া সকল, হে প্রভু ঈশ্বর, সর্ব্বশক্তিমান্; ন্যায্য ও সত্য তোমার মার্গ সকল, হে জাতিগণের রাজন্! হে প্রভু, কে না ভীত হইবে? এবং তোমার নামের গৌরব কে না করিবে? কেননা একমাত্র তুমিই সাধু।”—প্রকাশিত বাক্য ১৫:৩, ৪.
২০ ঈশ্বরের এই বিস্ময়কর উদ্দেশ্যগুলি সম্বন্ধে অন্যদের জানানোতে আমরা যেন আমাদের কাজে উদ্যোগী হই। (তুলনা করুন প্রেরিত ২:১১.) আমাদের দিনে এবং ভবিষ্যতেও যিহোবা আরও মহান এবং আশ্চর্য-কার্য করবেন, যেমন পরবর্তী প্রবন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে। (w92 12/15)
[পাদটীকাগুলো]
a অ্যাণ্ড্রু এ. বনারের কথা উদ্ধৃতি করে বাইবেলের উপর ১৮৭৪ সালের একটি ধারাবিবরণী বলে: “পূর্ববর্তী [৮৫তম] গীতের শেষে ঈশ্বরের নিজস্ব চরিত্র, তাঁর মহিমাময় নামকে অনেকটা, বহুল-পরিমাণে প্রকাশিত করা হয়েছে। এই জন্য বোধহয় তার পরেরটি, ‘দায়ূদের একটি প্রার্থনা,’ প্রায় একইভাবে যিহোবার চরিত্রে পরিপূর্ণ। এই [৮৬তম] গীতের মর্ম হল যিহোবার নাম।”
ওয়াচটাওয়ার বাইবেল অ্যাণ্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটি অফ নিউ ইয়র্ক, আই. এন. সি. দ্বারা প্রকাশিত আওয়েক! পত্রিকার জুন ২২, ১৯৮৪ সংখ্যার পৃষ্ঠা ২৮ দেখুন।
বিস্তারিত বিবরণের জন্য, “বিশ্বব্যাপী যিহোবার সাক্ষীদের ১৯৯২ পরিচর্য্যা বছরের রিপোর্ট” তালিকাটি দেখুন, যা জানুয়ারি ১, ১৯৯৩, প্রহরীদুর্গের সংখ্যায় প্রকাশিত হবে।
আপনি কি স্মরণ করতে পারেন?
▫ গীত ৮৬-এর প্রার্থনাটিকে কেন আমাদের নিজের করে নেওয়া উচিৎ?
▫ কিভাবে আমরা যিহোবার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি?
▫ যিহোবা কিভাবে আমাদের প্রতি তাঁর মঙ্গলভাব দেখিয়েছেন?
▫ যিহোবার অতুলনীয় কাজের মধ্যে কয়েকটি কী?
▫ মহত্ত্বের পরিচয়ে কিভাবে যিহোবা হলেন ‘একমাত্র ঈশ্বর’?
[Pictures on page 23]
আগত “নূতন পৃথিবীতে,” যিহোবার আশ্চর্য-কার্য তাঁর মহিমা এবং তাঁর মঙ্গলভাবের সাক্ষ্য দেবে