আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ
বলেছেন মার্তা চাভেস সেরনা
আমার বয়স যখন ১৬ বছর, সেই সময় একদিন ঘরে কাজ করার সময় আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। যখন আমার জ্ঞান ফিরে আসে, তখন আমি বিছানায়। প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণায় দিশেহারা হয়ে, আমি কয়েক মিনিটের জন্য দেখতেও পারছিলাম না বা শুনতেও পারছিলাম না। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার একি হল?
আমার উদ্বিগ্ন বাবামা আমাকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, যিনি ভিটামিন ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, এরকম মূর্ছা যাওয়ার কারণ ছিল ঘুম কম হওয়া। কয়েক মাস পর, আমার আবার খিঁচুনি হয়েছিল আর এরপর, তৃতীয় বারও একই বিষয় ঘটেছিল। আমরা আরেকজন ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম, যিনি ভেবেছিলেন যে, আমার স্নায়ুঘটিত কোনো রোগ হয়েছিল আর তিনি আমাকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলেন।
কিন্তু এরকম মূর্ছা যাওয়া খুবই ঘন ঘন হতে থাকে। বার বার আমি জ্ঞান হারাতাম এবং আহত হতাম। কখনো কখনো আমি নিজের জিভে ও মুখের ভিতরে কামড় দিতাম। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর, আমার প্রচণ্ড মাথাব্যথা হতো এবং বমি বমি লাগত। আমার সারা শরীরে যন্ত্রণা হতো আর প্রায়ই আমি মনে করতে পারতাম না যে, এরকম মূর্ছা যাওয়ার আগে কী ঘটেছিল। সুস্থ হয়ে উঠার জন্য আমাকে প্রায়ই দুএকদিন বিশ্রাম নিতে হতো। তা সত্ত্বেও, আমার বিশ্বাস ছিল যে, এই সমস্যা ক্ষণস্থায়ী—কারণ শীঘ্রই আমি ঠিক হয়ে যাব।
আমার লক্ষ্যগুলোর ওপর প্রভাব
আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন আমার পরিবার যিহোবার সাক্ষিদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করতে শুরু করে। আমাদের শিক্ষক ছিল দুজন বিশেষ অগ্রগামী অথবা পূর্ণসময়ের পরিচারক, যারা অন্যদের বাইবেলের সত্যগুলো শিক্ষা দিতে প্রতি মাসে অনেক ঘন্টা ব্যয় করত। আমি দেখতে পেয়েছিলাম যে, সেই অগ্রগামীদের পরিচর্যা তাদের আনন্দ দান করত। আমি যখন আমার শিক্ষিকা ও সহপাঠীদের কাছে বাইবেলের প্রতিজ্ঞাগুলো সম্বন্ধে কথা বলেছিলাম, তখন আমিও সেই আনন্দ অনুভব করতে শুরু করেছিলাম।
শীঘ্রই, আমার পরিবারের অনেকে যিহোবার সাক্ষি হয়। সুসমাচার প্রচার করে আমি কতই না আনন্দ পেয়েছি! সাত বছর বয়সে, আমি একজন বিশেষ অগ্রগামী হওয়ার লক্ষ্যও স্থাপন করেছিলাম। ১৬ বছর বয়সে যখন আমি বাপ্তিস্ম নিই, তখন আমি সেই লক্ষ্যের দিকে এক বিরাট ধাপ নিয়েছিলাম। এরপরই মূর্ছা যাওয়া শুরু হয়।
অগ্রগামীর পরিচর্যা
আমার শারীরিক সমস্যাগুলো থাকা সত্ত্বেও, আমি মনে করেছিলাম যে, আমি যিহোবার সাক্ষিদের একজন পূর্ণসময়ের পরিচারক হতে পারব। কিন্তু, যেহেতু আমি সপ্তাহে দুবার মূর্ছা যাচ্ছিলাম, তাই মণ্ডলীর কেউ কেউ মনে করেছিল যে, আমার এরকম এক গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত নয়। আমি দুঃখিত ও নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু, কিছু সময় পর, মেক্সিকোর যিহোবার সাক্ষিদের শাখা অফিসে সেবারত এক বিবাহিত দম্পতি আমাদের মণ্ডলীতে আসে। তারা আমার অগ্রগামী হওয়ার ইচ্ছার কথা জানতে পারে এবং আমাকে অনেক উৎসাহ দান করে। তারা আমাকে এই দৃঢ়প্রত্যয় জুগিয়েছিল যে, অসুস্থতার জন্য আমার অগ্রগামীর কাজ বন্ধ করার কোনো কারণ নেই।
তাই ১৯৮৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর, আমি আমার নিজ শহর মেক্সিকোর সান্ আনড্রেস চিয়াউটলাতে একজন নিয়মিত অগ্রগামী হিসেবে আমার কার্যভার পাই। প্রত্যেক মাসে সুসমাচার প্রচারে আমি অনেক ঘন্টা ব্যয় করি। মূর্ছা যাওয়ার কারণে আমি যখন জনসাধারণ্যে প্রচার করতে পারতাম না, তখন আমি এলাকার লোকেদের কাছে শাস্ত্রীয় বিষয়গুলোর ওপর চিঠি লিখতাম আর এইভাবে তাদেরকে বাইবেল অধ্যয়ন করার জন্য লিখিতভাবে উৎসাহিত করতাম।
আমার রোগনির্ণয় করা হয়
এই সময়ে আমার বাবামা অনেক পয়সা খরচ করে আমাকে একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যায়। এই ডাক্তার আমার রোগকে মৃগীরোগ বলে নির্ণয় করেন। তখন আমার যে-চিকিৎসা হয় তার দরুন প্রায় চার বছর যাবৎ আমার অসুস্থতা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। এর মধ্যে, আমি অগ্রগামী পরিচর্যা স্কুলে যোগদান করতে সক্ষম হই আর সেখানে আমি এমন উৎসাহ পাই, যা, যেখানে সুসমাচার প্রচারকদের বেশি প্রয়োজন ছিল সেখানে সেবা করার বিষয়ে আমার আকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধি করেছিল।
আমার বাবামা জানতেন যে, আমি আমার পরিচর্যাকে কতখানি বৃদ্ধি করতে চাইতাম। যেহেতু আমার অসুস্থতা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল, তাই তারা আমাকে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে, মিকোয়াকান রাজ্যের সিটাকোয়ারোতে যেতে অনুমতি দিয়েছিল। সেই কার্যভারের অন্যান্য অগ্রগামীদের সঙ্গে মেলামেশা করা আমাকে পূর্ণসময়ের পরিচর্যাকে আরও বেশি করে মূল্যবান বলে মনে করতে সাহায্য করেছিল।
কিন্তু সিটাকোয়ারোতে দুবছর কাটানোর পর, আবারও মূর্ছা যাওয়া শুরু হয়। হতাশ ও দুঃখিত হয়ে এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে আমি আমার বাবামার কাছে ফিরে যাই। আমি একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাই, যিনি দৃঢ়নিশ্চিত ছিলেন যে, আমি যে-চিকিৎসা করাচ্ছিলাম তা আমার যকৃৎকে নষ্ট করে দিচ্ছিল। আমি অন্য চিকিৎসা পদ্ধতির খোঁজ করতে শুরু করি, কারণ চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞের কাছে বার বার যাওয়ার খরচ আমরা আর বহন করতে পারছিলাম না। আমার অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে আর আমাকে অগ্রগামীর কাজ করা বন্ধ করে দিতে হয়। প্রতিবার মূর্ছা যাওয়ার ফলে আমার অবস্থার অবনতি হয়। কিন্তু, আমি যখন গীতসংহিতা বইটি পড়ি এবং প্রার্থনায় যিহোবার শরণাপন্ন হই, তখন আমি তাঁর দত্ত সান্ত্বনা ও শক্তি অনুভব করি।—গীতসংহিতা ৯৪:১৭-১৯.
আমার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়
আমার অবস্থা প্রচণ্ড খারাপ থাকার সময় আমি দিনে দুবার মূর্ছা যেতাম। এরপর এক লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে। একজন ডাক্তার আমাকে মৃগীরোগের জন্য এক ভিন্ন চিকিৎসা দেন আর আমি বেশ দীর্ঘদিন যাবৎ ভাল বোধ করতে শুরু করি। তাই, ১৯৯৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে আমি আবার অগ্রগামীর পরিচর্যার কাজ শুরু করি। আমার স্বাস্থ্য ঠিক থাকে, তাই দুবছরের মধ্যে কোনোরকম মূর্ছা না যাওয়ায়, আমি একজন বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে সেবা করার জন্য আবেদন করি। এর অর্থ হবে পরিচর্যায় আরও বেশি সময় ব্যয় করা এবং যেখানে বেশি প্রয়োজন সেখানে সেবা করতে যাওয়া। আমি যখন আমার কার্যভার পেয়েছিলাম, তখন আমার কেমন লেগেছিল তা একবার কল্পনা করুন! ছোটবেলায় আমি যে-লক্ষ্য স্থাপন করেছিলাম সেই লক্ষ্যে আমি পৌঁছেছিলাম।
২০০১ সালের ১লা এপ্রিল, ইডালগো রাজ্যের পর্বতমালায় অবস্থিত একটা ছোট্ট গ্রামে আমি আমার নতুন কার্যভার শুরু করি। এখন আমি গুয়ানাজুয়াটোর একটা ছোট্ট শহরে সেবা করছি। ওষুধপত্র খাওয়া ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার ব্যাপারে আমাকে খুবই সতর্ক থাকতে হয়। আমি আমার খাবারদাবারের ব্যাপারে সতর্ক থাকি, বিশেষ করে চর্বি জাতীয়, ক্যাফেইন এবং টিনের মধ্যে রাখা খাবারদাবারের ব্যাপারে। এ ছাড়া, আমি রাগ অথবা অত্যধিক উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো প্রবল আবেগগুলোকেও এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু, যথাযথ এই রুটিন মেনে চলায় আমার অনেক উপকার হয়েছে। একজন বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে সেবা করার সময়, আমি মাত্র একবার মূর্ছা গিয়েছিলাম।
যেহেতু আমি অবিবাহিত এবং কোনো পারিবারিক দায়দায়িত্ব নেই, তাই আমি একজন বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে সেবা করে যেতে আনন্দিত। আমি এটা জেনে সান্ত্বনা খুঁজে পাই যে, ‘ঈশ্বর অন্যায়কারী নহেন; আমাদের কার্য্য, এবং তাঁহার নামের প্রতি প্রদর্শিত আমাদের প্রেম, এই সকল তিনি ভুলিয়া যাইবেন না।’ তিনি কতই না প্রেমময়, কারণ আমরা তাঁকে দিতে পারব না এমন কোনোকিছুই তিনি দাবি করেন না! এই সত্যকে মেনে নেওয়া আমাকে আমার চিন্তাভাবনায় ভারসাম্যপূর্ণ হতে সাহায্য করেছে, কারণ ভগ্ন স্বাস্থ্য যদি আমাকে আবারও অগ্রগামীর কাজ বন্ধ করতে বাধ্য করে, তা হলে আমি জানি যে, যিহোবা তবুও মনপ্রাণ দিয়ে করা আমার সেবায় খুশি হবেন।—ইব্রীয় ৬:১০; কলসীয় ৩:২৩.
নিঃসন্দেহে, প্রতিদিন অন্যদের কাছে আমার বিশ্বাস সম্বন্ধে বলা আমাকে শক্তিশালী করে। এ ছাড়া, ভবিষ্যতের জন্য ঈশ্বর যে-আশীর্বাদগুলো সঞ্চিত করে রেখেছেন, সেগুলো আমার মনে সর্বাগ্রে রাখতে এটা সাহায্য করে। বাইবেলের প্রতিজ্ঞা হল যে, নতুন জগতে রোগব্যাধি, “শোক বা আর্ত্তনাদ বা ব্যথাও আর হইবে না; কারণ প্রথম বিষয় সকল লুপ্ত [হইবে]।”—প্রকাশিত বাক্য ২১:৩, ৪; যিশাইয় ৩৩:২৪; ২ পিতর ৩:১৩.
[২৬ পৃষ্ঠার চিত্রগুলো]
প্রায় ৭ বছর বয়স (ওপরে); প্রায় ১৬ বছর বয়স, আমার বাপ্তিস্মের ঠিক পরেই
[২৭ পৃষ্ঠার চিত্র]
একজন বন্ধুর সঙ্গে প্রচার করছি