প্রস্তরখণ্ড যা বিচ্ছুরিত হয়
রাতের এক স্বচ্ছ আকাশে আপনি কি কখনও কোন উল্কাকে জ্বলতে দেখেছেন? সম্ভবত খুব শীঘ্রই আপনি তা দেখতে পাবেন। বিজ্ঞানীদের মতে প্রকৃতির এই অগ্নিক্রিয়া পৃথিবীর আকাশে প্রতিদিন ২০,০০,০০,০০০ বার দেখা যায়!
এগুলি কী? এগুলি হল প্রস্তর অথবা ধাতুর এক অংশবিশেষ যাকে উল্কাপিণ্ড বলা হয় যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সাথে সাথে শ্বেততাপে জ্বলে ওঠে। পৃথিবী থেকে নিরীক্ষিত আকাশের মধ্যে যে উজ্জ্বল আলোটি দেখা যায় তাকেই বলা হয় উল্কা।
অধিকাংশ উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগেই সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যায়, কিন্তু কয়েকটি, তীব্র তাপ সহ্য করে পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে এসে পৌঁছায়। এগুলিকে বলা হয় মেটিওরাইট। কিছু বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন যে প্রতিদিন পৃথিবীতে প্রায় ১,০০০ টন এই বিচ্ছুরিত প্রস্তরখণ্ড জমা হয়।a
অপেক্ষাকৃতভাবে এই বিচ্ছুরিত প্রস্তরখণ্ডগুলির পরিমাপ খুবই ছোট থাকার দরুন এই বিচূর্ণকরণ খুব কম ক্ষেত্রেই মানুষের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়ে থাকে। বস্তুতপক্ষে, উল্কাপিণ্ড থেকেই অধিকাংশ মেটিওরাইটের সৃষ্টি হয় যেগুলি বালুকণার থেকে কোন অংশে বড় নয়। (“বহিঃস্থ মহাকাশ থেকে আসা প্রস্তরখণ্ডগুলি,” এই বাক্সটি দেখুন।) কিন্তু বৃহৎ প্রস্তরখণ্ডগুলি যা মহাকাশে বিচ্ছুরিত হয় সেগুলির সম্বন্ধে কী বলা যায়? উদাহরণস্বরূপ, বিবেচনা করুন সেরেসের কথা যার ব্যাসরেখা প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার! এছাড়াও আরও প্রায় ৩০ রকমের প্রস্তর রয়েছে যাদের ব্যাসরেখা ১৯০ কিলোমিটারেরও বেশি। অপেক্ষাকৃতরূপে দীর্ঘ এই প্রস্তরখণ্ডগুলি বস্তুতপক্ষে ছোট ছোট গ্রহের তুল্য। বিজ্ঞানীরা এগুলিকে গ্রহাণুপুঞ্জ বলে থাকে।
এদের মধ্যে যদি একটি গ্রহাণুপুঞ্জের সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ লাগে তাহলে? বিজ্ঞানীদের দ্বারা এই গ্রহাণুপুঞ্জ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণই হল এই সম্ভাব্য বিপদটি। যদিও অধিকাংশ গ্রহাণুপুঞ্জ মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথের মধ্যেই থাকে কিন্তু জ্যোতির্বিদেরা লক্ষ্য করেছেন যে কয়েকটি, পৃথিবীর কক্ষপথ অতিক্রম করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, অ্যারিজোনায়, ফ্ল্যাগস্টাফের কাছে অবস্থিত উল্কার আগ্নেয়গিরির (যেটিকে ব্যারিঞ্জার ক্রেটারও বলা হয়) মত আরও কয়েকটি বিশাল আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব সংঘর্ষের বিপদকে বাড়িয়ে তোলে। ডায়নোসেরাসের বিলুপ্তির পিছনে একটি মতবাদ হল যে একটি তীব্র সংঘর্ষ বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন ঘটায় ও পৃথিবীকে বেশ কিছু সময় ধরে ঠাণ্ডা আবহাওয়ার মধ্যে আচ্ছাদিত রাখে যা ডায়নোসেরাসের জন্য বেঁচে থাকার পক্ষে সঙ্কুলন ছিল না।
আজকের দিনে এইধরনের তীব্র সংঘর্ষ সম্ভবত মানবজাতিকে ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু বাইবেল ইঙ্গিত করে যে “ধার্ম্মিকেরা দেশের [“পৃথিবীর,” NW] অধিকারী হইবে, তাহারা নিয়ত তথায় বাস করিবে।”—গীতসংহিতা ৩৭:২৯.
ভিডিও টেপে অগ্নিগোলা
কয়েকটি উল্কা সাধারণত উজ্জ্বল ও বড় হয়ে থাকে। এগুলিকে বলা হয় অগ্নিগোলা। অক্টোবর ৯, ১৯৯২ সালে, উপরিস্থ ছবিতে যেমন দেখানো হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু স্থানে আকাশের মধ্যে এই অগ্নিগোলাকে দেখা যাচ্ছে। এই অগ্নিগোলাকে প্রথম দেখা গিয়েছিল পশ্চিম ভার্জিনিয়াতে যেখানে এটি ৭০০ কিলোমিটার জুড়ে ব্যাপৃত ছিল। এর একটি টুকরো, যার ওজন ছিল ১২ কিলোগ্রাম, নিউ ইয়র্ক, পিকস্কিলে, দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির উপর এসে পড়ে।
এই ঘটনাটি কেন এত স্বতন্ত্র তার কারণ হল যে যেরকম আলতোভাবে উল্কাপিণ্ডটি বায়ুমণ্ডলের মধ্যে প্রবেশ করে, যার ফলে একটি উজ্জ্বল অগ্নিগোলার সৃষ্টি হয় যা কেবলমাত্র ৪০ সেকেন্ডের মত স্থায়ী থাকে। এটি একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগ দিয়েছিল ভিডিওর মধ্যে এটিকে রেকর্ড করে রাখার আর এটি করা হয়েছিল ১৪টি বিভিন্ন জায়গা থেকে। প্রকৃতি (ইংরাজি) নামক পত্রিকা অনুসারে, “এগুলি হল অগ্নিগোলা সম্বন্ধীয় প্রথম চলচ্চিত্র যেখান থেকে মেটিওরাইটকে পুনরায় আবিষ্কৃত করা হয়।”
এই অগ্নিগোলা ৭০টি টুকরো হয়ে ভেঙে যায় এবং এগুলি কয়েকটি ভিডিও টেপে এক একটি উজ্জ্বল অভিক্ষেপ হয়ে প্রকাশ পায়। যদিও এই ঘটনাটির থেকে মাত্র একটি মেটিওরাইট পাওয়া যায়, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে আরও একটি বা তারও বেশি রয়েছে যেগুলি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যে প্রবেশ করে মাটির সাথে সংঘর্ষিত হয়েছে। সেই বিশাল উল্কাপিণ্ড যার ওজন ছিল প্রায় ২০ টন এটি হতে পারে তারই অংশবিশেষ যা থেকে গেছে।
[২১ পৃষ্ঠার বাক্স]
বহিঃস্থ মহাকাশ থেকে আসা প্রস্তরখণ্ডগুলি
গ্রহাণুপুঞ্জ: যাকে প্ল্যানিটয়েড বা ক্ষুদ্র গ্রহও বলা হয়। এই অতি ক্ষুদ্র গ্রহগুলি সূর্যের কক্ষপথে ঘুরে বেড়ায়। অধিকাংশেরই অসম গঠন রয়েছে যা হয়ত ইঙ্গিত করে যে এগুলি এক সময়কার বিশাল বস্তুর কোন অংশ।
উল্কাপিণ্ড: অপেক্ষাকৃতরূপে ছোট আকারের কোন ধাতু অথবা প্রস্তরখণ্ড যা মহাকাশের মধ্যে ভেসে বেড়ায় অথবা বায়ুমণ্ডলের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়। কয়েকজন বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে উল্কাপিণ্ড হল গ্রহাণুপুঞ্জেরই টুকরো যা সংঘর্ষের ফলে অথবা লুপ্তপ্রায় ধূমকেতুর প্রস্তরখণ্ডগুলির ধ্বংসাবশেষ থেকে এসেছে।
উল্কা: যখন উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, বাতাসের সংঘর্ষ অতিরিক্ত তাপ ও উজ্জ্বল আলোর সৃষ্টি করে। এই তপ্ত উজ্জ্বল গ্যাসগুলি ক্ষণিকের জন্য আলোর রশ্মি নিয়ে আকাশে দেখা দেয়। এই আলোর রশ্মিকে বলা হয় উল্কা। অনেকে এটিকে শুটিং স্টার অথবা ফলিং স্টার বলে থাকে। অধিকাংশ উল্কাগুলিকে দেখা যায় যখন তারা পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ থেকে ১০০ কিলোমিটার উপরে থাকে।
মেটিওরাইট: অনেক সময় উল্কাপিণ্ড এত বিশাল হয়ে থাকে যে এটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সময় সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যায় না পৃথিবীতে এসে পড়ে। মেটিওরাইট হচ্ছে সেইধরনের উল্কাপিণ্ডেরই আরেকটি শব্দ। এদের মধ্যে কয়েকটি খুবই বিশাল ও ভারী হতে পারে। আফ্রিকার নামিবিয়াতে, একটি মেটিওরাইটের ওজন ৬০ টনেরও বেশি। অন্যান্য মেটিওরাইটগুলি, যাদের ওজোন ১৫ টন অথবা তার চাইতেও বেশি, এগুলিকে পাওয়া যায় গ্রীনল্যাণ্ড, মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
[২১ পৃষ্ঠার বাক্স/চিত্র]
আইডা ও তার শিশু চাঁদ
একটি গ্রহাণুপুঞ্জ যার নাম আইডা, তার ছবি নেওয়ার সময়, গ্যালিলিও মহাকাশযান, বৃহস্পতি গ্রহে যাওয়ার সময় এক অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার করে—চাঁদ গ্রহাণুপুঞ্জের কক্ষ পথে ঘুরছে এমন এক প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়। আকাশ ও দূরবীন (ইংরাজি) নামক বইটিতে যেমন রিপোর্ট করা হয়েছে, বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে এই ডিম্বাকৃতি চাঁদটি, যার নাম হল ড্যাকটিল, এর পরিমাপ হল ১.৬ কিলোমিটার ও ১.২ কিলোমিটার। এর কক্ষপথ প্রায় গ্রহাণুপুঞ্জ আইডার কেন্দ্রস্থল থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে, যার পরিমাপ ৫৬ কিলোমিটার ও ২১ কিলোমিটার। এদের অবহেলিত রঙের বৈশিষ্ট্য ইঙ্গিত করে যে আইডা ও তার ক্ষুদ্র চাঁদ হল গ্রহাণুপুঞ্জের পরিবার করোনিসেরই অংশ যেটিকে একটি বিশাল প্রস্তরখণ্ডের একটি টুকরো বলে ধরে নেওয়া হয় যা মহাকাশের মধ্যে একটি সংঘর্ষের ফলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
[পাদটীকাগুলো]
a অনুমানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
[সজন্যে]
NASA photo/JPL
[২২ পৃষ্ঠার চিত্র]
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, অ্যারিজোনায়, ফ্ল্যাগস্টাফের কাছে অবস্থিত এই উল্কার আগ্নেয়গিরির ব্যাসরেখা হল ১,২০০ মিটার এবং এর গভীরতা হল ২০০ মিটার
[সজন্যে]
Photo by D. J. Roddy and K. Zeller, U.S. Geological Survey
[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র সৌজন্যে]
Sara Eichmiller Ruck