আমার মৃতপ্রায় অবস্থার থেকে ডাক্তারেরা কিছু শিখেছিলেন
মে ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি, আমরা জানতে পারি যে আমাদের চতুর্থ সন্তান আসছে। আমাদের ছোট ছেলে, মাইকেলের বয়স হল নয় বছর এবং আমাদের দুটি জমজ মেয়ে মারিয়া ও সারা, হল ১৩ বছরের। যদিও আগত শিশুটি আমাদের পরিকল্পনার বাইরে ছিল, কিন্তু আমরা আরেকটি সন্তান আসছে এই বিষয় সম্বন্ধে খুব শীঘ্রই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
আমার গর্ভাবস্থার তৃতীয় মাসে, একদিন সন্ধ্যার দিকে আমি ফুসফুসে হঠাৎ ব্যথা অনুভব করি। পরের দিন আমি প্রায় হাঁটতেই পারছিলাম না। ডাক্তার বললেন যে আমার নিমোনিয়া হয়েছে আর তিনি আমাকে পেনিসিলিন দিলেন। কয়েকদিন বাদে আমি একটু ভালবোধ করলাম, কিন্তু আমি খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। এরপর হঠাৎ আরেকবার আমি আমার ফুসফুসে ব্যথা অনুভব করলাম আর একই পদ্ধতির আবার পুনরাবৃত্তি ঘটে।
এর পরবর্তী দিনগুলিতে, নিঃশ্বাসের কষ্ট হওয়ার দরুন আমি শুতে পারতাম না। প্রথম ব্যথা হওয়ার এক সপ্তাহ পর আমার পা দুটি নীল হয়ে যায় ও ফুলে যায়। এইবার আমাকে হাসপাতালে ভরতি করানো হয়। ডাক্তার আমাকে জানালেন যে ফুসফুসে ব্যথার কারণ হল নিমোনিয়া নয়, কিন্তু রক্ত জমে যাওয়ার ফল। তিনি এও বলেন যে আমার কুঁচকিতে রক্ত জমে গেছে। আমি জানলাম যে সুইডেনে গর্ভবতী নারীদের রক্ত জমে যাওয়ার ফলে মৃত্যু হওয়া হল একটা সাধারণ কারণ। কিছু দিন পর আমি স্টকহোলমের ক্যারোলিনস্কা সুখুসেট হাসপাতালে স্থানান্তরিত হই যেখানে জটিল গর্ভ সংক্রান্ত একটা বিশেষ ক্লিনিক রয়েছে।
ডাক্তারেরা সিদ্ধান্ত নেন যে আমাকে তারা রক্ত-পাতলা করার ওষুধ হেপারিন দেবেন। তারা আমাকে নিশ্চয়তা দেন যে ফুসফুসের মধ্যে আরেকটি রক্তপিণ্ড হওয়ার তুলনায় হেপারিনের দ্বারা রক্তপাত হওয়ার বিপদ অনেক কম। কয়েক সপ্তাহ পর আমি বাড়ি ফেরার মত সুস্থ হয়ে উঠি। আমার ভিতরে বেড়ে ওঠা একটা জীবন্ত শিশু সমেত আমি যে বেঁচে উঠতে পেরেছি তার জন্য অন্তরে এক উষ্ণ আনন্দ উপলব্ধি করি।
সন্তান প্রসবের সময় উপস্থিত
চাপ সৃষ্টি করার দ্বারা প্রসব করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু এই পদ্ধতির ব্যবস্থা গ্রহণ করার আগেই আমার তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। সুতরাং আমাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ডাক্তারেরা কোন সমস্যাই শনাক্ত করতে পারেন না।
পরের দিন বিকালে আমার তলপেট ফুলে যায় এবং ব্যথা কমে না। মাঝরাতে, ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা করেন এবং দেখতে পান যে প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেছে। পরের দিন সকালে আমার তলপেট আরও বেশি ফুলে যায় এবং ব্যথা অসহনীয় হয়ে ওঠে। ডাক্তার চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং জিজ্ঞাসা করেন যে কবে আমি শেষবারের মত শিশুটির বিচলন অনুভব করেছি। আমার হঠাৎ মনে পড়ে যে বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে আমি তা অনুভব করিনি।
আমাকে সঙ্গে সঙ্গে প্রসব ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। দূর থেকে আমি শুনতে পাই যে কর্মীরা কথা বলছে। “ভদ্রমহিলা রক্ত নিতে অস্বীকার করেছেন,” একজন বলে ওঠেন। এরপর একজন নার্স আমার উপর ঝুঁকে পড়ে উচ্চ স্বরে বলে থাকে: “আপনি কি জানেন আপনার শিশুটি মারা গেছে?” আমার মনে হল কেউ যেন আমার বুকে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে।—হিতোপদেশ ১২:১৮.
দৃঢ়তার সাথে রক্ত গ্রহণ করতে অস্বীকার
হঠাৎ ডাক্তার এসে আমাকে জানান যে আমার অবস্থা খুবই সঙ্কটজনক। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে রক্ত না নেওয়ার সিদ্ধান্তে আমি এখনও অটল আছি কি না। আমি জোরের সাথে বলেছিলাম যে আমি অটল, কিন্তু এর পর আমার কিছু মনে নেই। কিন্তু, আমি পরিষ্কারভাবে ডাক্তারকে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে খ্রীষ্টানদের রক্ত থেকে দূরে থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি ঈশ্বরের নিয়মের বাধ্য হতে চাই।—প্রেরিত ১৫:২৮, ২৯; ২১:২৫.
এর মধ্যে তারা আরেকজন ডাক্তারকে ডাকেন, বারব্রো লারসান, একজন দক্ষ শল্যচিকিৎসক। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আসেন ও অপারেশন করেন। যখন তারা আমার পেটের তলদেশে অপারেন করেন, তখন তারা দেখতে পান যে আমি ইতিমধ্যেই ভিতরে রক্তক্ষরণ হওয়ার দরুন তিন লিটার রক্ত হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু ডাক্তার লারসেন রক্ত না নেওয়া সম্বন্ধে আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন।
পরে আরেকজন ডাক্তার বলেন যে কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার মৃত্যু ঘটত। “আমি জানি না এখনই ইনি জীবিত আছেন কি না,” তিনি নাকি মন্তব্য করেছিলেন। পরে জানা যায় যে ডাক্তারেরা বুঝতে পারেননি যে কোথা থেকে আমার রক্তক্ষরণ হচ্ছে আর তাই তারা আমার পেটের তলদেশে কম্প্রেস দিয়ে দেন। ডাক্তার ও নার্সেরা আমার বেঁচে থাকার কোন আশাই দেয়নি।
যখন আমার সন্তানেরা হাসপাতালে আসে ও আমার অবস্থা সম্বন্ধে জানতে পারে তখন ওদের মধ্যে একজন বলেছিল যে হর্মাগিদোন খুব শীঘ্রই আসতে চলেছে, অতএব ওরা আমাকে আবার পুনরুত্থানের মাধ্যমে ফিরে পাবে। এই পুনরুত্থানের ব্যবস্থা কতই না উত্তম ও যথার্থ!—যোহন ৫:২৮, ২৯; ১১:১৭-৪৪; প্রেরিত ২৪:১৫; প্রকাশিত বাক্য ২১:৩, ৪.
দাঁড়িপাল্লার মধ্যে জীবন
আমার হিমোগ্লোবিন কমে প্রতি ডেসিলিটারে ৪ গ্রামে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু আমার রক্তপাত কমে যায়। এর আগে আমি আমার কেস রেকর্ডে নভেম্বর ২২, ১৯৯১ সালের সচেতন থাক! (ইংরাজি) পত্রিকার একটি কপি রেখে দিয়েছিলাম। ডাক্তার লারসন এটি দেখেন এবং এর একটি শিরোনাম পড়েন যার বিষয়বস্তু ছিল, “রক্ত না নিয়ে কিভাবে রক্তক্ষরণ বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।” তিনি আগ্রহের সাথে সেটি পড়েন এটা দেখার জন্য যে এমন কিছু তিনি যদি খুঁজে পান যার দ্বারা তিনি আমাকে জীবন ফিরে পেতে সাহায্য করতে পারেন। তার চোখ পড়ে “আরির্থোপয়টিনের” উপর, যেটি এমন একধরনের ওষুধ যা দেহের মধ্যে শক্তি সঞ্চালন করে এবং লাল রক্তকোষ বাড়িয়ে দেয়। তিনি এটিকে এখন ব্যবহার করেন। কিন্তু এই ওষুধটির ফল প্রতীয়মান হতে সময় লাগে। সুতরাং প্রশ্ন ওঠে যে ঠিক সময় কি আরির্থোপয়টিন কাজ করবে?
পরের দিন আমার হিমোগ্লোবিন কমে ২.৯ দাঁড়ায়। যখন আমি জেগে উঠি এবং দেখি আমার খাটের চারিদিকে আমার পরিবার দাঁড়িয়ে আছে তখন আমি ভাবতে থাকি যে আমার কী হয়েছে। রেসপিরেটার থাকার দরুন আমি কথা বলতে পারি না। আমি দুঃখে বিমর্ষ হয়ে পড়ি, কিন্তু কাঁদতে পারি না। প্রত্যেকে আমাকে বলে যে বাঁচতে হলে আমাকে আমার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে।
আমার পেটের তলদেশে কম্প্রেস রাখার দরুন পরের দিন আমার জ্বর হয়। আমার হিমোগ্লোবিন কমে ২.৭ এ দাঁড়ায়। যদিও এই অবস্থায় একজন ব্যক্তিকে অজ্ঞান করানো খুবই বিপদের বিষয়, কিন্তু ডাক্তার লারসান বলেন যে বিপদের ঝুঁকি নিয়েও কম্প্রেসটিকে সরানোর জন্য অপারেশন করতেই হবে।
অপারেশন হওয়ার আগে সন্তানদের অনুমতি দেওয়া হয় আমার কাছে আসতে ও আমাকে দেখতে। প্রত্যেকেই ভেবেছিল যে এটাই হচ্ছে শেষ দেখা। অধিকাংশ চিকিৎসা কর্মীরা কাঁদতে থাকে। তারা বিশ্বাসই করতে পারেনি যে আমার পক্ষে তা অতিক্রম করা সম্ভব হবে। আমাদের সন্তানেরা ছিল খুবই সাহসী আর এটাই আমাকে সাহায্য করেছিল শান্ত ও দৃঢ়তা বজায় রাখতে।
যেহেতু আমাকে খুব কম পরিমাণে অ্যানেস্থিসিয়া দেওয়া হয়েছিল, তাই কর্মীরা নিজেদের মধ্যে যা কথাবার্তা বলছিল তা আমি এক এক সময় শুনতে পাচ্ছিলাম। কয়েকজন আমার সম্বন্ধে এমন বলছিল যে আমি হয়ত ইতিমধ্যেই মারা গিয়েছি। পরে যখন আমি স্মরণ করেছিলাম যে অপারেশনের সময় আমি কী শুনতে পেয়েছিলাম, তখন একজন নার্স আমার কাছে এরজন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সে বলেছিল যে সে দৃঢ় নিশ্চিত ছিল যে আমি মারা যাব, কিন্তু এখনও সে বুঝতে পারছে না যে আমি কিভাবে বেঁচে উঠলাম।
পরের দিন আমি একটু ভাল বোধ করলাম। আমার হিমোগ্লোবিন দাঁড়ায় ২.৯ এবং আমার হেমাটোক্রিট ছিল ৯। আমার খ্রীষ্টীয় ভাইবোনেরা আমাকে দেখতে আসে এবং আমার পরিবারের জন্য খাবার ও কফি নিয়ে আসে। তাদের প্রেম ও স্নেহের জন্য আমরা খুবই কৃতজ্ঞ। বিকেলের দিকে আমার অবস্থা সঙ্কটজনক কিন্তু স্থায়ী ছিল এবং আমাকে আরেকটি বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয়।
ডাক্তারেরা শিখেছিলেন
চিকিৎসা কর্মীদের মধ্যে অনেকে আমার সম্বন্ধে কৌতূহলী ছিল এবং অধিকাংশই আমার প্রতি খুব সদয় ছিল। একজন নার্স বলে: “আপনার ঈশ্বরই আপনাকে রক্ষা করেছেন।” আরেকটি বিভাগ থেকে একজন ডাক্তার আসেন ও মন্তব্য করেন: “আমি শুধু দেখতে এসেছি যে এত কম হিমোগ্লোবিন নিয়ে একজন ব্যক্তিকে কেমন দেখতে লাগে। আমি বুঝতেই পারছি না যে আপনি কী করে এত সজাগ আছেন।”
পরের দিন, তার ছুটি থাকা সত্ত্বেও, আমার ডাক্তার আমাকে দেখতে আসেন। তিনি বলেন যে যা কিছু ঘটেছে তার জন্য তিনি নম্রতার এক অনুভূতি উপলব্ধি করছেন। তিনি বলেন যে যদি আমি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠি তাহলে রক্ত দেওয়ার বিকল্প পদ্ধতির দ্বারা রোগীকে চিকিৎসা করা সম্বন্ধীয় এক নতুন গবেষণার সূচনা করা হবে।
আমার আরোগ্যলাভ ছিল এক নাটকীয় ব্যাপার। আমার দুঃখময় প্রসবের আড়াই সপ্তাহ পর আমার হিমোগ্লোবিন বেড়ে ৮ এর থেকে একটু বেশিতে দাঁড়ায়। অতএব আমাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিন দিন পর আমাদের যিহোবা সাক্ষীদের বার্ষিক সীমা অধিবেশন হয় এবং আমি সেখানে উপস্থিত থাকি। আমাদের খ্রীষ্টীয় ভাইবোনেদের আবার দেখতে পাওয়া কতই না উৎসাহজনক যারা আমাদের বিপদের সময় সাহায্য করেছিল!—হিতোপদেশ ১৭:১৭.
ডাক্তার লারসান যেমন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আমার কেস সম্বন্ধে একটি রিপোর্ট যার নামকরণ ছিল “রক্তদানের স্থান অদুর্থ্রাপয়টিন নেয়,” এটি সুইডেনের একটি চিকিৎসামূলক পত্রিকা ল্যাকারটিড-নিনজেনে প্রকাশিত হয়। এটি জানায় “৩৫ বছরের একজন যিহোবার সাক্ষী, এক সঙ্কটপূর্ণ প্রসব সংক্রান্ত প্রচুর রক্তক্ষরণে ভোগেন। তিনি রক্ত নিতে অস্বীকার করেন এবং অদুর্থ্রাপয়টিন চিকিৎসা গ্রহণ করেন। অপারেশন হয়ে যাওয়ার পর নয় দিন ধরে তাকে অধিক পরিমাণে আরর্থোপয়টিন দেওয়া হয়, তার হিমোগ্লোবিন প্রতি ডেসিলিটারে ২.৯ থেকে বেড়ে ৮.২ এ দাঁড়ায় কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়াই।”
প্রবন্ধটি এইভাবে শেষ হয়: “প্রথম দিকে রোগীটি খুবই দুর্বল ছিলেন, কিন্তু তিনি খুব তাড়াতাড়ি আরোগ্যলাভ করেন। এছাড়াও অপারেশনের পরবর্তী অবস্থাটি একেবারেই জটিল ছিল না। দুই সপ্তাহ পরে রোগীকে বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়।”
যদিও এই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর ছিল, কিন্তু আমরা খুশি যে এর ফলে কয়েকজন ডাক্তার রক্ত নেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও কিছু জানতে পেরেছেন। আশা করা যায় যে তারা সেই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করবেন যা সফল হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।—অ্যান ইপিসিওটিসের দ্বারা কথিত।
[২৪ পৃষ্ঠার চিত্র]
আমার সাহায্যকারী ডাক্তারের সাথে