যখন আপনি প্রার্থনা করেন ঈশ্বর কি শোনেন?
একজন চীফ এক্সিকিউটিভ সিদ্ধান্ত নেন কোন বিষয় তিনি অন্যদের পরিচালনা করতে দেবেন নাকি তিনি ব্যক্তিগতভাবে তা পরিচালনা করবেন। একইভাবে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সার্বভৌম শাসনকর্তার সামনে কোন বিষয়ে ব্যক্তিগতরূপে তিনি কতটা জড়িত থাকবেন তা বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শাস্ত্র আমাদের শিক্ষা দেয় যে ঈশ্বর আমাদের প্রার্থনায় ব্যক্তিগতভাবে জড়িত থাকা বেছে নিয়েছেন এবং তাই আমাদের প্রার্থনা তাঁর প্রতি উদ্দেশ্য করতে নির্দেশ দেয়।—গীতসংহিতা ৬৬:১৯; ৬৯:১৩.
এই বিষয়ে ঈশ্বরের বাছাই তাঁর মানব সেবকদের প্রার্থনার প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ প্রকাশ করে। তার লোকদের প্রত্যেক চিন্তা এবং উদ্বেগ সহকারে তাঁর কাছে যাওয়া থেকে বিরত করার বদলে, তিনি তাদের উৎসাহ দেন: “অবিরত প্রার্থনা কর,” “প্রার্থনায় নিবিষ্ট থাক,” “যিহোবাতে আপনার ভার অর্পণ কর,” “সমস্ত ভাবনার ভার [ঈশ্বরের] উপরে ফেলিয়া দেও।”—১ থিষলনীকীয় ৫:১৭; রোমীয় ১২:১২; গীতসংহিতা ৫৫:২২; ১ পিতর ৫:৭.
যদি ঈশ্বর তাঁর সেবকদের প্রার্থনার প্রতি মনোযোগ না দিতে চান, তাহলে তিনি তাঁর কাছে পৌঁছাবার এরকম ব্যবস্থা এবং তা মুক্তভাবে ব্যবহার করতে কখনও উৎসাহ দিতেন না। এইটি, তাহলে, তাঁর লোকেদের কাছে নিজেকে সমীপবর্তী করতে ঈশ্বরের বাছাই, আত্মবিশ্বাসের একটি কারণ যে তিনি প্রকৃতই শোনেন। হ্যাঁ, তিনি তাঁর প্রত্যেকটি সেবকের প্রার্থনার প্রতি বিবেচনা দেখান।
এই বিষয়টিও উপেক্ষা করার নয় যে বাইবেল সরাসরি জানায় যে ঈশ্বর প্রার্থনা শোনেন। প্রেরিত যোহন, উদাহরণস্বরূপ, লেখেন: “তাঁহার উদ্দেশে আমরা এই সাহস প্রাপ্ত হইয়াছি যে, যদি তাঁহার ইচ্ছানুসারে কিছু যাচ্ঞা করি, তবে তিনি আমাদের যাচ্ঞা শুনেন।” (১ যোহন ৫:১৪) রাজা দায়ূদ যিহোবা ঈশ্বরকে “প্রার্থনা-শ্রবণকারী” হিসাবে উল্লেখ করেন এবং দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে জোর দিয়ে বলেন: “তিনি আমার রব শুনেন।”—গীতসংহিতা ৫৫:১৭; ৬৫:২.
সুতরাং প্রার্থনার নিজস্ব উপকার থাকলেও, শাস্ত্র দেখায় যে যখন একজন ধার্মিক ব্যক্তি প্রার্থনা করেন তার সঙ্গে আরও অনেক কিছু জড়িত আছে। কেউ শুনছেন। সেই শ্রবণকারী ঈশ্বর।—যাকোব ৫:১৬-১৮.
যে প্রার্থনাগুলি শ্রবণ করা হয়েছিল
বাইবেল এমন ব্যক্তিদের বিবরণে পূর্ণ যাদের প্রার্থনা, বস্তুতপক্ষে, ঈশ্বর শোনেন এবং উত্তর দেন। তাদের অভিজ্ঞতা পরিষ্কারভাবে দেখায় যে প্রার্থনার উপকার একজনের চিন্তাধারা গুছিয়ে নিয়ে প্রকাশ করার চিকিৎসাবিদ্যাগত ফলের চেয়েও আরও অনেক বেশী। একজন ব্যক্তির তার প্রার্থনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার থেকেও আরও অনেক অধিক।
উদাহরণস্বরূপ, ইস্রায়েলের রাজত্ব দখল করবার জন্য অবশালোমের চক্রান্তের সম্মুখীন হয়ে, রাজা দায়ূদ প্রার্থনা করেন: “হে যিহোবা, অনুগ্রহ করিয়া অহীথোফলের [অবশালোমের মন্ত্রী] মন্ত্রণাকে মূর্খতায় পরিণত কর!” কোন ক্ষুদ্র অনুরোধ নয়, কারণ “অহীথোফল যে মন্ত্রণা দিত, সেই মন্ত্রণা ঈশ্বরের বাক্যে উত্তরপ্রাপ্তির তুল্য ছিল। . . . অহীথোফলের যাবতীয় মন্ত্রণা তাদৃশ ছিল।” অবশালোম তারপরে রাজা দায়ূদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অহীথোফলের পরিকল্পিত রণনীতি অগ্রাহ্য করে। কেন? “যিহোবা যেন অবশালোমের প্রতি অমঙ্গল ঘটান, তজ্জন্য অহীথোফলের ভাল মন্ত্রণা ব্যর্থ করণার্থে যিহোবাই ইহা স্থির করিয়াছেন।” স্পষ্টত, দায়ূদের প্রার্থনা শোনা হয়েছিল।—২ শমূয়েল ১৫:৩১; ১৬:২৩; ১৭:১৪, NW.
একইভাবে, চরম রোগগ্রস্থ অবস্থা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য ঈশ্বরের কাছে হিষ্কিয় সবিনয় প্রার্থনা করার পরে, তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। ইহা কি প্রার্থনা করার জন্য শুধুমাত্র মানসিক উপকার হিষ্কিয় লাভ করেছিলেন? অবশ্যই, না! ভাববাদী যিশাইয় যেমন বলেন, হিষ্কিয়ের প্রতি যিহোবার বার্তা, এই ছিল: “আমি তোমার প্রার্থনা শুনিলাম, আমি তোমার নেত্রজল দেখিলাম; দেখ, আমি তোমাকে সুস্থ করিব।”—২ রাজাবলি ২০:১-৬.
দানিয়েল, যার প্রার্থনার উত্তর তিনি যা আশা করেছিলেন তার থেকে দেরীতে দেওয়া হয়, যিহোবার স্বর্গদূত দ্বারা আশ্বাসপ্রাপ্ত হন: “তোমার বাক্য শুনা হইয়াছে।” অন্যদের, যেমন হান্না, যীশুর শিষ্যরা, এবং সৈনাধ্যক্ষ কর্ণীলিয়, তাদের প্রার্থনার এমনভাবে উত্তর দেওয়া হয়েছিল যা শুধুমাত্র মানুষের ক্ষমতার দ্বারা লাভ করা যায় না। বাইবেল, সুতরাং, স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে ঐশ্বরিক ইচ্ছার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রার্থনা ঈশ্বর গ্রহণ করেন, শোনেন, এবং উত্তর দেন।—দানিয়েল ১০:২-১৪; ১ শমূয়েল ১:১-২০; প্রেরিত ৪:২৪-৩১; ১০:১-৭.
কিন্তু বর্তমানে তাঁর বিশ্বস্ত সেবকদের প্রার্থনার উত্তর ঈশ্বর কিভাবে দেন?
প্রার্থনার উত্তর
উপরোক্ত প্রার্থনাগুলির উত্তর নাটকীয়, অলৌকিকভাবে দেওয়া হয়। দয়া করে মনে রাখবেন, যদিও, যে এমনকি বাইবেলের সময়ও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রার্থনার উত্তর অত সহজে উপলব্ধি করা যেত না। তার কারণ তা জড়িত ছিল নৈতিক শক্তি এবং অন্তর্দৃষ্টি দেওয়ার সাথে, যাতে ঈশ্বরের সেবকরা ধার্মিকতার পথ বজায় রাখতে পারত। বিশেষত খ্রীষ্টীয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, প্রার্থনার উত্তর সাধারণত আত্মিক বিষয়ের সাথে জড়িত ছিল, অত্যাশ্চর্য অথবা শক্তিশালী কাজের সাথে নয়।—কলসীয় ১:৯.
তাই হতাশ হবেন না যদি আপনার প্রার্থনার যে ভাবে আপনি চান অথবা পছন্দ করেন সেইভাবে সবসময় উত্তর না পান। উদাহরণস্বরূপ, কোন পরীক্ষা সরিয়ে না দিয়ে, ঈশ্বর হয়তো সহ্য করার জন্য “পরাক্রমের উৎকর্ষ” আপনাকে দিতে পারেন। (২ করিন্থীয় ৪:৭; ২ তীমথিয় ৪:১৭) এইরকম পরাক্রমের মূল্য আমরা যেন কখনও অবহেলা না করি, আমরা যেন এই উপসংহারেও না আসি যে যিহোবা আমাদের প্রার্থনার কোনই উত্তর দেননি।
অন্য কেউ নয়, ঈশ্বরের নিজের পুত্র, যীশু খ্রীষ্টের কথা চিন্তা করুন। আপাতদৃষ্টিতে ঈশ্বরনিন্দক হিসাবে মারা যাওয়া সম্বন্ধে তার দুশ্চিন্তার জন্য, যীশু প্রার্থনা করেন: “পিতঃ, যদি তোমার অভিমত হয়, আমা হইতে এই পানপাত্র দূর কর।” ঈশ্বর কি অনুগ্রহপূর্বক এই প্রার্থনা শোনেন? হ্যাঁ, যেমন ইব্রীয় ৫:৭ পদে তার নিশ্চয়তা দেওয়া আছে। যিহোবা তাঁর পুত্রের যাতনাদণ্ডে মৃত্যুবরণ করবার যে প্রয়োজন ছিল তা সরিয়ে দেননি। বরঞ্চ, “স্বর্গ হইতে এক দূত দেখা দিয়া তাঁহাকে সবল করিলেন।”—লূক ২২:৪২, ৪৩.
একটি নাটকীয়, অলৌকিক উত্তর? আমাদের কাছে, হয়তো হতে পারে! কিন্তু যিহোবা ঈশ্বরের কাছে, যিনি এই শক্তির উৎস, ইহা কোন অলৌকিক কাজ ছিল না। এবং যীশু, পূর্বে তার স্বর্গীয় জীবন থেকে, অতীতে স্বর্গদূতদের মানুষের কাছে আবির্ভূত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তাই একজন দূতের আবির্ভাব আমাদের উপরে যেরকম নাটকীয় প্রভাব ফেলতে পারে তার উপরে সেরকম প্রভাব বিস্তার করবে না। যাইহোক, এই দূত, যাকে স্পষ্টতই যীশু তার মানবপূর্ব অস্তিত্বের সময় থেকে ব্যক্তিগতভাবে জানতেন, তাকে আগত পরীক্ষার জন্য শক্তি প্রদান করতে সাহায্য করে।
বর্তমানে তাঁর বিশ্বস্ত সেবকদের প্রার্থনার উত্তর দেওয়ার সময়, যিহোবা প্রায়ই সহ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করেন। এই সাহায্য হয়তো যে সহউপাসকদের সাথে আমরা ব্যক্তিগতভাবে মেলামেশা করি তাদের কাছ থেকে উৎসাহ হিসাবে আসতে পারে। আমাদের মধ্যে কেউ কি সেই উৎসাহ উপেক্ষা করতে চাইব, হয়তো এই উপসংহারে এসে যে যেহেতু আমাদের সহসেবকরা আমাদের মত পরীক্ষার সম্মুখীন হয়নি, তারা আমাদের শক্তি প্রদান করার মত অবস্থায় নেই? যে স্বর্গদূত তার সামনে উপস্থিত হয়েছিল তার প্রতি যীশু ঠিক এইরকম মনোভাব দেখাতে পারতেন। বরঞ্চ, তিনি সেই উৎসাহ তার প্রার্থনার প্রতি যিহোবার উত্তর হিসাবে গ্রহণ করেন এবং তাই বিশ্বস্তভাবে তার পিতার ইচ্ছা পালন করতে সক্ষম হন। আমরাও আমাদের প্রার্থনার উত্তর হিসাবে ঈশ্বর যে শক্তি যোগান তা অনুগ্রহপূর্বক গ্রহণ করব। আরও, মনে রাখবেন, ধৈর্য্যসহকারে সহ্য করার এই সময়ের পরে প্রায়ই অবর্ণিত আশীর্বাদের সময় আসে।—উপদেশক ১১:৬; যাকোব ৫:১১.
নিশ্চিত থাকুন যে ঈশ্বর শোনেন
যদি অবিলম্বে উত্তর না পান তাহলেও প্রার্থনার কার্যকারিতা সম্বন্ধে আত্মবিশ্বাস কখনও হারাবেন না। কিছু প্রার্থনার উত্তরের জন্য, যেমন ব্যক্তিগত কোন সমস্যার উপশম অথবা ঈশ্বরের প্রতি পরিচর্য্যায় আরও অধিক দায়িত্বের জন্য, হয়তো অপেক্ষা করতে হতে পারে সেই সময়ের জন্য যা ঈশ্বর সঠিক এবং সর্বাধিক উত্তম বলে জানেন। (লূক ১৮:৭, ৮; ১ পিতর ৫:৬) যদি আপনি কোন গভীর উদ্বিগ্নতাপূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রার্থনা করছেন, অটলভাবে রত থাকার দ্বারা ঈশ্বরকে দেখান যে আপনার ইচ্ছা প্রবল, আপনার উদ্দেশ্য পবিত্র এবং অকপট। যাকোব এই মনোভাব দেখান, কিছুক্ষণ একজন স্বর্গদূতের সাথে রীতিমত মল্লযুদ্ধ করার পরে, তিনি বলেন: “আপনি আমাকে আশীর্ব্বাদ না করিলে আপনাকে ছাড়িব না।” (আদিপুস্তক ৩২:২৪-৩২) আমাদেরও একইরকম আস্থা থাকা চাই যে যদি আমরা ক্রমাগত চাইতে থাকি, আমরা যথাসময় আশীর্বাদ পাব।—লূক ১১:৯.
একটি শেষ কথা। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সার্বভৌম কর্তা যে আমাদের কথা শোনেন তা একটি মহামূল্যবান অধিকার। এই পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা কি মনোযোগসহকারে শুনি যখন যিহোবা ঈশ্বর, তাঁর বাক্যের মাধ্যমে, আমাদের সাথে তাঁর প্রয়োজন সম্বন্ধে কথা বলেন? আমাদের প্রার্থনা যেহেতু ঘনিষ্টভাবে আমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকটে নিয়ে আসে, আমাদের উচিৎ তিনি যা কিছু আমাদের বলেন তার প্রতি গভীর মনোযোগ দেওয়া। (w92 4/15)
[Pictures on page 6]
ঈশ্বর প্রার্থনা শোনেন। আমরা কি তাঁর বাক্যের মাধ্যমে তাঁর কথা শুনি?